#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৫৫
হায়া রাহাকে বাসায় দিয়ে যাওয়ার পর আফরা রাহাকে কতক্ষণ বকেটকে তারপর নিজের হাতে খাইয়ে দেয়। আফরার হাতে খাওয়ার সময় রাহার মুনতাহার কথা মনে পড়ে যায়। রাহা যখন অসুস্থ হতো তখন মুনতাহাও শুরুতে একটু বকাঝকা করে, এমনই ভাবে আফরার যত্ন করত। রাহা আফরার মাঝে মুনতাহাকে অনুভব করতে পারছে।
আফরা মুনতাহাকে খাইয়ে দেওয়ার পর এঁটো হাত ধুতে উঠে পড়ে। রুম ত্যাগ করার আগে কড়া গলায় বলে যায়–
—দুই মিনিটের মাঝে ঘুমানো চাই, নাহলে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না।
রাহা ভদ্র মেয়ের মতো শুয়ে পড়ে কিন্তু ঘুম পায় না। কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে তার। অস্থির অস্থির লাগছে। তাই সে শুয়ে শুয়ে এপাশ ওপাশ করতে থাকে। মুনতাহা হাত ধুয়ে এসে দেখে রাহা না ঘুমিয়ে কেমন ছটফট করছে। সে রাহার কাছে এসে বলে–
—কি হয়েছে? ঘুমাচ্ছো না কেনো?
রাহা তার গলা পেয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে। তারপর বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টে বলে–
—ঘুম আসছে না তো আম্মু।
আফরা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে রাহার দিকে। রাহাও তার নজর সরায় না আফরার মুখ থেকে। রাহার এমন ঠোঁট উল্টে কথা বলতে দেখে আফরার আদিবাকে মনে পড়ে যায়। আদিবাও কথায় কথায় এমন ঠোঁট উল্টে বিভিন্ন আবদার করত। আদিবার সেসব আবদারে আফরা উপরে উপরে রাগ দেখালেও, মেয়ের আবদার পূরণ না করা পর্যন্ত সে শান্তি পেতো না। সেই আদরের মেয়ে আজ পরের বাড়ির বউ। চাইলেই মেয়েটাকে যখন তখন বুকে টেনে নেওয়া যায় না, কান টেনে শাসন করা যায় না। মাসে একবার হুটহাট করে এসে সারপ্রাইজ দিয়ে পরেরদিনই আবার চলে যায়। সবটা ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে আফরার বুক চিঁড়ে।
আফরা দরজাটা হালকা ভিড়িয়ে দিয়ে বেডে উঠে রাহাকে শুয়ে দিয়ে তার মাথায় বিলি কেটে দিতে দিতে বলে–
—এখন ঘুম আসবে। চোখ বন্ধ করো তাড়াতাড়ি।
রাহা আফরার এই কাজে বেশ চমকে যায়। সেই সাথে আপ্লূতও হয়। সে রাহার পেট জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে। একটা সময় ঘুমিয়েও পড়ে। আফরা রাহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নিজেও এক সময় ঘুমিয়ে যায়। বাসায় আপাতত সে আর রাহা ছাড়া কেউ নেই। আফিফ গিয়েছে হসপিটাল আর আদিয়াত অফিসে। শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর নেওয়ার পর বছর পাঁচেক আগে একটা ছোট একটা বিজনেস শুরু করেছে। এই পাঁচ বছরে বেশ সফলতাও অর্জন করেছে।
________________________
ভার্সিটি থেকে মেহরিমার আসতে আসতে বেশ লেট হয়ে যায়। একটায় ক্লাস শেষ হয়েছে তার। মূলত রাস্তায় প্রচন্ড জ্যাৃ থাকার কারণে লেট হয়েছে। সকালে জাহান তাকে ভার্সিটিতে পৌঁছে দেয় আর ক্লাস শেষে তার জন্য প্রতিদিন বাসা থেকে গাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
স্বর্গীয় সুখের আবরণে ঢেকে গেছে মেহরিমার দিনগুলো। জীবনের যে শূন্যতাগুলো এতদিন অব্যক্ত থেকে গেছে, সেগুলো যেন ধীরে ধীরে ভরে উঠছে নিঃশব্দ আশ্বস্তিতে।
বাবা-মায়ের মতো স্নেহময় শ্বশুর-শাশুড়ি, মন-প্রাণ জুড়ে থাকা এক প্রেমিক সহচর, আর বড় ভাইয়ের মতো ছায়াসঙ্গী দেবর সব মিলিয়ে মেহরিমার জীবন যেন এক নিখুঁত ছবির ফ্রেমে বাঁধা পড়ে যাচ্ছে।
অনুভূতিগুলো এখন আর হাহাকারে থেমে থাকে না, বরং ধীর লয়ে তারা পূর্ণতার সুরে গেয়ে যায় তার একান্ত স্বপ্নের গান।
মেহরিমা কলিংবেলে বাজাতেই দরজা খুলে দেয় হানিয়া। সে এতক্ষণ ড্রয়িংরুমে বসে বড় পুত্রবধূর জন্য অপেক্ষা করছিল। মেহরিমার আসতে দেরি হচ্ছিল বলে সে চিন্তা করছিলো। দরজা খুলে দিয়ে মেহরিমাকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। মেহরিমা সালাম দিয়ে বাসায় ঢুকতেই হানিয়া তাকে বসিয়ে কিচেনে চলে যায় শরবত আনতে। লেবুর শরবতের গ্লাসটি তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে নিজে তার পাশে বসে বলে–
—আস্তে ধীরে সবটুকু খাবি। আর এত দেরি হলো যে? টেনশন হচ্ছিল তো আমার সোনা….
হানিয়ার বেশ স্নেহ করে পুত্র বধূদের। এত ভালোবাসা নিয়ে প্রশ্নটি করায় না চাইতেও মেহরিমার চোখে পানি এসে পড়ে। এই আড়াই মাসে এমন ঘটনা অহরহ ঘটেছে তাও মেহরিমা নিজেকে সামলাতে পারে না। একটু আদরেই সে কেঁদে দেয়। জীবনের এতগুলো দিন আপনজনের ভালোবাসাহীন বড় হয়ে উঠেছে সে, তাই অল্পস্বল্প আদর, ভালোবাসায় কেদে দেয়। গ্লাস থেকে একটু শরবত খেয়ে আস্তে ধীরে বলে–
—আসলে রাস্তায় এত জ্যাম ছিল কি বলবো, মাঝে তো ভেবেছিলাম গাড়ি থেকে নেমে হাঁটা দেই। কিন্তু ড্রাইভার আঙ্কেল নামতে দিলো না।
—ওহ্হ। আচ্ছা সমস্যা নেই। গায়ের ঘামটা শুকিয়ে ফ্রেশ হও যাও, আমি খাবার রুমে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
—আচ্ছা। তোমরা খেয়েছো আম্মু?
—হ্যাঁ।
মেহরিমা বাকি শরবত টুকু শেষ করে উপরে নিজেদের রুমে চলে আসে। ভার্সিটির ব্যাগ পড়ার টেবিলে রেখে হিজাব খুলে ফ্যানটা ছেড়ে সোফায় বসে রেস্ট নিতে থাকে। বেশ কয়েকদিন বৃষ্টি নামলেও গতকাল থেকে প্রচন্ড গরম পড়েছে। ফ্যানের শীতল হাওয়ায় ক্লান্ত মেহরিমার কখন যে চোখ লেগে যায় সে টেরও পায় না।
ঘুরে ঘোরে কারো আলতো হাতের স্পর্শে মেহরিমার ঘুমটা ভেঙে যায়। মনহরণ করা চিরপরিচিত সুবাসটি নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করতেই তাকে স্পর্শ করা ব্যক্তিটিকে চিনে ফেলে মেহরিমা। ব্যক্তিটি খুবই সাবধানী ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ হাতটি দ্বারা মেহরিমাকে নিজের বাহুতে তুলে নিয়ে বেডের দিকে হাঁটা দেয়। মেহরিমা বিষয়টি বুঝতে পেরে আরেকটু বেশি করে নিজের মাথাটা এলিয়ে দেয় পুরুষটির বুকে। পুরুষটি বুঝতে পেরে যায় তার রমণীর ঘুম ছুটে গিয়েছে। বিরক্ত হয় সে নিজের উপরই।
বউটাকে একটু ভালো করে শুয়ে দিতে গিয়ে ঘুমটাই ভাঙিয়ে দিলো। তাও সে বেডে নিয়ে গিয়ে শুয়ে দেয়। তারপর সরে আসতে চায় তার ব্যক্তিগত রমণীটির থেকে, কিন্তু রমণীটি তা করতে দেয় না। মেহরিমা হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরে তার পুরুষটির গলা যাতে সে তাকে ছেড়ে উঠতে না পারে। জাহান তার পাশে বসে ঝুঁকে আসে মেহরিমার দিকে। সময় ব্যয় ব্যতীত আলতো করে ভালোবাসার স্পর্শ দেয় প্রিয় নারীর ললাটে। নিজের ললাটে জাহানের উষ্ণ স্পর্শের অস্তিত্ব পেয়ে খানিক লজ্জা পায় মেহরিমা। কিন্তু সেই লজ্জাকে ছাপিয়ে যায় ভালোলাগার অনুভূতি টাকে।
সে চোখ বন্ধ রেখেই জাহানকে প্রশ্ন করে–
—আজ এই অবেলায় যে? যার দেখা রাত দশটার আগে পাওয়া যায় না সে আজ ভরদুপুরে বাসায় কি কারণে?
জাহান মেহরিমার প্রশ্ন শুনে হেঁসে উঠে। কিন্তু তার হাসির কোন আওয়াজ হয় না, বরাবরের মতো শব্দহীন সেই হাসি। জাহান মেহরিমার বেবি হেয়ার গুলো আঙ্গুল দিয়ে গুছিয়ে দিতে দিতে গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠে–
—বুক চিনচিন করছে হায়, মন তোমায় কাছে চায়।
জাহানের এমন হঠাৎ গুনগুনিয়ে ওঠায় মেহরিমা ভয়াবহ রকমে চমকে যায়। সে জাহানের গলা থেকে হাত সরিয়ে এনে হা করে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। মেহরিমাকে এমন থমকে যেতে দেখে জাহান আবারও হেঁসে দেয়। কোন কথাবার্তা ছাড়াই বেডে উঠে বউয়ের বুকের উপর শুয়ে পড়ে। ক্ষীণ গলায় বলে–
—মাথায় হাত বুলিয়ে দিবে একটু বউ? ভীষণ ক্লান্ত লাগছে।
মেহরিমা আর কোন প্রশ্ন ব্যতীত জাহানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। মাঝে মধ্যে আবার হালকা করে চুলগুলো টেনে দিচ্ছে, ভীষণ আরাম বোধ করছে জাহান। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে শুয়ে থাকার পর মেহরিমা জিজ্ঞেস করে–
—ফ্রেশ হবেন না? লাঞ্চ করেছেন?
—দু’টোর উত্তরই না। পরে হবে সব, এখন একটু ঘুমাবো।
—না। আগে ফ্রেশ হবেন, তারপর খেয়েদেয়ে ঘুম। উঠুন তাড়াতাড়ি।
—প্লিজ নাাা বউ। টায়ার্ড লাগছে ভীষণ……
বাচ্চাদের মতো জেদ করে কথাগুলো বলে জাহান। মেহরিমা জাহানকে ঠেলে উঠাতে উঠাতে বলে–
—একজন দায়িত্বশীল ডাক্তার হয়ে এমন জেদ মানায় আপনাকে? বাহির থেকে এসেছেন কত জীবাণু আছো শরীরে। উঠুন,ফ্রেশ হবেন। আপনি আগে যান,আপনি ফ্রেশ হয়ে বের হলে নি যাবো।
মেহরিমার ঠেলাঠেলিতে জাহান উঠে তো বসে ঠিকই কিন্তু তার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলা করছে। সে ভদ্রলোকের মতো শোয়া থেকে দাঁড়ায়। মেহরিমাও শোয়া থেকে উঠে বসেছে ততক্ষণে তারপর কোন আগাম বার্তা ছাড়াই মেহরিমাকে কোলে তুলে ওয়াশরুমে দিকে হাঁটা দেয়। মেহরিমা থতমত খেয়ে জিজ্ঞেস করে–
—কি হলো আবার? আমাকে নিয়ে যাচ্ছেন কেনো?
—আমি তোমার কথা শুনলাম, এখন তুমি আমার কথা শুনো। চুপচাপ চলো।
মেহরিমা জানে জাহান কেমন জেদি, তাই আর কথা বাড়ায় না। লোকটার সঙ্গ যে সেও বেশ উপভোগ করে। এতদিনে তার ভাগ্যের সবটুকু সুখ তার দরজায় এসে উপস্থিত হয়েছে। মেহরিমা কি করে সেই সুখকে ফিরিয়ে দিবে, তাই তো সবটুকু সুখ সাদরে গ্রহণ করছে।
_______________________
রাহার ঘুম ভাঙে বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে। সেই একটায় এসে ঘুমিয়েছে আর উঠল সাড়ে পাঁচটায় তাও শ্বাশুড়ি মায়ের ডাকে। কিন্তু এতক্ষণ ঘুমানোর পরও তার তন্দ্রা ভাবটা কাটছে না। সে ঘুমে ঢুলুঢুলু পায়ে ওয়াশরুমে গিয়ে অজু করে আসে। আগে নামাজ না পড়লেও বিয়ের পর থেকে আফিফ ও তার শ্বশুড়-শ্বাশুড়ির প্রচেষ্টায় রাহা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে এখন।
ওয়াশরুমে ঢুকেই সে আফিফের বডি স্প্রে’র গন্ধ পায়। কিন্তু রুমে বা বেলকনিতে কোথাও তার জামাকাপড় দেখতে পায়নি সে। রাহা আসরের নামাজ পড়ে কতক্ষণ বেলকনিতে৷ আনমনে বসে বসে ভাবতে থাকে আফিফের কথা। ইদানীং এটাই তার একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আফিফকে নিয়ে সে বরাবরই বড্ড বেশি ভালোবাসে।
মাগরিবের আজান দিতেই নামাজ পড়ে নিচে চলে যায়। শ্বশুর-শ্বাশুড়ির সাথে একসাথে বসে হালকা চা-নাশতা করে উপরে রুমে চলে আসে। হঠাৎই তার গা গুলিয়ে বমি চলে আসে। দৌড়ে ওয়াশরুমে গিয়ে বৃি করতে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ লাগিয়ে পেটের সব বের করে ক্লান্ত হয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়। ওয়াশরুম থেকে বের হয়েই ধপ করে শুয়ে পড়ে। একটু শুয়ে থাকার পর তার খানিকটা ভালো লাগলে শোয়া থেকে উঠে বই-পুস্তক নিয়ে বসে। বই-খাতা নিয়ে বসে তো ঠিকই কিন্তু পড়া হয় না তেমন কিছুই। ঘুম ঢুলতে থাকে। সে বুঝে উঠতে পারছে না ইদানীং তার এত ঘুম আর বমি বমি পায় কেনো।
এশারের পর কিছু না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। আফরা জোর করলে বলে আফিফ এলে তারা দু’জন একসাথে খেয়ে নিবে। আফরা আর কিছু বলে না। রাত বারোটার দিকে কারো ধাক্কাধাক্কিতে রাহার ঘুম ভেঙে যায়। চোখ মেলে তাকালে আফিফকে দেখতে পায় নিজের মুখের উপর ঝুঁকে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মুখে হালকা হাসি। রাহা আফিফকে দেখে একটু চমকে যায়। তাড়াহুড়ো করে উঠতে গেলে দু’জনের মাথার একে অপরের সাথে বা”’রি খায়। আফিফ “আঃ” করে মাথা ধরে খানিকটা পিছিয়ে গেলে রাহা নিজের ব্যথা ভুলে গিয়ে তার জন্য অস্থির হয়ে যায়। আফিফের ব্যথা পাওয়া জায়গায় হাত দিয়ে ডলতে ডলতে বলে–
—সরি সরি। আসলে আমি হুট করে আপনাকে দেখে একটু চমকে গিয়েছিলাম। বেশি ব্যথা পেয়েছেন? দেখি হাত সরান।
আফিফ হালকা হেঁসে বলে–
—তেমন ব্যথা পাইনি। তুমি এত অস্থির হয়ো না তো।
আজ অনেকগুলো দিন পর রাহা আফিফের মুখে হাসি দেখল। সদা হাস্যোজ্জ্বল আফিফ ইদানীং মুখটা গম্ভীর করে রাখত। তার মুখের সেই হাসিখানা রাহা অনেক মিস করছিল।
রাহা মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাকিয়ে থাকে আফিফের দিকে। আফিফ কিউট করে বলে–
—রাহা, ছাঁদে যাবে?
রাহা তার দিকে তাকিয়ে থেকেই মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়। তার সম্মতি পেয়ে আফিফ তার ডান হাত রাহার দিকে বাড়িয়ে দেয়। রাহা একবার আফিফের দিকে আরেকবার তার বাড়ন্ত হাতের দিকে তাকায়। আফিফ তাকে নিজের হাতের উপর হাত দিতে না দেখে, বলে উঠে–
—কি যাবে না? ভরসা নেই আমার উপর?
ভরসা? রাহা তো তার বাবার পর একমাত্র আফিফকেই চোখ বন্ধ করে ভরসা করে। রাহা আসলে একটু চমকে গিয়েছিলো আফিফকে হাত বাড়িয়ে দিতে।
রাহা যখন এই প্রশ্নটিরও উত্তর দেয় না তখন আফিফের মন খারাপ হয়ে যায়। সে মুখটা মলিন করে নিয়ে তার হাতটা সরিয়ে আনতে নিলে রাহা তার হাতের উপর নিজের হাত দেয়। আফিফ চমকে তার দিকে তাকালে রাহা বলে–
—পাপার পর আপনাকে আমি চোখ বন্ধ করে ভরসা করি আফিফ।
রাহার কথাটা শুনে আফিফের মুখে পুনরায় হাসি ফুটে ওঠে। সে রাহার হাত ধরে ছাদে নিয়ে যেতে থাকে।ছাঁদের সিঁড়ির মাঝামাঝিতে আসতেই আফিফ হাঁটা থামিয়ে দিয়ে রাহার পেছনে গিয়ে তার চোখ একটা কালো কাপড় দিয়ে বেঁধে দেয়। রাহা চমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে–
—আফিফ, চোখ বাঁধলেন কেনো? আমি হাঁটবো কিভাবে এখন?
আফিফ তার মুখটা রাহার কানের কাছে নিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে বলে–
—আমি আছি না, তোমার ডাক্তার সাহেব।
কথাটা বলেই আফিফ ঝট করে রাহাকে কোলে তুলে নেয়। তারপর রাহাকে কোলে করে নিয়ে গিয়ে ছাদের মাঝ বরাবর দাঁড় করিয়ে দিয়ে নিজে কোথায় যেনো চলে যায়। রাহা আফিফের কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে তাকে ডেকে উঠে, কিন্তু আফিফ তাতেও সাড়া দেয় না। রাহা খানিকটা ভয় পেয়ে গিয়ে চোখের বাঁধনটা খুলে ফেলে। আর সাথে সাথেই একঝাক আলো এসে তার চোখে লাগে। রাহা নিজের চোখটা আবার বন্ধ করে নিয়ে পুনরায় আস্তে আস্তে পিটপিট করে তাকায়।
যখন তার চোখ আলো টাকে সহ্য করে নেয় তখন সে আশেপাশের পরিবেশ দেখে ভয়াবহ রকমের চমকে যায়। কেনো? কারণ তাদের ছাদটা অনেক সুন্দর করে লাইটস ও বেলুন দিয়ে সাজানো হয়েছে। এছাড়া আরে একটি কারণে রাহা চমকে গিয়েছে আর তা হলো, আফিফ এক গুচ্ছ লাল গোলাপ নিয়ে রাহা সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। রাহা অবাক হয়ে তার দিকে তাকালে আফিফ বলতে শুরু করে–
—আমি জানি না, ঠিক কিভাবে বললে আমার হৃদয়ের অনুভূতি গুলো বুঝবে। শুনেছি, এই লাল গোলাপ দিয়ে প্রেয়সীর সামনে হাঁটু গেড়ে “আমি তোমায় ভালোবাসি” বললে নাকি ভালোবাসা প্রকাশ করা হয়। আসলে সারাজীবন সিঙ্গেল কমিটির একজন দায়িত্ববান সদস্য ছিলাম তো তাই এসব বিষয়ে আমি একদমই কাঁচা।
আমি জানি তুমি বুঝতে পেরেছো আমি কি বলতে চাইছি। তাও তুমি যাতে কখনো অভিযোগ করতে না পারো তাই স্পষ্ট করে বলছি, আই লাভ ইউ রাহা। আই লাভ ইউ সো মাচ। উইল ইউ বি মাই সোলমেট।
রাহা অবাক হয়ে ছলছল চোখে তার আফিফের দিকে তাকিয়ে আছে। তার ঠোঁট গুলো কাঁপছে। নাকের পাটা একটু একটু করে ফুলে উঠছে। যেকোন সময় কেঁদে দিতে পারে সে।
—কি হলো বলে রাহা? চুপ থেকো না আজ। তুমি হবে আমার প্রেয়সী? আমার রাতজাগার সঙ্গী? হবে তুমি?
রাহা কাঁপা কাঁপা গলায় সম্মতি দিতে যাবে তার আগেই তার চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে যায়। মাথা ঘুরে পড়ে যেতে নিলে আফিফ ঝট করে এসে তাঁকে নিজের বাহুতে জড়িয়ে ধরে। অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে রাহা।
শব্দসংখ্যা-২০০০
~চলবে?
[ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]

