একটুখানি সুখ পর্ব ৩৭+৩৮

0
48

#একটুখানি_সুখ
#আনিশা_সাবিহা
পর্ব ৩৭

সবে মোমবাতি নিয়ে নিজের রুমের দিকে ফিরছে স্বচ্ছ। সামনে করিডোর ধরে হাঁটতেই ফোনের রিংটোনের শব্দ তার হাঁটাতে বাগড়া দিল। হাঁটার গতি কমিয়ে ফোনটা বের করে কোনোরকমে স্ক্রিন দেখে নিল সে। স্ক্রিনে স্পর্শ নাম ‘পুলিশ অফিসার’ লিখাটি জ্বলজ্বল করছে। এতোদিন পর এই নম্বর থেকে ফোন পেয়ে কিছুটা হতবাক হয়ে গেল স্বচ্ছ। হাঁটা থামিয়ে বেশ করিডোরের রেলিং এ ভর করে কলটা রিসিভ করে স্বচ্ছ। ওপাশ থেকে গমগমে আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়।
“হ্যালো, মি. আহিয়ান স্বচ্ছ বলছেন?”

“ইয়েস অফিসার। এতোদিন পর হঠাৎ? কোনো দরকার?”

“দরকার ছাড়া তো পুলিশ কাউকে ডিস্টার্ব করে না মি. আহিয়ান! সরি ফর ডিস্টার্ব। বাট অনেকদিন পর কিছু ইনফরমেশন পেয়েছি আমরা।”

স্বচ্ছের কপালে বেশ কয়েকটি প্রগাঢ় ভাঁজ পড়ে। সে অফিসারের কথার কিছুই বুঝতে পারছে না। গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“কি ইনফরমেশন? আর কিসের ব্যাপারে?”

“আপনার ছোট ভাইয়ের ব্যাপারে। মনে রেখেছেন নাকি ভুলে গিয়েছেন? আহিয়ান সৌমিত্র! মনে নেই?”

থতমত খেয়ে যায় স্বচ্ছ। কপালে জমতে শুরু করে ঘাম। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে চাইলেও যেন পারে না সে। গলা খাঁকারি দিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে বলে,
“মনে থা…থাকবে কেন? মনে আছে আমার।”

“আপনারা আমেরিকান পুলিশদের যতটুকু ইনফরমেশন দিয়েছিলেন সেই অনুযায়ী সৌমিত্র মারা গেছে। কিন্তু আমাদের কাছে যা যা ইনফরমেশন আছে সেই অনুযায়ী সৌমিত্র বেঁচে আছে। আর সে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।”

“হোয়াট ডু ইউ মিন অফিসার?”

“যেটা আপনি শুনছেন সেটাই মিন করছি।”

“আমার ভাই বেঁচে আছে আর আমরা জানি না? মজা করছেন?”

ওপাশ থেকে অফিসার বেশ সিরিয়াস হয়ে বলে উঠলেন,
“আমরা তো এটাই বুঝতে পারছি না আমরা আপনাদের সাথে মজা করছি? নাকি আমাদের মজার খোরাক বানাচ্ছেন?”

কিছুটা ঘাবড়ালেও সেটা প্রকাশ করে না স্বচ্ছ। সৌমিত্র নিশ্চয় কিছু ঘটিয়েছে। নাহলে পুলিশ অফিসার এতো জোর দিয়ে বলার সাহস পেতো না। এখন স্বচ্ছের একমাত্র চিন্তা কি কারণে পুলিশ অফিসার এতো কথা বলছে!
“আমরা কেন আপনাদের মজার খোরাক বানাতে যাব? আহিয়ান স্বচ্ছের সাথে কথা ঘুরাবেন না অফিসার। স্পষ্টভাবে বলুন কি বলতে চান।”

“আজকে সাভার রোডে একজন বৃদ্ধ লোকের এক্সিডেন্ট হয়েছে। একটা লাল রঙের কার ট্রাফিক রুলস না মেনে গাড়ি চালিয়ে গেছিল। ফলস্বরূপ একটা বৃদ্ধ লোককে ধাক্কা মেরে পালিয়ে যায় গাড়ির মালিকটি। সিসিটিভি ফুটেজে একটা ছেলেকে দেখা গেছে। যদিও ভালোভাবে দেখা যায়নি। ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে মাস্ক পরে নিয়েছিল। কিন্তু মাস্ক পরার আগের দৃশ্য দেখা গেছে বেশ খানিকটা। আপনার ভাইয়ের ছবির সাথে লোকটার ছবি মিলাতেই অধিকাংশই মিলে গেছে। বিষয়টা ইন্টারেস্টিং না?”

এবার কাশি উঠে যায় স্বচ্ছের। জবাবে কি বলবে বুঝতে পারে না সে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা হয়ে সেটা গাল বেয়ে পড়ে সেটা থুঁতনিতে এসে ঠেকল।
“আপনি সিউর কি করে হচ্ছেন? এতো বছর পর সৌমিত্র কি করে আসবে?”

“সেটা আমারও কুয়েশ্চন মি. আহিয়ান। উত্তর আপনি দেবেন। আমি আপনাকে সিসিটিভি ফুটেজ পাঠিয়ে দিচ্ছি। দেখে মিলিয়ে নিন তো। আশা করছি আপনি কোঅপারেট করবেন আমাদের সাথে। সৌমিত্রের মতো একটা ক্রিমিনাল ধরিয়ে দিতে হেল্প করবেন।”

“আ…আই উইল ট্রাই অ…অফিসার।”
ফোনটা ওপাশ থেকে কেটে গেল। স্বচ্ছের মেজাজ বিগড়ে গেল মূহুর্তেই। এতে ঝামেলা আর সইতে মন চাইছে না। সেই কবে থেকে এসব কিছু লুকিয়ে লুকিয়ে সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। দাঁতে দাঁত চেপে ফোনটা ফেলে দিতে গিয়েও ফেলল না সে। ফোনটা জোরে চেপে ধরে রাগ নিবারণ করার চেষ্টা করল। তখনি ফোনে টুং করে মেসেজের শব্দ বেজে উঠল। তাড়াহুড়ো করে মেসেজ ওপেন করে স্বচ্ছ। একটা ভিডিও ক্লিপ পাঠানো হয়েছে তাকে। সেটাতে ক্লিক করতেই রাস্তায় একটা বৃদ্ধ লোককে ধাক্কা মারল লাল রঙের কারটি। স্বচ্ছ চোখমুখ খিঁচে ফেলল তা দেখে। কারের সামনের কাঁচ খোলা। কার কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়িয়ে ছিল। সেখান দিয়ে বেশ ভালোভাবে একটা যুবককে দেখা যাচ্ছে। বড় বড় দাড়ি তার গালে। যুবকটিকে চিনতে দেরি হলো না স্বচ্ছের। এবার ফোনটা ফেলেই দেয় স্বচ্ছ। উচ্চস্বরে বলে ওঠে,
“তোর বোকামির জন্য তোকে এবার ধরা পড়তে হবে সৌমিত্র। আমি এবার থাকব না বাঁচানোর জন্য। তোর আর মায়ের জন্য ভাবতে ভাবতে নিজেকে ভুলতে বসেছি আমি। এবার একটু স্বার্থপর হতে চাই।”

পরে থাকা ফোনটা হাতে নিয়ে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে আবারও নিজের রুমের দিকে হেঁটে যায় স্বচ্ছ।

সন্ধ্যে নামতে না নামতেই কারেন্ট উধাও হয়ে গেছে। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সবেই কারেন্ট চলে গেল। অতিরিক্ত বিরক্ত হয়ে ফোন খুঁজে চলেছে মোহ। সে বিরক্তির সুরে বলে ওঠে,
“স্বচ্ছ, আপনি মোমবাতি এনেছিলেন না? সেটা কোথায়?”

“আমি কি করে জানব?”

“কি করে জানবেন মানে? আপনি এনে রেখেছেন আর আপনি জানেন না?”

“না জানি না।”
বেশ খামখেয়ালি হয়ে গম্ভীর সুরে উত্তর দেয় স্বচ্ছ। মোহ বিকেলের পর থেকে খেয়াল করছে স্বচ্ছ বাহির থেকে মোমবাতি আনার পর কেমন যেন অদ্ভুত আচরণ করছে। মোমবাতি আনার পরই শুয়ে পড়েছিল স্বচ্ছ। তারপর আর ওঠেনি। ওইভাবেই শুয়ে আছে চোখ বুঁজে। স্বচ্ছ তো এমন শুয়ে থাকার মানুষ না। তাই বিষয়টা বেশ অদ্ভুত লাগছে মোহের।

কোনোরকমে ফোন হাতড়ে খুঁজে বের করে ফ্লাশ লাইট জ্বালিয়ে নেয় মোহ। তারপর মোমবাতির স্বচ্ছের বালিশের কাছেই খুঁজে পেয়ে স্বচ্ছকে চোখ রাঙিয়ে মোমবাতি নিয়ে মোমবাতি লাইটার দিয়ে জ্বালিয়ে নেয় সে। চোখ বুঁজে থাকা স্বচ্ছ আস্তে আস্তে চোখ মেলে। মোমবাতির আলোতে মুখরিত হয়ে উঠেছে ঘর। মোমবাতি হাতে ধরে এক সুন্দরী রমণী। মোমবাতির আলোতে ঝলমল করছে তার চেহারা। স্বচ্ছের দিকেই সরু চোখে তাকিয়ে আছে মেয়েটি। হরিণী চোখে সেই সরু দৃষ্টি আর চোখা মুখা মুখটা যেন অনন্য! সামনের মেয়েটা আসলেই বড্ড নেশালো। স্বচ্ছের সব থেকে বড় একটি নেশা। যাকে না দেখলে চোখের পাতা এক হয় না। কি এমন নেশাদ্রব্য দিয়ে তৈরি সে? তার মাঝে তো কোনো নেশাদ্রব্য নেই। তাহলে কেন এমন হয় স্বচ্ছের? যেন তাকে দেখলে আর অন্য কোনো কিছুই স্বচ্ছকে টানতে সক্ষম হয় না।

স্বচ্ছের এমন দৃষ্টি দেখে মোহের দৃষ্টিও পাল্টে গেল। চোখজোড়া বড় বড় করে চেয়ে থাকে স্বচ্ছের দিকে। হঠাৎ করেই স্বচ্ছ মোহের হাত টেনে ধরে মোহকে এনে ফেলে সরাসরি তার বুকের ওপরে। মোহ দ্রুত নিজের হাতে থাকা মোমবাতি সামলে নেয়।

“আরে আমার হাতে মোমবাতি আছে। পাগল নাকি আপনি? যেকোনো সময় আগুন জ্বলে যেতে পারে।”

“তো? এসব বাহিরের আগুন দেখতে পাও বুঝি? আমার মনের ভেতরে যে দাউদাউ করে ভালোবাসার আগুন জ্বলছে সেটা বুঝি তোমার চোখে পড়ে না?”

“আপনি দেখার সুযোগ দিয়েছেন কখনো?”

“এখন দেখবে?”

মোহ নিরব থাকে। স্বচ্ছ মোহের মাথা তার বুকের বাম পাশে চেপে ধরে। মোহ অনুভব করে স্বচ্ছের হৃৎস্পন্দন! এখানেই তো তার সুখ। তার প্রশান্তির জায়গা। এখানে মাথা রাখলে তো সব প্রশান্তি পাওয়া যায়। ভালোবাসার অন্য জগতে চলে যায় যায়।
“অনুভব করতে পারছো সেই আগুন?”

“হু। এখানে তো অনেক শান্তি। আগুন কোথায়?”

“তুমি বুঝবে না।”

“তাহলে কে বুঝবে?”

“তোমার মন।”

মোহ মৃদু হাসে। অতঃপর জিজ্ঞেস করে,
“কি হয়েছে আপনার?”

“কি হবে?”
কিছুটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায় স্বচ্ছ। মোহ ফিচেল কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“কি হবে মানে? আপনি কেমন যেন অদ্ভুত আচরণ করছেন। আমার ভালো লাগছে না।”

“অশান্তি লাগছে আমার। এতো অশান্তি সহ্য হচ্ছে না। শান্তি খুঁজছি আমি।”

“আমি আপনাকে কি করে শান্তির খোঁজ এনে দিতে পারি বলুন?”

“তোমার কাছেই তো শান্তি। সেজন্যই তো তোমার কাছে এসেছি সুন্দরী।”
মোহও কি যেন মনে করে স্বচ্ছকে পরম আবেশে জড়িয়ে ধরে।

কিছুক্ষণ নিরবতা! নিরবতা ভেঙে মোহ মাথা উঠিয়ে বলে ওঠে,
“বাহিরে যাবেন?”

স্বচ্ছ ভ্রু কুঁচকায়।
“এখন? রাত হয়ে এসেছে তো।”

“তো কি হয়েছে?”

“এটা ঢাকা শহর মনে করো? এখানে তোমার মতো সুন্দরীকে সন্ধ্যার পর বাহিরে নিয়ে গেলে অনেক রিস্ক আছে। আমি কোনো রিস্ক নিতে চাইছি না সরি।”

মোহ মুখ ফুলিয়ে উঠে বসে স্বচ্ছের হাত টেনে বলে,
“ধুর… চলুন না!”

মোহের বায়নার কাছে হার মানে স্বচ্ছ। উঠে বসে সে। নিচে নামতে নামতে বলে,
“ঠিক আছে চলো।”
#একটুখানি_সুখ
#আনিশা_সাবিহা
পর্ব ৩৮

আজকে পূর্ণিমার রাত। পূর্ণ চাঁদের আলো ঝলমলিয়ে উঠেছে আকাশে। কত সুন্দর চারিপাশটা। চাঁদ যেন কত কাছে। ধরলেই ছোঁয়া যাবে। গাছের পাতা জোরে জোরে নড়ছে। কি বাতাস! অনেকেই বাহিরে হাঁটাহাঁটি করতে বেরিয়েছে কারেন্ট নেই বলে। সবাই কত আনন্দের সাথে হাঁটাহাঁটি করছে। কেউ গল্প করছে। আবার গার্ডেনে একটা ছেলেমেয়ের দল গল্পের আসর বসিয়েছে। তারা বোধহয় পিকনিকে এসেছে। কত আনন্দ! মোহ সেসব দেখছে আর স্বচ্ছের পাশাপাশি হাঁটছে। স্বচ্ছ একবার চাঁদের দিকে তাকাচ্ছে একবার মোহের দিকে তাকাচ্ছে। সেটা নজর এড়ালো না মোহের। চাদর মুড়ি দিয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে হাঁটছে সে আর স্বচ্ছের কান্ড দেখছে। লোকটা এই ঠান্ডা আবহাওয়ায় এভাবে হাঁটছে কি করে? শুধু একটা পাতলা শার্ট গায়ে দিয়ে? তাও পকেটে হাত দিয়ে লাটসাহেবের ন্যায় হেঁটে চলেছে।

“চাঁদটা আজকে পূর্ণ হয়েছে না?”

আনমনে মোহকে কথাটা জিজ্ঞেস করে ওঠে স্বচ্ছ। মোহও মৃদু সুরে উত্তর দেয়,
“হু। হয়েছে তো। তাতে কি?”

“কেন যেন আজকে নিজেকেও পূর্ণ মনে হচ্ছে।”

একটু থামে স্বচ্ছ। আবার বলে ওঠে,
“পাশে এমন একজন হাঁটছে যাকে পেলে আমি সত্যিই পূর্ণতা লাভ করি। যাকে পেলে মনে হয় সব কিছু হারিয়ে যাক কিন্তু এই মোহে পরিপূর্ণ মেয়েটা আমার কাছে থাক। আমার বুকে লুকিয়ে থাক। এর চেয়ে সুখের আর কি আছে?”

“কোথাও নিজেকে ভাগ্যবতী মনে হচ্ছে। আপনার জন্যই কিছুই করিনি আমি। মনে হয়েছিল মানুষটা #একটুখানি_সুখ চেয়েছিল সেই মানুষটাকে তো সুখের আশাও দিতে পারলাম না। কিন্তু আমাকে পেয়ে যদি আপনি সুখ পেয়ে থাকে তাহলে এই মোহ কথা দিচ্ছে সে সারাজীবন আর শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আপনার হাতের ওপর হাত রেখে নির্দ্বিধায় কাটিয়ে দেবে।”

স্বচ্ছের হাতটা নিজের দুহাত দিয়ে জড়িয়ে নিয়ে নিজের গালে ঠেকিয়ে ধরে মোহ। স্বচ্ছের মনে অনুভূতির জোয়ার বইছে। দুজনের মনের জড়তা কেটে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। মোহ স্বচ্ছের হাত স্পর্শ করতেই খেয়াল করে স্বচ্ছের হাত বেশ ঠান্ডা। নিশ্চয় ঠান্ডা লাগছে কিন্তু প্রকাশ করছে না। মোহ কি করবে ভেবে না পেয়ে এদিকওদিক তাকায়। তখনই চাঁদের আলোতে নজর পড়ে এক দম্পত্তির দিকে। তারা বেশ সুন্দরভাবে এক চাদরে দুজনক দুজনকে ঢেকে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে আর হেঁসে হেঁসে গল্প করছে। মোহের মাথাতেও খেলে গেল বুদ্ধি। চলা থেমে তৎক্ষনাৎ নিজের চাদর খুলতে শুরু করে সে। স্বচ্ছ তা দেখে বিস্ময়ের সুরে বলে ওঠে,
“এতো ঠান্ডায় চাদর খুলছো কেন? ঠান্ডা লাগবে মেয়ে। তোমার তো ঠান্ডা হলেও অসুখ করে।”

“আর আপনার কি হবে শুনি তো? আপনি কি মানুষ না? নিজেকে সুপারম্যান মনে করেন নাকি হ্যাঁ?”
কড়া কন্ঠে কথাগুলো এক নিশ্বাসে বলেই নিজের চাদরের এক সাইড স্বচ্ছের কাঁধে পায়ের গোড়ালি উঁচু করে জড়িয়ে দেয় সে। আর স্বচ্ছের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বাকি অংশ নিজের গায়ে জড়িয়ে নিয়ে দুহাতে ঝাপ্টে ধরে স্বচ্ছের হাতটা। নরম সুরে বলে,
“এবার ঠিক আছে। আর আপনি আসলেই একটা হাতি। এতো উঁচু কেন? উফফ… সামান্য চাদর দিয়ে দিতেও কত পরিশ্রম করতে হয়!”

স্বচ্ছ বিস্ময়ে থম মেরে গেল। এমন আচরণ, এমন পাগলামি, এমন কেয়ার করার মানে কি? ভাববার সঙ্গে সঙ্গে স্বচ্ছ উত্তরটা পেয়ে গেল। মেয়েটার মনে কি তবে স্বচ্ছ নামক ভালোবাসার অনুভূতি জাগাচ্ছে? কোথাও কি স্বচ্ছ সত্যি সত্যিই এই মোহময়ী নারীর মনে জায়গা করে নিতে পেরেছে? হাঁটতে শুরু করেছে তারা। রাতের নিস্তব্ধতায় অনেকে হেঁটে কথা বললেও আওয়াজ তেমন শোনা যাচ্ছে না। স্বচ্ছ মুখ বাঁকিয়ে বলে,
“এতো পরিশ্রম করলে কেন তবে? না করলেই পারতে। তুমি একাই তো চাদর নিয়ে ভালো ছিলে!”

“ভালো ছিলাম না কচু! আমার ইচ্ছে হয়েছে তাই আমার জন্য পাগলামি করা মানুষটার জন্য একটু পাগলামি করছি। সেটাও করতে দেবেন না? সব পাগলামি শুধু আপনার জন্য বরাদ্দ না। আমার জন্যও কিছু পাগলামি বরাদ্দ থাক?”

বলেই আপনমনে স্বচ্ছের কাঁধে মাথা রাখে মোহ। মুচকি হেঁসে হাঁটতে থাকে দুজন। চারিদিকে শুধু ভালোবাসা আর ভালোবাসা!

হেঁটে বেশ সামনে এসেছে তারা। সামনে অন্য এক রিসোর্টের হোটেল। রিসোর্টের গার্ডেনে অনেকে বসে গল্প করছে। সেখানে এক ছেলেমেয়ের দল গিটার নিয়ে বসেছে। আনন্দের সাথে গিটার বাজাচ্ছে এক যুবক। মনোরম সুরে মুখরিত হয়েছে পরিবেশ। এরইমাঝে একটা ছেলের সাথে সাইকেল দেখে স্বচ্ছ বলে উঠল,
“অনেকদিন সাইকেল চালাই না। সাইকেলে উঠবে?

” এখন? কোথায় পাবেন সাইকেল?”

“ওইযে সামনে।”
ইশারা করে দেখিয়ে দেয় স্বচ্ছ। মোহ ফিচেল কন্ঠে বলে,
“ও আপনাকে সাইকেল দেবে কেন?”

“আহা চলোই না! সামনে একটা ছোট ঝুলন্ত ব্রিজ আছে না? ওইযে দেখা যাচ্ছে। সাইকেল নিয়ে ওখান থেকে ঘুরে আসি দুজনে।”

বলেই মোহকে নিয়ে ছেলেটির সামনে হেঁটে যায় স্বচ্ছ। বেশ বলে বলে সাইকেলটা দিতে রাজি হয় ছেলেটা। ছেলেটাও রিসোর্টে কাজ করে। বেশ গরীব। সাইকেল নেওয়ার আগে স্বচ্ছ বেশ কয়েকটা টাকাও গুঁজে দেয় ছেলেটির হাতে। সেটা দেখে বেশ মুগ্ধ হয় মোহ। অথচ এই লোকটাকে সে কতই না নিষ্ঠুর ভাবতো!

সাইকেলটা নিয়ে সিটে বসে স্বচ্ছ। মোহ মুখ কাঁচুমাচু করে ফেলে সে কারণ পেছনে বসার কোনো সিট নেই। আচমকাই স্বচ্ছ মোহের গা থেকে চাদর টেনে নিজের গায়ে জড়িয়ে মোহকেও নিজের কাছে টেনে সামনে বসিয়ে দেয়। একহাতে নিজের গায়ের সাথে লেপ্টে ধরে সে মোহকে। অন্যহাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে প্যাডেল চালাতে শুরু করে সে। মোহের কপালের পাশে নিজের ঠোঁটের আলতো স্পর্শ দিয়ে বলে,
“তুমি কি ভেবেছিলে তোমাকে ছাড়াই চলে যাব সাইকেলে? এতো রিস্ক নেওয়ার কোনো মানে আছে বলো? লোকে আর যাই বলুক বা বউপাগল বলুক। আমি আমার বউকে ছাড়ছি না। আর স্পেশাল রিজনটা হলো এভাবে গেলে একটু মাখো মাখো প্রেম হবে। সো কিউট না? মাঝে মাঝে টুপ করে চুমু খাওয়ার সুযোগও পাওয়া যাবে।”

মোহ প্রথমে মিইয়ে পড়লেও নিজের হাতের কনুইয়ের মাধ্যমে স্বচ্ছের পেটে গুঁতো দিয়ে বলে,
“অসভ্য মার্কা আইডিয়া আপনার।”

স্বচ্ছ উচ্চস্বরে হেঁসে ওঠে। আবারও মনোযোগ দেয় মোহ ও রাস্তার দিকে। পেছন থেকে ওই গিটার বাজানো ছেলেটির গলার গানের সুর ভেসে এলো।
“কঠিন! তোমাকে ছাড়া একদিন,
কাটানো এক রাত, বাড়াও দুহাত।
হয়ে যাও আজ বাঁধা বিহীন!
বলো, কবিতা হয়ে চলো।
বাগানে দাবানল, জমানো জল
হয় যেমন ঠিকানা হীন।”

ছেলেটি থামলে সেখান থেকে স্বচ্ছ মোহকে উদ্দেশ্য করে সুর ধরে গেয়ে ওঠে,
“চেয়েছি যতবারই, হয়েছে ছাড়াছাড়ি।
মরেছি ততবারই, এসেছে এক বেদনা দিন!
কঠিন! তোমাকে ছাড়া একদিন।”

মোহ জানে স্বচ্ছ তাকে উদ্দেশ্য করে গাইছে। এর থেকে অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম আর কি হতে পারে? তার মানে নিশ্চয় স্বচ্ছও ভালোবাসে তাকে? কথাটা ভাবতেই কান গরম হয়ে যায় মোহের। হৃৎস্পন্দনের গতি অস্বাভাবিকভাবে বাড়ে। ঘন হয়ে আসে নিঃশ্বাস। এ যেন অস্বস্তি সঙ্গে সুখের অনুভূতি। নিজেকে স্বাভাবিক করতে চাইতেই স্বচ্ছ ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে,
“আজ যদি সত্যিই বাঁধা বিহীন হয়ে যাই তাহলে কি আমার মিসেস. এর কোনো আপত্তি আছে?”

গলা শুঁকিয়ে আসে মোহের। আওয়াজ দিতে পারে না। মন চাইছে সত্যিই বাঁধা বিহীন হয়ে যেতে। ক্ষতি কি তাতে? মাথা নিচু করে ফেলে সে। স্বচ্ছ আবারও বলে ওঠে,
“আজ ইচ্ছে করছে তোমার সম্পূর্ণ নিজের করতে। গভীরভাবে স্পর্শ করতে। দুজনে দুজনের মাঝে বিলীন হয়ে যেতে!”

মোহ তবুও উত্তর দেয় না। সাড়া না পেয়ে স্বচ্ছও নিরব হয়ে যায়। তবে হতাশ হয় না। কারণ মেয়েটির জড়তা এখনো বোধহয় কাটেনি। এটা তো স্বাভাবিক।

চারিদিকে ঝিঁঝি পোকার আওয়াজ। আশেপাশে বড্ড নীরবতা বহমান। স্বচ্ছ মোহকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। রাতের খাবার খেয়েই এসেছে ওরা। রুমে ঢুকতে ঢুকতে স্বচ্ছ মোহকে মৃদু ডেকে বলে,
“মোহ! এসে পড়েছি।”

সাড়া দেয় না মোহ। লাইটের সুইচ দিতেই মনে পড়ে কারেন্ট তো নেই। বড় নিঃশ্বাস ছেড়ে বিছানার দিয়ে মোহকে নিয়ে এগিয়ে যায় সে। বেডে শুইয়ে দিতেই মোহকে বার বার ডেকেও যখন কাজ হয় না স্বচ্ছের ধারণা হয় মেয়েটা বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। মোহের দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে নিজেকে সামলাতে না পেরে মোহের সারা মুখে চুমুতে ভরিয়ে দেয় স্বচ্ছ। এক অজানা তৃপ্তি ঘিরে ধরে তাকে। আরেকটু বেশি স্পর্শ করতে ইচ্ছে করে। তবে বেশি না ভেবেই উঠে দাঁড়ায় সে। অন্যদিকে ঘুরতেই তার হাত চেপে ধরে কেউ। স্বচ্ছ ফিরে তাকাতেই মোহ হাত টেনে নিজের ওপর ফেলে দেয় স্বচ্ছকে। নিজেকে সামলে নেয় স্বচ্ছ। কিছু বলার আগেই মোহ মিহি সুরে বলে,
“থামলেন কেন? চলুন আজ হই বাঁধা বিহীন!”

স্বচ্ছের সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল মোহের কথায়। নিজেকে চিমটি কেটে বোঝার চেষ্টা করল এটা কি স্বপ্ন নাকি বাস্তব? অস্ফুটস্বরে বলে ওঠে,
“মোহ তুমি…?”

“আমি কি? কঠিন, আপনাকে ছাড়া একদিন!”
বলেই নিজের হাতে মুখ ঢেকে ফেলে সে। কি লজ্জা! কি নির্লজ্জের মতো কথাগুলো বলে ফেলল সে? স্বচ্ছ হতভম্ব হলো! এ কোন মোহ? হুট করেই মোহ আবারও ভয়ানক কাজ করে বসল। স্বচ্ছের ঠোঁটে আলতো চুমু খেতেই নিজের মধ্যে আর রইল না স্বচ্ছ। আজ তারা হবে বাঁধা বিহীন। এই মূহুর্ত শুধু তাদের! শুধু শোনা যাচ্ছে তাদের নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ।

ভোর রাত। স্বচ্ছের উম্মুক্ত বুকে বেশ আয়েশে ঘুমিয়ে আছে মোহ। হঠাৎ স্বচ্ছের ঘুম ভাঙল তার ফোনের রিংটোনের শব্দে। মোহকে বালিশে শুইয়ে আননোন নম্বর দেখে উঠে বসল সে। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে যা শুনল তাতে মোটেও প্রস্তুত ছিল না স্বচ্ছ। ফোনটা কেটে যেতেই আবারও ওই নম্বরে ব্যাক করল সে। লাভ হলো না। ফোন বন্ধ। অস্থির অস্থির করে উঠে গেল সে। গায়ে জড়িয়ে নিল শার্ট। ফোনটা নিয়ে রিয়ানার নম্বরে ডায়াল করে কল করতেই ওপাশ থেকে কল রিসিভ করে রিয়ানা।
“হ্যালো রিয়ানা। একটু রুম থেকে হও। প্লিজ!”

বলেই মোহের দিকে একবার তাকিয়ে বের হয়ে গেল স্বচ্ছ। স্বচ্ছ যেতেই উঠে বসে মোহ। সে জেগেই ছিল যখন রিয়ানাকে ফোন করছিল স্বচ্ছ। কি হয়েছে লোকটার? দ্রুত নেমে দাঁড়ালো সে। ওয়াশরুমে গিয়ে ৫ মিনিটের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে গায়ে চাদর পেঁচিয়ে নিতেই জানালা দিয়ে নজর গেল রিসোর্টের বাহিরের দিকে। দিনের আলো একটু একটু ফুটেছে। স্বচ্ছ আর রিয়ানা কোথাও যাচ্ছে। আর দেরি করে না মোহ। কি করবে ভেবে না পেয়ে বেরিয়ে যায় সে।

স্বচ্ছ ও রিয়ানা এসে থামে একটা বড় রিসোর্টের সামনে। মোহও হন্তদন্ত হয়ে এসে সেখানেই থামে। তার মনে ক্ষীণ প্রশ্ন জাগে। ওরা দুজন এখানে কি করতে এসেছে? তাও এতো ভোরে? স্বচ্ছই তো রিয়ানাকে ডাকল। কেন ডাকল? তাও দুজনে কেন রিসোর্টের দিকে এলো। মোহকে আরো অবাক করে দিয়ে স্বচ্ছ ও রিয়ানা দুজনই হাত ধরাধরি করে রিসোর্টে ঢুকে পড়ল। যেন তারা একে অপরের কত কাছের! মোহের মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিল এবার। বেশ কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। হঠাৎ কি হচ্ছে? এমন হচ্ছে কেন? তার ভয় লাগছে কেন?

১০ মিনিট পর খুব সাহস জুগিয়ে সেই রিসোর্টে ঢুকে পড়ে মোহ। রিসেপশনে আসতেই রিসেপশনিস্ট তাকে জিজ্ঞেস করে,
“ইয়েস ম্যাম? কিছু বলবেন?”

মোহ বেশ কিছুটা ইতস্ততবোধ করে বলল,
“কিছুক্ষণ আগে দুটো ছেলে আর মেয়ে এসেছিল। ওরা কোথায়? একচুয়ালি আমি ওদেরকে চিনি তো তাই বলছিলাম।”

“কিছুক্ষণ আগে? মানে মি. আহিয়ান স্বচ্ছ আর মিসেস. রিয়ানার কথা বলছেন?”

ভ্রু কুঁচকে গেল মোহের। রিয়ানা তো অবিবাহিত। তাহলে রিসেপশনিস্ট তাকে মিসেস. বলে সম্মোধন করছে কেন? তবুও যে মনকে বুঝিয়ে বলল,
“মিসেস. রিয়ানা?”

“হ্যাঁ! মি. আহিয়ান তো সেটাই বলল। উনারা তো ৩০১ নম্বর রুমে গেলেন চাবি নিয়ে। পরিচয়ে উনারা নিজেকে স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়েছেন।”

চলবে…

[বি.দ্র. ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এর বাস্তবে কোনো ভিত্তি নেই।]
চলবে…

[বি.দ্র. ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। আজকের পর্বটা ছোট হয়ে গেছে। 😐 কালকের পর্বে ছোটখাটো ঝটকা আছে। আর হ্যাঁ গল্পটা শেষ দিকে। গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here