#কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা
৩৫.
‘তোমরা এখানে কেনো?’ এর উত্তরে ‘আপনি এখানে, তাই!’ এমন জবাবটা তাথৈয়ের কাছ থেকে মোটেও আশা করেনি তাশদীদ। সেকেন্ডের মতো আটকে থেকে, অসতর্কে হেসে বললো,
– আমি এতোটাও বিখ্যাত নই।
তাথৈ জবাব দিলো না। কিন্তু তাশদীদ চাইলেই জবাব পেয়ে যেতো। তাথৈয়ের চাওনিতে স্পষ্ট বলা ছিলো, ‘বিখ্যাত না হলেও পৃথিবীর এক এবং একমাত্র বিশেষ মানুষটার নাম তাশদীদ ওয়াসীর।’ শার্লি কিচ্ছুটি না জানার ভান করে বললো,
– আপনি এখানে কেনো তাশদীদ ভাই? ধারেকাছেই বাসা নাকি আপনার?
– পাঁচমিনিট হাটলেই আমার বাড়ি। বাজারে এসেছিলাম। যাইহোক, তোমরা এসেই যখন পরেছো, চলো আমার বাসায়। লান্চ করে তারপর ঢাকা ফিরো।
রুমন-শার্লি একসাথে ঘাড় ঘুরিয়ে তাথৈয়ের দিকে তাকালো। তাশদীদ ধমক দিয়ে বললো,
– ওরদিক কি তাকাচ্ছো? ও না গেলেও তোমরা যাচ্ছো আমার সাথে! চলো!
– আমিও যাচ্ছি।
তাথৈয়ের জবাবে আবারো কিঞ্চিত অবাক হয় তাশদীদ। রুমন-শার্লি লুকিয়ে-চুরিয়ে হাসলো। এই দাওয়াতের জন্য যে তাথৈ তীর্থের কাক, তা যদি তাশদীদ বুঝতো তাহলে আর ও ‘না গেলে’ শব্দদুটো উচ্চারণ করতো না। তাথৈ গাড়ি থেকে বুজোকে বের করে কোলে নিলো। তারপর চারজনে মিলে হাটা লাগালো। প্রীতিকার্নিশের কাছাকাছি আসতেই বুজো তাথৈয়ের কোল থেকে নেমে গেলো। তাশদীদ বললো,
– ও এখানে আগেও এসেছে। ওকে ওর মতো ছেড়ে দাও। হারাবে না।
বুজো বাড়ির সামনের ঘাসের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করতে লাগলো। একপা দুপা করে এগোতে এগোতে তাথৈ একদৃষ্টিতে দেখতে লাগলো বাড়িটা। সে সীমানায় পা রাখতেই শীতল বাতাস একদফা ছুঁয়ে গেছে ওকে। বড়বড় গাছের ছায়ায় দাড়িয়ে টিনেরশেডের বাড়িটা। সামনের দিকটায় গ্রিল করা বারান্দা। গেইটের ওপরের দিকে দুই প্রকারের বাগানবিলাস ঝুলছে। গোলাপী, হলুদ। চাল থেকে নেমে গেইটের গ্রিলে জড়িয়ে আছে ফুলভর্তি ডালগুলো। ডানপাশের দেয়ালে ছোট্ট একটা আয়তাকার নেমপ্লেট। মাটির তৈরী নেমপ্লেটটার মাঝে সুন্দরমতো ‘প্রীতিকার্নিশ’ লেখা, চারপাশে নকশা করা। নিচে সবুজ লতার নকল গাছ ঝুলছে। বাড়ির ভেতর থেকে তেলে ভাজার আওয়াজ আসছে। তাশদীদ গিয়ে গেইটের ছিটকিনিতে দুবার শব্দ করলো। তারপর সিড়ির সামনে জুতা খুলতে খুলতে ‘মা!’ বলে ডাক লাগালো। ভেতর থেকে মিসেস ওয়াসীর চেচিয়ে বললেন,
– তুই আজকেও কেনো বাধাকপি কিনেছিস তাশদীদ? কে খায় কে বাধাকপি এ সংসারে? আমার একার জন্য বাধাকপি রান্না করবো? ওদিকে তোর ভাই আজকেও এই দুপুরবেলা ব্যাট নিয়ে বেরিয়ে গেছে! আর তোর বাবা! সে এই এগারো পয়েন্টের সুগার নিয়ে আবারো লুকিয়ে ফ্রিজে রাখা পায়েস খেয়েছে জানিস? এই তাশদীদ? তুই কি ওদের কিছু বলবি? নাকি আমিই এই সংসার ছেড়েছুড়ে চলে যাবো? তোদের তিনপুরুষের অত্যাচার আমি আর নিতে পারছি না! তিনজনের এইসমস্ত কাজকর্ম সহ্য করার জন্য ওপরওয়ালা কি শুধু আমাকেই পেয়েছিলো?
একপলক পেছনের রুমন, শার্লি, তাথৈয়ের দিকে তাকালো তাশদীদ। তিনজনই থমকে আছে। নিশব্দে হাসলো শার্লি রুমন। এইযে এতো দৃঢ় ব্যক্তিত্বের তাশদীদ, সেও এক নারীর কাছে নাস্তানাবুদ। মায়ের কাছে। তাশদীদ ক্ষুদ্র শ্বাস ছাড়লো। মাসের এই একটা দিন ওর মায়ের মেজাজটা গরম থাকে। এই জুনিয়রদেরও আজকেই সাভার আসতে হলো। যদিও মিসেস ওয়াসীর অতিথি দেখলে সবচেয়ে বেশি খুশি হন। তাশদীদ জোরালো হেসে গেইট ঠেলে ভিতরে ঢুকলো। পেছনপেছন ভেতরে ঢুকলো রুমন শার্লি। তাথৈয়ের পায়ে কাদা ছিলো। ও খেয়াল করলো, সিড়ির পাশেও একটা ট্যাপ আছে। জুতা খুলে জিন্স গুটালো ও। ট্যাপ ছাড়ার শব্দ শুনে তাশদীদ পেছন ফিরে দেখে তাথৈ নিচু হয়ে পা ধুচ্ছে। রুমন শার্লি ততোক্ষণে ভেতরে ঢুকে গেছে। তাশদীদ ওদের বারান্দার সোফায় বসতে বলে কিচেনের দিকে এগোলো। তাথৈকে হাত দিয়ে খুটিয়ে খুটিয়ে পা ধুতে দেখে শার্লি বললো,
– আমি যে তাথৈকে চিনতাম, সে তার আঁইশ-কাদামাখা পা অন্যকাউকে দিয়ে ধোয়াতে অম্বুনীড়কে দশবার করে বেচে দিতো। দুবারও ভাবতো না। আর এই তাথৈ এই টিনশেডের প্রীতিকার্নিশে ঢুকবে বলে নিজের হাতে পায়ের কাদা, আঁইশের পানি ধুচ্ছে! ভাবা যায়?
রুমন ছোট্ট করে হেসে গুনগুনালো, ‘তাথৈ আলফেজ ভয়াল প্রেমে ম-জিলো রে! নিশা লাগিলো রে…’
ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে থেরাপি সম্পর্কিত ম্যাসেজ দেখতে লাগলো ও। শার্লিও হেসে সোফায় বসে ফোনে মনোযোগ দিলো। কিচেনে ঢুকে মাকে বাজার গোছাতে মহাব্যস্ত পেলো তাশদীদ। চুলায় রান্না চরিয়ে বাকিসব গোছাচ্ছে সে। তাশদীদ বললো,
– মা? বাজারে ইউনিভার্সিটির তিনটা জুনিয়রের সাথে দেখা হয়ে গেছে। লান্চ করাতে নিয়ে এসেছি। তুমি চলো, ওদের সাথে দেখা করবে চলো।
মিসেস ওয়াসীর চিনির বয়াম আটকাচ্ছিলেন। তাশদীদের কথায় চকচকে চোখে তাকালেন উনি। বললেন,
– তোর জুনিয়র এসেছে?
– এমন করছো যেনো এরআগে আমার কোনো জুনিয়র এ বাসায় আসেনি?
– চুপ থাক তো! শেষবার তো সাত আটটা ছেলে এসেছিলো সেই কবে! তোর ফোর্থইয়ারে। আগে কতো ঘমঘন বাসায় আসতো বাচ্চাগুলো। আজ এ, কাল সে, আজ ওরা, কাল তারা! ঝমঝম করতো আমার প্রীতিকার্নিশ! এরপর যেইনা তুই দুরে গিয়ে ভর্তি হলি, বাসায় বাচ্চারা আসাই ছেড়ে দিয়েছে! তো তুই আমাকে আগে বলবি না ওরা এসেছে? দেখি সর সর! ওরা তো নতুন! কথা হয়নি কারো সাথে! কথা বলি গিয়ে! তুই সর! যেতে দে আমাকে!
মিসেস ওয়াসীর একাধারে বলতে বলতে বয়াম তুলে রাখলেন, চুলার আঁচ কমিয়ে হাত ধুলেন, আঁচলে হাত মুছতে মুছতে হাটা লাগালেন বারান্দায়। তাশদীদ অবাক হলো না। কোমড়ে হাত রেখে হেসে ফেললো। এই মা ওকে বাসায় ঢুকলে দেখলে আগে ওর গালে হাত রেখে বলে, ‘ইশ! ফাঁকিবাজ বাবার জন্য বাজার করতে গিয়ে রোদে পুড়ে গেছে ছেলেটা আমার!’ কিন্তু যেইনা শুনলো বাসায় ওর জুনিয়র এসেছে, মিসেস ওয়াসীর ভুলে গেছেন ওকে। এমনটাই ঘটে। প্রতিবার! মিসেস ওয়াসীর খুশিমনে বারান্দায় আসলেন। রুমন শার্লি তাকে দেখে দাড়িয়ে গেলো। সালাম দিলো। মিসেস ওয়াসীর বড়সর হেসে সালামের উত্তর নিলেন। ওদের বসতে ইশারা করে বললেন,
– আরে বসো বসো! তোমরা এসেছো, আমি খুব খুশি হয়েছি। কেমন আছো? বাসার সব কেমন আছে তোমাদের?
মিসেস ওয়াসীর হাসি আর উচ্ছ্বলতা দেখে খুশি হয়ে যায় রুমন শার্লি। শার্লিও হেসে বললো,
– জ্বী আন্টি আলহামদুলিল্লাহ। সবাই ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?
– হ্যাঁ আল্লাহ খুব ভালো রেখেছে আলহামদুলিল্লাহ। তাশদীদ যে বললো তোমরা তিনজন? আরেকজন কোথায়?
শার্লি-রুমন আটকায়। ওদের হুশ হয়, মিসেস ওয়াসীরের প্রাণভরা ব্যবহারে ওরা দুজনেই তাথৈয়ের কথা ভুলে গেছে। এতোই প্রাণোচ্ছল তার হাসি আর কথা। অবশ্য হবেই বা না কেনো? তাশদীদ ওয়াসীরের মা সে। শার্লি বললো,
– ও্ ও বাইরে পা ধুচ্ছে আন্টি।
তাশদীদ পানি খাচ্ছিলো। মায়ের কথা শুনে ওরও তাথৈয়ের কথা মনে পরেছে। আবারো গেইটের দিকে এগিয়েছে ও। মিসেস ওয়াসীর গেইটে এগোতে এগোতে বললেন,
– এই ছেলেকে নিয়ে আর পারি না! পা কেনো বাইরেই ধুয়ে আসতে হবে? তামজীদ কি এ ঘরবাড়ি ঠিক রাখে? এসব…
তিনসিড়ির নিচে মাথা উচু করে দাড়িয়ে থাকা তাথৈকে দেখে থেমে গেলেন মিসেস ওয়াসীর। সাদা কুর্তা পরিহিত মেয়েটার গায়ের রঙও বেশ ফর্সা। কাধ বেয়ে ছাড়া পাওয়া সোজা চুল। চেহারায় বুঝতে না দেওয়া আকাঙ্ক্ষা। জামায় শাকপাতার ছোপ দাগ, জিন্স গুটানো, হাতেপায়ে পানিকনা। তাশদীদও দরজায়ই দাড়ানো। ও বোঝার চেষ্টা করছে, পা ধোয়ার পরেও কেনো ভেতরে ঢুকছে না তাথৈ? মিসেস ওয়াসীর আদুরে গলায় বললেন,
– দেখেছো? মেয়েটা এখানেই দাড়ানো। এসো মা এসো। ভেতরে এসো।
‘মা’ সম্বোধন শুনেই জামা খামচে ধরলো তাথৈ। চোখ ভরে ওঠে ওর। বহুদিন পর হাউমাউ করে কাদতে ইচ্ছে হলো। সামনে দাড়ানো আদরমাখা মুখের অধিকারীনিকে শক্ত করে জড়িয়ে কান্নার ইচ্ছে হলো। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হলো, ‘আমায় কেউ মা ডাকে না!’
তবুও তাথৈ নিজেকে সামলায়। আড়চোখে একপলক পাশের দেয়ালে আটা কাগজটার দিকে তাকিয়ে, নোয়ানো স্বরে বললো,
– আমি অ্যারাবিক পারি না।
তাশদীদ বিস্ময়ে দেয়ালে তাকায়। মিসেস ওয়াসীর সেখানে একটা কাগজে ‘ঘরে প্রবেশের দোয়া’ লিখে রেখেছেন। আরবি তার নিজের হাতে লেখা। মুখস্ত বলে কাগজটা দেখার প্রয়োজন পরে না তাশদীদের। তাই এই কাগজ কে কেমন খেয়াল করে, এতোদিন একবারো মনে হয়নি ওর। মিসেস ওয়াসীর একটু আটকালেন। অতঃপর আবারো সুন্দরমতো হেসে বললেন,
– আচ্ছা ব্যাপার না। ভেতরে এসো তুমি।
তাথৈ তেমনি স্থির। দরজা ছেড়ে দাঁড়িয়ে তাশদীদ নিজেই উচ্চারণ করলো দোয়াটা। সিড়ির নিচে দাড়ানো অবস্থায় একদন্ড সময় নিলো তাথৈ। চেষ্টা করলো শুনে শুনে বলার। কিন্তু ওর টান ঠিক হয়নি। তাশদীদ এবারে ভেঙে ভেঙে দোয়া উচ্চারণ করলো। ওর সাথে ঠিকঠাক দুয়া শেষ করলো তাথৈ। পা রাখলো প্রীতিকার্নিশে।
শানবাধানো মেঝেতে খালি রাখতেই পায়ের তলা শিরশিরিয়ে ওঠে তাথৈয়ের। ওর পুরো শরীর ঝাকি দিয়ে ওঠে অদ্ভুত শীতলতায়৷ তাথৈ ভেবে পায়না, শার্লি-রুমনও তো ভেতরে ঢুকেছে। এই অদ্ভুত অনুভূতি কি ওদেরও হয়? নাকি কেবল ওরই হয়? অম্বুনীড়ের ভেতরের টাইলস করা মেঝেতে শেষ কবে খালিপায়ে হাটা পরেছে, মনে করতে পারে না তাথৈ। ওর শুধু মনে হচ্ছে, এই পুরো প্রীতিকার্নিশ জুড়ে কেবল মায়া-মমতার ঘ্রাণ৷ শুরু থেকেই যেনো অদ্ভুত হিম হাওয়া ওকে ছুঁয়ে চলেছে। গুটিগুটি পায়ে এসে সোফায় বসলো তাথৈ। তাশদীদ পাশের ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসলো। পরিচয়ের উদ্দেশ্যে সবে মুখ খুলেছে,
– মা ও…
– এই তুই যা তো! চুলার রান্নাটা দেখ গিয়ে। আমি ওদের সাথে পরিচিত হয়ে নেই। আসছি একটুপর। যা যা!
তাশদীদ গুরুত্বহীনতা নিয়ে মাথা নেড়ে চলে গেলো কিচেনে। ও জানে, আজকে ওর মা আর ওর না। মিসেস ওয়াসীর ডাইনিংটেবিল থেকে কিছু ফল নিয়ে চপিংবোর্ডে কাটতে শুরু করলেন। বললেন,
– তোমরা সবাই কি ঢাকারই স্থানীয়?
– আমি বাইরের। হলে থাকি। রুমন আর তাথৈ এখানকারই।
শার্লির জবাবে তাথৈয়ের দিকে তাকালোন মিসেস ওয়াসীর। নরম গলায় বললেন,
– তোমার নাম তাথৈ?
তাথৈ অপ্রস্তুত হলো। এই প্রথমবার কারো নাম জিজ্ঞেস করায় ওর মুখ দিয়ে নিজের নাম বেরোলো না৷ কেবল ঠোঁটে কিঞ্চিৎ হাসি ফুটিয়ে মাথা ওপরনিচ করে হ্যাঁ বুঝালো ও। তাথৈকে এমন নমনীয় জবাব দিতে দেখে রুমনের টেরেন্সের কথা মনে পরলো। একই প্রশ্নের জবাবে ও টেরেন্সকে যে চাওনিটা দিয়েছে, তাতেই ও বেচারার কলিজা গলা অবদি আসার কথা। মিসেস ওয়াসীর আরো কিছুক্ষণ কথাবার্তা বললেন ওদের সাথে। এরইমাঝে তাশদীদ কিচেন থেকে হাক ছুড়লো,
– মা?
মিসেস ওয়াসীর হতাশ হয়ে কিচেনের দিকে তাকালেন একবার। তাথৈও সেদিকে তাকালো। এখান থেকে তাশদীদকে দেখা যায় না৷ মিসেস ওয়াসীর কাটা ফলগুলো শার্লিদের খেতে বলে উঠে কিচেনে গেলেন। তাশদীদকে বললেন,
– হয়েছে! অনেক করেছিস। এখন যা তুই ওদের নিয়ে একটু হেটে আয়। এরমাঝে আমি বাকিটা শেষ করছি৷ যা!
– যথা আজ্ঞা!
তাশদীদ মাথা দুলিয়ে বারান্দায় আসলো। শার্লিদের উদ্দেশ্য করে বললো,
– চলো হেটে আসি।
শার্লি রুমন আগ্রহের সাথে উঠে দাড়ায়। তাথৈ বসেই ছিলো। তাশদীদের কপালে ভাজ পরে। তাথৈ বললো,
– আমি এখানেই থাকবো।
– এজ ইউ উইশ!
কাধ উঁচিয়ে বললো তাশদীদ। এরপর শার্লি রুমনকে হাত বাড়িয়ে ইশারা করলো, ‘চলো যাই।’ বেরিয়ে যাওয়ার সময় শার্লি এসে তাথৈয়ের কানেকানে বললো,
– আমরা আসি। এরমাঝে তুই শাশুড়িকে পটিয়ে ফেল!
তাথৈয়ের গায়ে লাগলো না কথাটা। কাউকে পটানোর চাহিদা ওর নেই। ওর চাহিদা হয়তো মিসেস ওয়াসীরের আঁচলটা। বারান্দায় বসে কিচেনে দুলতে থাকা আঁচলটা চোখে পরছে ওর। তাথৈ বশীভূতের মতো উঠে দাড়ায়। একপা দু পা করে এগোয় কিচেনে। উঁকি দিয়ে দেখলো, মিসেস ওয়াসীর কড়াইয়ে খুন্তি চালাচ্ছেন। তরকারীর ঘ্রাণ আর ঝাঁঝে ভরে উঠেছে চারপাশের বাতাস। নাকে ঝাল শুরু হয় তাথৈয়ের। দু সেকেন্ডের মধ্যে ঘর কাপিয়ে হাচি দিয়ে ওঠে ও। একটানা হাচি দিতেই থাকে। মিসেস ওয়াসীর এসে ব্যস্তভাবে ছুটে এসে ওকে দুহাতে ধরে বললেন,
– আরে আরে! তুমি যাওনি ওদের সাথে?
ঝাঝে তাথৈয়ের নাক লাল হয়ে গেছে। চোখ দিয়ে পানি গরাচ্ছে। কথা বলতে পারছে না ও। হাচি দিতে দিতে জ্বলতে থাকা চোখে মিসেস ওয়াসীরের দিকে কোনোমতে তাকালো ও। মিসেস ওয়াসীর ওকে দ্রুত পাশেররুমে নিয়ে আসলেন। বিছানায় বসিয়ে দিয়ে, গ্লাসভর্তি পানি এগিয়ে দিয়ে বললেন,
– ইশ! এডজাস্টার অন, কিচেনের জানালা খোলা, এরমাঝেও তোমার এমন অবস্থা? কিচেনে কেনো গিয়েছো তুমি? ইশ! নাও নাও! পানি খাও!
তাথৈ পানি শেষ করলো। মিসেস ওয়াসীর ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
– এবার ঠিক লাগছে?
মাথা নেড়ে হ্যাঁ বুঝায় তাথৈ। মিসেস ওয়াসীর বললেন,
– তুমি বাইরে গেলে না? পুকুরের ওদিকটায় গেলে ভালো লাগতো। ওদিকে সুন্দর…
– আমার আপনার কথা শুনতে ভালো লাগছে।
মিসেস ওয়াসীর আটকালেন। ওনার মনে হয়েছিলো তাথৈ কম কথা বলে। এমন আদুরে কথাটা এমন স্পষ্টভাবে বলা যায়, পুর্ব অভিজ্ঞতা ছিলো না তার। আবারো তেমন চমৎকার হেসে বললেন,
– আচ্ছা বেশ। তুমি এখানে দু মিনিট বসো। আমি তরকারীটা নামিয়েই আসছি কেমন?
তাথৈয়ের তেমনি হ্যাঁ সুচক ইশারা। মিসেস ওয়াসীর রান্নাঘরে গেলেন। তাথৈ পুরো ঘরটায় চোখ বুলালো। বড়বড় দুটো জানালার জন্য আলোবাতাসের অভাব নেই। খাট, ওয়ারড্রোব, ড্রেসিংটেবিল, পড়ার টেবিল, কালো খয়েরি রঙের কাঠের আসবাবে ছিমছামভাবে সাজানো। উঠে দাড়িয়ে জানালার দিকে গেলো তাথৈ। ঝুলতে থাকা সবুজ মানিপ্লান্টের আড়ালে ওর চোখে পরলো শার্লিদের। তাশদীদ উল্টোপাশ হয়ে দাড়িয়ে পুকুরে ঢিল ছুড়ছে। সে একটা ঢিল পানির ওপরিভাগে তিন চারবার লাফিয়ে দুরে গিয়ে পরছে। মুচকি হেসে তাথৈ বইয়ের তাকে তাকালো। একলাইনে ধর্মীয় বই, একটাতে দেশি বিদেশি গবেষণার বই, একটাতে আলাদা আলাদা ভাষার বই। টেবিলের সবার সামনের খাতাটায় পাতাভর্তি বিক্রিয়া লিখে একটানে কেটে দেওয়া। বা কোনায় লাল মার্কারে লেখা, ‘Not found’
তাথৈ বিক্রিয়াগুলো পড়লো। প্রতিটি বিক্রিয়ায় এক রাইবোজের সাথে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষারকের ব্যবহার করা হয়েছে৷ তাথৈ বুঝে উঠলো না, উৎপাদ হিসেবে ঠিক কি চেয়েছে তাশদীদ। তবুও কলম নিয়ে নিজেনিজে দুইটা বিক্রিয়া লিখলো ও। এরমাঝেই কানে আসলো,
– মায়ের বউমা নাকি?
তাথৈ হচকিয়ে দরজায় তাকায়। তামজীদ ব্যাট কাধে বাঝিয়ে সন্ধিহান চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। তাথৈকে তাকাতে দেখেই ও উল্লাসে হেসে বললো,
– আরে! মায়ের বউমা যে!
তাথৈ আরেকদফায় থতমত খেয়ে গেলো। সরে দাড়াতে গিয়ে হাতে থাকা কলমটা পরে যায় ওর। ওইটুকো শব্দেও কেপে উঠলো তাথৈ। ওর ভয়ার্ত মুখটা দেখে তামজীদ শব্দ হেসে ফেললো। তাথৈ একবার পরে থাকা কলম দেখছে তো আরেকবার হাসতে থাকা তামজীদকে। একটুখানি দম নিয়ে, নিজেকে স্বাভাবিক করলো ও। বুকে হাত গুজে কাটকাট গলায় বললো,
– কারো বউ, বউমা কোনোটাই এখনো হইনি। কিন্তু তোমার ভাবী ডাকার ইচ্ছে হলে ডাকো। আমার সমস্যা নেই!
#চলবে…

