স্নিগ্ধ অনুভব পর্ব ১১+১২+১৩

0
87

#স্নিগ্ধ_অনুভব
#পার্ট:১১
#পিচ্চি_লেখিকা

কাল থেকে মেঘলার বিয়ের অনুষ্ঠান তাই চুপ চাপ কাপড় গুছিয়ে নিচ্ছি। আর অনুভব একাধারে জিজ্ঞেস করেই চলেছে অতীতে কি হয়েছিলো কিন্তু আমি কিছু বলিনি। এসব জানতে পারলে উনি কষ্ট পাবে,,আমি চাই না উনি কষ্ট পাক তাই তো চুপ করে আছি। মেঘলা বলে দিয়েছে আজ থেকেই যেনো আমি, অনুভব, তন্নি, তামিম, তিশা আপু, অনা সবাই যেনো ওর বিয়েতে যায়। তিশা আপু কাল যাবে তাই আজ আমি অনুভব আর অনা যাবো। আর তন্নি তামিম ও ওইদিক থেকে আসবে। অনুভব এতো বার জিজ্ঞেস করার পরও আন্সার না পেয়ে বিরক্ত হয়ে চলে গেলো। আজকাল অনুভবের বিহেভে বড্ড অবাক হয়। কয়েকদিন আগেও যে লোক কথায় কথায় থাপ্পড় দিতো সে এখন থাপ্পড় তো দুর ধমকও দেয় না। উনার রাগ জেদ এসবে আমার বেশ ধারণা আছে। উনি একটুতেই রেগে যান অথচ রাহাতের কথা শুনে রিয়েক্ট করলো না? কেন?

মেঘলাদের বাড়ি চলে এসপছি। অনুভবে রাগে আমার সাথে কথাটাও বলেনি। পুরো রাস্তা চুপ ছিলো৷ আমাকে আর অনাকে দিয়ে হসপিটালে চলে গেছে। মেঘলা অনেকবার নিষেধ করা সত্বেও অজুহাত দিয়ে চলে গেলো। বলেছে আসতে রাত হবে। আমি কিছু বলিনি। তন্নি আর তামিমও চলে এসেছে। সবাই মিলে আড্ডা দিচ্ছি।
“তোর জামাই কই রে স্নিগ্ধু?” (তামিম)
“তোর হঠাৎ আমার জামাইরে দিয়া কি কাজ?”
“আরে তোর জামাইয়ের পায়ের ধুলা নিমু। ছোট বোনের ঝাঁড়ি খেয়ে একদম ফিট হয়ে গেছে। তোর ওই ননদ আমার বড় না হয়লে একটা চান্স নিতাম!”
“ওই ওই তামিম্ম্যা সাবধানে কথা কবি ওইডা আমার ননদিনী লাগে। তোর বড় আপু হয়। সম্মান কইরা কথা কবি।”
“ধুরো লুচু। তোর শুধু মাইয়া পটানো ছাড়া কাম নাই নাকি?” (তন্নি)
“আহারে মোর সাধু সন্ন্যাসী! তুমি যে সারাদিন ছেলেগো সাথে ফ্লার্ট করো তাতে কিছু না তাই না!” (তামিম)
“আমি কি তোর মতো বান্ধবীর ননদ রে পটানোর কথা কয়ছি?(তন্নি)
” তুই মাইয়া মানুষ তুই কেন ওর ননদরে পটাইয়ে যাবি? বাই দ্যা ওয়ে, স্নিগ্ধু জানে তুই যে তলে তলে কতদূর গেছিস?”(তামিম)
“এই দাঁড়া দাঁড়া তামিম্ম্যা আমি কি জানি না রে? কাহিনি কি?”
“ধুরু ছেরি দাঁড়ায়তে কস কেন? তোর বান্ধুপিরে জিগা কি করতেছে তলে তলে?” (তামিম)
“এই তোরা এত ঝগড়া করিস কেন বল তো? তন্নি কাহিনি কি?” (মেঘলা)
“আ..আরে কিছু না। ওর কথা বিশ্বাস করিস কেন তোরা?” (তন্নি)
“আমার কথা বিশ্বাস করবে না কেন? আমি বলবো তুষার ভাই……(তামিম)
” এই থাম থাম মেরি ভাই। এমনে আমার প্রেসটিজ ফুটা করিস না ভাই।”(তন্নি)
“সর সর আমি কমুই যে।”(তামিম)
“এই তোরা ২ টা থাম। যেকোনো একজন বল কাহিনি টা কি?”
“আমি বলি তন্নি!”(তামিম)
“ইয়ে মানে!”(তন্নি)
“তুই থাম। তামিম তুই বল,,”
“আরে আমাদের তন্নি তো তুষার ভাইয়ার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। কয়দিন তো যেখানে তুষার সেখানেই তন্নি🥴” (তামিম)
তামিমের কথা শুনে আমি আর মেঘলা হা করে তন্নির দিকে তাকিয়ে আছি আর তন্নি ফোকলা হাসি দিয়ে বসে আছে। আমি আর মেঘলা দুইজন দুজনের দিকে তাকিয়ে হেঁসে দিলাম।
“তন্নি তুইও না। তুষার ভাইয়ার পিছনে পড়ছিস এখন? তুষার ভাই কিন্তু অনুভবের মতোই রাগী। ফ্লার্টিং করা ছেড়ে দে মেরি মা। নয়তো আমার মতো থাপ্পড় খেতে খেতে শহিদ হয়ে যাবি।”
তন্নি চোখ ২ টা ছোট ছোট করে বললো,,
“ফ্লার্ট করছি না আমি। আই রিয়েলি ফিল লাভ উইথ হিম।”
“মজা করা বাদ দে। চুপচাপ বসে থাক।”
৪ জনই গল্পে মেতে ছিলাম তখনই দরজার বাইরে থেকে অনা ডাকলো।
“ভাবি”
অনার কথায় ওর দিকে তাকালাম। ওর কথা আমার মনেই ছিলো না। ওকে আমি রুমে রেখে এসেছিলাম।
“সরি সরি অনা আসলে আমি ভুলে গেছিলাম। রিয়েলি সরি।”
“ইটস ওকে ভাবি।”
তারপর ৪ জন মিলে অনেকক্ষণ আড্ডা দিয়ে যে যার রুমে চলে গেলাম। তন্নি সত্যি সত্যি তুষার ভাইয়ার প্রেমে পড়েছে। এই মেয়ের সাহস আছে বটে।

রাতে ডিনার করে একা একা রুমে বসে আছি। অনুভব সেই যে গেছে এখনো ফেরে নি। ফোন টাও সুইচড অফ বলছে। চিন্তায় মাথা হ্যাং মেরে গেছে্। ওরা সবাই আড্ডা দিচ্ছে আমাকে একবার ডেকেও গেছে কিন্তু আমি যায়নি। রুমের মধ্যে কখনো পায়চারী করছি তো কখনো বসছি কখনো বারান্দায় যাচ্ছি। শান্তি মতো বসতে পারছি না। হঠাৎ করে দরজা খোলার আওয়াজে পেছনে তাকাতেই দেখি অনুভব এসেছে। চুল গুলো এলোমেলো,,চোখ লাল হয়ে আছে। বিধ্বস্ত অবস্থা তার। আমি তাড়াতাড়ি ওর কাছে এগিয়ে বললাম,,
“কোথায় ছিলেন এতক্ষণ? ফোন অফ কেন আপনার? আর..আর এই অবস্থা কেন আপনার?”
“এত অস্থির হওয়ার কিছু হয়নি,,সর।”
অনুভব আমাকে কিছু বলতে না দিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো। আমি গিয়ে বেডের এক কোণে চুপ করে বসে আছি। কিছুক্ষণ পরই অনুভব ফ্রেশ হয়ে বাইরে আসলো। চুল গুলো ঠিক করতে করতে বললো,,
“সবাইকে দেখলাম মেঘলার রুমে আড্ডা দিচ্ছে তা তুই এই রুমে কেন?”
অনুভবের কথায় ওর দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়েই মাথা নিচু করে বললাম,,
“আপনার জন্য ওয়েট করছিলাম। আপনাকে এই রুমে কে দিয়ে গেলো?”
“অনা!”
“ওহ!”
“হুম!”
কি ভেবে অনুভবের কাছে গিয়ে ওর মুখোমুখি দাঁড়াতেই বললো,,
“কি হয়ছে?”
“কোথায় ছিলেন?”
“তোকে তো বলেই গিয়েছিলাম হসপিটালে যাচ্ছি.. তাহলে?”
“ফোন অফ কেন?”
“এমনি!তোর এসব না জানলেও চলবে।”
“এভাবে বলছেন কেন? আমি তো আপনার বউ! আপনার বিষয়ে সব জানার অধিকার আমার আছে।”
“আমার নেই?”
“থাকবে না কেন?”
“তাহলে আমি কেন জানি না তোর অতীত? কেন তুই এড়িয়ে যাস আমাকে?”
“………..
” জানি তুই কিছুই বলবি না। যায় হোক ঘুমিয়ে পড়।”
অনুভব আমাকে পাশ কেটে চলে যেতে লাগল। তখনই বলে উঠলাম,,
“সবটা জানলে ভেঙে পড়বেন না তো?”
অনুভব আমার থেমে গিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো,,
“কি এমন করেছিস যে ভেঙে পড়বো?”
“আমি আর কি করবো? আমি তো ওই বাড়ির আশ্রীতা ছিলাম। ওই পরিবারের স্বার্থের জন্য আমাকে বলি দিতেও ভাবেনি।”
“মানে?”
আমি অনুভবের কাছে এগিয়ে গিয়ে আলতো করে উনার গালে হাত দিয়ে বললাম,,
“আজ না। মেঘুর বিয়ে শেষ হোক সব জানবেন আপনি!”
“আজ বললে কি হবে?”
“কাল থেকে মেঘুর বিয়ে। বিয়েটা খারাপ কাটুক আমি তা চায় না। প্লিজ বিয়ের শেষে সব বলবো এইটুকু সময় অপেক্ষা করুন। করবেন তো?”
অনুভব তার গাল থেকে আমার হাত সরিয়ে হাতে ঠোঁট ছুঁইয়ে বললো,,
“করবো বউ। অপেক্ষা করবো!”
আমি মৃদু হেঁসে বললাম,,
“এবার চলেন খেয়ে নেন।”
“খেয়ে আসছি আমি। তুই খেয়েছিস?”
“খেয়ে এসেছেন মানে? কার সাথে খেয়ে আসছেন হ্যাঁ?”
“আরে বউ কি বলিস? আমি তো একাই খেয়ে আসলাম।”
“সত্যি তো?”
“হুম রে বইন হুম।”
“আচ্ছা শুয়ে পড়েন যান।”
“কোথায় শুবো আজ?”
“বেডে শুয়ে পড়েন। এমনিতেও আমরা হাসবেন্ড-ওয়াইফ, আর তাছাড়াও এটা মেঘুদের বাড়ি। কেউ ভুল করেও আপনাকে সোফাতে দেখলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।”
“থাক ম্যাডাম আর লজিক দিয়েন না।”
“আইচ্ছা দিমু না আর।”
“ঘুমাবি না তুই?”
“না আমি যাবো ওদের সাথে আড্ডা দিতে।”
“তো আমি একা একা কেন ঘুমাবো?”
“তো আপনি কি বাচ্চা যে দোকলা নিয়ে ঘুমাবেন।”
“চুপ কর। কথা কম বলে আমার সাথে ঘুমা।”
“না ঘুম….
আর কিছু বলতে না দিয়ে অনুভব আমাকে বেডে ফেলে দিয়ে বললো,,
” ঠিক মতো শুয়ে পড়।”
“ধ্যাত আমি ওদের কাছে যাবো!”
“রাগ উঠাবি না। চুপচাপ ঘুমা। নয়লে তোকে..
” থাক ঘুমাচ্ছি।”
অনুভব আমার পাশে এসে শুয়ে পড়লো। আমি চুপ করে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছি। মাথাটা একটু বের করে দেখি অনুভব গভীর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তাড়াতাড়ি আবারও কম্বলের মধ্যে মুখ লুকিয়ে শুয়ে থাকলাম। কয়েক সেকেন্ড যেতেই অনুভব এক টানে নিজের কাছে নিয়ে মিশিয়ে নিলো৷ আমি তল অবাক হয়ে গেছি। কখনো আমার সাথে ঘুমায় না আর আজ কি না নিজের কাছে টেনে নিচ্ছে। আমি অবাকের রেশ কাটিয়ে মাথাটা অনুভবের বুকে রেখে ওকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

আজ মেঘলার গায়ে হলুদ। সবাই খুব সুন্দর করে সেজেছে। সকাল থেকেই বাড়িতে হৈ হুল্লোর করে মেতে থেকেছি সবাই। অনুভবও আমাদের আনন্দে সামিল হয়েছিলো। এখন সন্ধ্যল হয়ে গেছে। সবাই সেজেছে। কেউ শাড়ি তো কেউ লেহেঙ্গা পড়েছে। কেউ ব্রাউডাল সাজে তো কেউ হালকা সাজে। মেঘলা কে শাড়ি পড়িয়ে হালকা সাজে সাজানো হয়েছে। ফাহিম ভাইয়া ফোন দিয়ে আগে দেখে নিয়েছে তার বউকে৷ তন্নি, অনা, আমি, তিশা আপু ৪ জনই লেহেঙ্গা পড়েছি্। আমি শপিং করার সময় অনার জন্যও কিনে শপিং করে নিয়েছিলাম। অনুভবও বিনা বাক্যে ওর জন্যও শপিং করিয়ে দিয়েছে্। আমি শাড়ি পড়তে পারি না তাই লেহেঙ্গাই পড়েছি। এখনো হলুদ মাখানো শুরু হয়নি। ফাহিম ভাইয়ার বাসা থেকে হলুদ তত্ত্ব আসলে মাখানো শুরু হবে। এখন থেকেই সবাই অনুষ্ঠান নিয়ে মাতামাতি করছে। কেউ নাঁচছে কেউ গায়ছে। কেউ কাপল ডান্স করছে। একেকটা পারফর্ম দেখে মুগ্ধ হচ্ছি। সবার মাঝেই কোনো না কোনো দক্ষতা রয়েছে। অনুভব আর আমি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছি। অনুভব পাঞ্জাবি পড়েছে। শুধু অনুভব একা না প্রাই সব ছেলেরাই পাঞ্জাবি পড়েছে। তন্নি তো তুষার ভাইয়া কে পটাতে ব্যস্ত। তুষার ভাইয়া বার বার চোখ গরম দিচ্ছে আর তন্নি ৩২ টা দাঁত বের করে হাঁসছে। ওর এমন অবস্থা দেখে আমি আর অনুভব হাঁসতে হাঁসতেই শেষ।
অনুভব আর আমি গল্প করছিলাম তখনি তন্নি দৌড়ে এসে আমাদের সামনে দাঁড়ায়।
“অনুভব ভাইয়া,,চলেন এবার আপনার পারফর্ম।” (তন্নি)
“আমার পারফর্ম মানে?”
“আমরা কিন্তু জানি আপনি অনেক সুন্দর গান গায়তে পারেন সো এখন গান গাইবেন।”
“না না আমি পারবো না।”
“না ভাইয়া প্লিজ। আজ মেঘুর গায়ে হলুদ আজ অন্তত ওর জন্য গান গাইতেই পারেন। প্লিজ প্লিজ ভাইয়া!”
“এহহ না। আমার এত মানুষের মাঝে গান গাইতে লজ্জা করবে।”
আমি অনুভবের কথা শুনে হা হয়ে গেছি। মুখ থেকে আপনা আপনি বের হয়ে আসে,,
“অ্যাাাাা?”
আমার অ্যাাা বলায় সবাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। অনুভব বললো,,
“অ্য্যাাাা বলার কি হয়ছে?”
“কি..কিছু না।”
মুখে কিছু না বললেও মনে মনে বলতেছি😁😁
“এই লোকের আবার লজ্জা! হাউ ফানি। রাস্তায় বলে বউয়ের সাথে রোমান্স করবে আর এখানে গান গাইতেই নাকি উনি লজ্জায় মরে যাবেন হুহ।”
তন্নি জোড় করে অনুভবকে নিয়ে গিয়ে মাইক্রোফোন ধরিয়ে দিলো৷ অনুভব গলা ঝেড়ে গিটার নিয়ে গান গাইতে শুরু করলো,,

Tere dar pe aake tham gaye
Naina namazi bann gaye
Ek dooje mein yun dhal ke
Aashiqana aayat ban gaye
main aur tum…..
Kaisi dill lagaai kar gaye
Rooh ki rubaai bann gaye
Khaali khaali dono thhe jo
Thoda sa dono bhar gaye
main aur tum…..
Chalo ji aaj saaf saaf kehta hoon
Itni si baat hai mujhe tumse pyar hai
Yunhi nhi main tumpe jaan deta hoon
Itni si baat hai mujhe tumse pyar hai

Chalo ji aaj saaf saaf kehta hoon
Itni si baat hai mujhe tumse pyar hai
Mujhe tumse pyar hai……(আমি আর পারি না হিহিহি যার যার ইচ্ছা ইউটিউব থেইকা শুনে নিয়েন😏)

অনুভব পুরে গানটাই আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো। লজ্জায় মাথা নিচু করে নিয়েছিলাম। হঠাৎ করেই কেউ পিছন থেকে টান দিয়ে মুখ চেপে একটা রুমে নিয়ে গেলো…..
#স্নিগ্ধ_অনুভব
#পার্ট:১২
#পিচ্চি_লেখিকা

(দেরী হওয়ার জন্য দুঃখিত)

একটা অন্ধকার রুমে মাথা চেপে বসে আছি। পাশেই দাঁড়িয়ে আছে অনা, তিশা আপু, তন্নি, তামিম, মেঘলা আর রাহাত। তন্নি গিয়ে রুমের লাইট দিয়ে আমার সামনে এসে বসে আছে। আজকে আমাদের জিবনে অনেক খুশির দিন হলেও এখন আমার কাছে সব কিছুই বিশাদময় লাগছে। রাহাত করুন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

কিছুক্ষণ আগে……
কেউ টেনে অন্ধকার রুমে নিয়ে যাওয়ায় খুব ভয় পেয়ে যায়। সেই লোকটা আমাকে একটা রুমে নিয়ে গিয়ে মুখ ছেড়ে দেয়। তারপর রুমের আলো দিতেই দেখি ওখানে রাহাত দাঁড়িয়ে। ওকে দেখে ভয় আর রাগ ২ টাই জেঁকে বসে। ভয় আর রাগ নিয়েই বললাম,,
“আপনি আমাকে এখানে কেন এনেছেন?”
রাহাত কিছু না বলে জাপটে ধরে আমাকে। উনার এহেন কাজে তো আমি চরম অবাক। হাত পা যেনো অবশ হয়ে গেছে। রাহাত আমাকে জড়িয়ে ধরেই বললো,,
“আমার তোমার লাইফে ২য় বার আসার একটুও ইচ্ছা ছিলো না স্নিগ্ধপরী। খুব ভালোবাসি তোমাকে। ফাহিম ভাইয়া বিয়ে তে এসেছিলাম। কিন্তু সব জায়গাতেই তোমাকে পাই। তোমাকে দেখলে নিজেকে ধরে রাখতে পারি না। ইছা করে নিজের করে ধরে রাখতে। আজ তুমিও আমার হতে যদি না সেদিন…..
রাহাতের কথা জড়িয়ে যাচ্ছিলো। বুঝতে পারছিলাম কান্না করছে। আমি নিজেকে ছাড়িয়ে কিছু বলতে যাবো তখনই পিছন থেকে কারো কন্ঠ শুনে রাহাত নিজেই আমাকে ছেড়ে দেয়। পেছনে তাকিয়ে দেখি অনুভব দাঁড়িয়ে আছে। উনাকে দেখেই ভয়ে গুটিয়ে যায়। এখন যদি উনি আমাকে ভুল বুঝে তাহলে কি হবে? আবার কোন ঝড় আসছে! অনুভব দুরে দাঁড়িয়ে একবার আমার দিকে তাকিয়ে আরেকবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রাগ দমানোর চেষ্টা করছে। আমাকে মাথা নিচু করে থাকতে দেখে বললো,,
” উনিই রাহাত তাই না রে স্নিগ্ধু? এগুলোর জন্যই বলেছিলি মেঘলার বিয়ে শেষ হলে বলবি! এসবের জন্যই বলেছিলি সত্যিটা সহ্য করতে পারবো কি না? আবারও ঠকালি!”
আমি অনুভবের কথা শুনে মুখ তুলে করুন চোখে তাকিয়ে উনার দিকে এক পা এগিয়ে গিয়ে কিছু বলতে যাবো তখনই উনি আমাকে হাত দেখিয়ে থামিয়ে দিলো। আমি একবার উনার দিকে আর একবার উনার হাতের দিকে তাকালাম।
“কাছে আসিস না। অনেক কষ্টে নিজের রাগ দমিয়ে রেখেছি কাছে আসলে আবারও তোর উপরে রাগ ক্ষোভ মিটাবো তার থেকে তুই দুরেই থাক।”
“অনুভব আমার কথাটা একবার শোনেন!”
“কি শুনবো আর? যা দেখার তা তো দেখলাম ই আর রাহাতের কথা শুনলাম ও।”
অনুভব রাহাতের পুরো কথা শুনলে এইসব কেন বলছে? উনি কি তবে পুরো কথা শুনে নাই? হয়তো!
“৩ বছর আগে দুরে থেকে ঠকিয়েছিস আর আজ কাছে এসে। তোর রাহাত কে প্রয়োজন হলে বিয়েতে রাজি হলি কেন? রাহাতের টাকা তোর এতই দরকার? বল!”
“কি বলছেন এসব?”
“কেন বুঝতে পারছিস না? আরে ৩ বছর আগে তো এই টাকার জন্যই প্রেম করে বিয়ে করতে চাইছিলি এই রাহাতের সাথে তাই না? আর আজ ওকে দেখে সেই প্রেম আবারও জেগে উঠেছে।”
“অনুভব কি বলছেন এসব? এসব আপনাকে কে বলছে?”
“কেন সত্যি টা জানি বলে তোর খুব খারাপ লাগছে? তোকে আমি কি দেয়নি বলতে পারিস? যখন থেকে বুঝতে শিখেছি তখন থেকেই এই অনুভবকে স্নিগ্ধর সাথে জুড়ে দিয়েছে। কিন্তু সব স্বপ্ন তুই এক মুহূর্তেই ভেঙে দিয়েছিলি।”
“আমি আপনার স্বপ্ন ভেঙেছি?”
“হ্যাঁ ভেঙেছিস। ৩ বছর আগে রাহাত বিয়ে না ভাঙলে তো তুই ওকেই বিয়ে করে নিতি তাই না? ৩ বছর আগে যখন শুনেছিলাম তোর বিয়ে নিমিষেই মনের কোণে জন্ম নেয়া অনুভূতিরা থেমে গিয়েছিল। তখনই ফিরতে চেয়েছিলাম বিডিতে কিন্তু কেন আসতাম? তোর জন্য? তুই তো নিজে থেকে এই বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলি! ইনফ্যাক্ট তোরা তো রিলেশনে ছিলি তাই না? রাহাত ছিলো শহরের সব চেয়ে বড় বিজনেসম্যান এর ছেলে। বড় লোক ছেলে দেখে নিজের লোভ সামলাতে পারিস নাই তাই না। তোর এত লোভ রে?”
অনুভবের কথা শুনে এবার প্রচন্ড রাগ লাগলো। নিজেরা দোষ করে আজ আমাকেই দোষী করছে। রাগ নিয়ে চেঁচিয়েই বললাম,,
“স্টপ দিস ননসেন্স। জাস্ট স্টপ। অনেক বলে ফেলেছেন মিস্টার আহান আবরার অনুভব। অনেক বেশি বলে ফেলেছেন। আর আমাকে লোভী বলার আগে যান নিজের পরিবার কে জিজ্ঞেস করেন কে লোভী? আপনার পরিবার তাদের স্বার্থের জন্য এই স্নিগ্ধা কে ব্যবহার করতেও ভুলে নি। যান জিজ্ঞেস করুন কে আমাকে বাধ্য করেছিলো বিয়ে করতে? আর রাহাতের বিয়ে ভাঙার কথা বলছেন? তো রাহাতকেই জিজ্ঞেস করুন কে বিয়ে ভাঙছে? আরে বাবাই আমার পর হয়েও আমাকে নিয়ে ভাবতো আর মামুনি? সে আমার আপন হয়েও বোঝা ভাবতো। যান আপনাার আম্মুকে জিজ্ঞেস করেন বিয়ে ভাঙার জন্য আপনার মা আর কাকি ওই বাড়ির সবাই কি কি করেছে আমার সাথে? যান গিয়ে জিজ্ঞেস করেন।”
অনুভব একবার রাহাতের দিকে তাকিয়ে দ্রুত পায়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমি উনার এহেন কাজে অনেক অবাক হয়েছি। এই মাত্র এত এত কথা শুনালো আর এখন কি না জড়িয়ে ধরছে! পাগল হয়ে গেছে নাকি? অনুভব আমাকে ছেড়ে আলতো হাতে গালে ধরে বললো,,
“থ্যাঙ্কুউ স্নিগ্ধু থ্যাঙ্কিউ সো মাচ। তোর থেকে সত্যি কথা শোনার জন্য এত কিছু। এতক্ষণ বাজে কথা বলার জন্য সরি আর আমি রাহাতের পুরো কথায় শুনেছি। ওর কথা শুনেই সত্যিটা জানার এটুকু চেষ্টা।”
“মানে?”
“বলছি! ৩ বছর আগে আমার কাছে একটা ফোন আসে যে তুই রাহাতকে ভালোবেসে বিয়ে করতে চাস। আমমি বিশ্বাস না করে বিডিতে ফিরতে চাইলে তখন বাড়ি থেকে আমার কাছে ফোন যায় আর ওরাও একই কথা বলে। কিন্তু এনগেজমেন্টের দিন তোদের বিয়ে আর এনগেজমেন্ট ২ টাই ভেঙে যায়। আমার কাছে তখন মনে হয়েছিলো তুই ঠকিয়েছিস আমাকে তোর শাস্তি তোকে দেবো। তাই আম্মুর সাথে রাগারাগি করে এটা মানায় যে তোকে আমি না আসা পর্যন্ত যেনো বিয়ে না দেয়। আম্মু প্রথমে না মানলেও পরে আমার জোড়াজুড়িতে মানতে বাধ্য হয়। পরের ৩ বছর তোর সাথে কোনো রকম যোগাযোগ করিনি। দেশে ফিরে তোকে দেখলেই রাগ লাগতো তাই তোকে সামনে পেলেই থাপ্পড় মারতাম। তোর ব্যবহার বড্ড অবাক লাগতো। তোকে দেখে বার বার কনফিউজড হয়ে যেতাম। তারপর আমিই তোর বাবাই আর মামুনিকে বলি তোকে বিয়ে করার কথা। আব্বু আগে থেকেই রাজি ছিলো কিন্তু আম্মু কেমন যেনো করতো কিন্তু শেষে মেনে নেয়। আর তুই গাধী ভেবেছিস তোর বাবাই মামুনি আমাকে জোড় করিয়ে বিয়ে করছে। কবে তোর মাথায় একটু বুদ্ধি হবে বল তো?”
অনুভবের কথা শুনে হা হয়ে গেছি। এত কিছু হয়ে গেছে আমার পিছে।
“তুই জানিস রাহাত ফাহিম ভাইয়ার চাচাতো ভাই হয় তাই তোকে ফাহিম ভাইয়ার সাথে দেখে সেদিন থাপ্পড় মেরেছিলাম। আর ওই দিন রেস্টুরেন্টে অন্য একটা ছেলের সাথে তোকে দেখে আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছিলো। তাই তোকে ওভাবে মেরেছি। তোকে শাস্তি দেওয়ার পর সবসময় নিজেকেও শাস্তি দিয়েছি। সেদিন তিশার ঝাড়িতে আমি পরিবর্তন হয়নি ওর কথা তে বুঝেছি অনেক কিছু। ও বলেছিলো তুই নাকি আমাকে ভালোবাসিস আমিই নাকি তোর ভালোইর যোগ্য না। সবাই আমাকে মিথ্যা বললেও তিশা যে বলবে না তাও খুব ভালো ভাবে জানি। তোর আর আমার মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করার জন্য অন্য কেউ আছে তা তো বুঝেছি। কিন্তু ৩ বছর আগের সত্যিটা জানা দরকার ছিলো আজ জানলাম। তোর সাথে করা সব অন্যায়ের জবাব ওরা পাবে।”
অনুভব আমার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে কিছু না বলেই চলে গেলো। আমি অনুভবের কথা শুনে থ মেরে গেছি। কে আছে এসবের মাঝে? কে ভুল বুঝিয়েছে অনুভবকে? রাহাতের দিকে এক পলক তাকিয়ে মাথা নিচু করে ফ্লোরেই বসে পড়লাম। তখনই তন্নি, তিশা আপু, মেঘলা, অনা, তামিম সবাই আমার কাছে আসে। রাহাত এখনো দুরে দাঁড়িয়ে আছে।

বর্তমানে……
তিশা আপু আমাকে এভাবে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলো,,
“স্নিগ্ধু কি হয়েছে এখানে? ভাইয়া এভাবে বেরিয়ে গেলো কেন? আর তুই ই বা সব ছেড়ে এখানে কি করছিস? আর রাহাত এখানে কি করে?”
আমি আপুর দিকে একবার তাকিয়ে রাহাতের দিকে তাকালাম। রাহাতও মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আপু আমাকে চুপ থাকতে দেখে রেগে গিয়ে বলে,,
“কি রে চুপ করে আছিস কেন? এখানে কি তুই মনোব্রত পালন করছিস? বল কি হয়ছে? ভাইয়া আবারও তোকে মেরেছে?”
আমি মাথা নাড়িয়ে বোঝালাম “না”। আপু রেগে আরো কিছু বলতে যাবে তখনি রাহাত বললো,,
” ওকে প্রশ্ন কইরেন না আমি বলছি সব…………..

রাহাতের মুখে সবটা শুনে সবাই হা হয়ে গেছে। কারো বুঝতে বাকি নেই অনুভব এতো রাতে কোথায় গেছে। আপু তো আমার পাশেই বসে পড়েছে। তন্নি, অনা, মেঘলা ওরাও সব টা শুনে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আপু কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,,
“এত দিন তো এই ভয়টাই পাচ্ছিলাম স্নিগ্ধু। কি হবে এখন? অনুভব ভাইয়া এত রাতে গিয়ে আবার কি করবে? বুঝতে পারছিস বিপদ বাড়বে কমবে না। কি করবো আমরা এখন?”
“জানি না। অনুভব আমাকে কিছু বলতে না দিয়েই চলে গেছে। কি করবো আপু?”
আমাদের কথার মাঝেই আমার ফোনটা বেজে উঠলো। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোন নিয়ে কানে ধরতেই ওপাশের বলা কথা গুলো শুনেই হাত থেকে ফোন পড়ে গেছে। পাথরের ন্যায় বসে আছি দেখে আপু বললো,,
“স্নিগ্ধু এই স্নিগ্ধু কে ফোন করেছে? কি হয়েছে? এমন করছিস কেন?বল!”
আমি আপুর দিকে তাকিয়ে আপুকে জাপটে ধরে কেঁদে উঠলাম। কাঁদতে কাঁদতে হিচকি উঠে গেছে। আপু বার বার জিজ্ঞেস করছে কি হয়েছে কিন্তু কিছু বলতে পারছি না। কোনো মতে বললাম,,
“আ..আপু হস..হসপিটাল!”
এটুকু বলেই দৌড়ে বেরিয়ে আসলাম ওই বাড়ি থেকে। পা গুলো যেনো অবশ হয়ে আসছে। দাঁড়াতে পারছি না, রাস্তাটাও যেনো আজ বড় হয়ে গেছে। পেছনে তিশা আপু, অনা, তামিম, তন্নি সবাই আসছে……..
#স্নিগ্ধ_অনুভব
#পার্ট:১৩
#পিচ্চি_লেখিকা

সময়ের স্রোতে মানুষও বদলে যায়। যেমন বদলে গেছে আমার প্রিয় মানুষগুলো। এক সময় তাদের চোখের মনি ছিলাম আর আজ..

লেহেঙ্গা ২ হাতে চেপে ধরে কোনো রকম দৌড়ে হসপিটালে ঢুকে রিসেপশন থেকে অনুভব কোথায় তা জেনে নিলাম। অনুভব icu তে আছে। দৌড়ে সেদিকটা যেতেই দেখি মামুনি বাবাই কাকা কাকি তুষার ভাইয়া তুবা মিরা সবাই দাঁড়িয়ে আছে। মামুনি কান্না করছে আর কাকি তাকে সামলাচ্ছে। আমার পেছন পেছন তিশা আপু, তন্নি, তামিম, অনা ওরাও এসেছে। মামুনি কাঁদতে দেখে বুকের ভিতর ধক করে উঠলো। লেহেঙ্গা ছেড়ে ধীর পায়ে মামুনির দিকে এগিয়ে গিয়ে উনার সামনেই বসে পড়লাম। কিন্তু মামুনি আমার দিকে না তাকিয়েই কেঁদে যাচ্ছে। কাকি আমাকে দেখেই মুখ ফিরিয়ে নিলো। বাবাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তিশা আপু এসে মামুনিকে ধরে শান্ত করতে লাগলো। তন্নি আর তামিম এসে এক পাশে দাঁড়ালো। আমি মামুনির সামনে থেকে উঠে icu এর দিকে এগোতে নিলেই মামুনির কড়া নির্দেশ শুনে থেমে গেলাম..
“এক পা ও এগোবি না। কেন এসেছিস তুই?”
মামুনির কথা শুনে কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম,,
“” মামুনি কি বলছো এসব? আমি অনুভবকে…
“চুপ একদম চুপ। জন্মের সময় নিজের মা কে তো খেয়েছিস,জন্মের পর বাবাকে আর এখন আমার ছেলেটার জিবন খাচ্ছিস!”
মামুনির কথা শুনে ছলছল চোখে তাকিয়ে আছি তার দিকে। এতদিন এগুলো কাকি বলতো আজ মামুনি বলছে। মামুনি এসব বলছে দেখে তিশা আপু বললো,,
“আম্মু কি বলছো এসব? ভাইয়ার শোকে কি পাগল হয়ে গেছো নাকি?”
“তুই চুপ কর তিশু। আর কত এই মেয়েটার পক্ষ নিবি হ্যাঁ। তোর ভাইয়ের আজ এই মেয়ের জন্য এমন অবস্থা।”
“কি বলছো আম্মু! কে বলেছে তোমাকে এসব? আর ভাইয়ার এক্সিডেন্ট হয়েছে এতে স্নিগ্ধুর কি দোষ?”
“তিশু তুই আজকেও পর পক্ষে কথা বলছিস? ও যদি আমার ছেলে টা কে অপমান নাা করতো তাহলে ও নেশাও করতো না আর এই ভাবে এক্সিডেন্টও হতো না। সব ওর জন্য হয়েছে!”
“আম্মু কে বলছে তোমাকে এসব?”
“যেই বলুক। সত্যি তো এটাই। আর ডক্টর নিজেও বলছে অনুভব ড্রিংক করে গাড়ি চালাচ্ছিলো!”
“তো ও অপমান করেছে তা কে বলছে?”
“তিশু বাড়াবাড়ি করবি না। আমার আর স্নিগ্ধুর মধ্যে তুই কেন ঢুকতেছিস?”
“আম্মু….
তিশা আপুকে থামিয়ে বললাম,,
” তিশা আপু চুপ করো প্লিজ,,মামুনি তোমার সত্যি মনে হয় অনুভবের এই অবস্থার জন্য আমি দায়ী?”
“হ্যাঁ মনে হয়। যদি সেদিন অনুভবের কথা শুনে তোর সাথে ওর বিয়ে দিতে রাজি না হতাম হয়তো আজ আমার এত কিছু দেখতে হতো না। তুই খবরদার আমার ছেলের কাছে যাবি না। তোর মুখ দেখতেও আমার ঘৃণা লগছে। তোর মুখ দেখাবি না কোনোদিন আমাদের। আমি চায় না আমার ছেলের ওপর তোর মতো অপয়ার আর কোনো ছায়া পড়ুক।”
মামুনির সব কথায় যতটা না অবাক হয়েছি তার থেকে বেশি শেষের কথাগুলোতে কষ্ট পেয়েছি। মনে হচ্ছিলো কেউ বুকে ছুড়ি দিয়ে আঘাত করে ক্ষত বিক্ষত করছে। মামুনির সাথে এখন কাকিও বলতে শুরু করেছে। তিশা আপু আর তুষার ভাইয়া দুজনের বিরুদ্ধে কথা বলছে। কিন্তু কোনো কথায় আমার কানে যাচ্ছে না। ঘুরে একবার অনুভবের দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে পিছিয়ে এলাম। আশে পাশে কি আছে কিছুই আমার মাথায় যাচ্ছে না। হ্যাং মেরে গেছে মাথা। এরাই কি তারা যারা আমাকে আগলে রেখেছিলো? এটাই আমার সেই মামুনি যে মামুনি আমাকে মায়ের ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছে? মামুনি এত গুলো কথা বলতে পারলো কি করে? আমি কি সত্যিই এতটা খারাপ? কেন তাদের এতো পরিবর্তন? ৩ বছর আগে তাদের স্বার্থ পূরণ করতে পারিনি বলে এত পরবর্তিন এদের? রাস্তার পাশে হেঁটে চলেছি আর ভাবছি ৩ বছর আগের কথা….

৩ বছর আগে….

সেদিন আমাদের কলেজে নবীন বরন অনুষ্ঠান ছিলো। সবাই শাড়ি পড়বে। আমি যদিও পড়তে পারি না তবুও মেঘলা তন্নি আর তামিমের জোড়াজুড়ি তে পড়তে বাধ্য হয়েছি্। বাবাই আর তুষার ভাইয়া ২ জনেই অফিসে চলে যাওয়ায় আমি আর তুবা রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু রিকশা আসার নাম গন্ধও নেই তাই বিরক্ত হয়ে আমরা হাঁটা লাগালাম। তুবা আর আমি বকবক করতে করতে যাচ্ছিলাম তখনই একটা রিকশা পাওয়ায় ২ জনেই চলে আসলাম। তাড়াহুড়ো করে কলেজে ঢুকতে গিয়েই ধপাস করে একজনের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায়। এমনিতেই লেইট তার ওপর গরম। মেজাজ টা আরো চটে গেলো। দাঁত কিড়মিড় করে ছেলেটা কে বললাম,,
“এত বড় খাম্বা হয়ছেন কি করতে? দেখে চলতে পারেন না? চোখ কি বাসায় রেখে আসেন নাকি যত্তসব।”
“এই যে মিস হ্যালো! আপনি কি চোখ প্রেমিকের বাসাই রেখে আসছিলেন?”
“হ্যাঁ প্রেমিকের বাসাই রেখে আসছি্।”
ছেলেটা আমার কথা শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললো,,
“প্রথমত ধাক্কা দিয়েছেন আবার কথাও শুনাচ্ছেন? সরি বললে কি মুখ ক্ষয় হয়ে যেতো?”
“হ্যাঁ যেতো। আপনি চোখে না দেখে হাটলে ধাক্কা দিবেন ই। নিজে দোষ করে আবার আমাকে দোষারোপ করেন সাহস কত বড় আপনার?”
অবস্থা খারাপ দেখে তুবা আমাকে শান্ত করতে করতে বললো,,
“আপু চুপ করো প্লিজ। ওই দেখো মেঘলা আপুরা তোমার জন্য ওয়েট করছে। তাড়াতাড়ি চলো।”
আমি আর কিছু না বলে মুখ বাকিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে অনুষ্ঠানের ওইদিকে চলে গেলাম। তারপর সারাদিন আড্ডা দিয়ে বিকালে বাড়ি চলে আসলাম। এর মাঝে কয়েকবার ছেলেটা কে দেখেছি তবে পাত্তা দেয়নি।

পরেরদিন তুবা কলেজ যায়নি। আমি একা কলেজ গেছি্। কলেজের সামনে যেতেই ওই ছেলেটা দৌড়ে এসে বললো,,
“ওই মিস থামো।”
আমি আশে পাশে তাকিয়ে ছেলেটার দিকে তাকলাম। ছেলেটা দৌড়ে এসে বললো,,
“উফফ কখন থেকে ডাকছি তুমি দেখি শুনোই না। যায় হোক যে জন্য আসা। আই লাভ ইউ”
ছেলেটার কথা শুনে হা করে তাকিয়ে আছি তার দিকে। কালকে প্রথম দেখা তার ওপর ঝগড়া দিয়ে শুরু। আর এখন বলছে আই লাভ ইউ। হচ্ছে টা কি? আমি রাগ নিয়ে বললাম,,
“এক দিনে আপনার প্রেম জেগে উঠেছে? এটা কি সিনেমা পাইছেন?”
“আরে সিনেমা কেন পাবো? কাল তো ভুলবশত ঝগড়া করে ফেলেছি নো প্রবলেম। আমি প্রোপোজ করছি তুমি রিপ্লাই দাও!”
“হুরু মিয়া ফাইজলামি পাইছেন?”
“ফাইজলামি কেন পাবো? আমি তো আমার মনের কথাই বলেছি!”
“আপনার মনের কথা পকেটে রাখেন যত্তসব।”
এটুকু বলেই চলে আসতে নিলাম। তখনই পিছন থেকে ছেলেটা ডেকে বললো,,
“এই যে মিস পরি এই রাহাত রায়ানের জন্য সব মেয়ে পাগল আর তুমি কি না রিজেক্ট করছো!”
“প্রথমত আমার নাম পরি না আর দ্বিতীয়ত পাগলের জন্য পাগলারাই পাগল হয়। বাট আমি সুস্থ মষ্তিকের মানুষ তাই আমার পাগল হওয়ার কোনো ইচ্ছা নাই।”
এটুকু বলেই সেখান থেকে চলে আসলাম। আমার মন জুড়ে একজনই আছে আর সে হলো অনুভব। সে ব্যাতীত কারো জায়গা নেই আমাার লাইফে।

এভাবেই কেটে যায় কয়েকদিন। সামনেই আমার ফাইনাল এক্সাম। কিন্তু রাহাত খুব বিরক্ত করে। প্রতিদিন কলেজ যাওয়ার পথ দাঁড়িয়ে থাকে। কখনো ফুল দেয়। কখনো চকলেট। একদম অতিষ্ঠ করে তুলেছিলো আমাকে। প্রতিদিনের মতোই আজও কলেজ যাচ্ছিলাম কিন্তু অদ্ভুদ বিষয় হচ্ছে আজকে রাহাত নেই। আমি তো খুশি মনে লাফাতে লাফাতে কলেজে ঢুকলাম। সবাই মিলে অনেক ইনজয় করে বাড়ি চলে আসলাম। বাড়িতে ঢুকতেই আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। সামনেই রাহাত আর তার পাশে কয়েকজন লোক বসে আছে। দেখে মনে হচ্ছে এটা ওর ফ্যামিলি। কিন্তু ওরা এখানে কেন? এটাই বুঝতে পারছি না। আমাকে দেখে মামুনি এগিয়ে এসে বললো,,
“স্নিগ্ধু মা যা তো তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে আয়। রুমে তোর জন্য শাড়ী রাখা আছে। তুই যা আমি আসছি।”
আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই মামুনি চলে গেলো। আমি অগত্যা ফ্রেশ হয়ে এসে দেখি মামুনি আমার রুমে। মামুনি আমাকে শাড়ি পড়াতে লাগলো।
“মামুনি!”
“হুম বল!”
“উনারা কারা? আর এবাড়িতে কেন? আর আমাকেই বা সাজাচ্ছো কেন?”
মামুনি মৃদু হেঁসে বললো,,
“ওরা হলো শহরের বড় বিজনেসম্যান আশরাফ রায়ানের পরিবার। আর ওরা তোকে দেখতে এসেছে। আশরাফ রায়ানের ছেলে রাহাত রায়ান তোকে পছন্দ করে তাই বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে!”
মামুনির কথা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়লাম। আমাকে না জানিয়েই এত কিছু। আর রাহাত আমাকে একবারো জিজ্ঞেস করলো না আমি ওকে বিয়ে করতে চাই কি না?
“মামুনি আমি বিয়েটা করতে পারবো না প্লিজ।”
মামুনি আমার দিকে ভ্রুকুচকে তাকিয়ে বললো,,,
“কেন? এত বড়লোক ওরা তাও কেন বিয়ে করতে পারবি না? আর দেখ স্নিগ্ধু তুই যদি কাউকে পছন্দ করিস তো সেইটা ভুলে যা। তোকে আমি বড় করেছি। আজকে আমার স্বামীর বিজনেসের ব্যাপার এটা। তাই আমার এতদিনের এতকিছুর বিনিময়ে তো বিয়ে করতেই পারিস।”
মামুনির মুখের ওপর আর কিছু বলার সাহস পায়নি। চুপচাপ গিয়ে ওদের সামনে বসে পড়লাম। উনাদের আমাকে পছন্দ হয়েছে। সাথে এনগেজমেন্টের ডেইট ও ফাইনাল হয়ে গেছে। মামুনিকে কিছু বলে লাভ নেই তাই সরাসরি রাহাতের সাথেই কথা বলার সিদ্ধান্ত নেয়।

এনগেজমেন্টের ডেইট ২ দিন পর করা হয়েছিলো। এই ২ দিন রাহাতের সাথে কথা বলতে পারিনি। আজ আমাদের এনগেজমেন্ট। সকাল সকাল যে করেই হোক রাহাতকে আসতে বলেছি। রাহাতও খুশি মনে এসে পড়েছে। বুঝতে পারছিলাম না কি করা উচিত! রাহাত যদি বিয়েটা না ভাঙে কি হবে তখন? এসব কিছু ভাবতে ভাবতেই রাহাত হাজির। রাহাত আসতেই আমতা আমতা করে বললাৃ,,
“আমি আপনাকে কিছু বলতে চায়?”
“হুম বলো।”
“আসলে আমি এই বিয়েটা করতে পারবো না প্লিজ বিয়েটা ভেঙে দিন।”
আমার এমন কথা হয়তো রাহাত আশা করেনি। তাই তার মুখের ধরনও বদলে গেছে। মলিন মুখ নিয়ে বললো,,
“কেন?”
“আসলে আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি। তাকে ছাড়া কাউকে মানিয়ে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। আমার কোনো কথায় মামুনি শুনতে নারাজ। প্লিজ বিয়েটা ভেঙে দিন।”
“কাকে ভালোবাসো?”
আমি মাথা নিচু করে বললাম,,
“অনুভবকে।”
রাহাত আমার কথা শুনে মৃদু হেসে বললো,,
“ওকে এতো ভালোবাসো যে অন্য কাউকে মানতে পারছো না?”
“হুম।”
রাহাত কি ভেবে যেনো বললো,,
“ঠিক আছে।”
এটুকু বলেই রাহাত বড় বড় পা ফেলে চলে যায়। পরে জানতে পারি আমাদের বিয়েটা ভেঙে গেছে্। এক দিকে সস্তির নিঃশ্বাস নিলেও অন্য দিকে শুরু হয় খোটা দেওয়া। বাড়ির কেউ আর ঠিক মতো কথা বলতো না। বাবাই যতটা সম্ভব স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলতো। রাহাত ওইসবের পর বিডি ছেড়ে চলে যায়। যাওয়ার আগে আমাকে বলেছিলো,,”তুমি তোমার ভালোবাসা নিয়ে ভালো থাকো স্নিগ্ধু,,চিন্তা করো না কখনো আসবো না তোমাদের মাঝে।”
সেইফ এটুকু বলেই চলে গেছিলো। ধীরে ধীরে সব ঠিক হতে লাগলো তবে কারোরই খোটা দেওয়া গেলো না।

অতীতের কথা ভাবছি আর রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছি। অনবরত চোখ বেয়ে পাানি পড়ছে। কি হতে আমার আব্বু আম্মু বেঁচে থাকলে? পৃথিবীতে এতো মানুষ আছে তারা ২ জন কি খুব বেশী হয়ে যেতো? কি হতো আমার জিবনে একটু সুখ আসলে? সুখ কি কমে যেতো এই পৃথিবীতে? আমার ভাগ্য সব সময় কেন আমার সাথে এত নিষ্ঠুর খেলা খেলে?
কাঁদতে কাঁদতে এক পা ২ পা করে এগোচ্ছি। হঠাৎ কেউ পাশে থেকে ধাক্কা মারায় সোজা একটা গাড়ির সামনে গিয়ে পড়ি। সামনে গাড়ি দেখে চিৎকার করে উঠতেই মনে হলো সব থেমে গেছে। রক্তাক্ত মুখ শরীর নিয়ে লুটিয়ে পড়লাম রাস্তার মাঝে। রাত হওয়ায় তেমন কেউ নেই। তবুও যারা ছিলে তারা দৌড়ে আমার দিকেই আসছে। যতক্ষণ সেন্স ছিলো শুধু চার পাশে রক্তই দেখলাম। বার বার মাথায় একটা কথায় আসছিলো! এখানেই কি শেষ অনুভবের সাথে পথ চলা? স্নিগ্ধ অনুভবের কি হবে না আর দেখা? অনুভবকে কি আর কখনোই দেখা হবে না আমার?মাথায় অনেকটা আঘাত পাওয়ায় বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলাম না। চোখ দুটো আস্তে আস্তে বন্ধ করে নিলাম……..

চলবে..
(

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here