ভালোবাসার_কাব্য_গাঁথবো (৪২)

0
1258

#ভালোবাসার_কাব্য_গাঁথবো

(৪২)
” এখানে কয়েক লাখ টাকা আছে। এটা নাও আর এ শহর ছাড়ো। টাকাটা আমি দিচ্ছি না। ভাইয়া দিচ্ছে। ”

” বিশ্বাস করিনা। তামিম কখনোই আমাকে টাকার উপর মাপে না। ”

” কিন্তু তুমি মাপো। এতোকাল যাবৎ তোমার চাওয়া অনুযায়ী সব হয়েছে বাট আজ হচ্ছেনা। এবার থেকে হবেও না। তোমাকে হেল্প না করতে পারার জন্য আমি সরি। ”

” তানভীর আমিতো তোমার খারাপ চায়নি। মানছি একটা সময় খারাপ কিছু করেছি বাট তোমাকে হেল্প করার ছুতো পেলে বসে থাকিনি। রাজনৈতিক স্বার্থে তুমি যেখানে যেখানে শো করতে বলেছো সেখানেই গিয়েছি। ঐ টাকা না হলে কি আমার চলতো না? তোমার বউটাও কত কষ্ট পাচ্ছিলো “।

” সেজন্য আমার বউটার মাথাটা বিগড়ে দিলে। ”

মুখের কথা কেড়ে নিয়ে তেড়ে যায় ফ্লোরার সামনে। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রাগ কন্ট্রোল করে। বাহিরের দিকে তাকিয়ে ফুস করে শ্বাস ছাড়ে। শান্ত গলায় বলে,
” তুমি কি করতে চাইছিলে তা তুমিই জানো। ধরে নিলাম তুমি আমার বউকে হেল্প করতে চেয়েছিলে কিন্তু সেটা নিজের স্বার্থে। আমার বউ যখন আমার জন্য পাগল তখন তুমি ওর মাথাটাই বিগড়ে দিলে যাতে ও তোমাকে ভালো মনে করে খান বাড়িতে তোমার প্রবেশের দ্বার সৃষ্টি করতে সাহায্য করে। জানোই আমি আমার বউয়ের প্রতি কতটা দুর্বল। এই সুযোগে গুটিও সুন্দর ভাবে চেলেছো। ভালো সাজতে সাজতে যখন মনের মধ্যে হিংস্রতা উঁকি দিতো তখন ঠিকই কথায় কথায় কষ্ট দিতে। কষ্ট পেয়েও আমার বউটা চুপ থাকতো আমার জন্য। আমার অবুঝ বউটাও বুঝে গিয়েছিলো আমাকে রাগালে আমি নিশ্চয়ই কন্ট্রোল হারাবো। ”

” সোজা আঙুলে তো তোমাদের ঘি ওঠে না।”

” তাই তুমি ঐ ছেলেটার দিকে আমার বউকে এগিয়ে দিবে? তুমি হয়তো ভাবছো তুমি আমার উপকার করেছ কিন্তু তুমি আমার অপকার টাই বেশি করেছ।
লাব্বুর কষ্ট লাঘব করতে গিয়ে আরো কষ্ট দিয়ে ফেলেছ। তুমি জিজ্ঞেস করে দেখতে পার ও কতোটা কষ্টে আছে। যে আমি আমার বউকে হারানোর ভয়ে থাকি সর্বদা সেই অনিশ্চয়তা আমার বউয়ের ছোট্ট বুকে ভয়ের সৃষ্টি করেছে। আমি ওকে যতই বলি ভালোবাসি ওর চোখে অবিশ্বাস দেখতে পাই। ওর ব্রেইন এটা বিশ্বাস করে নিয়েছে আমি তাকে চাইনা কিন্তু ও আমাকে নিজের জোরে ধরে রেখেছে এবং সারাজীবন রাখবে। কতটা হেল্পলেস লাগে জানো ? ওর কষ্ট যেন না বাড়ে সেজন্য দূরে দূরে থাকতাম। ওর মনে সুপ্ত অনুভূতি কাজ করতো কিন্তু এতোটাও উগ্ৰ ভাবে না যতটা তোমার সান্নিধ্য গিয়ে হয়েছে। কতটা কষ্ট করে ধৈর্য্য ধরে ওকে এচিভ করতে পেরেছি সেটা একমাত্র আমি জানি। আমাদের জীবনটা সুন্দর ভাবে শুরু হতে পারতো। দুটো বছর সময় নিয়ে ধীরে সুস্থে আমরা জীবনে শুরু করতে পারতাম। আমরা এক হবার পর কখনোই আলাদা হতাম না। তোমার জন্য সবটা নষ্ট হয়ে গেলো। বিশৃঙ্খল জীবন আমার পছন্দ না। তোমার জন্য আমি বিশৃঙ্খলা পূর্ণ জীবন যাপন করছি। তুমি থাকলে আমার বউ আবার কষ্ট পেতে পারে। সো চলে যাও।”

” আমি সব ছেড়ে ছুড়েই এসেছি তানভীর। সংসার করবার জন্য। একটু দয়া করো। তোমাদের ডিস্টার্ব করবোনা। কোন ব্যপারে আমাকে পাবেও না। প্রয়োজনে দাসী হয়ে থাকবো।”

” ছাড়া গরু গোয়াল ঘরে বসে থাকে না।”

” তামিম কি বলে? আমার তামিমের সাথে কথা আছে।”

” ব্লক লিস্টে আছো। আর শোনো। আমার বউয়ের আশে পাশে আসবেনা। আমিই আসতে দিবো না। এতো দিন আমি চেয়েছি জন্যই তুমি আসতে পেরেছিলে। ভেবেছিলাম আমার প্রতি তুমি সামান্য তম গ্ৰেটফুল। কিন্তু না। তুমি তোমার রং দেখিয়ে দিলে। এটা আর সম্ভব না। ”

” টাকা গুলো নিয়ে যাও তানভীর। আমি চাইনা।”

” শুনলাম মিডিয়ার কাজ ছেড়ে দিয়েছো। রেখে দাও লাগবে। এরকম দানের টাকা খান বাড়ি থেকে প্রতিবছরই যায়।”

তানভীর রাত বাড়ালো না।‌ দশটার দিকেই এসে রুমে ঢুকলো। লাবিবা হুট করেই তানভীর কে দেখে চমকে গেলো। আসার কথা তো ছিল না। এই ছেলেকে তো বলে বলেও আনা যায়না। যার যা স্বভাব তাই। এসেই ওয়াশরুমে ঢুকলো। বেরোলো উদোম গায়ে। এখন নিশ্চয় বিছানায় গা এলিয়ে দিবে। লাবিবা একটু লজ্জা পেলো। প্রচন্ড সাহসী মেয়েটা শার্টলেস তানভীরকে দেখেলেই লজ্জা পায়। অনান্য বিষয়ে লজ্জাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিতে পারলেও তানভীরের কাছে এলে অদ্ভুত ভাবে তাকে লজ্জা ঘিরে ধরে। কিছুতেই ইগনোর করতে পারে না। লজ্জারা যেন ঘুমিয়ে থাকে। তানভীরের আগমনে জেগে উঠে তাদের যাপন শুরু করে ‌। লাবিবা মনে মনে দোয়া করে,
“আল্লাহ আমার লজ্জা কমিয়ে দাও সারাজীবন ধরে নয়তো ভালোবাসার দাবী উনার সামনে পেশ করতে পারবোনা।”

তানভীর রুমের বাইরে চলে গেলো। ফিরে এলো মিনিট দুয়েকের মধ্যেই। রুমজোড়াও চোখ বুলিয়ে নিলো। লাবিবা বুঝলো তাকেই খুঁজছে। মুখ টিপে হাসলো। বেলকনির পার্দার আড়াল ছেড়ে গিয়ে গ্ৰিল ধরে দাঁড়ালো। আকাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। তারকারাজির দেখাও নেই। ঠান্ডা হাওয়া বইছে। মনে হয় রাতে বৃষ্টি হবে। এরকম ওয়েদার বেশ ভালো লাগে। ঠান্ডা বাতাসে লাবিবার গলার উড়না ওড়ছে । লাবিবা ধরলো না। উড়তে থাক। আজ তার মন ও উড়ু উড়ু করছে। কেমন যেনো সুখ সুখ অনুভব করছে। সেই সুখের নাম তানভীর খান। তার অগ্ৰাহ্য যেমন বিস্বাদের সৃষ্টি করে তেমনই তার একটুখানি এট্যানশন সুখের সৃষ্টি করে। উড়নাটা এই তো উড়ে যাবে যাবে। কেমন ঢেউ খেলছে। এই ঢেউ খেলা দেখতে লাবিবার সুখ লাগছে। ওমনি ওড়নাটা মুষ্টিবদ্ধ হলো। লাবিবা পেছনে তানভীরের উপস্থিতি বুঝে ঘুরে দাঁড়ালো। ওড়না শোভা পাচ্ছে তানভীরের গলায়। বলিষ্ঠ দেহে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে কোমড়ে হাত রেখে অভিনব কায়দায় দাঁড়িয়ে আছে। লাবিবা যেনো মৃদু কেঁপে উঠলো। এতো কেন নজর বেহায়া হয় এই মানুষটা সামনে থাকলে? তানভীরের হাত নিজে কোমড় থেকে নেমে লাবিবার কোমড় পেঁচিয়ে কাছে টেনে নিলো। ” কখন থেকে খুঁজছি?” বলতে বলতেই নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। লাবিবা হাত বাড়িয়ে গলা জড়িয়ে ধরলো। গালে টুপ করে চুমু দিয়ে জানালো,
” আমি আশা করিনি আপনি আসবেন। ”

“আমিও আশা করিনি আমার বউটা আমাকে এতোটা ভালোবেসে ফেলবে। ”

” খান সাহেব, এখানে থাকলে কি হয়?”

” শ্বশুড়ের বাসায় কেন থাকবো?”

” শ্বশ্বুড়ের বাসা কি আপনার বাসা না?”

” না। তবে শহরে যে বাসাটার কাজ শুরু হয়েছে সেটা শ্বশুড়ের বাসা হলেও আমার বাসা। ”

” কিভাবে?”

তানভীর লাবিবাকে ছেড়ে দেয়। বেলকনি থেকে রুমে যেতে যেতে বলে,
“:তোমাকে বলা যাবে না। তুমি সিক্রেট ফাঁস করে দিবে।”

লাবিবাও পিছু পিছু আসে।
” বলুন না? আমি বলবো না। ”

” উঁহু। বাপ সোহাগী মেয়েকে একদমই বলা যাবেনা। ”

“‘ বলবো নাতো। শুনার পর থেকে স্বামী সোহাগী হয়ে যাবো। প্রমিজ । ”

” ঐ বাড়িটার টাকা আমি ইনভেস্ট‌ করছি। সব”

” আব্বু রাজি হবেনা। ”

” জানবেনা। ”

” কিন্তু কেনো দিচ্ছেন?”

” আমার শ্বশুড় আমাকে অনেক বড় একটা গিফট দিয়েছে। আমার মনে হলো তাকেও কিছু গিফট করা উচিত। যদিও এই গিফট তোমার আব্বুর দেওয়া গিফটের কাছে কিছুই না। দুটোকে এক পাল্লায় মাপা যায়না।”

” সেই গিফট টা কি আমি?”

” উহু। আমার বউ। যাকে আমার শ্বশুড় শ্বাশুড়ি জন্য আজ আমি পেয়েছি। যারা আমার বউকে এতো যত্ন করে ভালোবাসা দিয়ে আমার জন্য তৈরী করেছে। বিশ্বাস রেখে আমার হাতে তাদের আদরের টুকরো কে তুলে দিয়েছে। আমি তাদের এই ঋণ হয়তো কোনদিন শোধ করতে পারবো না। কিন্তু তাঁদের এবং তাদের মেয়ের যেন কোনো অসুবিধা না হয় সেদিকটা দেখতে পারবো।”

তানভীরের কথা শুনে লাবিবার চোখে জল চলে এলো। ইসমাইলের সাথে তানভীরের কথা কাটাকাটি হয় লাবিবা জানে কিন্তু তানভীর এতো গভীর ভাবে চিন্তা করে দায়িত্ব তুলে নিতে পারে এটা সম্পূর্ণ অজানা। লাবিবার মনে পড়লো তার বাবা এতো কেনো বাছবিচার করে তার মেয়ের জন্য পাত্র নির্বাচনে! লাবিবার অগোচরে যে প্রচুর সমন্ধ আসতো এটা লাবিবা জানে। বাবা হয়তো জামাই চায়নি চেয়েছিলো ছেলে যে তার মেয়ের দায়িত্বের পাশাপাশি তাদের ছেলের অভাব টাও পূরণ করবে।

তানভীর মুচকি হেসে লাবিবার চোখের জল আঙুলে মুছে নিলো। লাবিবা কাতর কন্ঠে বললো,
” আপনি প্রতিদিন আসবেন খান সাহেব। না পারলে প্রায় ই আসবেন। আমি প্রতিদিন আপনাকে দেখে ঘুমোতে চাই। ঘুম ভাঙার পরেও আপনাকে দেখতে চাই। আমার দিন ফুরোবে মাস ফুরোবে বছর ফুরোবে তবুও আপনাকে দেখার রেশ যেনো না ফুরোয়।”

” আমাকে এতো ভালোবাসার কারণ কি লাবিবা? এমন তো নয় তুমি আমাকে আগে থেকেই ভালোবাসো । আমার সৌন্দর্য বিত্তের দিকে তুমি মুগ্ধ হও এটা আমি বেশ ভালোই জানি। নাকি শুধু স্বামী বলেই এতো কিছু?আমার জায়গায় যদি অন্য কেউ হতো তাহলে তাঁকেই ভালোবাসাতে।”

” বললাম না আল্লাহর জন্য আপনাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। আপনি আমার জীবনের প্রথম এবং শেষ পুরুষ। আমার স্বামী। আমার অর্ধাংশ। তিন কবুল উচ্চারণ করে নিজেকে আপনার নামে করে দিয়েছি। আল্লাহর জন্য আমি আপনাকে ভীষণ ভালোবাসি। কিন্তু টান টা আগে থেকেই ছিলো। আপনার সাথে আলাপ হবার পর থেকেই ভীষন আপন মনে হতো। মনে হতো ভরসার ছায়া আমার আব্বুর মতো। সেজন্য ই বার বার আপনার কাছে ছুটে গিয়েছি। আপনার অবহেলা আমাকে বড্ড পোড়ায়। কষ্ট দেয়। আমি কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে যাই। শক্তি পাইনা। ”

” তুমি প্রচন্ড সাহসী লাবিবা। মেয়ে হয়েও মনে যাই থাকুক কোনো দ্বিধা দ্বন্দ্ব ছাড়াই বলে দিতে পারো। অকপটে এভাবে সত্য বলতে অনেকেই পারেনা। ভালোবাসার মতো সেন্সিটিভ বিষয়ে তো আরো পারেনা। আমিও পারিনা বিশ্বাস করো। ”

” কোথায় লেখা আছে সবসময় ছেলেরা ভালোবাসি ভালোবাসি বলে গলা শুকাবে আর মেয়েরা চুপ করে থাকবে। আমি মনের কথা মুখ ফুটে বলতে পারি এটাই কি আমার দোষ?”

” না এটা মোটেই দোষের কিছু নয়। এটা তোমার সাহসের পরিচয়। কিন্তু এই সাহসটা একটু পরেই উধাও হয়ে যাবে। গলা উঁচিয়ে ভালোবাসা জাহির করা মেয়েটা লজ্জায় বুকে মুখ গুঁজে পড়ে থাকবে। তখন এই মেয়েটার লজ্জাবর্ণ মুখটাই আমার তৃষ্ণা বাড়িয়ে দেয়। অদ্ভুত সৌন্দর্য ছড়ায়। যে সৌন্দর্য দেখার জন্য আমি তার কাছে ছুটে আসি। দেখতে চাও তুমি?”

লবিবা মুখ ঘুরিয়ে নিলো। কি সুন্দর করে প্রস্তাব পেশ করেন উনি। যেন যেন তেন ব্যপার! কিন্তু লাবিবার কাছে মোটেই যেন তেন ব্যপার নয়। বড্ড লজ্জাজনক ব্যাপার। এখন ধীরে ধীরে লজ্জা বাড়বে। পৃথিবীর সমস্ত লজ্জা তাকে চেপে ধরবে। স্বামীর বুকে লজ্জায় লেপ্টে পড়ে থাকবে সে। তানভীর লাবিবার লজ্জাটা ফিল করে হো হো করে হেঁসে উঠে। কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় একদম বুকের সাথে চেপে ধরে। লাবিবাও তানভীরের পিঠ দুহাতে জড়িয়ে ধরে। লাবিবার কপালে চুমু এঁকে তানভীর প্রশ্ন করে, ” আমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবে?”
” পারবো। ”

” সত্যি?”

” সত্যি পারবো। তবে অনেক কষ্ট হবে। আমি যদি বলি আপনাকে ছাড়া বাঁচবো না তাহলে আল্লাহ তায়ালা আপনাকে ছাড়াই আমাকে বাঁচাবে। দুনিয়াতে সবাই সবার নির্দিষ্ট আয়ু নিয়ে এসেছে। কেউ কারো জন্য মরে না। আমি আপনাকে ছাড়তে চাইনা।প্লিজ আমাকে ছেড়ে যাবেন না। ”

” যাবোনা।”

” ডিনার করেছেন আপনি?”

” করবো এখন সারা রাত ধরে। ”

চলবে ___

গতকাল গল্প দিতে পারিনি। হুটহাট একটা ফ্যামিলি গ্যাটটুগেদারে গিয়েছিলাম সেজন্যই লিখতে পারিনি। গল্পটা আগে যতটুকু লেখা ছিলো সেটা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। আপনাদের চাহিদা অনুযায়ী এখন লিখছি গল্পটা টেনে। আর বেশি পর্ব হবেনা ইনশাআল্লাহ। ৬০ পর্বের আগেই ক্লোজ করার চেষ্টা করবো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here