পূর্ণতা পর্ব ৩৬+৩৭

0
66

#পূর্ণতা❤️
#Writer_তানজিলা_তাবাচ্ছুম❤️

৩৬ & ৩৭

‘ তোমার কাছে বলার এবং চাওয়ার মত আমার কাছে নেই। বরং আমি তোমার কাছে নিজেকে দিয়ে দিলাম। আমি নিজেকে অনেক ভাগ্যবতী মনে করি। মা না থাকার সত্ত্বেও তার চেয়ে বড় কিছু পেয়েছি। ছুঁতে পারিনি আকাশের চাঁদ কিন্তু তবুও আমার চাঁদকে ছুঁয়েছি, দেখেছি! ভালোবাসা পেয়েছি। কিন্তু আজ আর সেই সুযোগ নেই। যাই হোক এখন রয়ে গেলো তারা! আকাশের তারা তো অনেক দূরে তাকে তো ছুঁয়াও সাধ্য নেই তবে সামনের তারার কাছে আছে। হয়তো আমি তোমাকে বোঝাতে পারি নি, বাট আই লাইক ইউ সো মাচ! আই লাইক ইউর বিং অ্যাংরি উইথ মি। আই লাইক ইউর___

থেমে জোরে হেসে বললো,

‘ আই লাইক ইউর ঠোঁট উল্টে কাঁদার স্টাইল। এক্সক্লুদিং দেস ওয়ার্ডস,লেটস কাম টু দ্যা মেইন ওয়ার্ডস! আই লাভ ইউ তারা। উইল ইউ একসেপ্ট মি?’

বলে হাত বাড়িয়ে দিল আলোক। তারা তড়িৎ বেগে তার কাছে যেতেই আলোক তারাকে নিজের উষ্ণ আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে নিয়ে ফিসফিসে কানে বলে উঠে,

‘ তারা পাখি!

প্রত্ততরে তারা বলে,

‘ জ্বি আলোক বাবু?’

তারার কথায় আলোক মৃদু হাসে। তারা মৌনতা অবলম্বন করে মনে করতে লাগে কিছুক্ষন আগের কথা…

__________________

বিছানায় গুটি মেরে বসে আছে তারা। কয়েক মিনিট আগে আলোক বাহিরে গেছে তাকে রেডি হতে বলে। কিন্তু তারা তা না হ য়ে চিন্তা ও কান্নায় মগ্ন। সে কখনোই এক্সপেক্ট করে নি আলোক এমন কিছু বলবে। তারার খুব কান্না পাচ্ছে। মিনিট পাঁচেক পর আলোক এলো। তারাকে এখনো এভাবেই দেখে প্রশ্ন ছুড়লো,

‘ তুমি এখনো এভাবেই বসে আছো?’

হঠাৎ আলোকের কথায় তারা চমকালো। আলোকের দিকে বিষাদ দৃষ্টিপাত দিলো। আলোকের কথা শুনে দাঁড়ালো। আলোক হেঁটে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল গুলোকে হাতের আঙ্গুল দ্বারা আঁচড়াতে লাগল তারপর বলল,

‘ কাম অন তারা। তুমি এত স্লোলি চলতে থাকলে অনেক লেট হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি করো। ফাস্ট!’

তারা আলোকের দিকে ছলছলে নয়নে তাকালো। আলোক তার দিকে ঘুরলো। তারা কেমন ঠোঁট উল্টো করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের কার্নিশে পানি জমে আছে তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। তারা ক্ষুব্ধ হয়ে আলোকের সামনে এসে ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল,

‘ আমি তো আপনাকে ভালো ভেবেছিলাম কিন্তু আপনি এত খারাপ কেনো?’

আলোক ঠিক বুঝতে পারলো না তারার কথা। তারার কথা শুনে বিস্মিত হয়ে গেল। আলোক বিস্ময় কন্ঠে বলল ,

‘ মানে?’

তারা দু’কদম এগিয়ে তার দু’হাত দিয়ে আলোকের বুকে হাত রেখে তাকে ধাক্কা দিলো। আলোক কিছুটা পিছিয়ে আয়নার টেবিলের সাথে লাগল। তার আবার একই করার জন্য এগোতেই আলোক তার দু’হাত ধরে বলে,

‘ আরে হয়েছে টা কি?

তারা ঠোঁট উল্টো করে বলল,

‘ আমি ভাবতে পারিনি আপনি এতটা খারাপ হবেন। না আমি যাবো না।’

বলে টেবিলের উপর জিনিস গুলো ছোড়াছুড়ি করতে শুরু করে তারা। আলোক থামানোর জন্য ধরতেই সে ক্ষীণ কন্ঠে বলে,

‘ ছাড়ুন। আমি যাবো না কোথাও। আমি এমনি মন খারাপে আপনাকে কাল রাত ওইসব বললাম আর আপনি আজ নাচতে নাচতে এসে গেলেন যাওয়ার জন্য? আসলেই আপনি অনেক খারাপ।’

তারার কথায় আলোক চুপসে গেল। তার সামনে পুরো ব্যাপারটা এখন খোলা বইয়ের মতন। সে বুঝতে পারছে তারার এইরকম বিহেভিয়ারের কারণ। কেনো তারা এইরকম রিয়েক্ট করছে। আলোকের তো এইসব মাথায়-ই আসেনি। আলোক তারাকে ছেড়ে হাসতে লাগলো। তারা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সে কিনা কাদঁছে আর আলোক হাসছে? আলোক নিজেকে ধাতস্থ করে বলে,

‘ ওহ। নাও আই আন্ডাস্ট্যান্ড হোয়াট ইউ আর টকিং অ্যাবাউট!’

তারা আহাম্মকের মত তাকিয়ে আছে।

‘ তুমি ভেবেছো আমরা la… না থাক। আমরা ওখানে যাচ্ছি না।’

তারা নিরাশয় কন্ঠে বলল,

‘ ওখানে যাচছ্_যাচ্ছি না! তা_তাহ_তাহলে এত সকালে কোথায় যাবেন?’

আলোক পকেটে হাত গুঁজে দু’কদম এগিয়ে এসে বলল,

‘ নিবরের বাসায় যাচ্ছি। ইরা ইনভাইট করেছে আর বলেছে সকাল সকাল আসতে। তাই তাই ভাবলাম তুমি গিয়ে সারপ্রাইজড হবে! কিন্তু আর হলো না।’

তারা হতবুদ্ধির মত দাড়িয়ে গেল। তার এই মুহূর্তে আলোকের দিকে তাকাতেও লজ্জা লাগছে। নিজের কাছেই ই লজ্জা লাগছে। কিছুক্ষন পর আলোক কে ধরলো। আলোক মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

‘ তারামনি?’

‘ তাড়াতাড়ি করো আমাদের লেট হয়ে যাবে।’

বলে আলোক বের হলো। কারণ সে জানে তারার লজ্জা লাগছে তাই তাকে আর লজ্জায় ফেলতে চায়না। আলোক বের হতেই তারার কেমন লাগছে আয়নার দিকে তাকাতেই। হাত দিয়ে মুখ ডেকে আছে তারা। পরিশেষে হাত কে নামিয়ে আয়নায় তাকিয়ে নিজের প্রতিচ্ছবি কে বললো,

‘ অত লজ্জার কি আছে? এ এদিক দিয়ে আমার ওনার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ পেলো! হি আন্ডাস্টুড হাউ মাচ আই লাভড হিম অ্যান্ড অলসো আই রিলাইজড।’

খানিকক্ষণ পর তারা আয়নায় নিজেকে ছুঁয়ে ‘তারালোক’ উচ্চারণ করলো। তারপর কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে কি ভেবে আপনাআপনি হাসলো।

আলোকের কিছুতেই গাড়ি চালানোর দিকে মনোযোগ দিতে পারছে না। কারণ শুরুর থেকেই তার দিকে এক নজরে স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তারা। মাঝে মাঝে মুচকি হাসছেও। তারা নিকাব পড়ার কারণে বাহ্যিক দিক দিয়ে বোঝা না গেলেও আলোক তা উপলব্ধি করতে পারছে। আলোক স্লোলি চালাচ্ছে। এক সময় আলোক আর না পেরে বিচলিত কন্ঠে বলল,

‘ হেই লুচু তারা। এমন করে তাকিয়ে আছো কেনো?’

তারা প্রতিউত্তরে একটু কড়া কন্ঠে বলল,

‘ আমি লুচু! তুমি কচুর! আহা হাউ সুন্দর।’

‘ ওভাবে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছো কেন? আমার আনকাম্ফর্টেবল লাগছে!’

তারা হেসে হেসে বলে উঠে,

‘ছেলেরা কি লজ্জা পায়! তা তোমাকে না দেখলে জানতাম-ই না! হাউ কিউট মাই জামাই!’

তারপর আলোক কিছু বলবে তার আগেই সে আবারো বলে উঠে,

‘ আচ্ছা? দিন দিন মানুষের বয়স বাড়লে সে বুড়ো হয়ে যায়। কিন্তু তুমি দিন দিন ইয়াং, হ্যান্ডসাম হচ্ছো! ব্যাপার কি? রূপের রহস্য কি তোমার গো স্বামী?’

আলোক তারার কথা শুনে হেসে ফেলল কিন্তু কিছু বললো না। তারা আলোক কে পা থেকে মাথা পর্যন্ত স্ক্যান করে দেখছে। তারপর কিছুক্ষণ পর আবারো বলে উঠে,

‘ আলোক বাবু?‌ রহস্য কি?’

আলোক বড়বড় চোখ করে তারার দিকে তাকিয়ে চট করে বলল,

‘ লুচু তারা।’

তারাও নিজের দৃষ্টি আলোকের থেকে সরালো না! আলোক ওভাবেই চলতে থাকলো।

কয়েকঘন্টা পর আলোক তারা পৌঁছে গেলো। আলোক তারাকে ভিতরে যেতে বলল। গাড়ি রেখে আসছে। তারা ইতস্তত বোধ করে হাঁটতে লাগলো। বাড়ির টার দরজার সামনে দাড়ালো। একা যাবে না। দেখতে দেখতে আলোক আসলো। আলোক তারাকে দাড়িয়ে রেখে ভিতরে ঢুকল কিন্তু অনেকক্ষণ হয়ে গেলো সে বের হলো না। তারার বিচলিত হয়ে ভিতরে ঢুকলো। দরজা খুলতেই দেখলো পুরো অন্ধকার। মনে হয় যেন এক ভুতুড়ে বাড়িতে ঢুকেছে। তারা একটা ঢোক গিয়ে আলোক যে ডাকল। কোনো সাড়া পাওয়া গেল না । তারপর কয়েকবার ডাকলো। হঠাৎ তার মুখের সামনে একটা আলো আসতেই সে চোখ বন্ধ করলো তারপর কিছুক্ষণ আস্তে আস্তে চোখ খুলতেই আলোক কে সামনে পেল। চারিপাশে বেলুন। সুন্দর করে সাজানো রুম। তারপর আলোক আবেগী কন্ঠে বলতে শুরু করে…’

_____________________

বিছানায় হাত পা ছেড়ে শুয়ে আছে তারা। ওখান থেকে তারপর নিরব ইরাদের এখানে এসেছে। এখনো এখানেই আছে। কিছুক্ষন পর চলে যাবে। এখন প্রায় রাত। আজ সারাদিন এখানেই ছিল। নীরবের সাথে আর তেমন কথা বা দেখা হয়নি তারার। শুধু আসার সময় নিরবের সাথে একবার দেখা হয়েছিল। তারপর থেকে তারা ইরার সাথে। আলোকের সাথে খেয়েছে। আলোক নীরবের সাথে কথা বলছে আর তারা ইরার। এভাবেই কেটে গেলো পুরো দিন! আলোক বাহির থেকে আসলেই চলে যাবে।

আলোক নিরব হাঁটছে একসাথে। আগে অনেক কথা বলেছে কিন্তু অনেক্ষন ধরে নিরব একটা কথা নিজের মধ্যে পুষে রেখেছে। সে আলোক কে শান্ত গলায় বলল,

‘ তোর আর তারার মধ্যে সব ঠিক হয়েছে আলোক?’

আলোক হাসি মুখে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি প্রদান করল।

‘ তারা আর আলাদা হতে চায় না?’

আলোক ছোট মুখে উওর দিলো ‘ না’। নিরব একটু ক্ষীন কন্ঠে বলল,

‘ কেনো? আগে তো খুব চাইত,বলতো!’

আলোক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

‘ তারা বাচ্চা মেয়ে নিরব। বয়সের সাথে ও বেড়ে উঠলেও ওর জ্ঞান, বুদ্ধি,ব্রেইন বাচ্চাদের মতন। ওর বিহেভিয়ার ১৩ ১৪ বয়সের মেয়ের মতন। এই বয়সের বাচ্চারা যা দেখে তাই সত্যি ভাবে তেমনি তারাও! সে এতটুকু বুঝতে পারে না যে, যা সবসময় সামনে দেখা যায় তাই সত্য হয় না। তারাকে যদি জিজ্ঞেস করি, কি করো? তাহলে জানিস ও উত্তরে কি বলবে? বলবে ‘ তোমার সাথে কথা বলি।’ যেমনটা ছোটরা উওরে বলে। তারা সামান্য কেটে গেলে সেই ব্যাথা সহ্য করতে পারে না, ছোটদের মত ঠোঁট উল্টে কাঁদে।’

এক নাগাড়ে কথা গুলো বলে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলল আলোক। তারপর উৎকন্ঠায় বলল,

‘ কিন্তু তারা মন থেকে অনেক নরম, আর ওর ভিতরটা অনেক কোমলীয়। ও এখনো ইমম্যাচুরেট! তাই ওর কথায় আমি কিছু মনে করি না।’

নিরব আর বলার মত কিছু খুঁজে পেল না। ওরা যখন নিজেদের মধ্যে ভালো, সুখে আছে সেখানে সে আর কি বলবে?

বাহির থেকে আলোকের কণ্ঠের আওয়াজ শুনে তারার মুখে হাসি ফুটলো। সে রেডি হয়ে বের হলো, দেখে আলোক সোফায় বসে ফোন দেখছে। তারা গিয়ে তার পাশে বসে বলল,

‘ যাবা না?’

আলোক তারার দিকে দৃষ্টিপাত দিয়ে বলল,

‘ হ্যাঁ! একটু ওয়েট করো নিরব ভিতরে থেকে আসুক।’

তারা ছোট করে ‘আচ্ছা’ বলল। আলোকের আবারো ফোনের দিকে নজর দেয় আর তারা আলোকের দিকে। তারা হটাৎ এই নিরবতা কেটে বলে উঠে,

‘ আলোক?’

আলোক তারার দিকে তাকিয়ে নম্র কন্ঠে ‘হুম’ বলল। তারা আটকা কন্ঠে বলে,

‘ আম_ আমরা যাওয়ার সময় গাড়িতে যাবো না প্লিজ।’

তারার কথা শুনে আলোক হতবিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে চাপা কন্ঠে বলল,

‘ তাহলে কিসে যাবা?’

তারা উত্তেজনা নিয়ে বলল,

‘ কেনো যাওয়ার জন্য অনেক কিছুই তো পাওয়া যাবে। প্লিজ গাড়িতে যাবো না।’

তারার আকুতিতে আলোক ফোন রেখে নরম কন্ঠে বলল,

‘ এখন রাত তারা। আর অনেক দূরের পথ। আর গাড়ি রেখে গেলে পরে আনবো কিভাবে?’

তারা অনেক আকুতি মিনতি করে বলতে লাগল,

‘ প্লিজ আলোক প্লিজ।’

বলে আলোকের হাত ধরলো।

‘ নিরব ভাইয়াকে কাল পরশু নিয়ে আসতে বল। আর প্লীজ চলো না। ফাস্ট টাইম তোমার কাছে কিছু আবদার করলাম। প্লিজ!’

তারার এত আকুতি মিনতি তে আলোক আর না বলতে পারলো না। জানে যাওয়াটা একটু রিস্ক হবে তবুও আল্লাহর উপর ভরসা করে আর তারার মন রাখতে সে ‘হ্যাঁ’ বললো। আলোকের হ্যা বলায় তারা খুশি হয়ে আলোকের দাড়ি টেনে বলল,

‘ থ্যাঙ্ক ইউ মাই হ্যান্ডসাম জামাই।’

আলোকের একটু লাগায় সে ‘আউচ’ উচ্চারণ করলো। তারা বিচলিত হয়ে বলল,

‘ লেগেছে। সরি। আমি বুঝতে পারি নি।’

তারার এমন অবস্থায় আলোক বলে,

‘ না জাস্ট একটু।’

তারা ভ্রু উঁচু করে বলল,

‘ আমারা খুব ভালো লাগে।[‌ দাড়িতে হাত বুলিয়ে]‌সাথে টানতে অনেক মজা লাগে।’

বলে আবার টানলো। আলোক তারার হাত ধরলো। তারা ছাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

অনেকক্ষন ধরে দুটো চোখ তাদের দেখছে এই খুনসুটি ভালোবাসা দেখছে। হঠাৎ কাঁধে কারো স্পর্শ পেয়ে তাকালো।

‘ তারা আলোক ভাইয়াকে দেখছো?’

নিরব মৃদু কন্ঠে ‘ হুম ‘ বলল। তারার পিছনে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে দেখছে। আলোকের হাসিরজ্জ মুখটা দেখে তার মনে প্রচন্ড শান্তি লাগছে।

‘ আলোক আবার মত হাসতে শিখেছে। আজ কতদিন পর ওকে এভাবে হাসি খুশি দেখছি।’

ইরা তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,

‘ দেখো খুব শ্রীঘ্রই আলোক ভাইয়া আগের মতন হয়ে যাবে।’

‘ ইন শা আল্লাহ।’

ইরা কষ্টের শ্বাস ফেলে ধীর কন্ঠে বলে,

‘ জানো আজো চাঁদ মরে যাওয়ার সেই দৃশ্য গুলো চোখে ভাসে! আলোক ভাইয়ার সেই কষ্টের, আর্তনাদের দিন গুলো।’

নিরব ইরাকে নিজের আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে বলল,

‘ থাক অতীতের কথা আর বলো না। এখন ওরা হ্যাপি আছে এটাই অনেক।’

ইরা তপ্ত শ্বাস ফেলল আর কিছু বলল না। তারপর আলোক তারা বিদায় নিল। তারার মন রাখতে ওরা দুজন সিএনজি তে করে আসে। কিন্তু তারা বাড়ির কিছুটা কাছে আসার পর থামাতে বলে। তারপর নিজে নামে সাথে আলোককেও নামতে বলে।

‘ তারা এখান থেকে বাসায় যেতে কমপক্ষে ১৪-১৫ মিনিট লাগবে। ‌ তুমি এখানে নামতে বললে কেন?’

তারা আলোকের এক হাত ধরে বলল ,

‘ এখান থেকে তুমি আমি হেঁটে যাবো একসাথে। আমার খুব ইচ্ছে।’

‘ আচ্ছা চলো।’

আলোক তারা হাঁটতে শুরু করলো। তারা আলোকের ডান হাত ধরে আছে সাথে মাথাটা কিছুটা হেলান দিয়ে হাঁটছে । ২-৩ মিনিট যাওয়ার পর তারা আলোকের হাত ছেড়ে ধীর গতিতে হাঁটতে শুরু করলো। আলোকের কিছুটা পিছনে চলে গেল। হঠাৎ তারার আওয়াজে আলোক পিছনে তাকিয়ে দেখে তারা রাস্তায় বসে আছে। চারিদিকে নির্জন। ল্যামপোস্টের আলোয় কিছুটা আলোকিত। তারা এভাবে থাকতে দেখে আলোক বলল,

‘ এভাবে রাস্তায় বসেছো কেনো?’

তারা আমতা আমতা করে বলল,

‘ পড়্_পড়ে গেছি।’

আলোক সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

‘ কিন্তু এখানে তো কোনো গর্ত বা পড়ে যাওয়ার মতন কিছুই নেই। তুমি পড়লে কিভাবে?’

তারা ইতস্তত করে বলল,

‘ আর_আরে প্_পা পা মোড়কে পড়ে গেছি আরকি।’

‘ ওহ আচ্ছা। উঠো।’

বলে হাত বাড়িয়ে দিতেই তারা জোড় কন্ঠে আর্তনাদ করে উঠলো,

‘ আহ। খুব ব্যাথা লেগেছে। হাঁটতে পারবো না।’

আলোক হাঁটু ভেঙ্গে নিচু হয়ে বলল,

‘ কোথায় লেগেছে দেখি!’

‘ আরে না না সরো।’

আলোক লক্ষ্য করলো তারার চোখে বিন্দু পরিমাণ পানি নেই। স্বাভাবিক ভাবে তারার ব্যাথা লাগলে সে তো কেঁদে ভাসিয়ে দেয় কিন্তু আজ তার চোখে বিন্দু পরিমাণ পানি নেই! ব্যাপার টা কেমন অদ্ভুত লাগলো আলোকের। তবুও এইসব বাদ দিয়ে তারাকে বলল,

‘ তারা উঠার চেষ্টা করো। এভাবে না পারলে বাসায় যাবা কিভাবে তুমি?’

তারা অসহায় হয়ে বলল,

‘ উঠতে পারবো না। আমাকে তাড়াতাড়ি বাসায় নিয়ে চলো।’

‘ উঠতে পারবে না তাহলে বাসায় কিভাবে যাবা?’

তারা চট করে বলল,

‘ কেন আমার বডিবিল্ডার হাসব্যান্ড আছে না?‌আমাকে কোলে করে নেওয়ার জন্য।’

আলোকের এখন মনে হচ্ছে তারা অভিনয় করছে। আসলে সে নিজের পায়ে হেঁটে যেতে যায় না। আলোকের কোলে চড়ে যেতে চায়। যদি বাসায় বলতো তাহলে আলোক তা করতো কিন্তু রাস্তায়!

‘ তারা এটা রাস্তা। মানুষ দেখলে কি বলবে। আর বাসায় এসে গেছি তুমি কষ্ট করে চলো।’

আলোক কাঁদো কাঁদো ভাব নিয়ে বলল,

‘ অনেক রাত হয়ে গেছে। যেখানে সাতটার মধ্যে সব কিছু নিস্তব্ধ হয়ে যায় সেখানে এত রাতে কে থাকবে?’

আলোক তারা বলে,

‘ বাসায় গিয়ে নিবো। এখন উঠো প্লিজ’

তারা এবার কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে,

‘ তুমি সবসময় আমাকে কষ্ট দাও। আমার কোনো ইচ্ছের তোমার কাছে দাম নেই। এত রাতে কেউ দেখবে না। আর দেখো রাস্তা পুরো ফাঁকা।'[ সামনে ইশারা কর]

বলে তারা মুখ ফিরিয়ে নিল। আলোক বুঝতে পারলো তার উপর অভিমান করেছে। পরিশেষে আলোক নিরুপায় হয়ে তারাকে কোলে নিতেই তারা খুশি‌ হলো।

‘ তারা তুমি দিন দিন দুষ্টু হয়ে যাচ্ছো।

প্রত্ততরে তারা হাসলো। তারা বুঝতে পারলো আলোক তার অভিনয় ধরে ফেলেছে। কিন্তু সে কি করতো তার খুব ইচ্ছে এভাবে নিরবতার রাতে আলোকের সাথে হাঁটবে,টাইম স্পেন্ড‌ করবে সাথে আলোকের কোলে চড়বে। আলোক হাঁটতে হাঁটতে বলে উঠলো,

‘ এ পথ তোমার আমার কভু না শেষ হতো…
বিরহে কাতরে তোমায় রেখে __

আলোক কে থামিয়ে তারা বলল,

‘ এটা না। তোমার ওটা গাও না ‘ঘুমাও তুমি ঘুমাও গো জান’! আমার জন্য তো একবার ও গাও নি।‌আজ এখন প্লিজ। শুধু আমি শুনলেই হবে।’

আলোক ‌হাসলো। তারা আলোকের বুকে মাথা রাখার চেষ্টা করলো। আর কিছুক্ষণ পরই আলোক গেয়ে উঠলো,

ঘুমাও তুমি ঘুমাও গো জান,
ঘুমাও আমার কোলে…..
ভালবাসার নাও ভাসাবো,
ভালবাসি বলে…

তোমার চুলে হাত বুলাবো,
পূর্ণ চাঁদের তলে …..
কৃষ্ণচূড়া মুখে তোমার,
জোসনা পড়ুক কোলে…..
আজকে জড়ায় ধরবে,
তোমার মনকে আমার মন….
গাইবে পাখি, গাইবে জোনাক ;
গাছ গাছালি বন….

এত ভালবাসা গো জান,
রাখিও আঁচলে….

[

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here