লুকোচুরি_রোদ্দুর_ও_তুমি (৬) লেখনীতে : #অহনা_রহমান

0
152

গল্প : #লুকোচুরি_রোদ্দুর_ও_তুমি (৬)
লেখনীতে : #অহনা_রহমান

বাড়ি এখন মোটামুটি ফাঁকা। বউভাত হয়ে গেছে, তাই আত্মীয় সজন সবাই চলে গেছে। এখন শুধুমাত্র হিয়া ও তুবা হচ্ছে মেহমান। আর রুহির তো এখন এটা নিজেরই বাড়ি। রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ সবার। রাত তখন প্রায় দশটা। হিয়ার রুহির সামনে থাকতে ভালো লাগছে না। তাই সে ছাঁদে এলো। পরনে তার সবুজ রঙের জামা। লম্বা চুল গুলো বিনুনি গাঁথা। যেগুলো পেছনে ঝুলছে। হিয়া ছাঁদের রেলিং ধরে আকাশের পানে তাকিয়ে আছে। আর গুনগুন করে গান গাইতে লাগলো,

“কে বাঁশী বাজায় রে…
মন কেন নাচায় রে!
আমার প্রান যে মানে না…
কিছুই ভালো লাগে না…

ওই বাঁশি কি বিষের বাঁশী…
তবু কেন ভালোবাসি!
লগ্ন ভরে আড়াল থেকে…..
দেখেছি পোড়া হাঁসি….!!”

হিয়ার গানের মধ্যেই শুনতে পেলো কারো হাতে তালির শব্দ। তবে সে সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করলো না। আপন সুরে গেয়ে গেল মিষ্টি ওই গানটি। এমনিতে মেয়েটার কন্ঠ ও দারুণ। গান বন্ধ করার কোনও প্রশ্নই আসে না।

“আগে জানতাম মানুষ ছ্যাঁকা খেলে দুঃখের গান গায়। আজ প্রথম দেখছি কেউ ছ্যাঁকা খেয়ে রোমান্টিক গান গাইছে।”

হিয়া পুরুষালি কন্ঠ শুনে বুঝতে পারলো এটা রাজ। রাজের সাথে কথা বলার ইচ্ছে অথবা রুচি, দুইটার কোনটাই নেই হিয়ার। এজন্য সে রাজকে সম্পুর্ন ইগনোর করলো। রাজ এসেছে দেখে, সে অন্যদিকে ঘুরে চলে যেতে নিলো। কিন্তু তা হতে দিলো না রাজ। হিয়া চলে যাওয়ার আগেই রাজ হিয়ার হাত টেনে ধরলো। প্রথম দফায় ঘাবড়ে গেল হিয়া। কিন্তু পরক্ষণেই অন্যহাত দিয়ে ঠাস করে এক চড় বসিয়ে দিলো রাজের গালে। ব্যাপারটা খুবই দ্রুত ঘটেছে। না হিয়া চড় মারার জন্য প্রস্তুত ছিলো, না রাজ চড় খাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলো। কিন্তু কাজ যেহেতু ঘটেই গিয়েছে, তাহলে আর কি করার! হিয়ার চড়ে ক্ষেপে গেল রাজ। সে হিয়ার হাত টেনে ধরলো। এক ঝটকায় নিজের সামনে নিয়ে এলো। এরপর ও হঠাৎ করেই আক্রমণ করে বসলো হিয়াকে। রাজ হিয়ার গলা চেপে ধরলো। অগ্নি চক্ষু নিয়ে বলল,

“তোর তেজ এখনো মরেনি তাই না?? এতো বড় শক খাওয়ার পর তুই বেঁচে আছিস কিভাবে? বলতেই হয়, কৈ মাছের প্রান তোর।”

হিয়া রাজের থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য আপ্রান চেষ্টা করলো। কিন্তু শক্ত হাতের কাছে পেরে উঠলো না সে। এইজন্য খানিকটা থুতু মেরে দিলো রাজের মুখের উপর। এটাও অপ্রত্যাশিত ছিলো রাজের কাছে।
হিয়ার এমন কাছে রাজ ছেড়ে দিলো হিয়াকে। তবে নিজের একহাত দিয়ে হিয়ার একহাত সে শক্ত করে ধরে রাখলো। আর অন্যহাত দিয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে নিজের মুখটা পরিষ্কার করে নিলো। যা দেখে হিয়া তাচ্ছিল্য হেঁসে বলল,

“কোনও লাভ নেই ধুয়েমুছে। কয়লা ধুইলে কখনো ময়লা যায়না।”

রাজ আবারও হিয়াকে মারতে নিলো। কিন্তু এবারে আর তা হতে দিলো না হিয়া। রাজ কিছু করার আগেই ও শক্ত কন্ঠে বলল,

“খবরদার! ভুলেও এইকাজ করার সাহস দেখাবি না। তোর লজ্জা করছে না, নিচে বউ রেখে এখানে অন্য একটা মেয়ের হাত ধরে বসে আছিস?”

রাজ হিয়ার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলো। হিয়াকে ব্যাথা দেওয়ার জন্যই ধরেছে। তবে হিয়া ব্যাথা পেলেও চেপে গেলো। দাঁতে দাঁত চেপে, একদম স্বাভাবিক ভাবে তাকিয়ে রইলো রাজের দিকে। যেন ওর কিছুই হচ্ছে না। রাজ যখন দেখলো, হিয়াকে ব্যাথা দিয়ে কোন কাজ হচ্ছে না। তখন ও পাগলের মতো করতো লাগলো।

“শুধুমাত্র তোকে কষ্ট দেবো বলেই, আমি আমার জীবনের তিন বছর নষ্ট করলাম। তুই এতো শান্ত কিভাবে আছিস হিয়া?? তোর এই শান্তি আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারছে। মনে আছে তোর? ভরা ক্যাম্পাসে তুই আমাকে মেরেছিলি? আমি সেদিনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, তোকে কষ্ট দিয়ে, তোর জীবন জাহান্নামে পরিনত করবো আমি। জিহাদদের সাথে বাজিও ধরলাম তোকে নিয়ে। ঠিক করলাম তোর সাথে প্রেমের অভিনয় করে, তোকে ধোঁকা দেবো। আর সেটা করতে গিয়েই আমার তিনটা বছর লেগেছে হিয়া। আমি তো বাজিতে জিতে গেছি হিয়া। কিন্তু তুই? তুই তো একদম ঠিক আছিস। তোকে তো কষ্ট দেওয়া হলো না। কিভাবে? হ্যা কিভাবে? বল কিভাবেএএএ ঠিক আছিস তুই?”

হিয়া রাজের উত্তরে কিছুই বললো না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল শুধু। এটা সত্যিই সে গত একবছরে রাজের প্রতি কিছুটা দুর্বল হয়েছে। মানে রাজকে ভালোবেসেছে আরকি! আর সে তো রক্ত মাংসের মানুষই। তাই হিয়ারও কষ্ট হলো। ভিষন কষ্ট পেলো সে। মনটা ভেঙে খানখান হয়ে গেল। শুধুমাত্র প্রতিশোধ নিতে, আর বাজিতে জিততে তার সাথে এমন খেলা খেললো? মানুষ এমনও হয়? হিয়ার চোখ দিয়ে একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পরলো। রাজ দেখার আগে তা মুছেও ফেললো হিয়া। নাহ, এই কাপুরুষের সামনে কিছুতেই কান্না করা যাবে না। তার ভালো থাকাই হচ্ছে ওদেরকে হারানোর সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

হিয়া শক্ত কন্ঠে বলল,

“শুনেছিস কখনো শকুনের দোয়াতে গরু মরতে? তো সেরকমই, তোরা যা খুশি কর আমাকে ভাঙা অতটা সোজা নয়। আর শুনে রাখ, আমি কষ্ট না পেলেও প্রতিশোধ তো আমি নেবোই। সেটার জন্য প্রস্তুত থাক আপাতত।”

রাজ হেঁসে উড়িয়ে দিলো হিয়ার কথা। বলল,

“উলে বাবা! আমি ভয় পাইছি, ভয়ে মু*তে দিয়েছি। হিয়াপু রেগে গেছে প্রতিছোদ নেবে। আল্লা কুতাই পালাবো?”

কিছুক্ষণ এরকম ঠাট্টা করে, পরক্ষণেই রাজ চোখমুখ কঠিন করে ফেললো। হিয়ার দিকে আঙুল তুলে বলল,

“তোকে আমি প্রানে না মারলেও, এমন ভাবে মারবো যাতে তুই নিজেই মরে যাস।”

হিয়াও পাল্টা জবাব দিলো,

“কি করবি তুই? তুই আর তোর বউ আমার চুলটাও ছিঁড়তে পারবি না। তাছাড়া তোর সাথে আমার এতো গভীরে সম্পর্ক হয়নি যে তুই চলে গেছিস তাই মরে যাবো।”

“হিয়া আই সয়্যার যেভাবেই হোক তোর এই দেমাগ আমি ভেঙে ফেলবো। আই সয়্যার!”

হিয়া তাচ্ছিল্য হেঁসে বলল,

“আচ্ছা তোর সব কথা বিশ্বাস করবো। তুই শুধু একটা কাজ কর।”

রাজ অবাক হলো।

“কি কাজ?”

” মুখ খোলা রেখে আব্বা ডাক। আই মিন গাল হা করে আব্বা ডাক।”

রাজ কিছু বলতে যাবে তার আগেই ওর ফোনে কল এলো। এজন্য আপাততঃ ও হিয়াকে ছেড়ে ফোনের দিকে মনোযোগ দিলো। ইম্পর্ট্যান্ট হওয়ায় রাজ হিয়ার দিকে একবার তাকিয়ে চলে গেলো নিচের দিকে। রাজ চলে যেতেই হিয়া যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। তবে সবকিছুর জন্য ওর বেশ খারাপই লাগলো। ওদের ধোঁকা দেওয়ায় জন্য কি আর কেউ ছিলো না? বেছে বেছে ওকেই ঠকাতে হলো। হিয়ার আখিঁদ্বয় ভিজে এলো। তবে উপরওয়ালার কাছে তার লাখোবার শুকরিয়া। রাজের মতো কাপুরুষ তার জীবন থেকে আগে ভাগেই বিদায় হয়েছে।

কিছুক্ষণ পর হিয়াও প্রস্থান করলো সেখান থেকে। রাজ বা হিয়া কেউই খেয়াল করলো না, ওদের কথা কেউ একজন সম্পুর্ণ শুনেছে।

——

বিরক্তি আর রাগ নিয়ে হিয়ার কেটে গেল আরও একদিন। আজকে ওদের ফেরার পালা। সকাল আটটা বাজে। হিয়া আজকে সবার আগে উঠলো। মেয়েটা এমনিতে ভারি লক্ষি! সে উঠে একটু হাঁটাহাঁটি করছিলো। কিন্তু যখন দেখলো নাফির মা একা হাতে রান্নাবান্না করছে। তখন সে এগিয়ে গেল রান্নাঘরের দিকে।

“আন্টি আসবো?”

নাসিমা হিয়াকে দেখে অবাক হলেন। মিষ্টি হেঁসে বললেন,

“তুমি এখানে কেন আম্মু?”

“এই তো একা একা ভালো লাগছে না, তাই ভাবলাম আপনাকে একটু হেল্প করি।”

হিয়ার এমন কথাতে নাসিমা বেশ ইমপ্রেস হলেন। তিনি হিয়ার গাল টেনে দিয়ে বললেন,

“লক্ষি মেয়ে একটা! আমাকে হেল্প করা লাগবে না, তুমি বসো এখানে।”

নাসিমা তখন মাংস রান্না করছেন। সব কাজের বুয়া করে দিলেও রান্না টা তিনিই করেন। এখনও সেটাই করছিলেন। তবে হিয়ার ওইটুকু কথায় তিনি ভিষন খুশি হয়েছেন এটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। হিয়া নাসিমার কথা শুনে পাশেই একটা চেয়ারে বসলো।

“আন্টি আপনিও চলুন না আমাদের সাথে। আমাদের বাড়িতে।”

“তুমি বলেছো আর আমি যাবো না তাই হয় নাকি? তবে আজকে যেতে পারবো না মা। খুব শীঘ্রই যাবো। আর তোমাকে আমার বাড়িতে আনার বন্দোবস্ত করে আসবো।”

শেষের কথাটুকু তিনি আস্তে আস্তে বললেন। যা হিয়ার কান পর্যন্ত এলো না।

চলবে??

শব্দসংখ্যা : ১১০০+

ঘুম আসছে খুব। একচোখ বন্ধ রেখে আর একচোখ দিয়ে লিখেছি। কি লিখেছি জানি না। বানানও হয়তো ভুল আছে। কাল ঠিক করে নিবো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here