শুনলাম_বসন্ত_নাকি_আবার_এসেছে #লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান #পর্বঃ১৮

0
867

#শুনলাম_বসন্ত_নাকি_আবার_এসেছে
#লেখিকা_সিনথিয়া_জাহান
#পর্বঃ১৮

ঠিক ৫ টার দিকে আয়েশা ৩২৫ নম্বর ফ্লাটের সামনে গিয়ে দাঁড়াল ৷ আজকেও বীর এসে দরজা খুলে দিল ৷ পূর্বের ন্যায় বীর বই খাতা নিয়ে টেবিলের সামনে গিয়ে বসে পড়ল ৷ আয়েশা বীরের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ হেসে উঠল ৷ এতে করে বীর খানিকটা হকচকিয়ে গেল ৷ আয়েশা ভ্রু নাচিয়ে বলল,,,

কাল তুমি দু*ষ্টুমি করেছো আর আজ আমি দু*ষ্টুমি করব ৷ দেখি দুষ্টু*মিতে কে বেশি পারদর্শী ৷

বীর বোকা বোকা চোখে আয়েশার দিকে তাকিয়ে থাকল ৷ আয়েশা নিজের ব্যাকপ্যাক থেকে কয়েকটা চিপসের প্যাকেট বের করল ৷ তা দেখতেই বীর সেগুলো নেওয়ার জন্য ঝাপিয়ে পড়ল কিন্তু আয়েশা সেটা নিজের পিছনে লুকিয়ে ফেলে বলল,,,

উহু এভাবে তো পাওয়া যাবে না বাছা ৷ আমাকে একটা করে লেসন কমপ্লিট করে দিবে আর একটা করে চিপস নিবে ৷

বীর ঠোঁট উল্টে বলল,,, সুন্দরী তুমি এমন করতে পারো না ৷

আমি পারি বাছা ৷ আমার বাড়িতে একটা ভাই আছে ওর সাথে থাকতে থাকতে আমিও টুকটাক বা*টপারি শিখে গেছি ৷ নাও এবার শুরু করো দেখি বাছা ৷

বীর প্রথমবারের মতো খুবই ডেডিকেশনের সাথে পড়তে লাগল আর বারবার আড়চোখে চিপসের প্যাকেটের দিকে তাকাতে লাগল ৷ তা দেখে আয়েশা বিজয়ীর হাসি হাসল ৷ ও কাল বর্ষার থেকে বীরের সবচেয়ে পছন্দের খাবার কি তা জেনে নিয়েছিল ৷ এই ব্রান্ডের চিপস বলতে বীর পাগল আর সেটারই ফায়দা তুলল আয়েশা ৷

বর্ষা ড্রয়িংরুমে এসে ছেলেকে পড়তে দেখে অবাক হয়ে বলল,,, এ কেমন দৃশ্য দেখছি আমি? এটা কি আদৌই সত্য? বীর পড়াশোনা করছে!

মাম্মা চুপ করো ৷ ডিস্টার্ব করবে না একদম ৷

বর্ষা চুপ করল ৷ বীর কিছু ম্যাথ সলভ করতেছে ৷ বর্ষা আয়েশার জন্য কিছু স্নেকস নিয়ে এসেছিল ৷ স্নেকসগুলো টেবিলে রেখে বর্ষা আয়েশার পাশের চেয়ারে বসে বলতে লাগল,,,

বীর সবথেকে বেশি ভয় বারিশকেই করে ৷ তবুও বারিশ ওকে এতোটা মনোযোগের সহিত পড়াতে কখনো সক্ষম হয়নি ৷ বীর সেটা হতেই দেয়নি ৷ এই অসাধ্য সাধন তুমি কিভাবে করলে আয়েশা?

ছোট খাটো ট্রিক অবলম্বন করেছি আরকি ৷

বর্ষা সামান্য হাসল ৷ বীর হঠাৎ মাথা তুলে বলল,,, মাম্মা নানীমনি তোমাকে ডেকেছিল তখন ৷

বর্ষা বসা থেকে উঠে বলল,,, যাচ্ছি ৷

বর্ষা যেতে ধরলেই আয়েশা ভ্রু কুঁচকে বলল,,, আপনারা এই ফ্লাটেই থাকেন না?

থাকি কিন্তু পাশের ফ্লাট মানে ৩২৬ নম্বর ফ্লাটে বারিশ আর আম্মু থাকে , এই ফ্লাটে আমি আর আমার স্বামী থাকি ৷

বীর কপট রা*গ দেখিয়ে বলল,,, তুমি আর বাবা মানে? আমি কোথায় গেলাম?

ওর কথা শুনে আয়েশা আর বর্ষা হেসে উঠল ৷ বর্ষার হয়ে আয়েশা বলে উঠল,,, তুমি এখন এই আয়েশা হাসানের সামনে বসে আছো ঠিক আছে?

বর্ষা ইতোমধ্যে চলে গেছে ৷ তাই বীর বলে উঠল,,, হ্যাঁ সুন্দরী ৷

আয়েশা চোখ সরু করে ওর দিকে তাকাতেই বীর পুনরায় ম্যাথ করতে লাগল ৷ বর্ষা যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই বারিশ চলে আসল ৷ আয়েশা একপলক তাকিয়ে দেখল আজ ও ভদ্র বেশে এসেছে ৷ টি শার্ট আর ট্রাউজার পড়ে চুলগুলো ভালোভাবে সেট করেই এসেছে ৷ ওকে দেখতেই আয়েশার গতকালের কথা মনে পড়ে গেল ৷ ফলশ্রুতিতে প্রচন্ড হাসি পেল কিন্তু জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে আয়েশা সেটা আটকে নিল ৷

বারিশ সোফায় বসে একটা ম্যাগাজিন পড়তে লাগল ৷ আয়েশা আর তাকায়নি বারিশের দিকে ৷ ওর একদম পছন্দ না এই গোমড়ামুখো স্যারকে ৷ কথা অনুযায়ী বীরকে আপাতত তিনটা চিপস দেওয়া কমপ্লিট হয়ে গেছে ৷ আজ শুধু আর একটা চিপস পাওয়া বাকি আছে বীরের ৷

বারিশ ম্যাগাজিন টা পাশে রেখে বীরের পাশের চেয়ারে গিয়ে বসে ওর পড়াশোনার অবস্থা দেখতে লাগল ৷ এতে করে আয়েশার প্রচন্ড অ*স্বস্থি আর সাথে লজ্জা লাগতে লাগল কারন নিজের পড়াশোনাই যে কমপ্লিট করতে পারে না , সে এসেছে অন্যকে পড়াতে ছ্যাহ ছ্যাহ!

ক্ষণকাল বাদে বারিশ আয়েশার দিকে তাকিয়ে বলল,,, আই থিংক এতোটা ডেডিকেশন যদি নিজের পড়ায় দিতে তাহলে ক্লাসের শেষের সারির স্টুডেন্ট হতে না তুমি!

নিজের নতুন ছাত্রের সামনে নিজের এমন অ*পমান শুনে লজ্জা লাগল আয়েশার ৷ মাথা নিচু করে মুখ ভেংচি কেটে বিরবির করে বলতে লাগল,,,

কে চায় পড়তে? আমি তো ভাই বিয়ে করে স্বামীর সেবা করার পক্ষপাতী ৷

বারিশ ভ্রু কুঁচকে বলল,, হু? কি বললে?

আয়েশা জোরপূর্বক ৩২ পাটি দাঁত বের করে বলল,,, নাথিং স্যার ৷ আমার এতো প্রশংসা করার জন্য ধন্যবাদ ৷ শেষের দিক থেকে গণনা করলে কিন্তু আমি টপে আছি ৷ এটাও যার তার কর্ম নয় বুঝেছেন? আমি তো এটা ভেবেই চরম আনন্দিত ৷

বারিশ আহাম্মক হয়ে গেল ৷ যার লজ্জা নেই তাকে লজ্জা দেওয়া অসম্ভব ব্যাপার বটে! বীরের পড়া কমপ্লিট হতেই আয়েশা ওর হাতে আরেকটা চিপসের প্যাকেট দিয়ে বলল,,,

নাও তোমার শেষ পারিশ্রমিক ৷

বলে ও ব্যাকপ্যাক কাঁধে চাপিয়ে সদর দরজার দিকে যেতে যেতে বলল,,, ফি আমানিল্লাহ বাছা , ফি আমানিল্লাহ স্যার ৷

বীর দাঁত কেলিয়ে হাত নাড়তে নাড়তে বলল,,, ফি আমানিল্লাহ সুন্দরী ৷

আয়েশা চোখ পাকিয়ে বীরের দিকে তাকিয়ে ইশারায় ওকে হু*মকি দিয়ে চলে গেল ৷ আয়েশা চলে যেতেই বারিশ কাটকাট গলায় বীরকে বলল,,,

মামু তোমার কিছু সীমা নির্ধারণ করে দিতে হবে ৷ আমি যা বলছি সেসব বিনা বাক্যে মেনে চলবে নয়তো মে*রে পা*ছা লাল করে দিব তোমার!

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

আয়েশার ব্যস্ত সময় চলছে ৷ প্রথম এক মাস ও বীরকে প্রতিদিন ই পড়াবে ৷ তারপর সপ্তাহে তিনদিন করে ৷ এখন পর্যন্ত ১৫ দিন কেটে গেছে তাতেই আয়েশার অবস্থা নাস্তানাবুদ ৷ সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগার বিষয় হচ্ছে বারিশের দেখা পাওয়া ৷ এটা বাদ দিলে বাকিগুলো ভালোই লাগে আয়েশার ৷

প্রথম ক্লাস শেষে তুবা আর আয়েশা ভার্সিটিতে বসে আছে ৷ তুবা সেই তখন থেকে একদৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছু কল্পনা জল্পনা করছে ৷ ওর অবস্থা দেখে আয়েশা বিরক্তিতে ‘চ’ কারান্ত উচ্চারণ করে বলল,,

তুই কি জিরাফের মতো গলা উচু করতে চাচ্ছিস? এভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছিস কেন?

তুবা আকাশ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আয়েশার দিকে অপলকভাবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল ৷ তা দেখে আয়েশা চোখমুখ কুঁচকে বলল,,,

ছিহ এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? এই কোনোভাবে তুই আমার প্রেমে পড়িস নি তো? তাহলে আগেই বলে রাখছি আমার মনের মধ্যে থাকা তোর দুলাভাই সতীন পছন্দ করে না ৷

তুবা ওর কথায় কর্ণপাত না করে হঠাৎ বলে উঠল,,, আচ্ছা আমি যদি একটা আধপা*গলকে বিয়ে করতে চাই তাহলে তোরা সবাই কি অনুমতি দিবি আমাকে?

আয়েশা হতভম্ভ হয়ে বলল,,, কি!

তুবা দু হাত নাড়িয়ে ব্যস্ত হয়ে বলতে লাগল,,,, আরে আপু উ*ত্তেজিত হোস না ৷ পুরো পা*গল না আবার জাস্ট অল্প একটু ৷ মাথার দু একটা তাঁর হয়তো উলটপালট হয়েছে এর চেয়ে বেশি কিছু না ৷ তবে অভারঅল ছেলে মাশাআল্লাহ অনেক ভালো ৷ কি রে দিবি অনুমতি?

প্রাংক করছিস?

প্রাংক কেন করব? আজব আমি সিরিয়াস কথা বলতে গেলেই সবাই সেটা প্রাংক আর কোনো প্রাংক করতে গেলে সবাই সেটা সিরিয়াস ভাবে নেয় কেন? ফাডা কপাল রে আমার!

আয়েশা তুবাকে ঝাকিয়ে চোখ বড় বড় করে বলল,,, তার মানে তুই সিরিয়াস?

তুবা কপাল কুঁচকে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,,, না প্রাংক ৷

প্রাংক? সত্যি প্রাংক?

তুবা বিরক্তিতে ‘চ’ কারান্ত উচ্চারণ করে বলল,,, না রে ভাই সত্যি বলছি সত্যি ৷

আয়েশা খেকিয়ে উঠে বলল,,,শালা কি প্রাংক সত্য প্রাংক সত্য শুরু করেছিস বল তো?

তুবা কপাল চাপড়ে বলল,,,, আমার ফিলিংস কেউ বোঝে না ছ্যাহ! পরকালে গিয়ে হিসাব নিতেই হবে ৷ আমার ওই সাইক্রিয়াটিস্টকে মনে ধরেছে এটা কিভাবে বললে বুঝবি তুই?

আয়েশা তড়াক করে বসা থেকে উঠে বুকে হাত দিয়ে বলল,,,, ওও মাই আল্লাহ! দিস ইজ ক্রেজি! আসলেই ক্রেজি কারন ক্রেজির সাথে ক্রেজির ডাক্তারের বিয়ে দেখতে যাচ্ছি আমি ৷ এমন ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হতে যাচ্ছি আমি আহা আহা আহা!

আয়েশা বেশ খানিকটা গলা উচিয়েই কথাগুলো বলল ৷ ফলে ক্যাম্পাসের অন্যান্য স্টুডেন্টরা ওদের দিকে অবাক হয়ে তাকাল ৷ তা দেখে তুবা চট জলদি আয়েশাকে টেনে নিচে বসিয়ে বলল,,,

আপু কি করছিস? সবাই দেখছে ৷

আমার কথা রাখ মেয়ে ৷ তুই কি করেছিস সেটা আগে বল ৷

আমি আবার কি করব? যা করার তোরা করবি ৷ বিয়ে দিয়ে দে আমাকে ওই সাইক্রিয়াটিস্টের সাথে নয়তো দেখা যাবে কোথা থেকে কোন চশমাওয়ালীকে ধরে এনে বিয়ে করে ফেলেছে!

আয়েশা স্বাধীনের সব অদ্ভুত বিষয়গুলো আগেই শুনেছে তুবার থেকে ৷ তাই ও জোরে জোরে হাসতে লাগল ৷ হাসি থামিয়ে বলল,,,,

আচ্ছা আচ্ছা দ্রুত রাইশা খালামনি আর তানজিদ মামুর সাথে কথা বলতে হবে ৷

সাভাশ হঠাৎ ওদের দুজনের মাঝখানে মুখ নিয়ে এসে বলল,,,, আমি কিন্তু বিয়েতে সাক্ষী হবো আগেই বলে দিলাম ৷

আচমকা সাভাশের আগমনে আয়েশা আর তুবা ভয়ে চিৎকার করে উঠল ৷ সাভাশ ঘাসের উপর হাঁটুমুড়ে বসে স্বাভাবিক মুখভঙ্গিতে ওদের দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে যেন ও কিছু করেই নি ৷ আয়েশা আর তুবা বুকে থুথু দিয়ে নিজেদের ভয় কাটাল ৷ আয়েশা সাভাশের গালে চিমটি দিয়ে বলল,,,

এইই তুই কি ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে লুকিয়ে আমাদের কথা শুনছিলি? সবসময় দেখি আমাদের আড্ডার মধ্যে তুই উড়ে এসে জুড়ে বসিস ৷ পাশের বাড়ির কূটনী মহিলার মতো আমাদের সব কথা কান পেতে শোনা তোর অভ্যাস হয়ে গেছে ৷ তোর কি আর কাজ কারবার নেই? তুষারের মতো হতে পারিস না? বাই দা ওয়ে তুষার কোথায়?

সাভাশ গালে হাত বোলাতে বোলাতে বলল,,, দেখ গিয়ে লাইব্রেরির কোনো এক কোণায় বইয়ের সাথে প্রেমলিলা করছে ৷ নবদম্পতিও মনে হয় একে অপরের সাথে এতোটা চিপকে থাকে না যতটা তুষার বইয়ের সাথে চিপকে থাকে ৷ আমার কথা মিলিয়ে নিস ওর বউয়ের সবচেয়ে বড় শ*ক্রু আই মিন সতীন হবে এই বইগুলো!

চলবে,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here