আমার উপমা তুমি (২২) আফরোজা আঁখি

0
25

আমার উপমা তুমি (২২)
আফরোজা আঁখি

বিছানায় শুয়ে আছে কাশফিয়া। ওকে ঘিরে রেখেছেন বাড়ির সবাই। হুট করে ওর শরীর খারাপ কেন হলো বুঝে আসছে না কারোরই। ডাক্তার ডাকতে গেলে বারবার মানা করছে কাশফিয়া। সবাইকে বুঝিয়েছে, ওর কিছুই হয়নি।সবার সাথে কথা বলা শেষে কাশফিয়া ঘাড় কাত করে তাকিয়েছে সোফায় বসে থাকা ইয়াশের দিকে। ওর চোখ মুখে চিন্তার চাপ স্পষ্ট, কাশফিয়ার এমন অবস্থা দেখেই হয়তো চিন্তা হচ্ছে। সুফিয়া বেগম লক্ষ্য করলেন বিষয়টা।এক এক করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন সবাই। ইয়াশ এসে বসল কাশফিয়ার পাশে, ওর হাত টেনে চুমু দিল বেশ কয়েকটা। কাশফিয়া মুচকি হেসে বলল ইয়াশকে,

“আমি ঠিক আছি।”

“সত্যি তো?”

“হুম।”

“কাল আমরা ফিরছি।”

দ্রুত উঠে বসল কাশফিয়া, বলল ইয়াশকে,
“কোথায়?”

“যেখানে ছিলাম এতদিন।”

“আরো কিছুদিন থাকি। আমার যেতে ইচ্ছে করছে না।”

কথা শুনল না ইয়াশ। নানা বাহানা দিয়ে বলল কাশফিয়াকে, কালই তাদের ফিরে যেতে হবে। গাল ফুলিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল কাশফিয়া, বারবার ডাকলেও শুনল না ইয়াশের কথা। ইয়াশ জানে, কী করলে ওর উপমার এই রাগ গলে পানি হয়ে যাবে! তাই আর জোরাজোরি না করে চলে গেল রুম থেকে বেরিয়ে।

__________________

সময়টা সন্ধ্যা, মাত্রই রুমে ঢুকল ইয়াশ। কাশফিয়া বিছানায় পড়ে ঘুমোচ্ছে বেঘোরে। ইয়াশ আর বিরক্ত করল না ওকে। হাতে থাকা শপিং ব্যাগটা বিছানার এক পাশে রেখে আবারও দ্রুত পায়ে হেঁটে বেরিয়ে গেল রুম থেকে।
নিচে নামবে বলেই যাচ্ছিল ইয়াশ, চোখ গেল রোহির রুমের দিকে। দরজাটা আধখোলা দেখে ইচ্ছে হলো ভিতরে ঢুকবে। দেরি করল না ইয়াশ, দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করল সে। পুরো রুমে চোখ বুলালো একবার, দেয়ালে টাঙানো রোহির ছবিটার দিকে চোখ গেল তখন। আস্তে আস্তে হেঁটে সামনে গিয়ে দাঁড়ালো, ভালো করে দেখল ছবিটা। ছবিটা যেখানে টাঙানো, তার থেকে খানিকটা দূরে কলমের কালি দিয়ে লেখা,—-“আমি কনের সাজে সাজতে চাই ইয়াশ। লাল টুকটুকে শাড়ি পড়ে তোমার বউ হতে চাই আমি। আমাকে বউ বানাবে?” কিছুটা পিছিয়ে গেল ইয়াশ। গলাটা কেমন শুকিয়ে আসল ওর। এই লেখাগুলো নিশ্চয়ই অনেক আগের? ইসস, আজ খুব খারাপ লাগছে ইয়াশের। রোহি কেন করল এমন? ইয়াশের থেকে পারফেক্ট কেউ হয়তো ওর জন্য অপেক্ষা করছিল! কেন ওকে বাঁচাতে নিজেই বিদায় নিল পৃথিবী থেকে? ইয়াশের যে কষ্ট হয় আজও, বারবার রোহির মুখটা ভেসে ওঠে চোখের সামনে।নিজেকে অপরাধী মনে হয় ওর। ইয়াশ মিস করে সেই ছোট্ট রোহিকে, বারবার ওর রুমের সামনে এসে উঁকিঝুঁকি মারত রোহি। বড়সড় ধমক দিলেই আবার কান্না করে ভাসাত। ইয়াশ যখন লন্ডন চলে যায়, রোহি ব্যতীত কারোরই হয়তো মন খারাপ হয়নি তখন। মেয়েটার কান্না দেখে প্রথমবারের মতো ওর জন্য মায়া হয়েছিল ইয়াশের। মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল, ও ফিরে আসবে আবার। রোহির চোখ মুখে তখন খুশির ঝিলিক দেখেছিল সে৷ ইয়াশ বাড়ি আসার পর যখন দেখা হলো ওদের, তখনও রোহির চাহনিতে ইয়াশের প্রতি অদ্ভুত এক মায়া ছিল। ইয়াশ কি আর জানত, মেয়েটা তখনও নিজের মন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসত ইয়াশকে! জানলেই বা কী করত? এই ব্যাপারে যে ও বরাবরই কঠোর, নিজের ভালোবাসা উপমা ব্যতীত আর কাউকেই দেবে না সে। ইয়াশ কথাগুলো ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দেয়ালে টাঙানো রোহির ছবিটায় হাত ছুঁইয়ে বলল,

“আমি তোমাকে ভুলিনি রোহি। মনে রেখেছি! রাখব আজীবন।”

তখনই কানে আসল উজ্জ্বলের ডাক, ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল ইয়াশ। চোখের চশমাটা ঠেলে উজ্জ্বল বলল ইয়াশের উদ্দেশে,

“ছাদে যাবে ইয়াশ?”

“কেন?”

“অনেকদিন হলো আড্ডা দিই না আমরা। কাল তো চলেই যাবে, চলো আজ জমিয়ে আড্ডা দিই!”

ইয়াশ মুচকি হেসে সম্মতি জানাল উজ্জ্বলের কথায়। রোহির রুমের দরজাটা আটকে চলে গেল দুজন মিলে ছাদে।
কৌশিক আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল ইয়াশদের আসার জন্য। তবে ইয়াশ ওকে দেখে খুব একটা খুশি হয়নি, মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে তা। উজ্জ্বল দুজনকে একসাথে করেছে ওদের মধ্যে বনিবনা করিয়ে দিতেই। পাশাপাশি চেয়ারে বসে আছে ইয়াশ আর কৌশিক, মাঝখানে উজ্জ্বল। পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে জায়গাটাতে,নীরবতা ভেঙে প্রথম কথা বলল উজ্জ্বলই,

“তোমরা না ভালো বন্ধু ছিলে? বন্ধুত্বের সম্পর্কে এতো তিক্ততার কারণ কী জানতে পারি?”

ইয়াশ কথা বলল না, ভাবলেশহীন ভাবে বসে রইল আগের মতোই। তবে কৌশিক কথা বলল। মেজাজ দেখিয়ে বলল সে,

“ইয়াশ ভুল করেছে। তুমি জানো, ওর নজর খারাপ? ইয়াশ আমার ছোট্ট বোনের দিকে কুনজর দিয়েছিল বহু বছর আগে। তখনই ওর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা উচিত ছিল আমার। আমি তো মজা ভেবে উড়িয়ে দিলাম ওর কথা। এত বছর পর এসে আবার বুলিয়ে ভালিয়ে বিয়ে করে বসে আছে আমার বোনকে।”

ইয়াশ ভ্রু কুঁচকে তাকাল কৌশিকের দিকে, তারপর বলল,

“বিয়ে করা ভুল? তুই তাহলে বিয়ে করেছিস কেন? কুনজর দিই আর সুনজর দিয়েছি তো আমার বউয়ের দিকে, তোর এত সমস্যা কিসের? আমার ভালোবাসাকে কুনজর ভেবে ভুল করছিস তুই কৌশিক।”

“বিয়ে করা ভুল নয়। কিন্তু তোকে তো আমি পাঠিয়েছিলাম আমার বোনের খবর নেওয়ার জন্য, ওকে দেখে রাখার জন্য। বুলিয়ে ভালিয়ে বিয়ে করার জন্য নয়!”

“তোর বোনের ভাগ্য ভালো, আমার মতো বর পেয়েছে। আর দেখেশুনে রাখার একমাত্র উপায়ই হলো বিয়ে করা! আমি আবার লয়াল। বিয়ে সাদি ছাড়া কারো দায়িত্ব নেব কেন? তাই সোজা বিয়ে করে বউ বানালাম। এখন খালি জুনিয়রের মুখে আব্বু ডাক শোনা বাকি।”

“অসভ্যতামোর একটা সীমা থাকে ইয়াশ!”

“কি আজব! বিয়ে করেছি, বাবা হব না?”

চুপ রইল কৌশিক। ওর রাগের কারণ হলো, সেদিন ইয়াশের ওমন উগ্র আচরণ। বাইরের লোকেদের সামনে ওকে ছোট করেছে ইয়াশ। না জেনে না বুঝে কাশফিয়াকেও কথা শুনিয়েছে ওরা। এইজন্যই এতটা ক্ষেপে আছে কৌশিক! কিন্তু কী আর করবে, সেই তো বোন ওর, পাগলপ্রায় ইয়াশের জন্য! চোখ মুখ শক্ত করল কৌশিক। বিড়বিড় করে বলল,

“আমার বোকা বোন এই অসভ্য ছেলের মধ্যে কি দেখে এতো পাগল হয়েছে কে জানে!”

“তুই মাথামোটা,গর্দভ জানার পরেও ইনায়া তোর মধ্যে যা দেখে পাগল হয়েছে!”

কৌশিক রেগে তাকাল ইয়াশের দিকে। এই ইয়াশ মুখের উপর অপমান করে বসে সবসময়। এই জিনিসটাও অপছন্দ কৌশিকের। ইয়াশের ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বসে আছে আগের মতোই ওর কথায় কে কি ভাবল তাতে যায় আসে না কিছুই। কৌশিক কিছু বলতে নিলে থামিয়ে দিল উজ্জ্বল,বলল কৌশিকের উদ্দেশে,

“কাশফিয়া ইয়াশের কাছে ভালো আছে কৌশিক। আর ঝামেলা করো না, তুমি মেনে নাও ওদেরকে।”

কৌশিক মুখে বিরক্তি নিয়ে উত্তর দিল,
“মেনে না নিয়ে উপায় আছে!”

ইয়াশ হাসল কৌশিকের কথায়। মুখ ভেংচি কেটে উঠে চলে যেতে যেতে বলল,
“তুই মেনে না নিলেও আমার যায় আসে না। আমার যা পাওয়ার পেয়ে গেছি।”

ইয়াশ যাওয়ার পরে চলে গেলো কৌশিকও। উজ্জ্বল হাসছে আর ভাবছে মনে মনে সেদিনের কথা। মাঝখানে একবার দেশে এসেছিলো ইয়াশ, বাড়ির কেউ না জানলেও উজ্জ্বল জেনেছিল কোনোভাবে। ইয়াশের বন্ধুর স্কুলে প্রোগ্রাম ছিল, চিফ গেস্ট হিসেবে ডাকা হয়েছিল ওকে। এর সাপ্তাহ খানেক পরেই ইয়াশের লন্ডন ব্যাক করার কথা ছিল। পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছিলো ওর এখানে থেকে।
উজ্জ্বল সেদিন ইয়াশের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল স্কুলে। উজ্জ্বল যখন অফিস রুমে ইয়াশের কাছে গেলো, তখন জানালার কাছে দাঁড়িয়ে মনোযোগ দিয়ে কিছু দেখছিলো ইয়াশ। স্কুলের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল এক মেয়ে, পরনে ইয়াশের পছন্দের নীল রঙের শাড়ি। হাতে একগুচ্ছ কদম ফুল। টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছিল তখন। মেয়েটার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা হাসি, কোমর পেরিয়ে যাওয়া লম্বা কালো চুল, ডাগর ডাগর আঁখি জোড়া সবকিছুই অদ্ভুতভাবে আকর্ষণ করছিলো ইয়াশকে। বারবার ইচ্ছে করছিলো কাছে গিয়ে ছুঁয়ে দিতে মেয়েটাকে। পরে আবার নিজেই নিজেকে বকুনি দিচ্ছিলো ইয়াশ। এ কি ভাবছে সে? মেয়েটার বয়স খুব বেশি হলে পনেরো কি ষোল হবে! ইয়াশের বয়সের সাথে ১১ কি ১২ বছরের গ্যাপ তো হবেই! ইয়াশ কিনা এই মেয়েকে নিয়ে আকাশ পাতাল ভেবে যাচ্ছে? তাও প্রথম দেখাতেই! না না, ইয়াশকে এগুলো মানায় না।এই ভেবে নিজেকে মনে বকাঝকা দিল ইয়াশ।
কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে ঘুরে তাকাল ইয়াশ, দেখল উজ্জ্বল দাঁড়িয়ে আছে ওর ঠিক সামনে। স্কুল থেকে বেরিয়ে দুজনে মিলে কথা বলল অনেকক্ষণ। প্রায় সাপ্তাহখানেক পর ইয়াশ যখন ফিরে যাবে, তখন আবারও দেখা হয় মেয়েটার সাথে। কিন্তু তখন ওর সাথে ছিল কৌশিক, বুঝতে বাকি নেই ইয়াশের এই হলো কৌশিকের একমাত্র বোন যার গল্প শুনে এসেছে এতোদিন ধরে। সেদিনও ইয়াশের সাথে উজ্জ্বল ছিল। ওর ভাবুক চেহারা দেখে প্রশ্ন করল উজ্জ্বল,

“কি এতো ভাবছ শুনি?”

“বললে উত্তর দিবে কি?”

“বলেই দেখো।”

“আমার এক বন্ধু প্রেমে পড়েছে বুঝলে। কিন্তু মেয়েটার তুলনায় ওর বয়স অনেক বেশি। মেয়েটাকে ভুলতে চাইলেও পারছেনা। স্বপ্নে এসে উঁকিঝুঁকি মারছে বারবার। মনে কৌতুহল জাগছে তার সম্পর্কে জানার জন্য। আমার বন্ধুর কি করা উচিত?”

উজ্জ্বল বুঝল ইয়াশ কোনো বন্ধুর কথা বলছে না, বরং ওর নিজের কথাই বলছে। মুচকি হেসে কাঁধে হাত রেখে বলল ইয়াশকে,

“ভালোবাসা কি আর এসব বাধা মানে! তোমার বন্ধু তাকে মন থেকে ভালোবাসলে ঠিক পেয়ে যাবে। তবে অপেক্ষা করতে হবে। ধৈর্য ধরলেই না সফলতা আসবে।”

উজ্জ্বলের কথায় খুশি হলো ইয়াশ। হেসে বিদায় জানালো ওকে।
আজ আবারও উজ্জ্বলের মনে পড়ল সেদিনের কথা। বহুবার সেই অপরিচিতা সম্পর্কে শুনেছে ইয়াশের মুখে। যখন হুট করেই বিয়ে করে বাড়িতে বউ নিয়ে আসল, সেদিনই বুঝে গেছে এই মেয়েই ইয়াশের ভালোবাসা। হঠাৎ দেখা হওয়া সেই অপরিচিতা!

_______________

ইয়াশদের যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। সুফিয়া বেগম আর আনোয়ার সাহেব চুপ করেই আছেন আজ। যে কয়দিন ইয়াশ থেকেছে এখানে, বহুবার বলেছেন এবার আর ফিরে না যেতে, কিন্তু ইয়াশের এক কথা সে তার কাজ ছেড়ে এখানে পড়ে থাকতে পারবে না। কাশফিয়ারও তেমন ইচ্ছে নেই যাওয়ার, সেই সকাল থেকেই কান্না করে যাচ্ছে, যাবেনা বলে। ইয়াশ পাত্তা দেয়নি ওসবে। মমীকে কোলে নিয়ে গাড়িতে বসে আছে কাশফিয়া ইয়াশ কথা বলছে উজ্জ্বলের সাথে। বাড়ির সবার থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠতে যাবে, তখনই কানে আসল সুফিয়া বেগমের কণ্ঠস্বর,

“আবার করে আসবে?”

ঘুরে তাকাল ইয়াশ। মায়ের কথার উত্তরে বলল সে,—- “হয়তো আর আসব না।”

“আমার মৃত্যুর খবর পেলে অন্তত এসো!”

মায়ের অভিমানী কথায় বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠলো ইয়াশের। কথাটা শুনে কষ্ট পেলো হয়তো! কাল কাশফিয়ার কথায় ছুটে গিয়েছিল উনার সাথে কথা বলবে বলে, মায়ের রুমের সামনে গিয়ে ফিরে এসেছে আবার। জড়তা কাজ করছিল ওর মধ্যে।মাকে কি ওকে দূরে ঠেলে দিবে নাকি বুকে টেনে নিবেন? এসব প্রশ্নই বার বার ঘুরছিল মাথায়। তখন তো ইয়াশ ফিরে আসল, কিন্তু এখন ইচ্ছে করছে উনার সাথে কথা বলতে, সব মান অভিমানের দেয়াল ভেঙে ছোট্ট বেলার মতো জাপ্টে ধরতে ইচ্ছে করছে মাকে।ছেলের থেকে কোনো উত্তর আসবে না জানেন সুফিয়া বেগম, তাই আশাও করেননি। সবাইকে গেটের সামনে রেখেই চলে যাচ্ছিলেন উনি। দুয়েক পা বাড়াতেই কানে আসল ইয়াশের কণ্ঠস্বর,

“আম্মু।”

দ্রুত মাথা ঘুরিয়ে তাকালেন সুফিয়া বেগম। ইয়াশের মুখে কতোদিন পরে শুনলেন আম্মু ডাক! কোনো বিরক্তি নেই ওর চোখ মুখে, মায়ের প্রতি একরাশ স্নেহ আর ভালোবাসা প্রকাশ পাচ্ছে কেবল। সুফিয়া বেগম নিজেকে সামলে নিলেন, বললেন ইয়াশকে,

“কিছু বলবে?”

উপর নিচ মাথা নাড়াল ইয়াশ, যার উত্তর হ্যাঁ। সুফিয়া বেগমের চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো, মনে হচ্ছে চোখের সামনে সেই ছোট্ট ইয়াশকে দেখছেন তিনি। এগিয়ে গেলেন সুফিয়া বেগম, বললেন ইয়াশকে,

“কি বলবে বলো?”

“আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি আম্মু।”

সুফিয়া বেগমের চোখ বেয়ে দু ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল তখনই। দৌড়ে গিয়ে ইয়াশকে জড়িয়ে ধরে বললেন কান্নারত কণ্ঠে,

“আমিও তোমাকে ভালোবাসি বাবা। আমি মিস করি তোমাকে। আমার ভুল ছিলো ইয়াশ, তুমি মায়ের প্রতি আর রাগ করে থেকো না। তুমি আমার প্রতি রাগ করে থাকলে আমি মরেও শান্তি পাব না বাবা।”

কাশফিয়া ততো সময়ে নেমে এসে দাঁড়িয়েছে ইয়াশের পাশে। কিছুক্ষণ আগের মন খারাপ চলে গেছে নিমেষেই। আফিয়া আর উজ্জ্বলও দাঁড়িয়ে আছে পাশে। ইয়াশ আর সুফিয়া বেগমের সম্পর্কটা ভালো হয়েছে দেখে খুশি হয়েছে ওরাও। গাড়িতে উঠে বসল ইয়াশ আর কাশফিয়া, সবাইকে বিদায় জানিয়ে চলে গেলো নিজেদের গন্তব্যে।

____________________

ইয়াশরা লন্ডন ব্যাক করেছে আজ এক সাপ্তাহ হতে চলল। প্রতিদিনই কথা হয় বাড়ির মানুষদের সাথে। ইয়াশও কথা বলে ওর মায়ের সাথে। সবটা ঠিকঠাক হয়ে গেছে দেখে ভালোই লাগছে কাশফিয়ার।
কাশফিয়ার রেজাল্ট এসেছে বেশ অনেকদিন হলো।পড়াশোনাতে ও এতোটা ভালো না হলেও একেবারে খারাপ না। যথেষ্ট ভালো রেজাল্ট এসেছে, এখানকার যেকোনো ভালো ভার্সিটিতেই ভর্তি হওয়া যাবে। মাঝেখানে ইয়াশ কাশফিয়ার ঝগড়া ঝামেলার জন্য খেয়াল করেনি এই বিষয়টা। তবে আজ একটু নিশ্চিত হলো ইয়ানার সাথে কথা বলে কৌশিক নাকি কোনো একটা ভালো ভার্সিটিতে ভর্তি করিয়ে দিয়েছে কাশফিয়াকে। ব্যাস্ততার জন্য ভার্সিটি সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্যই নেওয়া হয়নি ইয়াশের। তবুও ভেবেছিল সবটা জেনে আজ নিয়ে যাবে কাশফিয়াকে, কিন্তু মহারানীর নাকি মন ভালো না, সে আজ বাড়িতেই থাকবে। ইয়াশও জোড় করল না আর, চলে গেলো নিজের কাজে,

__________________

মনোযোগ দিয়ে ক্লাস নিচ্ছে ইয়াশ, ও লেকচার দিচ্ছে আর স্টুডেন্টরা সবাই তাকিয়ে আছে ওর দিকে। মেহেক মেয়েটা বসেছে প্রথম বেঞ্চে, পাশেই সাইফান। মেহেকের ভীষণ রকমের মন খারাপ ছিলো আজ, ইয়াশের হাসিমাখা মুখটা দেখে ওর সব মন খারাপ উড়ে গেছে কোথায় যেন। হঠাৎই ইয়াশের কানে আসল মেয়েলী কণ্ঠস্বর। বিরক্তির ছাপ পড়ল পুরো মুখজুড়ে। কেউ ডেকে বলছে ইয়াশকে,

“মে আই কাম ইন স্যার?”

বইয়ের দিকে মুখ রেখেই উত্তর দিল ইয়াশ,

“নো। ইউ আর লেট, স্ট্যান্ড দেয়ার।”

সাইফান একবার তাকাল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে, পরে আবার ইয়াশের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে নিলে থামিয়ে দিল মেহেক। সাইফান ভাবছে মনে মনে,মেয়েটা কি এখানেই ভর্তি হয়েছে? কিন্তু দেখে তো ওকে জুনিয়র মনে হয়,এই ক্লাসে কি করছে? তবে কি ইয়াশের মনোযোগ নিজের দিকে নিবে বলেই এই কাজ করেছে? হয়তো তাই! মনে মনে এই ভেবে হাসল সাইফান—-” স্যারের কিন্তু ভাগ্য ভালো এই বয়সে এমন কম বয়সী, সুন্দরী বউ কে পায়? পরক্ষণেই আবার ভাবছে “স্যারও কিন্তু দেখতে কম সুন্দর না এমন সুন্দরী বউ পাওয়াটাই স্বাভাবিক।” মেহেকের কথায় সাইফান তো চুপ করল, কিন্তু বাকি স্টুডেন্টগুলো বিশেষ করে ছেলেগুলো তাকিয়ে ছিল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে। বিরক্ত হলো ইয়াশ, সবাইকে ধমক দিতেই, আবারও মনোযোগ দিল ক্লাসে। না চাইতেও ইয়াশের চোখ গেল মেয়েটার দিকে। চমকালো সে। ইয়াশের উপমা এখানে! এই ভার্সিটিতেই কি ভর্তি হয়েছে তবে? সব ছেড়ে ইয়াশের মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল, সবগুলো ছেলে একটু আগে ওভাবে তাকিয়ে ওর উপমাকেই দেখছিল? কথাটা ভাবনায় আসতেই রাগে মুখের ভাবভঙ্গি পরিবর্তন হয়ে গেল ইয়াশের। দ্রুত ক্লাস থেকে বেরিয়ে কাশফিয়ার হাত টেনে নিয়ে গেল একপাশে। কাশফিয়ার হাতে ব্যথা লাগায় চোখ মুখ কুঁচকে বলল সে,
“আরেহ করছেন কি?”

ইয়াশ ছাড়ল না কাশফিয়ার হাত আরও শক্ত করে ধরে বলল মেজাজ দেখিয়ে,
“কেন এসেছো এখানে?”

“পড়ব বলে। আমি পড়ব না বলায় আপনিই তো বললেন অশিক্ষিত বউয়ের সাথে সংসার করবেন না।”

“তোমাকে এতো পড়তে হবে না উপমা। কোনোদিকে না তাকিয়ে এক্ষুণি বাসায় যাবে।”

কাশফিয়ার হাসি মুখটা চুপসে গেলো মুহূর্তেই। গাল ফুলিয়ে তাকিয়ে রইলো অন্যদিকে। কাশফিয়াকে দাঁড় করিয়ে রেখে ক্লাসে গেলো ইয়াশ। মিনিট কয়েক পরে আবারও ফিরে আসল সে। ওর হাত টেনে নিয়ে গেলো নিজের অফিসে। চেয়ারে বসিয়ে রেখে চোখ মুখ শক্ত করে বলল,

“আমি ক্লাস শেষ করে ফিরে না আসা পর্যন্ত এখানেই বসে থাকবে। এক পাও যদি নাড়িয়েছো পা কেটে ফেলব বলে দিলাম।”

“এভাবে ধমকালে আমি এক্ষুণি বেরিয়ে যাব। সবসময় এভাবে বকুনি না দিয়ে চুমু টুমু ওতো দিতে পারেন! নিরামিষ লোক একটা।”

ইয়াশ প্রথমে রেগে তাকাল কাশফিয়ার দিকে। কাশফিয়া ভাবল ভুল করেছে সে। চুপ করে বসে রইলো বাধ্য মেয়ের মতো। ইয়াশ হুট করেই হেসে উঠলো কাশফিয়ার ভয়ার্ত মুখশ্রী দেখে।এগিয়ে গেলো ওর কাছে। কাশফিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই ইয়াশ ঠোঁট আঁকড়ে ধরল ওর। শত চেষ্টা করেও কাশফিয়া নিজের থেকে দূরে সরাতে পারল না ইয়াশকে। কিছুক্ষণ পর ইয়াশ ছেড়ে দিল ওকে, বড় বড় শ্বাস ফেলে ইয়াশের দিকে রেগে তাকাল কাশফিয়া। ইয়াশ ঠোঁট কামড়ে হাসল। কাশফিয়ার ঠোঁটে আবারও ছোট করে একটা চুমু দিয়ে বলল,
“এসব কি উপমা?আমার চুমুর পাওয়ার সহ্য করার ক্ষমতা নেই আবার আমাকে কাছে ডাকো!”

কাশফিয়ার ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমিতে ভরা হাসি। ইয়াশের গলা জড়িয়ে ধরে বলল ওকে,

“পুরো আপনিটাকেই তো সামলাই আমি এই চুমু আর কি?”

ইয়াশ হেসে উঠলো কাশফিয়ার কথায়। উপমা ভালোই জব্দ করতে শিখেছে ইয়াশকে। কেমন কথার জালে ফাঁসিয়ে দিল ওকে।

#চলবে…..
(০১)
পড়ুন রোমান্টিক ই-বুক “প্রাণ প্রণয়িনী”
https://link.boitoi.com.bd/4T8X

(০২)
পড়ুন রোমান্টিক ই-বই “রাগে অনুরাগে সিক্ত কাব্য”
https://link.boitoi.com.bd/GQcM

যেভাবে বইটই থেকে ই-বুক ক্রয় করবেন:

যেভাবে বইটই থেকে প্রিয়জনকে বই গিফট করবেন:


গল্প রিলেটেড সব আপডেট পেতে গ্রুপে জয়েন হোন।
https://facebook.com/groups/569604222322147

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here