মৌনপ্রেম #অয়ন্তিকা_রাফিয়াত_ঐশী পর্বঃ ৩৪(ক)

0
30

#মৌনপ্রেম
#অয়ন্তিকা_রাফিয়াত_ঐশী
পর্বঃ ৩৪(ক)
(অনুমতি ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)
📌“গল্পের এই অংশে যে ঘটনাগুলি তুলে ধরা হয়েছে তা কেবল কাল্পনিক ও কাহিনিচালিত। চরিত্রগুলি বাস্তব ব্যক্তির প্রতিরূপ নয়। তাই যেকোনো পরিস্থিতি পাঠকদের বিবেচনার অনুরোধ রইলো।”

——————————————

সময়টা সকাল ছয়টার ঘর পার করেছে। অন্তিক ঘুমুঘুমু চোখ খুলে। রুমে সূর্যের আলো প্রবেশ করছে। বুকটা হাল্কা হাল্কা লাগলে বুঝতে পারে প্রাণেশা নেই। ওকে আবার কাছে টেনে নেওয়ার জন্য বা পাশটা হাতরে দেখে। কিন্তু পাশে হাত দিয়ে কাউকে পায় না। অন্তিক বিরক্ত হয়। উঠে গেল মেয়েটা? আজকে আরেকটু ঘুমাতে পারতো। শরীর দূর্বল লাগবে। সবসময় ভোরে উঠতে হবে কথা আছে? অন্তিক বিরক্ত হয়ে চোখ খুলে দেখে ওয়াশরুমে আছে নাকি। না, দরজা খোলা। ব্যাল্কনিতে থাকবে ভেবে “প্রাণো” বলে ডেকে উঠে। সাড়া না পেয়ে ঘুমুঘুমু গলার স্বরটা আরেকটু উচিয়ে বলে,

“প্রাণো, কোথায় তুমি? এত তাড়াতাড়ি উঠে গেলে কেন? আসো আরেকটু ঘুমাবে। সিক লাগবে নাহয়।”

প্রাণেশার উত্তর না পেয়ে সে আরও দুইবার ডাকে। কিন্তু সাড়া না পেয়ে নিচে চলে গিয়েছে ভেবে আরও বিরক্ত হয়। কাল অল্প সময়ের আদর নিয়েই কেমন নেতিয়ে গিয়েছিল, আজকে এত তাড়াতাড়ি উঠে যেতে হবে কেন? আশ্চর্য!

অন্তিক না চাইতেও উঠে পড়ে বিছানা থেকে। মেয়েটা কি করছে দেখতে হবে। কাল উন্মাদ হয়ে ভালোবেসেছিল, কেমন হুশহীন ছিল পুরোটা সময়। প্রাণেশা প্রস্তুত ছিল না বলে হঠাৎ তাকে ওভাবে নিতে পারেনি। অন্তিক তো ধারণা করেছিল, মেয়েটা আজ সারাটা দিন বিছানায় কাটাবে। বিছানা থেকে উঠার শক্তিটুকু অবশিষ্ট থাকবেনা ওর মধ্যে। আর মেয়েটা কিনা ভোরবেলা উঠে নিচে চলে গিয়েছে……

অন্তিক চিন্তিত বদনে উঠে গায়ে টি শার্ট জড়ায়। পায়ে স্লিপার পরে নিচে নামে। সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে সারা ড্রয়িং রুমে চোখ বোলায়। কেউ নেই। বাবা কাল অসুস্থ বোধ করছিল। তাই ঘুমাতে সমস্যা হয়েছে। মাও বাবাকে অসুস্থ দেখে ঘুমাতে পারেন নি নিশ্চয়। এজন্য কাউকে দেখা যাচ্ছেনা কোথাও। ড্রয়িং রুমে না পেয়ে রান্নাঘরে যায়। না, ওখানেও নেই। প্রতিদিন সকালে দাদির কাছে গিয়ে এক কাপ চা দিয়ে আসে প্রাণেশা, অন্তিক তা জানে। তাই দাদির রুমে গিয়ে দেখে, ওখানেও নেই। দাদি ভোরবেলা উঠে নামাজ পরে আবার ঘুমান। এখনো ঘুমাচ্ছে। সেখানে না পেয়ে মায়ের রুমের সামনে গেলে ওখানে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখা যায়।

এবার অন্তিক একটু চিন্তিত হয়। মেয়েটা গেল কোথায়? কাল ওর কথা না শুনে আদর করেছিল বলে রাগ করেছে নাকি? কিন্তু রাগ করে যাবে কোথায়।

এসব ভেবে প্রাণেশা আগে যে রুমে থাকতো সেখানে যায় অন্তিক। প্রাণেশা ওখানেও নেই। তারপর একে একে বোনেদের রুমগুলো দেখে। প্রত্যেকে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। এখনো উঠেনি কেউ। ছাদ, বাগান, বাড়ির অন্যান্য পাশগুলো -সব জায়গায় দেখে নিয়ে কোথাও পায়না সে প্রাণেশাকে। কোথায় গেল মেয়েটা? অন্তিক ভাবে রেগে গিয়ে কোথায় যাবে? বাইরে হাঁটতে গেল কি? কিন্তু কাল যা হলো, মেয়েটার মাথা পাগল হলেই আজকে ভোরবেলা হাঁটতে বের হবে। তবে তা যদি না হয়, যাবে কোথায়?

অন্তিক আরও একবার ঠাণ্ডা মাথায় সারা বাড়ি খুজে দেখে। এবার অস্থির লাগছে তার। কিছুটা ভয়ও লাগছে। মেয়েটা কাল রাতের জন্য এতোটা রাগ করেছে, যে নিজেকে আড়াল করে নিয়েছে কোথাও? নাকি কাল বিকেলের কথাগুলোর জন্য এখনো ক্ষমা করতে পারেনি? এ পর্যায়ে অন্তিক কিছুটা ঘাবড়ে যায়। কালকের করা আচরণের জন্য যদি ক্ষমা না করে থাকে, তাহলে তো রাতের বিষয়টা খুব জগন্য একটা ব্যাপার হয়ে দাড়াবে।

সে বাড়ির বাইরেও আনাচে কানাচে খুঁজে দেখে। কোথাও না পেয়ে আবার বাড়ির ভেতর এসে ইশি, দিথীর রুমে নক করে দরজা খুলতে বলে। ওরা খুললে সে কোন কথা না বলে নিজেই ঢুকে দেখে প্রাণেশা কোথাও ওদের কাছে আছে কি না। কিন্তু তাদের কারো রুমে পায়না।

ততক্ষণে অন্তিকের মা-চাচিও রুম থেকে বেরিয়ে আসে, বাইরে ছেলে মেয়েদের আওয়াজ শুনে। এরা আজ এত তাড়াতাড়ি উঠল ভেবে অবাক হয়। মেয়েগুলোকে প্রত্যেকদিন তিন/চারবার করে ডাকতে হয়। এরা কিনা আজ এত সকাল সকাল উঠে গেল? ছেলেগুলোর গলাও শুনা যাচ্ছে। উনারা বের হয়ে অন্তিক-দিথী-দিগন্ত এমনকি মাহাদ-অয়ন্তিকেও ইশির রুমের সামনে দেখেন। ইশি নিজেও বাইরে দাড়িয়ে আছে। ভাই হঠাৎ সকাল সকাল তাদের দরজা খুলতে বলে ভেতরে কি যেন দেখছিল। ওরা কি খুজঁছে জানতে চাইলে প্রাণেশাকে দেখেছে কি না জিজ্ঞেস করে। তারা “না” বলে কি হয়েছে জানতে চাইলে অন্তিক ওকে সারা বাড়ির কোথাও খুঁজে পাচ্ছেনা তা জানায়। মা-চাচীও আসতে আসতে ছেলের কথা শুনে ঘাবড়ে যান। খুঁজে পাচ্ছেনা মানে? কোথায় যাবে?

আস্তে আস্তে বাড়ির সবাই বের হয়ে আসে। প্রাণেশাকে খুজে পাচ্ছেনা শুনে হতবাক হয়ে অন্তিককে কিছু জিজ্ঞেস করবে, তার আগে সে কিছু ভেবে অস্থির ভঙ্গিতে নিজের রুমের দিকে পা বাড়ায়। বাকিরাও যায় পিছু পিছু। অন্তিক রুমে গিয়ে আলমারি খুলে প্রাণেশার জামা কাপড় দেখে। আছে সব। ওকে জামাকাপড় দেখতে দেখে মা বলেন,

“কি হয়েছে অন্তিক? মেয়েটা কোথায়? সকাল সকাল কি শুরু করলি? জামা কাপড় দেখছিস কেন তুই?”

অন্তিক মায়ের প্রশ্ন শুনে উনার দিকে তাকায়। তাকে কেমন অস্থির আর চিন্তিত দেখাচ্ছে। মায়ের দিকে ফিরে সে জিজ্ঞেস করে,

“মা, কোথায় গেল ও?”

“সেটা তো আমি জানতে চাচ্ছি? কোথায়? আর কি হয়েছে? প্রাণেশা তো ভোরবেলা উঠে বাইরে কোথাও যায়না। চা বানায়, বাগানে যায় – এটুকুই। আজকে কি হয়েছে?”

“বাড়িতে কোথাও নেই ও।”

ছেলের ঠিকঠাক উত্তর না পেয়ে অন্তিকের বাবা মি. মাহমুদ ভারী স্বরে বলেন,

“বাড়িতে কোথাও নেই সেটা আমরা সবাই দেখতে পাচ্ছি অন্তিক। তোমার মা বাড়িতে না থাকলে কোথায় যাবে সেটাই জানতে চাচ্ছে।”

মিসেস আয়েশা আমিন অন্তিকের বাহু ধরে শক্ত মুখে জানতে চান,

“কি করেছিস আবার তুই? সেদিন তো সব ঠিকঠাক হলো। মেয়েটাও খুশি ছিল। এর মধ্যে আবার কি করলি? জামা কাপড় দেখছিস কেন? ও কি বাড়ি ছেড়ে যাবে নাকি?”

অন্তিক বাবা মায়ের কথা শুনে চিন্তিত মুখে। কিন্তু কোন উত্তর না দিয়ে আবার আলমারির একটা ড্রয়ার খুলে। যেখানে প্রাণেশার সেদিন মামা বাড়ি থেকে আনা কিছু জিনিস রাখা ছিল। অন্তিক জানেনা ওখানে কি ছিল। তাকে দেখাবে বললেও সময়ের অভাবে তা হয়ে উঠেনি। কিন্তু এই ড্রয়ারেই ওর সেসব মূল্যবান জিনিস ছিল। অন্তিক খুলে দেখে ওখানে কিছু নেই।

তা দেখে এতক্ষণের অস্থির ভাবটা মুহূর্তেই গায়েব হয়ে যায়। অন্তিকের হাবভাব বাকিরা কিছু ধরতে পারছেনা। সবার চিন্তিত মুখ দেখে দিগন্ত ঠাণ্ডা স্বরে বলে,

“ভাই, কি হয়েছে বলো। এভাবে সবাইকে টেনশনে রেখে তো লাভ নেই। বড় মা, বড় বাবা সবাই চিন্তা করছে। আর ভাবি যদি কোথাও হারিয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে তো খুঁজতে হবে, তাইনা? একটু খুলে বলো আমাদের প্লিজ। সবাই চিন্তা করছে।”

“হারিয়ে যায়নি।” অন্তিক ভীষণ শান্ত স্বরে বলে।

“হারিয়ে না গেলে কোথায় প্রাণেশা?” মা

“চলে গিয়েছে।”

“মানে?”

“মানে ও চলে গিয়েছে মা।”

“চলে যাবে কেন? আর কোথায় যাবে? খুলে বল অন্তিক।” বাবা

“বলতে হবেনা কিছু আর। আপনার ছেলে হাবভাবে বোঝায় যাচ্ছে আবার মেয়েটার সাথে বাজে ব্যবহার করেছে। এজন্য মেয়েটা কোথাও চলে গিয়েছে হয়তো দেখুন। নাহলে এভাবে উধাও হওয়ার তো কারণ দেখছিনা।” মা

অন্তিক হঠাৎ উঠে নিচে চলে যায়। বাকিরাও নামে।

অন্তিক নিচে গিয়ে সিকিউরিটি গার্ডের কাছে প্রাণেশাকে যেতে দেখেছে কিনা জানতে চায়। কিন্তু গার্ড মাত্রই এসেছে। তার আগে নাইট ডিউটিতে যে ছিল সে মাত্র বাড়ি চলে গিয়েছে। তাই না সূচক জবাব দেয়। অন্তিকের বাবা বলেন যেন নাইট শিফটের গার্ডকে কল দিয়ে বিরক্ত না করে এখন। সময় নষ্ট হবে। এর চেয়ে সিসিটিভি ফুটেজ চেক করলে ভালো হবে। উনার কথায় সকলে সম্মতি জানায়। অন্তিক সিকিউরিটি রুমে গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখতে পায় প্রাণেশা ছোট্ট একটা ব্যাগ নিয়ে ভোর পাঁচটার দিকে বেরিয়ে গিয়েছে বাড়ি থেকে। গার্ড তখন বসে বসে ঝিমুচ্ছিল। বুঝতেও পারেনি।

ফুটেজ দেখে সবার কাছে সব পরিস্কার হয়। কিন্তু প্রাণেশা চলে হঠাৎ চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল কেন সেটাই অজানা। মিসেস আয়েশা আমিন কাঁদছেন বসে বসে।

ছোটবেলায় থেকে এই ছেলেকে নিয়ে সবচেয়ে নিশ্চিন্তে ছিলেন তিনি। গর্ব করতেন সবসময়। কোনোদিন কোনো অভিযোগ আসেনি। না বন্ধুবান্ধবদের সাথে খেলাধুলায় মা রা মা রির অভিযোগ, না স্কুল-কলেজ থেকে পড়ালেখা নিয়ে কিংবা দুষ্টুমি নিয়ে অভিযোগ। যেখানে গিয়েছে সেখানে নিজের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে, শান্তভাবে যেকোনো পরিস্থিতি সামলানো এই ছেলের বা হাতের কাজ যেন। মানুষকে সহজে ম্যানিপুলেট করে নিজের মতো চালাতে উস্তাদ। আর এই ঠাণ্ডা মাথার সবচেয়ে বোঝদার ছেলেটা আজ এই বয়সে এসে নিজের সবচেয়ে উদ্দতপনার পরিচয় দিচ্ছে। বারে বারে নিজের বউকে অসম্মান, অপমান করছে। না জানি আজকে কি করেছে যে মেয়েটা বাড়ি ছেড়ে চলে গেল।

এসব ভেবে মিসেস আয়েশা আমিনের আফসোস হচ্ছে। তিনি কিছুটা রেগে সবার উদ্দেশ্যে বলেন,

“এখন সবাই এখানে বসে থাকবে? নাকি মেয়েটাকে কেউ খুঁজতে যাবে?”

অন্তিক ততক্ষণে কাউকে ফোন করছে। মায়ের কথা শুনে একপলক তাকায়। তবে কিছু বলেনা।

সে কয়েকজনকে প্রাণেশার মামা বাড়ির ওখানে পাঠিয়েছে প্রাণেশা ওখানে গিয়েছে কি না তা জানতে। তবে যদি না গিয়ে থাকে তাহলে ওর মামা বাড়ির কেউ যাতে ব্যাপারটা বুঝতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে বলে।

খবর আসতে অন্তত আধ ঘণ্টা তো লাগবে। কিন্তু অন্তিকের মন বলছে প্রাণেশা ওখানে যাবেনা। তাই সে গাড়ি নিয়ে কোথাও বের হয়ে যায় । দিগন্ত আর মাহাদ ও খুঁজতে বের হয়। ওরা নিজেদের মতো চারদিকে খুঁজতে থাকে। অন্তিক গিয়ে প্রথমে তাদের বাড়ির রাস্তা থেকে প্রাণেশার মামা বাড়ির রাস্তাটা একবার চক্কর দেয়। তারপর ওকে না পেলে আশেপাশের সব জায়গায় খুঁজে দেখে। অন্তিক প্রথমে প্রাণেশাকে না পেয়ে অস্থির ছিল। তারপর ও চলে গিয়েছে বুঝতে পেরে কেমন একটা শান্ত হয়ে যায়।

মেয়েটা কাল ওকে ক্ষমা করেনি তা স্পষ্ট। অন্তিকের ভুল। কাল ইরফানের থেকে জেনেছে ক্যাফের ছেলেটা ওর বোনের স্যার হয়। এরপর ক্ষমা চেয়ে নেওয়া উচিত ছিল।

কিন্তু তখন কাজের চাপে মাথা ঠিক ছিল না। যা মুখে এসেছে বলে দিয়েছে। অন্তিকের এ পর্যায়ে কেমন পাগল পাগল লাগে নিজেকে।

প্রাণেশাকে ভালো খারাপ কিছু বললে সে তো উত্তর দিতে পারেনা। অন্তিককে কড়া গলায় জবাব দিতে পারেনা। তাই কি অবচেতন মন ওর উপর রাগ ঝাড়লে আর কি হবে এমনটা ভেবে নিয়েছিল? হবে হয়তো… না হলে আগে তো কখনো এমন স্বভাব ছিল না তার।

নিজের ভুল বুঝতে পারার পর অন্তত প্রাণেশার রাগটা ভাঙানো দরকার ছিল। অন্তিকের সেটাও তখন মাথায় আসেনি। প্রাণেশার আগে পিছে কেউ নেই বলে কি ট্যাকেন ফর গ্র্যান্টেড হিসেবে নিয়ে নিয়েছিল? নাহলে ওর রাগ ভাঙ্গানোটা যে দরকার সে কথা মাথায় আসলোনা কেন? আর সেসব গেল। কিন্তু রাতে যা হলো? খুব বিচ্ছিরি একটা ব্যাপার হয়ে দাড়াচ্ছে এখন। প্রাণেশা বার বার ওকে বারণ করেছিল। কিন্তু সে শুনেনি। এখানেও ওর সম্মতিটা জরুরী একথা ভুলে গিয়েছিল।

অন্তিক “শিট” বলে গাড়ির স্টিয়ারিং এ একটা বারি দেয়। এত আফসোস ৩১ বছরের জীবনে তার আগে কখনো হয়নি। না জানি মেয়েটা অভিমান করে কোথায় চলে গিয়েছে। যতটুকু বুঝতে পারছে মামা বাড়িতে যাবেনা। কারণ ওখানে গেলে অন্তিকের কাছে আবার ওকে ফিরিয়ে আনা কঠিন কিছু হবে না। তাহলে গেল কোথায়?

অন্তিক অস্থির হয়ে উঠে। কোথায় খুঁজবে এই মেয়েকে? কোথায় চলে গেল? কালকের পর শারীরিক অবস্থাও ভালো থাকার কথা নয়। রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পরে থাকেনি তো কোথাও? উফ!! পাগল পাগল লাগছে অন্তিকের।

দিগন্তকে ফোন দিয়ে জানায় যেন আশেপাশের সব হস্পিটালে খোঁজ নেয়। আর মাহাদকে সে যেদিকে গিয়েছে ওদিকের মেইন স্ট্রিট থেকে অলি গলি সব দিকে খুঁজতে বলে। একা বের হয়ে গিয়েছে, খারাপ কারো হাতে পড়লে নির্দিষ্ট রাস্তাগুলোতে খুঁজে লাভ হবেনা। সব জায়গায় খুঁজতে হবে। এক ইঞ্চিও রিস্ক নেওয়া যাবেনা।

অন্তিক নিজে সে যেদিকটাই আছে ওদিকের সব অলি গলি থেকে মেইন স্ট্রিট কোনোটাই বাদ দেয় না। সব জায়গায় খুঁজে দেখে। কোথাও পায়নি। নীলয়কে দিয়ে ওর কলেজের একমাত্র বান্ধবী মেহার বাড়িতেও খোঁজ লাগায়, এমনকি ওর বোন আরশির শ্বশুর বাড়ি অব্দি বাদ রাখেনি। কোথাও নেই।

———————

হস্পিটালের করিডোরে চিন্তিত ভঙ্গিতে বসে আছে এক যুবক। বয়স ২৮/২৯ হবে। পাশে তার সমবয়সী কিংবা কিছুটা ছোট অন্য এক যুবককেও দেখা যাচ্ছে। উভয়েই চিন্তিত।

যে মেয়েটাকে নিয়ে তারা হস্পিটালে এসেছে তাকে তারা চেনেনা। আজই প্রথম দেখেছে। অথচ মেয়েটাকে আর এই যুবককে দেখলে কেউ একথা বিশ্বাস করবেনা, যে তারা একে অপরকে চেনে না। মেয়েটার চেহারা আর এই যুবকের চেহারা পুরো কার্বন কপি। যে কেউ বলবে তারা একই মায়ের পেটের ভাই-বোন। অথচ মেয়েটাকে আজই যুবকটা প্রথম দেখছে। তার তো কোনদিন কোন বোন ছিল না। তাহলে এই মেয়ে কে? বিষয়টা নিয়ে তারা খুব চিন্তিত।

“ভাই, আমার মনে হয় আপনার মেয়েটার সাথে একবার ডি.এন.এ টেস্ট করানো উচিত। ও আপনার রক্তের সম্পর্কের কেউ নয় এটা আমার বিশ্বাসই হচ্ছেনা কসম। মায়ের পেটের ভাই বোন না লাগেন, কিছু একটা তো সম্পর্ক থাকবে। একবার টেস্ট ফেস্ট করানো দরকার।”

“করাবো। আগে মেয়েটা সুস্থ হোক। জ্ঞান ফিরুক। ডাক্তার কি বলছে শুনি আগে।”

“ঐ তো, আসতেসে ডাক্তার সাহেবা।” পিয়াস নামের ছেলেটা কেবিন থেকে মহিলা ডাক্তারকে বের হতে দেখে বলে।

ড. ফাতেমা তাদের সামনে এসে বলেন,

“আপনাদের মধ্যে পেশেন্টের গার্ডিয়ান কে?”

ডাক্তারের প্রশ্নে পিয়াস প্রথম যুবকের দিকে ইশারা করে বলে,

“ভাই গার্ডিয়ান। উনাকে বলেন কি বলবেন।”

ড. ফাতেমা যুবকের দিকে তাকিয়ে তাকে নিজের কেবিনে আসতে বলেন উনার সাথে।

তিনি চেয়ারে বসে যুবককে জিজ্ঞেস করেন,

“আপনি পেশেন্টের কি হন?”

“কেউ না। গাড়ি নিয়ে পার্টি অফিস যাচ্ছিলাম। হঠাৎ সামনে এসে পড়ে। আগে থেকে অসুস্থ ছিল হয়তো। সামান্য ধাক্কায় অজ্ঞান হয়ে যায়।”

“ঠিক ধরেছেন। আগে থেকে অসুস্থ। কিন্তু মেয়েটা আপনার কেউ হয়না? আসলেই?”

যুবক চিন্তিত ভঙ্গিতে বলে,

“আমি মেয়েটাকে আজকে প্রথম দেখালাম। কিন্তু ওর চেহারা দেখে আমার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছেনা আমরা একে অপরকে চিনিনা। এটা কিভাবে সম্ভব। এত মিল। আমার আগে হারিয়ে যাওয়া কোন বোনও নেই যে এই মেয়েটা আমার বোন হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। কিন্তু কিছু একটা তো হবে। অন্য কোন রক্তের সম্পর্ক থাকবে হয়তো। আমি আপাদত কিছু বুঝতে পারছিনা। আমাকে পরিবারের সাথে আলোচনা করতে হবে। আপনি প্লিজ ওর এখন কি অবস্থা জানান”

“উম, বিষয়টা বেশ জটিল। কিন্তু এখন আমি যা বলবো তাতে পুরো ব্যাপারটা আরো বেশি ক্রিটিকাল হতে যাচ্ছে।”

যুবক মনোযোগ দিয়ে তাকায়। সে জানতে ইচ্ছুক কি হয়েছে।

“শুনুন মি. ফারদিন। আপনাদের মধ্যে আদৌ কোন রক্তের সম্পর্ক আছে কি নেই সেসব পরের ব্যাপার। আপাদত বিষয়টা অন্য পর্যায়ের জটিলতায় আছে। মেয়েটা শাারীরিক ভাবে ভীষণ দূর্বল, তাই অজ্ঞান হয়েছে। এক্সিডেন্টে তেমন ক্ষয় ক্ষতি হয়নি।” তারপর একবার গাঢ় দৃষ্টিতে সাহিলের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করেন,

“ওর শরীরে কিছু অযাচিত এবং তাজা চিহ্ন দেখে আমরা ওকে বিবাহিত কিনা জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে তখন কিছুটা হুশে ছিল, মুখে কিছু না বললেও মাথা নাড়িয়ে না বুঝিয়েছে। তারপর কিছু টেস্ট করিয়ে যা বুঝলাম। সামওয়ান হ্যাস বিন ইন্টিমেট উইথ হার উইদিন দা লাস্ট টোয়েন্টিফোর আওয়ার্স। এখন মেয়েটা যদি বিবাহিতা না হয় তাহলে ব্যাপারটা কি দাড়াচ্ছে আই থিংক বুঝতে পারছেন। আমি প্রথমে আপনাকে ওর বাড়ির কেউ ভেবেছিলাম। কিন্তু সেটা যেহেতু নয়। আমাদের কাউকেই ওর সাথে এ বিষয়ে কথা বলতে হবে।”

সাহিল ফারদিন মনোযোগ দিয়ে সবটা শুনে। ওর রক্তের সম্পর্কের কেউ হবে তা সে নিশ্চিত। তাই ডক্টরের কাছে এ ধরণের কথা শুনে ধাক্কা খায় সে। যদি ওর কেউ হয়ে থাকে। তাহলে প্রথম পরিবারের কাউকে পেলো মেয়েটা, অথচ এমন বাজে একটা ঘটনার মুখোমুখি হয়ে। মেয়েটা ওর কিছু একটা হবে তা সে ধরেই নিয়েছে। তাই আপন কারো সাথে এসব হলো ভেবে তার চোয়াল শক্ত হয়।

“ওকে সরাসরি জিজ্ঞেস করুন কিভাবে হলো। আর কে করেছে। নাম, চেহারা কিছু মনে আছে কি না জিজ্ঞেস করুন, তবে ফোর্স করবেন না। বলতে চাইলে বলবে, নাহলে এখন জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। আর পুলিশকে ইনফর্ম করবেন না। আমি দেখব ব্যাপারটা। আপনারা আগে আমার সাথে ওর ডি.এন.এ টেস্ট করান। দ্রুত…”

ডক্টর ডি.এন.এ টেস্ট করিয়েছে। ২৫% ডিএনএ মিলে। তার মানে মা অথবা বাবা কেউ একজন একই। কিন্তু বাবা, মা একসাথে একই নয়। সাহিল তার বাড়িতে ফোন দিয়ে বিষয়টা জানায়। তারা আসছে।
এর মধ্যে ডক্টর জানায়, মেয়েটা এসব নিয়ে মুখ খুলছেনা। কোনোরকম সেক্সুয়াল অ্যা স ল্টে র শিকার হয়েছে কিনা জানতে চাইলে সোজা না বলছে। সাহিল আপাদত এ বিষয়টা কাউকে জানায়না। ডক্টরকেও মানা করে। সব কিছু গোলেমেলে লাগছে তার। মেয়েটা হঠাৎ তার গাড়ির সামনে এসে পড়লো। অজ্ঞান হলো। তার মধ্যে কনফিউশন ঢুকিয়ে দিল। এখন জানল তারা ভাই বোন। মানে কি?
আবার অ্যা স ল্টে ড হয়েও অস্বীকার করছে। ভয় পেয়ে কি? হয়তো…এ ব্যাপারে পরে ওর সাথে কথা বলতে হবে। আগে একটু সুস্থ হয়ে স্থির হোক, ভয় কাটলে, তাদের উপর বিশ্বাস আসলে – তারপর এ ব্যাপারটা দেখা যাবে। এখন মেন্টাল সাপোর্ট দরকার সবচেয়ে বেশি।

সাহিলের বাবা, দাদি, ফুফি আর চাচা আসেন হস্পিটালে। সাহিল ঘটনা সংক্ষিপ্তভাবে তাদের জানিয়েছে। তারা সবাই এসে কেবিনে গিয়ে প্রাণেশাকে দেখে। মেয়েটা তখন ঘুম। উনারা সবাই ধারণা করতে পারেন, প্রাণেশা কে হতে পারে। এর মধ্যে নার্স প্রাণেশার কাছে যে ব্যাগ ছিল তাতে কিছু ছবি পেয়েছিল জানালে সাহিল সেসব হাতে নিয়ে দেখে। তার ছোটবেলার একটা ছবি আছে, আর মামনির ছবি।

সাহিল এসব দেখে পাথর বনে যায়। সে বাবার দিকে তাকিয়ে দেখে বাবাও মেয়েটার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। বাকিরাও সাহিলের ছোটবেলার ছবি আর আলিজা আহমেদের ছবি দেখে যা বুঝার বুঝে যায়। অবশ্য ওর চেহারা দেখেই কিছুটা ধারণা করেছিল। সাহিলের সাথে চেহারা মিললেও, চোখ দুটো হুবহু আলিজা আহমেদের মতো।

চলবে………
(আমি পর্বটা একদিন পর আরো বড় করে দিতে চেয়েছিলাম। কারণ আজ বাড়িতে আমার বোন এসেছে শ্বশুর বাড়ি থেকে। তাই একটুও লিখতে পারিনি। এই যে, সন্ধ্যা ৭ টা থেকে টানা লিখে মাত্র শেষ করলাম। তাও বড় করে কাল দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু গতকালের পর্ব পড়ে সবাই অধৈর্য হয়ে গিয়েছেন দেখতে পাচ্ছি। তাই কোনভাবে এত টুকু দিয়ে দিলাম। আপনাদের রেস্পন্স কাম্য। এই পর্বের পরের পার্ট আপনাদের রেস্পন্সের উপর ভিত্তি করে দেব। কারণ যথাযথ মূল্যায়ন না পেলে, এতগুলো দিন পর আমার বোন-ভাগিনা-ভাগিনিকে কাছে পেয়েও তাদের সময় না দিয়ে আপনাদের রেগুলার গল্প দেওয়ার তো মানে হয়না, রাইট?)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here