তোমার_আমার_প্রেম #শেষ_পর্ব

0
28

#তোমার_আমার_প্রেম
#শেষ_পর্ব
লেখনীতে – #রুবাব_ফারহা
.
রাতের শেষভাগ চারপপাশে নিস্তব্ধতা,সবাই ঘুমিয়ে।কিন্তু ঘুম নেই চৌধুরী বাড়ির কারো চোখে।জাহিদ চৌধুরী পায়চারি করছেন অনবরত। মিনারা বেগম গুনগুনিয়ে কেঁদে যাচ্ছে।ঈশানি উচু পেটটা নিয়ে বসে আছে।শরীরে তার আমূল পরিবর্তন এসেছে।ইয়াসিন ওটি রুমের পাশে বিমূঢ় হয়ে দাড়িয়ে আছে।ইয়াসিনের বাবা – মা ও অস্থির চিত্তে বসে আছে।

ভেতরে আয়রার ডেলিভারি হচ্ছে।স্বাভাবিক প্রসব নয়, সিজারিয়ান অপারেশন।ডাক্টার আগেই বলে রেখেছিলো ব্লাড জোগাড় করে রাখতে, সিজারে অনেক রক্ষরণ হওয়ার সম্ভবনা থাকে।
কিন্তু ডেলিভারি সময় ছিলো আরো দুদিন পরে। আজ মধ্যরাতে হুট করে প্রসব বেদনায় ছটফট করে উঠে। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় তাকে।
কেবিনে নিয়ে যাওয়ার আগে ইয়াসিনের হাত ধরে অনেক কেঁদেছে। বাচ্চামো করে বলেছে –
“অ্যাই,শুনো।আমি যদি মরে যাই তবুও বিয়ে করবে না কিন্তু তুমি।আমাদের বাবু নিয়ে কাটিয়ে দেবে।কথা দেও।”

ইয়াসিনের রাগ হয়েছিলো প্রচুর।এরকম মুহূর্তে কেউ এসব কথা বলে।কিন্তু মেয়েটাকে যে সে বকতে পারে না।উল্টো কেঁদে ফেললো শোকপক্ত মানবটি। আয়রা বুকে জড়িয়ে হাউমাউ করে উঠলো।
ডাক্টার বেশি সময় দেয়নি।নিয়ে গেছে দ্রুত ভেতরে।তখন থেকে সেখানেই বসে আছে ইয়াসিন।ছেলেকে শান্তনা দিতে এগিয়ে এলেন মা। এসে তিনি নিজেই কেঁদে দিলেন।

ঈশানির গর্ভাবস্থার পাঁচমাস পেরিয়ে ছমাসে পড়েছে।পেটটা স্পষ্টভাবে উচু হয়েছে।বসে থাকতে তার যথেষ্ট অসুবিধা হচ্ছে।তারউপর গলাটাও শুকিয়ে গেছে। কিন্তু আপাতত আপুর চিন্তায় এসব কিছু উপলদ্ধি করতে পারছে না।স্থির হয়ে বসে আছে।

পাশে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে ধীরে ফিরে তাকায় ঈশানি।পানির বোতল এগিয়ে দেয়।নিজের ওড়নার আচল দিয়ে মুখমন্ডল মুছে দিয়ে জিজ্ঞেস করে –
“রক্তের ব্যবস্থা হয়েছে?”

আরহান একঢোকে সম্পূর্ণ পানি শেষ করে।তারপর ঈশানির মাথায় ঘোমটা টেনে কোমল কন্ঠে বলে –
“হ্যাঁ,ডোনার চলে এসেছে। ফর্মালিটিস্ পূরণ করছে।”

“আমার না ভীষন ভয় হচ্ছে,চিন্তাও হচ্ছে।আপু ,বাবু দুজনকে নিয়ে।”

আরহান একহাতে আগলে নেয় ঈশানিকে।তারপর বলে –
“চিন্তা করো না। আয়রা ও বাবু দুজনেই সুস্থ্য থাকবে,ইন শা আল্লাহ।তুমি নিজের শরীর খারাপ করো না।”

এভাবে কেটে গেলো বেশ কিছু সময়।একসময় নিভে গেলো ওটি রুমের লাল আলোটি।সকলে ছুটে গেলো সেদিকে।শুধু ইয়াসিন যায়নি।সাহস হয়নি যেনো তার।বাচ্চা কান্নার শব্দ তার কানে আসছে।মনটা অস্থির হয়ে আছে।
ডাক্তারকে সবাই ঘিরে ধরেছে।সবাইকে থামিয়ে ডাক্টার প্রশ্ন করে –
“বাচ্চার বাবা কে?”

ইয়াসিনের মা তাকে ডেকে উঠে।ইয়াসিন মৃদু পায়ে এগিয়ে আসে।বাচ্চাটিকে এক পলক দেখেই যেন হৃদয় শান্ত হয়ে এলো, চোখ ভিজে উঠল ভালোবাসায়।
তবুও কোলে নিলো না উল্টো প্রশ্ন করলো –
“আমার স্ত্রী? ও ঠিক আছে?”

ডাক্টার হেসে জানায় –
“আপনার স্ত্রী ও বাচ্চা দুজনেই সুস্থ্য আছেন।আপনার একজন কন্যা সন্তান হয়েছে।”

ইয়াসিন চোখ বন্ধ করে “আলহামদুলিল্লাহ ” বলে।তারপর হাত বাড়িয়ে দেয়।ডাক্টার বাচ্চাটিকে দিয়ে চলে যায়।
নাজুক ছোট্ট প্রাণটাকে কোলে তুলতে ইয়াসিনের হাত কেঁপে উঠে।কাপা কাপা হাতে কোলে তুলে নেয়।বিড়বিড় করে বলে –
“আমার মা।আমার রক্ত।আমার রাজকন্যা।”

তারপর হিড়িক পরে যায় কে আগে বাচ্চাটিকে নিবে।ঈশানি তো কেঁদেই দেয়।ঠোঁট উল্টে বলে “আমাকে দেও না।আমি একটু নেই।”

সবাই হেসে দেয়।চৌধুরী বাড়ি যেনো আবার সেজে উঠেছিলো আনন্দে।ঝলমল করছিলো বাড়ির প্রতিটি মানুষের চেহারা।
.
আয়রার মেয়ে হওয়ার আজ তিনদিন। আজ তাকে হসপিটাল থেকে রিলিজ করা হবে।
মিনারা বেগমের অনেক ইচ্ছে ছিলো মেয়ে ও নাতনীকে চৌধুরী বাড়ি নিয়ে যাবেন।কিন্তু মেয়ের শ্বশুরবাড়ি থেকে মানছে না।তাদের প্রথম নাতি অবশ্যই তাদের বাড়ি যাবে। মিনারা বেগমের একটু মন খারাপ এটা নিয়ে।
জাহিদ চৌধুরী মিনারা বেগমকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছেন।বাসায় ঈশানি একা।
আরহান আয়রার সাথে গিয়েছে ওকে পৌঁছে দিতে।
.
প্রেগন্যান্সির শুরু থেকেই ঈশানির মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এই যেমন খিটখিটে হয়ে যাওয়া,কাজে অবসাদগ্রস্থ,যখন তখন মাথা ব্যথা কোমর ব্যাথা সহ নানারকম সমস্যার ভুক্তভুগী সে।
আরহান সেই সকালে বের হয়েছে হসপিটালের উদ্দেশ্যে এখনো আসেনি।এটা নিয়েও তার মেজাজ খিটখিটে লাগছে।
সে বিছানা হাতড়ে ফোনটা হাতে নিলো।পরিচিত নম্বরে ডায়াল করে অপেক্ষা করলো রিসিভ হওয়ার জন্য।দুবার রিং বাজতেই কল রিসিভ হলো।কিছু না বলে ঈশানি কেঁদে দিলো। যে – সে কান্না নয় একদম মরা কান্না জুড়ে দিয়েছে।
আরহান কিছুটা ঘাবড়ে গেলো।ব্যতিব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো –
“এ্যাই ,কি হয়েছে? কান্না করছো কেনো? পেটে ব্যাথা করছে? মা কোথায়?কান্না করে না,বউটা আমার।”

একসাথে এতগুলো প্রশ্ন শুনে ঈশানি আরো কেঁদে দিলো। আরহান কিছুই বুঝলো না।ভাবলো একবার কল কেটে দিয়ে মাকে কল দিবে কিন্তু পরমুহুর্তেই ঈশানির কান্নার কাছে হার মেনে আবার অস্থির হয়ে বললো –
“সোনা বউটা, কাদে না। কি হয়েছে বলো?তুমি এভাবে কাদলে তো আমি ড্রাইভিংয়ে মনোযোগ দিতে পারছি।”

ঈশানি হুট করেই চুপ হয়ে গেলো।তারপর ঝাঁঝালো কন্ঠে বলে উঠলো –
“আপনি ড্রাইভিং করতে করতে ফোন রিসিভ করেছেন কেনো?কয়েকমাস আগে এতবড় বিপদের মুখে থেকে ফিরে এসেছেন ভালো লাগছে না!আমাকে কষ্ট দিতে খুব ভাল্লাগে ,তাই না!”

আরহান হতভম্ব হয়ে গেলো।কিছু বলবে তার আগেই ঈশানি আবার রুক্ষ কন্ঠে ঝাড়ি দিয়ে বলে –
“এখনো কল কাটেননি কেনো?আপনি মানুষটা খুব বাজে।আপনার সাথে আমি কোথায় বলবো না।”

বলেই খট করে কল কেটে দেয়। আরহান ড্রাইভিংয়ের মনোযোগ দেয়।ঈশানি গর্ভবতী হওয়ার পর থেকে এসব নরমাল হয়ে গেছে তার।কিন্তু তবুও কিছু বলতে পারে না।তার সন্তান গর্ভে নিয়ে বেড়াচ্ছে মেয়েটা।নিজের কত শখ স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছে।
এই যেমন, প্রেগন্যান্স অবস্থায় ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে পড়ার সুযোগ হয়েছিলো।কিন্তু বাচ্চার কথা ভেবে এই শেষণ ড্রপ দেয়।এছাড়াও কত কি খেতে পারে না,কত আগের জামা পড়তে পারে না।এরকম বলা না বলা অনেক আত্মত্যাগ দিতে হয় একটা মেয়ের মা হতে গেলে।সেখানে মেয়ের সাধারণ মুড সুইং, আল্লাদ সহ্য করা পুরুষের জন্য গর্বের ও দায়িত্ব।তাইতো আরহান খুশি মনে এসব শোনে ও ঈশানিকে আগলে রাখে।

ঈশানি কল কেটে দিয়ে থম মেরে বসে রয়েছে। ফিরে গেছে আজ থেকে চার মাস আগে।যখন আরহান ছিলো হাসপাতালের বেডে আর ঈশানি খোজ পেয়েছিলো তার ভেতরের নতুন প্রাণ।

অপারেশন শেষে ডাক্টার বলে দিয়েছিলো –
“৭২ ঘণ্টার মধ্যে যদি রোগী পা নড়াচড়া অথবা পায়ে কোনো অনুভূতি অনুভব না করে তাহলে সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।”

একথা শুনে মিনারা বেগম আর একদফা কেঁদে অজ্ঞান হয়েছিলো।জাহিদ চৌধুরী মনি স্ট্রোক করেছিলো।আর ঈশানি সে যেনো পাথরে রূপান্তর হয়েছিলো।তার গর্ভে সন্তানকেও তার বিষ লাগতে শুরু করে।
আয়রা,ইয়াসিন ও অলিভিয়া সেসময়টা কিভাবে সামলাচ্ছে ,আল্লাহর কাছে শুকরিয়া।
কিন্তু আল্লাহ তায়ালা মুখ ফেরায়নি। আরহানকে কেবিনে শিফট করা হলে ৪৮ ঘণ্টা পর তার পা নড়ে ওঠে হাল্কা।তখন তার কেবিনে মাথার কাছে বসে ছিলো মিনারা বেগম।
ছেলেকে চোখ মেলে তাকাতে দেখে এবং পায়ের পাতার মুভমেন্ট দেখে সে চিল্লিয়ে স্বামীকে ডাকে।তারপর জাহিদ চৌধুরী ডাক্তারকে ডেকে আনে।ডাক্টার রিপোর্ট ও পর্যবেক্ষণ করে জানায় আরহান ঝুঁকি মুক্ত।তবে অবশ্যই দুমাস ফুল বেড রেস্টের পাশাপশি পূর্ণাঙ্গ ওষুধ সেবন চালিয়ে যেতে হবে।

ডাক্টার নির্দেশনাবলী দিয়ে চলে গেলে আরহান চোখ ঘুরিয়ে পুরো রুম দেখে।কোথাও ঈশানি নেই।সে মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে –
“ঈশানি কোথায়?”

আয়রা আনন্দে আত্মহারা হয়ে কিছু বলতে নিলেও ইয়াসিন আটকে নেয়।চোখ দিয়ে ইশারা দিল থেমে যায় সে।
মিনারা বেগম জানায় –
“ঈশানি অসুস্থ্য।স্যালাইন চলছে ওর।”

আরহান ব্যস্ত হয়ে পড়ে।ওদিকে ঈশানি ও আরহানের ব্যাপারে শুনে ব্যাকুল হয়।অবশেষে তাদের এক কেবিনে শিফট করা হয়।সকলে বেরিয়ে যায় কেবিন থেকে।

সময় যায় দুজনেই চুপ।এক সময় নিস্তব্দ ঘরে ঈশানির ফুপানোর আওয়াজ আসে। আরহান চোখ বন্ধ করে নেয়। এ মেয়েটাকে তাকে পাগল করবে।

আরহান কঠোর হওয়ার চেষ্টা করেও পারে না। হাত বাড়িয়ে দেয় সম্মুখে।ছুট্টে বুকে আঁচড়ে পরে ঈশানি।হাউমাউ করে সকল আর্জি করে। আরহান কাদতে দেয় ঈশানিকে।নীরবে মাথার উপরে হাত বুলাতে দেয়।
বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে ঈশানি থামে। আরহান তাকে বলে –
“শেষ? আরো কিছুক্ষন কান্না করে শরীরটা খারাপ করো।”

ঈশানি বুক থেকে ওঠার চেষ্টা করে। আরহান ছাড়ে না।ঈশানি এবার আরহানের কানের কাছে মুখ নেয়।তারপর ফিসফিসিয়ে বলে –
“কেউ একজন আসছে।আমরা দুজন থেকে তিনজন হচ্ছি।”

ঈশানি কথাটা বলেই ছিটকে সরে আসে। আরহান যেনো হতবাক,অবাক।এখনো ভাবছে যা শুনছে সব সত্যি কি না।অবাক হয়ে থেমে থেমে প্রশ্ন করে –
“কি বললে?আবার বলো।”

ঈশানি হাসে।কি স্নিগ্ধ সুন্দর লাগে সেই হাসি। ঠোঁটে হাসি নিয়ে লাজুক হয়ে পেটে হাত দিয়ে বলে –
“হুম।এখানে একটা ছোট্ট প্রাণ আছে।”

আরহান উঠে পড়ার চেষ্টা করে।ব্যথায় চোখ মুখ কুচকে যায়।সে ভুলেই গিয়েছিলো সে অসুস্থ।
ঈশানি ধড়ফড়িয়ে ধরে।শাসনের সুরে বলে –
“কি করছেন কি? আপনি এখনো অসুস্থ্য।উঠছেন কেনো?”

আরহান ঈশানির কোমড় জড়িয়ে ধরে। পেটে মুখ গুঁজে দুটো চুমু খায়।ঈশানি বুঝতে পারে তার কামিজের অংশ ভিজে যাচ্ছে।লোকটা কি কাদঁছে?ভেবেই কেঁপে উঠে ঈশানি।অনেকটা সময় এভাবেই যায়।ঈশানি নড়াচড়া অব্দি ও করে না।শুনতে পায় আরহানের হৃদয় নিঃসৃত বাক্য –
“জানো আমার নিজেকে আজ প্রথমবার অসহায় মনে হচ্ছে।খুব মন চাচ্ছে তোমায় কোলে নিয়ে পুরো দুনিয়া ঘুরতে।কিন্তু আমি যে এখন নিজ পায়ে দাড়াতেই অক্ষম।আমি কি ওকে বাবা হওয়ার অনুভূতি থেকে বঞ্চিত করছি,বউ?আমি কি খুব খারাপ বাবা হয়ে গেলাম?”

ঈশানির চোখে পানি চলে আসলো। সে দ্রুত আরহানের শুকনো ঠোঁটে চুমু খেলো।তারপর তার বুকে আধশোয়া হয়ে বলে –
“আপনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা হবেন।দেখবেন,বাবু আপনাকে দেখে বলবে – “আমার বাবা পৃথিবীর সেরা।”
আপনি সুস্থ হবেন,নিজ পায়ে দাঁড়াবেন আগের মতো সুস্থ সবল হলে এখনারটা পুষিয়ে নেবো।প্রতিদিন বাহির থেকে এসেই আমাদের কোলে নিতে হবে।কোনো ছড়াছড়ি নাই।”

আরহান জড়িয়ে নেয় ঈশানিকে।মেয়েটার মুখে চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দেয়। পেটে চুমু দেয়।তৃপ্তি সহকারে দেখে মেয়েটাকে।
.
রুমে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে ঈশানি অতীত থেকে ফিরে আসে। আরহানকে দেখে সে এখন সাহস পায়।তার একমাত্র বেঁচে থাকার অবলম্বন।

আরহানের গায়ে সাদা টি – শার্ট ও প্যান্ট।বাহির থেকে এসে সবার আগে সে হাত মুখ ধুয়ে দেয়।ঈশানি ও বাচ্চাকে নিয়ে সে খুব সেনসিটিভ।একরত্তি রিস্ক নিতে রাজি না।
ওদিকে ঈশানি মুখ ফুলিয়ে রয়েছে।উঠে চলে গেছে বেলকনিতে।মুখ ভার করে প্রকৃতি দেখে যাচ্ছে।

আরহান রুমে এসে দেখে ঈশানি নেই। পা বাড়ায় বেলকনিতে। ম্যাডাম ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। আরহান গিয়ে পেছনকে জড়িয়ে ধরে ঈশানিকে। সে কোনো সাড়াশব্দ করে না। আরহান জড়িয়ে ধরে ঈশানির ঘাড়ে চুমু খায়।ছটফটিয়ে উঠে ঈশানি।
এক বাচ্চার মা হতে যাচ্ছে তবুও আরহানের স্পর্শে কাবু হয় ঈশানি।নিজেকে সামলাতে পারে না।সমস্ত ভার ছেড়ে দেয় আরহানের উপর।সেও আগলে নেয়। কোলে তুলে নেয় তার প্রিয়তমাকে।
রুমে নিয়ে এসে বসিয়ে দেয় বিছানায়। তারপর বলে –
“চুলের কি অবস্থা করেছো?সারাদিন আচড়াও নি নাকি।”

ঈশানি এতক্ষণে কাবু হয় গেছে।মুখের রাগ মিলিয়ে গিয়ে সেখানে জায়গা পেয়েছে লাজুকতা।চোয়াল নামিয়েই বলে –
“আমার আঁচড়াতে কষ্ট হয় তো।”

আরহান এগিয়ে গিয়ে তেল,চিরুনি নিয়ে এলো।যত্ন করে ঈশানির মাথায় তেল দিয়ে আঁচড়াতে লাগলো।

এমন সময় কল বেজে উঠলো।স্ক্রিনে নাম দেখা যাচ্ছে “অলিভিয়া”।ঈশানি খুব খুশি হয় ,আগ্রহ নিয়ে কল রিসিভ করে শুধায় –
“আপু,কেমন আছো তুমি?”

স্ক্রিনে অলিভিয়ার হাস্যোজ্বল মুখশ্রী ভেসে উঠেছে। গায়ে জড়ানো শীতের পোশাক। সে এখন লন্ডনে বাস করছে।অলিভিয়া ঈশানির পিছনে আরহানকে দেখে খোঁচা দিয়ে বলে –
“আমার হ্যান্ডসাম বন্ধুটাকে তুমি একদম পাক্কা বউ পাগল বানিয়ে দিয়েছো।বউয়ের যত্নে বিলীন হচ্ছে বেচারা।”

ঈশানি লজ্জা পেলেও আরহান পেলো না।বরং এটা যেনো তার জন্য গর্বের বিষয়।অলিভিয়ার সাথে কুশলদী বিনিময় করে আরহান তারপর ছো মেরে ফোনটা কেড়ে নেয় ঈশানি।তারপর শুরু হয় ঈশানি আর অলিভিয়ার কথার যুদ্ধ।

গর্ভবতী হওয়ার পর ঈশানির মধ্যে যে পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি লক্ষণীয় সেটা হলো মেয়েটার মুখে কথার ফুল ফুটেছে।যাকে পাবে তাকে ধরে যে গল্প শুরু করবে আর শেষ হবার নয়।
অলিভিয়া ও সাথে তাল দেয়।তার মতে এসব “গার্লস থিং”– আরহান নাকি বুঝবে না।
.
ঈশানির গর্ভাবস্থার ৮ মাস চলছে।আল্ট্রা সোনোগ্রাফীতে বলেছে তাদের একটা ছেলে হবে।
আর ছেলেটা এতো দুষ্টু কিছুক্ষণ পর পর শুধু লাথি দিবে আর না হয় পেটের মধ্যেই ফুটবল খেলা শুরু করে।
যখন এরকমভাবে নড়েচড়ে উঠে ঈশানির জান যায় যায় অবস্থা হয়।সামনে যা থাকে খামচে ধরে।ছেলেটা পেটের মধ্যেই যা যুদ্ধু করে বেরোলে না জানি কি করবে।

আরহান এখনো ফেরেনি।ঈশানি ছোটমার ঘর থেকে মাত্রই নিজের ঘরে এলো।ফোনটা বেজে উঠলো ।স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে মিথিলার নাম।ঈশানি হাস্যোজ্বল হয়ে রিসিভ করে বলে –
“কিরে,নতুন সংসার করে আমায় ভুলে গেছিস।”

ওপাশ থেকে মিথিলার মুখ ঝামটা যেনো ফোনেই অনুভব করলো ঈশানি।তারপর মিথিলা বলে –
“আগে আগে বিয়ে করে বাচ্চার মা হয়ে যাচ্ছিস তুই আর আমাকে বলছিস আমি ভুলে গেছি।স্বার্থপর মহিলা।”

“জোচ্চোর মহিলা,তুই বিয়ে করেছিস আমাকে বলেছিস? তোর বর নিতে গেলো আর তুইও ধেই ধেই করে চলে এসেছিস।মাঝখান থেকে আমার দাওয়াতটা মিস করলাম।”

মিথিলা বোধ হয় এবার দমলো।টুপ করে চলে গেলো কল্পনায়।যখন –
বাবা বিয়ের জন্য জোর করছিলো,একপ্রকার ঘরে আটকে রেখে বিয়ে দিয়ে দেবে এমন অবস্থা। মিথিলা কোনো উপায় না পেয়ে ঘরে কেঁদে কেঁদে নিজের অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছিলো।তখনি নিচ থেকে আওয়াজ আসে চিল্লাচিল্লির।
মিথিলা ভালোভাবে খেয়াল করলে বুঝতে পারে কন্ঠটা তার ভীষন পরিচিত।তার একমাত্র ভালোবাসার মানুষের।মিথিলা দৌড়ে চলে যায় নিচে।দেখতে পায় অভ্র চিল্লিয়ে যাচ্ছে।দুজন সিকুরিটি তাকে আটকানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছে।
মিথিলা সামনে এগোতে গিয়ে আর আগায় না তার বাবাকে দেখে। ভদ্রলোক সোফায় পা তুলে বসে দেখছে অভ্রকে।তারপর একপলক মিথিলাকে দেখে শান্ত কন্ঠে বলে –
“ওকে চলে যেতে বলো।”

মিথিলা কিছু বলার আগেই অভ্র বলে উঠে –
“মিথু,তুমি কি যাবে আমার সাথে?”

মিথিলার বাবা বলে –
“যদি যাও এখনি যেতে পারো।তবে মনে রেখো আমি তোমায় তেজ্য করবো।আর যদি না যাও তবে চুপচাপ আমার পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করবে।”

মিথিলা অবাক নয়নে তাকায় বাবার দিকে।মিথিলার মা কান্না করে স্বামীকে ধমকাচ্ছেন।কিন্তু ভদ্রলোকের কঠোরতার সামনের টিকতে পারলেন না।
মিথিলা সংশয়ে দাড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ।একদিকে তার বাবা পরিবার অন্যদিকে ভালোবাসার মানুষ।কিন্তু সেদিন পরিবার হারানোর কথা একবার মাথায় আসলেও নিজের ভালোবাসাকে হারানোর ভয় একবারো মাথায় আসেনি।এক কাপড়ে বেরিয়ে যায় অভ্রের সাথে।
পিছনে ফেলে যায় মায়ের চিৎকার,হাহাকার, ছোট্ট ভাইয়ের কান্না আর নীরব বাবাকে।
পরে অবশ্য ভদ্রলোক হার্ট এ্যাটাক করেছেন।কিন্তু তবুও মিথিলার মুখ দেখেননি।

এরই মধ্যে মিথিলার বিয়ে হয়ে যায়।এখন সে দিব্যি সংসার করে যাচ্ছে বোকা সোকা সহজ সরল তার প্রেমিক পুরুষের যে এই মুহূর্তে তার স্বামী।
ইন্টার্নি করছে সে।কয়েকমাসের মধ্যেই সে হয়ে যাবে পূর্ণাঙ্গ ডাক্টার।
আশ্চর্যের বিষয় অভ্রের পরিবার তাকে খুব সহজে মেনে নিয়েছে।বাবা , মা ও বোনকে নিয়ে অভ্রের পরিবার।সেখানে মিথিলা যেনো আর একটা মেয়ে হয়ে উঠেছে।মধ্যবিত্ত পরিবারের ভালোবাসা,আনন্দ, দুঃখ কষ্ট সুখ ভাগ করে নেয়ার প্রবণতা সব কিছুতে জড়িয়ে গেছে ধনী পরিবারের মেয়েটা।

ঈশানির ডাকে কল্পনার জগৎ থেকে ফিরে আসে মিথিলা।ঠোঁটে তার প্রাপ্তির হাসি।সে বলে –
“সোনা,তুমি নিজেও লুকিয়ে বিয়ে করেছো।ভুলে গেছো?”

ঈশানি নিজে এবার থতমত খেলো।তারপর দুই বান্ধবী মেতে উঠলো নানান কথায়।যেখানে আগে ঠাঁই পেতো কলেজ বন্ধু এসব সেখানে এখন ঠাঁই পেয়েছে সংসারের বিভিন্ন গল্প।
.
রাত কয়টা বাজবে? তিনটা অথবা সাড়ে তিনটা।হঠাৎ ঈশানি আরহানের বাহু চেপে ধরে মৃদু চিৎকার করে উঠে।
আরহান ঘুম থেকে ভয় পেয়ে লাফ দিয়ে উঠে ঈশানিকে ধরে জিজ্ঞেস করে –
“বউ,এই বউ? কি হয়েছে? পেইন উঠেছে?”

ঈশানি কাঁদো কাঁদো মুখ করে ঠোঁট উল্টে বলে –
“ও কি ঘুমায় না?এতো রাতে কে জেগে থাকে?আবার ফুটবল ও খেলছে।”

আরহান হেসে ফেললো।ঈশানি মুখ ফুলিয়ে রইলো। আরহান ধীরে ধীরে ঈশানির পেটে মুখ আনলো।কামিজ সরিয়ে একটা ভেজা চুমু খেলো।তারপর ফিসফিসিয়ে বলে –
“আমার চ্যাম্প,মাকে এতো জ্বালানো যাবে না সোনা। মা,কষ্ট পাচ্ছে।তুমি তাড়াতাড়ি চলে এসো তারপর দুজন মিলে মাকে জ্বালাবো।ঠিক আছে? এটা তোমার আমার সিক্রেট মাকে বলা যাবে না।তাই এখন ভদ্র হয়ে থাকো। আর তাড়াতাড়ি বাবার কাছে চলে আসো।”

আবার চুমু খেলো।স্পষ্ট বুঝতে পারলো বাচ্চাটা আবার নড়ে উঠেছে।ঈশানি খাবলা দিয়ে আরহানের চুল টেনে ধরে।
আরহান হেসে বলে –
“দেখেছো,আমার ছেলে আমার কথা শুনেছে। আর জ্বালাবে না। আসো ঘুমাও।আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।”

ঈশানি শুয়ে পড়ে স্বামীর বাহু বন্ধনে।এখানেই তার স্বর্গীয় সুখ।একদিন হঠাৎ করেই না চাইতেই জড়িয়ে পড়েছিলো এই সম্পর্কে।কিন্তু সেই সম্পর্ক তার বেঁচে থাকার অবলম্বন।এই মানুষটা শুধু তার।তার প্রেম,তার ভালোবাসা।ঈশানি চুমু খায় আরহানের বুকে।

.

সময়টা বর্ষাকাল।সকাল থেকে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে।ডাক্তারের দেয়া তারিখ অনুসারে দু/তিনদিনের মধ্যে ঈশানির প্রসব ব্যথা উঠবে।
আরহান সকালে উঠে তৈরি হচ্ছে হসপিটালে যাওয়ার জন্য।ঈশানি ঘুম থেকে উঠে তাকিয়ে আছে।তার খুব বলতে ইচ্ছে করছে যে -“আজ না গেলে হয় না।”
কিন্তু বলছে না।মানুষটা এমনিতেই দিনের অর্ধেক সময় তার পিছনে ব্যয় করে। আর বাড়তি কষ্ট দিতে চায় না।

আরহান রেডি হয়ে ঈশানিকে চুমু দিয়ে বেরিয়ে যায়।
বেশ কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে ঈশানি ওয়াশরুমে যায়। সে দেখতে পায় তার পানি ভাঙছে।ভয় পেয়ে যায় সে,ঘাবড়ে গিয়ে পড়ে যায় সে ওয়াশরুমে।কান্না করে দেয় ব্যথায়।হঠাৎ করেই যেন ব্যথাটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।কাউকে যে ডাকবে সে উপায় নেই।ফোনটাও ঘরে।উঠে যাওয়ার মতো শক্তি পাচ্ছে না। সে কেঁদে যাচ্ছে অবিরাম।চিৎকার করছে আওয়াজ হয়তো বাহিরে যাচ্ছে না।নাহলে কেউ কেনো আসবে না।এদিকে ব্যথায় তার শরীর টানটান করছে।

এমন সময় ময়নার আওয়াজ পাওয়া গেলো।ঈশানি চিল্লিয়ে উঠে বললো –
“ময়না আপু,আমি ওয়াশরুমে।আমাকে বের করো।প্রচণ্ড ব্যাথা করছে।”

ময়না দরজা ঠেলে দেখে ঈশানি মেঝেতে পড়ে আছে।এক চিৎকার দিয়ে উঠে সে –
“ও খালাম্মা ও খালু,জলদি আহেন।আপামনি পইড়া গেছে।”

দৌড়ে আসে মিনারা বেগম ও জাহিদ চৌধুরী।ঈশানিকে তুলে বিছানায় শোয়ায়।
জাহিদ চৌধুরী ফোন লাগায় আরহানকে। সে বেশিদূর যায়নি।অর্ধেক পথ গিয়েছিলো সবে।ঈশানির খবর শুনে ব্যস্ত হয় ফিরে আসে।
এদিকে ঈশানি ব্যথা পুরো বাড়ি মাথায় নিয়েছে।তার চিৎকারে মিনারা বেগম ও কান্না করে দিয়েছে।বারবার শান্তনা দিচ্ছে –
“আরেকটু সহ্য কর মা।এখনি আরহান আসলো।”

ঈশানির কানে কিছু যাচ্ছে না।কেঁদে যাচ্ছে।চিৎকার করে যাচ্ছে।

আরহান হন্তদন্ত হয়ে ঢোকে রুমে।ঈশানিকে পাজকলে করে নিয়ে যায় গাড়িতে।বাহিরে বৃষ্টির প্রভাব কমেনি।তার মধ্যে ঈশানিকে নিয়ে বেড়িয়ে যায় চৌধুরী বাড়ির সকলে। বাদ যায়নি ময়না ও।
.
ঈশানিকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
বাহিরে উৎকণ্ঠায় দাঁড়িয়ে সবাই।
ছয় মাসের বাবু কোলে নিয়ে আয়রাও এসেছে,
সবার চোখে এক গভীর চিন্তার ছায়া।

আরহান—যে মানুষটা কখনো আবেগে ভাসেনি,
আজ সে দাঁড়িয়ে আছে ব্যাকুল চিত্তে,
চোখ দুটো যেন নির্বাক, মুখ শূন্য।

হঠাৎ করেই বেরিয়ে এলো এক নার্স।
হাতে তার ফুটফুটে এক নবজাতক,
মুখে থেমে থেমে কান্নার কণ্ঠস্বর।

নার্সটি প্রশ্ন করলো—
“বাচ্চার বাবা কে?”

আরহান ধীর পায়ে এগিয়ে এসে
কাঁপা হাতে তুলে নিলো শিশুটিকে,
বুকে জড়িয়ে বিড়বিড় করে বলে—
“আমার আব্বা… আমার সন্তান।”

তার চোখ জলে ভরে ওঠে।
গভীর মমতায় দেখছে সেই দুধে-ফেনা মুখ।

এরপর প্রশ্ন করে ডাক্তারকে—
“আমার স্ত্রী? সে কেমন আছে?”

ডাক্তার একটুখানি হাসি হেসে বললেন—
শী ইজ আউট অফ ডেঞ্জার নাউ।”

আরহানের মুখে একটুকরো স্বস্তির আলো।
চারপাশে হইচই পড়ে যায় শিশুটিকে ঘিরে।
সবাই তাকে আদরে ঘিরে ধরে।

এত মানুষ দেখে শিশুটি থেমে যায় কাঁদা।
তার গোল গোল চোখে যেন বিস্ময়ের আলো,
সে চুপটি করে তাকিয়ে থাকে
জন্মের পর প্রথম দেখা এই পৃথিবীর দিকে।

.
ঈশানি সকাল থেকে রান্নাঘরে ব্যস্ত।
হরেক রকম পদ রাঁধছে সে—মিষ্টি, বিরিয়ানি, কাবাব, পায়েস… হাত যেন খুন্তির সাথে তাল মিলিয়ে নাচছে। ঘামের চিকচিকে বিন্দু কপাল বেয়ে গড়াচ্ছে।

এমন সময় হঠাৎ টের পায়, কেউ তার ওড়না টেনে ধরেছে। চুলার আঁচ কমিয়ে, কপালের ঘাম মুছে পেছনে তাকিয়ে দেখে—ইরা গাল ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে।

ঈশানি হাঁটু গেঁড়ে বসে ইরাকে কোলে তুলে জিজ্ঞেস করে,
— “কি হয়েছে মামনি?”

ইরা নাক সিঁটকে বলে,
— “ঈথার আমার সাথে খেলছে না, মামনি।”

ঈশানি মেয়ের গালে দুটো চুমু দেয়। তার ছোট্ট হাত ধরে বাইরে এসে দেখে, ড্রয়িংরুমে আয়রা বসে আছে। ঈশানিকে দেখেই হেসে বলে—
— “ঈশু, খবরদার! জন্মদিনের দিন বাবুকে বকিস না।”

তারপর ইরাকে আদরে ডেকে বলে—
— “ইরা, তুমি এসো আমার কাছে। ঈথার পড়ে তোমার সাথে খেলবে।”

কিন্তু ইরা মুখ ফুলিয়ে আবার মায়ের কাছে গিয়ে লেপ্টে থাকে।

ঈশানি আয়রার কথা না শুনেই ছুটে যায় ঈথারের খোঁজে। নিজেদের রুমে গিয়ে দেখে—পুরো ঘর এলোমেলো। ড্রেসিং টেবিল পাউডার, তেল আর লোশন দিয়ে গোসল করানো হচ্ছে। ঈথার ছোট্ট দুই হাত ব্যস্ত নিজের মতো করে সাজাতে।

ঈশানি তেড়ে যায়, আর ঈথার মায়ের ভয় পেয়ে এক দৌড়ে পালায়। পেছনে ধাওয়া করে ঈশানি। এমন সময় সামনেই আরহানকে দেখে ঈথার সোজা তার বাবার কোলে লাফ দেয়।

ঈশানি দাঁড়িয়ে থাকে হাঁপাতে হাঁপাতে।
আরহান ছেলেকে কোলে নিয়ে আদরে চুমু দেয়। তারপর পকেট থেকে দুটো চকোলেট বের করে হাতে ধরিয়ে বলে,
— “ইরার সাথে ভাগ করে খেতে হবে কিন্তু!”

চকোলেট হাতে পেয়ে ছেলেটা আবার ছুটে যায় খুশিতে।
আর ঈশানি রাগে ফুঁসছে।

— “এই! আপনাদের আদরে ছেলেটা বাদর হয়ে গেছে। দেখেছেন ঘরের অবস্থা? আবার ইরাকেও কাঁদিয়েছে। একদিন এই ছেলের, একদিন আমার—এভাবেই চলবে?”

নিচে যেতে নিলে আরহান তাকে থামিয়ে দেয়। এক দমে কোলে তুলে রুমে নিয়ে যায়।
ঈশানি কোলে দাপাচ্ছে।

বিছানায় বসিয়ে দেয়া হয় ঈশানিকে। আশপাশে ছেলেটির তাণ্ডবের চিহ্ন ছড়ানো। ঈশানি একের পর এক অভিযোগ করছে ছেলে আর ছেলের বাবার বিরুদ্ধে।

হঠাৎই আরহান তার ঠোঁটে চুমু খায়। গাঢ়, নীরব চুম্বন।

ফিসফিসিয়ে বলে,
— “একটা ভাই বা বোন পেলে, ঈথারের দুষ্টুমি হয়তো একটু কমবে। আসো, ট্রাই করে দেখি?”

ঈশানি রাগে কিল মারে তার বুকে। উঠে যেতে গিয়েও আবার ফিরে আসে। চুপিচুপি আরহানের কোলে বসে, গলা জড়িয়ে বলে—
— “নিঃস্ব ছিলাম আমি। আপনার ভালোবাসায় আমি পূর্ণ হয়েছি।
স্বামী, সন্তান, শ্বশুর-শাশুড়ি, ননদ—সব মিলিয়ে আমার নারীত্ব আজ পরিপূর্ণ।
আপনার ভালোবাসা আমার জীবনের আশীর্বাদ,আমার পূর্ণতা।”

আরহান তার নাকে নাক ঘষে। চোখে চোখ রেখে মাদক কণ্ঠে বলে—
— “উহু… আমার জীবনের প্রেম তুমি। ভালোবাসা তুমি। তোমাকে ঘিরেই আমার সবটা।
ভালবাসি আমার বউটা।”

দুজন নর-নারী সিক্ত হয় ভালোবাসায়।হারিয়ে যায় সেই সদূর অতীতে—
যেখান থেকে শুরু হয়েছিল এই গল্প।

~সমাপ্ত

{বিশাল একটা পর্ব দিয়ে শেষ করলাম অবশেষে গল্পটা।দুষ্টু মিষ্টি সাধারণ ঘরানার রোমান্টিক গল্পটি আপনারা মিস করবেন তো? গল্পটি পড়ে নিজেদের অনুভূতি অবশ্যই জানাবেন।

আর যারা পড়েছেন তারা পারলে একটা রিভিউ দিবেন প্লীজ।এটা আমার অনুরোধ।ভালো খারাপ যেটাই লেগেছে সেটাই বলে আমাকে উৎসাহ দিবেন অথবা ভুল শুধরে দিবেন।ভালোবাসা আপনাদের}

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here