চিলেকোঠার প্রেম পর্ব ৩৯+৪০+৪১

0
48

#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_৩৯

আঁখি দুটি বন্ধ করে মাথায় হাত দিয়ে সোফার উপরে বসে আছে আরশি। মাথাটা খুব ধরেছে। এতে অভ্যস্ত সে,প্রায়ই কেঁদে মাথা ব্যথা বানিয়ে লম্বা ঘুম দেয়। মাঝেমাঝে তনয়া মাথা টিপে দেয় আরশির। তবে এখন আর দেয়না। আরশিই দিতে দেয় না। এই মাথা ব্যথা ওর সহ্য হয়ে গেছে। হঠাৎ চোখে ধোঁয়া আসতেই চোখ তুলে তাকালো আরশি। আকাশ কফির কাপ এগিয়ে দিয়েছে আরশির দিকে। আরেক হাতে নিজের কাপ ধরে রেখেছে। আরশি নিলো না অন্যদিকে ফিরে তাকালো। আকাশ দাঁড়িয়ে থেকেই বলল,’এর থেকে বেশি কিছু পাবে না। কারণ আজকে কাজের বুয়া আসেনি। রান্নাও হয়নি,কফিই খেতে হবে।’

অনিচ্ছা সত্ত্বেও কফির কাপ হাতে নিলো আরশি। আকাশের সামনে আনইজি ফিল করছে সে। অস্বস্তি নিয়েই কফির কাপে চুমুক দিলো। কয়েক চুমুক খেয়েই উঠে দাঁড়ালো আরশি। পার্স হাতে নিয়ে বলল,’আমি আসি!!’

‘দাড়াও??আমি ড্রপ করে দিবো তোমাকে।তাই চুপচাপ কফি শেষ করো!!’

‘না,তার দরকার নেই একা এসেছি একাই যেতে পারব।’

আকাশ কফির কাপ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,’পুলিশের উডবি বলে যে সবাই তোমাকে ছেড়ে দেবে এটা ভেবো না। আমার কিন্তু অনেক শত্রু আছে। সব সময় আমার উপর নজর রাখে। এখন তোমাকে আমার ফ্ল্যাট থেকে বের হতে দেখলে নির্ঘাত পিছু নেবে। যদি কিডন্যাপ করে তোমায় তাহলে তো আরাদ আমাকে দায়ী করবে।’

ভয় পেয়ে গেল আরশি। সত্যি সত্যি ওর পিছু নেবে নাকি??কিডন্যাপ করলে তো ও শেষ। হাতের পার্স চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে সে। আকাশ চোখের ইশারায় ওকে বসতে বলল। ভদ্র মেয়ের মতো বসে কফির কাপে চুমুক দিলো আরশি। খাওয়া শেষে বাইকের চাবি নিয়ে বের হলো আকাশ। আরশিও চলল পিছুপিছু। রঙিন শহরে প্রিয় মানুষটির সাথে ঘোরার মজাই আলাদা। মুহূর্তেই আরশির মাথা ব্যথা উধাও হয়ে গেছে। অজান্তেই একহাতে শক্ত করে ধরে রেখেছে আকাশকে। এতো দিন যাকে ধরতে চেয়েছিল আজকে সে নিজে থেকেই ধরা দিয়েছে। এর থেকে খুশির আর কি আছে??প্রিয় মানুষের ভালবাসা পাওয়ার তৃষ্ণায় ছটফট করেছে আরশি আর আজকে সেই মানুষটি বলেছে ওকে ভালোবাসবে। প্রথম ভালোবাসা হতে পারেনি তো কি হয়েছে?? শেষ ভালোবাসা হয়ে চিরদিন তাকে আগলে রাখবে। রঙ বেরঙের আলোর দিকে তাকিয়ে এক মনে এসব ভেবে যাচ্ছে আরশি। বাড়ির সামনে আসতেই বাইক থেকে নেমে পড়লো আরশি। একটু এগোতেই আকাশের ডাক পড়লো আরশি ঘুরে তাকালো,’শোনো,আর যেন ইফতির সাথে না দেখি। তাহলে কিন্তু,,,!!’

নিজেকে আটকে রাখতে না পেরে হেসে দিলো আরশি। এতে বোকা বনে গেলো আকাশ। এখানে হাসার কি হলো??আরশি কিছু না বলে হাসতে হাসতে চলে গেল। আকাশ নিজে থেকেই আওড়াতে লাগলো,’বড়ই অদ্ভুত মেয়ে মানুষ হঠাৎ করে হাসে আবার হঠাৎ করেই কাঁদে। এদের বোঝা পুরুষের কাম্য নয়।’

বাইক নিয়ে আকাশ চলে গেল। আরশিকে
রুমে আসতে দেখেই তনয়া উঠে দাঁড়ালো। দুষ্টু চাহনিতে তাকিয়ে বলল,’কিরে হবু বরের সাথে কি করে এলি??’
বিছানায় পা ভাঁজ করে বসে আরশি বলে, ‘আচ্ছা মতো ধোলাই দিয়ে এসেছি।’

তনয়া আরশির পাশে গালে হাত দিয়ে বসে বলল,’কেন কেন কেন??বিয়েতে অমত করছিস কেন??’

‘অমত করলাম কোথায়??ভাইয়া তো এখনও
আমার মতামত জানতে চায়নি। শুধু বলেছে আকাশ ভাইয়া নাকি আমাকে বিয়ে করতে চায়।’
তনয়া চিন্তিত হয়ে বলে,’একটা কথা বল, ভাইয়া সব জেনেও কেন এই বিয়েতে রাজি হচ্ছে? আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না।’

‘জানি না!!হয়তো এব্যাপারে ভাইয়া আমার সাথে পরে কথা বলবে।’
তনয়া আরশির গলা জড়িয়ে ধরে বলল,’সবাই যার যার মতো সেটিং হয়ে গেল। আমারটা কবে হবে রে??’
দু’জনেই একসাথে হেসে উঠলো।

ঘুমিয়ে আছে আরাদ তাও সায়েনের কোলে মাথা রেখে। সায়েন আরাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। সিল্কি চুলগুলোতে হাত বুলাতে ভালোই লাগছে সায়েনের। আরাদ আজকে খুব ক্লান্ত বিধায় তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছে। তখন শাস্তি হিসেবে সায়েনকে ওকে খাইয়ে দিতে বলেছে। বারন করবে কিভাবে সায়েন??আরাদের কোন কথাই সে ফেলতে পারে না। তাই আরাদকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার মাঝে মাঝে আরাদের চুলে মুখ ডুবিয়ে চুমু খাচ্ছে। গভীর ভাবে সে আরাদকে পর্যবেক্ষন করছে। এই মানুষটাকে সে নিজের জীবনের চাইতেও বেশী ভালোবাসে। ছাড়তে পারবে না সে আরাদকে। আরাদ তো কখনোই সায়েনকে নিজের থেকে আলাদা করবে না। সেদিনের থাপ্পড় এর কথা মনে পড়ে গেল সায়েনের। থাপ্পড়টা না দিলে হয়তো সে সহজে সাইন করতো না। ভাবতেই গালে হাত দিলো সায়েন। কিছু কিছু মানুষদের থাপড়িয়ে ভালোবাসা বোঝাতে হয়!!কথাটা ভাবতেও অবাক লাগছে সায়েনের। থাপড়িয়ে ভালোবাসা!!গালে হাত রেখেই হেসে উঠলো সায়েন। তখনই ঘুমের মধ্যে নড়ে উঠলো আরাদ। চুপ করে আরাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। আরাদকে আস্তে করে বালিশে শুইয়ে দিয়ে সায়েন ও শুয়ে পড়লো। বিনা সংকোচে আরাদের একদম কাছে ঘেষে শুয়ে পড়লো সে। আরাদের গলা জড়িয়ে ধরে বুকে মুখ গুঁজে দিলো। তখনই আরাদের স্পর্শ পেয়ে মাথা তুলে তাকালো সায়েন। আরাদ ঘুমের মধ্যেই সায়েনকে জড়িয়ে নিজের আরো কাছে নিয়ে এসেছে। সায়েন মুচকি হেসে আবারও আরাদের বুকে মুখ গুঁজে দিলো।

_______________

রেস্টুরেন্টের কোণায় একটা টেবিলে বসে আছে সায়েন আরশি ও তনয়া। তিন জনই আড্ডায় মেতে উঠেছে। কথার মাঝে মাঝে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপে ঠোঁট ছোয়াচ্ছে তিনজনেই। এরই মধ্যে ইফতি এসে চেয়ার টেনে বসে পড়ে। ওরা প্রথমে চমকালেও পরে হেসে দিলো। আরশি বলল,’আপনি খুবই ধূর্ত, মানতে হচ্ছে,সাথে আপনার বুদ্ধির তারিফ করতেও হচ্ছে।’
ইফতি মাথা ঝুকে বলে,’থ্যাঙ্কস!!বিয়েটা কবে করছো??’
তনয়া বলে উঠলো,’এখনও ডেট ফিক্সড হয়নি সম্ভবত খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। কিন্তু আপনি তো ছ্যাকা খেয়ে গেলেন।’

বলেই হাসলো তনয়া। ইফতি ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলে,’সো হোয়াট?? মেয়েদের কি অভাব আছে নাকি। দেখো ওদিকে গার্লস গার্লস গার্লস!!!’
ইফতি রেস্টুরেন্টে থাকা মেয়েদের উদ্দেশ্য করে বলল। ভ্রু কুচকালো তনয়া। অসহ্য লাগলো ইফতির কতগুলো। গম্ভীর কণ্ঠে সে বলল,’তো কি??এদের কাউকে প্রপোজ করবেন নাকি এখন??’

‘দরকার পড়লে করতেও পারি। আমাকে কেউ ফেরাবে না আ’ম সিওর।’
কথাগুলো গায়ে আগুন ধরিয়ে দিলো তনয়ার। ইফতির মুখে অন্য মেয়েদের কথা শুনতে ইচ্ছে করছে না। তবুও দাঁতে দাঁত চেপে বসে আছে। কিছু সময় পর আরশি সায়েন উঠে দাঁড়ালো। আরশি বলল,’আমরা যাচ্ছি। তনয়া চল??’
তারপর সে ইফতিকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘আপনি বসে বসে মেয়ে চয়েজ করুন।’
বলেই আরশি বাইরে চলে গেল সায়েনও পিছু পিছু চলে গেল। তনয়া এখনও বসে আছে। রাগে চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে। মনে হচ্ছে পারলে এখনই ইফতিকে খেয়ে ফেলে। ইফতি আশেপাশে থাকা মেয়েদের দিকে তাকালো এতে তনয়া আরো রেগে গেলো। তনয়ার চোখে চোখ পড়তেই থমকে গেল ইফতি।

‘ওভাবে দেখছো কেন খেয়ে ফেলবে নাকি??’

তনয়া চট করে দাঁড়িয়ে গেল। ইফতির কলার চেপে ধরে ওকেও দাঁড় করালো। বিষ্ময়ে তনয়ার দিকে তাকালো ইফতি। রেস্টুরেন্টে থাকা সবাই ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। তনয়া শক্ত করে ইফতির কলার চেপে ধরে রেখেই বলে,’হ্যা খেয়ে ফেলব। যদি অন্য কোন মেয়ের দিকে তাকান তাহলে খেয়েই ফেলব। ক’জ আই লাভ ইউ। এরপর যদি অন্য কোন মেয়ের দিকে তাকাতে দেখি তাহলে মেরে ফেলব। মাইন্ড ইট।’

তনয়ার কথায় সূক্ষ্ম হাসি ফুটে উঠল ইফতির অধরে। এই মুহূর্তে তনয়ার রাগি লুকটা এনজয় করছে সে। ঠোঁটের হাসি বিদ্যমান রেখেই সে বলল,’প্রপোজ করছো না থ্রেট দিচ্ছো??’
ঝাড়া দিয়ে ইফতির কলার ছেড়ে দিয়ে টেবিল থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে তনয়া বলে উঠে,’যা মনে করেন। তবে আমার কথার খেলাপ হলে সত্যি সত্যি জানে মেরে দেব।’
কথাটা বলে তনয়া এক মুহুর্ত সেখানে দাঁড়ালো না। দ্রুত প্রস্থান করলো। তনয়া যেতেই চেয়ারে বসে পড়লো ইফতি। তনয়ার মুখের এই কথাটার জন্যই সে এতদিন অপেক্ষা করছিল। আজকে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটলো। এতদিন সে নিজের অনুভূতি বুঝতে ব্যস্ত ছিলো। তনয়ার প্রতি যে অন্যরকম অনুভূতি হয় ওর মধ্যে তা বুঝে গেছে ইফতি। কিন্তু তনয়ার মনোভাব সে বুঝতে পারেনি। আজকে তনয়া নিজেই নিজের ভালোবাসার স্বীকারোক্তি দিয়েছে। ইফতি চেয়ারে হেলান দিয়ে মুচকি হাসলো।

তনয়া গাড়িতে বসে কাঁপছে। এসব কি বলে ফেলল সে ইফতিকে!!রাগের বসে বলেই দিলো মনের কথা। এরপর ইফতির সামনে দাঁড়াবে কিভাবে ভাবতেই লজ্জায় লাল হয়ে গেছে ওর মুখটা। তবে ভালো লাগাও কাজ করছে ওর মধ্যে। কাল সারারাত নিজের সাথে যুদ্ধ করে সে বুঝতে পেরেছে যে ও ইফতিকে ভালোবেসে ফেলেছে খুব করে। তাই ইফতির মুখে অন্য কারো কথা সে মানতে পারছে না। জেদের বশে বলেই দিয়েছে সত্যিটা। ভালোবাসার সাথে যুদ্ধ করে কখনোই জেতা যায় না। সত্যি ভালোবাসার কাছে সবাই হার মানতে বাধ্য। মনের বিরুদ্ধে যত যুদ্ধ করে প্রিয় মানুষের সাথে বিচ্ছেদ করতে চায় না কেন তা কখনোই হবে না। হারতে তাকে হবেই। তনয়াও হার মেনে নিয়েছে ইফতির ভালোবাসার কাছে। এই হারের জন্য আলাদা এক প্রশান্তি আছে। আছে আলাদা সুখানুভূতি যা মনের আঙ্গিনায় রঙিন পুষ্পবর্ষণ করে।

রাত্রি বেশি গভীর নয়। আটটা বাজে সবে। আরাদ আরশির সামনে বসে আছে। মাথা নিচু করে ভাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরশি। হয়তো বিয়ের বিষয়ে কোন কথা বলবে আরাদ এটাই আরশির ধারনা। কিন্তু আরাদ এখনও চুপ করে আছে। তাই আরশি ও কোন কথা বলছে না। অবশেষে নিরবতা ভেঙ্গে আরাদ মুখ খুলল,’আমি তোর মতামত চাই আরশি। আকাশের বিষয়ে সবটাই তোর জানা। আর আমি পুরোপুরি ভাবে এই বিয়েতে মত দেইনি। আমি বলেছি তুই যা বলবি তাই হবে। আকাশ তোকে সুখি রাখবে সেটা আমি জানি। কিন্তু তুই কি জানিস আকাশ সায়েন,,,’

বাকি কথাটুকু আরাদকে বলতে দিলো না আরশি। সে বলল,’অতীত টেনো না ভাইয়া। অতীত টানা বোকামো ছাড়া কিছুই নয় এটা তুমিই আমাদের বলেছো। আমি বর্তমান নিয়ে থাকতে চাই। আকাশ ভাইয়া যখন অতীতের পিছুটান ফেলে আসতে পেরেছে তাহলে আমি কেন পারব না?হয়তো আমি ভালো থাকবো। বাকিটা তোমার ইচ্ছা। তুমি যা বলবে তাই হবে।’

আরাদ মেঝেতে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আছে। আরশির কথাগুলো শুনে শান্তি লাগছে। আরশি সম্পর্কে অবগত সে। আকাশের কাছে সবই শুনেছে। কিন্তু ইফতির ব্যাপারটা আকাশ লুকিয়ে গেছে। এতে ভাইবোনের মধ্যে ঝামলে হতে পারে তাই কিছু বলেনি আকাশ।আরাদ চেয়েছে বিয়েটা আরশির মত অনুসারে হোক। যেহেতু আরশি রাজি তাই আর কথা না বাড়ানোই ভালো। আরাদ তাই কথা না বাড়িয়ে চলে গেল। মা বাবার সাথে কথা বলে নিলো। আরাদ যা সিদ্ধান্ত নেবে তা ভালোর জন্যই নেবে তাই ওর মা বাবা দ্বিমত পোষণ করেনি।

সব কাজ শেষ করে আকাশকে ফোন করে জানিয়ে দিয়ে হাফ ছাড়লো আরাদ। সায়েনের সাথে কথা বা দেখা করার সুযোগ মেলেনি আজকে। তাই সে গুটিগুটি পায়ে চিলেকোঠার ঘরে গেল। সেখানে গিয়ে যা দেখলো তা বিশ্বাস করতে পারছে না আরাদ।বিষ্মিত হয়ে সায়েনকে দেখছে সে। হাল্কা গোলাপী রঙের শাড়ি পরে আছে সায়েন। চুলে খোঁপা করে তাতে ফুল গুজতে ব্যস্ত সে। ধিমী পায়ে এগিয়ে যেতেই ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় আরাদের প্রতিবিম্ব দেখা দিলো। সায়েন পিছন ফিরে তাকিয়ে বলল,’বিছানার উপর চুড়িদার পাঞ্জাবি রাখা আছে ওটা পরে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিন।’
কথাগুলো বলে আবারও ঘুরে দাঁড়িয়ে কানে ঝুমকো লাগাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সায়েন। আরাদ এবার বলেই ফেলে,’এসব কি??আমি এসব পড়ে!! কোথাও যাচ্ছি আমরা??’

সায়েন পিছন ফিরে তাকিয়ে বলে,’হুম এখন রেডি হয়ে নিন। ছেলেদের তো রেডি হতে বেশি সময় লাগে না।’

‘কিন্তু আমরা যাচ্ছি কোথায়?? আমাকে আগে জানালে না কেন??’
সায়েন এবার খানিকটা রাগি স্বরে বলল, ‘ফোনটা হাতে নিয়ে দেখুন কতবার কল করেছি বিকেল থেকে। সবার ফোন ধরতে পারেন অথচ আমার ফোন বাদে। বেশি কথা বলবেন তো আপনাকে রেখে আমি একাই চলে যাবো।’
নিজের মাথায় নিজেই গাট্টা মারলো আরাদ।একটু আগেও তো আকাশের সাথে কথা বলল। কিন্তু সায়েন ফোন করেছে কি না তা চেক করতেই ভুলে গেছে। আরাদ কথা না বলে পাঞ্জাবি নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো।একটু পর বের হলো অফ হোয়াইট রঙের পাঞ্জাবি পরে। ভার্সিটি থেকে আসার সময় সায়েন পছন্দ করে কিনে এনেছে। সাদা রং টা আরাদকে বেশ মানায়। আরাদ আবারও জিজ্ঞেস করে,’এবার তো বলো কোথায় যাচ্ছি আমরা??’
সায়েন এগিয়ে এসে আরাদের চুলগুলো ঠিক করে দিলো। পারফিউম স্প্রে করে দিলো আরাদের সারা শরীরে। পাঞ্জাবির বোতাম লাগাতে লাগাতে বলল,’প্রথমে ভেবেছিলাম বলব কিন্তু আপনি বড্ড দেরী করে ফেলেছেন তাই ভাবছি সারপ্রাইজ দেব। নাউ ফলো মি!!’

সায়েন হাঁটা ধরলো। সায়েনের কথার আগাগোড়া বুঝতে না পেরে আরাদও চলল সায়েনের পিছু পিছু।
#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_৪০

ছাদের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে পুরো ড্রয়িং রুমে চোখ বুলায় সায়েন। কেউ নেই দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সে। সায়েনকে উঁকিঝুঁকি দিতে দেখে আরাদও সেদিকে দৃষ্টি বুলায়। বুঝতে পারে সায়েন ভয় পাচ্ছে। একটু আগেই তো কত সাহস দেখাচ্ছিল আর এখন ভয়ে মিইয়ে গেছে দেখে ঠোঁট চেপে হাসলো আরাদ। সায়েন চারিদিকে চোখ বুলাতে বুলাতে ড্রয়িং রুম পেরিয়ে মুল ফটকের দিকে এগিয়ে যায়। বাড়ির বাইরে এসে দম ফেলল সায়েন। গেইট পেরিয়ে ফাঁকা রাস্তায় হাঁটা ধরতেই আরাদ বলে উঠলো,’এবার তো বলো? এভাবে হেঁটে যাব নাকি??’

সায়েন থেমে পিছনে ফিরে তাকিয়ে বলল,’নাহ আপনার ওই গাড়ি নেওয়া যাবে না। সামনে দেখুন!!’
সায়েনের আঙ্গুলের ইশারায় আরাদ সেদিকে তাকালো। ব্লু রঙের স্কুটার দাঁড় করানো রাস্তার পাশে। চেনা চেনা লাগছে স্কুটারটা। আরাদ গিয়ে হাত বুলায় স্কুটারের গায়ে। তারপর সায়েনের দিকে তাকাতেই সায়েন বলে ওঠে, ‘ভুলে গেছেন?? বৃষ্টির দিনে এই স্কুটারে চড়েই প্রথম আমার বাড়িতে পা রেখেছিলেন??’

সায়েনের স্নিগ্ধ মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলো আরাদ। সেই দিনটা তো কখনোই ভোলার নয়। সেই বৃষ্টির দিনই প্রথম দেখা হয়েছিল সায়েনের সাথে। তবে তখন ভালো করে দেখনি সে সায়েনকে। রাতে হঠাৎ যখন ঘুম ভেঙ্গে যায় তখন এক শিশুসুলভ নারীকে নিজের পায়ের কাছে আবিষ্কার করে আরাদ। মোমবাতির নিয়ন আলোয় অদ্ভুত দ্যুতি ছড়াচ্ছিল সেই নারীর সারা শরীর থেকে। যা আরাদকে খুব করে টানছিল। নিজেকে এই নারীর আশেপাশে রাখার তীব্র ইচ্ছা জন্মেছিল। পুরোনো কথা মনে পড়তেই আরাদের হাসিটা গাঢ় হলো। সায়েন ততক্ষনে স্কুটিতে চড়ে বসেছে। সে আরাদকে উদ্দেশ্য করে বলে,’আপনি কি যাবেন নাকি ফেলে রেখে চলে যাব??’
আরাদ স্কুটিতে বসতে বসতে বলল,’আমাকে ফেলে রেখে তুমি যেতে পারবে না।’

‘হুম!!যাওয়া যাক??’

আরাদ পেছন থেকে সায়েনকে জড়িয়ে ধরে মাথা নাড়লো। বহুদিন পর আবার সেই স্কুটিতে বসেছে সায়েন। আঁকাবাঁকা রাস্তায় খুব সাবধানে স্কুটি সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সে। পরিচিত রাস্তা দেখে আরাদ অবাক হচ্ছে। অনেক দিন পর এই রাস্তায় আবার আসলো কেন সায়েন??প্রশ্নটা আরাদ মনের মধ্যেই রেখে দিলো। এখন প্রশ্ন না করাই ভালো। কিছুক্ষণ এর মধ্যেই একটা বাড়ির সামনে এসে স্কুটি থামালো সায়েন। আরাদ অবাক হয়ে তাকালো সায়েনের বাড়ির দিকে। সবার আগে চোখ গেল চিলেকোঠার ঘরের সেই জানালার দিকে যেখান থেকে আরাদ রোজ সায়েনের আসা যাওয়া দেখতো। এতো দিন পর এখানে আসার কারণ আরাদ বুঝতে পারছে না। পুরো বাড়িতে চোখ বোলাতে ব্যস্ত আরাদ। এরই মধ্যে আরাদের এক হাত মুঠোবন্দী করে নিলো সায়েন। কোমল হাতের স্পর্শে সায়েনের দিকে ফিরে তাকালো আরাদ। ঠোঁটযুগল প্রস্বস্ত করে হাসলো সায়েন। আরাদের হাত ধরেই গেইট খুলে দরজায় গিয়ে দাঁড়ালো। কলিং বেল চাপার একটু পরেই কেউ একজন দরজা খুলে দিল। সায়েনকে দেখে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটির মুখে হাসি ফুটে উঠল। সায়েন আলতো করে জড়িয়ে ধরলো রুহিকে। রুহি ও হাসিমুখে গ্রহন করে সায়েনকে। তারপর ওদের ভেতরে নিয়ে যায়। আরাদ এখনও কিছু বুঝতে পারছে না। সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। সোফায় বসে ফোন ঘাটছিল শাফিন। সায়েনকে দেখেই উঠে দাঁড়ালো সে। সায়েন এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে ভাইকে। অভিমান মিশ্রিত কন্ঠে বলে,’ভুলেই গেছিস আমাকে?? এখন আর মনে পড়ে না??’

সায়েনের অভিযোগে হাসলো শাফিন। সায়েনের নাক টেনে দিয়ে বলল,’তোকে ভুলতে হলে আমার মেমোরি লস করাতে হবে। এছাড়া তোর অত্যাচার গুলো ভোলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’
সায়েন রাগি লুকে তাকিয়ে পরক্ষণেই হেসে দিল। শাফিন মুগ্ধ হয়ে গেল সায়েনকে হাসতে দেখে। ঠিক কতদিন পর সায়েনের মুখে হাসি দেখছে সে তা নিজেও জানেনা। সায়েনের গালে হাত রেখে সে বলল,’তুই খুশি তো??’

সায়েন ঘাড় ঘুরিয়ে এক পলক আরাদকে দেখে শাফিনের দিকে তাকিয়ে বলল,’হুম!!আমি খুশি ভাইয়া। আর তোমরা??’

‘তোর খুশিতেই আমরা খুশি। আব্বুর কাছে যা তোর জন্য অপেক্ষা করছে।’
সায়েন মাথা দুলিয়ে বাবার রুমের দিকে চলে গেল। খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসে বই পড়ছেন শফিকুল ইসলাম। অনেক দিন পর সায়েন বাবা মায়ের রুমে প্রবেশ করলো। এখনও মায়ের গন্ধ পাচ্ছে এই রুম থেকে। অথচ সেই মানুষটাই এখন নেই। জয়নব বেগমকে হারানোর শোকটা এখনও রয়ে গেছে শফিকুল ইসলামের। হয়তো এই শোক আমৃত্যু পর্যন্ত থাকবে। জীবনসঙ্গীকে হারানোর বেদনা তো ভোলা যায় না। এই কষ্ট নিয়েই তাকে বেঁচে থাকতে হবে। যতদিন সে বেঁচে আছে ততদিন পর্যন্ত এই কষ্ট তার পিছু ছাড়বে না। সায়েন গিয়ে বাবার সামনে বসে বলল,’কেমন আছো আব্বু??’

হাতের বইটা বন্ধ করে চশমা ঠিক করে নিলেন শফিকুল ইসলাম তারপর হেসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,’আমরা খুব ভালো আছি। তুই কেমন আছিস??’
বাবাকে জড়িয়ে ধরে সায়েন বলল,’ভালো আছি আমি। তোমাকে খুব মনে পড়ে।’

মেয়ের সাথে কথা বলে ড্রয়িং রুমে আসেন শফিকুল ইসলাম। শাফিন আর আরাদ বসে কথা বলছে। শফিকুল ইসলাম ও তাতে যোগ দিলেন।

ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে সায়েন ও আরাদ। চারিদিকে অন্ধকার ছেয়ে আছে। রাস্তায় থাকা ল্যাম্প পোস্টের আলোতে আলোকিত হয়ে বাড়ির উঠোনের খানিকটা অংশ। সেদিকেই তাকিয়ে আছে সায়েন। পুরোনো স্মৃতিতে দু’জনেই ফিরে গিয়েছে। এখনও সব আগের মতোই আছে। চিলেকোঠার ঘরটা দু’জনেই ঘুরে দেখেছে। আর এখন ছাদের কার্ণিশে দাঁড়িয়ে আছে। দু’জনেই চুপ। শ্বাস প্রশ্বাসের ধ্বনি শুনছে শুধু।
‘সময় খুব দ্রুত বহমান,কত তাড়াতাড়ি চলে যায় তাই না??’
সায়েনের প্রশ্নে আরাদ তাকালো বলল,’হুম!!আমরা শত চেষ্টা করেও সময়কে আটকাতে পারব না কিন্তু প্রিয় মানুষ?? তাকে তো আটকাতে পারি!!!তাই প্রিয় মানুষটিকে আঁকড়ে ধরে খারাপ সময়টা ভুলে থাকা যায়। তুমি সেটা পারবে না??’
আরাদের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো সায়েন,কিন্ঞ্চিৎ হেসে বলল,’আমার খারাপ সময় গুলো ভুলিয়ে দিতে আপনার ভালোবাসাই যথেষ্ট।’
সায়েনের আরেকটু কাছে এগিয়ে গেল আরাদ। হালকা ঝুঁকে বলল,’শুধু আমার ভালোবাসা পেতে চাও?? তোমার ভালোবাসা দিতে চাও না??’

লাজুক হেসে মুখ ফিরিয়ে নেয় সায়েন। আরাদও হাসলো। তখনই রুহির ডাক পড়লো। খেতে ডাকছে সে। ডিনারের জন্য ইনভাইট করেছিল শাফিন। সায়েনকে আগে ফোন করে সে। আরাদকে জানানোর জন্য সায়েন ফোন করেও পায় না। তাই কিছু না বলেই আরাদকে এখানে নিয়ে এসেছে। আর স্কুটার টা শাফিনই সায়েনের কথামতো পাঠিয়ে দিয়েছে। আজকে সায়েনকে খুশি দেখে শাফিনের সব রাগ উবে গেছে। ও ভেবেছিল হয়তো আরাদের সাথে সায়েন সুখি হবে না। কিন্তু ওর ধারনা ভুল। সায়েন খুশি আরাদের সাথে। এজন্য শাফিনও খুশি যে এতদিন পর মেয়েটার কপালে সুখ ধরা দিয়েছে।

______________

কেটে গেছে তিনটা দিন,এই তিনদিন ঘরের বাইরে পা ফেলেনি তনয়া। ইফতির সামনে পড়তে সে নারাজ। ইফতির দিকে তো ও তাকাতেই পারবে না। এই তিনদিনে ইফতি অনেক বার ফোন করেছে তনয়াকে কিন্তু সে রিসিভ করেনি। কথা বলতেও সংশয় হচ্ছে তনয়ার। বাড়িতে বসে থাকতেও বোরিং লাগছে তবুও তনয়া বাড়ি থেকে বের হবে না ভেবে নিয়েছে। পড়ার টেবিলে বসে সে বইয়ের পাতা অনবরত উল্টে যাচ্ছে। মেসেজ টোনে ফোনের দিকে তাকালো সে। ফোন হাতে নিয়ে দেখলো ইফতির মেসেজ। মেসেজ পড়েই চোখ কপালে তনয়ার। আরশিকে দেখে নিল একবার। মরার মত ঘুমাচ্ছে আরশি। এক দৌড়ে বারান্দায় চলে গেল তনয়া। গেইটের ওপারের রাস্তা স্পষ্ট দেখা যায়। ফোন হাতে নিয়ে বারান্দার দিকে তাকিয়ে আছে ইফতি।ঘোর লাগা দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে আছে তনয়া। ফোনের শব্দে ধ্যান ভাঙল ওর। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল ইফতির কল। চকিতে সে ইফতির দিকে তাকালো। ইশারায় ফোন রিসিভ করতে বলছে ইফতি। তনয়া ফোন রিসিভ করে কানে ধরতেই ইফতির গলার স্বর ভেসে আসে,’হোয়াটস্ ইউর প্রবলেম??’

তনয়া উওর দিলো না তাই ইফতি আবারো বলে ওঠে,’তুমি ঘরের বাইরে বের হচ্ছো না কেন? মানে আমি কি তোমায় কিডন্যাপ করব?’
এবারো আগের মতোই নিশ্চুপ তনয়া। হতাশার শ্বাস ফেলে ইফতি বলে,’তোমার থ্রেট প্রপোজের উওর নেবে না??’
কেঁপে উঠলো তনয়া। শিহরণ খেলে গেল সারা শরীরে। কম্পিত কন্ঠে সে বলে,’উওর??’

‘হ্যা উওর!! তবে তার জন্য তোমাকে আমার সামনে আসতে হবে। ফোনে বলা যাবে না।’

‘নাহ আপনি ফোনেই বলুন।’

‘তুমি যদি ফোনে প্রপোজ করতে তাহলে আমি ফোনেই জবাবটা দিয়ে দিতাম। জলদি নিচে নেমে আসো।’

‘আমি যেতে পারব না। আপনি বরং চলে যান এখান থেকে।’
‘যদি না যাই??’

‘আমার ভাইয়া দেখতে পেলে আপনাকে আস্ত রাখবে না। আর যদি আকাশ ভাইয়া দেখেছে তাহলে তো হয়েই গেল।’

ইফতি কে কিছু বলতে না দিয়েই ফোন কেটে দিল। বারান্দার দরজা বন্ধ করে দিয়ে আরশির পাশে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়লো। চোখ বন্ধ করে মিটিমিটি হাসলো তনয়া। ঘুমানোর চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে এপাশ ওপাশ করতে লাগলো। ইফতি চলে গেছে। মনের কোনে জমা সূক্ষ্ম অনুভূতি গুলো আর বলা হলো না তার। ঝগড়ার পর ভেবেছিল শায়েস্তা করবে তনয়াকে কিন্তু নিজেই জব্দ হয়ে বসে আছে। ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গেছে। ভাবতেই অবাক লাগে ওর।

সামনে এগিয়ে গেল আরো দুদিন। এই দুদিনে সায়েন আরশি তনয়া কেউই বাড়ির বাইরে পা রাখেনি। কারণ টা হলো আকাশ। ওর পরিবার এসেছিল বিয়ের কথা বলতে। সামনের মাসেই বিয়ে ঠিক হয়েছে। যার কারণে এখন থেকেই বাড়ি উৎসবমুখর হয়ে গেছে। আরশিকে নিয়েই বেশি মাতামাতি হচ্ছে। এই খুশি সেলিব্রেট করার জন্য তনয়া ঠিক করেছে আজকে ওরা বাইরে যাবে ডিনারে। কিন্তু আরাদ থাকতে পারবেনা। আজকে আরাদের বাড়িতে ফিরতে অনেক রাত হবে। শেষে ঠিক করলো তামিমকে সাথে নিয়েই যাবে ওরা। কিন্তু সায়েন!!আরাদকে ফোনেও পেলো না। ইমজাদ ওয়াহেদের কাছ থেকে পারমিশন নিয়ে চারজনে বের হলো। বাড়ি থেকে কিছুদূর একটা নামিদামি রেস্টুরেন্ট গেল ওরা। বুক করে রাখা টেবিলে গিয়ে বসে তামিম অর্ডার দিলো। কথার মাঝে তনয়ার চোখ গেল দরজা দিয়ে আসা এক যুবকের দিকে। এইসময় ইফতিকে দেখে অবাক তনয়া। ওর পিছু নিয়েই ইফতি এখানে এসেছে? কিন্তু তনয়াকে অবাক করে দিয়ে ইফতি ভেতরে চলে গেল। তারমানে ইফতি তনয়াকে দেখেনি। তনয়া ওয়াশরুমে যাওয়ার বাহানায় উঠে পড়লো। পিছু নিলো ইফতির। ইফতি দ্রুত পায়ে গিয়ে একটা কেবিনে ঢুকে পড়লো। তনয়া সেদিকে এগোতেই একজন স্টাফ ওকে বলে,’ম্যাম এটা পার্সোনাল ভাবে বুক করা হয়েছে। ভেতরে যাওয়া নিষেধ আছে।’
মাথা নাড়ল তনয়া তবে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। ইফতি ভেতরে করছে কি?? ভাবাচ্ছে তনয়াকে,ভেতরেও যেতে পারছে না। স্টাফও চলে গেছে। অনেকক্ষণ নিজের সাথে যুদ্ধ করে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকেই পড়লো। এবং ও যা দেখলো তা অবিশ্বাস্য। কয়েকজন ছেলেদের সাথে নেশাদ্রব্য গ্রহণ করছে ইফতি। সবেমাত্র সিরিঞ্জ হাতে নিয়েছে সে। হাতে পুশ করার আগেই ওর চোখ গেল তনয়ার দিকে। ইফতিকে এই অবস্থায় দেখে তনয়ার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। হাত থেকে সিরিঞ্জ পড়ে গেল ইফতির। উঠে দাড়াতেই তনয়া আর সেখানে দাঁড়ালো না। এক ছুটে বের হয়ে গেল কেবিন থেকে। চোখ মুছে নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়ে এগোলো সে। আরশির সামনে গিয়ে দাড়াতেই আরশি বলল,’কোথায় গিয়েছিলি??এতো দেরি করলি কেন??’

তনয়ার অস্বস্তি হচ্ছে খুব। এরকম একটা ছেলেকে ভালোবাসলো ও। ভাবতেই ঘৃণা হচ্ছে ওর। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,’ভাবি কোথায়??’
‘গাড়িতে গেছে,ফোন ফেলে এসেছে।’

‘ওহ!!আমিও গাড়িতে গিয়ে বসি তাহলে।’

আরশি বিষ্ময়ে বলে উঠলো,’খাবি না তুই??’

‘নাহ ইচ্ছা করছে না। আমি যাই!!’

তামিম কটাক্ষ করে বলে,’তুই সব প্ল্যান করে এখন নিজেই বলছিস খাবি না। তাহলে আমি এতকিছু অর্ডার কেন করলাম?? আমার টাকা উড়ানোর ধান্দা করছিস??চুপচাপ খেতে বস এখানে।’

তনয়া কথা বলল না চুপচাপ রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে গেল। তামিম আরশি অবাক চোখে তাকিয়ে রইল সেদিকে। আরশিও বসলো না। তনয়ার পিছু নিলো। দৌড়ে এসে হাত টেনে ধরলো তনয়ার। তনয়ার চোখ থেকে তখন পানি পড়ছে। আরাশি কিছু বুঝলো না। কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ঘঠে গেল আরেকটা অনাকাঙ্খিত ঘটনা। বড় একটা ট্রাক এসে ধাক্কা দিলো আরশিদের গাড়িতে। ফলে গাড়িটা কিছুটা দূরে গিয়ে উল্টে পড়লো। তনয়া আরশি কিছুক্ষণের জন্য স্তব্দ হয়ে গেল। পরমুহূর্তে সায়েনের কথা মনে পড়তেই সেদিকে দৌড়ে দিলো দু’জনেই। গাড়ির কাছাকাছি যেতেই ব্লাস্ট করলো গাড়িটা। সাথে সাথে চিৎকার দিয়ে উঠলো তনয়া আর আরশি। সায়েন তো গাড়িতে ছিলো। যদি সায়েনের কিছু হয়ে যায় তাহলে আরাদকে ওরা কি বলবে??
তামিম ছুটে আসলো। গাড়িটা এভাবে জ্বলতে দেখে ও নিজেও স্তব্ধ হয়ে গেছে। হঠাৎ করেই কি হতে কি হয়ে গেল তা কারো বোধগম্য হচ্ছে না। আরশি তনয়া সায়েনের জন্য কাঁদছে। ইতিমধ্যে ফায়ার সার্ভিস কে কল করে দিয়েছে কেউ। তামিম ভাবছে এখন ও আরাদকে কি বলবে??সায়েনকে ছাড়া তো পাগল হয়ে যাবে আরাদ। এটা কি ভুল করে ফেললো ওরা?সায়েনকে একা ছাড়াই ওদের ভুল হয়েছে।

হঠাৎ করেই গাড়ির ড্রাইভার এসে হাজির হলো। উনি বললেন,’এসব কিভাবে হলো স্যার??’
তামিম উঁচু গলায় বলল,’কোথায় ছিলেন আপনি??এই দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলাম আপনাকে। ভাবিকে ছেড়ে কোথায় গিয়েছিলেন??’

‘ম্যাডাম তো আসেনি গাড়িতে। আসবেই কিভাবে?? গাড়ির দরজা তো লক করা। আমি তো সামনের দোকানে সিগারেট কিনতে গিয়েছিলাম।’

ড্রাইভারের কথায় কান্না থেমে যায় আরশি আর তনয়ার। ওরা তিনজনই অবাক হয়ে তাকালো পুড়ে যাওয়া গাড়ির দিকে। তাতে পানি ঢালছে ফায়ার সার্ভিস। তার মানে সায়েন গাড়িতে ছিলো না!!তাহলে সায়েন কোথায় গেল??
#চিলেকোঠার_প্রেম

#Ishita_Rahman_Sanjida(Simran)

#পর্ব_৪১

মানুষের জীবনে কখনো এমন ঘটনা ঘটে যা জানার পর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। শ্বাস টেনে নিলেও তা ছাড়তে ভিশন কষ্ট হয়। ভারি বুক আর ভারি নিঃশ্বাস দুটোই যন্ত্রনাদায়ক।
ঠিক সেরকমই অবস্থা হয়েছে আরাদের। তামিমের ফোন পেয়ে ছুটে যায় আরাদ। আশেপাশের সব জায়গায় খোঁজে সায়েনকে। কিন্তু আশ্চর্য কোথাও নেই সায়েন। হঠাৎ করে গেলো কোথায় সায়েন?? ইতিমধ্যে আকাশও চলে এসেছে। সেও সব জায়গায় ইনফরমেশন পাঠিয়ে দিয়েছে সায়েনের ব্যাপারে। এটুকু সময়ের মধ্যে যাবে কোথায় সায়েন??তনয়া আরশিকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে আরাদ। এই মুহূর্তে আরাদের মাথা একদম কাজ করছে না। সায়েনকে যে খুঁজে পেতেই হবে। তিনটা বছর সায়েনের থেকে দূরে ছিলো। কিন্তু এই পাঁচটা মাসে ওর প্রতিটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গেছে সায়েন। ওকে ছাড়া থাকা আরাদের পক্ষে অসম্ভব। সারারাত খোঁজাখুঁজির পরও সায়েনের কোন হদিস পাওয়া গেল না। ভোর বেলায় ক্লান্ত হয়ে বাড়িতে ফিরলো আরাদ। বাড়ির কেউই দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি। আরাদ গিয়ে সোফায় বসে পড়লো। দৃষ্টি ওর মেঝেতে নিবদ্ধ। চেহারায় চিন্তার ছাপ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কেউই আরাদের ভাবগতিক বুঝতে পারছে না। আরশি তনয়া এখনও কাঁদছে। আরশি বলল,’আ’ম সরি ভাইয়া। আমার জন্যই এসব হয়েছে। আমার ভাবিকে একা ছাড়া ঠিক হয়নি। যদি আমি ভাবির সাথে যেতাম তাহলে এসব হতো না। আ’ম রিয়েলি সরি।’

আরাদ চোখ তুলে শান্ত চোখে আরশিকে দেখে নিলো। কি বলবে সে??আর এখন বলেই বা কি হবে? আগে সায়েনকে খুঁজতে হবে। আরশির মুখে ভাবি ডাক শুনে নিলিমা আর হাসি বেগম দু’জনেই চমকালেন। নিলিমা বেগম মেয়েকে প্রশ্ন করলেন,’ভাবি কাকে বললি তুই?সায়েনকে??’
আরশি জবাব দিলো না। মুখ ফসকে ভাবি বলে ফেলেছে সবার সামনে। আরশির উওর না পেয়ে তিনি আরাদকে জিজ্ঞেস করে, ‘আরশি কি বলছে আরাদ??সায়েনকে ভাবি বলছে কেন??’
আরাদ করুন কন্ঠে বলল,’মা প্লিজ এখন এসব বলার সময় নয়। আমি সায়েনকে খুঁজে পাচ্ছি না। আমার মনের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করো??’
আরাদকে উত্তেজিত হতে দেখে ইমজাদ ওয়াহেদ মুখ খুললেন,’আমি বলছি কেন আরশি সায়েনকে কেন ভাবি বলছে।’
হাসি বেগমও নিলিমা বেগমের মতো উৎসুক দৃষ্টি মেলে তাকালেন। ইমজাদ ওয়াহেদ বলতে লাগলেন,’যেদিন সায়েনকে এই বাড়িতে আরাদ প্রথম নিয়ে আসে সেদিনই ওদের বিয়ে হয়ে গেছে। সায়েন আরাদের স্ত্রী। এটা ওইদিন আরাদ আমাদের জানায়। কিন্তু তখন বাড়ির পরিস্থিতি ভালো ছিল না। তোমরা সামিউক্তাকে নিয়ে মেতে ছিলে। তাই আরাদ সত্যিটা বলেনি। কিন্তু একদিন না একদিন তো সবাইকে সত্যি জানতেই হবে। তাই আজকে বলে দিলাম।’

স্তব্ধ হয়ে গেলেন নিলিমা বেগম। এতবড় সত্যি লুকানো হয়েছে তার থেকে। তাও আবার এতো দিন ধরে!!বিষয়টা তিনি হজম করতে পারলেন না। থম মেরে বসে রইলেন। আরাদকেও কোন প্রশ্ন করলেন না। পরিস্থিতি বেগতিক,এখন কিছু না বলাই শ্রেয়।
সবাই চুপচাপ, নিঃশ্বাস বাড়ি খাচ্ছে চার দেয়ালের মাঝে। আরাদ সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে। ফোনটা বেজে উঠতেই তাড়াতাড়ি রিসিভ করলো সে। আকাশের কল ছিল। সে কোন খোঁজ পায়নি সেটাই জানালো। ফোন রেখে হতাশার নিঃশ্বাস ছেড়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল সে। সায়েনকে ছাড়া থাকা অসম্ভব।

কিছু সময় চুপচাপ কেটে গেল। বেলা একটু গড়িয়ে গেল তবুও সবাই আগের স্থানে স্থির বসে আছে। তখনই কলিং বেল বেজে উঠল। কেউ কোন প্রতিত্যুর করলো না। একজন সার্ভেন্ট গিয়ে দরজা খুলতেই একটা মেয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো। তার কোলে বাচ্চা। তিন থেকে চার বছর হবে হয়তো। মেয়টা ভেতরে আসতেই সবাই অবাক হয়ে সেদিকে তাকালো। কারণ কেউই চেনে না মেয়েটাকে। এমনকি আরাদ ও না। তবে মেয়েটার পেছন থেকে একজন পুরুষ এগিয়ে এসে দাড়াতেই সোজা হয়ে বসল আরাদ। বেশ অবাক হয় সে ফাহিমকে এই সময় দেখে। তবে এবার বেশ ক্ষোভ জন্মায়। কারণ এর আগের বার সায়েন যখন আরাদকে ছেড়ে চলে যায় তখনও ফাহিমের উপস্থিতি ছিলো। তাহলে এবারও কি আগের মতোই,,,,!!রাগ হলো আরাদের। এবার যদি ফাহিম কিছু করে তবে ওকে ছেড়ে দেবে না। আগের বার ক্ষমা করলেও এইবার সে কিছুতেই ক্ষমা করবে না। ফাহিম আরাদের দিকে তাকিয়ে বুঝলো যে আরাদ ওকে দেখে রেগে গেছে।
ফাহিম গায়ের শার্টটা টেনে ঠিক করে বলল, ‘আমি ফাহিম আপনারা আমাকে হয়তোবা চিনেন না তবে আরাদ চেনে।’
অতঃপর ফাহিম পাশের মেয়েটার দিকে ইঙ্গিত করে বলল,’মাই ওয়াইফ এন্ড মাই প্রিন্সেস।’
বলেই হাসলো ফাহিম। সবার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলো সবাই বেশ অবাক হয়েছে।সবার চাহনিকে উপেক্ষা করে ফাহিম ওর মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে চোখের ইশারা করতেই তিনি বেরিয়ে গেলেন। একটু পর আবারো ফিরে আসলেন তবে একা নয়। তার একহাত সায়েনের হাত ধরে আছে। সায়েনকে দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল। আরাদের চিন্তিত গম্ভীর মুখে হাল্কা হাসি ফুটে উঠল। আরাদ উঠে দাঁড়াতে নিলে ফাহিম ইশারায় থামিয়ে দিলো। আরাদ আগের জায়গায় বসে সায়েনের দিকে তাকিয়ে রইল। ভালো করে দেখে নিলো সায়েনকে। হাতের কব্জিতে এবং মাথায় ব্যান্ডেজ। মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে সায়েন। আরশি তনয়া ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে সায়েনকে। কান্নারত কন্ঠে তনয়া বলল,’তুমি ঠিক আছো ভাবি??জানো ভাইয়া কতো খুঁজেছে তোমাকে। সবাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।’
সায়েন মাথা নেড়ে বলল,’আমি ঠিক আছি।’

আরাদের ইচ্ছে করছে ছুটে গিয়ে সায়েনকে জড়িয়ে নিতে কিন্তু পারছে না। ভেতরের ছটফট করছে সে। ফাহিম আরাদের সামনাসামনি সোফায় বসে। ফাহিমের স্ত্রী রিয়া মেয়েকে নিয়ে ফাহিমের পাশেই বসলো। সে ইশারায় সায়েনকেও তার পাশে বসতে বলল। সায়েন তাই করলো। ফাহিম কোন ভনিতা না করেই বলে উঠলো,’উপকারির উপর ফিরিয়ে দেওয়ার জন্যই হয়তো উপরওয়ালা কাল আমাকেই পাঠিয়েছিল। তাই সেখানে আমার আগমন ঘটিয়েছে।’
বলেই সে এক পলক সায়েনের দিকে তাকালো। তারপর আরাদের দিকে তাকিয়ে বড় একটা শ্বাস ফেলে বলেতে লাগলো,’কাল যখন ব্লাস্ট হয় তখন আমি আর আমার স্ত্রী বাড়িতে ফিরছিলাম। হঠাৎ করেই সায়েন আমাদের গাড়ির সামনে এসে পড়তেই সাথে সাথে ব্রেক করি। গাড়ি থেকে নেমে দেখি রাস্তায় জ্ঞান হারিয়ে পরে আছে। তখন আমিই হসপিটালে নিয়ে যাই। পরে জানতে পারি সায়েনকে সবাই হন্নে হয়ে খুঁজছে। ভাবলাম আরেকটু টেনশন দেই আরাদকে। তাই রাতে আর জানাইনি। তাছাড়া সায়েনের তখনও জ্ঞান ফেরেনি। ডক্টর বলেছে দেরি হবে জ্ঞান ফিরতে। তাই এখন এলাম। এজন্য সরি বলতে পারব না কিন্তু আরাদ।’
বলেই মুচকি হাসলো ফাহিম। আরাদ হাসতে পারলো না। সে কিছুটা গম্ভীর কন্ঠে বলল, ‘শত্রুতা তাহলে এখনও রয়ে গেছে??’

‘কিছুটা তো থাকতেই হবে তাই না??সব শত্রুদের বন্ধু হতে নেই।’

এবার আরাদ ফিচেল হাসলো। মুখ ফুটে কিছু বলল না। ইমজাদ ওয়াহেদ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বললেন,’তোমাকে ধন্যবাদ!!আমরা সবাই কালকে থেকে চিন্তিত ছিলাম। আমরা কৃতজ্ঞ থাকবো।’

ইমজাদ ওয়াহেদ কে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘নো‌ আঙ্কেল!! আমার উপকার টা সামান্য। তার থেকে অনেক বড় উপকার আমি আরাদের থেকে পেয়েছি। যাই হোক আপনারা আমার উপর কৃতজ্ঞ হবেন না। এতে আমার খারাপ লাগবে।’
ফাহিমের মুখের এরকম স্বাভাবিক কথাবার্তা আরাদকে অবাক করে দিয়েছে। বলতে গেলে ভুতের মুখে রাম নাম। রিয়া আরশিকে উদ্দেশ্য করে বলে,’তুমি সায়েনকে রুমে নিয়ে যাও। এখন ওর রেস্টের প্রয়োজন। ডক্টর আজকের দিনটা ওকে হসপিটালে রাখতে বলেছিল। কিন্তু সায়েনের জোরাজুরিতে আসতেই হলো।’

আরশি তাই সায়েন কে নিয়ে চলে গেল। ওরা চলে যেতেই রিয়া সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘আপনারা সবাই একটু খেয়াল রাখবেন সায়েনের। এই অবস্থায় একটা এক্সিডেন্ট বুঝতেই তো পারছেন। ডক্টর ছাড়তে চাইছিল না। অনেক কষ্টে মানিয়েছি। ডক্টর বলেছেন কয়েকদিন সম্পুর্ন বেড রেস্টে রাখতে। যদিও সব ঠিক আছে কারো কোন ক্ষতি হয়নি। তবুও সবাই একটু সতর্ক থাকবেন।’

সবাই চমকে গেছে রিয়ার কথায়। নিলিমা বেগম জিজ্ঞেস করলেন,’কি বলছো তুমি?এই অবস্থায়, আবার বলছো সব ঠিক আছে?? মানে কি??’
ফাহিম আর রিয়া একে অপরের দিকে তাকালো। যেনো ওরাও অবাক হয়ে গেছে। রিয়া বলল,’মানে আপনারা জানেন না??সি ইজ প্রেগন্যান্ট। আড়াই মাস চলছে। আশ্চর্য!! আপনারা এতো কেয়ারলেস কেনো??’
এবারের ঝটকা মেনে নিতে পারলেন না নিলিমা বেগম। তার অগোচরে এতো কিছু হয়ে গেল অথচ তিনি জানতেই পারলেন না। তার পক্ষে বসে থাকা সম্ভব নয়। গটগট পায়ে হেঁটে চলে গেলেন নিজের রুমে। আরাদ আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। দৌড়ে সিঁড়ি ভেঙে চলে গেল। চিলেকোঠার ঘরে ঢুকতেই আরশি বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়লো। আরাদ সায়েনের কথা জিজ্ঞেস করতেই আরশি জানালো সায়েন ওয়াশরুমে চেঞ্জ করতে গিয়েছে। আরশি মাথা নিচু করে রুম থেকে বের হয়ে গেল। সায়েনের বের হতে দেরি হলো। হাতে চোট পাওয়ায় দরুন একটু সমস্যা হলো। বের হতে প্রথমে চোখ গেল আরাদের দিকে। বসে ছিল আরাদ এতক্ষণ তবে সায়েনকে দেখে সে উঠে দাঁড়ালো। হালকা হেসে এগিয়ে গেল সায়েন।
আরাদ বিলম্ব না করে জড়িয়ে ধরে সায়েনকে। প্রশান্তিতে ছেয়ে যায় আরাদের মন। ভয় পেয়ে গিয়েছিল সে। ভেবেছিল এই বুঝি আবার সায়েনকে হারিয়ে ফেলল। শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে সায়েনকে। ডানহাতে চোট থাকায় বাম হাত আরাদের পিঠে রাখলো সায়েন। আরাদকে আজকে খুশি লাগছে। চুম্বনে ভরিয়ে দিল তার প্রেয়শির সারা মুখ। জড়িয়ে নিলো ফের নিজের বক্ষে। চোখের কোণে জমা অশ্রুকণা গড়িয়ে পড়লো গাল বেয়ে। নিজেকে সৌভাগ্যবতি মনে করছে সায়েন। এরকম ভালোবাসা কজনেরই ভাগ্যে থাকে। আরাদ সায়েনকে জড়িয়ে ধরা অবস্থাতেই বলল,’আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম সায়েন। তোমাকে হারাতে আমি চাইনা। আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল সায়েন। থ্যাঙ্ক গড তুমি ঠিক আছো।’

‘আমি ঠিক আছি। আমার কিছু হয়নি।’

আরাদ সায়েনের হাতজোড়া নিজের মুঠোবন্দী করে নিয়ে মুচকি হেসে বলল, ‘আমাদের যে ছোট্ট প্রিন্সেস আসছে তা তুমি বললে না কেন??’
মাথা নিচু করে হাসলো সায়েন। দৃষ্টি নত রেখেই বলল,’আমিও জানতাম না। কালকেই ডক্টর জানালো।’

‘কি??তুমি নিজের পরিবর্তন খেয়াল করোনি?’

‘আমি বিষয়টা স্বাভাবিক ভাবেই নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম হয়তো এমনি অসুস্থ আর আপনি চিন্তা করবেন বলে বলিনি।’

আরাদ কিছুটা রাগি স্বরে বলে,’এইভাবেই সব লুকিয়ে যাও আমার থেকে?? তবে আর লুকানো যাবে না। এখন থেকে যদি সব কথা না বলো তাহলে তোমাকে পানিশমেন্ট পেতে হবে।’
সায়েন মাথা নেড়ে বলল,’ওকে!!’

‘আচ্ছা যখন গাড়ি ব্লাস্ট হয় তখন কোথায় ছিলে তুমি??আর ফাহিমের গাড়ির সামনে গেলেই বা কিভাবে??’

‘আমি তো গাড়িতে ফোন আনতে গিয়েছিলাম। ড্রাইভার আঙ্কেল ছিল না। গাড়ির দরজা লক করা ছিল তাই আমি আঙ্কেলকে খোঁজার জন্য আশেপাশে তাকাই। পেয়েও যাই। ওনাকে ডাকার পরও উনি সাড়া দিচ্ছিল না। সামনের দিকে হেঁটেই যাচ্ছে। আমি একটু এগোলাম। হঠাৎ করেই উনি কোথায় যেন হারিয়ে গেল। আশেপাশে ভালো করে তাকালাম কিন্তু পেলাম না। আর তখনই তাকিয়ে দেখি আমাদের গাড়িটা ব্লাস্ট করেছে। দৌড়ে কাছে যাওয়ার আগেই আরেকটা গাড়ির সাথে ধাক্কা লাগে। তারপর আর কিছু মনে নেই। সকালে চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি হসপিটালের বেডে শুয়ে আছি।আর তারপর ডক্টরের কাছে থেকে জানতে পারি,,,,,!!!’

আরাদ আবারও জড়িয়ে ধরে সায়েনকে। কপালে এঁকে দিলো ভালোবাসার পরশ। আবেশে চোখজোড়া বন্ধ করে ফেলে সায়েন। তারপর নিজেও জড়িয়ে ধরে আরাদকে।

ফাহিম চলে গেছে। সবাই এখন যার যার রুমে। তনয়া আরশি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। তনয়ার থেকে জানতে পারলো সায়েন প্রেগন্যান্ট। এতে আরশিও খুশি হলো। তবে মায়ের কথা ভেবে চুপসে গেল সে। নিলিমা বেগম এরপর কি করবেন?? নিশ্চয়ই নতুন কোন ঝামেলা হবে এবার। তবে ঝামেলাটা বেশ বড়সড় হবে বলেই আরশির ধারনা। তনয়া বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে আছে। মনটা ওর ভালো নেই। ইফতিকে ওই অবস্থায় দেখার পর থেকে ওর মনটা বিষিয়ে গেছে একদম। সত্যিই কিছু কিছু মানুষের মুখোশের আড়ালে ঘৃণ্য চেহারা লুকিয়ে থাকে তা আজ ভালো করে বুঝতে পারছে তনয়া। হাতের উল্টোপিঠে শেষ অশ্রু বিন্দু মুছে নিলো সে। ভেবে নিলো আর কাঁদবে না। একজন খারাপ মানুষের জন্য কেন ও কাঁদবে?? শক্ত হয়ে বসে রইল তনয়া। এমন সময় আরশি এলো। তনয়ার দিকে ওর ফোন এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘ইফতি ফোন করেছে। কালকেও অনেকবার করেছিল। তখন পরিস্থিতি খারাপ ছিল তাই বলিনি। এখন ধর,,,,’

‘কথা বলব না আমি। ফোন কেটে দে। আর এখান থেকে যা।’

আরশি অবাক হয়ে বলল,’কেন কথা বলবি না। তোর ফোনের কি হয়েছে?? তুই নাকি ওর ফোন ধরছিস না তাইতো আমকে ফোন করলো। নে ধর,,,’

রাগ চটে গেল তনয়ার মাথায়। এক আছাড়ে গুঁড়ো গুঁড়ো করে দিলো ফোনটা। রেগেমেগে বারান্দা থেকে চলে গেল। আরশি বোকার মত দাঁড়িয়ে নিজের ভেঙে যাওয়া ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ করে তনয়ার কি হলো যে এতো রেগে গেল???

#চলবে,,,,,,,,
#চলবে,,,,,,,,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here