#সাঝের_প্রণয়ডোর
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
#পর্ব_৫৯(রোমান্টিক এলার্ট)
টিনের দরজায় অনবরত হাত দিয়ে বারি দেওয়ার আওয়াজে হায়া ও আশিয়ানের ঘুমটা পাতলা হয়। হয় একটু নড়েচড়ে আশিয়ানের বুকে পোক্ত ভাবে মুখ ডুবিয়ে রেখে আবারও ঘুমিয়ে যায়। কিন্তু আশিয়ান আর ঘুমায় না। তার এক বদ অভ্যাস আছে। একবার ঘুম ভেঙে গেলে আর ঘুম আসে না সহজে।
সে শোয়া অবস্থাতেই একহাত দিয়ে চোখ কচলে ঘুমটা পুরোপুরি ছাড়িয়ে নেয়। তারপর উঁচু গলায় বলে–
—কে?
দরজার অপর পাশ থেকে উত্তর আসে–
—আমি তোমার আম্মু।
আশিয়ান মায়ের কণ্ঠ সে সাথে সাথে চিনতে পেরে যায়। স্পর্শ আবারও বলে–
—উঠবে না? নয়টা বেজে গিয়েছে অলরেডি। হায়াকে কিছু খাওয়ানো দরকার।
কি? নয়টা বেজে গিয়েছে? আশিয়ান তাড়াতাড়ি করে বালিশের পাশ থেকে ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে স্ক্রিন অন করে সময় দেখে নেয়। হ্যাঁ, তার মা ঠিক বলেছে। নয়টা পাঁচ বাজতে চলেছে। এত লেট হয়ে গেলো আজ তাঁদের? আশিয়ান ফোনটা পূর্বের জায়গায় রেখে চাচীকে বলে–
—তুমি যাও আম্মু, আমরা আসছি।
—আচ্ছা আসো তাড়াতাড়ি।
স্পর্শ চলে যায়। আশিয়ান আস্তে ধীরে হায়াকে বুকে নিয়েই আধশোয়া হয়। তারপর ধীরেসুস্থে তাকে ডাকতে থাকে–
—হায়া, উঠবে না বউপাখি? নয়টা বাজতে চললো, কিছু খেয়ে আবার ঘুমাও।
হায়া ঘুমের ঘোরেই বিরবিরিয়ে কি জানি বলে আবার চুপ হয়ে যায়। আশিয়ান বুঝতে পারে এই মেয়েকে আজ এমন তুলুতুলু করে ডাকতে তাদের সকালের নাস্তা আর দুপুরের খাবার একসাথেই সারতে হবে। এবার সে জোরেই ডাক দেয়–
—হায়া, উঠো। অনেক বেলা হয়ে গিয়েছে। উঠে নাস্তা করে তারপর ঘুমিয়ে থেকো, উঠে বলছি। এই হায়া।
কানের সামনে আশিয়ানের অনবরত ডাকাডাকি উপেক্ষা করে হায়া আর ঘুমাতে পারে না। একটা সময় ঘুম ভেঙেই যায়। শোয়া থেকে উঠে বসতেই তার কেমন গা গোলাতে থাকে, কিন্তু সে এই শরীর খারাপ লাগাটাকে পাত্তা দেয় না। আশিয়ান নিজেই হায়ার চুলগুলো একটা ক্লিপ দিয়ে সুন্দর করে গুছিয়ে দেয়। হায়া রুমে থাকা ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসে। সে বের হয়ে আসলে, আশিয়ানও যায় ফ্রেশ হতে। সে এসে একটা ওড়নাটা পরিপাটি করে হায়ার গায়ে এলিয়ে দিয়ে তাকে নিয়ে বাহিরে চলে আসে।
দরজা খুলতেই বৃষ্টি ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ তাদের নাকে এসে বারি খায়। নিমিষেই মনটা ফুরফুরে হয়ে যায়। হায়া আশিয়ানের হাত ছেড়েই আগে আগে হাঁটতে থাকে। কাল রাতে সে আর আশিয়ান এবং জাহান আর মেহরিমা গ্রামের বাড়িতে আসে। রাস্তায় হায়া বমি করতে করতে এত কাহিল হয়ে গিয়েছিল, তাই বাড়িতে পৌছিয়েই আশিয়ান তাকে দুটো খাইয়ে দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে।
জায়িন-আদিবাও আসার কথা ছিল, কিন্তু আসেনি। আসার আগের দিন আদিবার হঠাৎই সে কি বমি আর মাথা ঘুরানো। টেস্ট করে জানা গিয়েছে, আদিবা জমজ বাচ্চার মা হতে চলেছে। তার শরীরে ভিটামিন ও রক্তস্বল্পতা রয়েছে। এই সময় জার্নি করা রিক্স হবে। তাই আর তাকে আনে নি কেউ। আদিবার যদিও একটু মন খারাপ হয়েছিল, কিন্তু দু’টো বাচ্চার জননী হতে চলেছে এটা মনে করেই তার সকল মন খারাবি উবে গিয়েছে। সেখানে ঠায় নিয়েছে, তার অনাগত সন্তানদের জন্য চিন্তা।
হায়াদের বংশ পরম্পরায় জমজ বাচ্চা হওয়ার বহু কাহিনি রয়েছে। তার মায়ের থেকে এই পরম্পরা শুরু হয়েছে। তারপর তার ভাইয়েরা হলো। এখন আল্লাহ দিলে তার ভাইয়ের ঘরেও দুটো নেয়ামত আসতে চলেছে।
হায়া উঠানে এসে হাত বাড়িয়ে দেয় সামনের দিকে। কিছুক্ষণ আগ অব্দি বৃষ্টি পরছিল, পাঁচ-সাত মিনিট আগে থেমেছে। চাল থেকে তখনও টুপটাপ করে কয়েক ফোঁটা করে বৃষ্টির পানি পড়ছে। হায়া মুগ্ধ হয়ে আশেপাশের পরিবেশ উপভোগ করতে করতে বলে–
—আশিয়ান, পরিবেশটা কি সুন্দর না? মাশা আল্লাহ।
আশিয়ান ততক্ষণে তার পেছনে এসে উপস্থিত হয়েছে। সেও নিঃশব্দে হেঁসে বলে–
—হুম, খুব সুন্দর। একদম আমার লাল টমেটো বউয়ের মতো।
লাল টমেটো বলায় হায়া মিছেমিছি রেগে যায়। ইদানীং কথায় কথায় রাগ উঠে তার। সে আশিয়ানের দিকে ফিরে কপট রাগী গলায় বলে–
—আমি টমেটো? এখন আমাকে টমেটো, মুলা, কচুঘেঁচু কত কিছু যে লাগবে। পুরোনো হয়ে গিয়েছি না। যত্তসব! মুডের চৌদ্দটা বাজিয়ে দিল।
নিজের মতে বকেঝকে সেখান থেকে চলে যায় খাবারের ঘরে। আশিয়ান বেআক্কলের মতে বউয়ের বকা গুলো শুনল। বেচারা এটা বুঝতে পারল না সে খারাপ কি বলেছে, কত সুন্দর পাকা টশটশা টমেটোর সাথে তুলনা দিল। বউটা তো দিনকে দিন সেই লাল টকটকে টমেটোর চেয়েও বেশি সুন্দর হয়ে যাচ্ছে। দেখলেই আদর আদর পায় আশিয়ানের। এটা বলাও কি দোষের?
আশিয়ানের নিজের জন্য এক আকাশ সমান মায়া হলো। মায়া দয়া একপাশে রেখে সেও যায় যায় খাবারের ঘরে। তারা আসতেই স্পর্শ তাদেরকে নাস্তা বেড়ে দেয়। গরম গরম ধোঁয়া ওঠা খিচুড়ি সাথে মুরগির মাংস, আলু ভর্তা, শুটকি মাছের ভর্তা, পেয়াজ-শুকনা মরিচের ভর্তা, ডিম ভাজা। আশিয়ানরা কেউই সকাল সকাল এত ভারী খাবার তেমন একটা না খেলেও আজ এত টাটকা টাটকা খাবার আর বৃষ্টিমুখর ঠান্ডা পরিবেশে এমন ধোঁয়া ওঠা গরম গরম খাবার সকলেই পেটপুরে খায়।
হায়া খাবার নিয়ে প্রায়ই গাইগুই করলেও আজ সে বেশ অনেকখানি খাবার খায়। খাওয়াদাওয়া শেষ করে আবরার এসে জানায় মি.মির্জা ঘুম থেকে উঠেছেন। তাদের সকলের সাথে দেখা করতে চাচ্ছেন। সকালে ফজরের নামাজ পড়ে হালকা কিছু খেয়ে আবার একটু ঘুমান সে। তাকে ডাক্তার টেস্টে থাকতে বলেছেন। জাহান-মেহরিমা, আশিয়ান-হায়া তখনই ছুটে যায় তার রুমে।
তারা যখন মি.মির্জা রুমের দুয়ারে এসে হাজির হয় তখন একটা চোখজুড়ানো দৃশ্যের সাক্ষী হয়। মিসেস মির্জা চোখ গরম করে মি.মির্জাকে স্যুপ খাওয়াচ্ছেন। অসুস্থতার কারণে মি.মির্জা মুখের রুচি একদমই নষ্ট হয়ে গিয়েছে, তেমন কিছুই খেতে পারেন না।
বৃদ্ধা মিসেস মির্জা চোখ গরম দিয়ে সবটুকু স্যুপ শেষ করে স্বামীর মুখটা মুছিয়ে বিছানা ছেড়ে দাঁড়ালে, দরজার কাছে নাতি-নাতনীদের দেখতে পান। তাদেরকে কেউ জানায়নি আশিয়ানদের আসার কথা।তিনি অবাক হয়ে যায় তাদের দেখে। বিশেষ করে আশিয়ানকে দেখে। আজ প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর পর প্রিয় নাতিকে দেখে সে কিছু সময়ের জন্য থমকে গিয়েছে।
সে ধীরস্থির পায়ে আশিয়ানের সামনে এসে নিজের কুঁচকে যাওয়া কাঁপা কাঁপা হাতটা দিয়ে আশিয়ানের গাল স্পর্শ করে। লম্বায় আশিয়ান পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চির মতো। স্বাস্থ্যও মাশা আল্লাহ নজরকাড়া। চেহারায় সুপুরুষ ভাবটা সে তার বাপ-দাদার কাছ থেকে পেয়েছে। একমাত্র নাতি হওয়ায় সকলে আশিয়ানকে মাথায় রাখত না উকুনে ধরবে বলে, মাটিতে রাখত না পিঁপড়ায় কামড়াবে বলে, এমনই আদরযত্ন করে বড় করা হয়েছে আশিয়ানকে।
মিসেস মির্জার চোখ ছলছল করে উঠে। সে ক্ষীণ গলায় ডেকে উঠে–
—আশিয়ান! তুই সত্যি সত্যি এসেছিস দাদুভাই?
আশিয়ান তার গালে থাকা দাদীর হাতের উপর হাত রাখে। তারপর সেই হাতটা নিজের মুখের কাছে এনে সেটায় আলতো করে একটা চুম্বন করে বলে–
—হ্যাঁ, দাদী আমি এসেছি। তোমার আশিয়ান এসেছে।
মিসেস মির্জা নাতিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয়। তার কত শখের, ভালোবাসার নাতি আশিয়ান আজ এতগুলো বছর পর আবার ফিরে এসেছে তাদের কাছে।
_______________________________
ল্যাপটপ থেকে মাথা তুলে বেডের দিকে তাকালে আফিফের কপালে কয়েকটা ভাজ পড়ে। একটু আগেও সে এখানে রাহাকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখেছে, অথচ এখন নেই। কই গেলো মেয়েটা?
আফিফ ল্যাপটপটা কোল থেকে নামিয়ে সেন্টার টেবিলের উপর রাখে। তারপর বসা থেকে উঠে দাড়িয়ে আনমনেই বেলকনিতে চলে যায়। তার অবচেতন মন কেন জানি বারবার করে বলছিল, রাহা এখানেই আছে।
বেলকনিতে এসে দেখা যায়, তার ধারণাই সঠিক। রাহা দোলনায় বসে ফোনে তার মায়ের সাথে কথা বলছে। মুখে তার এক চিলতে মিষ্টি হাসি। আর তার বাম হাতটা পেটের উপর রাখা, যেনো তার ভালোবাসার চিহ্নটিকে অনুভব করার ক্ষুদ্র প্রয়াস। আফিফ দরজায় হেলায় দিয়ে দাঁড়িয়ে রাহাকে দেখতে থাকে। সে এতদিন কত প্রেগন্যান্ট মহিলাকে দেখেছে। প্রেগ্ন্যাসির জন্য নারী দেহে অনেক হরমোনের বিকাশ ঘটে। এসব বিকাশের ফলে অনেকেই দেখতে আগের থেকে সুন্দর হয়ে যায় তো, অনেকের শরীর সেই বিকাশের ধাক্কা সইতে না পেরে দূর্বল হয়ে পড়ে।
রাহার প্রেগন্যান্ট হওয়ার খবর জানার পর থেকে আফিফ তার থেকে চোখ সরানোই বড্ড বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে। রাহা আগের থেকেই নজরকাঁড়া সুন্দরী ছিল, এখন তো মাতৃত্বের হাওয়া লেগেছে তার গায়ে। তার সৌন্দর্যে যেনে আশেপাশের পরিবেশও ঝলমল করে উঠছে।
আফিফ বেশ কিছুক্ষণ রাহাকে এক ধ্যানে দেখে তারপর আস্তে আস্তে করে তার সামনে গিয়ে উপস্থিত হয়। রাহা হুট করে তাঁকে দেখে খানিক চমকে গেলেও নিজেকে সামলে নেয়। আফিফকে ইশারা করে পাশে বসতে বলে। আফিফ বসে তো ঠিকই কিন্তু তার পাশে না বরং রাহার পায়ের কাছটায়। সেখানে বসে নিজের মাথা এনে রাখে রাহার কোলে, চোখ বন্ধ করে নিজেকে শান্ত করতে চায়। বুকের ভেতর যে তার ভালোবাসার ঝড় উঠেছে।
রাহা কথা বলতে বলতেই নিজের বাম হাতটা পেট থেকে সরিয়ে এনে আফিফের চুলের ভাঁজে ডুবিয়ে দেয়। বিলি কাটতে কাটতে আলতো হাতে টানতে থাকে তার চুল। আফিফের ভীষণ আরাম বোধ হয়। সে রাহার কোলে মাথা রাখা অবস্থায় শুনতে পায়, রাহা তার মা’কে বলছে–
—না আম্মু, এখন যাবো না। তোমরা কয়দিন এসে থেকে যাও না।
—…………..
—আমি চলে গেলে শ্বাশুড়ি আম্মু একদম একা হয়ে যাবে। আদিবারও তো বেবি হবে, ও একটু অসুস্থ দেখে আসতে পারবে না। তার মধ্যে যদি আমিও তোমার কাছে চলে যাই বেচারি একা ফিল করবে না?
—…….
—আসব তো। আদিবা একটু সুস্থ হয়ে এই বাড়ি আসুক, আমি তখম তোমার কাছে যাবো নে। কিন্তু এখন তো একেবারেই সম্ভব নয়।
আরো নানান কথা বলতে থাকে রাহা তার মায়ের সাথে। আফিফ তার এসব কথা শুনে মনে পড়ে যায় চারদিন আগের কথা, যখন কিনা তারা প্রেগ্ন্যাসির বিষয়টা প্রথমবারের মতো সকলকে জানিয়েছিল। একদিকে, মেয়ে মা হতে চলেছে। অন্যদিকে পুত্রবধূও সন্তানসম্ভবা। আফরার তো খুশি ধরে না।
রাহার প্রেগন্যান্সির খবর পেয়ে তার বাবা-মাও ছুটে আসে মাহমুদ ভিলায় প্রথমবারের মতো। রাহার মায়ের থেকে তার বাবাই বেশি কেঁদেছে মেয়ের সন্তান হওয়ার কথা শুনে। বড্ড আদরের কিনা মেয়েটা। ফেরার সময় রাহার বাবা-মা মেয়েকে নিজেদের সাথে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব জানায়। আদিয়াত ও আফরা বিষয়টা রাহার উপরই ছেড়ে দেয়। এই সময়ের তার যেখানে ইচ্ছে থাকুক। বলাবাহুল্য, শ্বশুর বাড়ি বা বাবার বাড়ি কোথাও তার আদর যত্নে এক বিন্দুও কম হবে না।
রাহা শ্বশুর বাড়িতেই থেকে যায়। এতদিন পর প্রকৃত অর্থে বরের ভালোবাসা পাচ্ছে, এখনই সেই ভালোবাসা থেকে দূরে যেতে চায় না। আরো কিছুদিন বর থেকে তার প্রাপ্য ভালোবাসা নিয়ে তারপর না-হয় যাওয়া যাবে বাবার বাড়ি।
রাহার বাবার বাসায় না যাওয়ার সিদ্ধান্তে আফিফ সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছে। সেও চায় না এত তাড়াতাড়ি বউটাকে নিজের কাছ ছাড়া করতে।
আফিফের ধ্যান ভাঙে রাহার কোমল গলার ডাকে। রাহা বলছে–
—এই শুনছেন? ঘুমিয়ে পড়েছেন নাকি আবার? ঘুমাতে হলে রুমে গিয়ে ঘুমান।
আফিফ রাহার কোল থেকে মাথা তুলে তার দিকে তাকায়। মেয়েটা বিড়ালের মতো পিটপিট করে তার দিকে কিছুটা ঝুঁকে এসে তাকিয়ে রয়েছে। স্নিগ্ধ, কোমল মুখখানা আদর দিয়ে লাল করে ফেলতে মন চাচ্ছে আফিফের। মন কিছু চেয়েছে আর আফিফ তা করবে না তা খুব কম হয়েছে। বিয়ের দিন রাহা অশ্রুসিক্ত মুখখানা দেখে তার মন বলে উঠেছিল, এই মেয়ের পাশে তোর থাকা উচিত আফিফ। বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে, বন্ধু হিসেবে, ভালোবাসার মানুষ হিসেবে। সেদিন মনের কথা শুনেই তো বিয়েটা করল। ভাগ্যিস করেছিল, নাহলে এত ভালোবাসা, এত সুন্দর অনুভূতির সাথে পরিচয় হতো কি করে।
আফিফ রাহার গাল নিজের হাত দ্বারা স্পর্শ করে। গম্ভীর অথচ প্রেমময় গলায় বলে–
—আমার একটা সিক্রেট শুনবে?
—কি?
—আমি আমার মস্তিষ্কের চেয়ে মনের কথা বেশি শুনি। এই মনটা কয়েকমাস আগে কোন একদিনে, এক অশ্রুসিক্ত বধূয়া সাজে সজ্জিত রমনীকে দেখে বলেছিল, আফিফ এই মেয়েটাকে তোর ভীষণ প্রয়োজন। তাকেও হয়ত তোর প্রয়োজন পড়বে জীবনের কোন একসময়। ভাবাভাবি বাদ দিয়ে তাকে নিজের নামে করে নে।
সেদিন মনের কথা শুনেই, বন্ধুর কাজিনের বিয়েতে গিয়ে সেই কাজিনের না হওয়া বউকে নিজের বউ করে নিলাম। ভাগ্যিস নিয়েছিলাম, নাহলে আমায় এত নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবাসার জন্য কাউকে কি আদৌও খুঁজে পেতাম আমি?
রাহা আফিফের চোখে চোখ রেখে তার কথাগুলো শুনছে। তার স্মৃতির পাতায়ও সেদিনটা আবারও ভেসে উঠেছে। জাহান তাকে প্রত্যাখ্যান করে বিয়ের আসর ছেড়ে মেহরিমার কাছে চলে যাওয়ায় সে ভীষণ কষ্ট পেয়েছিল। অনেকটা ভেঙেও পড়েছিল। তারপর হঠাৎই আফিফের প্রস্তাবে অন্যদের মতো সে নিজেও অনেক অবাক হয়ে গিয়েছিল।
আফিফ সেই একই সুরে আবারও বলে–
—জানো, এই মুহুর্তেও আমার মন আমায় একটা কাজের নির্দেশনা দিচ্ছে।
—আর সেই কাজটা কি?
—সদ্য প্রেমে পড়া মনটা বলছে, ছিঃ আফিফ আজ সারাদিন বাসা থেকেও একবারের জন্যও বউটাকে আদর দিলি না। তোর বউয়ের চুপসে থাকা মুখখানা দেখে তোর কি একটু দয়ামায়া হচ্ছে না। তোর তো উচিত বাসায় থাকতে, উঠতে-বসতে বউকে আদর করা। এখনই আদর করার মিশনে নেমে পড়।
আর তোমায় তে আগেই বললাম, আমি আমার মনের কথা সব থেকে বেশি শুনি। তাই এই কথাটাও আমাকে অবশ্যই শুনতে হবে।
কথাটা শেষ করেই আফিফ নিচ থেকে উঠে দাঁড়ায়। তারপর খুবই সাবধানে রাহাকে কোলে তুলে নিয়ে রুমের দিকে হাঁটা লাগায়। রাহা প্রথমে লজ্জা পেয়ে ছটফট করলেও পরবর্তীতে আফিফের চোখে তাকে পাওয়ার জন্য আকুলতা দেখে রাহার সকল ছটফটানি দূর হয়ে যায়।
রুমে এসে রাহাকে আস্তে করে বেডে শুয়ে দেয়। দরজাটা ভিড়ানো ছিল দেখে ভালো করে লাগিয়ে দিয়ে বউয়ের অতি নিকটে চলে আসে। রাহাও হাত বাড়িয়ে দেয় ভালবাসার পুরুষটির দিকে।
তাদের প্রথম কাছে আসাটা ছিল রাহার হুঁশহীন অবস্থায়। কিন্তু আজ তাদের কাছাকাছি আসার ক্ষণে আফিফ ও রাহা দু’জনই সম্পূর্ণ চেতনায় রয়েছে, এবং পূর্ণ ভালোবাসার সহিত একে অপরের কাছে নিজেদের বিলিয়ে দিচ্ছে।
দীর্ঘ সময়ের ওষ্ঠ ভালোবাসা শেষ করে আফিফ রাহার গলার থেকে ওড়না সরিয়ে দিয়ে সেখানে মুখ গুঁজে দেয়। খুচরো খুচরো ভালোবাসায় ভরিয়ে দিতে থাকে রাহার কাঁধ, গলার উন্মুক্ত অংশগুলো। রাহা চোখ বন্ধ করে অনুভব করতে থাকে তার প্রিয়তমের স্পর্শ গুলো।
তেমন একটা গভীর স্পর্শ না করেও রাহাকে স্বর্গসুখে ভাসিয়ে দিতে থাকে আফিফ। গলার থেকে মুখ উঠিয়ে এনে আফিফ এবার নিচে রাহার পেটের দিকে তাকায়। এই টুকুন একটা পেটে আরেকটা জান আছে। তার আর রাহার ভালোবাসার অংশ। আফিফ রাহার পেটের কাছে মুখ এনে জামার উপর দিয়েই উষ্ণ স্পর্শে ভরিয়ে দিতে। একটু শান্ত হয়ে কোমল গলায় বলে–
—আম্মু, এই প্রিন্সেস, তোমার আম্মুকে কিন্তু একটুও কষ্ট দিবে না সোনা, ঠিক আছে? তোমার আম্মু তো নিজেও ছোট, সেই ছোট আম্মুকে কষ্ট দিলে বাবা কিন্তু রাগ করব। তুমি না বাবার প্রিন্সেস, বাবার কথা শুনবে ঠিক আছে। তাহলে বাবা বড় হলে আমার মতো একটা সুন্দর ছেলের সাথে বিয়ে দিবো তোমার।
আফিফের লাস্টের কথাগুলো শুনে রাহা উচ্চস্বরে হেঁসে দেয়।
শব্দসংখ্যা~২০৪২
~চলবে?
[মেঘলাকে নিয়ে পরবর্তী পর্ব থেকে লেখা হবে।
ভাই রে ভাই! গতপর্বে আপনাদের কমেন্টগুলো দেখে আমি যেমন হেসেছি, তেমনি মন খারাপ করেছি। আমার একটা কথা, সব যদি আপনারাই ঠিক করে দেন আমি কি করবো? কার সাথে কার মিল দিবো? সবটা যদি আপনারাই ঠিক করে দেন তাহলে আমার লেখালেখি করার মানে দেখছি না।
যখনই একটু মিস্ট্রি বা ট্র্যাজেডি দেই তখনই আপনাদের কাছে সেটা স্টার জলসার নাটক মনে হয়। আবার শুধু প্রেম-পিরিত দিলেও একঘেয়েমি লাগে। আপনাদের মতিগতি বুঝা বড় দায়।
সে যাই হোক,আমি আমার মতো লিখব। আপনাদের পড়তে মন চাইলে পড়ুন, আর যদি মনে হয় স্টার জলসা হয়ে যাচ্ছে তাহলে এখনই স্কিপ করুন। পড়তেই হবে এমন কোন জোর নেই। আমার কথায় কারো খারাপ লাগলে দুঃখিত আমি।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]

