প্রেম_অপ্রেম_অধ্যায় |১২| #আফরিন_আলম_মৌনি.

0
525

#প্রেম_অপ্রেম_অধ্যায় |১২|
#আফরিন_আলম_মৌনি.

_
বৃষ্টির প্রতাপ এখন একেবারেই কমে এসেছে৷ মেঘের আড়াল থেকে সূর্য উঁকি দিতে শুরু করেছে। রাস্তায় যান চলাচল বেড়েছে। সেই সাথে বেড়েছে কল্পর চালানো বাইকের গতি। ক্রমে ক্রমে বাইকের গতি বাড়াতে বাড়াতে তার বাইকের গতি এখন তুঙ্গে। এদিকে পিছনে বসা মৌনির নাজেহাল অবস্থা৷ এমনিতেই তার বাইকে বসার অভ্যাস নেই, তার উপর এমন ঊর্ধ্বগতিতে বাইক চালানো হচ্ছে যে মনে হচ্ছে এখনি বুঝি পিছনে থেকে উল্টে পড়ে যাবে সে। সেই ভয়েই তো না চাইতেও কল্পকে দুহাতে জাপটে ধরে বসে আছে। চোখমুখ খিচে বন্ধ করে রেখেছে। উঁচু গলায় কল্পকে বারবার বাইকের গতি থামাতে বলছে৷ তবে সে কথা কল্পর কানে পৌছাচ্ছে কিনা আল্লাহ মালুম। তার বাইকের গতি থামানোর কোনো নামই নেই। মৌনি তো মনে মনে শপথ করেই নিল যে এই বেয়াদবটার বাইকে এ জনমে আর উঠবে না। কি কথা বলার জন্য মৌনিকে নিজের বাইকে তুলেছিল সেটা তো জানা হলোই না উলটে পিছনে বসে মৌনি হাওয়াই মিঠাই হয়ে যাচ্ছে। কল্প নামক কাঠিটা না থাকলে এতোক্ষণে হয়তো হাওয়াই উড়েই যেত। সেজন্যই মনে মনে তার কঠিন এই প্রতিজ্ঞা।

_________

ক্যাম্পাসের দক্ষিণ পাশে দিঘির পাড়ে বসে আছে মৌনি৷ শুধু শুধু বসে নেই, ইম্পোর্টেন্ট একটা নোট নিজের খাতায় তুলছে। এই নোটটা সে তাদের ডিপার্টমেন্টের একটা মেয়ের থেকে নিয়েছে। তাকে আবার ভার্সিটি ছুটি হওয়ার আগে ফেরত দিতে হবে৷ সেজন্য তাড়াহুড়ো করে নোট তুলছে সে। তাড়াহুড়ো করে নোটটা তোলার চেষ্টা করলেও ঠিকঠাক তুলতে পারছেনা। নোট তুলবে কীভাবে। মন যে অন্যজায়গায় পড়ে। ক্ষণে ক্ষণে তার কল্পর কথা মনে পড়ছে আর রাগে ফুলে ফেপে উঠছে। বেয়াদবটার কথা মাথা থেকে যাচ্ছে-ই না। মনে হচ্ছে কল্পর মাথার সবকয়টা চুল এক এক করে ছিড়ে টাকলু বানিয়ে দিতে পারলে বোধহয় শান্তি মিলত। বেয়াদব একটা! তাকে মিথ্যে বলে ভার্সিটির গেইট অব্দি নিয়ে এসেছে। তাদের ওই ছবি কে তুলেছে সেটা জিজ্ঞেস করারও সুজোগ পায়নি মৌনি। তার আগে বাইক টেনে চলে গিয়েছে৷ সেসব কথা মনে করেই নাকের পাটাতন ফুলে উঠছে মৌনির।

না! এভাবে লিখলে আজ আর লেখা শেষ হবে না৷ এই ভেবে মৌনি লম্বা সমীরণ ত্যাগ করল। লেখায় পুরোদমে মনোজোগ দেওয়ার চেষ্টা করল।

দেড় ঘন্টার মাথাতেই তার সকল লেখা কম্পিলিট হলো। একটানে একভাবে লেখার ফলে ঘাড়ে যন্ত্রণা হচ্ছে। কোমড়েও ব্যথা শুরু হয়েছে। মৌনি আড়ামোড়া ভেঙে সোজা হয়ে বসল। তখনই তার বিলুর কথা খেয়ালে এলো। সে মেয়ের এখনো কোনো পাত্তা নেই। ভার্সিটি প্রায় শেষ হতে চলল আজ আর আসবে কিনা আল্লাহ মালুম। মেয়েটা সত্যি সত্যি ভীষণ ফাকিবাজি৷ মৌনি কখনো তাকে ক্লাস করতে দেখেনি। ভার্সিটিতে আসেও তার কোনো সময়সূচি নেই। তারউপর বেশিরভাগ দিনই সে অ্যাবসেন্ট থাকে। আজও আসেনি সে। এখনো অব্দি তো মৌনি দেখেনি তাকে৷ এখন এসেছে কিনা কে জানে!

মৌনি এদিকওদিক তাকালো যদি বিলুকে পাওয়া যায়। সে বিলুকে চোখের সীমানায় দেখতে পেল না। তবে তার নজর আটকালো ক্যান্টিনের সামনে যথাক্রমে ছাপা শার্ট আর টিশার্ট দাঁড়িয়ে থাকা ছেলে দুটির পানে। এই ছেলেটিকেকে আগের দিন সে নিষাদের সাথে দেখেছিল। বেয়াদব দুইটা। কি বাজে ভাবেই না অপমান করেছিল তাকে৷ সেদিনের ক্যান্টিনের ওই ঘটনা ঘটার পর এদেরকে আর ভার্সিটি চত্ত্বরে দেখেনি। বোধহয় আর আসেই-নি এরা৷ অন্যদিকে এরা আসেনি বলে মৌনির ভালোই হয়েছে৷ মৌনি চায় না এদের সাথে আর কখনোই দেখা হোক তার। সে সর্বদাই তাদের এড়িয়ে চলতে চায়। আজ আবার ওরা এসেছে কিনা কে জানে। আসলেই বা তার কি। শুধু তাকে বিরক্ত না করলেই হলো। মৌনির নিষাদের কথা মনে পড়তেই মনে পড়লো নিষাদ ডাক্তার থেকে স্টুডেন্ট কীভাবে হলো এটা জিজ্ঞেস করতে হবে বিলুকে। কিন্তু সে বিলুই বা কোথায়?

__

ভার্সিটির মাঠ দিয়ে হাটতে হাটতে সহসাই মৌনি থমকে দাঁড়ালো। একটা জায়গায় একঝাক ছেলেমেয়ের ভীড় দেখেই থমকালো৷
তাদের মধ্যে বিলুকেও দেখতে পেল। মৌনির চোখজোড়া চকচক করে উঠলো। সে দ্রুত পায়ে সেদিকে এগিয়ে গেল। পিছন থেকে গিয়ে বিলুর হাত টেনে ধরল। উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল,
“ এই বিলু! কেমন আছো? ”

বিলু মৌনিকে দেখতেই ওর হাত চেপে ধরল। মৌনির চেয়ে বিলুর কন্ঠে তুমুল উচ্ছ্বাস প্রকাশ পেল-
“ ওহ! মৌনি তুমি, আ’ম অলওয়েজ গুড। তোমার খবর বলো!

“ আমিও আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি৷ আজ আসতে এতো দেরি করলে কেন? আমি ভাবলাম আজ আর তুমি আসবেই না। ”

বিলু প্রতিউত্তর করলো না। মুখ থেকে হাসিটাও মিলিয়ে গেল। ঠোঁট চেপে ক্ষণিক মৌনির দিকে চেয়ে থেকে শুধালো,
“ গায়ে এসব কিসের দাগ হয়েছে তোমার? ”

অজান্তেই মৌনির মুখে হাত চলে গেল। হাতের দিকে তাকালো। গায়ে মারের দাগগুলো এখনো রয়ে গেছে।

“ কিছু না বিলু। ”

“ কিছু না মানে কি? দেখি.. এগুলো তো মারের দাগ মনে হচ্ছে মৌনি। কেউ মেরেছে তোমায়? ”

“ না মানে…

“ আমি কিন্তু মিথ্যে পছন্দ করিনা মৌনি। তাই যা বলবে সত্যিটাই বলবে। ”
বিলুর কন্ঠস্বর উঁচু। এখানে অনেক মানুষ রয়েছে। এরা শুনলে মান সম্মানের আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। মৌনি নিচু কন্ঠে বলল,
“ এখন এখানে অনেক মানুষ রয়েছে বিলু, পরে বলব। আচ্ছা তুমি এখন বলো এখানে কি হচ্ছে। ”

বিলু থামল। পরপরই তার কন্ঠে ফের উচ্ছ্বাসটুকু ঢেলে বলল,
“ এসো মৌনি আজ তোমাকে তাকে দেখাই। ”

বলেই বিলু মৌনির হাত টেনে সকলের মধ্যে দিয়ে সামনে এগুতে থাকল। মৌনি যেতেই যেতেই একবার শুধালো,
“ কাকে? ”

বিলু তাকে একেবারে কাঙ্ক্ষিত মানুষটির সামনেই দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলল,
“ এনাকে—another heartthrob of our university, বিশেষ করে মেয়েদের হার্টবিটও বলতে পারো। মোস্ট জিনিয়াস, মোস্ট হ্যান্ডসাম, মোস্ট ট্যালেন্টেড-কল্প চৌধুরী। ”

সামনে কল্পকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আজকে ৪৪০ ভোল্টেজের শকডটা খেল মৌনি। বাইকের সাথে ঠেস দিয়ে সটান দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং কল্প। দৃষ্টি তার দিকেই। মৌনি তাকে দেখে যতোটা অবাক হয়েছে তার মধ্যে বিস্ময়ের ছিটে ফোটাও নেই৷ শুধু মৌনির বিস্মিত মুখটার দিকে ছোট ছোট চোখে চেয়ে আছে।

_______

মৌনি হতচকিত, হততম্ভ। বিস্মিত নয়নজোড়া ঘুরছে কল্পর পানে। অথচ কল্প দারুণ নির্বিকার। সে বেশ আরাম করেই বাইকে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পা দুটো আড়াআড়ি ভাবে ক্রস করে রাখা। হাতে একটা ফান্টার ক্যান। সেটা থেকে ক্ষণে ক্ষণে চুমুক দিচ্ছে। নির্লিপ্ত চোখ জোড়া মৌনিতে নিবিদ্ধ। তাদের আশেপাশে এখন আপাতত কেউ নেই। কল্প হাতের ইশারা করতেই সবাই চলে গিয়েছে। বিলুকেও এক অজুহাত দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে। শুধু মৌনিকে কৌশলে নিজের সামনে দাঁড় করিয়ে রেখেছে৷ আর এখন সে মৌনির বিস্মিত বদনখানা উপভোগ করছে৷ ক্ষণিক মূহুর্ত অতিবাহিত হতেই সে ভ্রু উচায়। নির্লিপ্ত কন্ঠে শুধায়,
“ কি ব্যাপার ম্যাডাম, এমনভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? লজ্জা পাচ্ছি তো? ”

মুখে লজ্জা পাচ্ছি বললেও তার মুখে লজ্জার কোনো আভাস নেই। অথচ তার কথায় মৌনি বেশ লজ্জা পেল। এতোক্ষণ ড্যাবড্যাব করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকার জন্য। বিস্ময়ের ঠেলায় এতোক্ষণ ভুলে বসেছিল যে ও ছেলেটার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছে। মৌনির বিস্ময় কল্পর জানা। তবুও এমনভাবে প্রশ্ন করলো যেন সে কিছুই জানেনা। ইতস্তত মৌনিকে নিবিড় চোখে দেখে ফের প্রশ্ন ছুড়লো কল্প,

“ ওভাবে তাকিয়ে ছিলেন কেন? ”

“ আপনি এখানে এই ভার্সিটিতে…

“ সো হোয়াট? ”

“ আপনি এখানকার স্টুডেন্ট আগে বলেন নি কেন? ”

“ এটা কি বলার মতো কোনো কথা? ”

মৌনি মনে মনে ভাবল সত্যিই তো। এটা সে আমাকে কেন বলতে যাবে। আর সে পড়তেই পারে এখানে। ভার্সিটি তো তার বাপের না। কল্প কেন কল্পর চৌদ্দ গুষ্টি পড়তে পারে। তাতে আমার কি? ধুর! এমনি এমনিই এতো অবাক হচ্ছিলাম। মৌনি প্রাথমিক বিস্ময় কাটিয়ে এবার বেশ গমগমে সুরেই বলল,
“ তখন আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ওভাবে চলে গিয়েছিলেন কেন বেয়াদবের মতো? ”

“ বেয়াদবের মতো চলে যায় নি ম্যাডাম। কাজ ছিল আমার। ”

“ কি কাজ? ”

“ আপনাকে বলব কেন?

“ আমি আপনার কাজের কথা শুনতেও ইন্টারেস্টেড নয়। ”

“ এখনই তো জিজ্ঞেস করলেন? ”

“ ওটা কথার কথা ছিল। এখন আমি যা প্রশ্ন করবো তার ঠিকঠিক উত্তর দেবেন। নয়তো.. নয়তো…

“ হুম। নয়তো কি? ”

” নয়তো আপনার এই সুন্দর চুলগুলো ছিড়ে হাতে ধরিয়ে দেব। কেঁদে কুল পাবেন না তখন..

” উফ! খুব ভয় পেয়েছি ম্যাডাম। আমি ভাই আমার এই সুন্দর চুলগুলোকে হাতে চাই না। মাথার জিনিস মাথায়-ই থাক আপনি বরং আমায় প্রশ্ন করুন। আমি ঠিকঠাক উত্তর দিই। ”

কল্পর কন্ঠে স্পষ্ট হেয়ালি টের পেলেও এ নিয়ে বেশি কিছু বলল না মৌনি। সে নিজের প্রশ্ন করলো-

“ এখন বলুন, আমাদের ওই ছবিগুলো কে তুলেছিল, আর গাড়িতে কে ছিল? ”

“ ছবিটা তুলেছে রুবি, আপনার স্টেপ ব্রাদারের মেয়ে। মেবি সে কোনো আপনাকে পছন্দ করেনা, আর আপনার নাম খারাপ করতে চাইছিল। ”

“ রুবি! আপনাকে এটা কে বলল? ”

“ সেদিন রাতে কথায় কথায় আপনার ভাবিই বলেছিল যে ছবিটা রুবি পাঠিয়েছিল তার হোয়্যাটসআপে….

“ কিন্তু আপনি যে বললেন ভীষণ খারাপ কোনো লোক এটা করেছে। গাড়িতেও তারা আমার পিছু নিয়েছে। আপনি তবে মিথ্যে বলেছেন? ”

“ উমম..কিছুটা…

“ আপনি আমাকে মিথ্যে বলে এখানে নিয়ে এসেছেন! আমি বললাম আপনার বাইকে উঠবো না, তার জন্য এভাবে মিথ্যে বললেন, বেয়াদব লোক কোথাকার? ”

“ আরে কিসের বেয়াদব! আমি আপনাকে হেল্প-ই করেছি। নয়তো আপনি বলুন তো ওভাবে আসতে পারতেন ভার্সিটি অব্দি? তাছাড়া গাড়ির ব্যাপারটা কিন্তু সত্য। আপনাকে কেউ..

“ চুপ করুন তো আপনি। আর মিথ্যে বলতে হবে না আপনাকে। আর আপনাকে কে বলেছিল আমাকে সাহায্য করতে। আপনার সাহায্য চেয়েছিলাম আমি? অসভ্য কোথাকার..

“ কি অদ্ভুত! সাহায্য করে অসভ্য হয়ে গেলাম। হে আমার খোদা, এ আমি কোন জমানায় বাস করছি..

“ এখন এসব নাটকীয় কথা-বার্তা বাদ দিন। আপনি আমার মিথ্যে বলেছেন কেন? আমি এতোক্ষণ কতো চিন্তায় ছিলাম ধারণা আছে আপনার। এমনিতেই সবসময় প্রাণ হাতে করে নিয়ে ঘুরি। আপনার এই মিথ্যের জন্য আমার..আমার..

বাকি কথাটুকু আর শেষ করতে পারল না। তার আগেই রেগেমেগে চলে গেল। কল্পর মুখের নির্বিকার ভাবটা আর নির্বিকার থাকল না। ক্ষণিকেই চূড়ান্ত গাম্ভীর্য এসে ভর করল মুখমন্ডল জুড়ে। মেয়েটা কি বলে গেল এক্ষুণি? প্রাণ হাতে নিয়ে ঘুরি বলতে কি বোঝাতে চাইল ও? কি বোঝাতে চাইল? কল্প কি কোনো কিছু মিস করে যাচ্ছে?

— চলবে.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here