#বৌপ্রিয়া #আভা_ইসলাম_রাত্রি #পর্ব – ২১

0
980

#বৌপ্রিয়া
#আভা_ইসলাম_রাত্রি
#পর্ব – ২১

হঠাৎ পেছন থেকে উচ্ছ্বাস কুসুমকে জড়িয়ে ধরতেই ভরকে গেল কুসুম। থরথর করে কেঁপে উঠল সর্বাঙ্গ তার। হাত থেকে টাওয়াল খসে পরে গেল। ঘাড়ে উচ্ছ্বাসের গরম নিঃশ্বাস অনুভব করল। সঙ্গে অনুভব করলে মৃদু নেশালো এক কন্ঠ,

‘ স-সরি কুসুম। ‘

কুসুমের বুকটা যেন ভেসে গেল। ভালো লাগায় প্রজাপতির ন্যায় উড়ে যেতে চাইল কিশোরী মন। কুসুম তবুও নিজেকে কঠিন রাখার চেষ্টা করে বলল,

‘ আ-আদিক্ষেতা দ-দেখাবেন না। ছ-ছাড়ুন। ‘

উচ্ছ্বাস ছাড়ল না। বরং হাতের বাঁধন আরো একটু শক্ত করল। কুসুমের পেটের উপর রাখা হাত আরো একটু চেপে ধরে ঘাড়ে মুখ গুজে বলল,

‘ বিশ্বাস করো, অনেক ব্যস্ত ছিলাম। আমি কিন্তু ইচ্ছে করে দেরি করিনি। ট্রাস্ট মি কুসুম। ‘

কুসুমের বুকের ধড়ফড়ানি যেন বেড়েই চললো ক্রমাগত। হৃদপিণ্ডের তালও খুব একটা ভালো নয়। উচ্ছ্বাসের প্রথম এতটা গভীর স্পর্শ কুসুমের সহ্য হচ্ছে না। কুসুম মৃদু স্বরে বলল,

‘ ট্রাস্ট করেছি। ছাড়ুন এবার। ‘

উচ্ছ্বাস কুসুমের ঘাড়ে থুতনি রেখে আয়নায় কুসুমের দিকে তাকাল। চোখের পলক ফেলে জিজ্ঞেস করল,

‘ রাগ ভেঙেছে? নাকি আরো এক্সপ্লেইন করব? ‘

কুসুম উত্তর দিল না। বরং একটু জোড় খাটিয়েই উচ্ছ্বাসের হাতের বাঁধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে সরে দাঁড়ালো। উচ্ছ্বাস খানিক দূরে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে কুসুমের দিকে চেয়ে আছে। কুসুম মেঝে থেকে টাওয়াল তুলে চুলে বাঁধতে লাগল। বলল,

‘ আমি বোধহয় কারো কাছে টেকেন ফর গ্র্যান্টেড হয়ে গেছিলাম। সমস্যা নেই। প্রথম তো। ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে যাবে। যান, শাওয়ার নিয়ে আসুন। হসপিটাল যাবেন না আজ? ‘

উচ্ছ্বাস দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাল। আজকে থেকে ছুটি শেষ। আজকে যেকোনো মূল্যে হসপিটাল যেতে হবে। সবে তিনদিনের ছুটি পেয়েছিল। আরো কটাদিন ছুটি পেত। কিন্তু হানিমুনে যাবে বলে সেসব ছুটি আপাতত উহ্য রাখা। বিয়েতে তাই বেশি ছুটি গ্রহন করে নি। উচ্ছ্বাস মাথা চুলকে কুসুমের দিকে তাকাল। এক ভ্রু বাঁকিয়ে বলল,
‘ তোমার রাগ ভাঙলে তারপর শাওয়ারে যাব। রাগ ভেঙেছে? ‘

‘ হু। ‘

উচ্ছ্বাসের বুঝতে বাকি নেই, এই রাগের বহর কটাদিন অব্দি চলবে। গরম আগ্নেয়গিরি শান্ত হতে সময় তো লাগবেই। লাভা হুট করে গলে যায় না। সময় দিতে হয় তাকে। উচ্ছ্বাস আর ঘাটাল না কুসুমকে। কুসুমের চুল থেকে এক টানে টাওয়াল খুলে শীষ বাজিয়ে বাথরুমে চলে গেল। কুসুম হতভম্ব হয়ে গেল। তার টাওয়াল তারই চুল থেকে খুলে নিয়ে গেল? খারাপ লোক।

কুসুম বিছানা গোছালো। উচ্ছ্বাসের শার্ট প্যান্ট সহ যাবতীয় জরুরী জিনিস বিছানার উপর রেখে নিচে এলো। খালামনি কুসুমকে দেখে এগিয়ে এসে বলেন,

‘ কুসুম পায়েস খাবি? বানিয়েছি আজকে। ‘

কুসুম মৃদু হেসে বলল, ‘ তুমি বানালে অবশ্যই খাব। ‘

খালামনি পায়েস প্লেটে নিয়ে কুসুমকে দিলেন। কুসুম নিজে খেল, খাওয়ার ফাঁকে ক’চামচ তুলে খালামণিকেও খাইয়ে দিল। দুজন মিলে বড্ড হাসাহাসি করছে। যা সিড়ি বেয়ে নিচে নামার সময় উচ্ছ্বাসের কানে এলো। উচ্ছ্বাস মনেমনে কিছুটা তৃপ্তি পেল। কুসুমকে এই বাড়ির বৌ করে আনার সবচেয়ে বেশি ইচ্ছে এবং আগ্রহ ছিল উচ্ছ্বাসের মায়ের। তিনি যেন ছোট থেকেই কুসুমকে একটু বেশিই পছন্দ করতেন। কুসুমের সঙ্গে উচ্ছ্বাসের কখনো ঝগড়া হলে বকার ভাগীদার কুসুম নয় বরং উচ্ছ্বাস নিজে হত। ছোটবেলায় এসব খারাপ লাগলেও, এখন মনে হচ্ছে কুসুম এবং তার মায়ের সম্পর্ক সারাজীবন যেন এমনই থাকে।

খাবার টেবিলে উচ্ছ্বাস কুসুমের পাশে এসে বসল। কুসুম ডান হাত উচু করে রুটিতে হাত দিবে, তার আগেই তার হাত বাঁধা পরল উচ্ছ্বাসের হাতে। কুসুম থমকে গেল। উচ্ছ্বাস নিজের বা হতে কুসুমের হাত দুমড়ে মুচড়ে নিচ্ছে। কুসুমের বড্ড অস্বস্তি হচ্ছে। টেবিল ভর্তি বড়রা! অথচ এই কাণ্ডজ্ঞানহীন মানুষের কাজ দেখে হতবাক হয়ে যাচ্ছে কুসুম। কুসুম চোখ রাঙিয়ে তাকাল উচ্ছ্বাসের দিকে। উচ্ছ্বাস খেতে খেতে কুসুমের দিকে চেয়ে সবার অগোচরে ডান কানে হালকা ছুঁয়ে মিটমিট চোখে সরি বলল। উচ্ছ্বাসের এমন অদ্ভুত ভঙ্গিতে সরি বলা দেখে কুসুম না চাইতেও ফিক করে হেসে ফেললো। সঙ্গেসঙ্গে বাকি সবাই কুসুমের দিকে তাকাল। কুসুম সবার এমন জহুরী চাওনি দেখে থতমত খেয়ে গেল। উচ্ছ্বাসও ততক্ষণে কুসুমের ডান হাত ছেড়ে দিয়েছে। এমন ভাব করে খাচ্ছে, যেন তার মত লক্ষ্মী ছেলে আর একটিও নেই। কুসুম সবার এমন চাওনি দেখে একটু কেশে খেতে মন দিল। সবাই ব্যাপারটা উড়িয়ে দিলেও কুসুম মনেমনে আরো একটুখানি প্রেমে পরল উচ্ছ্বাসের। ধীরে ধীরে এই ছেলেটা কুসুমের পুরো পৃথিবীকে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে নিচ্ছে। কুসুম কেমন যেন জালের ন্যায় আষ্টেপৃষ্ঠে ছেলেটার সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। চাইলেও সেই সুতো কেটে বের হতে পারছে না। কিন্তু কুসুম কি আদৌ তা চাইছে? উহু! মোটেও না।
___________________________________
গতকাল উচ্ছ্বাস সারাদিন বাসায় আসেনি দেখে ফেরা যাত্রা করা হয়নি। তাই বড়রা মিলে ঠিক করলেন, আজকে কুসুম নিয়মমাফিক নিজের বাপের বাড়ি যাবে। সঙ্গে উচ্ছ্বাসও যাবে। আগামীকাল শুক্রবার। উচ্ছ্বাসের হসপিটাল বন্ধ। তাই নিয়ম যথাযথভাবে পালন করা যাবে। উচ্ছ্বাস হসপিটাল থেকে ফিরতেই তোড়জোড় লেগে গেল সবার মধ্যে। শিউলি এবং উচ্ছ্বাসের বাকি কাজিনরা মিলে একদম সাদামাটাভাবে সাজিয়ে দিল কুসুমকে। হালকা গোলাপি রঙের শাড়ি পরিয়ে তৈরি করা হল কুসুমকে। সন্ধ্যার চা পর্ব শেষ হতেই উচ্ছ্বাস, কুসুম, শিউলি আর উচ্ছ্বাসের ফুপাত ভাই সঙ্গে গেল কুসুমের বাড়ি। তারা যেতেই কুসুমদের বাড়িতে বিশাল হুলুস্থুল ব্যাপার ঘটে গেল। সাহেদা অর্থাৎ কুসুমের মা মেয়ের জামাই আর নিজের বোনের ছেলের জন্যে বেশ ঘটা করেই আয়োজন করলেন। ও বাড়ি প্রবেশ করতেই খাবারের বহর লেগে গেল। উচ্ছ্বাসকে ঘিরে ধরল কুসুমের অন্যান্য ভাই-বোনেরা। কুসুম এক ফাঁকে রান্নাঘরে মায়ের কাছে চলে এল।

সাহেদা রান্নার দিকটা দেখছেন। কুসুম গিয়ে মা’কে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। মেয়ের স্পর্শ পেতেই চোখ ছলছল করে উঠল সাহেদার। পেছনে ফিরে মেয়েকে মন ভরে দেখে নিয়ে ভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘ ভালো আছিস? ‘

কুসুম বুঝতে পারল মায়ের ভালো আছিস বলার অর্থ কি? কুসুম মৃদু হেসে বলল, ‘ ঐ বাড়ির সবাই আমাকে খুব ভালো রেখেছে। চিন্তা করো না। ‘

সাহেদা আশ্বস্ত হলেন। কিছুক্ষন কথাবার্তার পর সাহেদা জিজ্ঞেস করলেন,

‘ তোর অনার্স ভর্তি তো কিছুদিনের মধ্যেই। কী করবি ভেবেছিস? পড়াশোনার ব্যাপারে উচ্ছ্বাস কি বলল? ‘

কুসুম ফলের ঝুড়ি থেকে একটা আপেল তুলে সেটায় কামড় বসাল। রয়েসয়ে উত্তর দিল,

‘ খালামনি সেদিন বললেন নর্থ সাউথে পড়ার জন্যে। তারও তাই মত। বাসার পাশে আছে। তার অনেক চেনাজানা মানুষ আছে। সমস্যা হবে না বললেন। তবে এখন ভর্তি হব না। সেখান থেকে ফেরার পর হব। সে কথা বলে রাখবে বলেছে। ‘

সাহেদা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ এখন আবার কোথায় যাবি?’

দেখা গেল কুসুম লজ্জা পেল। মিনমিন করে বলল,

‘ এই মাসের শেষের দিকে কক্সবাজার যাব। সেখান থেকে ফিরে এলে। ‘

সাহেদার আর বুঝতে বাকি নেই, মেয়ে কিসের কথা বলছে। তাই তিনিও আর ঘাটালেন না মেয়েকে। উচ্ছ্বাসের কাছে যাবার জন্যে বলে কাজে লেগে গেলেন।

#চলবে
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হবার একটাই কারণ, আমি ঘুমিয়ে গেছিলাম😐

গল্পের পরবর্তী সকল আপডেট পেতে যুক্ত হোন লেখিকার নিজস্ব গ্রুপে। গ্রুপ লিংক,
https://facebook.com/groups/929533097975216

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here