সাঝের_প্রণয়ডোর #সাদিয়া_সুলতানা_মনি #পর্ব_৩৩

0
20

#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৩৩
#রহস্যের_সমাধান

অন্ধকার ঘরে বসে আছে এক যুবক। হাতে তার এপ রমণীর হাস্যোজ্জ্বল ছবি। যুবকটি একধ্যানে সেই ছবিটির দিকে তাকিয়ে আছে আর ক্ষণে ক্ষণে তার চোখ দিয়ে টপটপিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। মাঝে মধ্যে আবার বিরবির করে কিসব বলছেও যুবকটি। সে ছবিটায় একবার চুমু খাচ্ছে তো আরেকবার হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আবার বিরবির করে কি বলছে। এক কথায় নানান ধরণের পাগলামি করছে যুবকটি।

তার এই পাগলামিরই মধ্যেই রুমে প্রবেশ করে দুইজন মাঝবয়সী নারী পুরুষ। নারীটির হাতে খাবারের ট্রে। পুরুষটি রুমে ঢুকেই হাতড়িয়ে হাতড়িয়ে লাইট জ্বালায়। নিমিষেই আলোকিত হয়ে উঠে তিমিরে ডুবে থাকা কক্ষটি। রুমটি আলোকিত হতেই নারীটি বলে উঠে–

—জাহান, আব্বু কই তুমি?

হ্যাঁ, অন্ধকার রুমে পাগলামি করা ছেলেটা আর কেউ না জাহান তালুকদার। জাভিয়ান তালুকদার আর হানিয়া মির্জার বড় ছেলে। যে কিনা তার প্রেয়সীকে হারিয়ে অনেকটা ভেঙে পড়েছে। হারিয়ে ফেলেছে কেন বললাম? আচ্ছা এই প্রশ্নের উত্তরও একটু পর দিচ্ছি।

জাভিয়ান আর হানিয়া রুমের এদিক সেদিক খুঁজে। অবশেষে তারা জাহানকে পায় সোফার পেছনে। তারা চপল পায়ে সেদিকে হাঁটা দেয়। হানিয়া খাবারের ট্রে টা টি-টেবিলের উপর রেখে ছেলের কাছে এগিয়ে যায়।

জাহান হাঁটুতে মুখ গুঁজে কিসব যেনো বলছে। তারা দু’জন শুনতে পায় না তা। হানিয়া ছেলের এমন অবস্থা দেখে ভেঙে পড়তে চায়। কোন মা কি ছেলের এমন দূরাবস্থা দেখতে পারবে? পারবে না। হানিয়াও পারছে না ছেলের এমন করুণ অবস্থা। কিন্তু সে ভেঙে পড়ে না। সে ভেঙে পড়লে তার ছেলে যে আরো ভেঙে পড়বে সেই সাথে তার সাজানো গোছানো সংসার টাও।

জাভিয়ান হানিয়া ছেলের পাশে বসে পড়ে। হানিয়া জাহানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে–

—আব্বু, কি করছো এখানে?

মায়ের আদরমাখা ডাকে জাহান সাড়া না দিয়ে পারে না। সে হাঁটু থেকে মুখ তুলে তার দিকে তাকায়। উষ্কখুষ্ক চুল, বড়বড় দাঁড়ি, লাল লাল ফোলা চোখের জাহানকে দেখে হানিয়ার বুকটা ধক করে উঠে। সবসময় পরিপাটি হয়ে থাকা ছেলের এমন করুণ অবস্থা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। জাহানের এমন মুখশ্রী দেখে হানিয়ার চোখে অশ্রুরা এসে ভীড় জমায়। হানিয়া অনেক কষ্টে অশ্রু গুলো গড়িয়ে পড়া থেকে বিরত রাখে।

সে আঁচল উঠিয়ে জাহানের চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলে–

—নিজের কি অবস্থা করেছো দেখেছো একবার? এটা কি আমার সেই জাহান যে কিনা সকল প্রতিকূল মুহূর্তেও ধৈর্য ধারণে করে বুদ্ধি খাটিয়ে কাজ করতো? সেই জাহান আর এই জাহানের মধ্যে তো আমি আকাশ পাতাল দেখতে পারছি। তুমি কি বুঝতে পারছো তোমার এই অবস্থা দেখে আমরা দু’জন কতটা কষ্ট পাচ্ছি? এমন করো না আব্বু, সন্তানের এমন অবস্থা দেখা কতটা কষ্টের তুমি তা হয়ত জানো না।

কথাগুলো বলতে বলতে হানিয়ার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। সে অনেক চেষ্টা করেও সেগুলো আর আটকাতে পারে না। এদিকে মায়ের কথা আর তার চোখে পানি দেখে জাহানও নিজেকে আর আটকাতে পারে না। সে মায়ের কোলে মুখ গুঁজে হুহু করে কেঁদে দেয়। কাঁদতে কাঁদতে বলে–

—আমি কি করবে আম্মু বলো, নিজেকে আমি কিছুতেই সামলাতে পারছি না। ও কোথায় গেলো? কেনো গেলো? আমি তো ওকে কম ভালোবাসি নি, তাও ও কেন আরেকজনের কথায় প্রভাবিত হয়ে আমায় ছেড়ে চলে গেলো? ও তো জানত আমি ওকে আমার সবটা দিয়ে ভালোবেসেছিলাম, সেই ভালোবাসার এই দাম দিলো? আম্মু… আম্মু ওকে আমার কাছে এনে দাও। আমার দাম বন্ধ হয়ে আসছে ওকে ছাড়া। ও কেনো আমায় আমার মতো করে ভালোবাসলো না? কেনো?

সন্তানের এমন মন ভাঙা আর্তনাদে জাভিয়ান-হানিয়ার হৃদয় কেঁপে উঠে। জাভিয়ানের মনে পরে যায় আজ থেকে ২৭বছর আগে তার করা পাগলামিগুলোর কথা। সেও তো তার প্রেয়সীকে হারিয়ে এমনই ভাবে তার বাবার বুকে পড়ে আবদার করেছিলো, তার বাবা যাতে তার প্রেয়সীকে খুঁজে এনে দেয়। আজ ২৭বছর পর তার ছেলেও একই ভাবে আবদার করছে। জাভিয়ান কোনদিন নিজের স্বপ্নেও ভাবে নি তার কোন সন্তান তারই মতো ভালোবাসার মানুষটিকে হারিয়ে এমন উন্মাদনা গ্রহণ করবে।

জাভিয়ান বড়বড় নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। মনের গহীন থেকে কেউ একজন বলে উঠছে–

—তোর সন্তানের এই বেহাল অবস্থার জন্য তুই একমাত্র দায়ী জাভিয়ান। কেমন পিতা তুই? সন্তানের মনের খবর তো রাখিসই না উল্টো তার কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়াস। ধিক্কার তোকে জাভিয়ান, ধিক্কার। তুই সারাজীবন অন্যের কান্নার কারণই হয়ে আসলি।

এসব উল্টা পাল্টা কথা ভেবে জাভিয়ানও ভেঙে পড়তে চায়। তার চোখের পানিও আজ বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। নিজেকে আজ ব্যর্থ মনে হচ্ছে। সে যদি আরেকটু খোঁজ খবর নিতো, ছেলের সাথে খোলাখুলি এই বিষয়ে কথা বলত তাহলে হয়ত তার সন্তান আজ এত কষ্ট পেতো না।

আপাত দৃষ্টিতে এই কথাগুলো সঠিক মনে হলেও, কথাগুলো কি আসলেই শতভাগ সঠিক? আমি বলবো না। কারণ, রাহাতদের সাথে জাভিয়ানদের আজকালের সম্পর্ক না কিন্তু। বলতে গেলে তিন যুগেরও অধিক সময় ধরে তারা বিজনেস ও পারিবারিক ভাবে পরিচিতি। একটা সময় রাহাত কিন্তু জাভিয়ান-হানিয়া অনেক সাহায্যই করেছিলো (যারা #প্রতিশোধের_অঙ্গীকার গল্পটা পড়েছেন তারা জানেন) অতীতে সেই সাহায্য আরও বিভিন্ন কারণে তারা রাহাতকে বিনা প্রশ্নে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করত। সেই বিশ্বাসকে পুঁজি করে রাহাত তাদের সাথে এমন জঘন্য একটা কাজ করে যা তারা কখনো ভাবতেও পারেনি।

এসব কথা হানিয়া জাভিয়ানকে বিগত কয়েকদিনে হাজার বার বলেছে যখন কিনা জাভিয়ান জাহানের এই অবস্থার জন্য নিজেকে দায়ী করে এসেছে, কিন্তু জাভিয়ান তো জাভিয়ানই। সে নিজেকে অযথা দোষারোপ করে ভেতরে ভেতরে গুমরে গুমরে মরছে।

জাভিয়ান জাহানের চুল গুলোয় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে–

—আমি সরি বাবা, আমার জন্য আজ তোমায় এতটা কষ্ট পেতে হচ্ছে। বাবাকে ক্ষমা করে দিও সোনা।

বাবার কথা শুনে জাহান মায়ের কোল থেকে মাথা তুলে আস্তে আস্তে। নিজের চোখের পানি মুছে দিয়ে জাভিয়ানের চোখের পানিও মুছে দেয়। ভাঙা গলায় বলে–

—তুমি নিজেকে শুধু শুধু দোষ দিচ্ছো কেনো বাবা? তুমি তো রাহাত আঙ্কেলকে বিশ্বাস করেই আমায় সারপ্রাইজ দিতে গিয়েছিলে, কিন্তু রাহাত আঙ্কেল তোমায় ধোকা দিল। প্লিজ বাবা নিজেকে অযথা ব্লেইম করো না। আসলে আমি ভালো তো বাসলাম ঠিকই কিন্তু সেই ভালোবাসায় কোন জোর ছিলো না হয়ত, যার কারণে একটা দমকা হওয়া সব উড়িয়ে নিয়ে গেলো।

কথাগুলো বলতে বলতে জাহানের চোখ দিয়ে আবারও অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। জাভিয়ান ছেলের চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলে–

—উহুম, তোমার ভালোবাসায় অবশ্যই জোর আছে। তালুকদাররা আর যাইহোক কাউকে ভালোবাসলে নিজের সবটা দিয়েই বাসে। তোমার চোখের সামনেই সেই উদাহরণ আছে। আর এটা একটা পরীক্ষা মাত্র বাবা, তোমার ধৈর্যের পরীক্ষা। উপরওয়ালা দেখতে চাইছেন তুমি কি আসলেই তার উপর ভরসা করে ধৈর্য ধরতে পারো কিনা। কিন্তু তুমি করছো টা কি? অধৈর্য হয়ে নিজেকে সব কিছু থেকে গুটিয়ে নিয়েছ। এমনটা করলে কি তুমি পরীক্ষায় পাশ করবে? না, বরং বাজে ভাবে ফেইল করবে। আমার জাহান আজ পর্যন্ত কোন পরীক্ষায় ফেইল করেনি, সে কিনা আজ জীবনের পরীক্ষায় এমন বাজে ভাবে ফেইল করবে? এটাও কি আমায় দেখতে হবে তুমি বলছো?

জাহান ছলঢ়ল চোখে বাচ্চাদের মতে করে বলে–

—আমি কি করবো তাহলে বাবা? আমি মানতে পারছি না মেহরিমা অন্য একজনের প্ররোচনায় আমায় ছেড়ে চলে গিয়েছে? কোথায় গিয়েছে সেটাও তো জানি না। ওর যে কেউ নেই বাবা। একা একটা মেয়ে কোথায় থাকছে? কিভাবে থাকছে? কি করছে? আমি কিচ্ছু জানি না। ও তো জানত আমি ওর ভালোবাসায় কতটা দূর্বল হয়ে পড়েছি, তাও এমনটা করলো আমায় সাথে।

—তোমার ভালোবাসাকে নিজের দূর্বলতা না বানিয়ে নিজের শক্তিতে রূপান্তর করো। এভাবে নিজেকে সবকিছু থেকে গুটিয়ে না নিয়ে মেহরিমা মামনিকে খোঁজার চেষ্টা করো। তোমার এসব প্রশ্ন আমাদের না করে তাঁকে খুঁজে বের করে তার থেকেই জানতে চাও। তুমি তো বুঝতেই পারছ তাকে রাহাত বাজে ভাবে ব্রেনওয়াশ করেছে, ছোট্ট মানুষ বুঝতে পারেনি কোনটা ভুল আর কোনটা সঠিক। তুমিই তো বললে ওর কেউ নেই, বাচ্চা মেয়েটা হয়ত কারো সাথে এই বিষয়ে পরামর্শও নিতে পারেনি। হটকারিতায় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। তোমার উচিত তাকে খুঁজে বের করে তার ভুল গুলো সংশোধন করে দেওয়া।

জাহান মন দিয়ে বাবার কথাগুলো শুনে। মাথা ঠাণ্ডা করে ভেবে দেখে আসলেই তো, মেহরিমা বরাবরই ঠাণ্ডা ও নাজুক স্বভাবের একটা মেয়ে। তাকে যে যা বুঝায় সে মুখ বুঝে তাই বিশ্বাস করে ফেলে আর খুব সহজেই যে কাউকে বিশ্বাস করে ফেলে। মেয়েটা হাতে পায়ে বড় হলেও বলতে গেলে চলে অন্যের কথায়। তার এই স্বভাবটারই ফায়দা নিয়েছে রাহাত।

জাভিয়ান জাহানকে সোফার পেছন থেকে নিয়ে এসে বেডে বসিয়ে দেয়। হানিয়া ওয়াশরুমে গিয়ে মগে করে পানি এনে তাতে টাওয়াল ভিজিয়ে জাহানের মুখ হাত ভালো করে মুছে দেয় ভেজা টাওয়াল দিয়ে। তারপর খাবারে প্লেট নিয়ে তার সামনে বসে খাইয়ে দিতে থাকে। জাহান বিনা বাক্যে মায়ের হাতেই খেয়ে নেয়। রাত অনেক হওয়ায় হানিয়া জাভিয়ান জাহানকে শুইয়ে দিয়ে ঘুমাতে বলে চলে যায়। শরীর ও মস্তিষ্ক ক্লান্ত থাকায় কয়েকদিনের নির্ঘুম জাহান আজ না পারতেই ঘুমিয়ে পড়ে।

______________________________

রাত এখন প্রায়ই দুটো। আবছা আলোয় ঢেকে থাকা রুম টিতে শুয়ে আছে এক জোড়া নবদম্পতি। নবদম্পতি হলেও তারা অন্যান্য সব নবদম্পতিদের থেকে ভিন্নতা অবলম্বন করে রয়েছে। তাদের দু’জনের মধ্যে একজনের অবস্থান বেডে তে আরেকজনের অবস্থান কাউচে। কেনো? কারণ বিয়েটা যে নিতান্তই এক্সিডেন্টলি হয়েছে।

আফিফ কাউচ থেকে উঠে বসে। চোখ উঠিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকা তার নববধূকে দেখে। তিনজন আনায়সে ঘুমাতে পারবে এমন একটা বেডেটায় মেয়েটা কোনায় এসে শুয়েছে। তাকে দেখে যেকেউ বলে দিবে, সে যেকোন সময় পড়ে গিয়ে যবরদস্ত একটা ব্যথা পাওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ। আফিফ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তার দিকে এগিয়ে যায়।

আলতো হাতে সে তার নববধূকে বেডের মাঝামাঝি শুইয়ে দেয়। যখন সে তাকে শুইয়ে দিয়ে চলে আসতে নিবে তখনই রমণীটি আফিফের এক হাত শক্ত করে আকড়ে ধরে বিরবিরিয়ে কিছু বলতে শুরু করে। আফিফ তার কানটা তার বধূর দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় সে কি বলছে তার শোনার জন্য, মেয়েটি বলছে–

—আপনি আমায় কেন ভালোবাসলেন না জাহান? আমি তো আপনাকে ছাড়া আর কারো কথা ভাবতেও পারছি না। কি আছে ঐ মেহরিমার মধ্যে, যা আমার মধ্যে নেই?

এরপর আরো কিছুক্ষণ বিরবিরিয়ে কথা বলতে বলতে একসময় রমণীটি চুপ হয়ে যায়। আফিফকে আঁকড়ে ধরা হাত টাও ঢিলে হয়ে যায়। আফিফ খুব সাবধানে তার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে রাহার গায়ে ব্ল্যাঙ্কেট জড়িয়ে দিয়ে চলে যায় বেলকনিতে। হ্যাঁ, রাহাই আফিফের বউ, যার সাথে বিয়ের দিন অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে আফিফের বিয়ে হয়।

আফিফ বেলকনিতে রাখা ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ জোড়া বন্ধ করে নেয়। গভীর রাতের হালকা ঠাণ্ডা বাতাসে তার ভেতরের সব অস্থিরতা যেনো দূর হয়ে যাচ্ছে। চোখ বন্ধ করতেই গত কয়েকদিনের মতো আজও তার চোখের সামনে ভেসে উঠে তার জীবনের অনাকাঙ্ক্ষিত সেই দিনটির ঘটনা।

_________________________

~ফ্ল্যাসব্যাক~

সকলে নারী কণ্ঠটির দিকে ফিরে তাকালে দেখতে পায় সে আর কেউ না মুনতাহা চৌধুরী, ওয়াইফ অফ রাহাত চৌধুরী। মুনতাহা হেঁটে স্টেজে উঠে আসে। জাভিয়ানদের সামনে দাড়িয়ে কিছুটা চাপা গলায় বলে–

—আমি আপনাদের সবটা খুলে বলছি, কিন্তু সেটা একান্ত ব্যক্তিগত ভাবে। এখানে প্রেস-মিডিয়ার অনেক লোক আছে, আমার হাসবেন্ড ও আপনার বিজনেস পার্টনাররা আছে তাদের সাথে আমি এসব বলতে চাইছি না। আমার অনুরোধ, আপনারা হয় একটু আলাদা স্পেসে আসুন, না হয় উনাদের খাবার খেতে পাঠিয়ে দিন। এসব কথা বাহিরের লোকের সামনে বললে আমার হাসবেন্ডের পাশাপাশি আপনাদের সম্মানও নষ্ট হবে।

জাভিয়ান রেগে বলে–

—যেখানে আমার পরিবারের সুখের বিষয়ে কথা হচ্ছে সেখানে আমি জাভিয়ান তালুকদার কারো তোয়াক্কা করি না।

মুনতাহা এবার খানিকটা অনুরোধ করেই বলে–

—প্লিজ মি.তালুকদার, আমি জানি আমার স্বামী অপরাধ করেছে এবং এটা হয়ত ক্ষমা যোগ্য না কিন্তু আমি স্ত্রী হয়ে তাকে এমন ভরা সমাজে অপমান করতে পারবো না। আর আপনারাও তো সত্যিটা জানতে চান, তাই আমার অনুরোধ আপনারা হলটা কিছু সময়ের জন্য খালি করানোর ব্যবস্থা করেন।

মুনতানার অনুনয় করে বলা কথাটা জাভিয়ান ফেলতে পারে না। সে এনাউন্সমেন্ট করে কিছুক্ষণের মধ্যে দ্বিতীয় বিয়েটা হচ্ছে, একটু ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে তাদের মধ্যে সেটা তারা ব্যক্তিগত ভাবে সমাধান করতে চায়। গেস্টরা যেনো ততক্ষণে খাবারের পব সেড়ে ফেলে।

আবরার আর আয়মান দায়িত্ব নেয় গেস্টদের খাবারের। তারা দু’জন মিলে গেস্টদের নিয়ে যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে হলটা খালি হয়ে যায়। এবার জাভিয়ান বলে–

—বলুন মিসেস চৌধুরী, আপনার হাসবেন্ড কেন আমাদের এমন ধোঁকা দিলো।

— পিতৃ স্নেহ অন্ধ হয়ে এমনটা করেছে।

—মানে? খোলাসা করে বলুন একটু।

—আমার হাসবেন্ড আমাদের মেয়েকে নিজের জীবনের চাইতো বেশি ভালোবাসে। ছোট থেকে তার সব ছোট-বড়, ভালো-খারাপ আবদার মেনে এসেছে। সে এসব নিজের ভালোবাসা জাহির করার একটা মাধ্যমে মনে করলেও সে হয়ত ভাবতে পারেনি এতে মেয়েটা কতটা বিগড়ে যাচ্ছে। কিছুদিন আগে হঠাৎই রাহা নাওয়াখাওয়া অফ করে নিজেকে ঘরবন্দী করে নেয়, একদিন তো এমন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো আমরা দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে দেখি ও অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। এরপর ওদের বাবা-মেয়ের মধ্যে কি কথা হয় জানি না, গত সপ্তাহে আমায় রাহার বাবা রাহার বিয়ের কথা জানায়। সে জানায় জাহানকে নাকি রাহা পছন্দ করে তাই আপনাদের বন্ধুত্বটা আরো পাকাপোক্ত করতে সে তাদের দু’জনকে বিয়ে দিতে চায়। আমি তো জানতাম, ছেলে হিসেবে জাহানের চেয়ে ভালো ছেলে আমরা হয়ত দুটো পাবো না। তার কথা মেনে নিয়ে আমি বিয়ের প্রস্তুতি শুরু করি। কিন্তু তার এই কাজের পেছনে যে কতটা ঘৃণ্য এক সত্য লুকিয়ে আছে তা আমি জানতে পারি কাল, যখন কিনা সবটা আমার হাতের বাহিরে চলে গিয়েছিলো।

সবাই অবাক হয়ে মুনতাহার কথা শুনতে থাকে। এরই মাঝে আয়মান আর আবরার এসে পড়ে গেস্টদের ওখান থেকে। তারা সবাই খাচ্ছে। মুনতাহা আবার বলা শুরু করে–

—কাল রাতে আমি রাহার কাছে ঘুমাতে গেলে দরজার সামনেই শুনতে পাই, ও ওর বান্ধবীকে বলেছে, রাহাত কিভাবে মেহরিমাকে জাহানের থেকে দূরে করেছে। মেহরিমা নাকি এতিম মেয়ে, এই কথাটাকে কেন্দ্র করে সে মেহরিমাকে বুঝিয়েছে এমন পিতৃ পরিচয়হীন মেয়ের সাথে জাহানের মতো একজন বিজনেস ম্যানের ছেলেকে মানায় না। রাহাত মেহরিমাকে তাদের আর্থিক অবস্থাটাও খুবই শুষ্ক ভাবে বুঝিয়ে দেয়। মেয়েটা নাকি একটু বোকাসোকা টাইপের, কয়েকদিন ক্রমাগত এসব বুঝিয়ে রাহাত তার মাথাটা বেশ ভালোভাবেই ওয়াশ করে ফেলে। যার কারণে আজ মেহরিমার জায়গায় রাহা বসে আছে। আর হ্যাঁ, রাহা তার বাবাকে এটাও জানায় যে, জাহান আর মেহরিমার সম্পর্কের কথা নাকি আপনারা জানেন না। সে এটারই ফয়দা নেয়। সে আপনার কাছে এসে হয়ত বলেছে, রাহা আর জাহান রিলেশনে আছে কি জাহান লজ্জায় এই কথাটা বলতে পারছে না আপনাদের, তাই তো মি.তালুকদার?

প্রশ্নটি জাভিয়ানকে করে মুনতাহা। জাভিয়ান মাথা নাড়িয়ে তার কথায় সম্মতি দেয়। মুনতাহার কথা শুনে সবাই হতভম্ব হয়ে যায়। ভালোবাসা ভালো তাই বলে অন্ধ ভালোবাসা ভালো নয়। রাহাত যেটা করে সেটা মূলত অপরাধ বলা চলে।

সব শুনে জাহান তার বাবার কাছে এসে বলে–

—বাবা, আমি এই বিয়ে করতে পারবো না। মেহরিমা না হলে কেউ আসবে না এই জাহান তালুকদারের জীবনে। তুমিই বলো বাবা, মনে একজনকে রেখে আরেকজনের সাথে সংসার করা যায়? হ্যাঁ, করা যায় হয়ত কিন্তু সুখী হওয়া যায়?

জাভিয়ান জাহানের কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করে বলে–

—চিন্তা করো না বাবা। তোমায় এই বিয়েটা করতে হবে না। তুমি যাকে ভালোবাসো, তার সাথেই তোমার বিয়ে হবে।

জাহান জাভিয়ানের কথা শুনে তাঁকে খুশিতে জড়িয়ে ধরে। উচ্ছ্বসিত গলায় বলে–

—থ্যাঙ্ক ইউ বাবা, থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ আমায় বুঝার জন্য। তোমরা থাকো আমি এখনি যেয়ে মেহুকে নিয়ে আসছি।

জাহান জাভিয়ানকে ছেড়ে ছুট লাগায় মেহরিমাকে আনতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে এরই মাঝে তার পথ আটকে দাঁড়ায় রাহাত। এতসবের পরেও রাহাত জাহানের কাছে এসে বলে–

—বাবা, আমার মেয়েটা তোমায় ভীষণ ভালোবাসে। প্লিজ ওকে ফিরিয়ে দিও না। ও তোমার মন মতো হয়ে চলবে। আমার মেয়েটার বিয়ে ভেঙে দিও না বাবা। তুমি তো একবার দেখেছই বিয়ের আসরে বিয়ে না হওয়া মেয়ের অবস্থা সমাজে কেমন। আমার মেয়ের সাথে এমনটা করো না। আমি তোমার কাছে হাতজোড় করে বলছি।

জাহান বলে—

—আঙ্কেল আমি একজনকে ভালোবাসি। আজ যদি আপনি এমনটা না করতেন তার সাথেই কিন্তু আমায় বিয়েটা হতো। আমি রাহা আর হায়া’কে সবসময় একই নজরে দেখেছি। মনেপ্রাণে একজনকে ভালোবেসে আরেকজনকে আমি কি করে বিয়ে করবো বলেন? এতে আমি বা আপনার মেয়ে কেউ সুখী হতে পারবো?

—তাহলে আমার মেয়ের অবস্থাটাও যে হায়ার মতো হবে। আমার মেয়ে এসব সহ্য করতে পারবে না বাবা।

কথা গুলো বলতে বলতে রাহাত ঝরঝরিয়ে কেঁদে দেয়। পুরুষ মানুষ হয়েও আজ রাহাত এতগুলো মানুষের সামনে নিজের চোখের পানি ফেলতে লজ্জা পাচ্ছে না। উপস্থিত সকলেরই খারাপ লাগে তার কান্না দেখে।

তখনই আফিফ বলে উঠে –

—আপনাদের সম্মতি থাকলে আমি রাহা’কে বিয়ে করবো।

উপস্থিত সকলে ভীষণ ভাবে চমকে যায়। এমনকি আদিয়াত-আফরাও। আফরা আফিফের কাছে এসে বলে–

—কি বলছিস তুই? ও জাহানকে ভালোবাসে, তোর সাথে ওর বিয়ে হলে তুই সুখী হতে পারবি না। বাচ্চাদের মতো কথা বলিস না।

—আমি রাহা’কে বাধ্য করবো আমায় ভালোবাসতে। আমি উনার ভালোবাসা হাসিল করে নিবো আম্মু।

ভীষণই কনফিডেন্সের সাথে কথাগুলো বলে আফিফ। সকলেই বিভিন্ন ভাবে আফিফকে বুঝায়, আফিফও তাদের নিজের যুক্তিগুলো দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেয়।

জাহান রাহাতকে বলে–

—আঙ্কেল, রাহার জন্য আফিফ ভাইয়ার থেকে ভালো ছেলে আপনি হয়ত পাবেন না। সে আশিয়ান ভাইয়ের বন্ধু হলেও আমাদের সাথেও তার ভালোই বন্ধুত্ব। সেই বন্ধুত্ব থেকেই বলতে পারছি কথাগুলো। আর মেহরিমা যদি আমার জীবনে না আসত তাহলে আমি হয়ত রাহার সম্পর্কে ভেবে দেখতাম, কি এই জীবনে আমি মেহরিমা ব্যতীত আর কাউকে নিজের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে ভাবতে পারবো না। এখন আপনারা ভেবে দেখেন কি করবেন। আমি আসছি।

জাহান চলে যায় মেহরিমাকে আনতে, তার সাথে হায়াও যায়। রাহা ভগ্ন হৃদয়ে, অশ্রুমাখা চোখে জাহানের প্রস্থান দেখে। সবশেষে সকলের পরামর্শে সেদিনই আফিফ ও রাহার বিয়েটা হয়ে যায়। আদিয়াত এক মেয়েকে বিদায় দিয়ে আরেক মেয়ে নিয়ে মাহমুদ ভিলায় ফিরে যায়।

___________________

~ফ্ল্যাসব্যাক এন্ড~

সেদিন জাহান আর হায়া মেহরিমার হোস্টেল গিয়ে জানতে পারে মেহরিমা গত চারদিন আগে হোস্টেল ছেড়ে অন্য কোথাও চলে গিয়েছে। কোথায় গিয়েছে কেউ জানে না। যাওয়া আগে একটা চিঠি দিয়ে গিয়েছে তার রুমমেটকে, যদি হায়া বা জাহান তার খোঁজে আসে তাহলে তাদের যেনো চিঠিটা দেয়। চিঠি টায় লেখা ছিলো–

—আবেগের দুনিয়া থেকে বের হয়ে বাস্তবতা দেখুন জাহান। আমি আপনার যোগ্য নই, যে যোগ্য তার কাছে রেখে গেলাম। দোয়া করি সুখের সংসার হোক আপনাদের।

জাহান চিঠিটা পড়ে ভীষণ ভেঙে পড়ে। পুরো শহর তন্নতন্ন করে খুঁজেও মেহরিমাকে পাওয়া যায় না। জাভিয়ান তার সব সোর্স লাগিয়ে দেয় মেহরিমাকে খুঁজতে কিন্তু ফলাফল শূন্য। আজ ১৪ দিন হতে চলেছে মেহরিমার নিখোঁজের।

শব্দসংখ্যা~২৬৫০
চলবে?

[তাদের প্রেমকাহিনী এখানেই শেষ করে দেই?🥱 আর হ্যাঁ, মেহরিমার কাজটা ন্যাকামি মনে হতেই পারে। কিন্তু তার জায়গায় একবার নিজেকে বসিয়ে দেখুন। এতিম হিসেবে মেহরিমাকে বলা কথাগুলো তার মনে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে একবার ভেবে তারপর তার কাজটাকে ন্যাকা বলেন। আপনারা হয়ত শুরু থেকেই দেখে এসেছে মেহরিমার চরিত্রটাকে আমি কিভাবে উপস্থাপন করেছি।

ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here