কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা ৩৬.

0
874

#কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা

৩৬.

– কারো বউ, বউমা কোনোটাই এখনো হইনি। তোমার ভাবী ডাকার ইচ্ছে হলে ডাকো। আমার সমস্যা নেই!

তাথৈয়ের জবাব শুনে তামজীদ নিজেই এবার হচকিয়ে যায়। হাসি থেমে যায় ওর। তাথৈ নিস্প্রভ। তেমনি বুকে হাত গুজে থেকে বললো,

– মুসলিমরা একজন আরেকজনের ভাই হয়। সে হিসেবে যে আমার বর হবে, সে তোমার ভাইই হবে। সো ইউ ক্যান কল মি ভাবী। সমস্যা নেই!

তামজীদ কি ভেবে খুশি হয়ে গেলো আবারো। ব্যাট কাধ থেকে নামিয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললো,

– তোমাকে তামজীদের পছন্দ হয়েছে ভাবী। ইচ্ছে করে পাড়ামহল্লা জানিয়ে তোমাকে ভাবী ডাকি। কিন্তু সমস্যা হলো, এখন থেকেই তোমাকে ভাবী ডাকলে আমার আপন ভাই আমাকে আস্ত রাখবে না। এদিকটার কি করা যায় বলো।

তাথৈ বুক থেকে হাত নামালো। টেবিলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে, পেছনদিকে দুহাত টেবিলে ঠেকিয়ে বললো,

– আমারো তোমাকে পছন্দ হয়েছে তামজীদ। আর তাথৈ আলফেজ যাকে পছন্দ করে, তাকে আস্ত রাখবে না, এতোবড় সাহসটা কারো নেই। সো রিল্যাক্স!

তামজীদ ব্যাট ঠিকঠাকমতো রেখে কোমড়ে হাত রেখে দাড়ালো। আরেকবার আপাদমস্তক দেখে নিলো তাথৈকে। ভাইয়ের ফোনে থাকা একমাত্র রমনীর ছবি বাস্তব হয়ে এ বাসায় এসেছে বলে কথা! তাথৈকে পরখ করার পর ওর মনে হলো, বেছেবেছে দুনিয়ার সবচেয়ে স্পষ্টভাষী, প্রখর-দৃষ্টির মেয়েটা ওর সামনে। তাথৈ বললো,

– কয় রানে আউট হয়েছো?

– আর বলো না। বারোতে গেছি।

– দুপুরবেলা লান্চ করে বিকেলবেলা খেলতে যেতে! হাফসেঞ্চুরি পাক্কা ছিলো।

মায়ের শাষনটা অন্য রমনীর কাছে অন্য ভঙিতে শুনে তামজীদ হাসলো। বললো,

– এখনই মায়ের মতো শাষন করছো দেখি! যাইহোক! তুমি কার সাথে এসেছো? আমার আপন ভাই তো তোমাকে দাওয়াত করে বাসায় আনার মতো মেটাল না। তাহলে?

তামজীদের কথার ভঙ্গিমা শুনে তাথৈ অতিকষ্টে হাসি সংবরন করলো নিজের। জবাব দিতে যাবে, মিসেস ওয়াসীর এরমাঝে রুমে আসলেন। তামজীদকে দেখে বললেন,

– ও! ছোট নবাব বাসায় ফিরেছেন? বলুন কি দিয়ে খেদমত করতে পারি আপনার? স্ট্যাম্পগুলো ধুয়েমুছে তাশদীদর আসা অবদি অপেক্ষা করবো? নাকি আমার খুন্তিতেই আপনি সন্তুষ্ট হবেন?

তামজীদ একবার মায়ের দিক তাকায়, তো একবার তাথৈয়ের দিক। দুপুরে খেলতে বের হলেই যে ওর নিয়ম করে মা-ভাইয়ের বকুনি জোটে, সেটা তাথৈয়ের জানাটা আবশ্যক ছিলো না। জোরালো হেসে মায়ের দিকে এগিয়ে গেলো তামজীদ। তার কাধে হাত রাখতে রাখতে বললো,

– কি যে বলো না মা! আমার কি আর এমন খেদমত নেওয়ার বয়স আছে? তুমি…

– খবরদার ধরবি না আমাকে! জলদি গোসল সেরে নামাজ শেষ কর! নইলে মার একটাও আজ মাটিতে পরবে তামজীদ! বলে দিচ্ছি!

তামজীদ গায়ে হাত দেওয়ার আগেই দ্রুততার সাথে সরে গেলেন মিসেস ওয়াসীর। শাষনের স্বরে বললেন কথাটা। তামজীদ বললো,

– আচ্ছা আচ্ছা। শান্ত হও! যাচ্ছি। এটা বলো এই ভা…মানে আপুটা কখন এসেছে? কার সাথে এসেছে? ভাইয়ার সাথে তো না তাইনা?

– কেনো? ওকে প্রীতিকার্নিশ আনতে তোর অনুমতি নেওয়া লাগতো?

তামজীদ দরজায় তাকিয়ে দেখে তাশদীদ এসেছে। পেছনে রুমন-শার্লিও আছে। ভাইয়ের স্বভাব নিয়ে তামজীদ যা জানে তা অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাওয়ায় ‘হেহ হেহ!’ করে হেসে গামছা নিয়ে গোসলে চলে গেলো ও। তাশদীদ একপলক তাথৈয়ের দিকে তাকালো। সে ওর পড়ার টেবিল ঘেষে দাঁড়িয়ে। চোখাচোখি হতেই তাথৈ সোজা হয়ে দাড়ালো। সরে আসলো ওখান থেকে। ওয়াসীর সাহেব বাইরে থেকে ডাক লাগালেন। সবাইকে খাবার টেবিলে বসার জন্য বলে ঘর থেকে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে আসলেন মিসেস ওয়াসীর। বাইরে এসে তাশদীদ বাবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো তাথৈদের। তাথৈ খেয়াল করলো, তাশদীদের সাথে ওয়াসীর সাহেবের ব্যক্তিত্বের প্রচন্ড মিল। দৃঢ়তার পাশাপাশি সৌজন্যতা আর হাসির কোনোরুপ অভাব নেই ভদ্রলোকের ব্যবহারে। মিসেস ওয়াসীর ডাকে ডাইনিংয়ে এগিয়ে গেলো সবাই। ব্যস্তও হয়ে পরলো যারযার মতো। তাথৈ শুধু দেখছে। মিসেস ওয়াসীর কিচেনে খাবার বাড়ছেন, তাশদীদ হাতেহাতে তা এনে টেবিলে রাখছে, তামজীদ সবার প্লেট এগিয়ে দিয়ে টেবিলে জায়গা করে দিচ্ছে আর শার্লির সাথে হাসাহাসি করছে, ওয়াসীর সাহেব গ্লাসে গ্লাসে পানি ঢালছেন সাথে রুমনের সাথে কথা বলছেন। তাথৈ চাক্ষুষ দেখলো, পুরুষালি অহংকারের একবিন্দুও এ বাসার তিনপুরুষের মাঝে নেই। ছয় চেয়ারের টেবিলটায় তাশদীদ আরেকটা অতিরিক্ত চেয়ার এনে তামজীদ আর রুমনের মাঝামাঝি বসে গেলো। তাথৈকে বললো,

– বুজোকে বাইরে ডগফুড দিয়েছি। ওকে নিয়ে টেনশন করো না।

তাথৈ কিছুই বললো না। সত্যি তো এটাই, ওর একবারো বুজোর চিন্তা হয়নি। ও জানতো, সবার খেয়াল রাখতে জানা তাশদীদ বুজোকে ভুলবে না। মিসেস ওয়াসীর তাথৈয়ের পাশেই বসলেন। খাবার বাড়ার সময়ও ওনারা চারজন মিলে তাথৈদের বেড়ে দিচ্ছিলো, খাবারের বাটিগুলো একজন আরেকজনকে এগিয়ে দিচ্ছিলো, কথা বলছিলো, হাসছিলো। সবাইকে পরখ করা শেষে সামনের বড়সর প্লেটের দিকে তাকালো তাথৈ। স্টিলের ইয়া বড় ছড়ানো থালাটায় ধোয়া ওঠা ভাতের মাঝে ডাল। তার চারপাশে গোলগোল করে লালশাক ভাজি, সবুজ রঙের কোনো এক ভর্তা, পেয়াজের ঝোলে টকটক করতে থাকা মাছের টুকরো আর গরুর গোশত সাজানো। এতো খাবার দেখে একমুহূর্তের জন্য চারপাশ ঘুরে ওঠে তাথৈয়ের। পাশে তাকিয়ে দেখে সবাই খাওয়া শুরু করে দিয়েছে। কেবল ও পরেছে বিপদে। চামচ ছাড়া হাতে খাওয়ার অভ্যস নেই। এখানে সবার মাঝে ওর একার চামচে খাওয়াটাও ভালো দেখাবেনা। তাই সাহস করে কাপাকাপা হাতে ভাতে আঙুল চালায় তাথৈ। মিসেস ওয়াসীর দেখলেন, তাথৈ এতোটাই আলতোভাবে ভাত মাখাচ্ছে যে ভাত ওর হাতে ওঠার বদলে প্লেটে ছড়িয়ে যাচ্ছে। ওর চেহারায়ও ভাত ঠিকঠাকভাবে তুলতে না পারার অপারগতা। মিসেস ওয়াসীর বললেন,

– তোমার হাত দিয়ে ভাত খাওয়ার অভ্যাস নেই?

খাওয়া বাদ দিয়ে সবাই তাথৈয়ের দিকে তাকালো। তাথৈ একবার তাশদীদের দিকে তাকিয়ে মিসেস ওয়াসীরের দিকে তাকালো। তারপর নিঃসংকোচে না সূচক মাথা দুলালো। মিসেস ওয়াসীর হেসে ফেললেন। তারপর তাথৈয়ের হাত ধরে ধরে ওকে ভাত মাখানো, খাবারের লোকমা বানানো শেখালেন। তাথৈ একদম মনোযোগী ছাত্রীটার মতো তার হাতের ভঙিমা দেখছে, নিজেও লোকমা বানাচ্ছে। ওকে আনাড়ি হাতে ভাত মাখাতে দেখে তাশদীদ শুরুতে নিয়ব্দে হাসলো। পরে খাওয়ায় মনোযোগ দিতে গিয়েও আনমনা হয়ে গেলো ও। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মালে সে চামচেই অভ্যস্ত হয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু চামচে অভ্যস্ত মেয়েটা ওর মায়ের কাছে হাতে ভাত খাওয়া শিখছে, সে ব্যাপারটা কতোটা স্বাভাবিক, আপাতত সেটাই ওকে ভাবাচ্ছে।

প্রীতিকার্নিশে পা রেখে বারান্দায় রুমনকে দেখে থেমে গেলো রিংকি। খাওয়াদাওয়া শেষে রুমন, তাশদীদ আর ওয়াসীর সাহেব বারান্দায় বসেছেন। রিংকি শুনতে পেলো তাশদীদের ঘর থেকে একাধিক মেয়েলী আওয়াজ আসছে। অথচ এ বাসায় মিসেস ওয়াসীর ছাড়া আর কোনো মেয়ে নেই। রুমনকে দেখে তাশদীদের বন্ধুবান্ধবী এসেছে, এমনটাই আন্দাজ করলো রিংকি। ওউ জানে, তাশদীদের চেনাপরিচিতদের প্রীতিকার্নিশে হরহামেশাই যাতায়াত থাকে। মনেমনে এটুকোও ভাবলো, আগেরদিন ওর জামায় চা ফেলে দেওয়া তাথৈ যেনো এখানে না থাকে। তাশদীদ অসময়ে বাসায় রিংকিকে দেখে ভ্রু কুচকালো। বললো,

– রিংকি? তুমি এখানে?

তাশদীদের নজরে আসতে পেরেই রিংকির ঠোঁটে হাসি ফোটে। ওয়াসীর সাহেবকে সালাম দিলো ও। তারপর তাশদীদকে হাতের বক্সটা দেখিয়ে বললো,

– আব্বু শেরপুর গিয়ে ছানার পায়েস এনেছে। আপনার তো পায়েস পছন্দ। আর আপনি আমাকে আর পড়াতেও যাবেন না। তাই আম্মু বললো দিয়ে যেতে৷

তাশদীদ আজও বিরক্তই হলো। পায়েস ওর বাবারও পছন্দ। এভাবে ওর নাম করে রিংকির এ বাসায় আসাটা মোটেও পছন্দ হলোনা ওর। রুমন কপাল ডলার ভঙিমায় মুখ লুকালো। যতোদুর যা শুনছে দেখছে, তাতে ওরই এখন ভয় করছে। তাশদীদ বললো,

– এটার কোনো প্রয়োজন ছিলো না। তুমি…

ওয়াসীর সাহেব নিমীলিত স্বরে বললেন,

– এসেছো যখন, ভেতরে গিয়ে বসো রিংকি। তোমার আন্টি ভেতরেই আছে দেখো।

বক্সটা ডাইনিংয়ে রেখে, মাথা দুলিয়ে ঘরের ভেতরে চলে যায় রিংকি। কিন্তু ঘরে ঢুকতেই ওর হাসিটা গায়েব হয়ে যায়। তাথৈ, শার্লি, তামজীদ, মিসেস ওয়াসীর; তাশদীদের বিছানার চারজন। মিসেস ওয়াসীর তামজীদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন আর তার কলেজজীবনের কথা বলছেন। তামজীদ তার কোলে শুয়ে রুবিক্স কিউব মেলাচ্ছে, মাঝেমাঝে মাকে খোচাচ্ছে। শার্লি কোলে বালিশ নিয়ে বসে মিটমিটিয়ে হাসছে। আর তাথৈ দুহাতে হাটু জড়িয়ে বসে, হাটুতে থুতনি ঠেকিয়ে মুচকি হাসিতে মিসেস ওয়াসীরের কথা শুনছে। রিংকির পায়ের তলার ঠান্ডা শান জ্বলন্ত কয়লা হয়ে যায় যেনো। অদ্ভুতভাবে ‘আন্টি’ বলে ডাক লাগায় ও। উপস্থিত চারজনই দরজায় তাকালো। মিসেস ওয়াসীর হাসিমুখে বললেন,

– ওমা রিংকি? তুমি কখন এলে?

তামজীদ কপাল কুচকে বিরবিরিয়ে বললো,

– ওমা আপদ? এটা কেনো এলো?

শার্লি একবার রিংকির দিকে তাকায়, একবার তাথৈয়ের দিকে। ও তাথৈয়ের অভিমত বোঝার চেষ্টা করছে। তাথৈ হাটু ছেড়ে বাবু হয়ে বসে গেছে এবারে৷ রিংকি ভেতরে ঢুকে বললো,

– ওনারা কখন এসেছেন?

– ওরাতো দুপুরে লান্চ করেছে৷ তুমি এসো। কেমন আছো বলো? ও বাসার সব কেমন আছে?

– সব্বাই ভালো আছে! তুমি কেমন আছে আন্টি?

রিংকি বিছানা ঘুরে এসে হুট করেই মিসেস ওয়াসীরের গলা জডিয়ে ধরলো। তামজীদ ধরফরিয়ে উঠে বসে। রিংকির এই নাটকটা এরআগে ঘটেছে বলে মনে পরছে না। পরপরই ওর মনে হলো, এরআগে তাথৈও এ বাসায় আসেনি। ইতিমধ্যে শার্লি ওর কাছে তাথৈয়ের বিষয়ে বলেছে, সাথে রিংকির ইতিহাসও জেনে নিয়েছে৷ তামজীদ হিসেব করে বুঝলো, চা ফেলার ঘটনার জন্য রিংকির মনে তাথৈকে নিয়ে কিছুটা হলেও ভয় ঢুকেছে। তাই ওর মাকে এসে ওভাবে জরিয়ে ধরেছে সে। মিসেস ওয়াসীর রিংকির আকস্মিক আলিঙ্গনে কিছুটা হচকিয়ে যান। তবুও জোরপুর্বক হেসে বললেন,

– হ্যাঁ আলহামদুলিল্লাহ।

রিংকি তার গলা ছেড়ে তাথৈয়ের পানে চাইলো। তাথৈ আবারো ওমন হাটু জড়িয়ে বসলো। মুচকি হেসে বললো,

– কেমন আছো রিংকি? এডমিশনের রেজাল্ট কবে দেবে তোমার?

রিংকির রাগ হয়। তবুও মুখে জবাব দেয়,

– দুদিন পর।

তাথৈ কথা এগোলো না। ঘাড় বাকিয়ে তাকিয়ে রইলো রিংকির দিকে। রিংকি মিসেস ওয়াসীরের গা ঘেষে বসলো। মিসেস ওয়াসীর আবারো বলতে লাগলেন। এরইমাঝে তাশদীদ দরজায় নক করে ভেতরে আসে। একপলক ওকে দেখে তাথৈয়ের দিকে তাকালো রিংকি। সে মিসেস ওয়াসীরের কথায় মনোযোগী। টেবিলে থাকা টুপিটা নিতে গিয়ে তাশদীদে চোখে পরলো খাতায় অতিরিক্ত তিনটা বিক্রিয়া লেখা। তৎক্ষণাৎ ওর চোখ যায় তাথৈয়ের দিকে। তাশদীদ গম্ভীর গলায় ডাক লাগালো,

– তাথৈ?

তাথৈ নিমীলিত চোখে তাকালো ওর দিকে। তাশদীদ বললো,

– এই পেইজের নতুন তিনটা রিয়্যাকশন তুমি লিখেছো?

– হু।

– এক্সপেরিমেন্টে এই রিয়্যাকটেন্ট পেয়েছিলে?

– ল্যাবে আঠারোটা চেক দিয়েছিলাম।

– এদিকে আসো।

তাথৈ মিসেস ওয়াসীরের মুখপানে চাইলো। হয়তো সে চাওনিতে এটুকো বলা ছিলো, ‘আমি না আসা অবদি আপনি একশব্দও বলবেন না প্লিজ।’ বিছানা থেকে নেমে আসে তাথৈ। তাশদীদ টেবিলের কোনায় বসেছে। তাথৈকে চেয়ার দেখিয়ে বললো,

– ডেরাইভ দ্য রিয়্যাকশন।

– আমি এখানে রিয়্যাকশন ডেরাইভ করতে আসিনি!

সুস্পষ্ট জবাব দিলো তাথৈ। তাশদীদ ততোতাই স্পষ্টভাবে বললো,

– এটার ডেরিভেশন না করলে তুমি প্রীতিকার্নিশ থেকে একপাও বেরোতে পারবে না। গট ইট?

‘বেরোতে চাইছেই বা কে?’
মনের জবাবটা মুখে দিলো না তাথৈ। খাতাকলম নিয়ে চেয়ারে বসে গেলো ও। ওই টেবিলের কোনায় তাশদীদ বসেবসে ওর লেখা দেখছে। আর এটুকোই সহ্য হলো না রিংকির। রাগে ফুসতে ফুসতে বিছানার পাশে থাকা ছোট টেবিলটার ড্রয়ারে আঙুল রাখে ও। তারপর জেদ করে বন্ধ করে দেয় ড্রয়ারটা। হাত তুলে ধরে আর্তনাদ করে ওঠে তখনতখনই।
রুমের সবাই ওরদিক তাকালো। তাশদীদ টেবিল থেকে নেমে ছুটে আসে একপ্রকার। রিংকির ডানহাত ধরে দেখে ড্রয়ারে চাপ লেগে অনামিকা আঙুলের একপাশ কিছুটা থেতলে গেছে। একই ড্রয়ারেই ফার্স্ট এইড বক্স ছিলো। তাশদীদ দ্রুততার সাথে মলম আর সেলোটেপ বের করে রিংকির হাতে লাগিয়ে দিতে লাগলো। শেষে একটা ধমক দিয়ে বললো,

– দেখেশুনে হাতপা ছুড়োছুড়ি করতে পারো না? বড় হওনি?

– বড় হয়েছি বলছেন?

মেজাজ আরো বিগড়ে যায় তাশদীদের। হনহনিয়ে এসে টেবিলে এগিয়ে টুপিটা নিলো ও। তাথৈকে বললো,

– আসরের আযান হয়েছে। আই থিংক তোমাদের বেরোনো উচিত। তোমরা আসো, আমি মসজিদে নামাজটা সেরে সামনেই দাড়াচ্ছি।

তাশদীদ তৎক্ষনাৎ রুম থেকে বেরিয়ে যায়। ওকে ওভাবে বেরিয়ে যেতে দেখে বারান্দা থেকে মিসেসকে ডাক লাগালেন ওয়াসীর সাহেব। তামজীদও গেলো মায়ের পিছুপিছু। রুমন দরজার সামনে এসে দাড়িয়েছিলো। শার্লি ওকে সাইডে ডেকে বলতে লাগলো কি ঘটেছে।
তাশদীদের ঘরে কেবল তাথৈ-রিংকি। তাথৈ চেয়ার ছেড়ে বেশ স্বাভাবিক ভঙিতে রিংকির দিকে এগোলো। তারপর ওর হাত তুলে আঙুলটা পরখ করলো। রিংকির বুক দুরুদুরু করলেও ভাবে প্রকাশ করলো না কিছু। আঙুলটা দেখতে দেখতেই, হুট করেই সেলোটেপটা টান মেরে খুলে ফেলে তাথৈ। তৎক্ষণাৎ ব্যথাতুর আওয়াজ করে ওঠে রিংকি। চোখ খিচে বন্ধ করে নিয়ে, নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে। একটুপরে চোখ তুলে তাকায় তাথৈয়ের দিকে। তাথৈ ফার্স্ট এইড বক্সে থাকা আরেকটা নতুন সেলোটেপ নিলো। রিংকির আঙুলে লাগিয়ে দিতে দিতে বললো,

– নিজেনিজে ব্যথা নিলে ব্যথা কম লাগবে। অন্যজন ব্যথা দিলে দেখো, ব্যথা বেশি পাওয়া যায়।

– তাশদীদ ভাই হয় তোমার। সিস্টার না। ওর হাত থেকে তুমি নার্সিং ডিসার্ভ করো না। সো? আমার নার্সিং কেমন? পছন্দ হয়েছে তোমার?

– আ্ আপনি কি চাইছেন?

তাথৈয়ের হাত থামে। রিংকির প্রশ্নে হাত থেকে চোখ তুলে, ওর মুখের দিকে তাকালো ও। টের পেলো, যতোটা বাচ্চা ভেবেছিলো, রিংকি ততোটাও বাচ্চা না। ওর হাত ছেড়ে দিয়ে বুকে হাত গুজে দাড়ালো তাথৈ। বললো,

– আমার চাওয়া জেনে তোমার কাজ নেই। তুমি বরং আমার না চাওয়া শোনো।

রিংকি তাথৈয়ের দৃষ্টি পড়ার চেষ্টা চালালো। কিন্তু লাভ হলো না। ও বুঝলো, তাথৈয়ের ওই সুক্ষ্ম হাসি আর তীক্ষ্ণ চাওনির ভাষা পড়ার বয়স ওর হয়নি। ওকে খুব বেশিক্ষণ হতাশ হতে দিলো না তাথৈ। তেমনই দীপ্ত কন্ঠে বললো,

– আমি চাই না তুমি তাশদীদকে আর কোনোভাবে ডিস্টার্ব করো।

রিংকি প্রসারিত চোখে চায়। তাথৈ বিন্দুমাত্র ভণিতা না করে বললো,

– তুমি তাশদীদের জবাবটা জানো রিংকি। তুমি এটাও বোঝো, ও তোমাকে নিয়ে বিরক্ত। এরপরও এমনসব কাজ করো, যাতে ও তোমার প্রতি আরো বিরক্ত হয়। এন্ড ট্রাস্ট মি, এই ব্যাপারটা আমি একদমই চাইছি না। আমি চাইছি না তুমি তাশদীদের বিরক্ত বা বিব্রতবোধের কারন হও। চাইনা ওর সামনে-পেছনে, আগে-পরে, জানা-অজানায় তুমি এমন কিছু করো না যাতে ও বিন্দুমাত্র বিরক্ত হয়। তোমার কারনে তাশদীদ একবারো ‘অসহ্যকর’ ভাবনায় দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলুক, এটা আমি একেবারেই চাইছি না!

রিংকি স্তব্ধ! বিমূঢ়! ওর মুখ দিয়ে কোনো কথাই বেরোচ্ছে না। তাশদীদের জন্য এইভাবে কেউ কোনোদিন ওকে বলবে, তা হয়তো ওর ধারনায় ছিলোনা। ওকে আটকে থাকতে দেখে তাথৈ কিছুটা ঘাড় বাকালো। জিজ্ঞাসুসূচক চেয়ে বললো,

– তুমি বুঝতে পারছো রিংকি, আমি ঠিক কি চাইনা বুঝিয়েছি?

রিংকি হুশে আসে। তাথৈ যে তাশদীদের প্রতি দূর্বল, সেটা ও বুঝেও বুঝতে চাইলো না। তাথৈয়ের কথায় ভয় ও পেয়েছে। তবুও যেনো কোত্থেকে সাহস জুগিয়ে বলে ফেললো,

– তাশদীদ ভাইকে আমি ভালোবাসি।

তাথৈ জবাব দিলো না। কয়েকদন্ড নিরবে চেয়ে রইলো রিংকির দিকে। তারপর একবার ওর হাতের দিকে তাকিয়ে আবারো তাকালো ওর চোখে। এই অল্পবয়সী মেয়ের জেদ আটকাতে ও কোনো চুড়ান্ত মাত্রায় যেতে চাইছে না। তাই নিজেকে সংবরন রেখে ধীরস্থির গলায় জবাব দিলো,

– ভালোবাসা হলে সেটাকে আঘাতের দুঃসাহস আমি করতাম না রিংকি। বাট রিমেম্বার! তাশদীদকে এতোটুকোও হ্যারাজ করবে, এমন জেদকে আমি টলারেট করব না। করতে পারবো না। সো স্টে এওয়ে ফ্রম হিম। বেটার ফর ইউ!

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here