সুখ_একটি_প্রজাপতি (৩৪)

0
311

#সুখ_একটি_প্রজাপতি (৩৪)

খাবারের টেবিলে বসে একচোট গল্প হলো। পুরো গল্পের কেন্দ্রবিন্দু অভিনব। ব্যক্তিগত ভাবে ছেলেটাকে সবাই পছন্দ করেছে। বিশেষ করে অভিনবর ব্যক্তিত্ব। কথায় কথায় কানাডার সব থেকে বড় চিরিয়াখানায় ঘুরতে যাওয়ার কথা হলো। মাহের অবশ্য এতে নারাজ। সে তার বউকে কোথাও বের হতে দিবে না। কিন্তু বেচারির অবস্থা ও বিশেষ ভালো নয়। ঘরে বসে থেকে থেকে কেমন যেন হয়ে গেছে। চিরিয়াখানায় না নিয়ে গেলেও মাহের বলেছে ভিডিও কলে রাখবে। এতেই যেন খুশি হলো মিশকাত। অবেশেষ ঠিক হলো ওরা সবাই টরন্টো বেড়াতে আসবে। যেহেতু শীত কমে এসেছে,তাই ঘুরেও মজা পাওয়া যাবে। একটা দিন থাকার কথা থাকলেও ওরা থাকল না। অভিনবর এ সিদ্ধান্তের কারণ হচ্ছে ঝিল। মেয়েটির অস্বস্তি চোখে পড়েছে। ফেরার পথে অভিনবর বাহু চেপে রইল ঝিল। ছেলেটা স্মিত হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
“একটা কথা বলবে অভিনব?”

“হুম।”

“মাহেরা আপু কি তোমায় পছন্দ করত?”

“করত না,এখনো করে।”

ঝিলের মুখটা মলিন হয়ে এল। অভিনব মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরল। সকলের অগোচরে গলায় নাক ঘষতে ঘষতে বলল, “ভয় পাচ্ছ?”

“না। ভয় কেন পাব।”

“তোমার চোখে ভয় দেখা যায় ঝিল।”

“জানি না। তবে তোমার পাশে ওকে দেখে ভালো লাগছিল না আমার।”

“বোকা মেয়ে। আমি কি তোমায় কখনো ছাড়ব?”

“তবু বুকের ভেতরটা কেমন করে যেন। এমন কেন হয়?”

“ঘুমাও। ভালো লাগবে।”

টরন্টো ফিরে এসে ঝিল একদমই ফুরফুরে হয়ে গেছে। বিশেষ করে ইহরিমা সরকারের জন্য। তিনি যে মাতৃস্নেহে মেয়েটিকে আগলে নিয়েছে তা বলতেই হয়। এমি আজকাল ফ্রি সময় পার করে। তাকে রান্না করতেই হয় না। উল্টো খাবার তুলে খাওয়ানোর মতো অবস্থা। ঝিলকে পেয়ে সে বেশ খুশি হলো।
“তোমাকে দেখে কি যে শান্তি লাগছে।”

“কেন এমি?”

“ওল্ড আন্টি তো আমায় কাজ ই করতে দেয় না। সারাদিন বসে থাকতে ভালো লাগে নাকি।”

“ওল্ড আন্টি!” ফিক করে হেসে দিল ঝিল। এমি নিজেও হাসল। তারপর বলল‍, “আন্টি বয়সের তুলনায় স্মার্ট আর সুন্দরী। এটা বলার পর আন্টি বলল যে তাকে নাকি পাম দিচ্ছি। তাই ওল্ড আন্টি বললাম।”

“বেশ তো।”

এমি আর ঝিলের গল্পের মাঝে ইহরিমা এলেন চপ আর মুড়ি মাখা নিয়ে। এমি এক চামচ মুখে দিয়েই বলল, “ওয়াও। এটা খুব টেস্টি।”

“হুম। বাংলাদেশে মুড়ি মাখা বেশ প্রচলিত।”

পাশ থেকে ইহরিমা বললেন, “কত বছর হয় দেশের মাটিতে পা রাখি না।” বলতে বলতে বসলেন তিনি। তারপর পুনরায় বললেন,
“জানো ঝিল, তোমার আম্মুকে কথা দিয়েছিলাম আমরা, দুটো পরিবারকে মিল করাবোই। কিন্তু কিছুতেই হচ্ছে না। এই ব্যথা আমায় শেষ করে দিচ্ছে।”

মায়ের কথা স্মরণ হতেই ঝিলের বুক চিন চিন করে উঠল। সেটা লক্ষ্য করে বুকে টেনে নিলেন ভদ্রমহিলা।
“এক আম্মু নেই তো কি হয়েছে? আমি আছি না? এখনো আন্টি বলে ডাকবে?”

“উঁহু।”

“তাহলে?”

“আম্মু।” শব্দটি উচ্চারণ করেই কান্নায় ভেঙে পড়ল ঝিল। ইহরিমার সরকারের দুটি চোখ ও ভেজা। এদের কথার কিছুই বুঝতে পারল না এমি। তবে এইটুকু বুঝতে পেরেছে কোনো এক স্মৃতি বেশ দহন দিচ্ছে।

এক সপ্তাহ পর মুনতাহা,মাহেরা,আফরা আর মাহের এল অভিনবর বাড়িতে। নানান গিফ্ট এনেছে ওরা। মুনতাহা গত কয়েকদিন অ্যালকোহল থেকে দূরে ছিল। তাই চেহারায় অদ্ভুত দ্যুতির দেখা মিলল। ঝিল কাছে আসতেই হাসল মেয়েটি।
“কেমন আছ ঝিল?”

“ভালো আপু। তোমাকে দেখতে বেশ ভালো লাগছে।”

মাহেরা এসেই অভিনবর সাথে গল্প জুড়ে দিয়েছে। সে দিকে তাকিয়ে ঝিল বলল, “মাহেরা আপুর বয়ফ্রেন্ড নেই?”

“ওর কথা আর কি বলব। উড়নচন্ডী সে।”

“আর আফরা আপুর?”

“সে তো তামীমের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। তবে আমাদের সম্পর্কটা ভাঙার পর থেকে ওদের সম্পর্কটাও মলিন হয়ে গেছে।”

অকপটে কথাগুলো বলেই মুনতাহা বলল,
“পৃথিবীর সব থেকে দুঃখের একটি হলো স্বামীর ভালোবাসা না পাওয়া। বিছানার সুখের থেকে মনের সুখ বেশি জরুরি। কিন্তু আমার ভাগ্য বড়ো খারাপ।”

“এমনটা বলিও না। আরফান ভাইয়া নিশ্চয়ই ভুল বুঝতে পারবে।”

“কিন্তু আমার কি উচিত হবে ফিরে যাওয়া?”

এ প্রশ্নের জবাব নেই ঝিলের নিকট। ওকে বিব্রত হতে দেখে মুনতাহা বলল, “আসো সবার সাথে বসি গিয়ে।”

ইশারায় কিছু একটা বলল ঝিল। অভিনব উঠে এসে বলল, “কি হলো?”

“মাহেরা আপুর সাথে এত গল্প কিসের হু?”

“জেলাস হচ্ছেন মিসেস?”

“তো। জেলাস হবো না।”

“আরে বাবা সৌজন্যতা বোধ থেকে গল্প করতেই হয়।”

“না তুমি করবে না।”

“আমার প্রজাপতি দেখি ভীষণ রেগে আছেন।”

“রাগব না?”

ঝিলের ঘাড়ে থুতনি ঠেকাল অভিনব। তারপর বলল, “হু হু রাগার ই কথা।”

“ছাড়ো।”

“না না ছাড়ব কেন? এখন তো ভালোবাসব।”

“কিসের ভালোবাসা। কোনো ভালোবাসা নেই। সব লোক দেখানো।”

“উম। বউ দেখি খুব রেগেছে।”

“আমার ভয় হয়।”

টুপ করে গালে ঠোঁটের ছোঁয়া দেয় অভিনব। তারপর বলে, “কিসের এত ভয়? তুমি জানো না তোমার অভিনব কতটা ভালোবাসে তোমায়।”

“তবু ভয় হয়।”

বলতে বলতে ছেলেটার বুকে মুখ গুঁজে দিল ঝিল। নরম তুলতুলে হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। অভিনবর অবাধ্য হাত দুটিও মেয়েটির স্পর্শের সাথে তাল মেলাল। মাহেরা এসেছিল পানি নেওয়ার জন্য। এ দৃশ্য দেখে থেমে গেল সে। সাধারণ দৃষ্টিতে লজ্জা পাওয়ার কথা থাকলেও ওর ভীষণ রাগ হলো। সাথে কষ্টে বুকের ভেতরটা খান খান হতে লাগল। প্রিয় মানুষের সাথে অন্য মেয়ের ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত আসলেই চোখে দেখা যায় না। কিন্তু ভাগ্য, সে তো নির্বিঘ্নে অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে।

মাহেরার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে চোখের জল ফেলত। কিন্তু মাহেরা একদমই তেমন করল না। তার বুকের ভেতর জ্বলছে ঠিকই তবে মুখের মধ্যে বিন্দুসম প্রকাশ নেই। সে এত বেশি ফুরফুরে মেজাজে যে ঝিলের সেটা নিয়েও ভয় হলো। মাহেরাকে সে আসলেই ভয় পাচ্ছে। রাতের বেলা বাড়ির সামনে বারবিকিউর আয়োজন করা হলো। মাহেরের গানের গলা ভালো। সে গিটার নিয়ে এসেছে। মাহেরা মিশুক প্রকৃতির বটে। সে নিজ থেকেই আয়োজনে হাত লাগিয়েছে। অন্যদিকে ঝিল চুপচাপ দেখছে। সে সঙ্গ দিচ্ছে মুনতাহাকে।
“আপু,একটা কথা জানার ইচ্ছে হচ্ছে।”

“কি কথা?”

“আরফান ভাইয়া কি শুরু থেকেই এমন ছিল?”

“সেটা তো জানি না বোন। তবে আমার ধারণা শুরুতেই তার জীবনে অন্য কেউ আসে নি।”

“তাহলে এমন কেন হয়ে গেল সে।”

“হয়ত আমা ভাগ্যটাই এমন ছিল। আমাদের পারিবারিক দেখায় বিয়ে হয়। সবথেকে অবাক করার বিষয় হচ্ছে বিয়ের প্রথম রাত্রিতেই সমস্ত ভালোবাসায় সিক্ত করে দিয়েছিল সে। অথচ এত বছরের সংসারে নাকি কোনো ভালোবাসা ছিল না। বড়ো বোকা আমি।”

মুনতাহার তপ্ত শ্বাসে টরন্টো শহরে যেন উষ্ণতা নেমে এল। শুকিয়ে যাওয়া দুটি চোখ আজ পুনরায় সিক্ত হলো। ঝিল দু হাতে আগলে ধরল। অভিনব সব আয়োজন শেষে ওদের ডেকে নিল। ঝিলের পাশে বসেছে সে। আর নাক বরাবর বসেছে মাহেরা ও আফরা। ওদের দুজনের রোমাঞ্চিত দৃশ্য দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। পাশ থেকে আফরা হাত খামচে ধরল।
“ওরা হাসবেন্ড ওয়াইফ। তাও অনেক বছর ধরে।”

“বাট আমার কি দোষ ছিল আফরা?”

“তোর উচিত নিজেকে কন্ট্রোল করা।”

“বাট আই কান্ট।”

মাহের তখুনি চিল্লিয়ে উঠল। “আমি একা গাইলে চলবে না। সবাইকে গাইতে হবে।”

সকলে সম্মতি দিল। গিটারের দু একটা শব্দ পেয়ে পাশের বাসা থেকে তিনটে বাচ্চা ছুটে এল। ঝিলের সাথে তাদের সম্পর্ক ভালো। এসেই বসে পড়ল ওরা। ঝিল হাসল। বাচ্চা গুলো আনন্দ পাচ্ছে বেশ। মাহের একটা ইংলিশ গানের মাঝ থেকে শুরু করল।

“গার্ল ইউ নো আই ওয়ান্ট ইউর লাভ,
ইউর লাভ ওয়াস হ্যান্ডমেড ফর সামবডি লাইক মি।
কাম অন নাউ ফলো মাই লিড,
আই মেবি ক্রেজি ডোন্ট মাইন্ড মি।”

গান গাওয়ার সময় মিশকাত ভিডিও কলে ছিল। সে সেখান থেকে ইনজয় করছে। গান শেষ হতেই মাহের মিশকাতের সাথে কথা বলতে লাগল। ওদের দুজনের এই মুহূর্তের প্রশংসা করছে সবাই। ঝিলের মাথাটা অভিনবর কাঁধে এলানো। বারবিকিউর দারুণ ঘ্রাণটা নাকে এসে লাগছে। তার সাথে আসছে মৃদু মিউজিকের আওয়াজ। হীম শীতল বাতাসে মিশে আছে চন্দন কাঠের সুবাস। ভালোলাগা আর ভালোবাসায় ভরে উঠেছে ওদের এই মুহূর্ত। অন্যদিকে কিছু হৃদয় ব্যর্থতার প্রহর গুনে চলেছে। সবার জীবনে সব সুখে থাকে না।

চলবে…
কলমে~ফাতেমা তুজ নৌশি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here