প্রিয়_অর্ধাঙ্গীনি #সুমাইয়া_সুলতানা_সুমী #পর্ব_৩২

0
896

#প্রিয়_অর্ধাঙ্গীনি
#সুমাইয়া_সুলতানা_সুমী
#পর্ব_৩২
,
কাক ডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠে শিউলি ফুল কুঁড়ানো জোনাকির বিছানায় আর পিট ঠেকলো নাহ। বাড়িতে বড় মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙলেও এখানে কাকের কা কা কর্কশ ডাকে ঘুম ভেঙে গেলো। কালকে শশীর সাথেই এখানে এসেছে ও। ঘুম ভাঙতেই পাশে শাহানারা কে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখলো। শাহানারা কে পাড় করে খাট থেকে নেমে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। বাইরে তখন সূর্য উঠেছে সবে মাত্র। বাড়িতে এতোক্ষণে সবাই উঠে পড়লেও এখানে কারো উঠার নামগন্ধ নেই। গুটিগুটি পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসলো। পুরো বাড়িতে কাউকেই দেখতে পেলো নাহ৷ হয়ত এখনো কেউ ঘুম থেকে উঠেনি। চোখ ডলতে ডলতে হেঁটে সামনের দিকে গিয়ে সিঁড়ির সামনে যেতেই দেখলো জয় হাতে কিছু একটা নিয়ে খেতে খেতে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছে। জোনাকি এক পাশে সরে দাঁড়ালো। জয় তখনো শশীকে দেখেনি। শেষের সিঁড়ি পাড় করে কেবলি উপরে উঠবে তখনি জোনাকি পা দিয়ে জয়কে ল্যাং মারলো। তবে জয় নিজেকে পড়ার হাত থেকে বাঁচাতে পারলেও হাতের আইসক্রিম এর বাটিটা বাঁচাতে পারলো নাহ। সিঁড়ি বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে নিচে গিয়ে ঝনঝন শব্দ করে থেমে গেলো। রেলিং ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে উপরে উঠে কমরে হাত দিয়ে রাগী চোখে জোনাকির দিকে তাকিয়ে জয় বলল।

‘তুমি এমন করলে কেনো? আমি যদি এই সিঁড়ি থেকে নিচে পরে ধুপ করে মরে যেতাম তখন কি হতো?

‘কি আবার হতো ভালোই হতো। আর তাছাড়া দিনে দিনে খেয়ে খেয়ে নিজের যে অবস্থা বানিয়েছো কবে দেখা যাবে ফটাস করে ফেঁটে ঠাস করে মরে গিয়েছো।

‘জোনাকির কথায় জয়ের রাগ তড়তড় করে আরো খানিকটা বেড়ে গেলো। কীহ তোমার এতোবড় সাহস তুমি আমাকে মরার কথা বলছো। এখন যদি আমি সত্যি মরে যাই তখন কি হবে বলো?

‘জয়ের রেগে যাওয়া দেখে জোনাকি মোটেও বিচলিত হলো নাহ। উল্টো জয়কে বোঝানোর স্বরে বলল। আরে তুমি এতো রেগে যাচ্ছো কেনো। আমিতো তোমার আরো ভালো করলাম।

‘কাউকে মরার কথা বললে সেখানে ভালো কোথায় থাকে শুনি।

‘আরে তুমি জানো না বুঝি যে কাউকে মরার কথা বললে উল্টো তার আয়ু বেড়ে দ্বিগুন হয়ে যায়। তো তোমাদের বাড়িতে এসে থাকছি। তোমরা এতো আদর যত্ন করছো তাই আমিও ভাবলাম তোমাদের ও কিছু দেওয়া দরকার। এই জন্য তোমার আয়ুটা একটু বাড়িয়ে দিলাম। ধন্যবাদ দিতে হবে নাহ। আমি এমনি সবার উপকার করে বেড়ায়। স্কুলেও কতজনকে এমন উপকার করেছি।

‘কথাটা বলে জোনাকি নিজের ফ্রগটা দুপাশে ধরে দুলাতে দুলাতে চলে গেলো। জয় এখনো সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছে। সত্যি কি কাউকে মরার কথা বললে তার আয়ু বেড়ে যায়? কই স্কুলে তো কখনো এটা তাকে শিখাই নাই।
‘,,,,,,,,,,
আপনি দেশ রক্ষক হিসাবে ভালো হলেও বর হিসাবে খুবি খারাপ। প্রথম দিনই ফেল করে গেছেন।

‘সকাল সকাল নিজের নব বধূর থেকে এমন সার্টিফিকেট পেয়ে সমুদ্র অবাক হয়ে শশীর দিকে তাকিয়ে বলল। কি বলছো তাহলে কী আমি আদর কম করে ফেললাম? আচ্ছা কোনো ব্যাপার না তুমি চাইলে এখন আবার পুরো দমে শুরু করতে পারি।

‘ছিঃ কথার কি ধরন। আমি আপনাকে মোটেও এই বিষয়ে কোনো কথা বলেনি।

‘তাহলে কোন বিষয়ে বলেছো শুনি। কিন্তু তার আগে তুমি আমায় এটা বলো যে তুমি এভাবে কাঁথায় মুখ ঢেকে আমার সাথে কথা বলছো কেনো। বুক থেকে মাথাটা তোলো আমিও একটু দু-চোখ ভরে আমার নব বধূকে দেখি।

‘কথাটা বলে সমুদ্র শশীর মুখ থেকে কাঁথা টান দিতে গেলে শশী আরো নিজেকে কাঁথায় আবৃত করে শাসানোর ভঙ্গিতে বলল। খবরদার কাঁথা টান দিবেন নাহ। আমি এভাবেই কথা বলবো।

‘কিন্তু কেনো?

‘কারণ আমার লজ্জা লাগছে তাই। আর এ ছাড়া-ও আরো একটি কারণ আছে সেটা বলা যাবে নাহ।

‘এবার মনে হচ্ছে তুমি কথাটা ঠিকি বলেছো। স্বামী হিসাবে আমি সত্যই ফেল করে গেলাম। নয়ত এতো কসরত করেও বউয়ের লজ্জা ভাঙতে পারলাম নাহ। তাহলে আর কেমন স্বামী আমি।

‘শশী বুঝলো ও যদি আরো কথা বাড়ায় তাহলে এই ঠোঁটকাটা লোকটা এর থেকেও লজ্জা জনক কথা বলে ওকে আরো বেশি লজ্জায় ফেলবে এই জন্য শশী কথা ঘুরিয়ে বলল। আপনি উঠুন তো আর আমাকে ছারুন আমি ফ্রেশ হবো।

‘বললেই তো হয় গোসল করবা এতো লজ্জা পাওয়ার কী আছে। আচ্ছা ঠিক আছে চলো একসাথে গোসল করি। তখন যদি বউয়ের লজ্জা ভাঙ্গতে পারি।

‘এই না না একদম নাহ।

‘হ্যাঁ হ্যাঁ একদম হ্যাঁ চুপ থাকো।

‘কথাটা বলে সমুদ্র এক লাফে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ালো। উদম শরীলে টাওজার এর রাবারটা নাভির নিচে নামানো। নিচু হয়ে এক টানে শশীর উপর থেকে কাঁথাটা সরিয়ে ফেলল। সমুদ্রের এমন কাজে শশী লজ্জা নিবারণ এর জন্য দু হাতে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল। শশীর পরনে তখন সমুদ্রের গায়ের বিয়ের পাঞ্জাবি টা। একদম পা পযন্ত নেমে গেছে। চিকন শরীলে পাঞ্জাবি টা পরিমাণের তুলনায় বেশ ঢোলা হয়েছে। গলার দিকে কাঁধ গলিয়ে অনেকটাই নেমে এসে শশীর ফর্সা কাঁধটা বেরিয়ে আছে। আর ফর্সা কাঁধে রাতে সমুদ্রের দেওয়া ভালোবাসার চিন্হটা লাল হয়ে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। সমুদ্র সেদিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে শশীর উপর উবু হলো। হাতের উপর চুমু দিয়ে মুখ থেকে শশীর হাত টা সরিয়ে দিলো। শশী তখনো চোখ বন্ধ করে আছে। সমুদ্র একে একে শশীর বন্ধ চোখের পাতায় কপালে দু গালে থুতনিতে চুমু দিয়ে নাকের ডগায় কুট করে একটা কামড় বসালো। বেথ্যা পেয়ে চোখ খুলে রাগী চোখে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে শশী বলে উঠল।

‘কালকে রাতে এতো কাঁমড়িয়েও সাধ মেটেনি? রাক্ষস কোথাকার।

‘না মেটেনি আমার বউকে আদর করবো দরকার হলে কাঁমড়িয়ে খেয়ে ফেলবো তাতে তোমার কি? এখন বেশি কথা না বলে চলো।

‘কথাটা বলেই শশীকে পাজাকোলা করে কোলে তুলে নিয়ে বাথরুমের দিকে চলল সমুদ্র।
,,,,,,,,,,,,,

‘কি হয়েছে এতো সকালে ফোন করেছো কেনো?

‘এতো কিছু হয়ে গেছে আর তুমি এভাবে পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছো? আবার আমায় বলছো কেনো ফোন দিয়েছি। তুৃমি জানো সমুদ্র শাহীন কে তুলে নিয়ে গেছে। আমার ছেলেটা আদেও বেঁচে আছে কীনা কে জানে। আর বেঁচে থাকলেও ওই সমুদ্র ওকে কোথায় রেখেছে কী অবস্থায় রেখেছে তাও জানি নাহ। তোমার কথামত সবকিছু করেছি। এখন আমার ছেলেকে বিপদে ফেলে তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছো মালবিকা।

‘সকাল সকাল এমন তাজা খবর শুনার পরেও ওনার মাঝে কোনো হেলেদুল দেখা গেলো নাহ। হাঁটু অবধি উঠে আসা নাইটির লেনটা নিচে নামিয়ে ঠিক করে দিয়ে বালিশে পিঠ ঠেকিয়ে শান্ত গলায় বলল। এতে এতো উত্তেজিত হওয়ার কি আছে আমি বুঝলাম নাহ।

‘মালবিকার এমন গা ছাড়া কথাশুনে খেপে গেলেন চেয়ারম্যান। রাগে মুখ থেকে প্রায় বেরিয়ে আসা গা*লি টা গিলে নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল। তোমার কি মনে হয় এই খবর শোনার পরে আমি বিছানায় শুয়ে আরাম করবো? আরে তুমি বুঝতে পারছো নাহ। আমার ছেলেকে ওই সমুদ্র ধরে নিয়ে গেছে এখন যদি সমুদ্র টর্চার করে আর শাহীন বলে দেয় তোমার আমার মধ্যে কি সম্পর্ক তখন? শোনো মালবিকা একটা কথা কান খুলে শুনে রাখো ফাঁসলে কিন্তু আমি একা ফাঁসবো না তোমাকে নিয়েই ফাঁসবো। তোমার সব অপরাধের সাক্ষী আমি।

‘চেয়ারম্যান এর কথায় এবার বেশ রেগে গেলো মালবিকা রাগে বাজে একটা গা,লি দিয়ে বলল। এই চেয়ারম্যান ভুলে যাসনা তোকে ওই গ্রামের চেয়ারম্যান কিন্তু আমিই বানিয়েছি। আর চাইলেই তোকে ওই চেয়ার থেকে টেনে ছুঁরে ফেলে দিতে পারি। আর কি বললি তুই শাহীন আমাদের সম্পর্কের কথা সমুদ্র কে বলে দেবে। আচ্ছা দিক ওকে নিষেধ করেছে কে।

‘মানে?

‘আরে বোকা চেয়ারম্যান আমি তোর মতো এতো বোকা নয়।তোর সাহস কি করে হলো আমার সাথে এভাবে কথা বলার। আর রইলো বাকী ওই হাঁটুর বয়সী সমুদ্র আমার কিছুই করতে পারবে নাহ। আর আমি চেয়েছি বলেই ওই সমুদ্র শাহীন কে ধরতে পেরেছে। আর শাহীন ও জানে ওকে ঠিক কি করতে হবে। জাল পেতেছি আমি সমুদ্রের চারপাশে আর অবস্থা বুঝে আস্তে আস্তে জালটা গুটিয়ে নেবো। সমুদ্র ও নিজের অজান্তেই সেই জালে আটকে পরবে।

‘মালবিকার এমন কথা শুনে চেয়ারম্যান ভয় পেয়ে শুকনো ঢোক গিলে বলল। তুমি আসলে করতে কি চাইছো মালবিকা।

‘সেটা তোর না জানলেও চলবে। এই মালবিকা মির্জা এতোটাও কাঁচা খেলোয়াড় নয় কথাটা মনে রাখিস।

‘আচ্ছা আমাকে একটা কথা বলবে তুমি? ওই সমুদ্রের সাথে তোমার ঠিক কিসের এতো শত্রুতা। আর ওতো তোমার থেকে অনেক ছোট তাহলে তুমি ওর এতো ক্ষতি কেনো করতে চাও?

‘আমি চাই না তো। আমি তো ওর সাথে আগে শত্রুতা করতে যায়নি। আমিতো চেয়েছিলাম আমাদের মাঝে সুন্দর একটা সম্পর্ক হোক। কিন্তু ও সেটা চাইলো না। বাবা আর কাকার মৃত্যুর জন্য আমাকে দায়ী করে। অনেক ক্ষতি করেছে আমার ও এবার ওর পালা। আর আমি তোমাকে এতো কিছু কেনো বলছি। শোনো চেয়ারম্যান মুখ বন্ধ রাখো যা হচ্ছে হোক বেশি কিছু করতে যেও না তাহলে অকালে প্রাণটা হারাবে।
,,,,,,,,,,,,

খাবার টেবিলে বসে আছে সমুদ্র সহ সবাই। শশী মাথায় লম্বা একটা ঘোমটা দিয়ে সবইকে খাবার পরিবেশন করছে। জয় বেশ বিচক্ষণ চোখে শশীকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। এতো লম্বা ঘোমটা দেওয়ার কারণ সে খুঁজে পাচ্ছে নাহ। সমুদ্রের মুখোমুখি বসেছে রোদ্র প্লেটে শুধু ভাত নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে আঙুল দিয়ে নাড়ানাড়ি করছে। শশী পিছন থেকে চামচে করে একটু ডাল প্লেটে দিতেই রোদ্র মাথা উঁচু করে শশীর দিকে তাকালো। রোদ্রের তাকানো দেখে শশী সৌজন্যে মূলক একটা হাসি দিলো। কিন্তু রোদ্র মোটেও সে হাসিতে মোহিত হলো নাহ। সেতো এখন শশীর ঠোঁটের কোনে লাল হয়ে যাওয়া দাগ টার দিকে তাকিয়ে। এই দাগের কারণ তার সামনে বসা সমুদ্র। রোদ্র মাথা ঘুরিয়ে একবার সমুদ্রের দিকে তাকালো যে কিনা এই মুহুর্তে খাবার খেতে ব্যাস্ত। রোদ্রের এক মুহুর্তের জন্য মনে হলো ঝুড়ি থেকে ফল কাঁটার ছুড়িটা নিয়ে হয় সমুদ্রের বুকে বিঁধিয়ে দিতে নয়ত নিজের বুকে বিঁধিয়ে এই যন্ত্রণার শেষ করে দিতে। কালকে রাতে সমুদ্র শশীকে ছুঁয়েছে ওকে ভালোবেসেছে এটাই সয্য করতে পারছে নাহ রোদ্র। দুজনের মধ্যে কেউ একজন মরে গেলে শান্তি লাগত। কেননা এই বেথ্যা অসহনীয়। ধ্যান ফিরতেই প্রচন্ড অনুশোচনা ভুগতে লাগলো রোদ্র কিছুক্ষণ আগে সে কি ভাবছিলো এটা মনে হতেই নিজের উপর ঘৃণা হতে লাগলো। সে কী ভাবছিলো নিজের বড় ভাইকে মারার কথা ভাবছিলো সে। একদিকে ভালোবাসা অন্যদিকে নিজের বড়ভাই। মন আর মস্তিষ্কের খেলায় সত্যি এবার নিজেকে কেমন পাগল পাগল লাগছে। খাবার ছেড়ে হঠাৎই উঠে দাঁড়ালো রোদ্র।

‘কিরে দাঁড়িয়ে পড়লি যে কিছুই তো খেলি নাহ।

‘আমার খাওয়া হয়ে গেছে মা আমি উপরে যাচ্ছি।

‘কথাটা বলে একটুও দাঁড়ালো না রোদ্র সোজা সিঁড়ি বেঁয়ে উপরে চলে গেলো। চেয়ারে বসে সবটাই দেখলো সমুদ্র কিন্তু কিছুই বলল নাহ। শশী রোদ্রের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে মনে মনে এটাই ভাবছে৷ প্রথম যেদিন দেখা হলো সেই রোদ্র ভাইয়া আর আজকের রোদ্র ভাইয়ার মধ্যে আকাশ পাতাল তফাত। হঠাৎ কি এমন হলো যে ওনি এতোটা বদলে গেলেন।

#চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here