চিলেকোঠার প্রেম পর্ব ১+২+৩

0
123

রক্তাক্ত অবস্থায় ছেলেটা হুট করে সামনে আসতেই স্কুটি থামিয়ে দিল সায়েন। চোখ তুলে তাকিয়ে দেখলো ছেলেটার মাথা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। গায়ের সাদা শার্ট টা রক্তে লাল হয়ে গেছে। বৃষ্টি পড়ছে বিধায় পুরো শার্ট ভিজে গেছে। বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যাচ্ছে রক্ত ফলে সাদা শার্ট টা লাল বর্ণ ধারণ করছে। ছেলেটাকে এই অবস্থায় দেখে ভড়কে যায় সায়েন। সায়েন ওর ফ্রেন্ড দিশার বাড়ি থেকে নোটস কালেক্ট করে ফিরছিলো। বিকেল থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি নামছিল তাই সে রেইনকোট নিয়ে এসেছিল। এখন প্রায় সন্ধ্যা নেমে এসেছে চারিদিকে। বৃষ্টির প্রকোপ বাড়ায় গায়ে রেইনকোট জড়িয়ে বাড়ি ফিরছিল সায়েন। হঠাৎ করেই ছেলেটা কোথা থেকে হুমড়ি খেয়ে পড়লো ওর স্কুটির সামনে। সায়েন স্কুটিতে বসা অবস্থায় তাকালো ছেলেটার দিকে। ইশশ কি বেহাল অবস্থা ছেলেটার। সায়েন কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল,’কে আপনি?? আর আপনার এরকম দশা হলো কিভাবে??’

ছেলেটার মুখ দিয়ে অস্পষ্ট কথা বেরোচ্ছে যা সায়েন শুনতেই পারছিল না। তবে মানতে হবে যে ছেলেটা স্ট্রং নাহলে এতো জখম হওয়া সত্ত্বেও পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিভাবে??সায়েন ছেলেটার জায়গায় হলে তো জ্ঞান হারিয়ে পগারপার হয়ে যেতো। কিন্তু ছেলেটাকে তো সাহায্য করতে হবে। এই অবস্থায় থাকলে মরেও যেতে পারে। আশেপাশে কেউ নেই। সায়েন বিড়বিড় করে বলতে লাগলো,’এখন কি করি?? আশেপাশে তো কাউকে দেখতেও পাচ্ছি না। এই বৃষ্টির মধ্যে ডক্টরের দোকান আদৌ খোলা থাকবে??কি করি??কি করি??একে বরং আমার বাড়িতে নিয়ে যাই। প্রাথমিক চিকিৎসা করি। তারপর দেখা যাবে। কিন্তু মা তো আমাকে আস্ত রাখবে না। মা বকলে বকুক। তাছাড়া সাহায্য করছি বললে কিছু বলবে না।’

যেই ভাবা সেই কাজ। সায়েন ছেলেটাকে ধরে বলল,’আপনি আমার স্কুটিতে বসতে পারবেন তো?? তাহলে নিয়ে যেতে পারবো।’

ছেলেটা নিভু নিভু চোখে সায়েনের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লো। কিন্তু সে স্বাভাবিক ভাবে স্কুটিতে বসতে পারলো না। সায়েন পড়লো আরো বিপদে। হঠাৎ করেই মাথায় এলো ওর ব্যাগে তো ওড়না আছে। রেইনকোট পড়ার জন্য ওড়না খুলে রেখেছিল সে। সায়েন দ্রুত ওড়না বের করে নিজের কোমড়ের সাথে ছেলেটার কোমড়সহ বেঁধে ফেলল। যাক এখন পরে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। ছেলেটা দুহাতে সায়েনের গলা জড়িয়ে ধরেছে। অস্বস্তি হওয়া সত্ত্বেও সায়েন স্কুটি স্টার্ট দিলো। ছেলেটাকে নিয়ে সায়েন সোজা বাড়িতে এলো। কোনরকমে ছেলেটাকে ধরে নিয়ে বাড়ির দরজায় পর্যন্ত আসলো। সায়েন কলিং বেল বাজালো। কিন্তু কেউ দরজা খুলল না। কয়েকবার বাজানোর পর ও কেউ দরজা খুলল না দেখে সে এক্সট্রা চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো। ছেলেটাকে নিজের রুমে নিয়ে গিয়ে খাটের উপর শুইয়ে দিলো। বাড়িতে কেউ নেই দেখে সায়েন অবাক হলো।

সায়েন দৌড়ে বাবার রুমে গেল। বাবার ডাক্তারি ব্যাগটা বের করে নিয়ে ছুটলো নিজের রুমে। ব্যাগ থেকে ঔষধ পত্র বের করলো। মাথা ড্রেসিং করে দিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিলো সে। হাতও কাটা ছেঁড়া। সব জায়গায় ড্রেসিং করে ব্যান্ডেজ করে দিয়ে হাফ ছাড়লো সায়েন। কিন্তু ছেলেটার গায়ের জামাকাপড় যে এখনও ভেজা। সায়েন একটু ভেবে ছুটলো শাফিনের রুমে। একটা টাউজার আর গেঞ্জি নিয়ে আসলো সে। তারপর অচেনা আগুন্তক কে উদ্দেশ্য করে বলল,’তাড়াতাড়ি চেঞ্জ করে নিন। এমনিতেই আপনি আঘাত পেয়েছেন। যেকোন সময় জ্বর আসতে পারে। ভেজা শরীরে থাকলে জ্বর তাড়াতাড়ি চলে আসবে।’
অচেনা লোকটা শুধু মাথা নাড়লো। সায়েন দ্রুত রুম ত্যাগ করলো। বাবার রুমে তার ব্যাগটা রেখে ফোন করলো ওর মা’কে। জয়নব বেগম ফোন রিসিভ করতেই সায়েন বলল,’মা তোমরা কোথায়??আমি একা বাড়িতে বসে আছি।’

জয়নব বেগম বললেন,’আমি আর তোর বাবা তোর লিলি খালার বাসায় এসেছি। বৃষ্টির জন্য বের হতে পারছিনা তোর খালাও আসতে দিচ্ছে না। তাই আমরা থেকে যাব। তুই চিন্তা করিস না শাফিন চলে যাবে তাড়াতাড়ি। আমি ফোন করেই দিয়েছি। আর কোন ঝামেলা করবি না। চুপচাপ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বি।’

সায়েন মুখটা গোমড়া করে বলল,’ঠিক আছে মা।’

সায়েন ফোনটা কেটে দিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেল। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে এসেছে।এখন এই অজানা ছেলেটাকে নিয়ে সে কি করবে?? এখন মনে হচ্ছে ছেলেটাকে বাড়িতে নিয়ে আসাই ভুল হয়েছে। ওর মা যদি জানতে পারে তাহলে ওর ফাসি হবে নিশ্চিত। মা কি বলবে তাই ভেবে কাঁপতে লাগল সায়েন। কি হবে??সায়েন আর শাফিন প্রচন্ড ভয় পায় ওর মা’কে। মায়ের প্রতিটা কথা দুজনে মান্য করে। সায়েন বিড়বিড় করে বলল,’কালকে মা এসে এই ছেলেটাকে দেখলে তো আমি শেষ। তার আগেই একে বিদায় করতে হবে।’

এসব বলতে বলতে সায়েন রান্নাঘরে চলে গেল। ওর মা রান্না করে রেখে গিয়েছে। গরম করে খেতে হবে শুধু। সায়েন দুধ গরম করলো ছেলেটাকে দেবে বলে। গরম দুধ গ্লাসে ঢালতেই কলিং বেল বেজে উঠলো। সাথে সাথে সায়েন প্রচন্ড জোরে কেঁপে উঠলো। নিশ্চয়ই শাফিন এসে পরেছে। কয়েকবার ঢোক গিলে সায়েন নিজের রুমের দরজা ভেজিয়ে দিয়ে দরজা খুলে দিলো। শাফিন কাক ভেজা হয়ে ফিরেছে। শাফিনকে দেখে সায়েন দাঁত বের করে হাসলো। শাফিন চুল ঝাড়তে ঝাড়তে ভেতরে ঢুকলো। সায়েনের দাঁত কেলানো দেখে সে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তারপর ভেজা শরীরে ড্রয়িং রুম আর রান্নাঘর ঘুরে দেখলো। শাফিনের কান্ড দেখে সায়েন বলল,’কি হলো ভাইয়া কি দেখছিস??’

শাফিন সায়েনের দিকে তাকিয়ে বলল,’কিছু গন্ডগোল করেছিস??’
সাথে সাথে সায়েনের মুখের হাসি গায়েব হয়ে গেলো। শাফিন বলল,’তোর হাসি দেখে বুঝতে পেরেছি যে কিছু গন্ডগোল করেছিস তুই। গ্লাস প্লেট ভেঙেছিস??’
সায়েন জোরে জোরে মাথা নাড়িয়ে বলল,’না না ওসব কিছু না। তুই যা তো চেঞ্জ করে নে। নয়তো ঠান্ডা লেগে যাবে।’

শাফিন নির্দিধায় রুমে চলে গেল। সায়েন দ্রুত দুধের গ্লাস নিয়ে রুমে গিয়ে দরজা আটকে দিলো। রুমে গিয়ে সায়েন অবাক। ওমা, ছেলেটা তো ঘুমিয়ে আছে। সায়েন বিছানার দিকে সামান্য ঝুঁকে আস্তে করে বলল,’ঘুমিয়ে পড়েছে নাকি মরে গেছে??মরে গেলে তো আমি মার্ডার কেসে ফেসে যাব। হায় আল্লাহ কোন ঝামেলায় ফেললে আমাকে??রুমে বিপদ রুমের বাইরে ও বিপদ।’
সায়েন ছেলেটার নাকের সামনে হাত রেখে দেখলো নিশ্বাস নিচ্ছে তারমানে বেঁচে আছে। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে জোরে শ্বাস ফেলল সায়েন। তখনই দরজায় টোকা পড়লো। সায়েন চাদর দিয়ে ছেলেটাকে সম্পূর্ণ ঢেকে দিয়ে দরজা হালকা খুলে মাথা বের করলো। শাফিন চোখ কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল,’আমার ব্রাউন রঙের গেঞ্জি কই??এ্যাশ রঙের টাউজারটাও খুঁজে পাচ্ছি না।’

সায়েন ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে কয়েকটা শুকনো ঢোক গিলল। শাফিনের টাউজার আর গেঞ্জি তো ওই ছেলেটাকে পরতে দিয়েছে। সায়েন তোতলাতে তোতলাতে বললো,’দ দেখ মা হয়তো কোথাও রেখেছে। আপাতত অন্য কোন জামাকাপড় পর যা।’

শাফিন যেতে নিয়ে আবার ফিরে এসে বলল,’দুধ কার জন্য??’
সায়েন হাতের গ্লাসের দিকে তাকালো। শাফিন দেখে ফেলেছে। সায়েন আমতা আমতা করে বলল,’আ আমার জন্য।’

‘কিন্তু তুই তো দুধ খাস না।’

সায়েন আরো ঘাবড়ে গেল। পদে পদে বিপদ এসে পরছে। সামাল দিতে কষ্ট হচ্ছে সায়েনের। সে বলল,’ক কে বলেছে আমি দুধ খাই না??খাই তো!!’
এই বলে সায়েন এক চুমুকে সব দুধ খেয়ে ফেললো। সায়েনের এরকম কাজে বেশ অবাক হয় শাফিন। হঠাৎ করে সায়েনের হলো কি?? অদ্ভুত বিহেভ করছে। ভেজা কাপড়ে থাকার জন্য শাফিন কথা না বলে রুমে চলে গেল। সায়েন ঠাস করে দরজা আটকিয়ে দিলো। দুধ সে খেতে পারে না। গন্ধটা অসহ্যকর। ওয়াক ওয়াক করতে করতে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার খুলে চকলেট বের করে খেতে লাগলো।

‘অসহ্যকর!!এই ছেলেটার জন্য এরকম হচ্ছে। ভাইয়া যদি জানতে পারে তাহলে এখনি মা’কে বলে দেবে। ঘরে বাইরে সবখানে বিপদ।’

সায়েন পায়চারি করছে আর চকলেট খাচ্ছে। হঠাৎ জানালা দিয়ে জোরে বাতাস আসতেই ছেলেটার মুখের উপর থেকে চাদরটা সরে গেল। সায়েনের চোখ আটকে গেল ছেলেটার ঘুমন্ত মুখের দিকে। ফর্সা মুখখানা লাল হয়ে গেছে। ঠোঁটের কোণে রক্ত জমে কালচে হয়ে গেছে। ঠোঁটজোড়া গোলাপের পাপড়ির ন্যায় কোমল। চেহারা জুড়ে মায়া ছড়ানো। সায়েন কেন যে কেউ দেখলে মুগ্ধ হয়ে দেখবে ছেলেটাকে। এমন সুন্দর ছেলেটাকে এভাবে আঘাত করলো কে??বিবেকে কি তার একটুও বাঁধলো না??এই মুহূর্তে সায়েনের সামনে সুদর্শন যুবক শুয়ে আছে। এরকম ভাবে কাউকে কখনো পর্যবেক্ষন করেনি সায়েন। কিন্তু এই ছেলেটার রূপ তাকে দেখতে বাধ্য করেছে। আঁখিযুগল অসম্ভব সুন্দর। শুধু কি ছেলেরাই মেয়েদের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়?? নাহ মেয়েরাও ছেলেদের রূপে মুগ্ধ হয়। তার প্রমাণ সায়েন নিজে। সায়েন অবাক নয়নে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে আছে। তখনই কারেন্ট চলে গেল। অন্ধকার হওয়ায় সায়েনের সম্বিৎ ফিরে এলো। এত সুন্দর একটা মুহূর্ত কারেন্টটা নষ্ট করে দিলো। এদিক ওদিক খুজে মোমবাতি জ্বালিয়ে একটা টুলের উপর বসলো। এই মোমবাতির আলোয় ছেলেটাকে মোহনীয় লাগছে। ছেলেটাকে দেখছে আর চকলেট খাচ্ছে সে। এর মধ্যে শাফিন এসে ডেকেছিল কিন্তু সায়েন বলেছে সে ঘুমিয়ে পড়েছে। তাই শাফিন চলে গেছে।

…………………

ঘুমের ঘোরে সায়েন অনুভব করছে যে কেউ একজন ওকে দেখছে। সায়েনের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে যে,সায়েন একজোড়া আঁখি গভীর দৃষ্টিতে তোকে দেখছে। তার দৃষ্টি যে শুধু তোর দিকে। চট করে সায়েন চোখ মেলে তাকায়। দেখে সত্যি সত্যি একজোড়া আঁখি ওর দিকে তাকিয়ে আছে। সায়েন তড়িঘড়ি করে ঠিক হয়ে বসলো। ছেলেটার পায়ের কাছে বসে থাকতে থাকতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে তা টের পায়নি সে। অচেনা ছেলেটা খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসে সায়েনের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এতে সায়েন অস্বস্তি বোধ করছে। মোমবাতি এখনও জ্বলছে কারেন্ট আসেনি এখনও। ইতস্তত করতে করতে শেষে সায়েন বলল,’আ আপনি এখন ঠিক আছেন??’

ছেলেটা আস্তে করে বলল,’পুরোপুরি ঠিক না।’
ছেলেটার মধুর কন্ঠ শুনে শিহরণ বয়ে গেল সায়েনের শরীর জুড়ে। এতো সুন্দর কন্ঠ কারো হয়?? আচ্ছা ছেলেটা মানুষ তো??নাকি অন্যজগতের কেউ??সায়েন কোথায় যেন শুনেছে যে, সবচেয়ে সুন্দর হয় তারাই যারা অন্যজগতের মানুষ। মানে জ্বিন অথবা পরী। এই ছেলেটাও কি সেইরকম কিছু??সায়েন অপলক চোখে তাকিয়ে ভাবছে। ছেলেটা বলে উঠলো,’এক্সকিউজ মি কি হলো??’
ছেলেটার কথায় কেঁপে উঠলো সায়েন। সে বলল,’আপনার নাম কি??বাসা কোথায়??’

ছেলেটা ঠোঁট উল্টে বলল,’জানি না মনে পড়ছে না।’
সায়েন অবাক হয়ে গেল বলল,’কি??মনে পড়ছে না মানে কি??’

ছেলেটা সহজ ভাবে বলল,’মনে পড়ছে না মানে মনে পড়ছে না। আমার কিছু মনে পড়ছে না।’
সায়েন চট করে দাঁড়িয়ে পড়লো বলল, ‘ইয়ারকি পেয়েছেন নাকি??রাত দুপুরে মজা করছেন আমার সাথে??’

‘বিশ্বাস করুন আমার সত্যি কিছু মনে পরছে না। বোধহয় আমার মেমোরি লস হয়েছে!!’

ছেলেটার এরকম কথায় সায়েন চোখ বড়বড় করে তাকালো। রোগী নিজেই বলছে তার মেমোরি লস হয়েছে। এই প্রথম শুনলো সে।অবাক হয়ে বলল,’অদ্ভুত তো?? আপনার মেমোরি লস হয়েছে আপনি কিভাবে জানলেন??এটা কি বাংলা সিনেমা পেয়েছেন নাকি??যে গাছের সাথে ধাক্কা লেগে স্মৃতি হারিয়ে গেছে।’

ছেলেটা ইনোসেন্ট ফেসে বলল,’আমার তো গাছের সাথে ধাক্কা লাগেনি। আমার মাথায় কেউ জোরে আঘাত করেছে যার ফলে আমার মেমোরি লস হয়েছে। আমি এখন কিছু মনে করতে পারছি না।’

সায়েন কটমট করে তাকিয়ে বলল,’আপনার মেমোরি লস হোক বা না হোক তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমার বাড়ি থেকে বের হন এখুনি।’

ছেলেটা মুখটা কাঁদো কাঁদো করে বলল, ‘এরকম করছেন কেন??এই বৃষ্টির মধ্যে আমি কোথায় যাব?? আমাকে এখানে কয়েকদিন থাকতে দিন। আমি তো অসুস্থ। একটু সুস্থ হই তারপর না হয় চলে যাব। আমার মতো অবলা পুরুষ কে তাড়িয়ে দিতে আপনার বিবেকে বাঁধছে না??’

সায়েন অবাকের চরম সীমান্তে পৌঁছে গেছে। অবলা নারী হয় কিন্তু অবলা পুরুষ ও যে হয় তা সে আজ শুনলো। কিন্তু ছেলেটার অসহায় মুখ দেখে মায়াও হচ্ছে। সে বলল,’কিন্তু আপনাকে তো এখানে রাখা অসম্ভব। মা বাবা খালামনির বাসায় গেছে। তাই আপনি এখন ও এখানে আছেন। ওরা এসে পড়লে আপনাকে তো বের করবেই সাথে আমাকেও বাড়ি ছাড়া হতে হবে। আপনি আমার মা’কে চেনেন না।’

ছেলেটা অনুরোধ করে বলল,’প্লিজ। আমাকে কোথাও লুকিয়ে রাখেন তবুও আমাকে তাড়িয়ে দিয়েন না।’

‘উফফ কি করি এখন?? আপনার সত্যি নিজের নাম ঠিকানা বাবা মা কারো কথা মনে নেই???’

ছেলেটা ঘাড় নেড়ে বলল,’নাহ মনে নেই।’

সায়েন ফোনটা হাতে নিয়ে বলল,’ওকে আমি আপনার ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে দিচ্ছি। দেখবেন কালকের মধ্যে আপনার পরিবারের সবাইকে খুঁজে পাবেন।’

ছেলেটা মৃদু চিৎকার করে বলল, ‘নাআআআ’

সায়েন মুখে আঙ্গুল দিয়ে বলল,’হুসসস চিৎকার করবেন না। পাশের রুমে ভাইয়া আছে। সে যদি জানতে পারে যে একটা অচেনা ছেলে তার বোনের রুমে আছে তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।’

ছেলেটা মুখে আঙ্গুল দিয়ে মাথা নেড়ে চুপ হয়ে গেল। সায়েন বলল,’আপনার ছবি ফেসবুকে দিবো না কেন??’ বলেই সায়েন ভ্রুকুটি করে ছেলেটার দিকে তাকালো। ছেলেটা অসহায় হয়ে বলল,’দেখুন সত্যি আমার কিছু মনে নেই। শুধু এটুকু মনে আছে যে কতগুলো গুন্ডা আমাকে এটাক করেছিল। তাদের সাথে আমি পেরে উঠিনি। তাই ওরা আমার এই অবস্থা করেছে। আর কিছু মনে নেই আমার। আপনি যদি আমার ছবি ফেসবুকে দেন তো গুন্ডাগুলো আমার খোঁজ তাড়াতাড়ি পেয়ে যাবে তার সাথে আপনার উপর ও এটাক করবে। এই বাড়িতে ও চলে আসতে পারে। আমি চাই না আমার জন্য আপনার ক্ষতি হোক!!তাই বলছি আমাকে কয়েকদিন থাকতে দিন।একটু সুস্থ হলেই আমার সব মনে পড়ে যাবে। তারপর না হয় চলে যাবো!!!’

ছেলেটা ধীরে ধীরে কথাগুলো বলল। সায়েন মাথা চুলকে ভাবতে লাগলো যে কথাগুলো তো সত্যি। ওই গুন্ডাগুলো যদি ওর উপর এটাক করে!!! ভাবতেই গলা শুকিয়ে আসে সায়েনের। পুলিশ গুন্ডা সে খুব ভয় পায়। আর তাছাড়া ওর বাবা মা ভাইয়ের যদি কোন ক্ষতি হয় তখন কি হবে??কিন্তু এই ছেলেটাকে এই বাড়িতে রাখাটা রিক্সের ব্যাপার। মা তো কিছুতেই এখানে রাখবে না ছেলেটাকে। আর বাবা তো মায়ের কথায় ওঠে বসে। শাফিন তো শাফিনই। সায়েন ঠোঁট কামড়ে ভাবতে লাগলো কি করা যায়??সায়েনকে এভাবে চিন্তিত হতে দেখে ঠোঁট চেপে হাসলো ছেলেটা। সায়েন বলল, ‘ঠিকই বলেছেন। কিন্তু আপনাকে আমার বাড়িতে কিভাবে রাখব?? আমার মা থাকতেই দেবে না। আমি মা’কে খুব ভয় পাই। শুধু আমি না ভাইয়া আর বাবাও। আমার মা আপনাকে এখানে থাকতে দেবে না।’

ছেলেটা কিছু একটা ভেবে বলল,’আমি বরং আপনার খাটের তলায় লুকিয়ে থাকব।’

সায়েন মাথা নাড়িয়ে বলল,’সেটা অসম্ভব। কারণ মা প্রতিদিন আমার খাটের তলা ঝাড়ু দেয়। আর আমার রুমটা তত বড় নয় যে আপনাকে কোথাও লুকিয়ে রাখব।’

‘আপনাদের এত বড় বাড়িতে কি এমন কোন জায়গা নেই যেখানে আমাকে লুকিয়ে রাখা যায়??’

সায়েন কিছুক্ষণ ভাবলো। তারপর হঠাৎ করেই ওর কিছু একটা মনে পড়লো। সে বলল,’আছে। একটা জায়গা আছে যেখানে আপনি থাকলে কেউ বুঝতে পারবে না।’

ছেলেটার মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে বলল,’কোথায়??’

‘আমাদের ছাদে একটা চিলেকোঠার ঘর আছে। সেখানে আপনি থাকলে কেউ সন্দেহ করবে না।’

‘কেন??ছাদে কি কেউ যায় না??’

‘নাহ। আসলে ছোটবেলায় আমার ভাইয়া ছাদ থেকে পড়ে গিয়েছিল। ভাগ্য ভাল যে আমাদের বাড়ি ঘেঁষে একটা পেয়ারা গাছ ছিল সেটার সাথেই আটকে ছিল ভাইয়া। তাই হাত পা ভাঙা থেকে বেঁচে গেছে। তারপর থেকে বছরের পর বছর ধরে ছাদ সহ চিলেকোঠার ঘরও বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। কেউ ছাদে জামাকাপড় ও মেলতে যায় না। আমাদের বাড়ির সামনে যে উঠোন আছে সেখানে জামাকাপড় মেলে।’

ছেলেটা মাথা নাড়িয়ে বলে,’বুঝলাম। তাহলে আমি ওখানেই থাকব।’

সায়েন মুখটা কাচুমাচু করে বলল,’তাহলে আপনি এখানে থাকুন আমি চিলেকোঠার ঘরটাকে মানুষ করে রেখে আসি।’

ছেলেটা টেবিলে থাকা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,’এখন রাত দুটো বাজে। এতো রাতে যাবেন??’

সায়েন মুখ বাঁকিয়ে বললো,’তাছাড়া কোন উপায় নেই। সকালের আলো ফোটার আগেই আপনাকে চিলেকোঠার ঘরে যেতে হবে। আপনি থাকুন আমি যাই।’
সায়েন বেরিয়ে যেতেই ছেলেটা হাসলো। তারপর পকেট থেকে ফোনটা বের করলো। ফোনটা এখনও ঠিক আছে। শুধু ফোনের গ্লাস ফেটে গেছে। সে তাড়াতাড়ি করে কাউকে ফোন করলো। ফোন রিসিভ হতেই বলল, ‘কিছু লোক আমার উপর এটাক করেছিল। তাড়াতাড়ি খবর নে কে বা কারা এসব করেছে।’

অপর পাশ থেকে কেউ কিছু বলল। ছেলেটা চটপট কিছু কথা বলে ফোনটা পকেটে পুরে রাখলো। সায়েনকে তার বোকা বোকা লাগছে। নাহলে এত তাড়াতাড়ি ছেলেটার কথাগুলো বিশ্বাস করে নিলো??এই ভেবে সে হাসলো। তবে সায়েনের চান্ঞ্চল্যতা ছেলেটাকে মুগ্ধ করেছে। সে ঠিক করেছে এখানেই সে থাকবে কিছুদিন। তার কাজ না হওয়া পর্যন্ত এখানে থাকতে হবে। সায়েনকে বোকা পেয়ে সে মানিয়ে নিয়েছে।

ঘড়ির কাঁটা সাড়ে তিনটার দিকে। সায়েন ফিরছে না দেখে ছেলেটা উঁকি দিচ্ছে দরজার দিকে। কিন্তু দরজা বাইরে থেকে বন্ধ। কারেন্ট আসার নাম গন্ধ নেই এখনও। কিছুক্ষণ পরে সায়েন ফিরলো। সায়েনকে দেখে সে বলে উঠলো,’কি করলেন??’

সায়েন হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,’অনেক কিছু। আপনার জন্য এই রাত বিরতে ধুলো ময়লা মাখতে হয়েছে আমাকে।’ কথাগুলো বলতে বলতে জামাকাপড় ঝাড়লো সায়েন। তারপর ছেলেটার দিকে এগিয়ে এসে বলল,’চলুন চিলেকোঠার ঘরে। হাঁটতে পারবেন তো!!’

ছেলেটা খাটের উপর থেকে পা নামিয়ে দিলো মেঝেতে তারপর বলল,’আমাকে একটু সাহায্য করুন তাহলে পারব।’

সায়েন ছেলেটার হাত ধরে আস্তে আস্তে ছাদে নিয়ে গেলো। চিলেকোঠার ঘর দেখে ছেলেটা অবাক। এরকম ঘরে মানুষ কেন কোন জংলি পশুও থাকবে না। কিন্তু আফসোস এখন তাকে এখানে থাকতেই হবে। সায়েন পুরো ঘরটা পরিস্কার করতে পারেনি। এতো সময় তার নেই। শুধু মেঝে পরিষ্কার করে সেখানে তোশক বিছিয়েছে। ছেলেটাকে তোশকের উপর বসিয়ে দিয়ে বলল,’এখন থেকে এখানেই থাকবেন। ভুলেও বের হবেন না। অবশ্য আমি বাইরে থেকে দরজা আটকে দিয়ে যাব। ছাদের দরজায় তালা দেওয়া থাকবে।’
ছেলেটা শুধু সায়েনের কথা শুনলো কিন্তু কিছু বলল না। সায়েন ফিরে যেতে নিয়ে আবার ঘুরে তাকিয়ে বলে,’এই যে শুনুন। ধ্যাত এসব কি বলছি!! আপনার নামটা মনে করার চেষ্টা করুন না??’

ছেলেটা আবার ঠোঁট উল্টে জবাব দেয়,’সত্যি আমার নামটাও মনে পড়ছে না। আপনি একটা নাম ঠিক করে দিন। তাহলেই হবে।’

‘বয়েই গেছে আপনার নাম ঠিক করতে। আপনার চক্করে পড়ে আমি নিজের নাম ভুলতে বসেছি। নিজের নাম নিজে ঠিক করে নিন। আর হ্যা কিছুর দরকার হলে আমাকে ডাকবেন।’

‘কিন্তু কিভাবে ডাকব?? আপনার মা বাবা ভাই তো বাসায় থাকবে সবসময়।’

সায়েন মাথা চুলকে বলল,’তাই তো!!এক কাজ করুন। যখন আপনার কিছু প্রয়োজন হবে তখন কোকিলের কন্ঠে ডাকবেন। তাহলেই আমি যেকোন উপায়ে চলে আসব। কেমন??’
ছেলেটা মাথা দোলাতেই সায়েন বের হয়ে যায়। দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে যায়। আর ছাদের দরজায় তালা মেরে চাবি কঙ্খিত স্থানে রেখে জামাকাপড় পাল্টে ঘুমিয়ে পড়লো। কিন্তু একটা ভয় মনে গেথেই রয়েছে সায়েনের। একে তো মায়ের ভয় দ্বিতীয়ত ছেলেটার প্রতি মায়া। এসব ভাবতে ভাবতে সায়েন ঘুমিয়ে পড়ে।

সকালে দেরিতে ঘুম ভাঙে সায়েনের। শাফিন এসে টেনে না তুললে সায়েনের ঘুম ভাঙত না। দেরি করে ঘুমানোর জন্য এসব হয়েছে। ফ্রেশ হয়ে বাইরে আসতেই দেখলো বাবা টেবিলে বসে খাচ্ছে। সায়েন চোখ বড়বড় করে তাকালো। তারমানে ওর বাবা মা এসে গেছে!! এবার তো কিচ্ছা খতম। ধরা পড়লেই শেষ। ওদিকে ছেলেটা চিলেকোঠার ঘরে কি করছে কে জানে??মা রান্না ঘর থেকে পরোটা নিয়ে এসে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো সায়েনের দিকে। সায়েন কয়েকটা ঢোক গিলে মেকি হাসি দিলো। জয়নব বেগম গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,’এতো দেরি হলো কেন ঘুম থেকে উঠতে??’

‘আসলে বৃষ্টি পড়েছিল তো তাই ঘুমটা একটু বেশি হয়ে গেছে। এরপর থেকে আর হবে না প্রমিস।’

বলতে বলতে সায়েন পরোটা ছিঁড়ে মুখে দিলো। কিন্তু চিবুতে পারলো না। কারণ কোকিলের কন্ঠে কুহু কুহু করে কেউ ডাকছে। সায়েন তব্দা মেরে বসে রইল।
#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_২

জানালা দিয়ে দূরের দশতলা ভবনের দিকে তাকিয়ে আছে সায়েন। সময়টা তার পার হচ্ছে না যেন। তাই সে ভবনের দিকে তাকিয়ে আছে। শাফিন সকালেই ভার্সিটি চলে গেছে। ক্লাস করে সেখান থেকে অফিসে যাবে। সায়েনের বাবা শফিকুল ইসলাম তার চেম্বারে চলে গেছে। এখন বাকি সায়েনের মা জয়নব বেগম। তিনি একটু পর বাজারে যাবেন। সেই ফাঁকে সায়েন ছাদে চলে যাবে। পেট ব্যাথার দোহাই দিয়ে আজকে কলেজে যায়নি সায়েন। রুমের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে আছে।
আর বাইরের সব কিছু দেখছে। ওদের বাড়ির চারপাশে বড়বড় সব ভবন। শুধু ওদের বাড়িটাই একতলা। এটা শফিকুল ইসলামের নিজস্ব বাড়ি। বউ আর দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে তার ছোট্ট পরিবার।
সায়েন আস্তে করে দরজা খুলে উঁকি দিলো। জয়নব বেগমকে আশেপাশে দেখতে না পেয়ে তার রুমে গিয়ে উঁকি দিলো। জয়নব বেগম রেডি হচ্ছেন বাইরে যাওয়ার জন্য। সায়েন দ্রুত নিজের রুমে এসে শুয়ে পড়লো। কারণ এখনই মা আসবে ওকে দেখতে। তাই হলো, জয়নব বেগম সায়েনের রুমে এসে বললেন, ‘সায়ু আমি বাজারে যাচ্ছি। দরজা বন্ধ করে দে!!আর চুপচাপ শুয়ে থাকবি। আমি আসার সময় তোর বাবার কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে আসবো।’
সায়েন অসুস্থতার ভান করে মাথা নাড়লো। জয়নব বেগম বেরিয়ে যেতেই সায়েন দরজা বন্ধ করে দিয়ে ছুটলো মায়ের রুমে। ছাদের চাবি নিয়ে দৌড়ে চলে গেল। চিলেকোঠার ঘরের দরজা খুলতেই চোখ কপালে সায়েনের। ছেলেটা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। চোখেমুখে চিন্তার ছাপ। সায়েন দ্রুত ছেলেটার পাশে বসে বলল,’কি হয়েছে আপনার??মাথা ব্যথা করছে??অসুস্থ লাগছে??কিছু লাগবে??’
সায়েনের কথা শুনে ছেলেটা চোখ তুলে তাকিয়ে বলল,’অনেক কিছু হয়েছে। আগে আমি ওয়াশরুমে যাব। অনেক এমার্জেন্সি।’

সায়েন তড়িঘড়ি করে দাঁড়িয়ে ছেলেটাকে নিয়ে নিচে নামলো। নিজের বাথরুমে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে অপেক্ষা করতে লাগলো।

তখন খাওয়ার সময় কোকিলের ডাক শুনে সায়েনের খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। কারণ ছেলেটা যে তাকে ডাকছে। কিন্তু সে যেতে পারছে না। শফিকুল ইসলাম অবাক হয়ে বললেন,’এই অবেলায় কোকিল কোথা থেকে আসলো??আর এখন তো নভেম্বরের শুরু। শীত কালের পর বসন্ত কাল। তখন কোকিল ডাকবে। কিন্তু এখন কোকিল ডাকছে কেন??’

সায়েনের তো হাত পা কাপাকাপি শুরু হয়েছে। মা রান্নাঘরে তাই সে কিছু শোনেনি।সায়েন কম্পিত কন্ঠে বলল,’ক কে বলেছে যে ক কোকিল শুধু বসন্ত কালে ডাকে??অন্য ঋতুতে কি সে ডাকতে পারে না নাকি??ভুল ভাবছো তুমি। তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করো। নাহলে মা এসে যদি দেখে তাহলে জোর করে খাওয়াবে।’
শফিকুল ইসলাম মাথা নেড়ে বললেন,’ওহ হ্যা আমার তো আবার চেম্বারে যেতে হবে।’
তিনি আর কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না। খাওয়া শেষে চলে গেলেন। সায়েনও যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। কিন্তু তারপর আর সে কোকিলের কন্ঠে ডাকেনি। এতে সায়েন প্রশান্তির শ্বাস ফেললো।

দরজা খোলার শব্দ অতীত থেকে ফিরে আসে সায়েন। ছেলেটা এলোমেলো পায়ে হেঁটে এসে খাটের উপর টানটান হয়ে শুয়ে পড়লো। সায়েন চকিতে তাকিয়ে বলল,’একি!!!কি করছেন?? শুয়ে পড়লেন কেন?? আমার মা একটু পরেই এসে পরবে। তাড়াতাড়ি চিলেকোঠার ঘরে ফিরে যান।’

ছেলেটা খুবই ক্লান্ত। সে ঘাড় ঘুরিয়ে ক্লান্ত দৃষ্টিতে সায়েনের দিকে তাকিয়ে বলল,’ওই ঘরে কি মানুষ থাকে??’

সায়েন অকপটে জবাব দিলো,’আগে থাকতো না তবে এখন থাকে। আর সেটা হলো আপনি।’
ছেলেটা সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি ওখানে থাকবো কিভাবে??দম বন্ধ হয়ে আসে আমার। এখানে কিছুক্ষণ থাকি না??’

‘এই না না। মা এখুনি চলে আসবে। উঠুন উঠুন। এই যে শুনছেন??’

ছেলেটা উঠে বসে বলল,’আমি আমার জন্য একটা নাম ঠিক করেছি।’
সায়েন চোখ কুঁচকে তাকালো। ছেলেটা ঠোঁটের কোণে স্নিগ্ধ হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘আরাদ!!কেমন হয়েছে নামটা।’

টেনশনের মধ্যে থেকেও সায়েন হেসে ফেললো। কারণ ছেলেটার হাসিটাও মন কাড়ার মতো। আপাতত এসব চিন্তাভাবনা সাইডে রেখে বলল,’খুব সুন্দর নাম রেখেছেন। তো মিস্টার আরাদ আপনি চিলেকোঠার ঘরে ফিরে যান নয়তো আমি শেষ।’

আরাদ অস্থির হয়ে বলল,’কিন্তু আমার খিদে পেয়েছে। কাল থেকে কিছু খাইনি।’

‘ওহ!!ওয়েট আমি খাবার আনছি।’ সায়েন রান্নাঘরে গিয়ে দুটো রুটি আর ভাজি আনলো। সাথে একটা ডিম ভেজে আনলো।এসব দেখে আরাদ মুখ কুঁচকে নিলো। কারণ সে এসব খাবার খায় না। ব্রেড ডিম বা স্ন্যাক্স জাতীয় খাবার খায়। কিন্তু কিছু করার নেই। সে খেতে লাগল। সামনেই সায়েন গালে হাত দিয়ে বসে আরাদের খাওয়া দেখতেছে। আরাদ খেতে খেতে সায়েনের দিকে তাকিয়ে বলল,’আপনার সম্পর্কে তো কিছুই জানলাম না। নাম কি আপনার??কিসে পড়েন??’

আরাদের কথায় সায়েন কিন্ঞ্চিৎ হাসলো। কিছুক্ষণ মেঝের দিকে তাকিয়ে থেকে আবার আরাদের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো, ‘আমার নাম সানজিদা ইসলাম সায়েন। ইন্টার দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি। বাবা মা আর ভাইয়ার সাথে এখানেই থাকি।’
আরাদ টেবিলে থাকা পানির গ্লাস নিয়ে পানি খেয়ে শব্দ করে গ্লাসটা রেখে বলল,’ডক্টর হওয়ার ইচ্ছা???’
আরাদের কথায় ভ্রু জোড়া কুঁচকে এলো সায়েনের। সে বলল,’হঠাৎ এই প্রশ্ন??’

আরাদ খানিকটা হেসে বলল,’না মানে আমার হাত পা মাথায় যেভাবে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছেন তাই বললাম। একজন ডক্টরের থেকেও ভালো ব্যান্ডেজ করেছেন। তাই জিজ্ঞেস করলাম।’
সায়েন বড় একটা দম ফেললো। খাটের উপর থেকে বালিশটা নিয়ে কোলের উপর রেখে বলল,’ডক্টর হওয়ার কোন ইচ্ছা আমার ছিল না। আমার বাবা একজন ডক্টর। সামনের বাজারে একটা ফার্মেসির দোকান আছে বাবার। সেখান থেকেই চিকিৎসা করেন। বলতে পারেন ছোটখাটো ডক্টর। তাই আমি ডাক্তারির টুকিটাকি কাজ পারি ওই আরকি।’

আরাদ আবার বলল,’ওহ!!ডক্টর হওয়ার ইচ্ছা নেই। তাহলে কি হতে চান??’

সায়েন আবার হাসলো আরাদের কথায়। তারপর বলল,’আমি ভবিষ্যৎ এ কি হবো তা আমি ঠিক করতে পারব না। সেটা সম্পূর্ণ আমার মায়ের উপর ডিপেন্ড করে। মা চায় আমি সাইকোলজিস্ট হই। আমি তাই করছি। কিন্তু আমার ইচ্ছা আমি ফ্যাশন ডিজাইনার হবো। ছোটবেলা থেকে এটাই ইচ্ছে ছিল। কিন্তু মায়ের মুখের উপর কথা বলার সাহস আমার নেই। এমনকি ভাইয়ার ও নেই। ভাইয়া একজন ফটোগ্রাফার হতে চায়। ফটোগ্রাফি খুব পছন্দ করে ভাইয়া। কিন্তু মায়ের এক কথা ভাইয়া পড়াশোনা শেষ করে যেন ব্যাংকে চাকরি নেয়। তবে আপাতত ভাইয়া একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে। পনের হাজার টাকা বেতন পায়। সাথে পড়াশোনাও কন্টিনিউ করছে।’

সায়েনের কথায় বড়সড় ধাক্কা খায় আরাদ। এটা কেমন পরিবার??মায়ের কথায় সবাই ওঠে বসে!!!তাহলে ওর মা নিশ্চয়ই জল্লাদ প্রকৃতির হবে। আরাদ বিড়বিড় করে বলে,’কি মা?? আমার বাড়িতে তো আমার মুখের উপর একটা পাখিও কথা বলতে পারে না।’

সায়েন একটু ঝুঁকে বলল,’কিছু বললেন??’

‘নাহ!!!অদ্ভুত পরিবার আপনার। আচ্ছা চলুন আমাকে ওই ঘরে দিয়ে আসুন। কষ্ট হলেও থাকতে হবে।’

আরাদ উঠে দাঁড়ালো সাথে সায়েন ও। আরাদ বলল,’আচ্ছা আপনি তো আমার ছোট। দেখতেই বোঝা যাচ্ছে। তুমি করে বলতে পারব তো??’
সায়েন মাথা ঝাঁকিয়ে বলে,’হুম।’

‘আর কখন দেখা করবে আমার সাথে??’

‘দিনে সময় হবে না। রাতে দেখা করব সবাই ঘুমিয়ে পড়লে।’
আরাদের চোখে বিষ্ময় নেমে এলো। অবাক হয়ে সে বলল,’এতোক্ষন আমি একা থাকব?? আমার যদি এমার্জেন্সি কল আসে তখন কি করব??’
আরাদের কথায় লজ্জা পেলেও হেসে ফেললো সায়েন। এই ছেলের দেখি লজ্জা শরম কম। সায়েন হাসি থামিয়ে বললো,’নাম্বার এক হলে ছাদেই কাজ চালিয়েন। আর নাম্বার দুই হলে কোকিলের সুর ধইরেন তাহলেই হবে। আর হ্যা দুইবারের বেশি ডাকবেন না। আর দিনের বেলায় ছাদে হাঁটাহাঁটি করবেন না। আশেপাশের বিল্ডিং গুলোর কাকিরা সব সিসি ক্যামেরা। খবর ছড়াতে এক সেকেন্ড টাইম নেবে না।’

আরাদ মাথা দোলায়। পরক্ষণেই কিছু মনে পড়তেই সে বলে,’চিলেকোঠার ঘরে খুব মশা। কাল রাতে তো মশা মারতে মারতে আমার জান শেষ।’
‘আচ্ছা আমি কয়েল দিয়ে আসব। এখন তাড়াতাড়ি যান।’
আরাদ চিলেকোঠার ঘরে ঢুকতেই সায়েন দরজা ভেজিয়ে দিল। তাড়াতাড়ি ছাদের দরজায় তালা মেরে চাবি মায়ের রুমে রেখে এলো। বিছানায় বসে বসে ভাবছে পরবর্তীতে কিভাবে ছাদে যাবে সে??এমন একটা ব্যবস্থা করতে হবে যাতে ছাদে গেলে ওর মা কিছু না বলে। কিন্তু কিভাবে যাবে??মেজাজ টাই গরম হয়ে গেল সায়েনের। খাটের উপর বসে সে আরাদের কথা ভাবতে লাগলো।

কলিং বেলের শব্দে হুড়মুড়িয়ে দরজা খুলে দিল সায়েন। বাজারের ব্যাগ ভর্তি করে এসেছেন জয়নব বেগম। সায়েন মায়ের থেকে ব্যাগ নিয়ে রান্নাঘরে রাখলো। একগ্লাস পানি নিয়ে সে মা’কে দিলো। জয়নব বেগম পানি খেয়ে জোরে শ্বাস ফেলে বললেন,’মানুষের গলা হচ্ছে গাছের মতো। পানি দিলে ভিজে যায়। কিছুক্ষণ পর আবার শুকিয়ে যায়।’

মায়ের কথা শুনে সায়েন হাসলো। হঠাৎ মনে পড়ল গাছ!!হ্যা একমাত্র গাছই পারবে ছাদে যাওয়ার পথ বেছে দিতে। কিন্তু এখন গাছ কোথায় পাবে সায়েন??হাতে তো তেমন টাকাও নেই গাছ কেনার!! কিছু একটা ভাবতে ভাবতে সায়েন রুমে চলে গেল।

আজ সারাদিন রুম থেকে বের হতে পারলো না সায়েন। কারণ মা’কে তো দেখাতে হবে যে সে অসুস্থ। তাই সুস্থ হয়েও অসুস্থতার অভিনয় করতে হচ্ছে তাকে। সারাদিন কেটে গেল কিন্তু সায়েন আরাদের কাছে একটুও যেতে পারলো না। মা’কে উপেক্ষা করে যেতে সে পারবেই না। জয়নব বেগমের চক্ষু জোড়া সিআইডি ফেল। তাই সারাদিন ছটফট করে কাটিয়ে দিল সায়েন। রাত হতে ছটফটানি আরো বেড়ে গেল। কারণ আরাদ সারাদিন না খেয়ে আছে। এইভেবে সায়েন ও কিছু মুখে তুলতে পারলো না। অসুস্থের অজুহাত দিয়ে খেল না সে।
রাত সাতটার পরে শাফিন আসলো। নিজের রুমে শুয়ে শুয়ে সে ফোন চালাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সায়েন মায়ের রুমে উঁকি দিলো। জয়নব বেগম ব্লাউজ সেলাই করছে। খুশি হয়ে সায়েন শাফিনের রুমে গেল। শাফিন সায়েনকে দেখেও না দেখার ভান করে ফোন টিপতে ব্যস্ত। সায়েন গলা খাঁকারি দিয়ে উঠলো। শাফিন বিরক্ত হয়ে সায়েনের দিকে তাকিয়ে বলল,’কি হয়েছে কিছু বলবি??’
সায়েন দাঁত বের করে হেসে বলল,’টাকা লাগবে!!!’

শাফিন ওয়ালেট থেকে একশ টাকার নোট বের করে দিয়ে বলে,’এই নে!!!’
সায়েন টাকাটা হাতে নিয়ে বলে,’উহু একশ টাকায় কিছু হবে না। আমার এক হাজার টাকা লাগবে।’
সায়েনের এমাউন্ট শুনে বড়বড় চোখে তাকিয়ে শাফিন বলল,’এতো টাকা দিয়ে কি করবি তুই??’
সায়েন কটমট করে শাফিনের দিকে তাকিয়ে বলে,’সেটা দিয়ে তুই কি করবি?? আমার কাছে কৈফিয়ত চাইছিস কোন সাহসে??’

শাফিন গলা ঝেড়ে বলে,’আমি এতো টাকা দিতে পারব না। একশ টাকা নিলে নে না নিলে ভাগ এখান থেকে।’
সায়েন একশো টাকার নোট ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,’ওহ আচ্ছা?? তাহলে ফুচকা খাওয়ার ছবিটা কি মা’কে দেখাবো নাকি??’

শাফিন ফোন ফেলে সোজা হয়ে বসে বলল, ‘দেখ বোন আমার এরকম করিস না। আমার কাছে এতো টাকা নেই।’

সায়েন ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শাফিন উপায় না পেয়ে একহাজার টাকার চকচকে নোট বের করে সায়েনের হাতে দিল। সায়েন টাকাটা নিয়ে বলল,’থ্যাঙ্কস শাফিন ইসলাম।’
শাফিন মুখটা গোমড়া করে বেলে,’এখন ওই একশো টাকা দে??’

সায়েন মুখ বাঁকিয়ে বললো,’সরি!! এতক্ষণ ধরে আমার সাথে বেয়াদবি করার জন্য একশ টাকা জরিমানা করা হয়েছে তোকে। আসি হ্যা??’
সায়েন দুষ্টু হাসি দিয়ে নাচতে নাচতে চলে গেছে। শাফিন কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে বলে উঠলো,’এমন বোন থাকলে শত্রুর দরকার হয় না। কোথায় ভাইকে হেল্প করবে তা না করে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা নেয়।’
রাগে গজগজ করতে করতে শাফিন ফোন হাতে নিলো। দুমাস আগে গার্লফ্রেন্ড এর সাথে ফুচকা খাওয়ার সময় সায়েন দেখে ফেলেছিল। শুধু দেখেনি বরং কয়েকটা ছবি তুলে রেখেছে। এখন সেটা নিয়েই রাতদিন ব্ল্যাকমেইল করে বেড়ায়।আগে কথায় কথায় সায়েনের মাথায় চাটি মারতো কিন্তু এখন সায়েন মারে। এই দুঃখ শাফিন কোথায় লুকাবে??

সায়েন টাকা নিয়ে নিজের রুমে চলে গেল। এগারো শত টাকা পেয়ে সে খুব খুশি। একশ টাকা দিয়ে সে চকলেট কিনবে আর একহাজ টাকার গাছ কিনবে। ব্যাস হয়ে গেল হিসাব। খুশিতে নাচতে ইচ্ছে করছে সায়েনের।

গভীর রাত। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। সায়েন প্লেটে খাবার বেড়ে ঢেকে নিলো। পানির বোতল হাতে নিয়ে আস্তে আস্তে ছাদে গেল। খুব সাবধানে দরজা খুলে এগিয়ে গেল চিলেকোঠার ঘরে। দরজার ঠকঠক আওয়াজ শুনে তড়িঘড়ি করে ফোনটা লুকিয়ে ফেলে আরাদ। সে বুঝতে পারে যে সায়েন এসেছে। সায়েন নিঃশব্দে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো। আরাদ পা ভাঁজ করে মেঝেতে বসে আছে। সায়েন খাবারের প্লেট আর পানির বোতল তোশকের উপর রেখে বলল,’কোন সমস্যা হয়েছে??এমার্জেন্সি কল??’

আরাদ মুচকি হাসলো। চিলেকোঠার ঘরে কোন আলো নেই। সায়েনের ফোনের ফ্লাশ অন করা। সেই আলোতে আরাদের মুচকি হাসি দেখে আরেকদফা ক্রাশ খেলো সায়েন। আরাদ বলল,’নাহ!! আপনার কথামত ছাদেই কাজ সেরেছি।’

সায়েন নাক কুঁচকে বলল,’ইয়াক থু। আচ্ছা আপনি ছাদে বের হয়েছিলেন কেন??কেউ দেখেনি তো???”
আরাদ মাথা নেড়ে বলল,’সন্ধ্যার পর বের হয়েছিলাম। সারাদিন কিছু খাইনি তাই এমার্জেন্সি কল আসবে কিভাবে বলো??’

সায়েন আবার লজ্জা পেল। মাথা নুইয়ে বলল,’মেমোরি লস হয়ে আপনার লজ্জা শরম সব ডুবে গেছে দেখছি। তাড়াতাড়ি খেয়ে নিন। আমি রুমে চলে যাব।’

কিছু একটা ভেবে সায়েন আরাদের কপালে হাত দিয়ে শিউরে উঠে বলে,’একি আপনার দেখি ভিশন জ্বর। আপনি খেতে থাকুন আমি ওষুধ নিয়ে আসছি।’
সায়েন দ্রুত নিজের রুমে আসে। ওষুধ পত্র আর কয়েল নিয়ে আবার চিলেকোঠার ঘরে ফিরে যায়। ততক্ষণে আরাদের খাওয়া শেষ।সায়েন আরাদকে ওষুধ খাইয়ে দিল। তারপর বলল,’এখন ঘুমিয়ে পড়ুন। কালকে সকালে আসতে পারব কিনা জানিনা তবে আসার চেষ্টা করব। কাল কলেজ যেতে হবে। রাত ছাড়া তো এখানে আসতেও পারব না। আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে তাই না??এক বেলা খাবার পাচ্ছেন তো অন্যবেলা পাচ্ছেন না।’

আরাদ সৌজন্যমূলক হাসি দিয়ে বলল,’ইটস্ ওকে। আমার জন্য তোমাকে বিপদে পড়তে হচ্ছে। এখন যাও ঘুমিয়ে পড়ো।’
সায়েন উঠে চলে যেতে নিলে আরাদ বলে উঠলো,’ফোনে এলার্ম দিয়ে রেখো। সবাই ঘুম থেকে ওঠার আগে আমাকে একবার ওয়াশরুম থেকে ঘুরিয়ে এনো।’

সায়েন পিছনে না ঘুরে মাথা দুলিয়ে চলে যায়। আবার সে লজ্জায় পড়েছে। ছেলেটা কি ওয়াশরুম ছাড়া কিছুই বোঝে না। পরক্ষণে মনে পড়লো যে দৈনন্দিন জীবনে ওয়াশরুমে যাওয়াটা প্রয়োজন। সায়েন দরজায় তালা মেরে আবার রুমে ফিরে যায়। আরাদের জন্য ওর খুব খারাপ লাগছে। ছেলেটার এতো জ্বর অথচ ছেলেটা ওই নোংরা ঘরে থাকছে। তাছাড়া সারা শরীরে তার ক্ষত। মুখটা গোমড়া করে ঘুমিয়ে পড়ে সায়েন।

ভোর চারটার এলার্ম দিয়ে রেখেছিল সায়েন। যদিও এতো সকালে ওঠার অভ্যাস নেই তবুও উঠতে হলো। আস্তে আস্তে সে চিলেকোঠার ঘরে গিয়ে আরাদকে ডেকে তুলল। তখনও চারিদিকে অন্ধকার। আরাদ ঘুমে বিভর ছিল। সায়েন ডাকতেই সে উঠে পড়লো। ওয়াশরুম থেকে ঘুরে এসে মেঝেতে বসতেই ফোনটা কেঁপে উঠলো। আরাদ ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কেউ বলে ওঠে,’ভাইরে ভাই, তোর লাইগা দুইদিন খাওয়া দাওয়া ঘুম সব ফেলে দৌড়াদৌড়ি করছি। এখন সব কটাকে ধরে আনছি। এখন কি করবি কর!!আর তুই কোথায় এখন??’

আরাদ হেসে জবাব দিল,’ছোট্ট একটা রাজ্যের রাজকন্যার প্রেমের জালে ফেসে গেছি। তাই শাস্তিস্বরূপ রাজকন্যা আমাকে তার চিলেকোঠার ঘরে বন্দি করে রেখেছে। আমি এখন সেখানেই আছি।’

ওপাশ থেকে ছেলেটা বলল,’আরাদ তুই ঠিক আছিস ভাই??পাগল হয়ে গেলি নাকি??মজা করিস না?? কোথায় তুই??’

‘দেখা হচ্ছে কাল রাতে। গোডাউনে থাকিস। আমি এসে ওদের শাস্তি দেব।’
আরাদ খট করে ফোনটা কেটে দিলো। টানটান হয়ে শুয়ে চোখটা বুজে ফেলল সে। সাথে সাথে সায়েনের ঘুমন্ত মুখখানা ভেসে আসে আরাদের চোখে। চোখ বুজে থাকা অবস্থাতেই হেসে ওঠে আরাদ।

আরাদকে বিদায় দিয়ে সায়েন আবার ঘুমিয়ে পড়লো। ঘুমে যে তার পোষাচ্ছে না। আসার সময় দুই প্যাকেট কেক ও পানি দিয়ে এসেছে আরাদকে। যাতে সারাদিন সে অভুক্ত না থাকে। কিছুক্ষণ পর নরম কিছুর উপর হাত পড়লো সায়েনের।ভালোই লাগছে সায়েনের। বস্তুটাকে টেনে কাছে আনতেই হাঁচি দিলো ও। সাথে সাথে চোখ জোড়া খুলে উঠে বসে। বিড়ালটাকে দেখে সায়েনের মাথা গরম হয়ে গেল। রেগে বলল,’শফিকুলের বাচ্চা শাফিন!!তোর কালা বিলাই আবার আমার কাছে আসছে।’

সায়েন দুহাতে বিড়ালটাকে ধরে বাইরে আসতে আসতে বলল,’ভাইয়া,,,কোথায় তুই??বের হ,,’

শাফিন শার্টের হাতা ঠিক করতে করতে এসে বলল,’কি হয়েছে???’
সায়েন বিড়ালটা ছুড়ে মারে শাফিনের দিকে। শাফিন দুহাতে বিড়ালটা ধরে সায়েন রাগে কটমট করে বলে,’তোর কালা বিলাই আবার আমার রুমে গেছে কেন??জানিস না এই কালা বিলাই তে আমার এলার্জি আছে??’

‘এই ওরে কালা বিলাই বলবি না। ওর নাম সল্টু।’

‘রাখ তোর সল্টু বল্টু। মানুষ সুন্দর দেখে সাদা বিড়াল পোষে। আর তুই কালো পেত্নির মতো বিড়াল পুষছিস?? ছিঃ ছিঃ ছিঃ ছিঃ।’

শাফিন সল্টুর গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে বলল,’আমার ইচ্ছে হয়েছে তাই। সর এখান থেকে।’
শাফিন চলে যায়। সায়েন কিছু না বলে নিজের রুমে চলে গেল। রেডি হয়ে সে কলেজে গেলো। কিন্তু দিশা আসেনি তাই সায়েনের মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেছে।

বাড়ি ফেরার পথে সে অনেক গুলো ফুলগাছ কিনে আনলো। রিকশাওয়ালা কাকু গাছগুলো ওর বাড়ির দরজার সামনে রেখে গেল। সায়েনের হাতে কাঠগোলাপের চারা। দরজা খুলে জয়নব বেগম রুক্ষ দৃষ্টিতে তাকালো সায়েনের দিকে। সায়েন মুখে হাসির রেখা টেনে মায়ের দিকে তাকালো। ভাবতে লাগলো মা মানবে তো???
#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_৩

কাঠগোলাপের চারা হাতে নিয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে সায়েন। জয়নব বেগম ক্রোধ নিয়ে তাকিয়ে আছে সায়েনের দিকে। যেন কাঁচা গিলে খাবে। জয়নব বেগম কঠোর কন্ঠে বললেন,’এগুলো কি সায়ু???’

সায়েন আর চুপ করে থাকলো না ঝটপট উত্তর দিলো,’মা আমাদের মনোবিজ্ঞান স্যার বলেছেন গাছ লাগানো ভালো। প্রতিদিন গাছের যত্ন করলে নাকি মনটাও ভালো হয়। যখন গাছে গাছে রং বেরঙের ফুল ফোটে তখন সেই সৌন্দর্য উপভোগ করলে মনটা নাকি আরো ভালো হয়ে যায়। জীবনে চলার পথে তো মনটাই সব। মন ভালো তো সব ভালো। তাইতো টাকা জমিয়ে গাছগুলো কিনে আনলাম।’

স্যারের কথা শুনে জয়নব বেগম কিছু বললেন না। তিনি বললেন,’কোথায় লাগাবি এইসব গাছ??’

সায়েন আমতা আমতা করে বলল,’ইয়ে মানে ছাদে। ছাদের টবগুলো তো সেইরকমই পড়ে আছে। গাছগুলো সেখানে লাগাই মা??’

‘ছাদে লাগাবি মানে??ছাদে যাওয়া মানা তুই জানিস না??’ মায়ের গম্ভীর কন্ঠে ভয় পেলেও সায়েন দমলো না। সে বলল,’কিন্তু মা এখন তো আমি আর ছোট নেই। যে ছাদে গেলে পড়ে যাব। তাছাড়া আমি তো শুধু সকাল বিকাল গাছে পানি দেব। এছাড়া আর ছাদে যাব না প্রমিস।’

জয়নব বেগম একপ্রকার জোর করেই রাজি হলেন। তিনি গটগট করে রুমে চলে গেলেন। গাছগুলো রেখে রুমে এসে উরাধুরা নাচতে লাগলো সে। তার মা যে এতো তাড়াতাড়ি রাজি হয়ে যাবে এটা ভাবতেই পারেনি সায়েন। গোসল সেরে খাওয়া দাওয়া সেরে রেডি হয়ে নিলো সে। বিকেল হতেই ভদ্র মেয়ের মতো মায়ের থেকে ছাদের চাবি নিলো। এক এক করে সব চারাগুলো ছাদে নিয়ে আসে। সাথে এক বালতি পানি।
সায়েন ছাদের দরজা আটকিয়ে আস্তে করে চিলেকোঠার ঘরের দরজা খুলল। আরাদ নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাচ্ছে। সায়েন না তাকিয়ে থাকতে পারলো না।
‘ঘুমন্ত অবস্থায় এই ছেলেটাকে এতো মায়াবী লাগছে কেন?? ইচ্ছে করছে চিবিয়ে খেয়ে ফেলি। উফফফ বুকের ভেতর ধকধক করছে।নাহ বাবা এখন যাই।’
কথাগুলো বিড়বিড় করে বলতে বলতে বেরিয়ে আসলো সায়েন। তারপর ছাদের রেলিং ঘেঁষে গাছগুলো মাটির টবে পুঁতে দিলো। গাছে পানি দিয়ে যাওয়ার জন্য পিছনে ঘুরতেই চমকালো সায়েন। আরাদ দাঁড়িয়ে আছে। সায়েন তাড়াতাড়ি আরাদের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল চিলেকোঠার ঘরে। তারপর আস্তে করে বলল,’ছাদে গেলেন কেন?? আশেপাশের সব বিল্ডিং গুলোতে এখন ছেলেমেয়েরা আসবে। আপনাকে এই ছাদে দেখে নিলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।’

‘আমি তো তোমাকে দেখেই গেলাম। বাই দা ওয়ে তুমি হঠাৎ ছাদে এই সময়ে??’

সায়েন হেসে বলে,’অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে আপনার জন্য। গাছ লাগানোর কথা বলে ছাদে আসার পারমিশন এনেছি মায়ের কাছে থেকে।’

আরাদ টাউজারের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলে,’আমার জন্য এতকিছু!!একটা অজানা অচেনা ছেলেকে এভাবে বিশ্বাস করাটা কি ঠিক??তুমি তো আমাকে বের করে দিতেই পারো??’

সায়েন চোখ কুঁচকে তাকায় তারপর বলে, ‘দেখুন আপনাকে দেখে ভালো লোক বলেই মনে হচ্ছে। আর আপনার মেমোরি লস হয়েছে। এজন্য আপনার জন্য খারাপ লাগছে আমার তাই আপনাকে সাহায্য করছি। আপনার জায়গায় অন্য কেউ হলেও আমি সাহায্য করতাম।’

আরাদ মুখ ঘুরিয়ে বিড়বিড় করে বলল, ‘ভাগ্যিস আমি এসেছি।’

‘কিছু বললেন??’
আরাদ সায়েনের দিকে তাকিয়ে বলে,’নাহ কিছু না। দু’দিন ধরে গোসল করছি না। যদি গোসলের ব্যবস্থা করে দিতে তো ভালো হতো।’

সায়েন মাথা নাড়িয়ে বলে উঠলো,’ঠিক!!তবে আজ গোসল করতে হবে না আপনার জ্বর আছে। কালকে গোসল করবেন। এমনিতেই আপনার শার্ট প্যান্ট শুকায়নি। ভাইয়া তার গেঞ্জি টাউজার খুজতেছে। আমাকে সন্দেহ ও করেছে অনেকবার।’

আরাদ হাসলো সায়েনের কথায়। সায়েন ওর জন্য এতো পজেটিভ যে মিথ্যা বলা চুরি করা সব করছে। আরাদ বলল,’ওকে। তবে আমার ভালো লাগছে না। গোসল করলে ভালো হতো।’

‘আচ্ছা ঠিক আছে। সন্ধ্যা নামুক তারপর গোসল করিয়ে দেব। সন্ধ্যায় মা পাশের বাসায় যাবে। তখনই গোসল করিয়েন। এখন যাই।’

সায়েন দ্রুত চলে যায়। আরাদ বুকে হাত গুজে জোরে শ্বাস ফেলে বলে,’উফফ বুকটা এরকম করছে কেন??কন্ট্রোল করতে পারছি না কেন??সায়েন নামক রোগে আক্রান্ত হয়ে গেছি আমি।’
আরাদ টান হয়ে শুয়ে পড়ে। এখানে শুয়ে থাকতে ভালো না লাগলেও কিছু করার নেই। এখানে থাকতে সে বাধ্য।
রাতে এক বালতি পানি নিয়ে ধীরে ধীরে ছাদে উঠে এলো সায়েন। জয়নব বেগমের পাশের বাসায় যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু সে যায়নি। লিলির সাথে গল্পে মেতেছেন তিনি। এই গল্প ঘন্টা দুয়েক এর মধ্যেও শেষ হবে না। এর সুযোগ নিয়ে সায়েন ছাদে গেল। হাতে তার গামছা লুঙ্গি আর আরাদের শার্ট। শার্ট শুকালেও প্যান্ট শুকায়নি। রৌদ্রে শুকাতে না দিলে কি শুকায়??
সায়েন চিলেকোঠার ঘরে টোকা দিয়ে বলল,’এই যে শুনছেন বেরিয়ে আসুন।’

আরাদ বেরিয়ে এসে দেখে সায়েন বালতির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আরাদকে দেখে সায়েন বলে উঠলো,’আপনার গোসল করার পানি।’

আরাদ চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে বলল,’এভাবে গোসলের করব আমি!!এই খোলা জায়গায়??’

সায়েন অবাক হয়ে বলে,’হ্যা!!কেন বলুন তো??’
আরাদ মাথা নাড়িয়ে বলল,’আমি তো জীবনেও এভাবে গোসল করিনি।’
আরাদের কথা শুনে সায়েন মৃদু চিৎকার দিয়ে বলল,’তার মানে আপনার মনে পড়ে গেছে আপনি কিভাবে গোসল করতেন??’
আরাদ বোকা বনে গেলো। এইভাবে সায়েন তাকে ফাসিয়ে দিলো??সব মনে আছে এটা জানলে তো সায়েন ওকে বাড়ি থেকে বের করে দেবে। কিন্তু আরাদ তো যাবে না। সে আমতা আমতা করে বলল,’না মানে শুধু গোসলের কথা মনে পড়লো আরকি। আস্তে আস্তে সব মনে পড়ে যাবে।’

সায়েন নিজের কপালে হাত রেখে বলল,’হায় আল্লাহ!! কোথায় বাবা মা ঠিকানার কথা মনে করবে তা না করে গোসলের কথা মনে করছে।’
সায়েনের মুখের ভঙ্গি দেখে আরাদ না হেসে পারল না। পুরো বাচ্চা বাচ্চা লাগছে সায়েনকে।

‘আচ্ছা এসব কথা না বলে গোসল করি হ্যা।’
সায়েন মাথা দোলায় বলে,’আমি ওপাশ ফিরে দাঁড়াই আপনি গোসল করুন।’

গোসল করে মাথার ব্যান্ডেজ ভিজিয়ে ফেলেছে আরাদ। সায়েন শার্ট আর লুঙ্গি আরাদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে,’আপনি চেঞ্জ করুন আমি এইড বক্স নিয়ে আসি।’

লুঙ্গি দেখে আরাদ তাজ্জব বনে গেল। অবাক দৃষ্টিতে সায়েনের দিকে তাকিয়ে বলে,’লুঙ্গি!! কিন্তু আমি তো লুঙ্গি পরতে পারি না। কোনদিন পরেছি কি না মনেও পরছে না।’

সায়েন বলল,’আচ্ছা ঝামেলা তো!!! আপনি দেখছি কিছুই পারেন না। আমার পিন আছে।সেটা দিয়ে কোনমতে আটকাইয়েন। আমি আপনার জন্য জামাকাপড় কিনে আনব। আপাতত এটা পরে কাজ চালান।’

সায়েন নিচে চলে আসে। কয়েকটা পিন মশার কয়েল আর এইড বক্স নিয়ে আসে। আরাদ কোনরকমে লুঙ্গি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আরাদকে এই অবস্থায় দেখে সায়েন হাসি চেপে রাখতে পারলো না। খিলখিল করে হেসে উঠলো। আরাদ গোমড়া মুখে বলে,’বেশি বেশি করে মজা নাও। আমার অবস্থা বেহাল আর তুমি মজা নিচ্ছো??’

সায়েন হাসি থামিয়ে বললো,’আপনাকে অদ্ভুত লাগছে তাই হাসি পাচ্ছে। এই নিন পিন দিয়ে আটকে নিন। তাহলে ধরে রাখতে হবে না।’
বলেই পিনগুলো আরাদের দিকে এগিয়ে দিল। আরাদ পিন হাতে নিয়ে উলটপালট করে দেখে বলে,’কিভাবে লাগায় এটা??’

‘উফফফ সত্যি আপনি কিছু পারেন না।’ সায়েন পিন নিয়ে ভালো করে লুঙ্গিটা আটকিয়ে দিলো। আরাদ ঘুরে ফিরে নিজেকে দেখে বলল,’ভেরি ব্যাড। খারাপ লাগছে দেখতে। লুঙ্গি কার এটা??’

‘আমার বাবার। আচ্ছা আমি এখন যাই। টাটা, আবার দেখা হবে।’

সায়েন বালতি আর শাফিনের জামাকাপড় নিয়ে চলে যায়। শাফিন এখনও ফেরেনি। ওর ভেজা জামাকাপড় খাটের তলায় রেখে সায়েন নিজের রুমে চলে আসে। জয়নব বেগম এখনও লিলি খালার সাথে কথা বলছে। এই ফাঁকে সায়েন রান্নাঘর থেকে খাবার বেড়ে নিলো।রুই মাছ রান্না হয়েছে আজকে। বড় এক পিস মাছ নিয়ে দৌড়ে সে চিলেকোঠার ঘরে গেল। কারণ এই সুযোগ আরাদকে খেতে দেওয়ার। আরাদ আবার সায়েনকে দেখে অবাক হয়ে বলল,’আরেহ আবার এলে যে??’

সায়েন হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,’আপনার জন্য খাবার নিয়ে এসেছি। পরে আর সুযোগ পাব না।’

খাবার দিয়ে এক মুহুর্ত দেরি করলো না সায়েন। দৌড়ে গিয়ে পড়ার টেবিলে বসলো। কারণ কথা শেষ করে ওর মা আসবে দেখতে।
আজকে সায়েনের খুশি খুশি লাগছে। আরাদের কিছুটা হলেও মনে পড়েছে। আস্তে আস্তে সব মনে পড়ে যাবে। পড়ায় মন দিলো সায়েন।

…………………..

গোডাউনে পাঁচজন কে বেঁধে রাখা হয়েছে। সবার মুখ কালো কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। পাশে দশ বারো জন গার্ড দাঁড়িয়ে আছে। জোনায়েদ হকিস্টিক দিয়ে অনেক মেরেছে ওদের। ক্লান্ত হয়ে সে চেয়ারে বসে পড়লো। হঠাৎ দরজা দিয়ে আরাদকে ঢুকতে
দেখে তব্দা খেয়ে যায় জোনায়েদ। সাথে গার্ডগুলো অবাক হয়ে যায়। আরাদ একহাতে লুঙ্গি সামলিয়ে আসছে। জোনায়েদ হাত দিয়ে চোখ ডলে আবার তাকালো। বড়বড় চোখে তাকিয়ে আছে সে। আরাদ কাছে আসতেই সে বলল,’এটা আমি কি দেখছি??এটা আরাদ তো??’
আরাদ জোনায়েদের গালে হালকা চাপড় মেরে চেয়ারে বসে বলল,’এটা আমিই!! ঠিকই দেখছিস তুই!!!’

‘কি রে ভাই?? লুঙ্গি তো জীবনেও পরিস না। তাহলে আজকে কি হলো???’

আরাদ পায়ের উপর পা তুলে বলল,’সময়ের সাথে মানিয়ে নিতে শিখেছি। এখন বল ওরা কোথায়??’
জোনায়েদ সামনের দিকে ইশারা করে বললো,’ওরা সব ফাহিমের লোক।’

‘জানি আর এও জানি ওরা আমার প্রজেক্ট চুরি করার জন্য আমার পিছু নিয়েছিল। কিন্তু পারেনি।’

‘তুই সব জানতি যায়?? জোনায়েদ আরাদকে জিজ্ঞেস করেও কোন উত্তর পেল না। তাড়াতাড়ি বিরিয়ানীর ব্যবস্থা করলো সে। বেচারা গুলো এতো মার খেয়েছে যে বিরিয়ানী গলা দিয়ে নামছে না। কিন্তু আরাদকে ওরা ভালো করেই চেনে।না খেলে ওদের খেয়ে ফেলবে আরাদ।

বিরিয়ানী খাওয়া শেষে দুই বোতল ওয়াইন নিয়ে বসেছে জোনায়েদ আর আরাদ। লুঙ্গি গুটিয়ে পা ভাঁজ করে বসেছে আরাদ। জোনায়েদ বোতলে চুমুক দিয়ে বলল,’এবার সবটা খুলে বল। আমার তর সইছে না। কোথায় আছিস তুই এখন??’

‘চিলেকোঠার ঘরে।’ আরাদের উওরে ভ্রু জোড়া কুঁচকে এলো জোনায়েদের। সে ভনিতা না করেই বলল,’দেখ ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলবি না। সোজা ভাবে বল। সেদিন মিটিং এ প্রেজেন্টেশন তৈরির কাজ বুঝিয়ে নতুন প্রজেক্ট নিয়ে তুই বাড়িতে ফিরিসনি। কোথায় গিয়েছিলি???সব বল।’

আরাদ বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলতে লাগলো,’আমার পেনড্রাইভে পুরো প্রজেক্টের মুল কপি ছিল। একাই বের হয়েছিলাম। কিন্তু পথে একটা গাড়ি আমাকে ফলো করে। আমি ওদের চোখে ধুলো দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু লাভ হলো না। কারণ বৃষ্টির কারণে পুরো রাস্তা ফাঁকা ছিল। হঠাৎ গাড়ি দুটো আমার গাড়ির সামনে চলে আসে। গাড়ি থেকে নেমে আমি ওদের সামনাসামনি হই। আমার সাথে হাতাহাতি মারামারি হয়। মাথায় আঘাত পাই আমি। কোনরকমে ওদের থেকে পালিয়ে আসি। আর তারপর,,,,,,’

জোনায়েদ উৎফুল্ল হয়ে বলল,’তারপর কি হলো??’

আরা সটান হয়ে শুয়ে পড়লো। খোলা আকাশের নিচে ওরা। আকাশে হালকা মেঘ। বিকালে একটু বৃষ্টি হয়েছিল। আরাদ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,’জানিস এই নভেম্বরের বৃষ্টি আমার একদম পছন্দ নয়। কিন্তু এই বৃষ্টি যে আমার মনে অনুভূতি জাগিয়ে দেবে তা ভাবতেও পারিনি। সায়েন!!মেয়েটা এমন কেন??প্রথম দেখাতেই আমার সমস্ত অনুভূতি গুলো নিজের দখলে নিয়ে নিয়েছে।’

আরাদ কাত হয়ে জোনায়েদের দিকে তাকিয়ে বলল,’তুই ঘুমন্ত অবস্থায় কোন মেয়েকে দেখেছিস কখনো??’
জোনায়েদ তাচ্ছিল্য করে হেসে বলে,’আমি কেন তুইও কোনদিন দেখিসনি?? আবার জিজ্ঞেস করছিস কেন??’

আরাদ আবার আকাশের দিকে তাকালো বলল,’ঘুম থেকে উঠে দেখি ঘরময় আলোকিত হয়েছে মোমবাতির আলোয়। সেই আলোতে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম যে একটা মেয়ে আমার পায়ের কাছে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে। ওর মুখটা তখন এতো মায়াবী লাগছিল যে নিজেকে কন্ট্রোল করতে কষ্ট হচ্ছিল। অবাধ্য মনেটা বারবার ওই ঘুমন্ত মুখটা ছুঁয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছিল। ওভাবে কতক্ষন তাকিয়ে ছিলাম নিজেও বুঝতে পারিনি। হঠাৎ করে আমি আমার মধ্যে থেকে হারিয়ে গেছি। মনে হচ্ছে এই মেয়েটার কাছে যেকোন উপায়ে আমার থাকতে হবে। ছেড়ে দিলে চলবে না। তাই থেকে গেলাম। তবে চিলেকোঠার ঘরে। এই মুহূর্তে আমার কাছে ওর কাছাকাছি থাকাটা জরুরি খুব।’

জোনায়েদ হা হয়ে আরাদের কথা শুনছিল। আরাদের কথা শেষ হতেই সে বলল,’থাকছিস কিভাবে তুই??এসি ছাড়া, নোংরা একটা ঘরে??’
আরাদ হাসলো, আকাশের দিকে চোখ রেখে বলল,’আমার যে হাত পা বাঁধা। ওখানে থাকতেই হবে আমাকে।’

জোনায়েদ বুঝলো একে কিছুই বোঝানো যাবে না। ঘাড়ত্যাড়ার বড় ঘাড়ত্যারা আরাদ।আরাদ চট করে উঠে দাড়ালো বলল,’আমাকে যেতে হবে চল পৌঁছে দিবি আমাকে??’
বলেই আরাদ গাড়ির দিকে হাঁটা দিল। জোনায়েদ পিছু পিছু গেল। সায়েনের বাড়ির সামনে এসে থামলো গাড়ি। জোনায়েদের থেকে নিজের ফোনটা নিলো। এতক্ষণ চার্জে ছিল ওর ফোন। আরাদ গাড়ি থেকে নেমে বলল,’যখন ফোন করে এখানে আসতে বলব তখনই চলে আসবি। আর সায়েনের উপর নজর রাখবি যাতে কোন ছেলে ডিস্টার্ব করতে না পারে।’

জোনায়েদ মাথা দুলিয়ে বলে,’ওকে!! খুব শিগগিরই ভাবি নিয়ে ফিরতে হবে কিন্তু।আরেকটা কথা,লুঙ্গিতে বেশ মানিয়েছে তোকে। ফার্সটাইম দেখলাম,তোর পরিবার দেখলে তো হার্ট অ্যাটাক করতো।’

‘হুম!! এখন এই লুঙ্গি পরে আমাকে ছাদে উঠতে হবে তাও পাইপ বেয়ে। যা এখান থেকে।’
জোনায়েদ হাসতে হাসতে চলে গেল। নামার সময় অনেক কষ্টে নেমেছে সে। এখন ওঠার পালা। খুব সাবধানে ছাদে উঠে গেল আরাদ। চিলেকোঠার ঘরে গিয়ে দেখলো কালো কুচকুচে বেড়ালটা আরামে ঘুমাচ্ছে। সায়েন যে খাবার দিয়ে গিয়েছিল তা সব সাবাড় করে ফেলছে সে। অবশ্য ভালোই হয়েছে। আরাদ খেয়েই এসেছে। তাই সে বিড়ালের পাশ ঘেঁষে শুয়ে পড়লো।

সকাল বেলা শফিক সাহেব ঘরময় ঘুরছে আর কিছু খুজতেছে। কিন্তু পাচ্ছে না। সায়েন টেবিলে বসে খাচ্ছিল সাথে শাফিন ও আছে। শাফিন তার সল্টুকে খাওয়ানোর চেষ্টা করছে কিন্তু সল্টু কিছুতেই খেতে চাইছে না। খাবে কিভাবে??পেটে জায়গা থাকলে তো??শাফিন তবুও জোর করছে। জয়নব বেগম টেবিলে এসে খেতে বসতেই শফিকুল ইসলাম এসে বললেন,’জয়ু, আমার লুঙ্গি টা দেখেছো??’

সায়েনের গলায় খাবার আটকে গেল। সে জোরে জোরে কাঁশতে লাগলো। হাত এগিয়ে পানি নিয়ে খেয়ে শান্ত হলো। জয়নব বেগম বিরক্ত হয়ে সায়েনের দিকে এক পলক তাকিয়ে বলল,’কোন লুঙ্গি??’

‘ওই যে সাদার মধ্যে ছাই রঙের ওইটা!! কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না রুমেই তো রেখেছিলাম কোথায় গেল??’

শাফিন সাথে সাথে বলে উঠলো,’বাবা আমি ও আমার ব্রাউন রঙের গেঞ্জি আর টাউজারটা পাচ্ছি না। অদ্ভুত তোমার লুঙ্গি হাওয়া সাথে আমার ও।’

সায়েন নিজের আঙ্গুল কামড়াচ্ছে। এখন কি হবে??

#চলবে,,,,,,,,,,,
#

নায়িকার নাম নিয়ে অনেকের সমস্যা হচ্ছে। হতেই পারে,এটা হতেই পারে। তবে নতুন জুটি নিয়ে লিখতে আমার ভালো লাগে। তাই সরি নাম বদলানো যাবে না।
ধন্যবাদ সবাইকে ❤️
#চলবে,,,,,,,,,,,,,

#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_১

সাইলেন্ট রিডার্সরা,প্লিজ জেগে উঠুন। ঘুমিয়ে থাকবেন আর কতকাল?? কমেন্ট নাই বা করলে। রিয়েক্ট তো দিতেই পারেন।

আর নতুন গল্প,,,,,,
কেমন হয়েছে দুই লাইনের মন্তব্য অবশ্যই করবেন।
ধন্যবাদ সবাইকে ❤️❤️

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here