গল্প : #লুকোচুরি_রোদ্দুর_ও_তুমি (২)
লেখনীতে: #অহনা_রহমান
(অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ)
হিয়া বিছানায় চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। হেলেনা বসে আছে হিয়ার মাথার কাছে। সযত্নে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন তিনি। বাহিরে এতো কাজ, এতো ব্যস্ততা সবকিছু ফেলে রেখে তিনি বসে আছেন হিয়ার পাশে। তিনি এখনো কেঁদে চলেছেন। একটা মাত্র মেয়ে তার। স্বামী হারা হয়েছেন সেই কত বছর আগে। কিন্তু মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি ২য় বার বিয়ে করেননি। হিয়াকে নিয়ে পড়ে রয়েছেন মৃত স্বামীর সংসারে। মেয়েটাকে ঘিরেই তো তার বেঁচে থাকা। হিয়াই তো তার সবকিছু।
হিয়া মনের ভেতরে কষ্টের পাহাড় চেপে রাখলেও তার সামান্যটুকুও বাহিরে প্রকাশ করতে পারছে না। কারন তার মা কষ্ট পাবে। এইজন্য হিয়া চেয়েছিলো তার মা যেন চলে যান। কিন্তু হেলেনা গেলেন না৷ তিনি একই ধ্যানে বসে হিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে চলেছেন।
মায়ের এই কান্না আবার রাজের ঠকানো হিয়াকে ভিষন কষ্ট দিচ্ছে। সে চাইলেও পারছে না একটু কাঁদতে। চাইলেও পারছে না কাউকে এসব কথা খুলে বলতে। হৃদয়ের রক্তক্ষরনে মেয়েটার ভেতরটা শেষ হয়ে যাচ্ছে। হিয়া নিজের চোখের উপর হাত দিয়ে শুয়ে আছে। মায়ের থেকে চোখের পানি লুকোনো তে ব্যস্ত সে। মা মেয়ে দুজনেই কেঁদে চলেছে। তাদের এই মুহুর্তের মাঝে হিয়ার অন্যান্য কাজিনরা সব হুড়মুড়িয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকলো। তারা জানে না হিয়া অসুস্থ হয়ে পরেছিলো। হিয়াকে এভাবে শুয়ে থাকতে দেখে তুবা নামের মেয়েটা বলল,
“কিরে তুই এখানে শুয়ে আছিস? আর আমরা তোকে খুঁজে খুঁজে পাগল হয়ে যাচ্ছি।”
হিয়া খুব সন্তপর্ণে আঁখিদ্বয়ের অশ্রু মুছে নিলো। কারো সামনেই এ অশ্রু দেখানো যাবে না। কারো সামনে মানে? হিয়ার মন ডেকে বলল,
“কারো সামনে কি? তুই ওই বেইমানটার জন্য কাঁদবিই না কখনো। তোর চোখের পানি অতটাও সস্তা নয় হিয়া। কাঁদবি না তুই, একটুও কাঁদবি না। তখন দেখিসনি রাজের মুখের হাঁসি? ও তোকে ইচ্ছে করেই ঠকিয়েছে হিয়া। এভাবে কান্নাকাটি করে ভেঙে পড়লে ও তোকে আরও সস্তা ভেবে নিবে। খবরদার তুই নিজেকে এতটা সস্তা ভাবিস না। কেউ না থাকুক তোর মা আছে হিয়া৷ তোর মায়ের জন্য হলেও তোকে শক্ত হতে হবে৷ তুই তো স্ট্রং! তুই রাজকে দেখিয়ে দিবি, ওই শয়তান টা ছাড়াও তোর জীবন চলে। তুই একটুও কষ্ট পাসনি।”
নিজ মনে এসব ভাবতে ভাবতে হিয়া যেন হারিয়ে গেছিলে অন্য কোথাও। মায়ের কন্ঠ শুনে হুঁশ ফিরলো তার। হেলেনা হিয়ার কাজিনদের কে বলছেন,
“ও অসুস্থ রে বাইরে যেতে পারবে না৷ তোরা গিয়েই আনন্দ কর।”
তুবা বলল,
“সে’কি ছোট কাকিমা? রুহি আপা তো হিয়াকে খুঁজছে। তাছাড়া আমরা সবাই বরের গেট আঁটকেছি। টাকা ছাড়া ছাড়বো না। হিয়ার সাথে তো আমাদের আরও প্লান রয়েছে। কি হবে এখন?”
“তোরাই সব করে নে মা। ও অসুস্থ যেতে পারবে না।”
হিয়া ভাবলো,
আসলেই তো! সে তো তখন দেখেছিলো, রাজ কেমন তাকে চোখ মেরেছিলো। আর ওই হাসিটা? রাজ ওকে দেখেই, ওভাবে হেঁসেছিলো। এর থেকেই প্রমান হয়, রাজ সবকিছু ইচ্ছে করেই করেছে। এমনকি সে একটুও অনুতপ্ত নয়। এখন যদি সে ঘরের মধ্যে বসে থাকে, তাহলে রাজ আরও পেয়ে বসবে তাকে৷ রাজ সফল হবে তাকে ঠকানোর কাজে। কিন্তু এতো হতে দেওয়া যায় না। হিয়া হতে দেবে না। সে ভেঙে যাবে, তবু মচকাবে না৷
হিয়া মায়ের কথাকে প্রত্যাখান করে বলল,
“আম্মু সমস্যা নেই। এখন অনেকটাই ভালো লাগছে৷ রুহি আপার বিয়ে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছিলাম বলো। এখন যদি সব ভেস্তে যায়!”
হেলেনা অনেক বোঝাতে চাইলেন হিয়াকে। কিন্তু হিয়া শোনার বান্দা নয়। ছোট থেকেই ভিষন জেদি সে। যা বলবে তাই করবে। এবারেও তার ব্যতিক্রম হলো না। হিয়া শুনলো না মায়ের কথা। সে বিছানা থেকে ঝটপট উঠে চট করে একটা চুমু খেল হেলেনার গালে। এরপর সকল কাজিনদের নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল বাহিরে। হিয়াকে এভাবে চঞ্চল হরিণীর মতো দেখে শান্তির নিশ্বাস নিলেন হেলেনা। এরপর তিনিও চলে গেলেন নিজের কাজে।
——
হিয়া রুমের বাইরে এসে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো। অন্তস্তলে ব্যাথা তো পেয়েছে সে! এগুলো তো বের করতে হবে নাকি? চোখের জল নাহয় না ঝড়লো। হিয়া কিছুক্ষণ শ্বাস নিয়ে নিজেকে ঠিক করার চেষ্টা করছে। কাজিনদের সকলকে গেটের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে সে। রাজের সামনে যাওয়ার আগে নিজেকে প্রস্তুত করে নিতে হবে তো। নাহলে ওই শয়তানটা আরও মজা পাবে। আর হিয়া তো ওকে খুশি হতে দেবে না।
হিয়া শ্বাস নিতে নিতেই মনে পরলো, তার কাজিন অর্থাৎ রুহি তো জানতো রাজের কথা। এমনকি রুহি রাজের ছবিও দেখেছে। তারপরও এমন করলো? এইজন্যই কি, রুহি বিয়ের আগে হবু স্বামীর ছবি দেখায়নি হিয়াকে? হিয়ার মাথা আবার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। হিসেব কিছুতেই মিলছে না। রুহি এবং রাজ দুজনেই জানতো তার ব্যাপারে। দুজনের সাথে হিয়ার কেমন সম্পর্ক সেটাও দুজন জানতো। ও মাই গড! তারমানে ওই দুটোই মিলে হিয়াকে ধোঁকা দিয়েছে। হিয়ার মাথা আবারও ঘোরাচ্ছে। রাজ তো নাহয় পরের ছেলে। কিন্তু রুহি? রুহি তো তার বড় বোনের মতো৷ সে কিভাবে পারলো এমন একটা কাজ করতে?
হিয়ার সবকিছু আওলা ঝাওলা লাগছে৷ কি আশ্চর্য! এগুলো কি হচ্ছে তার সাথে৷ হিয়া দুহাত দিয়ে মাথা চেপে ধরলো। এটা বাড়ির পেছনদিক তাই এখানে কারো আসার সম্ভাবনা নেই। হিয়া মাথা চেপে নিজের সাথে ঘটা সবকিছু মনে করতে লাগলো। আর তখনই শুনতে পেল এক অপরিচিত কন্ঠস্বর,
“এই যে ম্যাডাম? এখানে কি করছেন? আপনি না অসুস্থ?”
কারো কন্ঠ শুনে হিয়া তরিৎ মাথা থেকে হাত নামিয়ে ফেললো। নিজেকে সামান্য ঠিক করে তাকালো পেছনের দিকে। দেখতে পেল সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহিত স্বল্প পরিচিত যুবককে। হিয়ার মন মেজাজ তো এমনিতেই ভালো নেই। যেই মানুষটা তাকে এতো নিষ্ঠুরভাবে ঠকালো তার ভাই সামনে। মেজাজ আরও বেড়ে গেল হিয়ার। সে কর্কশ ভাষায় জবাব দিলো,
“ডান্স করছি এখানে। করবেন? আসেন দুজনে একসাথে ডান্স করি।”
নাফি তাজ্জব বনে গেল। এ কেমন বেয়াদব মেয়ে? একটু আগে যে, ওকে পরে যাওয়ার হাত থেকে সে বাঁচালো! এইজন্যই মেয়ে মানুষ তার পছন্দ না। আর মেয়ে মানুষ পছন্দ না বলেই আজকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে ছোটভাইয়ের বিয়ে দেখছে৷ শুধুমাত্র মানবতার খাতিরে গিয়ে সে মেয়েটাকে ধরেছিলো। এমন বেয়াদব জানলে সে কখনোই বাঁচাতো না।
“এভাবে সংয়ের মতো দাঁড়িয়ে আছেন কেন? দেখা হয়েছে না নাচতেছি? তো যাচ্ছেন না কেন?”
নাফি লজ্জিত হলো খুউব৷ সে তো বাড়িটা একটু ঘুরে দেখছিলো। ওখানে অত লোকজনের মধ্যে তার ভালো লাগছে না। এদিকে এসেছিলো একটু নিরিবিলি শান্তি করার জন্য।
নাফির আর কিছু বলা লাগলো না। তার আগেই হিয়ার সাঙ্গপাঙ্গরা চলে এসেছে এখানে। তুবা রা সকলে হিয়াকে খুঁজতে খুঁজতে বাড়ির পেছনে চলে এসেছে। নাফিকে এখানে দেখে ওরা খানিকটা অবাকই হলো। ওরা তেমন গুরুত্ব দিলো না এই বিষয়ে। ওরা কোন কথাবার্তা ছাড়ায় হিয়ার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল গেটের কাছে। সেখানে এখনো আটকা রয়েছে রাজরা। তুবারা পঞ্চাশ হাজার টাকা চেয়েছে৷ কিন্তু রাজরা দিতে রাজি নয়। এই জন্যই এখনো ওদের ঢুকতে দেয়নি তুবারা। হিয়া নিজেকে স্বাভাবিক রাখলো। এমন একটা ভাব করলো যেন রাজকে ও চেনেই না। হিয়া এসেই সকলের উদ্দেশ্যে জোরছে সালাম দিলো,
“আসসালামু আলাইকুম।”
রাজ একটু বিব্রত হলো। হিয়া এতো স্বাভাবিক কেন? তার ভাবনার মাঝে হিয়া ওর দিকে তাকিয়ে বলল,
“দুলাভাই? বউয়ের সাথে ফ্রী শালি পাচ্ছেন কতগুলো। এতো কিপটা হলে চলে? কিপ্টামি তো ভালো লক্ষন নয়!”
রাজ অবাক হলো। এটা হিয়া? হতেই পারে না। তবে সেও কাউকে কিছু বুঝতে দিলো না। সে বলল,
“অবশ্যই টাকা দিবো। দিবো না কেন? এতো সুন্দর শালিরা আমার!”
সে নিজের মাথাটা সামান্য এগিয়ে দিয়ে হিয়াকে কাছে ডাকলো। সবাই চারিদিকে হো হো করে উঠলো। নতুন বর কি বলছে শুনতে সবাই উৎসুক হয়ে গেল। যেহেতু রাজ হিয়ার দুলাভাই তাই কেউ কিছু মনে করলো না। হিয়াও পরিস্থিতি বিবেচনা করে এগিয়ে গেল রাজের দিকে। রাজে হিয়ার কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“কেমন লাগলো সারপ্রাইজ? এটা পছন্দ না হলে আরও আছে সামনে। নো টেনশন!”
হিয়া ও রাজের কানের কাছে গিয়ে বলল,
“তোর মুখে ঝাঁটা মারি বাস্টার্ড।”
চলবে?
রিচেইক করতে পারিনি। ভুলত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন। আপনাদের কাছে অনুরোধ প্লিজ আপনারা সবাই রেসপন্স করবেন।

