লুকোচুরি_রোদ্দুর_ও_তুমি (৩) লেখনীতে : #অহনা_রহমান

0
152

গল্প : #লুকোচুরি_রোদ্দুর_ও_তুমি (৩)
লেখনীতে : #অহনা_রহমান

কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ

কোনরকম বাঁধা বিপত্তি ছাড়ায় হয়ে গেল রাজ ও রুহির বিয়ে। ওরা দুজন এখন স্টেজে বসে মেহমানদের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। হিয়া একদম পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে দেখে গেল সবটা। রাজ ও রুহির মুখ থেকে হাসি যেন সরছেই না। কত সুন্দর হাস্যজ্জল মুখে রয়েছে দুজন। দেখে মনে হচ্ছে রাজ ও রুহির বা জানি কত বছরের সম্পর্ক। যদিও এই বিষয়ে হিয়া তেমন কিছুই জানে না। অথচ এই দুই হাস্যোজ্জ্বল চেহারার পেছনে লুকিয়ে রয়েছে একটা হাসিখুশি মেয়েকে ঠকানোর ভয়ংকর গল্প।

ওদের দুজনকে এভাবে খুশিতে থাকতে দেখে মনে মনে হিয়ার আফসোসই হলো। কেননা তার সাথে যদি রাজের বিয়ে হতো তাহলে হয়তো রাজ-রুহি জুটির মতো অত সুন্দর লাগতো না। আচ্ছা যদি ভালো না-ই লাগে? যদি সম্পর্কে পূর্ণতা না-ই বা পায় তাহলে দেখা হয় কেন? কেন পরিচয় হয় দুজন মানুষের? আর কেনই বা তাদের ভেতরে আবার তৃতীয়পক্ষ চলে আসে? হিয়ার মুখে হাসি থাকলেও অন্তর পুড়তে লাগলো। হিয়া এখনো বুঝতে পারছে না রাজ বা রুহির সাথে তার কিসের শত্রুতা। কি কারনে তার সাথে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করা হলো?

হিয়া অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে রইলো ওদের দিকে৷ বুক চিরে বেড়িয়ে এলো দীর্ঘশ্বাস। হঠাৎ হিয়ার চোখদুটো বড় হয়ে গেলো। এতক্ষণ ধরে তো হিয়া খেয়ালই করেনি। গিফট বক্স নিয়ে স্টেজে উঠেছে হিয়ার ফ্রেন্ডরা (নাফিজ ও মারজিয়া)। হিয়া অবিশ্বাস্য চোখে দেখলো সব। কি হচ্ছে এসব? নাফিজ ও মারজিয়া রুহির হাতে গিফট দিয়ে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে হাসিঠাট্টা করলো। ওরা চলে যাওয়ার পরই এলো রাজের বন্ধুরা। ওরাও গিফ্ট দিয়ে নবদম্পতিকে নিয়ে মজা করলো অনেকক্ষণ। অথচ ওরা সবাই জানতো হিয়ার সাথে রাজের সম্পর্কের কথা। রাজ ও হিয়ার সম্পর্ক ও এক-দুই দিনের নয়। তিনটা বছরের সম্পর্ক। তারমানে ওরা সকলে মিলে হিয়ার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো? কিন্তু এমন শত্রুতা ওদের সাথে হিয়ার? হিয়ার জানা মতে এমন কোন কারন মাথায় আসছে না, যার দরুন ওরা সবাই মিলে ওকে ঠকাবে। হ্যাঁ এটা ঠিক ছিলো যে ভার্সিটিতে প্রথম ভর্তি হওয়ার পরই রাজের সাথে তার ঝামেলা বাঁধে। রাজকে সে থাপ্পড় ও মেরেছিলো একদিন। কিন্তু তা তো চলে গেছে কোন কালে। তারপর তো তারা সম্পর্কে জড়ালো।

হিয়ার এই সবকিছু কেমন যেন স্বপ্ন মনে হচ্ছে। নাফিজ, মারজিয়া তার সাথে কেন এমন করলো?

রাজের সেকেন্ড সারপ্রাইজ বোধহয় এটাই ছিলো। স্টেজ ফাঁকা হয়ে গেলে, রাজ সবাইকে ছাপিয়ে হিয়ার দিকে তাকালো আবার। রুহিও তাকালো হিয়ার দিকে। দুজনের ঠোঁটেই বাঁকা হাসি। তবে রুহির থেকে রাজের হাসিটা আরও প্রকাশ্য! হিয়া ওদের দিকে তাকিয়ে ছিলো তাই দেখতে পেলো এসব। হিয়া তো জানে এই হাসির কারন কি। তাকে আঘাত করার জন্যই তো তাইনা? এমন ঠুনকো কারনে হিয়া আঘাত পাবে না। কিছুতেই না! হিয়া নিজেও ওদের দিকে ঠোঁট এলিয়ে হাঁসলো। তারপর মিডিল ফিঙ্গার দেখালো ওদের।

এসব দেখে কেশে উঠলো রুহি। রাজ দ্রুত চোখ সরিয়ে নিয়ে অন্যদিকে ফিরলো। কি ডেঞ্জারাস মেয়ে রে বাবা!

রাজ ও রুহি ছাড়াও অন্য একজন খেয়াল রাখলো হিয়ার দিকে। এবং এই বিষয়টা তারও নজর এড়ালো না।

—–

গ্রাম বাংলায় নিয়ম আছে, নতুন বউয়ের সাথে শশুরবাড়িতে তার পরিবারের কেউ যায়। রুহির সাথে যাওয়ার কথা ছিলো রুহির নানির। কিন্তু তিনি বয়ষ্ক মানুষ হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় যেতে পারবেন না। তাই রুহি বায়না ধরেছিলো তার সাথে যেন হিয়া ও তুবা যায়৷ হিয়া তখন তো আর জানতো না রুহির স্বামী কে হবে। এখন যখন কন্যা বিদায়ের পর্ব এলো তখন হিয়া তো কিছুতেই যাবে না। যাওয়ার কোনও প্রশ্নই আসে না। হিয়া ঠিক বুঝতে পারছে, রুহি ইচ্ছে করেই তাকে নিতে চাচ্ছে। এসব জেনে বুঝেই হিয়া যেতে চাইলো না। কিন্তু রুহি মেয়েটা সবার সামনে এমন কান্নাকাটি করলো যে হিয়াকে বাধ্য হয়ে যেতেই হবে।

হেলেনা চাইছিলেন না হিয়া যাক। কেননা মেয়েটার শরীর এমনিতেই ভালো নেই। ওখানে গিয়ে কোথায় কি করবে না করবে তার ঠিক নেই। নিজের খেয়াল রাখবে না। এইজন্যই তিনি রুহিকে বোঝাতে চাইলেন। বিদায়ের আগে কাঁদতে কাঁদতে অস্থির হয়ে পরেছে সে। তাই হেলেনা আর কিছু বলতেও পারলেন না।

ওদিকে সবাই হিয়া ও তুবাকে তাড়া দিতে লাগলো তারা যেন দ্রুত সব গুছিয়ে নিয়ে আসে। না চাইতেও হিয়াকে যেতে হলো গোছাতে।

তার পরনে তখন ছিলো একটা খয়েরী শাড়ী। গোলগাল সুন্দর চেহারার মেয়েটাকে এই শাড়ীতে বেশ ভালোই লাগছে। হিয়া হয়েছে তার মায়ের ফটোকপি। হেলেনা ও ভিষন সুন্দর দেখতে। আর হিয়াও সেরকম। টানা টানা হরিণী চোখ, খাড়া নাক, গোলাপের পাপড়ির মতো ঠোঁট। কোমড় ছাড়ানো ঘন কালো চুল। হিয়া ছোট থাকতে নাকি সকলে ওকে গোলাপের সাথে তুলনা করতো। সবমিলিয়ে মেয়েটা অসম্ভব সুন্দর।

হিয়া ও তুবা চটজলদি কিছু কাপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বের হলো। তবে তারা আসার আগেই রুহিকে অন্যা গাড়িতে নিয়ে চলে গেছে বরযাত্রীরা। রুহি কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। তারজন্যই রুহিকে আগে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। হিয়ারা যাবে রাজের বড় ভাই নাফির গাড়িতে। এসব দেখে হিয়া নাক সিটকালো। কিন্তু যেহেতু রুহি বলে গেছে তাই বাড়ির সকলের জোরাজুরিতে তাকে যেতে হলো।

নাফির সাথে আরও একটা ছেলে রয়েছে। তার নাম তাসরিক। নাফি ড্রাইভ করছে। তাসরিক তার পাশের সিটে বসেছে৷ আর হিয়া ও তুবা বসেছে পেছনে। সবার থেকে বিদায় নিয়ে নাফি গাড়ি স্টার্ট করলো। হিয়ারা যেহেতু ওদের বেয়াইন হয় তাই তাসরিফ বলল,

“বেয়াইনরা কিন্তু আগুন! আমাদেরকে তো জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছেন।”

তুবা হেসে উঠলো তাসরিকের কথায়। কিন্তু হিয়া ‘চ’ সূচক শব্দ করলো বিরক্তিতে। বর্তমানে সে গোটা দুনিয়ার উপরেই বিরক্ত। নিজের জ্বালায় সে বাঁচছে না আর আসছে ফাউল আলাপ নিয়ে। অসহ্য!

“তাই নাকি? তো এখন উপায়?”

তুবা বলল তাসরিককে। এই কথায় যেন সুযোগ পেয়ে গেল তাসরিক। সে বলল,

“উমমমম….. যে জ্বালাতে পারে সে নেভাতেও পারে। শুধু উপায় টা জানতে হবে বুঝলেন। যাইহোক! আমার ডায়বেটিস আছে বুঝলেন? ”

“এখানে ডায়বেটিস আসলো কোথাথেকে? আর আগুন নেভানোরই বা কি উপায়?”

” আপনি যে মিষ্টির মিষ্টি! ডায়েবেটিস না থাকলে নিশ্চিত খেয়ে ফেলতাম।”

হিয়া শব্দ করে হেঁসে উঠলো। আর তুবা কেশে উঠলো। তাসরিক মুচকি হেঁসে আবারও বলল,

“আগুনের ব্যাপারটা বলি? এই যে ধরেন আপনাকে দেখে আমার মনে অসুখ হয়েছে। মনের মধ্যে আগুন জ্বলছে। এখন মনের অসুখ তো আর যেমন তেমন ঔষধে সারবে…..!”

তাসরিক বেচারা কথা শেষ করতে পারলো না। তার আগে নাফি খানিকটা ঝাড়ি মেরে বলল,

“ভাই থামবি প্লিজ?? আমার ভাই হয়ে তুই মেয়েদের সাথে এমন সস্তা ফ্লার্ট করছিস? ছিঃ!”

নাফির কথা শুনে ওরা তিনজনই একযোগে ভেঙচি কাটলো।

এরপর নীরাবতা পালন করতে করতেই ওরা পৌঁছে গেল নাফিদের বাড়িতে৷ রুহি তখন একটা রুমে বসে আছে। তাকে ঘিরে রয়েছে এ বাড়ির সমস্ত আত্মীয়-স্বজন। রুহি ও তুবা পৌঁছালে ওদের সাময়িক ভাবে নাস্তা পানি খেতে দেওয়া হয়৷ তারপর নিয়ে যাওয়া হয় রুহির কাছে।

এতক্ষণ হিয়া ভালো থাকলেও রুহির সামনে আসার পরই হিয়ার হৃদপিণ্ড কাঁপতে লাগলো। রুহিকে মাঝখানে বসিয়ে হিয়া ও তুবা বসলো রুহির দুইপাশে। মানুষ আসছে যাচ্ছে বিরামহীন ভাবে। কমার নামই নেই। যদি দেখার দরকার হয় সবাই একবারে এসে দেখে যাক! বারবার আসার কি দরকার আশ্চর্য!

প্রায় দেড় দুই ঘন্টা ওরা বসেই থাকলো। এরপর লোকজন একটু কমতে শুরু করলো। তখন রুমে শুধুমাত্র ওরা তিনবোন। আর কাকতালীয় ভাবে তুবার তখনই ওয়াশরুম যেতে হবে। ও ঘর ফাঁকা দেখে দৌড়ালো ওয়াশরুমে।

হিয়া বিয়ের পর থেকে রুহির সাথে এই পর্যন্ত একটা কথাও বলেনি। আর বলার ইচ্ছে ও নেই। যদি পরিবেশ বিবেচনায় বলতেই হয়, সেটা হবে শুধুমাত্র লোক দেখানোর জন্য। তুবা চলে যাওয়ার পরও হিয়া কিছুই বলল না৷ সে নিজের মতো করে ফোন টিপতে লাগলো। রুহি ভেবেছিল হিয়া হয়তো তাকে কিছু বলবে। বা কোনও রিয়াক্ট অন্তত করবে৷ কিন্তু হিয়া তা করেনি৷ এই জন্য রুহির ভিষণ রাগ হলো৷ জিদ চাপলো মাথায়। সে হিয়ার দিকে ঘুরে বসলো। কেমন একটা গম্ভীর গলায় বলল,

“তোর রাগ হচ্ছে না হিয়া?”

হিয়া ভেবেছিল কথা বলবে না। কিন্তু এখন ভেবে দেখলো, যদি সে কথা না বলে তাহলে সবাই ভাববে হিয়া কষ্ট পেয়েছে। হিয়াকে কষ্ট দিতে ওরা সফল হয়েছে। তাই হিয়া কথা বলছে না।

“রাগ কেন হবে?”

রুহি খানিকটা তাচ্ছিল্য হেঁসে বলল,

“এই যে পেরেম করে ধোঁকা খেলি? তোর কি কিছুই হচ্ছে না?”

হিয়া হেঁসে উঠলো। খুব কনফিডেন্সের সহিত বলল,

” তাহলে মানলে যে আমাকে ধোঁকা দিয়েছো তোমরা? যাকগে সেকথা! ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন, আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ও জমছে না এই বিষয়ে। কষ্ট পাওয়া তো অন্নেক দুরেএএএর বিষয়।”

রুহি ও পাল্টা হেঁসে বলল,

“তুই কষ্ট পাচ্ছিস কি’না পাচ্ছিস তা তোর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। শুধু শুধু শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করিস না।”

হিয়া প্রতিত্তোর করার আগে তুবা চলে আসলো ঘরের ভেতরে।

——-

রাত তখন এগারোটা। হিয়া একা একা ছাঁদে দাঁড়িয়ে আছে। নিচে ড্রয়িংরুমে সবাই কত আনন্দ ফুর্তি করছে হিয়ার এসব কিছুই ভালো লাগছে না। ওর ক্ষনে ক্ষনে শুধু রাগ লাগছে। মনে চাচ্ছে সব কটাকে যদি থাপ্রাতে পারতো তাহলে ভালো লাগতো৷

হিয়া উদাস হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো। মনের মধ্যে ঘুরছে একগাদা প্রশ্নের ঝাঁক। কিন্তু তার উত্তর আর মিলছে না। হিয়া ঠিক করলো সুযোগ বুঝে রুহির কাছে সে জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু পরক্ষণেই আতঙ্কে আরেকমনে বলল,

“তুই কেন জিজ্ঞেস করবি? নিজেকে তুই এতটা শক্ত বানা যাতে ওরা নিজেরাই এসে সবটা এক্সপ্লেইন করে।”

হিয়া মনের দ্বিতীয় কথাটা শুনলো। ঠিক করলো ওদের থেকে রিভেঞ্জ নিবে৷ হিয়া যদি ভালো থাকে, সেটাই হবে সবচেয়ে বড় প্রতিশোধ। কেননা ওরা শুধুমাত্র হিয়াকে কষ্ট দিতেই এই তিনবছর ধরে এমন প্লান সাজিয়েছে। হিয়ার এসব ভাবনার মাঝেই কেউ একজন বলে উঠলো,

“রাজের সাথে কি সম্পর্ক তোমার?”

চলবে?

ভুলত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন। আশাকরি সবাই রেসপন্স করবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here