#ভালোবাসার_কাব্য_গাঁথবো
(৫৮)
বৈরী আবহাওয়া। আকাশে ছেয়ে গেছে কালো মেঘ। ছাদে আয়োজন করা হয়েছে ব্যাচেলর পার্টি। এই পার্টির খবর ব্যাচেলররা ব্যাতীত কেউ জানে না। জানার কথাও না। খুব গোপনে আয়োজন করা হয়েছে। জানাজানি হলে পার্টিটা হতো না। ফিরোজ খান অবশ্য কিছু বলতেন না। উনাকে বয়স্কদের কাতারে ফেলা যায়না। এক্সপেরিয়েন্সড পার্সন। যুবকদের উৎসাহ দিতে পিছ পা হন না। কিন্তু নাক ছিটকাতো কনেদের বাড়ির গার্ডিয়ান। তাঁদের ফ্যামিলিতে এসব এলাউড না। আত্মীয় সম্পর্ক হচ্ছে দুই স্তরের ফ্যামিলির মধ্যে। এটাই কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাঁধা।
রাত যখন নিশুতি তখন এক ব্যাগ ওয়াইন নিয়ে ফিরে এলো নাকিব। চোখে মুখে উচ্ছাস। বিদেশী ওয়াইন গুলোর প্রতি কম বেশি প্রায় সবারই লোভ। যদি হয় সুইজারল্যান্ড এর তাহলে তো কথাই নেই। অর্গানিক আঙুরের ওয়াইন। সিঁড়িতে তামিম পিঠে চাপড় মারলো। জিজ্ঞেস করলো,
” কেউ কিছু বুঝেনিতো?”
” বাইরে কেউ নেই। ”
” ভদকা আছে তো?”
” খুব কম। মাত্র দুই বোতল। ”
” চলবে। ”
উচ্চস্বরে চলছে ডিজে বক্স। পার্টিতে উপস্থিত আছেন শহরের বড় ডিজে এ. কে. আখম। তানভীরের বসম ফ্রেন্ড। ফ্রিতে গিফটও বলা চলে। তামিম নিজে একজন ডাক্তার। আজ সে নিজের পরিচয় থেকে বেরিয়ে এসেছে। হাতে মদের গ্লাস। গলায় উৎকণ্ঠা। পজিশন টপ ফ্লোরের মাঝ বরাবর। তামিমের ফ্রেন্ডরাও উপস্থিত। বউদের আড়ালে মাল গিলতে পেরে সবাই তামিমকে নতুন বিয়ের জন্য বাহবা দিচ্ছে। শরীর দুলাতে দুলাতে তামিমকে নিয়ে মজেছে।
” দোস্ত! ডোন্ট মাইন্ড। তোকে আমরা হিংসা করি। আমরা এক ফুলের মধু খেয়ে জীবন পার করছি তুই শালা দুটো ফুলের মধু চুষে নিংড়ে নিবি। ”
” শালা কচি বউ পেয়ে আবার আমাদের ভুলে যাস না।”
” ভয় নেই দোস্ত তোর কচির দিকে আমরা নজর দিবো না। বন্ধুর বউ বোনের সমান। জয় বন্ধুর বউ বোনের জয়। ”
” জয় বন্ধুর বোনের জয়। ”
” ধুর শালা তামিমের বউয়ের জয়। ”
তামিমের হয়তো খারাপ লাগতো। এরকম মাতলামো যুবক বয়সে সে বেশ করেছে। কিন্তু সঙ্গী ছিলো ফ্লোরা। আজ করছে রোজের জন্য। যে মেয়েটা এখান অব্দি সে আনতে পারছেনা। এসবে অভ্যস্ত নয়। খারাপ মিন করতে দুবার ভাববে না। তামিমের ফ্রেন্ডরা তামিমকে সিডিউস করলো, ” তোর বউকে কল দে। ”
” আমার বউ আমার না। ”
” তাইলে আমাক দিয়ে দে। ”
” ধুর শালা!”
কলটা তামিম ঠিকই দিলো। কিন্তু বউয়ের নাম্বারে কল দিতে গিয়ে কল চলে গেলো ছোট বউ লেখা নাম্বারে। বাড়ির ছোট বউয়ের কাছে।
ঠান্ডা আবহাওয়ায় লাবিবার ঘুমটা ভীষন গাঢ় হলো। কত রাত পর আজ ঠিক সময়ে ঘুমিয়েছে জানা নেই। সারাদিনের ধকলে শরীরটা আর চলছে না বললেই চলে। ক্লান্তিতে তানভীরের খেয়ালও নেই। চোখে মুখে উপচে পড়া ঘুম। রাত আড়াইটা নাগাদ শিয়রে রাখা ফোনটা বেজে উঠে। গাঢ় ঘুম হালকা হতেও দুবার ফোন বেজে বন্ধ হয়ে যায়। তৃতীয়বারের মতো ঘুমটা হালকা হয়ে আসে। হাতরিয়ে ফোন কানে গুঁজে হ্যালো বলে। ওপাশ থেকে এমন কন্ঠ ভেসে আসে লাবিবার ঘুম ছুটে যায়। হুড়মুডিয়ে উঠে বসে। ফোনের স্কিনে তামিমের নাম্বার দেখে আতঙ্কে ঢুক গিলে। অদ্ভুদ আওয়াজ বের হয় মুখ থেকে ” ভাইয়া!”
মাতাল হয়ে ঢুলতে ঢুলতে একের পর একজনকে ছাদ থেকে নেমে আসতে দেখা যায়। তামিমও আছে তাঁদের মাঝে। নিজের ব্যালেন্স টুকু রাখতে পারছে না। সিড়িতেই দুবার বসে পড়লো। লাবিবার আড়ালে দাঁড়িয়ে কাঁপতে লাগলো। এমন দৃশ্য আগে কখনো তার দেখা হয়নি। তামিম এসব খেতে পারে এটা অবিশ্বাস্য। পুরোপুরিই অবিশ্বাস্য। অনেকক্ষন আর কাউকে না দেখতে পেরে লাবিবা আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। দৌড়ে উঠলো সিড়ি বেয়ে। ছাদে এরা মদের আড্ডা বসিয়েছিলো এটা নিশ্চিত। কিন্তু পা রাখতেই তার ধারণা পাল্টে গেলো। এখানে মদের আড্ডা না শুধু রিতীমত ডিজে পার্টি চলেছে সকলের আগোচরে। রুমের ভেতর থেকে বাহিরের শব্দ মোটেও কানে যায়না। বারও বসানো হয়েছে। এতোকিছু ঘটে গেলো আর লাবিবা জানলোই না? ভীষন অবাক হলো। তামিমের মতো একজন ভদ্র ডাক্তার যদি ড্রিংকস করতে পারে তাহলে তানভীরকে মোটেই বিশ্বাস নেই। সেই ছেলে আগে থেকেই বারে বারে ঘুরে। না না এমন কিছু না। লাবিবার কথা ভেবে অন্তত তানভীর এসব ছুঁয়েও দেখবেনা। নিজে নিজে মনকে বোঝাতে লাগলো। কিন্তু কোথায় উনি? সবাই বাইরে তিনি ঘুমোচ্ছে? খটকা লাগলো। দৌড় লাগালো সেকেন্ড ফ্লোরের দিকে। তানভীরের রুমের দরজা বন্ধ। যাওয়ার ও সাহস নেই। ভেতরে নিশ্চয় তানভীর একা থাকবেনা। মাতাল ভাসুর দেবর ননদাইও আছে। লাবিবা ডিসাইড করলো ফিরে যাবে। যেই না ঘুরেছে ওমনি শক্ত পোক্ত কিছুর সাথে কপালে লেগে গেলো। মৃদু ব্যথায় হকচকিয়ে পিছিয়ে গেলো লাবিবা। তানভীরকে বাইরে এভাবে দাড়িয়ে থাকতে দেখে কপাল কুঁচকে তাকালো। নেশাক্ত জোড় চোখে চোখ পড়তেই লাবিবা হাত পা ছেড়ে দিলো। তানভীর গুম সুরে টেনে ডাকলো,”জান..”।
সর্বনাশ। বলিষ্ঠ বাহুর বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ছটফট করলো। ছাড়াতে পারলো না। মুখ থেকে উটকো অথচ মিষ্টি স্মেল পেয়ে মাথা ঘুরিয়ে গেলো। আলতো ধাক্কায় দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলো। কিছু বলার আগেই কমলার কোয়ার মতো ঠোঁট জোড়া তানভীর নিজ ঠোঁটের ভাঁজে নিয়ে নিলো। আগ্ৰাসী চুমুতে পিষিত হলো কোমল ঠোঁট। অবাধ্য হাতের বিচরণ পুরো কোমড় জুড়ে। তৃষ্ণার্ত কোপত কপোতী উগ্ৰ হলো দুটি দেহ। তানভীরের এমন আচরণে লাবিবা মুহুর্তেই ব্যালেন্স হারালো। একসময় ঠোঁট ছেড়ে কামড়ে ধরলো আপেলের ভাঁজে তৈরী থুতনি। ব্যথায় লাবিবার চোখে জল চলে এলো। সমস্ত শরীরের শক্তি দিয়ে তানভীরকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো। দু পা পিছিয়ে গেলো সে। তানভীর ছাড়লো না। ফের জড়িয়ে নিলো লাবিবার কোমড়। মুখ গুজলো বুকে। লাবিবার গা গুলিয়ে উঠলো। আবার সেই গন্ধ। যেটা অসহ্য। সে প্রতিবাদ জানালো, ” দূরে সরুন। এসব ছাইপাস খেয়ে আমার কাছে আসছেন লজ্জা করছে না?খান সাহেব! আপনি ড্রিংকস করেছেন আমি এটা নিতে পারছিনা। দূরে সরুন আমার থেকে।বমি পাচ্ছে আমার।”
তানভীর উঠে এলো। লাবিবার থেকে দুরত্ব বজায় রেখে দাঁড়ালো। পরক্ষনেই আবার এগিয়ে এসে দুহাতে দু গাল চেপে ধরলো। কামড় দেওয়া জায়গাটায় আলতো চুমু খেলো। আদুরে গলায় বললো,
“আমার বউ। সোনা বউ। ”
লাবিবা কেঁদে ফেললো।
” আপনি মদ খেয়েছেন কেন?”
” হুসস! কাঁদে না। আমি খায়নি তো জান। ”
” ঠিক করে দাঁড়াতে অব্দি পারছেন না। আবার মিথ্যে বলছেন আমাকে? আমি জানতাম আপনি এসব ছাইপাস ধরে দেখেন না। কিন্তু আপনি আজ মদ খেয়ে মাতলামি করছেন। ”
” উঁহু। খায়নি তো বউ। কাদিস না কলিজা। ”
” আপনি ছাড়ুন আমাকে। আমার সামনে আসবেন না।”
” আর কতো আড়ালে থাকবো জান? আর পারছিনা। কসম! পারবো না। ”
হাউমাউ করে কান্না জুড়ে বসলো তানভীর। লাবিবা পড়লো মহা বিপদে । হুটহাট এরকম সিচুয়েশনে সে নিজেও পুরো ব্ল্যাংক। বার বার চুপ চুপ বলতে লাগলো। তানভীর চুপ হলে তো। আচ্ছা বিপদে পড়া গেলো। লাবিবা তানভীরকে ছেড়ে দৌড় লাগালো নিজের রুমের দিকে। সিঁড়িতে কাছে গিয়ে আবার ফিরে এলো। তানভীরকে রুমে রেখে যাবে। নয়তো বেচারা হয়তো এখানেই পড়ে থাকবে। কেউ দেখলে সর্বনাশ। লাবিবার আত্ত্বীয় স্বজন অনেক আছে এখানে। উনিশ থেকে বিশ হলেই খবরটা বাবার কানে চলে যাবে। নিশ্চিত যে জামাইকে নিয়ে এতো গুন গান করছে পরে তাকে নিয়েই রসিয়ে কষিয়ে বলবে, “কিগো ইসমাইল! জামাই দেখি নেশা করে। বড়লোকের নেশাখুর পোলা দেখে মেয়েরে জলে ফেলে দিলে! ” তখন ইসমাইলের রিয়েকশন কেমন হবে সেটা জানা কথা। এমনিতেই তানভীরকে উনি পছন্দ করেন না।
লাবিবা রুমের দরজায় নক দিলো। দরজা খুলে গেলো হাত পড়তেই। ভেতরে লাইট অন করা কিন্তু একেবারে ফাঁকা। কেউ নেই। বাকিরা কোথায় আছে কে জানে? মাতাল হয়ে কার ঘরে ঢুকেছে। লাবিবা যেনো স্বস্তি পেলো। বুকে হাত রেখে শ্বাস ফেললো। তানভীরের কাছে গিয়ে জোড় করলো,” শুনুন! আপনি ভেতরে আসুন। কাঁদবেন না। ”
তানভীর কান্না অফ করলো। কিন্তু লাবিবাকে ছাড়লো না। আবার জাপটে ধরলো। লাবিবা জোর করে তানভীরকে ধরে নিয়ে রুমে গেলো। দরজা ভেজিয়ে দিয়ে খাটে নিয়ে গিয়ে তানভীরকে বসালো। ছেড়ে দিতেই তানভীর খাটে হা পা ছেড়ে দিলো। এমন পরিস্থিতি দেখে লাবিবার বসে কাঁদতে ইচ্ছে করলো।হাত পা সোজাসুজি করে তানভীরকে শোয়ালো। চলে যেতে নিলে তানভীর লাবিবার হাত শক্ত করে মুঠোয় পুড়ে নিলো। লাবিবার মাথা চরম মাত্রার খারাপ হয়ে গেলো। হাত ছাড়িয়ে নিতে চাইলো,
” ছাড়ুন। একদম ধরবেন না আমাকে। এক্ষুনি ছাড়ুন।”
” আই লাভ য়্যু জান।”
” মাতলামো বন্ধ করুন।”
” য়্যু সাউট মি জান।”
মুখটা বড্ড নিষ্পাপ দেখালো। লাবিবা আর চিৎকার করতে পারলোনা। শুধু বললো,
“ঘুমিয়ে পড়ুন। সকালে আপনার সাথে আমার বোঝাপড়া হবে।”
ঝট করে তানভীর হাত টেনে বুকের উপর ফেললো। আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে বুকের নিচে ফেললো লাবিবাকে। মুখ নামিয়ে গলায় নাক ঘসলো। লাবিবা বুঝে গেলো এই ছোঁয়ার মানে। এখানে আর এক মুহুর্ত থাকা ইমপসিবল। কাল বিয়ে আজ! তাছাড়া যে কোনো মুহূর্তে যে কেউ চলে আসতে পারে। লাবিবা তানভীরের মুখটা দু হাতে আগলে ধরে মুখের উপর টেনে তুললো। চোখে চোখ রেখে বললো, ” আমি যাচ্ছি হে? কাল সকালে বিয়ে তো। একটা দিন প্লিজ ধৈর্য্য ধরুন। প্লিজ।”
” একটা সত্যি বলি জান? ট্রাস্ট মি আমি মাতাল নয়।”
লাবিবার কান্না ছেড়ে এবার হাসি পেলো। শরীরের ব্যালেন্স রাখতে পারছেনা অথচ বলছে মাতাল নয়।
” আরেকটা কথা বলি জান?”
“বলুন।”
” আমার না একটুও ধৈর্য্য নেই। কিন্তু তোমাকে বিয়ে করতে আমি যতটা ধৈর্য্যশীল হয়েছি তুমি না থাকলে নিজেকে এতোটা ধৈর্য্যশীল কখনোই মানতে পারতাম না। কেনো এতো অপেক্ষা করতে হয় তোমাকে নিজের করে পাবার জন্য? কোন আকাশের চাঁদ তুমি যে আমার আকাশে পৌঁছতে এতোটা সময় লাগিয়ে দিচ্ছো?”
” আপনার আকাশে তো আগেই যেতে পারতাম। আপনিই তো আমাকে রিজেক্ট করে দিয়েছিলেন। আপনার দোষেই এখন আপনার এতো কষ্ট।”
” আমিতো তোমাকে ভুলতে চেয়েছিলাম জান। পারলাম কই? তোমার ঐ হরিণীর চোখ, টিংটিংয়ে নাক, ছোট্ট তুলিতে আঁকা ঠোঁট আমার কল্পনায় জেঁকে বসলো। তোমার প্রত্যেকটা পদক্ষেপ আমার বুকে ঝড় তুলতে যথেষ্ট। তোমার এই নরম গরম গোলগাল দেহ! এইযে দুটো উমমমমমমমম ___”
তানভীর আর একটা কথা উচ্চারণ করতে পারলো না। লাবিবা মুখ চেপে ধরেছে তার। মৃদু শাসন করলো,
” অসভ্য!”
চলবে __

