গল্প : #লুকোচুরি_রোদ্দুর_ও_তুমি [(৪) খ.]
লেখনীতে : #অহনা_রহমান
হিয়ার কথা শেষ হতে না হতেই একটা শক্ত চড় পরলো ওর নরম গালে। চড়টা মেরেছে রুহি৷ হিয়া জানতো এমন কিছুই হবে। ওরা তাকে এতোটা ভাঙার চেষ্টা করছে অথচে ও সামান্য মচকাচ্ছে না। রাগ তো হবেই। হিয়া এমন শক্ত চড়ে সামান্য রিয়াক্ট ও করলো না। একচুল সরলে না নিজের জায়গা থেকে। তা দেখে রুহির বোধহয় আরও রাগ হলো। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তুই জানিস তোর সাথে আমি কেন এই খেলাটা খেলেছি?”
হিয়া মনে মনে অনেকবার জানার চেষ্টা করেছে এই উত্তর কিন্তু মেলেনি। বলতে গেলে সে অপেক্ষাতেই ছিলো, কখন ওরা নিজেরা বলবে ওকে ঠকানোর কারন। হিয়া একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো রুহির দিকে। রুহি কিছু একটা ভেবে বলল,
“কি জানতে ইচ্ছে করছে খুব? বুকের ভেতরে ছটফট করছে জানার জন্য? করুক না। আমার ভিষন মজা লাগছে তোকে এইভাবে দেখতে। তোকে এই চেহারায় দেখতে যদি আমার সারাজীবনও লেগে যেতো, তাহলেও আমি এই প্লান অব্যাহত রাখতাম হিয়া৷”
হিয়া যেন কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেললো। তার প্রতি এতটা ঘৃনা কবে জন্মালো? অথচ রুহি আপুই ছিলো তার প্রিয়। একমাত্র রুহি আপুর সাথেই সে রাজের ব্যাপারটা শেয়ার করেছিলো। হিয়া ভাঙা গলায় বলল,
“এতটা ঘৃণা? এতটা ঘৃণা করো আমাকে?”
রুহি হিয়ার গাল চেপে ধরলো। শক্ত গলায় বলল,
“তুই ভাবতেও পারবি না, তোকে আমি কতটা ঘৃণা করি হিয়া। তোকে কষ্টে দেখার শখ আমার বহু আগের। তুই কষ্ট পা হিয়া। কষ্টে ছারখার হয়ে যা তুই।”
এই পর্যায়ে সত্যিই হিয়া কেঁদে ফেললো। সে তো কখনো ভাবতেও পারেনি এসব। কি এমন করেছে সে? কই তার তো কিছুই মনে পরছে না। হিয়া কান্না মাখা গলায় বলল,
“এইজন্যই বলে, বেইমান রা সবসময় পেছন থেকেই ছুড়ি মারে। আমি জানি না, তোমার কি ক্ষতি করেছি। তবে শুনে রাখো, আমাকে ভাঙা অতটাও সহজ নয়। আমি জানি আমি ঠিক সো মিথ্যা দোষে আমাকে কষ্ট দেওয়ার চিন্তা ভুলে যাও। সেটাই ভালো হবে তোমাদের জন্য।”
রুহি আবারও হাত উঠালো হিয়ার উপর। কিন্তু এইবারে হিয়া আর আগের ভুল করলো না। সে শক্ত করে চেপে ধরলো রুহির হাত। শাসানো কন্ঠে বলল,
“খবরদার! এই স্পর্ধা আর দেখিও না। আমি ভালো করেই বুঝতে পারছি, তুমি আমাকে এখানে কেন এনেছো৷ তোমার যা খুশি তুমি করে নাও দেখো আমার চুলটা পর্যন্ত ছিঁড়তে পারো কি’না।”
ততক্ষণে রুমে চলে এসেছে রাজ। রাজ আসা মাত্রই হিয়া ঘুরে চলে যেতে নিলো। রুহি রাগে রীতিমতো কাঁপছে। সেই ছোটবেলা থেকেই হিয়াকে সে ঘৃণা করে। কিন্তু সবসময় সবার সামনে দেখিয়ে এসেছে, রুহিই সবচেয়ে ভালোবাসে হিয়াকে। রহিকে এই অবস্থায় দেখে রাজ হিয়াকে দাঁড়াতে বলল। হিয়া থেমেও গেল। রাজ হিয়াকে থামতে বলে, গেল রুহির কাছে। খুবই আদুরে কন্ঠে বলল,
“কি হয়েছে সোনা? শরীর খারাপ লাগছে? আমি চলে এসেছি তো।”
হিয়ার কাছে এগুলো নিতান্তই লোক দেখানো ন্যাকামি মনে হলো। হিয়া ওদের দিকে না তাকিয়েই বলল,
“একটা রাস্তার আবর্জনা, আরেকটা টোকাই। ভালোই মিলেছে!”
হিয়া কথাটি বলেই দ্রুত প্রস্থান করলো। পিছনে রেখে গেল দুইটা মানুষরুপি শয়তানকে।
—–
“আচ্ছা তোকে যদি তোর বয়ফ্রেন্ড ধোঁকা দেয়, তাহলে তুই কিভাবে তার থেকে প্রতিশোধ নিবি?’
হিয়া ও তুবা শুয়ে আছে গেস্টরুমে। রাত তখন অনেক। কিন্তু ওরা না ঘুমিয়ে গল্প করে যাচ্ছে। কথা বলতে বলতে হিয়া উপরিউক্ত কথাটি তুবাকে বলল । তুবা হিয়ার কথার উত্তরে কিছু না ভেবেই বলল,
” আমাকে ধোঁকা দেওয়া অত সোজা নাকি? আর ধোঁকা যদি দিয়েই বসে, তাহলে আমি আমার এক্সের ভাইকে বিয়ে করবো। আর সুখে শান্তিতে সংসার করবো। শালা দেখবে আর জ্বলবে লুচির মতো ফুলবে।”
তুবার কথা শুনে চোখমুখ কুঁচকে ফেললো হিয়া। আইডিয়া ভালো আছে। কিন্তু…. এখন রাজের থেকে প্রতিশোধ নিতে ওই লোককে বিয়ে করতে হবে? এহ! জীবনেও না। হিয়া বলল,
“আর কোন উপায় থাকলে সেটা বল।”
“আরক কি উপায়? প্রতিশোধ নিতে গেলে, তুই যে ওকে ছেড়ে ভালো আছিস এটা দেখাতে হবে। ধর তুই অন্য বেডারে বিয়ে করলি। তাহলে ও দেখবে কিভাবে, তুই ভালো আছিস কি খারাপ আছিস? এই জন্য আমার মনেহয় প্রত্যেকটি মেয়েরই এই ট্রিকস ফলো করা উচিৎ। এক্স গুলো যখন ভাইয়ের বউ হিসেবে দেখবে, তখন না পারবে সইতে আর না পারবে কইতে।”
হিয়া ভাবতে লাগলো। রুহির কথা তে সে বুঝেছে, রুহি তাকে কষ্টে দেখতে চায়। আর রাজের থেকে তো তাকে প্রতিশোধ নিতেই হবে। তার মা আজ হলেও তাকে বিয়ে দেবে, কাল হলেও তাকে বিয়ে দেবে। বিশে তো তাকে করতেই হবে। যদি ওর অন্য জায়গায় বিয়ে হয়, তাহলে ও যে ভালো আছে এটা কিভাবে দেখবে রুহি?
হিয়া কিছুই বুঝতে পারছে না। কি করবে সে? ওদিকে ঘুমও আসছে না। বারবার কানে বাজছে রুহির বলা কথা গুলো। অথচ হিয়া নিষ্পাপ! ছোটবেলায় বাবা মারা গিয়েছে তার। মায়ের হাতে মানুষ হয়েছে সে। হিয়ার চাচারা ভাইকে হারিয়ে হিয়াকে নিজেদের সন্তানের মতো দেখেছেন। কিন্তু হিয়া কখনোই ভুলে যায়নি তার বাবা নেই। কখনোই এমন কোনও কাজ করেনি যাতে লোকে বলবে, বাপ হারা মেয়ে আর কত ভালো হবে। চঞ্চল হলেও হিয়া সবসময়ই ছিলো ভদ্র। কেউই ওকে মন্দ বলতে পারবে না। যেরকম মেয়ের চেহারা, সেরকম মেয়ের আচরণ।
তার জীবনের প্রথম ও শেষ ভুল ছিলো বোধহয় রাজের সাথে সম্পর্কে জড়ানো। যদিও হিয়া প্রথমে চায়নি, রাজের মতো একটা বেয়ারা ছেলের সাথে কোনও ধরনের সম্পর্কে জড়াতে। টিজ করার জন্য হিয়া কলেজের সমস্ত স্টুডেন্টের সামনে রাজকে মেরেও ছিলো। কিন্তু কোথা থেকে যে কি হয়ে গেল হিয়া জানে না। রাজ ওর পেছনে ঘুরেছে প্রায় একবছরের মতো। নিজেকে সম্পুর্নরূপে পাল্টে ফেলেছিলো রাজ। আসলে হিয়া তখন বুঝতে পারেনি, সাপ খোলস পাল্টালেও তার বিষ ঠিকই থেকে যায়।
সারাদিনের ধকল ক্লান্তিতে এসব ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে গেল হিয়া।
—–
পরদিন সকালে বৌভাতের অনুষ্ঠান। হিয়া ও তুবার ঘুম থেকে উঠতে উঠতেই বেজে গেল নয়টা। তুবা আগে উঠেছে। সে উঠে ফ্রেশ-ট্রেশ হয়ে বাইরে গেল। তারপর উঠলো হিয়া। মাথাটা ভার হয়ে আছে তার। চোখদুটোও লাল হয়ে আছে। নিশ্চয়ই ঘুম হয়নি রাতে। অবশ্য তাকে দেখতে খারাপ লাগছে না। বরং ভালোই লাগছে। এখন একটু কফি না খেতে পারলে হিয়া বোধহয় মরেই যাবে। সে ম্যাজমেজে শরীর নিয়ে উঠলো হিয়া। অনেক সময় নিয়ে ফ্রেশ হলো সে। অফ হোয়াইট কালারের একটা জামা পরলো সে। সুন্দর করে পরিপাটি হয়ে তবেই বের হলো রুম থেকে।
ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখলো তেমন কেউ নেই। কয়েকজন গেস্ট ছাড়া৷ হিয়া এদের কাউকেই চেনে না। সে খুঁজতে লাগলো তুবাকে। মেয়েটা কোথায় গেল কে জানে। হিয়ার ভাবনার মাঝেই একজন মধ্যবয়সী মহিলা এসে উপস্থিত হলো ওর সম্মুখে। মিষ্টি হেঁসে তিনি বললেন,
“এখন উঠলে? এসো এসে তোমার জন্যই তো অপেক্ষা করছিলাম।”
হিয়া অপ্রস্তুত হয়ে গেল। সে তো চেনে না কাউকেই৷ হিয়া হালকা হাসার চেষ্টা করে বলল,
“ইয়ে?”
ভদ্রমহিলা এবার বিস্তর হেঁসে উঠলেন। বললেন,
“আমি তোমার দুলভাইয়ের মা। তুমি তো এখনো খাওনি মা। এইজন্যই অপেক্ষা করছিলাম।”
হিয়া নাফির মায়ের সঙ্গে ডাইনিংরুমে গেল। সেখানে সকালের নাস্তা করলো সে। রুহি ও রাজ নাকি এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি। নয়তো বোনের শশুরবাড়ি এসে বোনকে ছাড়া খাওয়া, ব্যাপারটা ভালো দেখায় না।
হিয়া খাওয়ার মাঝখানে জেনে নিলো তুবা ছাঁদে আছে৷ লজ্জার খাতিরে তার আর কফি খাওয়া হলো না। তাই খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে সে ছাঁদের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
চঞ্চল হরিণীর মতো দৌড়ে যেতে লাগলো সে। আর সেখানেই বাঁধলো বিপত্তি৷ সামনে যে কখন জুনায়েদ (নাফি) এসেছে সে খেয়ালই করেনি। হিয়া দৌড়াতে দৌড়াতে আচমকা ধাক্কা খেলো জুনায়েদের শক্তপোক্ত বুকে। ধাক্কা খেয়ে সে পরেই যেতে নিচ্ছিলো, তার আগেই জুনায়েদ হিয়ার হাত টেনে ধরলো। হিয়া দুর্ঘটনাবশত আবারও গিয়ে পরলো জুনায়েদের বুকের উপর।
চলবে?
ছোট করে দেওয়ার জন্য দুঃখীত৷ লিখতে লিখতে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। একটু আগে উঠে,আবারও লিখলাম। ভুলত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন। আর গল্পটি বেশি বেশি শেয়ার করে দিবেন আপনাদের বন্ধুমহলে।

