প্রেমের ঘাটের মাঝি #অন্তিম পর্ব(শেষাংশ) #লেখনিতে খুশবু আকতার

0
215

#প্রেমের ঘাটের মাঝি
#অন্তিম পর্ব(শেষাংশ)
#লেখনিতে খুশবু আকতার

১০ বছর পর……

“তুমি যাবে বাড়ির ভেতরে?”

সুজনের প্রস্তাবে রুমি নাকচ করে বলল,

“না আমি যাব না।যাই বলো না কেন এখনো ওই জামশেদের মুখ আমার দেখতে মন চায় না।আজ বিপদে পড়েছে জন্য ভালো হয়েছে।”

রুমে যেতে আপত্তি করলে সুজনের ছেলে সৃজন মোটেও আপত্তি করল না।সে নিজের ফুপির সাথে দেখা করতে ভীষণ আগ্রহী।উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,

“বাবা আম্মু না গেলেও আমি যাব।আমায় নিয়ে চলো।”

সুজন ছেলের হাতটা ধরে বলল,

“ঠিক আছে আব্বু চলো।কিন্তু তুমি কি করবে রুমি?”

“জুঁই কল করেছিল।ওরা প্রায় এসে গেছে।আমি নদীর ঘাটে যাই।ও এলে তারপর না হয় ওর সাথে যাব। না গিয়ে তো আর কোন উপায় থাকবে না তখন।”

সুজন মাথা নাড়িয়ে সায় জানিয়ে ছেলের হাত ধরে বাড়ির ভিতরে গেল।কত বদলে গেছে বাড়িটা।জলিল তালুকদারের ঘর,জুঁই আর জবার ঘর প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে।চালের ওপরে শুকনো পাতা পড়ে আছে,চালগুড়া অনেক জায়গায় ফুটো হয়ে গেছে।অপর পাশে আরো তিনটে ঘর।তবে তিনটে ঘরের মাঝে পার্থক্য অনেক।তার মাঝে দুটো বাড়ি ইট সিমেন্টের আর একটা বাড়ি এখনো টিনেরই।সুজনের গন্তব্য ওউ ভাঙ্গা টিনের ঘরটায়।১০ বছরেও যে ঘরের বিন্দুমাত্র কোন উন্নতি হয়নি বরং ধীরে ধীরে অবনতি হয়েছে।এখন চাল ফুটো হয়ে বৃষ্টির দিনে পানি পড়ে সেখানে।

দরজার কাছে কারো উপস্থিতি লক্ষ্য করতেই জামশেদ বলে উঠলো,

“কে?”

কন্ঠটা তার ভীষণ দুর্বল শোনালো।এই সামান্য একটা শব্দ উচ্চারণ করতেই কাশি উঠে গেল।মুক্তা দরজার কাছে এগিয়ে না গিয়ে আগে ছুটে স্বামীর কাছে এলো।এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিল তার দিকে।জামশেদের এখন আর একা উঠে বসে সেই পানিটুকু খাওয়ারও ক্ষমতা নেই।সুজন তাড়াহুড়া করে এগিয়ে এসে জামশেদকে বসতে সাহায্য করলো।নিজেই গ্লাসটা ধরে জামশেদকে পানিটুকু খাইয়ে দিল।

“ঠিক আছেন?”

জামশেদ মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো।মুক্তা পিছনে বালিশটা ঠিক করে দিল। জামশেদ হেলান দিয়ে বসলো।এতক্ষণে খেয়াল করলো যে সুজন এসেছে।জামশেদ চোখে ঝাপসা দেখে।ডাক্তার দেখাতে হবে তবে সেই টাকা নেই।কাছের জিনিস দেখতে তার সমস্যা হয়।সুজনের মুখটাও স্পষ্ট দেখতে পেল না।তবে বুঝতে পেরেছে যে সুজন এসেছে।পাশে সুজনের ৮ বছরের ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার মুখে হাসি ফুটে উঠলো।আজ অনেকগুলো দিন পর এই ঘরে কারো পা পড়লো।মানুষজন বোধহয় ভুলেই গেছে যে এই ঘরেও তালুকদার বাড়ি আরেক ছেলে থাকে।সবার সব লেনাদেনা এখন বাড়ির অন্য দুই ছেলের সাথে।জাকির মাঝে মাঝে আসে তবে খুব একটা যাতায়াত নেই। আর জাফর?সে তো ভুলেই গেছে যে তার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই এখনও বেঁচে আছে।জামশেদ হাত বাড়ি সৃজনকে কাছে ডাকলো।সৃজন গুটি গুটি পায়ে সেদিকে এগিয়ে গিয়ে পাশে বসলো।জামশেদ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

“তোর ছেলে তো অনেক বড় হয়ে গেছে সুজন।দেখতে অনেক সুন্দর হয়েছে।কোন ক্লাসে পড়ে।”

“থ্রি তে পড়ে।”

“ওহ। ওকে পড়াশোনা শেখাস।পড়াশোনা ছাড়া জীবনে কিছু সম্ভব না।তুইও তো অনেক কষ্টে পড়াশোনা করেছিস।দেখিস যত কষ্টই হোক ছেলেটার পড়াশোনা ছাড়াস না।অন্তত আমি যে ভুলটা করেছি সেই ভুলটা কখনো করিস না।”

“আপনার শরীর কেমন এখন?ডাক্তার দেখিয়েছিলেন?”

জামশেদ নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নিল।ইতস্তত গলায় বলল,

“হ্যাঁ দেখিয়েছিলাম।”

সুজন বুঝলো যে জামশেদ মিথ্যা বলছে।

“আমি তো টাকা পাঠিয়েছিলাম।ডাক্তারটা দেখানো জরুরি ছিল না কি?দেখেই বুঝতে পারছি চোখের সমস্যাটা আরো বেড়েছে।কাশিও তো বেড়েছে দেখছি।”

“আসলে ধার বেড়ে গিয়েছিল।ডাক্তার দেখাতাম কিন্তু পাওনাদাররা বাড়িতে আসা শুরু করেছিল,কিছু করার ছিল না।তুই চিন্তা করিস না আমি ফেরত দিয়ে দেব তোর টাকা।”

“আমি কি ফেরত চেয়েছি?আমি টাকা দিয়েছি বলে আপনার থেকে হিসাব চাইছি না শুধু বলছি ডাক্তার দেখানোটা দরকার ছিল।”

“আচ্ছা বাদ দে এসব কথা।রুমি আসেনি?”

“জুঁইদের জন্য অপেক্ষা করছে।”

জামশেদ এবার মুক্তা কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ছেলেটা এসেছে কিছু খেতে দাও।”

মুক্তার মুখটা শুকিয়ে গেল।ঘরের মুড়ি-বাতাসাও নেই।নিম্নকন্ঠে বললো,

“কিছুই তো নাই ঘরে কি দিমু?”

সুজন তারাহুড়োর কন্ঠে বলল,

“আমরা খেয়ে এসেছি।সৃজনও কিছু খাবে না।আর আপা আমি বাজার করে এনেছি। তুমি বরং রান্না করো কিছু।জুঁইয়েরা এতো দূর থেকে আসছে রান্না করো তুমি।”

“তুই আবার বাজার আনতে গেছিস কেন?এমনিতেই তুই অনেক টাকা দিস,মাস শেষে তো যা হয় তোর আর জুঁইয়ের টাকা দিয়াই হয়।মতিউরও বাজার কইরা পাঠায় কয়দিন বাদে বাদে।আবার এইডা করতে গেলি কেন?”

“এসব হিসাব বাদ দাও না আপা এখন।নিজের মানুষদের ক্ষেত্রে এত হিসেব আমার পছন্দ না। এমনিতেও কতটুকুই বা করতে পারি।তুমি যাও রান্না করো।তোমরা কি খেয়েছো সকালে কিছু?”

“হ খাইছি।”

“আচ্ছা যাও রান্না করো তুমি।”

মুক্তা উঠে গেল রান্না ঘরে রান্না করতে।সুজন জামশেদকে বলল,

“রাকিব কোথায়?”

ছেলের নামটা শুনতেই জামশেদের মুখে ঘোর আধার নেমে এলো।

“ও যে কোথায় আমি নিজেও জানিনা।সারাদিন যে কি করে বেড়ায় কে জানে।কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেয় না।ছেলেটা খারাপ সঙ্গে মিশে গেছে রে সুজন। মানুষ করতে পারেনি ওকে।অবশ্য আমার র/ক্তই তো পেয়েছে।আমিই বা কোথায় এত ভালো মানুষ ছিলাম যে ছেলে ভালো হবে?”

“আচ্ছা আমি কথা বলব ওর সাথে।ওকে আমার সাথে নিয়ে যায় শহরে?একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দেই?”

জামশেদ কৃতজ্ঞতার কন্ঠে বলল,

“কৃতজ্ঞ থাকব তোর কাছে। আমাদের তো জীবন শেষ হয়ে গেল ও যদি একটু নিজের জীবনটা গোছাতে পারে তাও শান্তি পাবো।তুই ওকে তোর কাছে রাখিস, ভরসা পাব।”

“আচ্ছা।আমি উঠি এখন কেমন।জুঁইরা আসছে একটু এগিয়ে যাই।”

সুজন উঠতে নিলে জামশেদ বাধা দিল।সোজা হয়ে বসে সুজনের হাত ধরে অপরাধী গলায় বলল,

“আমার ক্ষমা করে দিস সুজন।সারা জীবন তোকে ভিখিরির বাচ্চা বলেছি আর আজ তোর কাছেই হাত পেতে টাকা নিতে হয়।জহিরের কাছেও আজ ক্ষমা চাইবো।ওর গায়ে হাত তুলেছি একসময় অথচ আমার প্রতি ওর কোনো রাগ নেই।মতিউরের কাছে অনেক আগেই ক্ষমা চেয়েছি।তোরা টাকা না দিলে পেটে খাবার যায় না,ডাক্তার দেখাতে পারি না,ওষুধ কিনতে পারিনা। মেয়েটার বিয়ে দিলাম তোদের সাহায্যে।মতিউর ভালো পাত্রের সন্ধান দিল,জুঁই আর তুই মিলে মেয়ের সংসার গুছিয়ে দিলি,মতিউর কত মানুষ কে খাওয়ালো।তোদের টাকা দিয়েই জীবনটা চলছে।এক সময় যাদের অপমান করেছি এখম আমি সম্পূর্ণভাবে তাদের ওপরে নির্ভরশীল।তুই গরিব বলে তোর সাথে জবার বিয়ে দিতে আপত্তি করেছিলাম।অনেক অন্যায় করেছি তোর সাথে,তোদের সাথে আর তার শাস্তি এখন আমি পাচ্ছি।দেখ কিচ্ছু নেই।এই অর্থ সম্পত্তির লোভ জীবনটা শেষ করে দিয়েছে। জুয়া খেলতে খেলতে ধার দেনায় জর্জরিত।তারপরে সব সম্পত্তি ধীরে ধীরে শেষ হয়ে গেল।আজ আমি ভিখিরি।এখন আর গ্রামের কোনো বড় অনুষ্ঠানে আমাকে ডাকা হয় না। আমার দুই ভাইকে ডাকা হয়। আমাকে দেখলে মানুষ পথ বদলে নেয়। আগবাড়িয়ে কথা বলতে নিলে অজুহাত দেখায়, হয়তো ভাবে টাকা চাইবো।আমার এই অবস্থার কারণে মেয়েটাও শ্বশুরবাড়িতে দাম পায় না,শুধু মতিউরের ভয়ে কেউ কিছু বলতে পারে না।আর ছেলের কথা না হয় নাই বললাম।অমানুষ হয়েছে।কখনো যদি আমায় অভিশাপ দিয়ে থাকি তাহলে তুলে নেস অভিশাপটা। এমনিতেই জীবনটা আমার শেষ হয়ে গেছে।এখন শুধু নিঃশ্বাসটা যাওয়া বাকি।”

সুজনের ঠিক কি বলা উচিত বুঝতে পারছে না। সত্যিই মানুষটা কম অন্যায় করেনি ওর সাথে। জবা কে না পাওয়ার পেছনে এউ মানুষটাই বোধহয় সব থেকে বেশি দায়ী ছিল।অবশ্য জামশেদকে একা দায়ী করা উচিত না।ভাগ্যে ছিল না জবা।তবে সুজন এখন সেসব কথা মনে করতে চায় না।ওর আপা এত কিছু করেছি যে সংসার বাঁচানোর জন্য সুজন চায় সেই সংসারটা যেন টিকে যায়।

“মনে রাখিনি আমি কিছু।যদি মনে রাখতাম তাহলে এখানে আসতাম না।আমি কখনো অভিশাপ দেইনি আপনাকে।হয়তো আপনি সত্যিই কোন অন্যায় করেছিলেন যার শাস্তি আল্লাহ দিয়েছে আপনাকে।আমরা তো মানুষ আমাদের ক্ষমতা কতটুকু বলুন?পুরোনো কথা ভুলে যান।”

________
বেশ কয়েক বছর পর জুঁই আবার শ্যামলডাঙ্গা গ্রামে পা রাখলো।অনেক বদলে গেছে গ্রামটা।নতুন অনেক বাড়িঘর হয়েছে,অনেক নতুন মুখ হয়েছে।আর অনেক পুরাতন মুখগুলো হারিয়ে গেছে।জুঁই কে গভীর ভাবনায় নিমগ্ন থাকতে দেখে পাশ থেকে জহির বলে উঠলো,

“কি ভাবছো জুঁই?”

জুঁইয়ের ঘোর কাটলো।

“গ্রামটা অনেক বদলে গেছে তাইনা জহির?দেখো এই নদীটাও মনে হচ্ছে বদলে গেছে।মনে আছে এই নদীতে এক সময় তুমি নৌকা চালাতে?আজ কেন যেন অপরিচিত লাগছে নদীটাকে।”

জহির আলতো হেসে বলল,

“সময়ের সাথে সাথে সবই বদলে গেছে জুঁই।আমাদেরকে দেখো একসময় যে গ্রামে আমাদের আসল বাড়ি ছিল আজ সেই গ্রামে কত বছর পর পা রাখলাম।”

ওদের কথাবার্তার মাঝে নৌকা পাড়ে এসে থামল।নদীর পাড়ে রুমিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো।ছেলেমেয়েদের নিয়ে নৌকা থেকে নামলো দুজনে।গ্রামের মাটিতে পা পরতেই পুরনো দিনগুলো মনে পড়ে গেল জুঁই আর জহিরের।এই নদীর পাড়েই তো কত পুরনো স্মৃতি জমে আছে।সেই লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করা,রাতবিরেতে নৌকায় করে ঘুরতে বেড়ানো সব কিছু মনে আছে।কত ভয়,কত চিন্তা আর আতঙ্ক কাজ করতো তখন মনে।আর আজ সে সব কিছুকে ছাড়িয়ে ওদের সংসারের দশ বছরেরও বেশি হলো।বাড়ির উঠোনে পা রেখে আগেই জুঁই কারো সাথে দেখা করতে গেল না।সোজা গেলে বাড়ির পিছন দিকটায় যেখানে নিজের মা বাবার কবর আছে।আজ দশটা বছরের বেশি সময় হলো মানুষ দুটো সেখানে।রোদ বৃষ্টি যে রকম আবহাওয়াই হোক না কেন সব সময় ওখানেই থাকতে হয়।কতদিন হলো দেখেনা মানুষগুলোকে,কতদিন হলো একটু কথা বলে না,একটু সুখ দুঃখের আলাপ করে না।জুঁই নিজের সাথে করে নিজের ছেলেমেয়েদের কেও নিয়ে গেল।ওদের এক ছেলে,এক মেয়ে।কিছুটা সময় পর জহির গিয়ে ছেলে-মেয়েদেরকে নিয়ে এলো।জুঁই কে একটু একা থাকতে দিল।জুঁই বোধহয় নিজের আম্মার থেকে একটু বেশি হলেও আব্বার কথা বেশি মনে পড়ে।জানে না কেন তবে জুঁইয়ের মনে হয় এমনটা।ওই মানুষটাও যে জুঁইকেই সব থেকে বেশি ভালোবাসত।

“দেখেছো আব্বা তোমার এত কষ্টে গড়া এই সাম্রাজ্য, প্রভাব-প্রতিপত্তি,নাম কিছু রইল না।সব শেষ।আজ সবাই কি বলে জানো?জলিল তালুকদার নিজের ছেলেদেরকে মানুষ করতে পারেনি।মেজ ভাইজানকে তো এখন আড়ালে অনেকে চোর বলে।আর একদিন তুমি এই প্রভাব প্রতিপত্তির কথা চিন্তা করে আপার সাথে সুজন ভাইয়ের বিয়ে দাওনি,আমার সাথে জহিরের বিয়ে দিতে চাওনি।আমি কিন্তু তোমায় সেদিন বলেছিলাম যে এসব টাকা-পয়সা দেখে মানুষকে বিচার করোনা।এসব প্রভাব প্রতিপত্তি থাকবে না একদিন। দেখেছো আজ কিন্তু আমার কথাই সত্যি হলো।”

“আর অভিযোগ করিস না জুঁই।মানুষটা এক বুক সমান কষ্ট নিয়ে চলে গেছে আমাদের ছেড়ে।আমাদের সবার জীবন তো বেশ ভালোই চলছে।এখন আর এসব অভিযোগ করে কি হবে বল?”

কন্ঠটা চিনতে জুঁইয়ের অসুবিধা হলো না।এত বছরের পরিচয় যে আপার সাথে,যে আপার সাথে ছোটবেলা থেকে বেড়ে ওঠা তার কন্ঠ চিনতে কি অসুবিধা হতে পারে?পাশ ফিরে তাকাতেই জবার মুখটা দেখতে পেল।চোখের পাতা হালকা ভেজা লাগছে।জবা পুনরায় বলল,

“জানিস তো একসময় আব্বার প্রতি ভীষণ রাগ ছিল।ভেবেছিলাম আর কখনো কথাই বলবো না।হ্যাঁ আব্বা হয়তো আমার থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে কিন্তু তার বদলে অনেক কিছু দিয়েছে।মতিউর সাহেবের মত মানুষকে পাওয়ার পর কি আমার আর কোন অভিযোগ করা সাজে বল?”

“একদম ঠিক বলেছো আপা,দুলাভাইয়ের মতন মানুষকে পাওয়ার পরও যদি তুমি অভিযোগ করো তবে তোমাকে অকৃতজ্ঞ বলতে হয়।আল্লাহও হয়তো তোমায় তখন ক্ষমা করবে না।আমি শুধু আব্বাকে এটাই বলছিলাম যে প্রভাব প্রতিপত্তি সারা জীবন থাকে না।এই টাকা-পয়সার জন্য আমরা মানুষকে কতটা ছোট করি আর আজ দেখো আমাদের এই বাড়ির কি অবস্থা।এখানে যে মানুষ থাকে সেটাই বোঝা যায় না।শ্মশান মনে হয়।”

“সেসব এই বাড়ির কুলাঙ্গার ছেলেদের জন্য যারা নিজের বাবার সম্মান রক্ষা করতে পারেনা।থাক এসব কথা বাদ দে।ভেতরে চল তোর দুলাভাই তোকে খুঁজছে।”

জুঁই আলতো হেসে বলল,

“দুলাভাইয়ের অনেক ঋণ জমা হয়ে আছে আমাদের সবার উপরে তাই না আপা?যার প্রতি আমাদের সবার একরাশ ঘৃণা ছিল,যার প্রতি আমাদের কারোর কোন আশাই ছিল না সেই মানুষটা আমাদের সবার জীবন গুছিয়ে দিয়েছে।মাঝে মাঝে আমার কি মনে হয় জানো আপা আল্লাহ বোধ হয় তোমার জীবনটা কিছুদিনের জন্য এলোমেলো করে দিয়েছিলো আমাদের পরবর্তী গোটা জীবনটা গুছিয়ে দেওয়ার জন্য।”

“সেজন্যই তো এখন আমারও আর আফসোস নেই।তিন বাচ্চার মা হওয়ার পর কি আর আফসোস করা সাজে?শুধু মনে হয় প্রথম কয়েকটা দিন মানুষটার সাথে খুব অন্যায় করেছি।অথচ ওই মানুষটা তা সত্বেও কখনো কোনো অভিযোগ করেনি।”

“দুলাভাই মানুষটাই এমন।দুলাভাই মানে একটা ভালোলাগা।মানুষটা বড্ড বেশি ভালো।”

_________

“সুজন মিয়া চলো তোমার ছেলে আর আমার মেয়ের বিয়ের কথা পাকাপোক্ত করে ফেলি।দেরি করে কি হবে বলো?আর কয়েকটা বছর যাক বিয়ে দিয়ে দেব।”

মতিউরের কথা শুনে সুজন অবাক হল সেই সাথে ভ্যাবাচ্যাকাও খেল।

“বয়স তো এখনো খুব একটা বেশি হয়নি।এত তাড়াতাড়ি মাথা খারাপ হয়ে গেল আপনার?এই ছোট ছোট বাচ্চাদের বিয়ের কথা বলছেন?”

“আরে রাখো তো তোমার ছোট।বিয়ের কথা বলতে আবার ছোট বড় দেখার কি আছে?আজ হোক কাল হোক বিয়ে তো দিতেই হবে।”

“তাই বলে এত তাড়াতাড়ি ভাববেন?”

“ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করা জ্ঞানীর পরিচয়।তা বলো তোমার ছেলের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দিচ্ছো তো?”

“অত সহজ নাকি?সৃজনের সাথে আমি আমার মেয়ের বিয়ে দেব দুলাভাই।আপনি হাজার চেষ্টা করলেও এই সম্বন্ধ ভাঙতে পারবেন না।”

জুঁইয়ের কথা শুনে মতিউর চোখ ছোট ছোট করে ওর দিকে তাকিয়ে বলল,

“তুমি আবার এর মাঝখানে কোথা থেকে এলে জুঁই?”

“আমি মাঝখানেই ছিলাম দুলাভাই।সুজন ভাই তুমি বলোতো তুমি কার মেয়ের সাথে বিয়ে দেবে সৃজনের?দুলাভাইয়ের মেয়ের সাথে না আমার মেয়ের সাথে?”

সুজন মহাবিপদে পড়লো।এখন কাকে ছেড়ে কার পক্ষ নেবে?একজনের দিকে গেলে আরেকজন মন খারাপ করবে।সুজনকে বিপদ থেকে উদ্ধার করার জন্য পাশে বসা রুমি বলে উঠলো,

“আমি বলছি কে হবে আমার ছেলের বউ।যে বড় হওয়ার পর দেখতে শুনতে বেশি সুন্দর হবে, পড়াশোনায় বেশি ভালো হবে,আর অবশ্যই আমার সাথে সমান তালে তাল মিলিয়ে পাগলামি করতে পারবে সেই হবে আমার ছেলের বউ।”

মতিউর ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,

“জুঁই আমি কিন্তু চাইলেই তোমার থেকে একধাপ এগিয়ে যেতে পারি।আমি শুধু একটা কথা বলব আর সুজন মিয়া সৃজনের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দিতে রাজি হয়ে যাবে।”

জুঁই তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে মতিউরের দিকে তাকিয়ে বলল,

“কি?জাদু-টাদু করবেন নাকি আবার?”

“আরে না।সুজন আমার মেয়ের সাথে নিজের ছেলের বিয়ে দিতে রাজি না হলেও জবার মেয়েকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না।জবার অংশের কোন কিছুই ফিরিয়ে দেওয়ার সাধ্য সুজন মিয়ার নেই।”

হঠাৎ করেই পরিবেশটা কেমন যেন থমথমে হয়ে উঠল।এই অসময়ের মতিউরের এমন ব্যাক্কল কথা শুনে জুঁই রুমির দিকে তাকালো যে এখন কটমটে দৃষ্টিতে মতিউরের দিকে তাকিয়ে আছে।রুমি কটমট করে মতিউর কে বলল,

“একটা কথা বলি দুলাভাই?”

মতিউর সায় জানাতেই রুমি বলল,

“আপনি মানুষটা এখনও জা****ড়াই আছেন।”

_______
দুপুরে সবাই একসাথে বসে খাওয়া দাওয়া করলো।মুক্তা রান্না করেছিল,জামশেদের ঘরেই খাওয়া-দাওয়ার পাঠ চুকলো।জাফর কোনরকম কারো সাথে কথা বলেনি,কেউ এগিয়ে গিয়ে ওদের সাথেও কোন রকম কথা বলেনি।তবে জাকির আর নিতুর সাথে সবারই সম্পর্ক ঠিক আছে।অন্তত নিতু সুজনের সাথে আজীবন সম্পর্কটা ঠিক রাখতে চায়।মানুষটা ওর না হোক,ওর ভালোবাসা না বুঝুক তবুও তো একটু কথা বলার সুযোগ পাবে।একটু তো চোখ ভরে দেখতে পাবে এতোটুকুই যথেষ্ট।আজই জুঁইরা আবার শহরে ফিরে যাবে বলে মনস্থির করলো।ওদের সাথে সুজনরাও যেতে চাইলো তবে মতিউর তাতে বাঁধা দিল।এতগুলো বছরে কেউ কখনো মতিউরের বাড়িতে গিয়ে থাকেনি।জুঁই কখনো যায়ইনি।সুজন গিয়েছিল একবার,পরবর্তীতে আর কখনো সেই পথে পা বাড়ানোর সাহস হয়নি।এখনো যে একজোড়া চোখের মায়ায় পড়ার ভয় করে সুজন,পুষ্প কুড়ির ন্যয় একজোড়া ঠোঁটের দিকে এখনো তাকাতে পারে না, এখনো জবা নামটা শুনলে বুকের কোথাও একটা সূক্ষ্ম চিনচিনে ব্যথা অনুভব করে।অনেকগুলো দিন পেরিয়েছে,মাস পেরিয়েছে,বছর পেরিয়েছে তবুও অনুভূতিগুলোতে যেন আজও মরিচা ধরেনি।সেগুলোর ওপরে সুজন ধুলো জমতে দেয়নি।রোজ যত্ন করে।তবে অপর পাশে জবার অনুভূতিগুলো এখনো এক আছে কিনা সেসব সুজনের জানা নেই।তবে যতদূর ওর মনে হয় এখন আর অনুভূতি নেই।সবটুকু ভালোবাসা এখন মতিউরকে দিয়ে দিয়েছে।সুজন এতেই খুশি।এখনো যদি জবা সুজনকে ভালোবাসতো তবে যে মতিউরকে ঠকানো হতো।অনেকের চোখে যে জবা খারাপ প্রমাণিত হতো,অপবিত্র বলতো ওকে।সুজন সেসব চায় না।বিকালের দিকে সবার থেকে বিদায় নিয়ে মতিউদের বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিল সবাই।

নৌকায় উঠে আজ মাঝি কে বিশ্রাম দিল জহির।অনেকগুলো দিন হলো নৌকা চালানো হয় না।এই নদী,নৌকা সবটাই জহিরের ভালোবাসা।আজ আবার একটু নিজের পুরনো রূপটাতে ফিরে যেতে ইচ্ছে করলো।সেই পুরনো জহির আর এখনকার জহিরের মাঝে কত বদল এসেছে।এখন জহিরের নিজের একটা ব্যবসা আছে,জুঁই সরকারি চাকরি করে।একসময় জহির অনেক কষ্ট করে জুঁইকে পড়াশোনা শিখিয়েছে,কারো সাহায্য নেয়নি।নিজে অতিরিক্ত খেটেছে কিন্তু তারপরও কখনো জুঁইয়ের পড়াশোনায় কোন বাধা আসতে দেয়নি।বেশিরভাগ সময় এখন জহির শার্ট প্যান্ট পড়ে,অন্তত বাইরে বের হলে লুঙ্গি পড়ে না।ভাষার মাঝেও বিস্তর পার্থক্য এসেছে।আগের সেই পাতলা ফিনফিনে দেহটা এখন বেশ স্বাস্থ্যকর হয়েছে।আগে যে চুলগুলো সবসময় তেল দিয়ে চিপচিপে হয়ে থাকত এখন আর তেমনটা থাকে না।গায়ের রঙটারও বোধহয় একটু উন্নতি হয়েছে।জহিরের সাথে তাল মিলিয়ে সুজনও অন্য পাশে বৈঠা হাতে নিয়ে বসলো।নৌকা চালাতে তারও বেশ লাগে।নৌকা চালানো শিখতে হয়েছিল কোন একটা বিশেষ মানুষের আবদারে।জবার হঠাৎ রাত বিরেতে নৌকা নিয়ে ভ্রমন করতে ইচ্ছে হতো।আর সুজন ওর আবদার ফেলতে পারতো না।
মতিউর গলা উঁচিয়ে সুজন কে বলল,

“কিগো সুজন মিয়,একটা বিরহের গান শোনাও তো দেখি।কতদিন হলো তোমার কন্ঠে গান শুনে আমার বুকটা একটু ভার হয় না।শোনাও শোনাও।আমার বুকটা একটু ভার হোক আর কারো হৃদয়টা একটু জুরাক।আর কেউ আরো একবার আমায় গালি দেক।”

মতিউরের কথা অনুসারে রুমি সত্যি আরো একবার মনে মনে ওকে গালি দিল।জবা মতিউরের কথায় পাত্তা দিল না।সে দেখালো নিজের মেয়ের সাথে সে কথা বার্তায় ব্যস্ত।জুঁই একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলল।এই মানুষটা আসলেও ভালো হলো না।দিন দিন বয়স হচ্ছে তবুও কথাবার্তার কোন লাগাম হয়নি।কখন কোথায় কি বলতে হয় সেই জ্ঞান আজও তার হলো না।সুজন একবার আড় চোখে জবার দিকে তাকালো।খুব তাড়াতাড়ি আবার নিজের দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়ে মতিউরকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আমার কন্ঠের গান তো অনেক শুনলেন,আজ আপনার কন্ঠের গান শুনি।আপনার গান শুনে আমার মন কিন্তু ভার হবে না বরং শান্তি পাবো।নিন মতিউর সাহেব একটা গান শোনান।নিজের এত শখের ভালোবাসার মানুষটাকে উদ্দেশ্যে করে একটা গান গান।”

মতিউর ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“না রে ভাই,এই গলা দিয়ে গান বের হবে না।আমি যদি এখন গান গাই তবে নৌকার দুই মাঝি জ্ঞান হারিয়ে নৌকা ডুবে যেতে পারে।তার থেকে বরং তুমি গান গাও।সেই সাথে জহির মিয়া তুমিও একটু গাও।জুঁই কিন্তু আমায় বলেছে তুমি ওকে গান শোনাতে।তোমাদের দুজনের গানের গলাই সুন্দর।কত গুন তোমাদের দুজনের!”

জবা এবার মৃদু রাগান্বিত গলায় বলল,

“বেশি কথা বলছেন না কি আপনি?এত কথা বলার প্রয়োজন দেখছি না আমি?গান শুনবেন ভালো কথা একবার আবদান করেছেন শোনালে শুনবেন,না হলে চুপচাপ থাকবেন।”

মতিউর জুঁই কে অভিযোগ করে বলল,

“দেখেছো জুঁই এই হচ্ছে আমার অবস্থা।দিনরাত উঠতে বসতে বউয়ের হাতে গালি খাই।”

“আপনার কপাল ভালো যে আপনি আমার আপার মতন নরম কারো পাল্লায় পড়েছেন।যদি আপার মধ্যে আমার গুণ থাকতো আপনার কপালে দুঃখ ছিল।গালির সাথে ফ্রিতে মারও খেতেন।রুমি একদম ভুল কিছু বলে না।আপনি মানুষটা একটা ব্যাক্কল।”

সবার এত কথা কাটাকাটি থামিয়ে দিয়ে জহির বলে উঠলো,

“আচ্ছা ঠিক আছে।এখন আর কাউকে ঝগড়া করতে হবে না।সুজন একটা গান ধর তো।অনেকদিন হল তোর সাথে গান গাওয়া হয় না।”

সবার অনুরোধ আর সুজন ফেলল না।বৈঠা হাতে নিয়ে নৌকা চালাতে চালাতে আকাশ পানে দৃষ্টি রাখলো। চোখ দুটো বন্ধ করে খুব গভীরভাবে কিছু একটা অনুভব করার চেষ্টা করল যেন।কিছু স্মৃতি যেগুলো ভুলে যাওয়া উচিত ছিল কিন্তু ভুলতে পারিনি সুজন,কিছু অপরাধবোধ,রুমির সাথে করা কিছু অন্যায়।রুমি কে সবটা দিয়ে ভালো না বাসতে পারার অপরাধবোধ।নিজের উপরে মাঝে মাঝে বিরক্ত হয় সুজন যখন আজও মাঝরাতে কিছু দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠে।পাশ ফিরে যখন নিজের স্ত্রীর মুখটা দেখে তখন মানতে ভীষণ কষ্ট হয় যে আজও সুজন অতীতের কিছু স্মৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি।তবে এতসব কষ্টের মাঝেও অনেক কিছু প্রাপ্তি আছে সুজনের। রুমির থেকে পাওয়া নিঃস্বার্থ ভালোবাসা,তার ছেলের মুখ থেকে শোনা বাবা ডাক।আর অতীতের কিছু সুন্দর মুহূর্ত।সুজন আলতো হাসলো।চোখ মেলে সে খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে গলা ছেড়ে গান গাইলো,

❝যখন ওই-রূপ স্মরণ হয়,
থাকে না লোকলজ্জার ভয়…
লালন ফকির ভেবে বলে সদাই,
লালন ফকির ভেবে বলে সদাই,

ও প্রেম যে করে সেই জানে..
ও প্রেম যে করে সেই জানে..
আমার মনের মানুষের সনে..
আমার মনের মানুষের সনে..
মিলন হবে কত দিনে মিলন হবে কত দিনে?
আমার মনের মানুষের সনে..
আমার মনের মানুষের সনে…..❞

সমাপ্ত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here