লুকোচুরি_রোদ্দুর_ও_তুমি #সূচনা_পর্ব লেখনীতে : #অহনা_রহমান

0
135

বর এসেছে, বর এসেছে! চারিদিকের এতো হৈচৈ, এতো আনন্দ, কোনকিছুই ছুঁতে পারছেনা হিয়াকে। সে বরকে দেখে স্তব্ধ হতবাক হয়ে গেছে। চাচাতো বোনের হবু স্বামী হিসেবে যে মানুষটা তার সামনে রয়েছে। সে আর কেউ নয়, বরং তারই প্রেমিক #জুবায়ের_তিহান_রাজ।

হিয়ার সবকিছু এলোমেলো লাগছে। কি হচ্ছে এখানে তার কিছুই বুঝে আসছে না। আজতো তাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার কথা ছিলো রাজের। তাহলে এটাই কি সেই সারপ্রাইজ? হিয়ার ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে যাচ্ছে। নিজের চোখকে সে বিশ্বাস করতে পারছে না। হিয়াকে ঠেলে-ঠুলে লোকজন বর দেখতে এগিয়ে যাচ্ছে। এসবে তার কিছুই যায় আসছে না। সে তো ব্যস্ত চাচাতো বোনের হবুস্বামীকে দেখতে। চোখের সামনে দেখা এতো বড় সত্য তার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না। হিয়ার মন বারবার বলছে,

“পৃথিবীতে একই চেহারার সাতজন মানুষ আছে। এও নিশ্চয়ই রাজের মতো দেখতে কেউ। তার আর রাজের তিন বছরের সম্পর্ক। সেই সম্পর্ক ভেঙে দিয়ে রাজ কিছুতেই বিয়ে করতে পারে না। আর তাও আবার তারই কাজিনকে? এ হতেই পারে না।”

হিয়ার মন এতোসব অজুহাত দিলেও বাস্তবতা ভিষণ নিষ্ঠুর। হিয়া বুঝতে পারছে না কিছুই। সে একদৃষ্টিতে দেখতে লাগলো রাজকে। আসলেই কি এই রাজ তার ভালোবাসার মানুষ? নাকি অন্যকেউ? আর তখনই হিয়া মুখোমুখি হলো এক অপ্রত্যাশিত ঘটনার।

এতক্ষণে রাজও ওকে খেয়াল করেছে। কিন্তু রাজের মধ্যে হিয়াকে দেখেও কোন ধরনের শোকতপ্ত দেখা গেল না। সে হিয়ার উদ্বিগ্ন উৎকন্ঠিত অবস্থা দেখে বেশ মজা পাচ্ছে। সে আশেপাশে তাকাচ্ছে আর বাঁকা চোখে হিয়াকে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে। কিন্তু এইবারে সে সরাসরি তাকালো হিয়ার দিকে। আর হিয়া যেহেতু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো দুজনের দৃষ্টি বিনিময় হলো সাথে সাথে। হিয়ার চোখে চোখ পরতেই রাজ নিজের হাতের রূমাল টা নিয়ে মুখ ঢাকলো। শুধু চোখ দুটো বের করে, পরিস্থিতি বুঝে হুট করেই চোখ মেরে দিলো হিয়াকে। তারপর রূমাল সরিয়ে, হিয়ার দিকে তাকিয়ে ক্রুর হাসলো সে। রাজকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে ইচ্ছে করেই হিয়াকে ঠকিয়েছে।

এতক্ষণে হিয়ার বুঝতে বাকি রইলো না এই মানুষটা আর কেউ না বরং তারই প্রেমিক রাজ। হিয়ার যেন পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল মুহুর্তেই। তার মাথা ঘুরছে অসম্ভব ভাবে। চারপাশ কেমন ঘোলা ঘোলা দেখা যাচ্ছে। এতো মানুষের ভিড়েও নিজেকে ভিষন একা লাগছে তার। মনে পরছে তার জীবনের সবচেয়ে আপন মানুষটি হারানোর কথা। রাজকেও তো সে তার জীবনের প্রিয় মানুষ বানিয়েছিলো। রাজও তাকে ছেড়ে দিলো?

হিয়ার এই অবস্থা দেখে রাজ বেশ মজা পেলো। ওর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধুর (জিহাদ) কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“একটা জাদু দেখবি?”

জিহাদ বুঝতে পারলো না রাজের কথার অর্থ। কেননা সে এখনো হিয়াকে দেখেনি। সে কৌতূহল হয়ে বলল,

“কিয়ের জাদু মাম্মা? তুমি গার্লফ্রেন্ডরে ধোঁকা দিয়ে বিয়ে করতেছো এইডাই তো বড় জাদু। আবার কি দেখাবা? শালি টালি আছে নাকি?”

রাজ ‘চ’ সূচক শব্দ করে বলল,

“দেখবি কি’না বল।”

“কি দেখা দেখি।”

“ওকে! আমি এক থেকে তিন পর্যন্ত গুনবো। তারপর দেখবি।”

এটা বলেই তিহান গোনা শুরু করলো,

“ওয়ান….টু….থ্রি….!”

হিয়া আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলো না। সে অজ্ঞান হয়ে গেল। পরে যেতে নিলো মাটিতে। কিন্তু তার আগেই একটা শক্তপোক্ত বাহু আঁকড়ে ধরলো হিয়াকে। আর রাজের ও গোনা শেষ হলো তখনই।

হিয়া অজ্ঞান হয়ে যাওয়ায় চারিদিকে হুড়োহুড়ি লেগে গেল। সব মানুষ দুদিকে ভাগ হয়ে গেল। কেউ গেল হিয়ার কাছে৷ কেউ বা থেকে গেল রাজের কাছে। হিয়াকে কারো বাহুতে দেখে রাজের একটু বিরক্ত লাগলো। পরে যেতো মাটিতে! তাহলেই তো বেশি মজা হতো৷ রাজ এবার জিহাদের কানের কাছে গিয়ে বলল,

“কেমন জাদু দেখলি?”

এতো ভিড়ের মাঝে জিহাদ হিয়াকে দেখেনি। সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না, রাজ বলামাত্রই ওখানে কি হলো। কে অসুস্থ হয়ে পরলো?

“মামা কাহিনি কি? খুলে বল সব।”

রাজ ভিষন ভাবের সহিত পাঞ্জাবির কলারটা ঠিক করে বলল,

“ওটা হিয়া৷ আমার পেয়ারে গার্লফ্রেন্ড হিয়া। আমাদের জুনিয়র #আর্শিয়া_জাহান_হিয়া।”

জিহাদ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে মৃদু চেঁচিয়ে বলল,

“কিহ?”

রাজ বাঁকা হেঁসে বলল,

“হুম। ওটা হিয়া ছিলো।”

—-

হিয়ার যখন মাথা ঘোরাচ্ছিলো, সে দিকবিদিকশুন্য হয়ে গেছিলো। তখন রাজ বাদেও কেউ একজন খেয়াল করেছিলো ওকে। তাই হিয়া পরে যাওয়ার আগেই সে এসে ধরেছে। এবং সে ধরেই ক্ষ্যান্ত হয়নি। কোন কথাবার্তা না শুনেই সে হিয়াকে কোলে তুলে নিলো। এবং সবাইকে উপেক্ষা করে চলে গেল বাড়ির ভেতরে৷

এতক্ষণের এসবকিছু বাড়ির বাইরে গেটের কাছে ঘটেছে। আর এমনিতেও বাড়ি ভর্তি লোকজন থাকায় চারিদিকে লউ হুলুস্থুল কান্ড বেঁধে রয়েছে। বাড়ির লোকজন কে কোনদিকে সামাল দিবে তা বুঝতে পারছেন না। তাই হিয়ার অসুস্থতার কথা সেভাবে পৌঁছালো না বাড়ির ভেতরে।

ওদিকে অজ্ঞাত সেই যুবক হিয়াকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে গেল। সেখানেই উপস্থিত ছিলেন হিয়ার মা। দুর থেকে মেয়ের এ অবস্থা দেখে ছুটে এলেন তিনি। তার পাশাপাশি আরও কয়েকজন এলো। তারা এসেই কান্নাকাটি শুরু করে দিলেন। যুবকটি যথা সম্ভব তাদের শান্ত করার চেষ্টা করলো। সবাই যুবককে একটা রুম দেখিয়ে দিলো। সে গিয়ে হিয়াকে সেই রুমের খাটের উপর শুইয়ে দিল। হিয়ার মাকে সে চিনে না। সে বলল,

“ইনি কে আমি জানি না। ওখানে ভিড়ের মধ্যে মাথা ঘুরে পরে গেছে। ওখানে এমনিতেই অনেক ভিড় ছিলো তাই বাড়ির ভেতরে নিয়ে এলাম।”

হিয়ার মা হেলেনা কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

“ও আমার মেয়ে, আমার হিয়া। এই কেউ পানি আনো, ডক্টর কে কল করো। আমার মেয়েটার কি হয়ে গেল! আমার মেয়ের কিছু হলে আমি বাঁচবো না। ও আল্লাহ! আর কাউকে কেড়ে নিও না আমার থেকে।”

হেলেনাকে শান্তনা দিতে লাগলো সকলে। কেউ একজন গিয়ে পানি এনে দিলো যুবকের কাছে। সে হিয়ার মাকে বলল,

“আন্টি আপনি ভেঙে পরবেন না। ওনার কিছুই হবে না। এতো মানুষের মাঝে, এতো ভারি সাজে হয়তো সামলাতে পারেননি। আর তাছাড়া যে গরম পড়েছে। তাতে যে কারোরই সমস্যা হতে পারে।”

এটা বলে ছেলেটি গ্লাস থেকে পানি নিয়ে হিয়ার চোখে-মুখে ছিটিয়ে দিলো। তিন-চারবার এভাবে পানি ছিটানোর পরে হিয়া পিটপিট করে চোখ খুললো। এতে যেন প্রানে পানি এলো সকলের। হিয়াকে চোখ মেলতে দেখে সবাই ফিরে গেল যার যার কাজে। শুধু থেকে গেল হিয়ার মা ও অজ্ঞাত সেই যুবক।

হিয়ার মা হিয়াকে বুকের মধ্যে নিয়ে কাঁদতে শুরু করলেন আবার। যুবক শান্তনা দিতে লাগলো ওনাকে। কিন্তু হেলেনা কারো কথায় মানতে চাইলেন না। হিয়াকে জড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

“আমার সোনা, আমার বুকের মানিক। ও ছাড়া আর কে আছে আমার?”

হিয়ার বুঝতে সময় লাগলো এখানে কি হচ্ছে। কয়েক সেকেন্ডের মাথায় তার মনে পরে গেল, কিছুক্ষণ আগের সেই বিভৎস দৃশ্য। হিয়ার ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে উঠলো। রাজ তাকে এভাবে ঠকালো? এই তো আজ সকালেই রাজ কল দিয়ে বলেছে,
“শোনো না জানপাখি! তোমার জন্য আমি একটা বিশাল সারপ্রাইজ রেখেছি। দেখবে না বলো?”

হিয়া তখন সাজুগুজু তে ব্যস্ত ছিলো ভিষণ। এমনিতেই তো আজকে ওর সময় থাকার কথাও নয়। কিন্তু হিয়া রাজের মুখে সারপ্রাইজের কথা শুনে সবকাজ সাইডে রেখে বলেছিলো,

“আজতো আমার কাজিনের বিয়ে। তবুও আমি চেষ্টা করবো তোমার সাথে দেখা করার।”

“আরে আরে দেখা করার দরকার নেই। সারপ্রাইজ নিজেই চলে যাবে তোমার কাছে।”

হিয়া তখন বুঝতে পারেনি সারপ্রাইজ হিসেবে শয়তানটা এই প্লান করে রেখেছিলো। হিয়া জানে না, তাকে এভাবে কেন ঠকানো হলো? হিয়ার চোখের সামনে ভাসতে লাগলো তার আর রাজের কাটানো মুহুর্ত গুলো আর একটু আগে দেখা দৃশ্য গুলো। হেলেনা তখনও হিয়াকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। হিয়া আর ভেতরের যন্ত্রণা সহ্য করতে পারলো না। সে মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলো। আর বিলাপ করতে লাগলো,

“মা আমাদের সাথেই কেন এমন হয়? কেন হয় এমন?”

হিয়ার মা বুঝতে পারলেন না, হিয়া এসব কেন বলছে। সে নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত করে বললেন,

“কি হয়েছে মা? কেউ বকেছে? ওখানে কি হয়েছিলো?”

এখন কি বলবে হিয়া? এটা কি বলা যায়, তার ভালোবাসার মানুষটা তাকে ধোঁকা দিয়েছে? শুধু ধোঁকা দিয়েই শান্ত হয়নি, তারই বোনকে বিয়ে করছে। হিয়া বলতে পারলো না এসব৷ হঠাৎ তার খেয়াল হলো তাদের ঘিরে লোকজন জড়ো হয়েছে। নিজের ভেতরের যন্ত্রণাগুলো হিয়া চেপে রেখে চোখ মুছে নিলো। সেই সাথে হেলেনার ও চোখ মুছিয়ে দিলো। নিজেকে সামলে বলল,

“কিছুই হয়নি আম্মু। ধ্যাত তোমাকে কাঁদতে দেখে কি না কি বলে ফেললাম।”

হেলেনা বিশ্বাস করলেন মেয়ের কথা। তিনি হিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে মাথায় ও কপালে চুমু খেলেন। কান্না মাখা গলয়া বললেন,

“আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আল্লাহর কাছে অশেষ শুকরিয়া, আমার হিয়াপাখি ঠিক আছে। ”

“হুম আম্মু আমি ঠিক আছি। এইবার শান্ত হও প্লিইইইজ।”

মা মেয়ের কথাবার্তার মাঝে তাদের হঠাৎ খেয়াল হলো, সামনে অপরিচিত একটা ছেলে বসে আছে। হেলেনা তো জানেন এই ছেলেটাই তার মেয়েকে এখানে এনেছেন। তিনি হিয়াকে সরিয়ে সামনের দিকে ঘুরে বসলেন। হিয়া ও তাকালো যুবকের দিকে। হেলেনা এইবার খেয়াল করে দেখলেন, তাদের আত্মীয় সজন কেউ না। তাহলে কি বরযাত্রীর কেউ? তিনি যুববকে বললেন,

“ধন্যবাদ বাবা! তুমি না ধরলে, আমার মেয়েটা ওখানে পরে ব্যাথা আরও ব্যাথা পেতো। অনেক অনেক ধন্যবাদ তোমাকে।”

“সমস্যা নেই আন্টি। এটাতো আমার দায়িত্ব ছিলো।”

হেলেনা বলল,

“তা বাবা তোমাকে তো ঠিক চিনলাম না। তোমার নাম কি বাবা? কি হও বরের?”

“জ্বি আমার নাম নাফি! #জুনায়েদ_আহনাফ_নাফি। আমি বরের ভাই।”

চলবে?

গল্প : #লুকোচুরি_রোদ্দুর_ও_তুমি
#সূচনা_পর্ব
লেখনীতে : #অহনা_রহমান

ভুলত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন। আজ দেখবো সবার রেসপন্স। এতোদিন গল্পের অপেক্ষা করে ছিলেন। আজ দিয়ে দিয়েছি। এখন রেসপন্স না করলে কিন্তু……💔🤌

আর হ্যাঁ প্রথম দিকে বোরিং লাগতে পারে। এগুলো স্কিপ করিয়েন সবাই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here