#কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা
১৫.
তাশদীদ ফজর নামাজটা শেষ করেই রওনা হলো হসপিটালের দিকে। গত রাতটা যে ওদের জন্য কতোটা ভয়ংকর গেছে, তা কেবল ওরাই জানে। প্রায় মাঝ রাতের দিকে রোজির মেয়ে হয়েছে। সিজারিয়ান অপারেশন। তবে বহু জটিলতা তৈরী হয়েছিলো। তাশদীদ রিংকিদের বাড়ি পৌঁছে রোজিকে খুবই গুরুতর অবস্থায় পায়। সিএনজিতে তৎক্ষনাৎ হাসপাতাল নেওয়া হলেও ডাক্তার রোজির অবস্থা নিয়ে শংকায় পরে যায়। অপারেশনের সময় রক্তের প্রয়োজন পরে। পরিস্থিতি এমন দাড়ায়, বাচ্চা অথবা মা, যেকোনো একজনকে বাচানোই তাদের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পরে। সৌভাগ্যক্রমে রোজির সাথে তাশদীদের ব্লাডগ্রুপ ম্যাচ করে যায়। রোজিকে হসপিটালে ভর্তি থেকে শুরু করে রক্ত দেওয়া, সম্পূর্ণটাই তাশদীদ নিজে সামলেছে। অস্থিরতা নিয়ে ছোটাছুটি করেছে রাতভর। রোজির মা কান্নাকাটিতে ব্যস্ত ছিলো, ওর বাবা ছিলো বাড়ি না ফেরার অপরাধবোধে দিশেহারা। বিপদে পরে দ্বিকবিদিক হারিয়ে ফেলেন তিনি।
এতোসবের মধ্যেও হুশে ছিলো কেবল রিংকি। তবে ওর দৃষ্টি ওটির দরজা কিংবা মা-বাবার দিকে ছিলোনা। ওর সবটুকো আগ্রহ ছিলো তাশদীদের দায়িত্বজ্ঞান নিয়ে। একটা ছেলে কারো এমন বিপদে কতোরকমভাবে ছুটতে পারে, চাক্ষুষ দেখে নিয়ে নিজের পছন্দের ওপর শুধু গর্ব অনুভব করেছে ও। বাচ্চাকে ওটি থেকে বের করার পর শুরুতে রোজির মায়ের কোলে দেওয়া হয়। সেসময় রিংকি ছিলো রেস্টিংরুমের বাইরে। রক্ত দেবার পর তাশদীদ কেমন আছে, তা দেখতে। খানিকটা সুস্থ হতেই তাশদীদ রোজির খোঁজ লাগায়। রেস্টিংরুম ছেড়ে এসে কোলে তুলে নেয় রোজির মেয়েকে। ছোট্টছোট্ট আঙুল, হাত, পা, চোখ, তোয়ালে মোড়ানো ছোট্ট শরীরটার মুখ দেখে মুহুর্তেই সব ক্লান্তি ভুলে যায় তাশদীদ। রোজির বাবা-মা সেসময়ে ধন্যবাদের ঝুলি খুলে বসেছিলো। তবে কিছুই কানে যায়নি তাশদীদের। নতুন প্রাণকে আদর দিয়ে, রোজির সাথে দেখা করে প্রীতিকার্নিশ ফেরে ও। ফজর পরে আরেকবার রোজি আর বাচ্চার খোঁজ নিতে কেবিনে নক করলো তাশদীদ। ধীর আওয়াজে বললো,
– রোজী? ঘুমোচ্ছো?
– না তাশদীদ। ভেতরে আসো।
তাশদীদ দরজা ঠেলে ভেতরে যায়। রোজি বেডে আধশোয়া হয়ে আছে। ওর বাচ্চা পাশেই ঘুমোচ্ছে। আর পাশের সোফায় রোজির মা ঘুমাচ্ছেন। তাশদীদ হাসিমুখে এগোলো। উঁকি দিয়ে বাচ্চার ঘুমন্ত মুখটা দেখে রোজীকে বললো,
– এখন কেমন আছো মা-মেয়ে? আমি যাওয়ার পর সমস্যা হয়েছিলো কোনো?
মাথা দুলিয়ে না বোঝায় রোজী। কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু জ্ঞান ফেরার পর ওকে যখন বেডে শিফট করা হয়, রিংকি তখন এসেই বলতে শুরু করে দিয়েছিলো, ওর জন্য তাশদীদ কতো ছোটাছুটি করেছে, ব্লাড দিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। কথাগুলো রিংকি গর্ব করেই বলছিলো। রোজি কেবল অবাক হয়ে দেখছিলো, ওর এই অবস্থায় ওর নিজের বোন ওর খোজ না নিয়ে, বাচ্চার খোজ না নিয়ে তাশদীদকে নিয়ে কতোটা ব্যস্ত। রোজির মা বাচ্চাকে নিয়ে ছিলেন। রিংকি ওর বাবার সাথে বাসায় চলে যায়। তাশদীদ ঝুকে দাড়িয়ে বাচ্চার ছোটছোট চোখমুখ দেখছিলো আর হাসছিলো। রোজি বললো,
– আমি তোমার চিরকৃতজ্ঞ তাশদীদ।
তাশদীদ রোজির দিকে তাকালো। মৃদ্যু ঘাড় নাড়িয়ে আবারো বাচ্চার দিক তাকিয়ে বললো,
– এসব বলতে নেই। বেবির নাম কি দিয়েছো?
– ভাবিনি এখনো।
– সেকি কথা। এখনো কেনো ভাবোনি? আর ওর বাবা কি বলেছে? আসছে কখন সে?
রোজির মুখ কালো হয়ে যায়। এমনিতেই স্বামীসুখ খুবএকটা ওর কপালে নেই। আল্টাসনোতে মেয়ে বাচ্চা দেখার পর থেকে ওর স্বামীর ব্যবহার আরো অস্বাভাবিক। ভদ্রলোক হয়তো ছেলে বাচ্চা চেয়েছিলেন। কল করে তাকেমেয়ে হওয়ার খবর জানিয়েছে ওর বাবা। কিন্তু সে বিষয়ে খুব একটা সুখ, আগ্রহ দেখায়নি সে। বলেছে এখন আসলে ছুটি নেই। কিছুদিন পর ছুটি নিয়ে আসবে। রোজি এমন প্রতিত্তর করেনি। যেনো ও জানতো, সে এমনটাই বলবে। মেয়ের জন্য ওকে একাই হতে হবে, তা বেশ ভালোমতোই বুঝেছে ও। জবাব না পেয়ে তাশদীদ সোজা হয়ে দাড়ালো। কিছুটা গভীরভাবে রোজিকে দেখে আবারো বললো,
– সব ঠিকাছে রোজী?
– হু? হ্ হুম তাশদীদ। ঠিকাছে সব। তুমি বরং এখন বাসায় যাও। অনেক ধকল গেছে। তোমার রেস্ট নেওয়া দরকার।
আনমনে জবাব দিলো রোজী। তাশদীদ একদন্ড চুপ রইলো। একটু ভেবে কিছু বলতে যাবে, তখনই বাবাকে নিয়ে কেবিনে ঢোকে রিংকি। রিংকির হাতে খাবারের বক্স। দরজার আওয়াজে চমকে ওঠে বাচ্চাটা। ঘুম ভেঙে যায় রোজীর মায়েরও। তাশদীদের মেজাজ খারাপ হলেও ও সেটা প্রকাশ করলো না। রিংকি একপাশে এসে দাড়ালো। ওর বাবা তাশদীদকে বললেন,
– কালরাতে তুমি যা করলে তাশদীদ…
– দায়িত্ব পালন করেছি আঙ্কেল। আর কিছুই না।বারবার এটা বলে আমাকে মহাত্মা সাজাতে চাইছো?
– আপনি মহৎ আত্মাই বটে। সেটা আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখেনা তাশদীদ ভাই।
রিংকির হেয়ালিপূর্ণ কথা এবার তাশদীদের সহ্যসীমা অতিক্রম করে। এমনিতেও ওর ওপর রাগ আছে ওর। ওর বুঝতে বাকি নেই, রিংকিই জোর করে ওর মাকে নিয়ে রোজিকে বাসায় একা রেখে প্রীতিকার্নিশ এসেছিলো। রোজি আর ওর বাচ্চার যে সমস্ত কমপ্লিকেশন তৈরী হয়েছিলো, পুরোটার জন্য দায়ী রিংকির এই হেয়ালীপণা। তাশদীদ হাত মুঠো করে দম নেয়। রিংকির বাবাকে বলে,
– তোমার সাথে কিছু কথা ছিলো আঙ্কেল। আলাদাকরে।
– আলাদাকরে কি কথা তাশদীদ?
– জরুরিই৷ বাইরে এসো। কথাগুলো বলেই আমি বেরোবো। ভার্সিটি যেতে হবে।
তাশদীদ বাইরে চলে গেলো। একনজর রিংকির দিকে তাকিয়ে পা বাড়ালো ওর বাবাও। রিংকিও বেরোলো না। কেবিনের দরজার থাকা চারকোনা স্বচ্ছ জায়গাটুক দিয়ে দেখলো, তাশদীদ বেশ গুরুত্বের সাথে ওর বাবাকে কিছু বুঝাচ্ছে। শুরুতে জবাব দেওয়ার চেষ্টা করছিলো ওর বাবা৷ কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই নেতিয়ে আসে সে। ঠোঁটের কোনের হাসি বাড়ে রিংকির। কেবিন থেকে বেরিয়ে আসে ও। তাশদীদ থামলো। রিংকির বাবা দমেছেন। কিন্তু তার মেয়ের হাসিটা এবারও ওর পছন্দ না। একটা ছোট্ট দম নিয়ে ও এগিয়ে আসলে। কিছু বলতে যাবে, রিংকি হাসিমুখে ঘাড় কাৎ করে বলে উঠলো,
– আপনি আর আমাকে পড়াবেন না তাশদীদ ভাই?
বিব্রতবোধ বিস্ময়ে পরিনত হয় তাশদীদের। কিছুটা অবাক চোখে চায় ও রিংকির দিকে। পরপরই নিজেকে সামলে বললো,
– ভালো হয়েছে তুমি নিজেই ব্যাপারটা রিয়েলাইজ করেছো। হ্যাঁ। আমি আর তোমাকে পড়াতে যাবোনা।
– আমার রিয়েলাইজেশন আপনার ভালোলেগেছে তাশদীদ ভাই?
তাশদীদ কিছুটা রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকালো। রিংকি উচু করে বাধা চুলের ঝুটি খুলে দিলো। আয়েশে হেয়ার ব্যান্ডটা কবজিতে ঢুকিয়ে বললো,
– আমি আপনাকে পছন্দ করি। আপনি আপনার অপছন্দের দিকগুলো আমাকে বলতে পারতেন তাশদীদ ভাই। আমি শুধরে নিতাম নিজেকে। কিন্তু আপনি ডিরেক্ট আব্বুকে বলছেন আমাকে আর পড়াবেন না। আপনার জানা উচিত তাশদীদ ভাই, আপনি না পড়ালে, আমি পড়াশোনা করবো না। আর পড়াশোনা আমার লাইফে না থাকলে আমিও বেচে থাকবো না। আপনাকে পছন্দ করার পরিনতিতে, ক্যারিয়ার শুরুর আগে আমার জীবন শেষ হয়ে যাবে তাশদীদ ভাই।
মেয়ের মুখে এতো বড়বড় কথা শুনে রিংকির বাবা নিজেই হতভম্ব হয়ে গেলেন। তবে বিচলিত হলো না তাশদীদ। বুকে হাত গুজে দাড়ালো ও। স্পষ্ট গলায় বললো,
– কি চাও?
– পড়াশোনা করতে চাই। বাচতে চাই। আপনি আগের মতোই আমাকে পড়াতে যাবেন। বিনিময়ে আমি আমার সব পছন্দ বিসর্জন দেবো।
তাশদীদ চুপচাপ দেখতে লাগলো, একটা মেয়ের জেদ কি পরিমানে তৈরী হলে সে এমন হাসিমুখে, স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুর কথা বলে? রিংকি জবাবের জন্য চোখ তুলে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। তাশদীদ একবার ওর বাবার দিকে তাকালো। বুঝেও অসহায়, নিরুপায় হওয়ার ভঙ্গিমা ভদ্রলোকের চেহারায় স্পষ্ট। একটা ছোট্ট দম ফেললো তাশদীদ। বুক থেকে হাত নামিয়ে বললো,
– ওকে দেন। পড়াবো তোমাকে আমি। কিন্তু একটা কথা মাথায় রেখো, তুমি তোমার থাকার মর্যাদা রাখলেই আমি আমার কথার মর্যাদা রাখবো। নইলে…
কথা শেষ না করে বড়বড় পা ফেলে চলে যায় তাশদীদ। রিংকি ওর চলে যাওয়া দেখে নিজেনিজেই বললো,
‘আপনার সব ইচ্ছাও আমার পছন্দের তাশদীদ ভাই। কথার মর্যাদা রাখতে গেলে, সেগুলোকেও আমার বিসর্জন দিতে হবে। আর আমি সেটাই করলাম। আপনার ইচ্ছাকেই ত্যাগ দিলাম। তবুও আপনাকে ছাড়তে পারবো না। আপনি আমার অপরিহার্য। আপনাকে আমার লাগবেই।’
•
তাথৈ মাথা নিচু করে প্রক্টরের কেবিনের এককোনে দাড়িয়ে আছে। ওয়াশরুমের বেসিনের আয়না ভাঙার দায়ে মাঝক্লাস থেকে ডেকে আনা হয়েছে ওকে। আলো চুপ করে দরজার সামনে দাড়িয়ে আছে, আর শার্লি পায়চারী করছে। প্রক্টর কিছু কাগজপত্র দেখা শেষে টেবিললর একপাশে ফাইল রাখলেন। চোখের চশমা খুলে, বেশ নম্রভাবেই তাথৈকে বললেন,
– শুনেছি এর আগে তুমি অন গার্ড টিচারকে ইনসাল্ট করেছিলে। কথা সত্য?
…
– কাল তুমি আফিফের গাড়ির হেডলাইটও ভেঙেছো।
…
– অল আসাইড! ভার্সিটির সম্পদকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি কবে থেকে ভাবতে শুরু করেছো তাথৈ?
তাথৈ তখনো জবাবহীন। ওভাবেই মাথা নিচু করে আছে ও। প্রক্টর আবারো বললেন,
– জবাব দাও তাথৈ। ইউ আর আনসারেবল। বায়োকেমের মেধাবী মুখ তুমি। ডোন্ট ইউ নো? ক্যাম্পাসের যেকোনো কিছু নষ্ট করার দায়, টিচারদের সাথে অগ্রহনযোগ্য আচরন মুহুর্তেই তোমার এই জ্বলজ্বলে রেজাল্টকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে জানে। জানো না তুমি এটা?
তাথৈ এবারো জবাব দিলো না। প্রক্টর উঠে দাড়ালেন। ওনাকে দাড়াতে দেখেই দরজা থেকে আলো ‘ম্যাম!’ বলে ডেকে উঠলো তাকে। ক্লাসের আরেক মেধাবীকে চিনতে সমস্যা হলো না প্রক্টরের। আলোকে ভেতরে আসার অনুমতি দিলেন তিনি। আলো কিছুটা জড়সড় পায়ে ভেতরে ঢুকলো। ওর পেছনপেছন শার্লিও ঢুকলো।আলো একটা ঢোক গিলে বললো,
– ম্যাম ঘটনাটা আপনি যেমন ভাবছেন, তেমন না। আসলে ওয়াশরুমের পার্টিশন দেয়ালে ওইসময় একটা কিছু ঝুলছিলো। ওটাকে সরু সাপ ভেবে শার্লি অনেকটা ভয় পেয়ে যায়। আর তাথৈ ওই মোমেন্টে হাইপার হয়ে…
– তাথৈকে আমি চিনি আলো। তাথৈ কোনো মোমেন্টে হাইপার হয়, নাকি হাইপার হয়েই সব মোমেন্ট পার করে, সেটা তোমাকে বলতে হবে না।
আলো থেমে যায়। জবাব দেওয়ার কিছু খুজে পায়না। এবারে মুখ খুললো তাথৈ। শক্তপোক্ত আওয়াজে বললো,
– ভবিষ্যতে আর এমন হবে না ম্যাম। যাই কিছু হয়ে যাক, আমি ক্যাম্পাসে কোনোরকম ভায়োলেন্স ক্রিয়েট করবো না। আমার ব্যক্তিগত আক্রোশ কখনোই এই ক্যাম্পাসের জন্য ক্ষতিকারক হবে না।
প্রক্টর মাথা নেড়ে ওদের বেরিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। একপলক শার্লি-আলোর দিকে তাকিয়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে আসে তাথৈ। শার্লি পরনে থাকা জ্যাকেটসদৃশ কটিটা ধরে, তাড়াহুড়ো করে ছুট লাগায় ওর পেছনপেছন। কিন্তু বারান্দার বাক পেরোতে গিয়েই কারো সাথে ধাক্কা লেগে ফ্লোরে পরে যায় ও। বিপরীতের মানুষটাকে না দেখেই ‘তুল্যর বাচ্…’ বলে চেচিয়ে ওঠে ও। একইসময় ওর কানেও ভেসে আসে, ‘শার্লির বাচ্…’
বলা শেষ না করে থেমে যায় দুজনেই। শার্লি কাধের দিকটা ডলতে ডলতে উঠে দাড়ালো। উচ্চস্বরে বললো,
– তুই আরেকদিন আমার সাথে ধাক্কা খাবি তো আমি তোর নামে নির্যাতনের মামলা ঠুকবো তুল্য!
– তুি কি করে মামলা ঠুকবি? পুরুষ নির্যাতনের তো মামলাই হয়না। আমিও পরেছি বিপদে। তোর এগেইনিস্টে যে কেইস ফাইল করবো, ছদ্মবেশী পুরুষের কাছে নির্যাতিত হয়েছি শুনলে লোকে আমার ওপরই হাসবে।
জবাব শুনে শার্লির কান দিয়ে ধোঁয়া বেরোয়। ও রাগ নিয়ে তুল্যর বুকের দিকে দুহাত বাড়ায় ওকে ধাক্কা দেবে বলে। কিন্তু নিমিষেই ওর হাত মুচড়ে ধরে তুল্য৷ উল্টোদিক দাড় করিয়ে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে,
– তোর সাহস দেখে অবাক হচ্ছি। এই আলুথালু হাত কিনা তুই তুল্য আলফেজের সিক্স প্যাকের দিকে বাড়িয়েছিস? কয়টা কলিজা তোর এইটুক শরীরে বলতো? তোর কি মনে হয়, এই হাতদুটো ভেঙে পিঠের ব্যাগে তুলে দিতে আমি দুবার ভাববো? হু?
শার্লি মৃদ্যু ব্যথায় কুকড়ে উঠলো। গলা ঝারার শব্দে ওকে ছেড়ে দিলো তুল্য। শার্লি তৎক্ষনাৎ সরে দাড়ালো। আলো মাথা নিচু করে পাশ কাটায় ওদের। তুল্য শার্লির দিকে এগিয়ে এসে পুনরায় রাগ নিয়ে বললো,
– এখনো সময় আছে, ভালো হ। তুল্য আফফেজের রাগ সহ্য করার ক্ষমতা তোর নেই।
তুল্য চলে যায়। শার্লি দাড়িয়ে দাড়িয়ে বড়বড় দম ফেলতে ফেলতে আপনাআপনিই বললো,
‘হ্যাঁ। আমার তো ক্ষমতা নেই। তোদের দুই ভাইবোনের রাগ তো ভূতে এসে সহ্য করে যায়। মন্জুলিকা, চন্দ্রমুখী ওরাই এসে…’ আটকে যায় শার্লি। চন্দ্রমুখী বলতে গিয়ে রুমনের কথা মনে পরেছে ওর। যেহেতু সবে তাথৈ প্রক্টরের সাথে দেখা করে ক্লাসে গেছে, এখন তাথৈয়ের কাছে ভেরাটা ওর জন্য মোটেও সুবিধের হবে না। শার্লি পা বাড়ালো নাট্যকলার দিকে। নিজে কিছু বলতে পারেনি তো কি হয়েছে? রুমনকে দিয়েই তুল্যকে চেতাবে ও।
তুল্য ব্যাগ টানতে টানতে ক্লাসে এসে দেখে পুরো ক্লাস দাড়িয়ে আছে। ডায়াসে সব মাস্টার্সপড়ুয়া সিনিয়র ভাই-আপু। সবার আগে সর্বডানের অফ হোয়াইট শার্ট পরিহিত তাশদীদকে চোখে পরে ওর। সাথে শান্ত, টিটুও আছে। তাশদীদ বুকে হাত গুজে দাড়িয়ে। পুরো ক্লাসে চোখ বুলাচ্ছে। তুল্য বোনের দিকে তাকালো। তিননম্বর বেঞ্চে বসা তাথৈ নিচদিক তাকিয়ে। তুল্য গলা উচিয়ে বললো,
– শান্ত ভাই? আসবো?
হাসিমুখে ওকে আসতে বলে শান্ত। সর্ব সিনিয়র ব্যাচের এক ছেলে ডায়াসের মাঝে এসে দাড়ালো। একহাত টেবিলে ঠেস দিয়ে বাকা হয়ে দাড়িয়ে বললো,
– ফার্স্ট ইয়ারে ডিপার্টমেন্টাল ট্যুরে গিয়েছিলেন কে কে?
এক চতুর্থাংশ হাত উচু করে। তাথৈ হাত তোলেনি। আগেরবার ফাইনাল পরীক্ষার জন্য ও বা তুল্য, কেউই যায়নি। তাশদীদ হাত নামিয়ে রাখা মুখগুলো দেখলো। ওদের দু ভাইবোনকে চোখে পরলো ওর। ডায়াসের ছেলেটা সোজা হয়ে দাড়ালো। ট্যুরের উপকারিতা নিয়ে দুই প্যারা ভাষন দেওয়া শেষে জিজ্ঞেস করলো, এ বছর কে কে যেতে চান ট্যুরে। ইচ্ছুকদের সংখ্যা নেই বললেই চলে। ছেলেটা ব্যাচের তিন টপারকে দাড়াতে বললো। আলো, তুল্য, তাথৈ, তিনজন বাধ্য শিশুর মতো দাড়িয়ে গেলো এবারে। ছেলেটা বললো,
– হ্যালো টপার্স? গতবছরও কেউ যাননি, এবারও যাবেন না তাইতো? তা পড়াশোনাঘটিত কারনে ট্যুরে যাবেন না? নাকি অন্য কারনে?
– জ্বী। এক্সাম আছে সামনে।
তাথৈ স্পষ্ট জবাব দিলো। তবে আলোর জবাবটা ছিলো অর্থসংকট। আর তুল্য চাইছিলো না তর্কে যেতে। শান্ত এগোলো এবারে। তাশদীদকে দেখিয়ে বললো,
– সত্যি বলার জন্য থ্যাংকিউ। এবার শুনুন আপনারা যা করবেন, আপনারা এই তাশদীদ ভাইয়ের সাথে আজ কালের মধ্যেই পার্সোনালি আলোচনায় বসবেন। ওনার ট্যুর ভার্সেস পড়া যুক্তিখন্ডন করবেন। যদি পারেন, তাহলে আমি ট্যুরের জন্য আপনার এক্সাম পিছিয়ে দেবার ব্যবস্থা করবো। আর যদি তা না পারেন, তাহলে বিনাবাক্যে নির্দিষ্ট ডেইটেই আপনাদের ট্যুরে যেতে হবে৷ সর্বপরি আপনারা তিনজন যাচ্ছেন ট্যুরে। বাই হুক, অর বাই ক্রুক। আপনারা এই পুরো ক্লাসকে প্রেজেন্ট করেন। আপনারাই যদি না যান, বাকিরা ভাববে ওরা ট্যুর বাদ দিয়ে পড়ে বলেই টপ করে। যেটা কুসংস্কার পর্যায়ে চলে যায়। এন্ড আই কান্ট লেট দ্যাট হ্যাপেন। বুঝেছেন ব্যাপারটা?
স্পষ্টভাবে আটকে দিয়ে চলে যায় শান্ত। একেএকে বেরিয়ে যায় বাকি সবাই। তাশদীদ পকেটে হাত গুজে দাড়িয়ে ছিলো। সবাই বেরিয়ে গেলে, ও ডায়াস থেকে নিচে নামলো। তাথৈয়ের দিকে তাকিয়ে একটা চমৎকার হাসি দিয়ে বললো,
– আমার মনে হয়না তোমার আমার সাথে কোনো আলোচনায় বসার কোনো দরকার আছে। ইউ নো না? তাশদীদ ওয়াসীর ইজ আ ফুলস্টপ ফর ইউ, রাইট?
তাথৈ ফুসতে থাকে। তাশদীদ মুঠো করা ডানহাত বাড়িয়ে দেয় তুল্যর দিকে। তেমনই হেসে বলে,
– বাস্কেটবল ফিনালেতে দেখা হচ্ছে চ্যাম্প! অল দ্যা বেস্ট!
তুল্য অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুঠো ছোঁয়ায় তাশদীদের মুঠোতে। বেরিয়ে যায় তাশদীদ। তাথৈ টের পেলো, ওর আপাদমস্তক জ্বলছে। আর ওর কানে কেবল একটা কথাই বাজছে, ‘বাধভাঙা তাথৈকে তাশদীদ থামিয়ে দিতে জানে। তাশদীদ ওকে আটকাতে জানে, দমাতে জানে। ওর ছন্নছাড়া চলনে, এক এবং একমাত্র বিরামচিহ্নের নাম, তাশদীদ ওয়াসীর।’
#চলবে…

