গল্পঃ_হৃদয়ে_লাগিল_দোলা_ #পর্বঃ_৩৬ #লেখিকাঃ_নুসাইবা_জান্নাত_আরহা_

0
554

#গল্পঃ_হৃদয়ে_লাগিল_দোলা_
#পর্বঃ_৩৬
#লেখিকাঃ_নুসাইবা_জান্নাত_আরহা_

ধীর পায়ে কক্ষের পথে পা বাড়ালাম আমি। এ মুহুর্তে কক্ষের মাঝে বিরাজ করছে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ। কক্ষে প্রবেশ করে তাই হাতড়িয়ে বাতি জ্বালিয়ে দিলাম। অশান্ত চাহনিতে একবার এদিক ওদিক পরোখ করেও আদ্রিশের দেখা মিলল না। ফলে ললাটে যৎকিঞ্চিত ভাঁজ আপনাআপনিই চলে এলো আমার। হুট করে বেলকনির দিকে নজর পড়তেই এক ছায়ামূর্তির সন্ধান পাওয়া যায়। আমি তাই দেরি না করে সে পথেই চরণ ফেললাম।

পেছন থেকে কয়েকবার ডাক দিলাম আদ্রিশকে। কিন্তু তার কোনো সাড়াশব্দ মেলেনা। সে তো এক ধ্যানে ঐ দূর অন্তরীক্ষের মিটিমিটি তারার হাসি আর মেঘের আড়ালে শশাঙ্কের লুকোচুরি দেখাতেই ব্যস্ত। আমি এবার আদ্রিশের কাঁধে আমার ডান হাতটা আলতো করে রাখলাম। তবুও এতে বিন্দুমাত্রও হেলদোল হলোনা তার। সে পূর্বের ন্যায় রাতের অরূপ সৌন্দর্যে মগ্ন! বুঝলাম মানুষটা বেজায় চটে আছে, সকালের অমন আচরণে হয়তো মানুষটার অভিমানের দেয়াল প্রগাঢ় হয়েছে! আচ্ছা পুরুষ মানুষও কি অভিমান করে? সাত পাঁচ আর না ভেবে তাই তো পেছন থেকেই জড়িয়ে ধরলাম আদ্রিশকে।

বুকের মাঝে প্রেয়সীর শীতল হাতের ছোঁয়া অনুভব হতেই, সমস্ত রাগ অভিমানের পুরু আস্তরণ ঝরে যায়। মনের আকাশ ভেঙে নেমে আসে বৃষ্টির ফোয়ারা। আচমকা এক শীতল হাওয়া এসে হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়। পূর্বের ন্যায় পুনরায় সেই হৃদয় উপকূলে ঢেউ তোলে এক উত্তাল জোয়ার!

সমস্ত রাগ অভিমানকে দূরে সরিয়ে প্রেয়সীকে আগলে নেয় নিজের বক্ষপিঞ্জরের মাঝে। আমিও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম আদ্রিশকে।

কয়েক মুহুর্ত অতিবাহিত হতেই আমায় নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয় আদ্রিশ। আমি অসহায় ভাবে তার পানে চেয়ে এবার তার গলা জড়িয়ে ধরে বললাম

-‘ হুট করে ভাইয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় সেদিকেই তো এতো ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। আবার নতুন ভাবিকেও তো সবটা বুঝিয়ে পড়িয়ে দিয়ে আসতে হতো। আফটার অল আমি তার একমাত্র ননদিনী বলে কথা! আমারও তো একটা দায় দায়িত্ব আছে, তাইনা?

আমার হাত নিজের গলা থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে কাটকাট গলায় সে বলল

-‘ আর ভাইয়ের বিয়ে নিয়ে আজ সারাদিন এতোটাই মগ্ন ছিলে যে নিজের বরের দিকে একটাবার ফিরে তাকানোরও সময় হয়নি তোমার! তো যাও না যাও গিয়ে আরও দায়িত্ব পালন করে আসো। আমার কাছে এসেছো কি জন্য? নাকি সারাদিন পর রাতের বেলায় আমায় খুব প্রয়োজন পড়েছে তোমার?

তার এহেন বাক্যচয়নে আহত হলাম আমি। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম

-‘ স’রি আমার ভুল হয়েছে, আমায় ক্ষমা করে দাও। তুমি যে এসব নিয়ে বাচ্চাদের মতো এমন অভিমান করে বসে থাকবে তা আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি।

আদ্রিশ চোখ বুঁজে দাঁড়িয়ে রয়, এরপর চট করে কি মনে করে বলে দিল

-‘ ক্ষমা করতে পারি এক শর্তে!

-‘ কি শর্ত?

-‘ ফটাফট দুটো চু’মু খাও নয়তো কিছুতেই আমার এই রাগ মিটবে না!

আমি হতভম্ব বনে গেলাম। সত্যিই ধরে নিয়েছিলাম, বেচারা আমার উপর রেগে আছে কিন্তু এই ব্যাটা যে এতোক্ষণ যাবত ভং ধরেছিল তা কে জানত! আমি কিছু না বলে চলে আসতে নিলেই সে আমার হাত টেনে ধরে, শক্ত করে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলে

-‘ আমার পারমিশন ব্যতিত এখন কোথাও যাওয়া চলবেনা। বলেছিলাম না একবার ধরলে, আমি হতে ছাড়া পাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করলেও ছাড়ব না, মনে আছে তো? আর না থাকলেও সমস্যা নেই, গতরাতের স্পেশাল খাতির যত্ন তো ঠিকই মনে থাকার কথা!

শীতল অথচ ধারালো এই কথায় ভড়কে যাওয়ার বদলে আমি বাঁকা হেসে তার গলায় জড়িয়ে ধরলাম। আদুরে ভঙ্গিতে বললাম

-‘ আচ্ছা শোন, ওসব বাদ দাও তো! আমার সাতটা না পাঁচটা না একটা মাত্র গুণধর বর মশাইয়ের জন্য আমার পক্ষ থেকে একটা ছোট্ট সারপ্রাইজ দেওয়ার আছে! কি গ্রহণ করবে তো এই অধমের সারপ্রাইজ?

আদ্রিশ চেয়েছিল তার বউকে ওলোট পালোট বলে ভড়কে দিতে, মেয়েটাকে ছোট থেকেই তার উজবুক বানাতে সেই লাগে। কিন্তু আচমকা মেয়েটার এমন আচরণে যে নিজেই উজবুক বনে যাচ্ছে। তবুও নিজেকে ধাতস্থ করে নেয় সে। অনুভূতি লুকানোতে তো সে এক্সপার্ট, এর পূর্ব নজিরও রয়েছে। তাই সে মুখে কাঠিন্যে ভাব বজায় রেখে বলল

-‘ নো এক্সকিউজ, আগে চু’মু তারপর সারপ্রাইজ।

-‘ আরে তুমি বুঝতে পারছো না, এই সারপ্রাইজটা এর চাইতেও বড়। সেটা দেখলেই বুঝতে পারবে।

আদ্রিশ আর কথা বাড়ায় না। তার চোখেমুখে এখন অন্য ইঙ্গিত! সেসবে পাত্তা না দিয়ে, আমার কোমড় থেকে তার হাতের বাঁধন আলগা হতেই সরে এলাম আমি। ইশ এই লোকের পাল্লায় পড়ে আমিও কিসব ছাইপাঁশ, অসভ্যমার্কা কথাবার্তা বলতে আরম্ভ করে দিয়েছি। ছ্যাঁহ্, কি লজ্জা!

কক্ষে এসেই ড্রয়ার খুলে একটা বক্স বের করে নিলাম। আদ্রিশ দেখার পূর্বেই তা দ্রুত আড়াল করে নিলাম। তাকে বিছানায় বসতে বলে, চোখ বন্ধ করতে বললাম। প্রথমে তার আপত্তি থাকলেও শেষমেষ আমার কথায় সে একপ্রকার বাধ্য হয়। এই লোককে বিশ্বাস নেই, এ যা পল্ট্রি মোরগ, চিটিংবাজ, তা তে করে চিটিং করবেই তাই আমার গায়ে জড়িয়ে রাখা ওড়নাটা দিয়ে তার চোখ বেঁধে দিলাম।

-‘ কি এমন দেবে যার জন্য তুমি আমার চোখ বেঁধে দিয়েছো?

-‘ তোমার মতো লোককে বিশ্বাস নেই। তুমি যে একটা এক নম্বরের চিটিংবাজ, তা আমি ভালো করেই জানি।

-‘ কি বললি…

আদ্রিশের ওষ্ঠাধরে আঙুল ছুঁইয়ে চুপ করিয়ে দিলাম। এখন আপাতত আমি আমার কাজে মনোনিবেশ করি।
এর মাঝে আবারও আদ্রিশ বলে উঠল

-‘ কিরে, সুরসুরি লাগছে কেন?

-‘ তুমি কথা বললে কিন্তু আমার সারপ্রাইজ দেওয়ার মুডটাই নষ্ট হয়ে যাবে। তখন আমি আর তোমার সাথে কথা বলব না!

আমার কথায় দমে যায় আদ্রিশ। মনের কোণে শত প্রশ্ন ঘুরঘুর করলেও আর মুখ খোলেনা সে।

কাজ শেষ হতেই তাকে আয়নার সামনে নিয়ে গিয়ে চোখের বাঁধন খুলে দিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলাম

-‘ সারপ্রাইজ!

চোখ মেলে আয়নায় পড়া নিজের প্রতিবিম্ব নজরে আসতেই, আদ্রিশের চক্ষু চড়কগাছ! চিৎকার করে সে বলে উঠল

-‘ সর্বনাশ! এটা তুই কি করলি মেহু!

আদ্রিশের এমন রিয়াকশন দেখে আমি হাসিতে ফেটে পড়লাম। বেচারা খুব ভাব দেখিয়ে একবার বলেছিল, ‘আমার জন্য নাকি একটা লাল টুকটুকে বর এনে দিবে!’ অথচ সে নিজেই আমার বর হলো কিন্তু তার কথামতো লাল টুকটুকে বর আর পেলাম না। তাই তো নিজের দুঃখ মেটাতে আমার মেকআপ বক্সে থাকা লাল ব্লাসটা লেপে দিলাম আদ্রিশের পুরো মুখে , সাথে আদ্রিশের ঠোঁটে একদম কটকটা লাল লিপস্টিকও মেরে দিলাম। শুধু চোখ ঢাকা থাকায় আর লাল আইসেডোটা দেওয়া গেল না। তবে আমার তাতে আফসোস নেই, আমার লাল টুকটুকে বর দেখার স্বপ্নটা তো পূরণ হলো। এতেই চলবে!

আদ্রিশ আমার দিকে ফিরতেই আরও একদফা হাসলাম। তা দেখে সে কটমট করে তাকায় আমার দিকে। বেচারা আমার একদম লাল টুকটুকে জামাই! আমি এবার বিদ্রুপ করে বললাম

-‘ খুব তো ভাব নিয়ে বলেছিলে, আমার জন্য একেবারে লাল টুকটুকে জামাই নিয়ে আসবে তবে তুমি একথা ভুলে গেলেও আমি কিন্তু ঠিকই মনে রেখেছি। আর তাছাড়াও এখন তো আর জামাই পাল্টাতে পারবোনা, তাই যেটা আছে সেটাকেই একটু ঘসামাজা করে লাল বানিয়ে দিলাম!

এতোটুকু বলে পুনরায় হেসে উঠলাম আমি। আদ্রিশ আমার হাসি দেখে কটমট করে বলল

-‘ খুব হাসি পাচ্ছে তাইনা? ওয়েট এই তোরও তো আমাকে একটা লাল টুকটুকে বউ এনে দেওয়ার কথা ছিল, রাইট?

আমার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বাঁকা হেসে উক্ত কথাটা বলল আদ্রিশ। এবার ভড়কে যাই আমি। এই লোক এবার আমায় রঙ মাখিয়ে সঙ সাজিয়ে দেবে না তো? এখনই একটা ব্যবস্থা করতে হবে, তাই হাতে একটা বালিশ তুলে নিলাম। আদ্রিশও কম নয়, সেও বালিশ তুলে নেয়। তারপর দুটো মিলে বালিশ নিয়ে মারামারি বাঁধিয়ে দিলাম। আমাদের দেখলে কে বলবে যে আমরা হাসবেন্ড-ওয়াইফ! এই কাজিন-কাজিন বিয়ে করলে বোধহয় এমনই টম&জেরির মতো ঝগড়া মারামারি লেগেই থাকে! হায়রে কপাল আমার!

অনেকক্ষণ যাবত বালিশ নিয়ে মারামারির পর, ক্লান্ত হয়ে ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়লাম আমি। আদ্রিশও সুযোগ বুঝে সুরসুরি দিতে আরম্ভ করে আমায়। আর এদিকে হাসতে হাসতে আমার অবস্থা যায়যায়।

-‘ খুব তো আমায় সুরসুরি দিয়েছিলি, এখন দেখ কেমন লাগে?

-‘ এবার থামো, হাসতে হাসতে আমার পেট ধরে আসছে।

আদ্রিশ থামেনা, আরও কিছুক্ষণ সুরসুরি দিয়ে থামে সে। কেন মরতে যে ব্যাটারে উজবুক বানায়তে গেলাম, এমন তো নিজেরই মরিমরি অবস্থা হচ্ছে!

এরপর আমার উপর ভর দিয়ে আদ্রিশ ভ্রু নাচিয়ে, দুষ্ট হেসে বলল

-‘ তোর মতো আমারও লাল টুকটুকে বউ দেখার অনেক শখ! তুই তো আমায় কিসব ছাইপাঁশ মাখিয়ে লাল বানিয়ে দিয়েছিস, তবে তোর আর ওসব কৃত্রিম রঙের কোনো প্রয়োজন নেই। একটু পর তুই এমনিতেও লাল টুকটুকে হয়ে যাবি। জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ!🧛

(চলবে)

কি ব্যাপার!? দুম করে আপনাদের রেসপন্স এতো কমে গেল কেন?🤨 ঠিক আছেন তো আপনারা নাকি ঝড়ে সবাই রে উড়ায় নিয়ে গেল😵
চকচকা তেলতেলে টাকলা মাথায় যেমন হারিকেন জ্বালিয়ে খুঁজলেও চুলের সন্ধান পাওয়া মুশকিল ঠিক তেমনি আমার গল্পেও আপনাদের রেসপন্সের ঐ এক দশা!😵‍💫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here