#কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা
৩৪.
তাথৈদের নতুন সেমিস্টারের ক্লাস শুরু হয়েছে। একটা ক্লাস শেষে ক্লাসে বসেই যারযারমতো আড্ডা দিচ্ছে সবাই। আলো নিশব্দে উপন্যাস পড়ছে। শার্লি পুরো ক্লাস ঘুমিয়েছে। আড়মোড়া ছেড়ে আবারো হাইবেঞ্চে হাত-মাথা ঠেকিয়ে ঘুমোতে থাকে ও। তুল্য বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিলো। শার্লির দিকে তাকিয়ে দেখলো, শার্লির ছোটছোট চুলগুলো ওর চোখেমুখে পরে আছে। পুরো ক্লাসে একপলক চোখ বুলালো তুল্য। সবে হাত বাড়িয়েছে শার্লির চুলগুলো কানে গুজে দেবে বলে, আফিফ ডাক লাগায় ওকে। মেজাজ পুরোটাই বিগড়ে যায় তুল্যর৷ যে হাতটা ও শার্লির দিকে নমনীয়তার সাথে বাড়িয়েছিলো, সে হাতেই ঠাস করে শার্লির মাথায় চাটি লাগালো ও। শার্লি লাফিয়ে ওঠে। মাথায় হাত বুলিয়ে কোথায় আছে পরখ করতে থাকে। তুল্য ওকে পাশ কাটাতে কাটাতে বিরক্তিতে বললো,
– গন্ডার একটা!
চরম মেজাজ খারাপ হয় শার্লির। বিশ্রি নামটা, ঘুম নষ্ট আর অহেতুক মারার দায়ে তুল্যকে খুন করার ইচ্ছা জাগলো ওর। তুল্য ততোক্ষণে গিয়ে আফিফের সাথে দাড়িয়েছে। মাথা ডলতে ডলতে সিট থেকে বেরোলো শার্লি। আলোকে বললো,
– এই আলো? তাথৈ কোথায়?
– ও বাইরে বসেছে। বুজোকে খাওয়াচ্ছে।
– ওহ। ওকে।
শার্লি বেরোচ্ছিলো। তবে একটুখানি এগিয়েও থেমে গেলো ও। পেছন ফিরে আলোর হাতের বইটাতে উঁকি দিলো। বইয়ের কভারটা ওর নজর কেড়েছে। সেখানে দুটো মেয়ে আর একটা ছেলের ছায়াময় অবয়ব। শার্লি হেসে বললো,
– লাভ ট্রায়াঙ্গল পড়ছো আলো?
আলো চোখ তুলে চায়। মৃদ্যু হেসে জবাব দেয়,
– লাভ কি কখনো ট্রায়াঙ্গল হয় শার্লি? প্রেম-ভালোবাসা শুধু ওই দুই প্রান্তের দুজনেরই হয়। একতরফা ভালোবাসাকে দেখেছো কোথায়ও মুল্যায়ন হতে?
– কিন্তু আমিতো জানতাম ভালোবাসা ভালোবাসাই! কোনো না কোনোদিন তার মুল্যায়ন ঠিকি হয়। আর…
– এমনটা না হোক!
আলো থামিয়ে দেয় শার্লিকে। ওর জবাব না বুঝে শার্লি ভ্রু কুচকালো। আলো অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ওর চোখের তারা জ্বলজ্বল করছে। আলো বললো,
– সব ভালোবাসার মুল্যায়ন হতে নেই। কিছু ভালোবাসা অবমূল্যায়িতই থাকা উচিত।
আলো টের পেলো কথা বলতে গিয়ে ওর চোখ জ্বলছে। আর একমুহূর্ত শার্লির দিকে তাকিয়ে থাকলে কান্না বেরিয়ে আসবে ওর। চোখ নামিয়ে ও উপন্যাসে মনোযোগী দেখালো নিজেকে। শার্লি আলোর কথা বুঝলো। শুধু কথার পেছনের প্রেক্ষাপট বুঝলো না। সৌজন্য হেসে রুমের বাইরে চলে আসলো ও। এসে দেখে তাথৈ সেখানে বুজোকে খাওয়াচ্ছে আর আনমনে কিছু ভাবছে। শার্লি এগিয়ে গিয়ে ওর পাশে বসলো। কাধে ঠেলা মেরে বললো,
– কিরে? ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে, আনমনে তাহার কথা ভাবা হচ্ছে নাকি? হুম?
– সাভার যাচ্ছি। যাবি?
– কিহ?
চেচিয়ে বলে সেকেন্ডের ব্যবধানে দাঁড়িয়ে যায় শার্লি। আওয়াজ শুনে জানালা দিয়ে পুরো ক্লাস বাইরে তাকালো। ওকে ওমন লাফাতে দেখে বুজোও আওয়াজ করে উঠেছে। তাথৈ নিরস দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে। শার্লি নিজেকে সামলালো। আবারো তাথৈয়ের পাশে বসে গিয়ে, ফোকলা হাসি দিলো একটা। তাথৈ বললো,
– লেইম রিয়্যাক্ট দেওয়া বন্ধ কর। সাভার যাবো। পরপার না।
– বিশ্বাস কর তাথৈ! তোর সাভার যাওয়া নিয়ে আমার একবিন্দু বিস্ময় নেই। কিন্তু তুই ক্লাস বাঙ্ক দিয়ে সাভার যাবি? সিরিয়াসলি?
– মাস্টার্সে ক্লাস চলছে। কিন্তু তাশদীদ আজ ক্লাসে আসেনি। আমার ভালো লাগছে কিছুই।
বিরবির করে বললো তাথৈ। শার্লি গালে হাত দিয়ে অবাক হয়ে ওর কথা শুনছে আর মনেমনে বলছে, ‘আহা! কি সুন্দর প্রেম! প্রেমিক ক্লাসে আসেনি বলে প্রেমিকা তাকে দেখতে বিশ কিলোমিটার পাড়ি দেবে! বাট ওয়েট! লাইনটা উল্টো হলো না?’ তাথৈ পাশ ফিরতেই জোর করে নিজেকে স্বাভাবিক করলো শার্লি। বললো,
– ত্ তো এখন কোথায় যাবি তুই? শুধু জানিস তাশদীদ ভাই সাভার থাকে। সাভারে কোথায় থাকে সেটা জানিস? যাবিটা কোথায়?
– জেনে নেবো।
তাথৈ উঠে ক্লাসে গিয়ে ব্যাগ কাধে নিলো। তারপর বেরিয়ে আসলো ক্লাস থেকে। বুজো ওর পেছনপেছন ছুটছে। শার্লি যেনো বাহানা পেয়েছে ক্লাস না করার৷ উৎফুল্ল হয়ে ওউ ব্যাগ নিয়ে বেরোচ্ছিলো। আলো ওদেরকে ওমন বেরিয়ে যেতে দেখে বললো,
– কি ব্যাপার শার্লি? ক্লাস আছে তো? এখন কোথায় যাচ্ছো তোমরা?
– ঘুরতে। তাথৈ আমাকে নিয়ে লং ড্রাইভে যাবে!
শার্লি একছুটে বেরিয়ে আসে। তাথৈ ফোন বের করে কল লাগালো রুমনকে। ফোন আবারো পকেটে পুরে হেডফোনে বললো,
– কোথায় তুই?
– ক্লাসে। কেনো?
– ক্লাস না থাকলে পুকুরপাড় আয়। যাবো একজায়গায়।
তাথৈ কল কাটলো। রুমন দু মিনিটে হাজির হয়। শার্লিকে ইশারায় শুধায়, ‘কোথায় যাবে?’ শার্লি দাঁত কেলিয়ে বললো,
– সাভার।
– সাভার কেনো?
– প্রেমের টানে।
রুমন শব্দ করে হেসে দিলো। একনজর দুজনের দিকে তাকালো তাথৈ। ওরা তৎক্ষনাৎ হাসি লুকালো। তাথৈ গাড়ির লক খুললো। সবে গাড়ির দরজা খুলতে যাবে, পাশ থেকে আওয়াজ আসে,
– হেই তাথৈ!
তাথৈ পাশ ফিরলো। ওর সামনে ধবধবে ফর্সা, রোগাপাতলা দেহী একটা ছেলে। পরণে টকটকে লাল টিশার্ট, ছেড়াফাটা ডিজাইনের কালো প্যান্ট, গলায় কয়েকটা চেইন, হাতের কবজিতে ফিতে বাধা, মাথায় উল্টোপাশ করে রাখা ক্যাপ। ছেলেটার বেশভুষা দেখে ভ্রু কুচকে আসে তাথৈয়ের। একই অবস্থা শার্লি-রুমনেরও। রুমন বিরবিরিয়ে বললো,
– এই ইয়ো ইয়ো হরিপদ আবার কে?
শার্লি ফিক করে হেসে দেয়। ছেলেটা অতিমাত্রার উৎসাহ নিয়ে তাথৈয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে বললো,
– হেই! আ’ম টেরেন্স। এন্ড ইউ আর তাথৈ! রাইট?
তাথৈয়ের কপাল শিথিল হয়। একবার টেরেন্সের বাড়িয়ে রাখা হাতের দিকে তাকিয়ে, দুহাত বুকে গুজলো ও। পরিপূর্ণ ভাব বজায় রেখে বললো,
– তাথৈ আলফেজ।
তাথৈয়ের গা ছাড়া স্বভাব দেখে টেরেন্স একটু আটকে যায়। বিদেশে মেয়েরা নিজ থেকে ওর গায়ে লেপ্টে থাকতে চায়। ও কারো দিকে হাত বাড়ালো, আর সে হাত কেউ ধরলো না, এমনটা আজ প্রথমবার ঘটেছে। ‘আমার মেয়েটা একটু জেদী’ তাথৈয়ের মায়ের বলা কথাটা মনে পরে যায় ওর। টেরেন্স হেসে দুহাত একসাথে করে তালি দিলো। আগের মতোই উৎসাহে কিছু বলতে যাবে, তাথৈ তার বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে গাড়িতে চড়ে বসলো। টেরেন্স দ্বিতীয় দফায় আটকায়। আশপাশ দেখে নিয়ে ইংরেজীতে বললো,
– আমি এখানে তোমার সাথে কথা বলতে আসলাম, আর তুমি চলে যাচ্ছো?
তাথৈ ড্রাইভিং সিটে বসা অবস্থায় ওরদিক তাকালো। ইংরেজীতেই বললো,
– না আমি তোমাকে চিনি, নাইবা আমি তোমার কথা শুনতে বাধ্য। অতএব আমি তোমার কথা শুনছি না।
সানগ্লাস চোখে দিয়ে জানালার কাচ তুলে দিলো তাথৈ। জানালার কাচে নিজের অপমানিত অবয়ব দেখে যেনো টেরেন্স নিজেকেই চিনলো না। রুমন উল্টোদিকের জানালা দিয়ে ফ্রন্টসিটে বুজোকে তুলে দিলো। তারপর নিজেও পেছনের সিটে বসলো। শার্লি টেরেন্সকে পাশ কাটিয়ে পেছনের সিটে উঠতে উঠতে বললো,
– নাম টেরেন্স হলে কি হবে, ছাদে মাল নাই।
টেরেন্স বুঝলো না ওর কথা। গাড়ি স্টার্ট দেয় তাথৈ। দ্রুতগতিতে চলে যাওয়া গাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলো টেরেন্স। গাড়িটা চোখের আড়াল হলে ও অদ্ভুত হেসে বললো,
– এটিটিউড! ওকে! আই লাইক ইট!
•
জ্যাম ঠেলে মোটামুটি ঘন্টা তিনেক পর সাভারের মুলসড়কে পৌছালো তাথৈ। পেছনের সিটে বসে শার্লি লোকেশন দেখছে। রুমন শান্তকে কল করে তাশদীদের ঠিকানা জেনে নিয়েছে। বুজো জানালায় সামনের দু পা তুলে বাইরের হাওয়া খাচ্ছে। একটাসময় শার্লি বললো,
– আর তিনমিনিট এগিয়ে ডানের রোড বেয়ে নেমে যাবি।
তাথৈ তিনমিনিটই গাড়ি চালালো। তবে ডানে এগোনোর পরিবর্তে মোড়টাতেই গাড়ি থামিয়ে দিলো ও। ব্রেক কষতে দেখে পেছন থেকে রুমন প্রশ্ন করলো,
– কিরে? গাড়ি থামালি কেনো? আরো যেতে হবে তো!
– আমি সরাসরি তাশদীদের বাসায় গেলে ও অস্বস্তিতে পরবে রুমন।
চিন্তিতস্বরে বললো তাথৈ। রুমন-শার্লি একে ওপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। শার্লি বললো,
– অস্বস্তিতে পরবে মানে? কিসের অস্বস্তি? তাশদীদ ভাইয়ের কোনো অস্বস্তি-ফস্বস্তি নাই। আমরা…
– আছে! তাশদীদের ব্যক্তিত্ব সবজায়গায় জ্বলজ্বল করে। আমি চাইনা আমার অসময়ী, অনাকাঙ্ক্ষিত উপস্থিতি ওর উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বে একবিন্দু ছায়া ফেলুক! কেউ ওকে প্রশ্নতাক করুক। আমরা ওর বাসায় যাচ্ছি না!
তাথৈয়ের জবাব প্রাসঙ্গিক হলেও শার্লি মানলো না। বললো,
– তো? এখন এতোদুর এসে দেখা না করেই চলে যাবি নাকি?
– তা কেনো হবে? আমি আছি না? দাড়া দেখছি কি করা যায়।
রুমন গাড়ি থেকে বেরিয়ে কল লাগালো তাশদীদের নম্বরবে। ও বেরোতেই বুজোও লাফিয়ে তাথৈয়ের কোলে আসলো। এদিকটার জানলায় পা দিয়ে বারি দিতে লাগলো। ‘রিল্যাক্স বুজো’ বলে তাথৈ থামানোর চেষ্টা করলো বুজোকে। ও মানছে না। এরমাঝেই রুমন বাইরে থেকে গাড়ির জানালায় হাত ঠেকালো। ঝুকে দাড়িয়ে বললো,
– এ তাথৈ! কল করেছিলাম তাশদীদ ভাইকে। সে তো বাড়িতে নেই। তার মা নাকি তাকে মাসকাবারির বাজার করতে পাঠিয়েছে!
তাথৈ একটা ছোট শ্বাস ফেললো। বুজো তখনো জানালা খোলানোর জন্য ছটফট করছে। মনটা খারাপ করে জানালার কাচ নামিয়ে দিলো তাথৈ। বুজো জানলা খোলা পেয়ে খুশি হয়ে যায় যেনো। দুবার আওয়াজ করে সামনে তাকিয়ে। তাথৈ অগ্রাহে একবার বাইরে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলো। কিন্তু পরমুহূর্তেই আবারো রাস্তার উল্টোপাশে দৃষ্টি নিলো তাথৈ। মেইনরোড পার হয়ে ওদিকেও একটা রাস্তা নেমে গেছে। ইটবিছানো ভাঙাচুড়া রাস্তাটার পাশে ঝুড়িতে করে শাকসবজি নিয়ে সবজিওয়ালারা বসেছে। আর রাস্তার সর্বসম্মুখে সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট পরিহিত এক মানব দাড়ানো। সে তাশদীদ ওয়াসীর। বা হাতে একটা বাজারের ব্যাগ ধরে, ডানহাতে ফোন আর মানিব্যাগটা প্যান্টের পকেটে গুজলো তাশদীদ। তারপর উবু হয়ে প্যান্টটা আরেকটু ভাজ দিয়ে উপরে ওঠালো। তাথৈয়ের মন যেনো ময়ুরের মতো পেখম মেলে। বুজোকে রেখে, ঠোঁটে হাসি নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে আসে তাথৈ। পেছন থেকে শার্লি বললো,
– তুই আবার উল্টোদিকে কোথায় যাচ্ছিস?
– পথ যাই হোক, আমার গন্তব্য ওই একটাই। তাশদীদ।
শার্লি-রুমন বুঝলো তাথৈ তাশদীদকে দেখেছে। তাশদীদ ততক্ষণে বাজারের ভেতরে ঢুকে গেছে। তাথৈ রোড পার হলো। ওর সাথে রুমন শার্লিও এসে দাড়ালো বাজারের মাথায়। শুরুর মুরগীর দোকানটা থেকে বিদঘুটে গন্ধ আসছে। শার্লি নাকমুখ চেপে ধরে দাড়িয়ে গেলো। কিন্তু তাথৈয়ের থামার নাম নেই। রুমন ওকে থামিয়ে দিয়ে বললো,
– তুই কি এখন এই নোংরা কাচাবাজারে ঢুকবি? এমন ধুলাবালি…
– যে পথে তাশদীদ হেটে যায়, সে পথের ধুলোবালি মাড়ানো কেনো, আমি নিজেই সে পথের ধুলোবালি হয়ে যেতে পারি।
রুমন ভাষাহীন হয়ে যায় তাথৈয়ের এমন নিস্প্রভ জবাবে। পা বাড়ায় তাথৈ। ওর তৃষ্ণার্ত চোখ কেবল তাশদীদকে চাইছে। তাশদীদ মুরগীর দোকানে মুরগীর অর্ডার দিলো। তারপর গেলো বড় একটা মুদির দোকানে। একটা লিস্ট দেখেদেখে বাজার বলতে লাগলো। তাথৈ আরেক দোকানের আড়াল থেকে ওকে দেখছিলো। সে দোকানের মালিক ওকে উদ্দেশ্য করে বললো,
– কি নিবেন?
তাথৈ হচকিয়ে যায়। সামনে তাকিয়ে দেখে বস্তায় থরেথরে সাজানো কোনোকিছুই ওর পরিচিত না। ডাল, ছোলা থেকে শুরু করে গুড়ো মশলা, সব যেনো আজ প্রথমবার বাস্তবে দেখলো ও। তাথৈ তাশদীদের দিকে তাকালো। ও লিস্ট দেখে কি কি বলছে, সেটা মনোযোগ দিয়ে শুনে নিয়ে দোকানিকে বললো,
– হ্যাঁ! ডাল এক হালি, শ্যাম্পু দুই পোয়া, জিরা এক ডজন, ডিম তিন কেজি।
দোকানী মাপ দেবার উদ্দেশ্যে ডাল তুলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তাথৈয়ের ফর্দ শুনে যেনো তিনি পাথর হয়ে গেলেন। তাথৈ চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো৷ ভাবনাচিন্তা না করে পরিমাপ বলাটায় কতোবড় গন্ডগোল পাকিয়েছে, সে বুঝ হয়ে নিজের ছাত্রীত্বের ওপর তীব্র লজ্জা হলো ওর। কোনোমতে হিসাব বুঝে নিয়ে আবারো বললো,
– ইয়ে মামা, ডাল এক কিলো, শ্যাম্পু দুই ডজন, জিরা এক পোয়া, আর ডিম তিন হালি।
দোকানী এতোক্ষণে শ্বাস নিলেন। ঠিকঠাক বলে দিয়ে তাথৈ নিজেও লম্বা শ্বাস নিলো একটা। দোকানী সেগুলো প্যাক করতে লাগলো। শার্লি রুমন অতিকষ্টে বাজারের ভেতরটায় আসলো। তাথৈ টাকা মিটিয়ে দেখে তাশদীদ সবজির দোকানে ঢুকেছে৷ সবজিতে পানি ছেটাতে ছেটাতে পায়ের নিচটা কদর্মাক্ত করে ফেলেছে দোকানীরা। একজন যাওয়ার সময় তাথৈয়ের পায়ে পারা দিয়ে চলে গেলো। কাদায় মাখোমাখো হয়ে যায় তাথৈয়ের পা। তবুও টু শব্দটাও করলো না ও। বরং ও মনোযোগ দিয়ে তাশদীদের দর কষাকষি উপভোগ করছে। আলুর দাম পঞ্চান্ন থেকে পঞ্চাশ করার জন্য কয়েকবার দোকানীকে বলছে সে৷ বেগুন ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে খুঁত দেখাচ্ছে। তাথৈয়ের মুগ্ধ চোখজোড়া দেখে রুমন আনমনে বলে উঠলো,
– তাথৈ আর তাথৈ নেই।
– ইটস জাস্ট দ্য ট্রেইলার ব্রো।
শার্লিদের কথাগুলো কানে গেলো না তাথৈয়ের। তাশদীদ নিজের বলা দামে সবজি নিয়ে গেলে কলকলিয়ে হেসে ওঠে ও। গর্বের সাথে ‘মাই ম্যান’ বলে তেমনি চেয়ে রয় তাশদীদের দিকে। রুমন ওর হাত থেকে বাজারের জিনিসগুলো নিয়ে বললো,
– তোর ম্যান বাজার করছে। তোর আবার কি দরকার ছিলো বাজার করার?
– এগুলো না কিনলে ওই দোকানদার মামা মনেহয় তার দোকানের সামনে দাড়াতে দিতো না।
– তাও ভালো। তা দেখিতো! তাথৈ আলফেজ প্রথমবার বাজারে ঢুকে কি কি কিনেছে? কতো টাকার বাজার এখানে?
– হ্যাঁ একটু দেখতো? তাশদীদ চলে আসছিলো বলে এক হাজার টাকার নোট দিয়ে চলে এসেছি। মামা আরো পাবে কিনা।
শার্লি ঠাস করে কপাল চাপড়ালো। তাথৈ বুঝলো, ও বেশিই দিয়ে এসেছে। আর ওদিকটায় দাড়ালো না ও। দ্রুতপদে চলে আসলো বাইরে। দুর থেকে দেখলো তাশদীদ একটা ভ্যানে সব বাজার তুলে দিয়ে ভ্যানওয়ালাকে টাকা দিয়ে দিচ্ছে। তারপর কাউকে কল করলো ও। এলোমেলো পায়ে এগোতে থাকে তাথৈ।
তামজীদকে বাজার নিতে বলে ফোন কান থেকে নামালো তাশদীদ। হুট করেই ওর চোখ গেলো রাস্তার উল্টোপাশে দাড়ানো গাড়িটার দিকে। গাঢ় কালো খয়েরি রঙের ঝকমকে গাড়িটা ওর চেনা। আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে গেলো ও সেদিকে। ওকে দেখে বুজো গাড়ির ভেতর থেকে আওয়াজ করে ওঠে। তাশদীদ নিশ্চিত হয়ে যায়, গাড়িটা তাথৈয়েরই। আশপাশ তাকাতেই তাথৈকে চোখে পরে ওর। তাথৈয়ের সাদা কুর্তায় লালশাক, সবুজশাকের ছোটছোট পাতা লেগে আছে, পা জুড়ে কাদা। পেছনে রুমন দুইচারটে জিনিস হাতে আসছে। শার্লিও আছে। কাছাকাছি এসে শার্লি সালাম দিলো তাশদীদকে। তাশদীদ সালামের জবাব নিয়ে কিছুটা বিস্ময়ে বললো,
– তোমরা এখানে কেনো?
– ওই রুমনের বয়ফ্রেন্ড এখানেই…
তাশদীদ ভ্রু কুচকে তাকালো। আটকে যায় শার্লি। পরিস্থিতি সামাল দিতে রুমন জোরপূর্বক হেসে বললো,
– না আসলে শার্লির গার্লফ্রেন্ড এ্…
মনেমনে নিজেকে একনাগাড়ে গালি দেওয়া শুরু করে শার্লি। রুমন কপাল ডলতে ডলতে নিজের চেহারা আড়াল করলো। দুজনেরই মনে হলো, নাকটা কাটা যাওয়ার এরচেয়ে ভালো উপায় আর দুটো নেই। এমন এক অস্থিতিশীল পরিবেশেও তাথৈ বেশ ধীরস্থির মস্তিষ্কে জবাব দিয়ে বসলো,
– আপনি এখানে। তাই!
#চলবে…

