#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_১৯
—এখানে কি হচ্ছে?
পেছন থেকে একটা পুরুষালী গলার প্রশ্ন শুনে হায়া’কে পাহারা দেওয়া লোকটা সেদিকে তাকায়। লোকটির পেছন ফেরার সুযোগ নিয়ে হায়া তাড়াতাড়ি করে কলটি কেটে দিয়ে ফোনটা পুনরায় পকেটে পুড়ে নেয়। বুকটা তার এখনও ধুকপুক করছে। একটুর জন্য ধরা পরে যায় নি।
লোকটি শরীফকে দেখতে পেয়ে বলে–
—ওস্তাদ হেয় বাথরুমে আইছিলো, মুখহাত ধুইতে দেরি হওয়ায় আমি তার ডাকতাছিলাম।
শরীফ লোকটির ঘাড়ের উপর দিয়ে উকি দিয়ে হায়া’র দিকে তাকায়। প্রথম দেখাতেই তার হায়া’কে মনে ধরে গিয়েছিলো। তাকে হয়ত শরীফ নিজের বিছানাতেও নিয়ে নিতো এতক্ষণে যদি না আশিয়ান হায়া’র মিথ্যে প্রেগন্যান্সির কথা বলতো। তাদের লিডার শুরু থেকে বলে দিয়েছে, কোন গর্ভবতী নারী আর শিশুর গায়ে কখনো নোংরা হাত যাতে তাদের দলের কেউ না দেয়। শরীফ সবসময় তার লিডারের অনুগত্য হলেও আজ হায়া’র চোখ ধাঁধানো রূপ দেখে তার শয়তান মন তাদেট লিডারের কথা অমান্য করতে চাইছে।
শরীফ লোকটিকে বলে–
—তুই যা আমি দেখছি।
—কিন্তু ওস্তাদ…….
শরীফ চোখ গরম করে জঘন্য একটা গালি দিয়ে বলে–
—আমার কথার উপর কথা বললে জানিস না আমি কি করতে পারি? মজনু’র কথা ভুলে গেছোস?
মজনু তাদের দলেরই একজন ছিলো। কয়েকদিন আগে শরীফের কথা না শোনায় সে চাল খাটিয়ে লোকটিকে মেরে ফেলেছে। মজনু’র পরিণতির কথা মনে করে হায়া’কে পাহারা দেওয়া লোকটি ভয় পেয়ে যায়। সে ভয়ে ভয়ে সেখান থেকে চলে যায় আশিয়ানকে যেই রুমে রাখা হয়েছিলো সেটায়।
আশিয়ান দূর থেকে সবটাই খেয়াল করে। হায়া’কে পাহারা দেওয়া লোকটা তাকে রেখে একাই চলে এসেছে দেখে আশিয়ান লোকটিকে প্রশ্ন করে–
—আপনি ওকে রেখে চলে আসলেন কেনো?
লোকটি ভীষণ রুক্ষ ও রাগান্বিত গলায় বলে–
—আপনারে কওয়া লাগবো ক্যা রাইখা আইছি। আপনার বউ কি ছোড খুকি। আইয়া পরবো ঠিক সময়ে। যান নিজের জায়গায় গিয়া বহেন।
—জায়গায় গিয়ে বসবো মানে? আমার ওয়াইফ যে অসুস্থ দেখেন নি আপনি? আপনার যদি দাঁড়িয়ে থাকতে এতই সমস্যা হচ্ছিল তাহলে আমায় যেতে দিতেন, আপনি আমার বউকে অন্য একজনের কাছে রেখে আসলেন কেনো?
আশিয়ানও পাল্টা রাগ দেখিয়ে হালকা চিল্লিয়ে কথাগুলো বলে লোকটিকে। লোকটি আশিয়ানের কলার চেপে ধরে বলে–
—ঐ শালা গলার উঁচা কইরা কথা কস কার লগে? বেশি লটরপটর করলে গলার আওয়াজ জনমের লেগা বন্ধ কইরা দিমু।
আশিয়ান একবার লোকটির হাতের দিকে তাকাচ্ছে আরেকবার লোকটির মুখের দিকে তাকাচ্ছে। মনে মনে ভাবছে–
—হায়া যদি আজ না থাকতো একে দেখিয়ে দিতাম কার কলারে হাত দিয়েছে সে।
তাদের বাকবিতন্ডার মাঝেই দূর থেকে মেয়েলি চিৎকারের আওয়াজ শুনতে পায় আশিয়ান। মেয়েটি আর কেউ না বরং তার আদরের পুতুলবউয়ের গলা।
—আশিয়ানননননননননন।
সে চিৎকারে মিশে ছিল এক অসহনীয় যন্ত্রণা, এক অনির্বচনীয় আর্তনাদ। করুণ এই চিৎকার যেন নিস্তব্ধ আকাশ কাঁপিয়ে তুলেছিল, বাতাস থমকে দাঁড়িয়েছিল তার বেদনার ভারে।
_________________________
মেয়ের অশ্রুসিক্ত গলা শুনে জাভিয়ান বিচলিত হয়ে পড়ে। কি রেখে কি করবে সে বুঝে উঠতে পারে না তাই সে একহাত দিয়ে চুল খামচে ধরে বেডে বসে পড়ে। হানিয়া ওয়াশরুম থেকে অজু করে বের হয়ে দেখে জাভিয়ান মাথার চুল খামচে ধরে বসে আছে। সে তটস্থ পায়ে তার কাছে এসে অস্থির কণ্ঠে সুধায়–
—এই আপনার কি হলো আবার? এমন করে চুল খামচে ধরেছেন কেনো?
হানিয়া কথা বলতে বলতে নিজেই জাভিয়ানের মাথা থেকে তার হাতটি ছাড়িয়ে নেয়। জাভিয়ান নিজেকে সামলাতে না পেরে হানিয়াকে ঝাপটে ধরে তার পেটে মুখ গুঁজে নিজের অশ্রু ছেড়ে দেয়। মিসেস তালুকদার মারা গিয়েছেন বছর চারেক আগে, সেবারই জাভিয়ান লাস্ট কেঁদেছিলো তারপর আজ কাঁদছে।
হানিয়া প্রথমে ভাবে হয়ত মেয়ের টেনশনে কাঁদছে, তাই হানিয়া তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে–
—কাঁদবেন না হায়া’র পাপা। জাহান কি বললো শুনলেন না? আমাদের মেয়েকে সহিসালামত ফিরিয়ে আনবে আমাদের ছেলেরা। আপনি শান্ত হোন প্লিজ। এভাবে করলে তো আপনার শরীর খারাপ করবে আবারও।
জাভিয়ান সেই অবস্থাতেই বলে–
—হানি আমার মেয়ে কষ্টে আছে। তা…তাকে নাকি বাজে কথা বলা হয়েছে…. আম…আমার মেয়ে কাঁদছিলো হানিয়া।
জাভিয়ানের কাছে এহেন কথা শুনে হানিয়া বেশ অবাক হয়ে যায়। সে জাভিয়ানকে জিজ্ঞেস করে–
—আপনি কিভাবে জানলেন এসব?
—আমায় ফোন দিয়েছিলো হায়া।
তারপর জাভিয়ান হানিয়াকে সবটা খুলে বলে। হানিয়া হায়া’র কথা শুনে নিজেও বিচলিত হয়ে পরতে নিয়েও হয় না। কারণ সে নিজেও যদি জাভিয়ানের সাথে বিচলিত হয়ে পড়ে তাহলে ব্যাপারটা গোঁজামিল হয়ে যাবে। তাছাড়া সেও যদি ভেঙে পড়ে তাহলে জাভিয়ানকে সামলাবে কে?
হানিয়া জাভিয়ানকে বলে–
—এজন্য আপনি কাঁদছেন? আরে বোকা লোক, আপনি কান্না না করে হায়া’র যেই নাম্বার থেকে আপনাকে কল দিয়েছে সেটা পুলিশকে দিলে তারা এতক্ষণে হায়া’দের লোকেশন ট্রেস করে ফেলতো। তখন শুনেন নি, পুলিশ’রা আশিয়ানের নাম্বার বন্ধ থাকার কারণে ওদের লাস্ট লোকেশন ট্রেস করতে পারলেও, এক্স্যাক্ট লোকেশন ট্রেস করতে পারছিলো না। এখন যেহেতু আরেক নাম্বার খোলা আছে সেটা দিয়ে ওদের এক্স্যাক্ট লোকেশন ট্রেস করা কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার হবে।
জাভিয়ান নিজের কান্না থামিয়ে হানিয়া’র কথাগুলো শুনে। আসলেই তো। হানিয়া যা বলেছে তা ১০০% সত্য। জাভিয়ান নিজের চোখের পানি মুছে নেয় ঝটপট করে। তারপর ফোনটা নিয়ে তাড়াতাড়ি করে জাহানকে ফোন লাগায়। সে জাহানকে হায়া’র কল করার বিষয় জানায়। জাহান তার পুলিশ বন্ধুকে তৎক্ষনাৎ বিষয়টা সম্পর্কে অবগত করে।
জাভিয়ান কথা বলা শেষ করে চলে যায় অজু করতে। ওয়াক্ত প্রায় শেষের পথে। জাভিয়ান অজু করে এসে দেখে হানিয়া তার জন্য জায়নামাজ বিছিয়ে অপেক্ষা করছে। জাভিয়ান আসতেই হানিয়া তার হাত-মুখ মুছিয়ে দিয়ে দু’জনে নামাজে দাঁড়ায়। মোনাজাতে তারা নিজেদের সন্তানের সুস্থতা আর নিরাপত্তার জন্য অশ্রু ঝরাতে ভুলে না।
______________________
হায়া দাঁত দিয়ে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে কান্না আটকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তা তো হয়ই না বরং কান্নারা যেন আরো কঠোর ভাবে বের হয়ে আসতে চায়। হায়া হাত বাড়িয়ে আশিয়ানের ঠোঁটের কাছের রক্ত মুছিয়ে দেয়। চোখ আবার ভরে উঠে তার।
রক্ত মুছানো শেষ হলে হায়া দু’হাত দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে আশিয়ানকে জড়িয়ে ধরে তার কাঁধে মুখ গুঁজে ফুপাতে থাকে। আশিয়ান তার মাথায় আর পিঠে হাত বুলিয়ে শান্ত করতে থাকে। আশিয়ানের উপরে শান্ত দেখা গেলেও ভেতরে ভেতরে সে বিধ্বংসী রাগে ফেটে পরছে। কিছুক্ষণ আগের কথা মনে পরতেই তার ভেতরটা আবারো কেঁপে উঠে ক্রোধে।
__________________
কিছুসময় পূর্বে~
আশিয়ান হায়া’র এমন রুহ কাঁপানো চিৎকার শুনে নিজেকে আটকে রাখতে পারে না। সে দৌড়ে কলপাড়ের দিকে যেতে চাইলে একটা গুণ্ডা তাকে আঁটকে দেয়। আশিয়ান তাকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে কলাপাড়ের দিকে ছুট লাগায়।
কলপাড়ে ঢোকার আগেই একটা নারী কায়া’র সাথে তার ধাক্কা লাগে। আশিয়ান বুঝতে পারে এটা তার ব্যক্তিগত নারীটি ছাড়া আর কেউ না। হায়া আশিয়ানের সাথে ধাক্কা খেয়ে পরে যেতে নিলে আশিয়ান হাত বাড়িয়ে তাকে নিজের বুকে নিয়ে আসে। তারপর চোখ উঠিয়ে সামনে দিকে তাকালে দেখতে পায় শরীফের গলায় হায়া’র ওড়না।
আশিয়ানের বুঝতে বাকি থাকে না কেন হায়া’র ওড়না শরীফের গলায়। সে হায়া’কে একপাশে দাঁড় করিয়ে শরীফের কাছে গিয়ে তাঁকে উড়াধুড়া পিটাতে শুরু করে। ততক্ষণে আগের দু’টো লোকও এসে আশিয়ানকে আটকানোর চেষ্টা করে। যখন তারা দেখে তারা আশিয়ানকে আটকাতে পারছে না তখন তারা দু’জন আরো দু’জনকে ডেকে নিয়ে এসে মারতে থাকে।
একজন লোক পেছন থেকে আশিয়ানের কাঁধে আঘাত করায় সে নিজের খেই হারিয়ে ফেলে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে নিচে। এরই মধ্যে শরীফ উঠে সেও লোকগুলোর সাথে আশিয়ানকে মারতে শুরু করে। শরীফ আশিয়ানকে মারতে মারতে বলে–
—কুত্তার বা** আমার গায়ে হাত দিলি তুই! আজই তোর শেষদিন। এই বল্টু যা তো রাম দা ডা নিয়া আয়। শালারে এহনি জবো দিমু।
বল্টু নামের লোকটি শরীফের কথা শুনে কাজে লেগে পরে। অন্যদিকে হায়া শরিফের মুখে এমন কথা শুনে আরো ভয় পেয়ে যায়। সে ছুটে গিয়ে শরীফের পা ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে–
—প্লিজ উনাকে এবারের মতো মাফ করে দেন। কিছু করবেন না উনাকে। আমি আপনার পায়ে পরছি, প্লিজ ছেড়ে দেন উনাকে।
শরীফ হায়া’র চুলের মুঠি ধরে টেনে তাঁকে দাঁড় করায়। তারপর রাগে হিসহিসিয়ে বলে–
—তোর ওড়নায় হাত দিছিলাম বলে তোর সোয়ামি আমার গায়ে হাত দিছে না। এখন ওর সামনেই তোরে আমি আদর করমু দেখি শালায় কি করতে পারে।
হায়া একহাত দিয়ে নিজের মাথায় থালা শরীফের হাত চেপে ধরে। শরীফ এত জোরে তার চুলের মুঠি ধরেছে মনে হচ্ছে সেই জায়গাটা খুবলে উঠে আসবো।
আশিয়ান শরীফের এমন কথা শুনে বলে–
—ওরে ছাড় কুত্তারবা** তোর কলিজা আমি রাস্তার কুত্তাকে দিয়ে খাওয়াবো। তোর সাহস কি করে হয় আমার বউয়ের গায়ে হাত দেওয়ার। ছাড় আমায়য়য়য়য়!!!
আশিয়ান ক্ষ্যাপা বাঘের মতো করছে। তাকে তিনজন লোক চেপে ধরে আছে তাও পারছে না। লোক গুলোর জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে উঠছে আশিয়ানকে ধরে রাখতে। এদিকে তাদের এত চিল্লাচিল্লি শুনে ডাকাত দলের লিডার বের হয়ে আসে নিজের রুম থেকে। ফজরের নামাক পড়ছিল সে।
সে এসে এমন কুরুক্ষেত্র দেখে সকলকে ধমকে উঠে। সে শরীফকে উদ্দেশ্য করে বলে–
—শরীফ তুই মেয়েটাকে এমনে ধরে রেখেছিস কেন? আর ওর স্বামীকেই বা ওরা এভাবে ধরে রেখে কেন?
শরীফ নিজেকে বাঁচানোর জন্য মিথ্যে বলে–
—ওস্তাদ ওরা পালাতে চেয়েছিলো কিন্তু আমি দেখে ফেলি। শালায় আমারে মাইরা ভাগতে চাইলে ওরা আইসা ধইরা ফেলে।
শরীফ কথা শেষ করার সাথে সাথে হায়া বলে–
—উনি মিথ্যে বলছেন। উনি আমার সাথে নোংরামি করার চেষ্টা করে তাই আমার হাসবেন্ড উনাকে মেরেছে। বিশ্বাস করুন আমার কথা।
—ঐ শালি চুপ কর। আরেকটা মিথ্যা কথা কইলে জিহ্বা ছিড়া ফেলমু টাইনা।
ডাকাতদের লিডার চিৎকার করে বলে উঠে–
—চুপপপপপপপপপপ!!!!!
সকলে তার চিৎকার শুনে শান্ত হয়ে যায়। তার সে শরীফের সামনে এসে বলে–
—ওরে ছাড় শরীফ।
শরীফ হায়া’কে ছেড়ে দিলে সে দৌড়ে গিয়ে আশিয়ানকে জড়িয়ে ধরে। আশিয়ানকে ধরে রাখা তিনজনকেও সে একই নির্দেশ দেয়। তারা আশিয়ানকে ছেড়ে দেয়। লিডার এবার সবার উদ্দেশ্য বলে–
—এখানে কি হইছে এহন খুইলা ক। যারই দোষ থাকুক তারে এহনি শাস্তি দিমু আমি।
শরীফ ও আশিয়ানকে মারা লোকগুলো শরীফের কথায় হ্যা হ্যা করতে থাকে। লিডার এবার আশিয়ানকে জিজ্ঞেস করলে আশিয়ান বলা শুরু করে–
—আমার স্ত্রীর শরীর খারাপ লাগায় অনেক বলে কয়ে তাকে ওয়াশরুমে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করি এই লোকটির মাধ্যমে। (হায়া’কে পাহারা দেওয়া লোকটিকে দেখিয়ে বলে আশিয়ান) আমি ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। আমার স্ত্রী ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে কলপাড়ে আসে মুখে পানি দেওয়ার জন্য তখনই শরীফ এসে উনাকে পাঠিয়ে দিয়ে কলপাড়ে ঢুকে পরে। একটু পরই আমি আমার বউয়ের চিৎকার শুনি। এসে দেখি আমার বউয়েট ওড়না তার গলায়। এটা দেখে কার বুঝতে বাকি থাকে যে আমার বউয়ের গায়ে নোংরা হাত দেওয়া হয়ে? আমি রাগের মাথায় তাকে মারা শুরু করলে অন্যরা এসে আমায় মারতে শুরু করে। উনি একজনকে পাঠিয়েছে আমাকে জবাই করার জন্য রামদা আনতে। আর এ-ও বলেছে আমার চোখের সামনেই আমার বউকে ধ*** করবে।
আশিয়ান এক নিঃশ্বাসে সবগুলো কথা বলে। তার কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই শরীফ অস্থির হয়ে চিৎকার করে বলা শুরু করে–
—ওস্তাদ এই শালায় মিথ্যা কথা কইতাছে। সব ওগো বানানো নাটক। মিথ্যা না হইলে সবুজ রে জিগান।
সবুজ সেই লোকটি যাকে হায়া ওয়াশরুমের বাহিরে পাহারা দিচ্ছিলো। সবুজ শরীফের চোখ রাঙানিতে আমতা আমতা করে বলে–
—হ ওস্তাদ। শরীফ ভাই সইত্য কথা কইতাছে। এই শালারা পালাইতে চাই ছিলো।
আশিয়ান এবার আর মাথা গরম করে না আর না বিচলিত হয়। সে ডাকাত দলের লিডারকে বলে–
—আমার ওয়াইফ কে ওয়াশরুমের নিয়ে যাওয়াটা বদলে তাকে আমি আমার প্ল্যাটিনামের ব্রেসলেট দিয়েছিলাম। আপনি উনার পকেট চেক করেন তাহলেই পেয়ে যাবেন।
সবুজের পকেট চেক করা হলে সত্যি সত্যি আশিয়ানের কথা অনুযায়ী ব্রেসলেট পাওয়া যায়। শরীফ নিজের পক্ষে আবারো সাফাই দিতে গেলে তাদের লিডার কষে একটা থাপ্পড় মারে শরীফকে। শরীফ ছিটকে নিচে গিয়ে পড়ে। ডাকাতদের লিডার বয়স্ক হলে কি হবে শক্তি ও বুদ্ধির দিক দিয়ে বেশ বিচক্ষণ।
লিডার শরীফের কলার ধরে নিচ থেকে উঠিয়ে বলে–
—তোর কলিজা দেহি বেশি বড় হইয়া গেছে রে শরীফ। তুই আমার কথা অমান্য করার সাহস দেখাস। তোরে কইছিলাম না পোয়াতি মাইয়া গো গায়ে হাত দিবি না? এ শুয়ো**রের বাচ্চা তোর বউরে যদি এমন অবস্থা ***** করতো তোর কেমন লাগতো? নাকি তুই এমনই কোন ঘটনার মাধ্যমে দুনিয়ায় আইছোস?
লিডারটি শরীফকে আরো অনেক আজেবাজে কথা শুনায় আর প্রহার করে। বেশ কিছুক্ষণ মারার পর তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় সেখানে ফেলে রেখে সকলে চলে আসে।
________________
বর্তমান~
অতিরিক্ত ক্লান্তি আর টেনশনে কখন যে আশিয়ানের চোখ লেগে এসেছে তার খেয়াল নেই। হঠাৎই অনেক চিৎকার চেচামেচি আর গুলির শব্দে তার ঘুমটা ভেঙে যায়। তাঁদেরকে আগের রুমটায় আটকে রেখে বাহির থেকে ছিটকানি লাগিয়ে লোকগুলো নাস্তা করতে গিয়েছে।
হায়াও ঘুমিয়ে পরেছিলো কাঁদতে কাঁদতে। তার ঘুমটাও গোলাগুলির শব্দে ভেঙে যায়। দু’জন দু’জনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বসে থাকে ঘরের এককোনায়। কিছুক্ষণ পরই কতগুলো পায়ের শব্দ শোনা যায় তাদের রুমের বাহিরে। মিনিটের ব্যবধানে কেউ একজন দরজা খুলে দিলে সূর্যের আলো অন্ধকার রুম টিকে আলোকিত করে তুলে।
—পুতুল…..
—বনু…..
অতিপরিচিত দু’টো গলা থেকে পরিচিত ডাক শুনে হায়া-আশিয়ান সহজেই তাদের চিনে ফেলে। হায়া আশিয়ানের বুক থেকে মুখ তুলে দেখে তার ভাইয়েরা এসেছে পুলিশসহ।
জায়িন আর জাহান হাঁটু গেড়ে বোনের সামনে বসে পড়ে। হায়া আশিয়ানকে ছেড়ে ভাইদের বুকে ঝাপিয়ে পড়ে হুহু করে কাঁদতে শুরু করে।
—বড় দা’ভাই…
জাহান-জায়িন তাদের আদরের বোনকে জড়িয়ে ধরে। তাদের দু’জনের চোখেও পানি ছলছল করছে। হায়া কাঁদতে কাঁদতে ভাইদের বুকেই অজ্ঞান হয়ে যায়। অতিরিক্ত কান্না, ভয়, দুঃশ্চিন্তায় অনেক দূর্বল হয়ে পরেছে।
হায়া কোন শব্দ করছে না দেখে জাহান হায়া’র মুখ তুলে দেখে সে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। মুহূর্তেই তিনজন পুরুষ বিচলিত হয়ে পরে তাঁকে নিয়ে। আশিয়ান হায়া’কে নিজের কাছে নিয়ে এসে তার গালে কয়েক বার চাপড় মেরে ডাকতে থাকে–
—বউ, এই বউ। উঠো, কি হয়েছে তোমার?
জাহান হায়া’র পালস রেট ও চোখ পরীক্ষা করে বলে–
—অতিরিক্ত ভয় ও দুঃশ্চিন্তায় এমনটা হয়েছে। ওকে আমার কাছে দাও ভাই। আমি নিয়ে যাচ্ছি কোলে করে, তুমি জায়িনের সাহায্যে আসো।
—না আমি পারবো ওকে নিতে।
কথাটা বলে আশিয়ান বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে হায়া’কে কোলে তুলে বাহিরের দিকে হাঁটা দেয়। রুমটা থেকে বের হয়ে দেখে বাহিরের পরিবেশ বেশ ভয়াবহ। পুলিশের সাথে গোলাগুলিতে বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছে, তাদের মধ্যে একজন হলো ডাকাতদের লিডার।
আশিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেই জায়গা ত্যাগ করার জন্য পা বাড়ালে তার নজরে আসে শরীফ ও সবুজের দিকে।তারাও আহত হয়ে কাতরাচ্ছে। আশিয়ান ওদের দিলে এগিয়ে গিয়ে পুলিশকে বলে–
—এই দু’জনের গায়ে কেউ হাত দেবেন না। এদেরকে সুস্থ করে আমার হাতে তুলে দিবেন। বিনিময়ে যত টাকা লাগে আমি দিবো।
জাহানের পুলিশ বন্ধু ইন্সপেক্টর শওকত হোসেন বলে–
—এমনটা করা করা যাবে না ভাইয়া। একবার এদের নাম তালিকা হয়ে গেলে তখন আর তাদের বের করা সম্ভব নয়। এটা করতে গেলে আমার চাকরি নিয়ে টানাটানি হবে।
—তাহলে এদের নাম তালিকা করবে না। কিন্তু এদের আমার যেকোন ভাবে চাইই চাই।
আশিয়নাপর চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে কিন্তু কণ্ঠ নদীর ন্যায় শান্ত।
শব্দসংখ্যা~২১৩৬
চলবে?
[কাল ও পরশু নিজের বানানো দুটো ভিডিও কপিরাইট খেয়ে আমার পেইজের অবস্থা অর্ধমৃত 🙂 সকলে প্লিজ ২/৩ টা কমেন্ট করেন।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স 🤍]

