গল্প : #লুকোচুরি_রোদ্দুর_ও_তুমি (৫)
লেখনীতে : #অহনা_রহমান
“চোখ কি অন্ধ নাকি? দেখতে পান না? আশ্চর্য!”
তখনও হিয়া নাফির বুকের সাথে লেপ্টে আছে৷ নাফি হিয়াকে সরিয়ে দিলো নিজের কাছ থেকে। হিয়ার মুখের সামনে আঙুল তুলে বলল,
“তোমার দেখার দরকার ছিলো, কে আসছে না কে যাচ্ছে। চোখ কপালে রেখে, পাখা বিহীন উড়াউড়ি করলে তো ধাক্কা খাবেই।”
“কি আমি চোখ কপালে রেখে উড়াউড়ি করি? আপনি তো চোখ বন্ধ করে হাঁটাহাটি করছেন। নিজে আগে চোখ খুলে দেখুন, দুনিয়া কোনদিকে যাচ্ছে। কি আশ্চর্য!”
নাফি আবারও আঙুল বাড়িয়ে দিলো হিয়ার দিকে। কিছু বলার আগে হিয়া বলল,
“আর শুনুন, কথায় কথায় এমন আঙুল তুলবেন না। মনেহয় আপনার একারই আঙুল রয়েছে, আর কারো নাই। ঢং!”
কথাটুকু বলে হিয়া দৌড়ে পালালো ছাঁদের দিকে। নাফি তাজ্জব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তাকিয়ে থাকলো মানুষরূপি একটা ডানাবিহীন পরীর দিকে। হঠাৎ নিচে থেকে নাফিকে ডেকে উঠলেন নাসিমা (নাফির মা)।
“এই বড়ছেলে খাবি না?”
নাফি মায়ের দিকে একবার তাকিয়ে আবারও তাকালো হিয়ার যাওয়ার দিকে। একপলক সেদিকে তাকিয়ে নিচে নেমে এলো সে।
ডাইনিং টেবিলে বসলো সকালের নাস্তার জন্য। অনেকক্ষণ বসে থাকার পরও কেউ খারাপ নিয়ে এলো না। এতে বিরক্ত হলো নাফি। সে জোরে চেঁচিয়ে বলল,
“আম্মুউউ খাবার কই?”
নাসিমা একটা প্লেটে দুইটা শুকনো রুটি আর সামান্য একটু ভাজি এনে সামনে রাখলো নাফির। নাফি এতে অবাক হয়ে তাকালো মায়ের দিকে। আশেপাশে যদিও এখন কেউ নেই। মেহমানরা ছাঁদে আড্ডা দিচ্ছে আর কেউ কেউ ঘুমাচ্ছে। নাফি চাপা গলায় বলল,
“আম্মু এসব কি? তুমি জানো না, আমি খায় না এসব?”
নাসিমা একবার এদিক ওদিক তাকিয়ে নিলেন। সতর্কতার সঙ্গে বললেন,
“এটাই খেতে হবে। আজ থেকে অনুশীলন কর।”
“আশ্চর্য আম্মু আমি এসব কেন খাবো? তুমি জানোনা আমি সকালে এইসব খায় না। আমার পরোটা নিয়ে এসো।”
“এহহহ শখ কতো! তোর লজ্জা করে না, মাকে অর্ডার করিস?”
“মা এখানে অর্ডার করার কি আছে? আজ হঠাৎ কি হলো তোমার?”
“তোর লজ্জা থাকা উচিৎ! বড়ভাই হয়ে ছোট ভাইয়ের বিবাহ দেখছিস। বউয়ের রান্না খাওয়ার বয়সে মায়ের রান্না খাচ্ছিস, আবার হুকুমও করছিস? ছিঃ!”
নাফি বোকা বনে গেল মায়ের কথা শুনে। সে এতদিন ঢাকায় ছিলো। এখন সে বিয়ে-শাদির মধ্যে জড়াতে চাইছে না। এটাতো তার মা ভালো করেই জানে, তাহলে এখন আবার কি হলো? নাফি বিরক্ত কন্ঠে বলল,
“আম্মু এসব কি কথা বলছো তুমি?”
” ঠিকই তো বলছি। কোথাও দেখেছিস বড় ভাইয়ের আগে ছোটভাই বিয়ে করে?”
“না দেখিনি এইবার দেখবে সবাই। যাও আমার খাবার নিয়ে এসো।”
নাসিমা একটা ন্যাকা কান্না টাইপ কেঁদে বললেন,
“হায় খোদা! সারাজীবন এদের সংসারে খেটেখুটে এই বয়সে একটু শান্তি করবো, সেটাও আমার কপালে নেই।”
নাফি রাগে আর বসলোই না সেখানে। সে উঠে চলে গেল সদর দরজার দিকে। নাসিমার মন তবুও গললো না। সে মৃদু চেঁচিয়ে বললেন,
“যা যা, যেখানে খুশি সেখানে যা। বিয়েতে রাজি না হওয়া পর্যন্ত তোর খাবার বন্ধ।”
নাসিমা জানেন এতে কোনও কাজ হবে না। কেননা তার বড় ছেলে এখন আর ছোট নেই। যে খাবারের ভয় দেখালেই তার কথা শুনবে। যদি তাই হতো, তাহলে গত দুই বছর ধরে, তিনি ওকে বিয়ের কথা বলে যাচ্ছেন। কিন্তু ও কোনমতেই বিয়ে করবে না এখন। তার নিজের বাড়ি হয়েছে, গাড়ি হয়েছে, ভালো একটা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে তবুও নাকি ওনার প্রতিষ্ঠিত হওয়া বাকি আছে। প্রতিষ্ঠিত না হয়ে তিনি বিবাহ করবেন না। বাধ্য হয়েই, নাসিমা রাজকে বিয়ে দেন। এতে নাফিরও একটু লজ্জা হবে আর তারও একজন সঙ্গী হবে। কিন্তু রাজের বিয়ে হওয়ার পরও মনেহয় তেমন কোন লাভ হয়নি। নাফির মন মানসিকতার তো কোনরকমই পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন না নাসিমা। এখন দেখা যাক কি হয়! পাত্রি তো তার দেখায় আছে। শুধু নাফি রাজি হলেই মিলে গেল।
—-
হিয়া ছাঁদে গিয়ে দেখলো তুবা, তাসরিকসহ রাজের আরও কিছু বন্ধুরা আড্ডা দিচ্ছে। রাজের সকল বন্ধু-ই হিয়াকে চেনে। ওদেরকে এখানে দেখে হিয়া কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পরলো। সে ঝামেলা চাইছে না কোনো। আগে ঠান্ডা মাথায় ভাবতে হবে, তারপর প্রতিশোধ নেওয়ার কথা ভাবতে হবে। এখনই সবকিছু হয়ে গেলে তো মজাই শেষ। হিয়া ঘুরে চলে যেতে নিলো। ঠিক তখনই ডাকলো তুবা।
“এই উঠেছিস? চলে যাচ্ছিস কেন? আয় এখানে আয়।”
তুবার সাথেসাথে তাসরিকও ডাকলো।
“ও বেয়ান, আরে ও বেয়ান? চলে কেন যাচ্ছেন? আসুন না একটু সুখ দুঃখের গল্প করি।”
রাজের বন্ধুরা সকলে হিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। ওরা সবাই ভেবেছিল হিয়া বোধহয় কেঁদে কেটে চোখমুখ ফুলিয়ে ফেলবে। অথচ এখন দেখছে, হিয়া সুন্দর করে সেজেগুজে, সোনো-পাওডার, লিপিসটিক(লিপস্টিক) পরে আছে। আর মেয়েটাকে সুন্দরও লাগছে ভিষণ। জিহাদও সেখানে উপস্থিত আছে৷ হিয়াকে এখানে এভাবে দেখে সবচেয়ে বেশি জিহাদই ঝটকা খেয়েছে। ও সবচেয়ে ভালো জানতো, রাজ ও হিয়ার রিলেশনের বিষয়আশয়। ওর যতটুকু ধারণা, হিয়াকে সম্পুর্ন রূপে পটাতে রাজের দের বছরের মতো সময় লেগেছে। আর হিয়া তো মনেহয় লাস্ট একবছর ওদের সম্পর্কে সিরিয়াস হয়েছে। তবে হিয়াকে ওই সময়ে দেখলে মনে হতো, হিয়া বোধহয় রাজের উপর নির্ভরশীল হয়ে গেছে। রাজ ছাড়া ও বাঁচবেই না। অথচ, ওরই কাজিনের সাথে বিয়ে হলো রাজের তারপরও মেয়েটা কতটা শক্ত।
হিয়া শুনলো তুবার কথা। সে পালিয়ে যাওয়ার মতো মেয়ে নয়। এখান থেকে পালিয়ে গেলে ওরা ভাববে, হিয়া হেরে গিশে পালিয়ে গেছে। না… হিয়া তা হতে দেবে না। সে প্রত্যেকটা বিশ্বাসঘাতককে দেখে নেবে। শোধ সে তুলবেই তুলবে।
হিয়া গিয়ে বসলো তুবার পাশের চেয়ারে। বিভিন্ন মজা আনন্দ করতে লাগলো ওরা৷ তুবা হঠাৎই গান গেয়ে উঠলো,
“এই যে বেয়াইশাব ভাব নিয়েন না
এতোগুলো বেয়াইন থাকতে দেইখাও দেখেন না।”
তুবার গান শুনে সকলে হো হো করে উঠলো। তাসরিক নামের শ্যামবর্ণের ছেলেটা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তুবার দিকে। তুবার গান শেষ হওয়ার পরই সে, বুকে হাত দিয়ে, জিহাদের কোলের উপরে পরলো। তুবা লজ্জা পেয়ে মুচকি হাসলো। তখন তাসরিক উঠে বসলো নিজ চেয়ারে। নাটকীয় কন্ঠে বলল,
“কিসের সাবিনা ইয়াসমিন, কিসের রুনা লায়লা? আমার কাছে তো আমার বেয়াইনশাব-ই সেরা। বেয়াইন আপনার কিছু গান রেকর্ড করে দিয়েন তো।”
তুবা বলল,
“কেন?”
“আসলে বউ-টউ নাই তো। রাতে ঘুম আসে না। আপনার এইগান শুনলে নিশ্চিত আমার তিনদিনের আগে ঘুম ভাঙবে না।”
——
দুপুরের দিকে হিয়াদের বাড়ি থেকে মেহমান এলো রাজদের বাড়িতে। আজকে বউভাতের অনুষ্ঠান তাই। হিয়ার মা হেলেনা ও এলেন। তারা এসেছেন প্রায় আধঘন্টা হয়েছে। কিন্তু হিয়াকে তিনি দেখতে পাচ্ছেন না। কোথাও খুঁজে পাচ্ছেন না হিয়াকে। যদিও তিনি খুঁজেননি ভালোকরে। তিনি তো এসেই রুহির রুমে ঢুকেছেন। আর বের হননি। তিনি রুহির সাথে কথা বলছিলেন। এমন সময় হিয়া এসে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো হেলেনাকে। হেলেবার চোখ দুটো ও ধরলো সে। হেলেনা বুঝলেন তার মেয়ে এসেছে। তিনি আদুরে কন্ঠে বললেন,
“আমার মায়ের স্পর্শতেই তো বুঝতে পারি সে এসেছে। কেমন আছে আমার সোনা?”
হিয়া খুশি মনে মায়ের প্রশ্নের উত্তর দিতেই যাবে তার আগে চোখ গেল রুহির দিকে। ঠোঁট-মুখ বেঁকে কেমন বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। হিয়াকে তাকাতে দেখেই সাথে সাথে মুখের ভাবমূর্তি পরিবর্তন করে ফেললো সে। মুখে হাসি হাসি ভাব এনে তাকালো ওদের দিকে। আস্তে আস্তে রুহির আসল রূপ প্রকাশ পাচ্ছে হিয়ার নিকট। আজ রুহির যেই রুপটা দেখেছে এটাই ওর আসল চেহারা৷ শুধুমাত্র মানুষের নিকট দেখানোর জন্যই মুখোশ পরে থাকে সে। হিয়া যদি এসব আগে বুঝতো, তাহলে হয়তো তার জীবনে এমন বিপর্যয় কখনোই নেমে আসতো না। কিন্তু আফসোস হিয়া বুঝতে পারেনি।
অবশ্য আমাদের আশেপাশেই এমন অহরহ বন্ধুরূপি কালসাপ ঘুরছে। কিন্তু আমরা দেখতেই পাচ্ছি না। ওরা আমাদের ভালোমানুষির সুযোগ নিয়ে ঠকিয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন। আমরা হয়তো, অপেক্ষায় আছি প্রকৃতির বিচারের। কিন্তু প্রকৃতি কি সবসময় বিচার করে? আর করলেও কি তা আমরা দেখতে পায়? পায় না।
হিয়া সব চিন্তা বাদ দিয়ে, মায়ের কাছে গেল। হেলেনার কপালে চুমু এঁকে দিয়ে বলল,
“মিস ইউ আম্মু।”
হেলেনাও মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে বলল,
“মিস ইউ টু বাচ্চা।”
মা ও মেয়ের সুন্দর মুহুর্তে জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে রূহি। হিয়াকে নিয়ে সবার এই আদিখ্যেতাটা-ই পছন্দ নয় তার। রুহি বলল,
“তোমরা এমন করছো যেন, বিয়ে আমার না হিয়ার হয়েছে?”
হিয়া রুহির মজা নিতে বলল,
“য়াপুটি বোধহয় জেলাস।”
মেয়ের কথায় হেঁসে উঠলেন হেলেনা। তিনি রুহিকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন,
“জেলাস কেন হবে? আমার রুহি মাকে কি আমি কম ভালোবাসি?”
রুহি এবারেও খুব একটা খুশি হলো না। সে চোখমুখ কালো করেই থাকলো হেলেনার কাছে। তা দেখে হিয়া বিরবির করে বলল,
“কয়লা ধুইলে যেমন ময়লা যায় না। তেমনি কুত্তার লেজও কখনো সোজা হয়না।”
চলবে??
শব্দসংখ্যা: ১২০০+
সবাই রেসপন্স করবেন আর মন্তব্য করবেন হু?? (রিচেক কালকে করবো)🫶

