#কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা
১৯.
সন্ধ্যার আগমুহুর্তে তাথৈ অম্বুনীড়ে ঢুকলো। মন ভালো ছিলো না বলে ভার্সিটি থেকে ফাঁকা রাস্তা ঘুরে এসেছে। তুল্য বাগানে ছিলো। চিকন স্লিভসের গেন্জি পরে বাস্কেটে বল ছুড়ছিলো। একহাতে বল ছুড়ে, বারোবারের মধ্যে দশবার বাস্কেটে বল ঢুকিয়েছে ও। বুজো আশেপাশে ছোটাছুটি করছিলো। তাথৈয়ের গাড়ি দেখে তুল্য বল ধরে ফেলে। ঘাসের ওপর থেকে জুসের বোতলটা নিয়ে কয়েকঢোক খায়। তাথৈ গাড়ি থেকে নেমে শব্দ করে গাড়ির দরজা লাগালো। তারপর বুকে হাত গুজে, গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বললো,
– কি লাভ একহাতে বাস্কেট করে? সেইতো হেরেই এসেছিস।
তুল্য জবাব দেয় না। ম্যাচ নিয়ে কোনোরুপ তর্কে যাবার ইচ্ছে নেই ওর। ‘বুজো কাম’ বলে পা বাড়ায় বাসার ভেতরে। বুজো ডাক শুনে তাকিয়ে তাথৈকে দেখলো। একছুটে এসে তাথৈয়ের পায়ে গা ঘষতে শুরু করে দিলো ও। তাথৈ চমকে ওঠে কিছুটা। তৎক্ষণাৎ চেচিয়ে ডাক লাগায় তুল্যকে। তুল্য নিরস নজরে বোনের দিকে তাকায়। তাথৈ তেমনি চেচিয়ে বলে,
– এই বুলশিট এ বাসায় কেনো?
– তোর পছন্দ না এজন্য।
– এটাকে সরা তুল্য! সরা!
তুল্য পাত্তা না দিয়ে বাসার ভেতরে চলে যায়। তাথৈ কোনোমতে বুজোকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢোকে। বুজোও ওর পায়ের নিচনিচ দিয়ে আসছিলো৷ ভেতরে ঢুকে দেখে তুল্য ডগফুড দিয়ে রেখেছে। এবারে বুজো তাথৈকে ছেড়ে খাবারের দিকে চলে যায়। পায়ের নিচটা ফাঁকা হতেই তাথৈ যেনো ছাড় পায়। হনহনিয়ে গিয়ে সেন্টার টেবিলে থাকা পেপারওয়েট হাতে নেয় ও। দেয়ালে থাকা একটা কাচের ওয়ালমেটে ছুড়ে মারে ওটা। ওয়ালমেটটা নিচে পরে ভেঙে যায়। তাথৈ তেমনি রাগ নিয়ে বলে,
– ওকে বলবি আমার কাছে না আসতে!
নিজের ঘরে চলে গেলো তাথৈ। তুল্য আরেকঢোক জুসের বোতলে চুমুক দিলো। বুজো খাওয়া বাদ দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ওর চেহায়ায় প্রশ্ন, ‘আশ্চর্য! মেয়েটা রেগে গেলো কেনো?’ তুল্য প্রশ্ন বুঝে জবাব দিলো,
– আমার নিজের বোন, তাই যা ব্যবহার। তোরতো সৎ বোন হয়। আর কেমন ব্যবহার আশা করিস তুই?
বুজো কি বুঝলো, নিজের মতো আবারো খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। সোফায় গা এলিয়ে দিলো তুল্য। শরীরটা বেশ ব্যথা করছে। কিছুসময় পরই গাড়ির হর্ন কানে আসে ওর। তৈয়ব আলফেজ বাসায় কুকুর দেখে চমকে উঠলেও তুল্যকে দেখে স্বাভাবিক হলেন। তুল্যকে বললেন,
– এ আবার কোন নতুন নাটক?
– তোমার সৎ ছেলে।
– তুল্য!
গর্জে ওঠেন তৈয়ব আলফেজ। তুল্য বাবার হুংকার গায়ে লাগায় না। অগোছালো পায়ে এসে বুজোর বেল্ট ধরে। ওকে আবারো কোলে নিয়ে হাটা লাগায়৷ সিড়িতে উঠতে উঠতে বলে,
– ও আজ থেকে অম্বুনীড়েই থাকবে। বাট ডোন্ট ওয়ারী, সম্পত্তির দাবীতে তোমার পা চুমোবে না। এন্ড ইউ বুজো, লিসেন! শুধুমাত্র তোর বিলেতী মালকীন তোকে ছেড়ে গেছে বলে আমি তোকে করুনা করেছি। সৎ ব্যাপারটার বাইরে অম্বুনীড়ের কারো সাথে তোর কোনো সম্পর্ক নেই। সো লিমিটে থাকবি। বুঝে আসলো?
ওপরতলায় পৌছাতেই বুজো শরীর মোচড়াতে থাকে। নরম ছোট্ট শরীরটা নিয়ে, তুল্যর হাত পেরিয়ে নিচে নেমে আসে। লেজ নাড়িয়ে ঠিক তাথৈয়ের রুমের দড়জা অবদি পৌছে যায় ও। তুল্য ছুটে এসে আবারো ওর বেল্ট ধরলো। বললো,
– হ্যাঁ! এ ঘরের কাছেও ভিড়বি না! তোর সৎ বোন দ্য তাথৈ আলফেজের ঘর এটা। এন্ড শি ইজ আ রেড ফ্ল্যাগ! রাগের বশে তোকে তুলোর বালিশের মতো ব্যালকনি দিয়ে ছুড়ে মারতেও দুবার ভাববে না ও। গট ইট?
তুল্য বুজোকে নিয়ে রুমে চলে আসে। দরজা লক করে চিৎ হয়ে শুয়ে পরে বিছানায়। মনেমনে ভাবতে থাকে, প্রথমবার ম্যাচ হেরে ওর আফসোস করা উচিত। রাগ হওয়া উচিত। কিন্তু ওর আফসোস আসছে না। রাগ আসছে না। উল্টো যে ওকে হারিয়েছে, সেই তাশদীদের খোজ নিতে ইচ্ছে করছে। জানতে ইচ্ছে করছে, তার পায়ের ব্যথাটা এখন কেমন।
•
তাশদীদ বিছানার ওপর বসে ব্যান্ডেজ খুলছে আর ব্যথাতুর আওয়াজ করছে। মিসেস ওয়াসীর গম্ভীর চেহারা নিয়ে রুমে ঢুকলেন। সঙ্গেসঙ্গে চুপ হয়ে গেলো তাশদীদ। আওয়াজ না করে ব্যান্ডেজ খুলতে লাগলে আর আড়চোখে মাকে দেখতে লাগলো। ওর মা পানির গ্লাস আর ঔষধের বক্সটা টেবিলে রেখে চলে যাচ্ছিলেন। তাশদীদ মায়ের হাত ধরে ফেললো। মিসেস ওয়াসীর অভিমানী স্বরে বললেন,
– কাজ আছে আমার তাশদীদ। তুমি ঔষুধ খেয়ে ঘুম যাও। ফজর বাসায়ই আদায় করো। আমি ডেকে দেবোনে।
অভিমান বুঝে মাকে টেনে এনে সামনে বসালো তাশদীদ। পা নামিয়ে বসে, মায়ের কোলে মাথা গুজে দিলো। ঘুমুঘুমু স্বরে বললো,
– ঘুম আসছে না। ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে যাওতো মা।
– বড় হয়েছো তুমি। আমার ঘুম পাড়িয়ে দেবার বয়স নেই তোমার।
তাশদীদ জবাব না দিয়ে আরো ভালোমতোন মুখ গুজলো মায়ের কোলে। মিসেস ওয়াসীর হার মানলেন। লম্বা একটা শ্বাস ফেলে ছেলের মাথায় হাত রাখলেন উনি। আদুরে গলায় বললেন,
– এইভাবে পা খুড়ো করে নিয়ে বাসায় ফিরতে হয়। কেনো খেলতে যাস এমন খেলা তাশদীদ?
– যাতে তুমি গর্ব করে তোমার বউমাকে বলতে পারো, তোমার ছেলের কতো গুন!
– কাকে কি বললি রে ভাই? দেখ মা এই মাঝরাতে আবার রিংকি আপুদের বাসার দিকে রওনা হয় কিনা।
তামজীদ আপেল খেতে খেতে ঘরে ঢুকলো। মিসেস ওয়াসীর ছোটছেলের ওপর ক্ষিপ্ত হলেন। কিছু বলতে যাবপন, তখনই তাশদীদের ফোন বেজে ওঠে। তামজীদ উঁকি দিয়ে দেখে স্ক্রিনে রিংকির নাম। হে হে করে করে দিয়ে বললো,
– দেখো! পিশাচিনীর নাম লিয়া, য়ো হাজির!
মিসেস ওয়াসীর পিশাচিনী বুঝলেন শুধু। তামজীদকে চোখ রাঙালেন তিনি। তাশদীদ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে সত্যিই রিংকির ফোন। কল রিসিভ করে বললো,
– হ্যাঁ বলো।
– আজকে পড়াতে আসবেন না তাশদীদ ভাই?
– না। বাস্কেটবল ম্যাচ খেলতে গিয়ে পায়ে চোট পেয়েছি আজ। ওয়াকিং স্টিক নিয়ে হাটতে হচ্ছে। দু তিনদিন পড়াতে যাবো না তোমাকে। কাল অনলাইনে পড়াবো। পড়া করে রেখো।
একটানা বলে ফোন রেখে দেয় তাশদীদ। তামজীদ এবারো হতাশ হয়। এগিয়ে এসে চেয়ারে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে বলে,
– লে! তুইও তোর মায়ের মতোই! কাকে কি বললি? দেখ তোর পায়ের ব্যথা শুনে, ওইটা কাল প্রীতিকার্নিশ এসে না টপকায়।
তাশদীদ প্রতিত্তোর করলো না। মায়ের কোলে মুখ গুজলো আবারো। ও জানে ও কি করছে, তার পরিনতি কি হতে পারে, আর তা প্রতিহত কিভাবে করতে হয়। ভাইয়ের উল্টোমুখ দেখে তামজীদ ভ্রু কুচকালো। আপেলে আরেকদফা কামড় দিয়ে মাকে বললো,
– এ তোমার এ ছেলে কিন্তু সুবিধার না মা। ও ওপরেওপরে এমন ভালো দেখতে। কিন্তু ভেতরেভেতরে নিশ্চিত ওরকোনো ঘাপলা আছে। যেদিন ওর সেই ঘাপলামো বার হবে, ওইদিন বুঝবে, কি একটা ছেলে পেটে ধরেছিলো। এই আমি বলে রাখলাম। মিলিয়ে নিও।
এতোগুলো কথার একটা কথাও কানে তুললেন না মিসেস ওয়াসীর। অতি যত্নে তাশদীদের মাথায় আঙুল বুলাচ্ছেন তিনি। তামজীদ আপেলটা শেষ করছিলো। ওর কামড়ের আওয়াজে মিসেস ওয়াসীর ওকে ধমকে বললেন,
– উফ! আওয়াজ করিস না তো তামজীদ। ছেলেটা আমার ঘুমোচ্ছে।
তামজীদ বেকুবের মতো কিছুক্ষণ মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। বেহুঁশের মতো প্রশ্ন করে বসলো,
– আমাকে কি সত্যিই তোমরা সাভারের ময়লার গুদামে কুয়ায়া পাইছিলা মা?
•
দেশের প্রত্যন্তঅঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহ চলছে। অথচ ঢাকার আকাশজুড়ে আজ উজ্জ্বল রোদ। দুটো ক্লাস শেষে, দুপুরের খাবারটা খাবে বলে শার্লির সাথে ক্লাস থেকে বেরোলো তাথৈ। শার্লি পরনে থাকা হাটুর ওপর অবদি কালো শার্ট টানতে টানতে বললো,
– শার্টটা কি ছোট হয়ে গেছে রে তাথৈ?
– এতোই যখন শর্টসে প্রবলেম, লংফ্রকে আসলেই তো পারিস।
ওরদিক না তাকিয়ে হাটতে হাটতে জবাব দিলো তাথৈ। শার্লি ফিক করে হেসে দিলো। বললো,
– ধুরু! আমি আর ফ্রক? ওইসব মানায় আমাকে?
তাথৈ জবাব দিলো না। ও জানে, জবাব দিয়েও লাভ নেই। ও যতোই বলুক না কেনো, শার্লি স্বাভাবিক পোশাকআশাক পরবে না। অবশ্য ওর এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথাও নেই। ও যা খুশি পরুক, অশালীন কিছু তো পরছে না। ঠিক সে সময়েই শার্লির নজরে পরলো বাইরের রাস্তা দিয়ে রুমন দৌড়াতে দৌড়াতে আসছে। ওদের দেখে সে এমনভাবে দাঁত কেলাচ্ছে, যেনে কয়জন্ম পর ওদের দেখা। রুমনের পরনে জলপাই রঙের শর্ট ফ্রক, সাদা টাইট পায়জামা। কোমড়ে সাদা ওড়নার মতো কিছু একটা প্যাচ দেওয়া। শার্লি নিরস কন্ঠে বললো,
– তবে এইটাকে ফ্রক ভালো মানায়৷
চোখ তুলে তাকালো তাথৈ। রুমনকে দেখে নিয়ে আরেকপলক শার্লির দিকে তাকালো। যে চাওনির মানে, আবার শুরু করলি? শার্লি গায়ে লাগায় না। রুমনের হাওয়ায় ভাসার মতো করে তাথৈদের সামনে চলে আসলো ও। ইয়া বড় একটা হাসি দিয়ে বললো,
– গার্লস! আমার পারফর্ম আছে এখন! চল দেখবি চল!
তাথৈ ঠোঁটে হাসি ফুটায়৷ আপাদমস্তক রুমনকে দেখে নিয়ে বললো,
– ভালো দেখাচ্ছে তোকে।
– হ্যাঁ। একদম আনারকলির মতো!
পাশে তাকায় তাথৈরা। চুইংগাম চিবোতে চিবোতে আফিফ কথাটা বলেছে। ওর সাথে আরো দুটো ছেলে। রুমন নিজেকে দেখে নিয়ে বললো,
– একচুয়ালী আমার রোল সেলিমের। কস্টিউম এখনো পুরোটা পরিনি। তাই এমন বলছো।
– তাই নাকি? সেলিম করবি তুই? কিন্তু সেলিম কেনো করবি? তোর ওপর তো আনারকলি ওয়ালা লুক উপচে পরে রে! আনারকলি কর গিয়ে! বেশ মানাবে!
রুমন অহেতুক খুশি হয়। কিন্তু খুশি হলো না তাথৈ-শার্লি। আফিফের চোখেমুখে রুমনকে ছোট করার ধান্দা। অথচ রুমন ব্যাপারটা ধরতেই পারছে না। উল্টো খুশি হচ্ছে। তাথৈ ‘চল রুমন।’ বলে তাড়া দিলো। কিন্তু রুমনের পথ আগলে দাড়ায় আফিফ। নিচের ঠোঁটের ডানদিকটা ডলে বললো,
– দাড়া রুমন। একটা প্রশ্ন করার ছিলো তোকে।
– হ্যাঁ বলোনা!
– তুই এলজিবিটি’র ঠিক কোনটা?
রুমন যতোটা খুশিতে প্রশ্ন জানতে চেয়েছিলো, ততোটাই স্তব্ধ হয়ে যায় আফিফের প্রশ্ন শুনে। ভাষাহীন চোখে চেয়ে রইলো ওর দিকে। তাথৈ হাত মুঠো করে নিলো। পাশ থেকে শার্লি ক্ষিপ্ত বাঘিনীর মতো বললো,
– মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গুইজ আফিফ! লিমিট ক্রস করছিস তুই!
– ওয় টমবয়? তুই নিজের লিমিটে থাক! আমি তোর সাথে কথা বলছি না! হ্যাঁ রুমন? তুই বল! তোর সাথে কি কি ঘটে?
…
– নাকি কিছু ঘটেনা বলে অপারেশন টপারেশন…
– আফিফ স্টপ।
নিজের রাগকে অতিকষ্টে সংবরন করে বললো তাথৈ। আফিফ খুশি হলো ওর ধৈর্য্য দেখে। বিশ্রি হেসে, পকেটে হাত গুজে আরামে দাড়ালো। আরো আয়েশী ভঙ্গিতে বললো,
– হুয়াই? আমি কেনো থামবো? আমি যা বলছি তা সত্যি না? বাইদাওয়ে! মিথ্যে হলেও সেটা তুই কি করে জানলি? রুমন তোর কাছে নিজেকে প্রমাণটমান করেছে নাকি?
তাথৈয়ের সহ্যের সীমা পার হয়ে যায় এবারে। ওয়াশরুমের গ্লাস ভাঙ্গা নিয়ে সেদিন প্রক্টর অনেক শাষিয়েছে বলে ও চুপ থাকবে ভেবেছিলো। কিন্তু আফিফের কথার ধরণ ঘৃণ্য পর্যায়ে চলে গেছে। তাথৈ উদ্যত হয় ওকে চড় লাগাবে বলে। কিন্তু ওর কিছু করে ওঠার আগেই সশব্দে চড় পরে আফিফের গালে। চড়ের আওয়াজ এতেটাই বেশি ছিলো যে, চমকে ওঠে তাথৈ। শক্ত চড়টা গালে পরায় আফিফ মুখ থুবড়ে মাটিতে পরেছে। ওর পেছনে দাঁত ক্যালাতে থাকা ছেলেদুটো থতমতে খেয়ে একপা পিছিয়ে গেছে। তাথৈ আর আফিফদের মাঝে হালকা খয়েরী শার্ট পরিহিত এক যুবক এসে দাড়ায়। তাথৈ পিছন থেকে যুবকের প্রশস্ত কাধের দিকে তাকিয়ে রইলো। মানুষটার উপস্থিতিতে অনিয়মিতভাবে ওর হৃৎস্পন্দন বাড়ছে। অতি ধীরগতিতে দৃষ্টি নামায় তাথৈ। ওর চোখে পরে, সামনেরজনের বা হাতে ওর চেনা বই। সে হাতেই লাঠিতে ভর করে দাড়িয়ে আছে মানুষটা। আফিফ মাটিতে পরে থাকা অবস্থাতে গালে হাত রেখে চোখ তুলে সামনে তাকালো। চড়দাতাকে দেখে অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করলো,
– তাশদীদ ভাই…
তাশদীদের চেহারায় স্থিরতা। কোনোরকমের রাগ, আক্রোশের উপস্থিতি নেই। চড় লাগিয়ে, ঘাড়টা কিঞ্চিৎ বাকিয়ে আফিফের দিকে তাকিয়ে ছিলো ও। যেনো পর্যবেক্ষণ করছিলো ওকে। আফিফের ডাক শুনে এবারে বললো,
– তোমার ঠোঁটের বা কোনায় কেটে গেছে।
আফিফ বোধহয় শুনতে পেলো না। কিছুটা অপ্রস্তুভাবে নিয়ে আশপাশ দেখলো তাশদীদ। নিচের ঠোঁটটা জিভ দিয়ে ভিজিয়ে নিলো। তারপর নিজের ঠোঁটে হাত লাগিয়ে ইশারায় আফিফকে বুঝালো, ওর ঠোঁট কেটে গেছে। আফিফ এবারে বোঝে, তাশদীদ কি বলেছে ওকে। কপালে ভাজ ফেলে গাল থেকে হাত সরায় ও। ঠোঁট স্পর্শ করে তরলের উপস্থিতি অনুভব করে। বুঝতে পারে, সত্যিই কেটে গেছে সেখানে। বা কানে নখ ঘুরিয়ে মাথা ঝারা মারে আফিফ। তাশদীদ আফিফের সাথে থাকা ছেলে দুটোর দিকে তাকালো। হাতের ইশারায় বুঝালো, তোমাদের বন্ধুকে তুলে দাড় করাও। ছেলেদুটো শুকনো ঢোক গিলে তৎক্ষণাৎ টেনে তুললো আফিফকে। তাশদীদের একটা চড়ে ও যে কানে শুনছে না, সেটা বুঝতে বাকি নেই ওদের। দাড়ানোর পর আফিফ ঠৌঁট মুছছিলো আর কান ডলছিলো। তাশদীদ ছেলেদুটোকে আবারো ইশারায় বলে, আরেকটু ডানে দাড়াতে। ও জানে বা কানে আফিফ কিছু শুনবে না।
ছেলেদুটো করেও তাই। তাশদীদ পেছনে তাকালো। জিনস, টপস পরিহিত তাথৈ, কাধের ব্যাগের ফিতা শক্তহাতে আঁকড়ে ধরে দাড়িয়ে আছে। তাথৈকে বই ফেরত দিতে এসেছিলো ও। আফিফের বিশ্রি কথাবার্তা শুনতে পেয়ে নিজেকে থামাতে না পেরে চড় লাগায় ওকে। বইটা তাথৈকে এগিয়ে দিলো তাশদীদ। তাথৈ হাতে নিলো ওটা। ওর ঠিক পাশে রুমন দাড়ানো। নমনীয়ভাবে চলাফেরা করা রুমনকে এমুহুর্তে বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। অবশ্য দেখাবেই না কেনো? মেয়েলি স্বভাবের জন্য এতোগুলো বছরের জীবনে কম কথা শুনতে হয়নি ওকে। নিজের পরিবারই ওকে ছাড় দেয়নি। তাই বাইরের কারো কাছেও ও সম্মান আশা করেনি। আবার নিজেকে বদলাতেও পারেনি। ও বুঝে গিয়েছিলো, বাকিসবের মতো মুফতে সম্মান মিলবে না ওর। এজন্য নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করতে হবে। তাইতো দেশসেরা বিদ্যাপিঠে জায়গা করে নিতে দিনরাত এক করে দিয়েছিলো ও।
ঘটেছেও ওর ভাবনার মতোই। বিশ্ববিদ্যালয় আত্মপ্রকাশের জায়গা। নাট্যকলা ওর শখকে ওর প্রতিভা হিসেবে গ্রহন করেছে। তার বাইরে ঠাট্টা মশকরায় যতোটুকই হোক না কেনো, সেসব কখনো পাত্তা পায়নি রুমনের কাছে। কিন্তু আজ আফিফ সব সীমা পার করেছে। ওর নিজের প্রতি রাগ হচ্ছে। ওর বেশভূষাসমেত ওকে গ্রহণ করেছে বলে তাথৈকে এইভাবে অপমানিত হতে হবে, ভাবেনি ও। অনুশোচনায় মুখচোখ লাল হয়ে আছে ওর। তাশদীদ ইশারায় রুমনকে ডাকলো। নাকটা ডলে, দিশেহারার মতো মাটিতে তাকিয়ে এগুলো ও। তাশদীদের কাছে এসে দাড়িয়েও নিচদিক তাকিয়ে রইলো। তাশদীদ আফিফকে বেশ স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
– কার্বোহাইড্রেট মেটাবলিজমের সাইকেল কয়টা আফিফ?
আফিফ প্রত্যেকের চোখমুখের দিকে তাকায়। যেনো শব্দদুটো নতুন শুনেছে ও। তাশদীদ বুঝতে পারে, ও জবাব দিতে পারবে না। কিছুটা সাচ্ছন্দে হেসে বললো,
– ফার্স্ট সেমিস্টারের পড়া। ব্যাসিক অফ বায়োকেম। ভুলে গেছো?
আফিফ দৃষ্টি সরালো। তাশদীদ এবার রুমনকে জিজ্ঞেস করলো,
– নিঃসঙ্গ সম্রাট কার লেখা রুমন?
রুমন বড়বড় চোখে একপলক চাইলো তাশদীদের দিকে। ওদের পেছনে তাথৈ শ্বাস আটকে দাড়িয়ে আছে। রুমন আবারো মাথা নিচু করে নিলো। বলতে লাগলো,
– সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের। নাটকটাকে বইয়ের পাতা থেকে টিভিতে তুলে ধরেছিলেন দেবেশ চট্টোপাধ্যায়। প্রযোজক ছিলেন পাইকপাড়া ইন্দ্ররঙ্গ নাট্য দলের ইন্দ্রজিৎ চক্রবর্তী। দেবেশ যখন নাটকটা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা শুরু করেছিলেন সে সময়ই সুনীল গত হন। দেবেশ চলে যান নাটকের জন্মদাতার স্ত্রী স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে। এরপর তার অনুমতিতে তৈরী হয় নিঃসঙ্গ সম্রাট। ওসময়…
রুমন বলতে থাকে। তাশদীদ মুচকি হেসে ডানহাতটা ওর কাধের ওপর রাখলো। আলতো চড় মেরে থামতে বুঝালো। তারপর আফিফকে বললো,
– কানে গেছে?
আফিফ মাথা উপরনিচ করে হ্যাঁ বুঝালো। তাশদীদ ওকে একশব্দের সবচেয়ে সহজ প্রশ্নটাই করেছিলো। তার জবাব দিতে পারেনি ও। কিন্তু রুমন দুইশব্দের প্রশ্নে পুরো অনুচ্ছেদ রচনা করে ফেলেছে। আফিফ দৃষ্টি নিচু করে নিলো। তাশদীদ আবারো বললো,
– মাথায় গেছে?
নিচদিক তাকিয়ে থাকায় এ কথাটা আফিফ শোনেনি। ওর পাশের ছেলেটা ওকে ধাক্কা লাগালো। আবারো চোখ তুলে তাশদীদের দিকে তাকায় আফিফ। তাশদীদ বললো,
– ভার্সিটিতে সবাই নিজ নিজ যোগ্যতায় পড়তে আসে। আর এই যোগ্য মানুষগুলোর একজনকেও, একবিন্দু অপমান অপদস্ত করার যোগ্যতা তোমার নেই। পরেরবার কাউকে একটুও ছোট করে কথা বলার আগে আমাকে স্মরণ করো। ম্যানার শেখানোর আমার বহুবছরের অভিজ্ঞতা আছে।
শেষ কথাটা বেশ জোর দিয়ে বলেছে তাশদীদ। বলা শেষে ঘাড় নাড়িয়ে বুঝালো, তাথৈ রুমনকে সরি বলতে। আফিফের রাগ এতোক্ষণে ওর চেহারায় ফুটে উঠলো। একপলক তাথৈয়ের দিকে তাকিয়ে, তেজী গলায় ‘সরি!’ বললো ও। তারপর একমুহূর্ত না দাড়িয়ে হনহনিয়ে চলে গেলো ওখান থেকে। তাশদীদ রুমনের কাধে হাত রেখে শরীরের ভর কিছুটা ছেড়ে দেয়। বা হাতটা লাঠি থেকে বের করে শার্টের ডানহাতা ঠিকঠাক করার চেষ্টা করে। আফিফকে চড় দিতে গিয়ে হাতা নেমে গিয়েছিলো। রুমন কেবল দেখছে তাশদীদকে। অতিকষ্টে কান্না করা থেকে নিজেকে আটকে রেখেছে ও। তাশদীদ হাতা ঠিক করে আবারো লাঠিতে ভর করে দাড়ালো। রুমনের কাধ থেকে হাত সরিয়ে হাসিমুখে বললো,
– নিজের মতো থাকো রুমন৷ কিন্তু এদের মতো কাউকে বলার সুযোগ করে দিও না। তোমার ব্যক্তিত্ব একান্তই তোমার! বুঝেছো?
রুমন চোখ বন্ধ করে নিয়ে মাথা ওপরনিচ করে। ওর দুচোখ বেয়ে জল গরায়। একটা ঢোক গিলে গলা ভেজালো ও। চোখমুখ মুছে নাক টেনে বললো,
– টিনেজ থেকে সত্যিই কিছু ফ্যান্টাসি আছে তাশদীদ ভাই। কিন্তু সেগুলো আমার আত্মসম্মানের সুপিরিয়র না। আমি ওদের কাউকে কোনোদিন সুযোগ দেবো না এমন কিছু বলার।
তাশদীদের হাসি প্রসারিত হয়। আরেকপলক তাথৈয়ের দিকে তাকায় ও। তারপর লাঠিতে ভর করে, খুড়িয়ে খুড়িয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যায় ওকে। তাথৈ স্থির রইলো। পেছন ফিরে তাকালো না। কিন্তু শার্লি-রুমন কৃতজ্ঞতার চোখে তাশদীদের চলে যাওয়া দেখলো। শার্লি একটা চমৎকার হেসে বললো,
– তাশদীদ ভাই ইজ দ্যা বেস্ট!
কথাটা কানে আসতেই কয়েকপা দুরে থেমে যায় তুল্য৷ আফিফ ক্লাসে গিয়ে হুলস্থুল বাধিয়েছে। নিজেরই বইখাতা বেঞ্চ থেকে ফেলে দিয়েছে। বারবার কান থাপড়াচ্ছে, মাথা ঝাড়া মারছে। ওর সাথের দুইটাকে জিজ্ঞেস করেও কেউ কিছু জানতে পারেনি। ক্লাসে তাথৈকে না দেখে তুল্যর সন্দেহ হয়। তাই তৎক্ষণাৎ ক্লাস থেকে বেরিয়ে এসেছে ও। আর করিডোরে এসে সবারআগে শার্লির কথাটা কানে যায় ওর। তুল্যর পেছনপেছন বুজোও এসেছে। তবে ও দাড়িয়ে গেলেও বুজো থামেনি। তাথৈকে দেখলেই যেনো রাজ্যের আদর পাওয়ার ইচ্ছা জাগে ওর। বুজো ছুটে এসে তাথৈয়ের পায়ে গা ঘষতে লাগলো। তাথৈ ওর দিকে স্থিরচোখে চেয়ে থেকে বললো,
– দুরে থাকো। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলেছি। আবারো দূর্বল হয়ে পরতে চাইছি না।
#চলবে…

