#প্রণয়ের_রূপকথা (১৬)
আবিদা চটে গিয়ে বললেন,”এই অসভ্যর মতন আচরণটা না করলে হোতো না?”
মায়ের থেকে নিজের হাতখানা ছাড়িতে নিল আয়ানা। বেশ জোরেই চেপে ধরেছিলেন তিনি।
“শুরু হলো তোমার জ্ঞান দেয়া। নিজের মেয়ের প্রতি দরদ না দেখিয়ে পরের মেয়ের প্রতি দরদ দেখাচ্ছে। বেশ ভালো।”
“একটা চড় দেব।”
“সেটাই তো পারবে। দাও চড়।”
বলে এগিয়ে এল আয়ানা। আবিদা বিস্ময়ে কথা বলতেই ভুলে গেলেন।
“আমার সহ্য হয় না কাউকে। ওদেরকে আমি জানি না কী করব।”
“কী করবে?”
বলে মেয়ের বাহু টেনে ধরলেন আবিদা। আয়ানা বিরক্তি ভাব নিয়ে বলল,”হাত ধরে টানাটানি করছো কেন?”
“তোমাকে আসলেই চড় দেওয়া উচিত আয়ানা। গতকাল কণাকে শিক্ষা নিয়ে বলেছিলাম। আজ দেখি তোমারই শিক্ষা নেই।”
“উফ, মা। বিরক্ত লাগছে।”
“লাগুক। একটা কথা শুনে রাখো, এই রকম কাজ আর যেন না দেখি। কণার প্রতি তোমার রাগ আছে। কিন্তু সেটা কুহুর উপর কেন উঠালে?”
আয়ানা কথা বলল না। মৌন হয়ে রইল। আবিদা বুঝতে পারলেন। তিনি মেয়েকে পুনরায় চেপে ধরলেন।
“দীপ্র কোনো বস্তু নয় যে তাকে ছিনিয়ে কেউ নিতে পারবে কিংবা এনে দেওয়া যাবে। বোকা বোকা কাজ না করে পারলে তার মন জয় করো। যা শুরু করেছ, এতে তুমি মন জয় তো দূর,উল্টো অনেক দূরত্ব বাড়িয়ে দেবে।”
মায়ের এই কথাটা আয়ানাকে ভাবিয়ে তুলল। ওর চোখে মুখে চিন্তা এসে ভর করল।
“শোনো কথাটা।”
শান্ত সুরে বললেন আবিদা। আয়ানা এবার পুরো মনোযোগ দিল। মায়ের দিকে সরল চোখে চাইল।
“দীপ্র বিয়েটা ভাঙলেও, কুহু-কণার প্রতি ওর আলাদা স্নেহ আছে। ওর বাবা নেই এই কারণেই নাকি এটা অন্য কারণ তা এখন বোঝা মুশকিল। তবে আয়ানা, তুমি দিনকে দিন বাড়াবাড়ি শুরু করেছ। এতে দীপ্রকে পাওয়ার পূর্বেই হারিয়ে ফেলবে।”
আয়ানা শুকনো একটা ঢোক গিলল। দীপ্রকে হারানোর কথা মনে হতেই শরীরটা কেমন লাগছে।
“আমি কী করব এখন?”
“কুহু-কণার প্রতি ভালো আচরণ করবে।”
“এটা সম্ভব না। ওদের দেখলেই মেজাজ খারাপ হয়।”
“তাহলে দীপ্রকে হারানোর প্রস্তুতি রেখো।”
আয়ানা তাকাল সরল চোখে। শেষমেশ ঐ দুই বোনের প্রতি মায়া দেখাতে হবে তাকে।এটা ভাবলেই তো শরীর রি রি করে উঠে।
কুহুর কান্না থামছিলই না। কান্নাকাটি করে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল। এমন কি গোসল অবধি করা হলো না। বিকালে ঘুম ভাঙতেই, মনটা আবারো বিষণ্ণ হয়ে গেল। একরাশ খারাপ লাগা নিয়ে বাগানে যেতেই ওর দুটো চোখ থমকে গেল। বাগানে নতুন অনেক গাছ লাগানো। সব গুলো গাছেই ফুল ফুঁটে আছে। ও বিস্মিত হয়ে কণার ঘরে ফিরল। মেয়েটি তখন বইয়ে মুখ ডুবে আছে।
“আপু তুই।”
“বাগানে নতুন গাছ লাগানো। সব গুলোয় ফুল। এগুলো কে করল কণা?”
মনে মনে একটা সন্দেহ তো তৈরি হয়েই আছে। তবু ও জিজ্ঞেস করে নিচ্ছে। কণা ধীর স্থির ভাবে বলে,”দীপ্র ভাইয়া, গাছ গুলো লাগিয়েছে।”
কুহুর সন্দেহ এবার সত্যিতে বদলে গেল। ও থ হয়ে রইল। বই রেখে বোনের কাছে এল কণা।
“তুই দেখেছিস আপু। দীপ্র ভাই আসলেই তোকে কেয়ার করে। তুই একটু বোঝ প্লিজ।”
কুহু তাকাল ছোট বোনের দিকে। মেয়েটির চোখে মুখে আকুতি। কুহু জবাব দিল না। চলে এল নিজের কক্ষে। তবে মনটা চিন্তায় বুদ হয়ে রইল। ওর পুরো বিকেলটা ওভাবেই গেল। সন্ধ্যায় দীপ্রকে আসতে দেখা গেল। কুহু অপেক্ষায় ছিল। ও দোতলা থেকে নেমে এল। সোজা বাড়ির সামনের রাস্তায় এসে দাঁড়াল। দীপ্র ওকে দেখে ভ্রু কুঞ্চিত করল।
“আমার কথা আছে।”
একদম সংকোচহীন ভাবে বলল কুহু। দীপ্র ছোট করে বলল,”শুনছি, বল।”
“আপনি গাছ গুলো এনেছেন?”
“হ্যাঁ।”
“আমি তো বলিনি।”
“অহ।”
“তবে, কেন এনেছেন?”
“ইচ্ছে হয়েছে। তাই এনেছি।”
“ইচ্ছে হলেই সেটা করতে হবে?”
“গাছ আনাতে কী সমস্যা হয়েছে? এটা নিয়েও ঝামেলা?”
দীপ্র বিরক্ত হয়ে বলল কথাটা। কুহু বুক ভরে সমীরণ টেনে নিয়ে কিছু বলতে যেতেই দীপ্র বলে উঠল,”এখানে কোনো দয়ার ব্যাপার নেই। এখন যদি সেটাকেও তুই দয়ার সাথে যোগ করিস তাহলে আমার কিছুই বলার থাকবে না। তোর যা হয় ভেবে নিতে পারিস। এমনিতেই আমাকে সবার কাছে খারাপ বানিয়ে রেখেছিস।”
কুহুর কথা আটকে গেল। দীপ্র ওকে পাশ কাটিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। কুহু দাঁড়িয়ে রইল ওভাবেই। মানুষটা চোখের আড়াল হতেই কুহু মিনমিনে সুরে বলল,”আপনি তো খারাপই দীপ্র ভাই। ভীষণ খারাপ আপনি।”
মায়ের কথাটা একেবারে অন্তরে গেঁথে নিয়েছে আয়ানা। ও নিজেকে বুঝিয়েছে দীপ্রকে পেতে হলে নিজেকে সবসময় দীপ্রর চোখে ভালো রাখতে হবে। যেমনটা কুহু-কণা করে থাকে। দীপ্রর হৃদয়ে স্নেহ আছে। সেই স্নেহটা আরো বেশি বাড়াতে নিজেকে যথাসম্ভব ভালো ও অসহায় হিসেবে দেখাতে হবে। ও রাতের খাবার খেতে এসেই বিষয়টি শুরু করল। কণা যখন বিরক্তি নিয়ে অন্য চেয়ার টেনে বসতে যাচ্ছিল। আয়ানা বলে উঠল,”এদিকে বোস কণা। এদিকে ফ্যানের বাতাস ভালো আসে।”
কণা বোধহয় আশ্চর্য হয়ে পড়ল। ডাইনিংয়ে থাকা বাকিরাও একটু কেমন চোখে তাকাল। আয়ানার নিজেকে জোকার মনে হলো। মনে মনে নিজেকে গালি দিতে লাগল। এমন দিন না আসলে এই মেয়েটিকে এভাবে বিনয় সে দেখাত না। কখনোই না।
“কী রে, ঐদিকে গিয়ে বোস।”
বললেন বড়ো চাচী। কণা তাকাল বোনের দিকে। কুহু হাতে হাতে খাবার দাবার দিতে সাহায্য করছে।
বোনের ইশারা পেয়ে বসল কণা। আয়ানা মুখটায় হাসি আনল। কণার আসলে ভালো লাগছে না। আয়ানার মতি গতি ওর সুবিধার লাগে না।
“মাছ দেব?”
বললেন আবিদা। কণার মেজাজ ভালো নেই। তবে ও আসলে বেয়াদব না। তাই জবাব দিল।
“হুম।”
সবটা স্বাভাবিক হতে দেখে দীপ্রর মাঝে একটা স্বস্তি কাজ করল। বাড়ির ছোটরা সবাই বসলেও কুহু বসেনি খাবার খেতে। ও বলল,”চেয়ার আরেকটা খালি আছে। কুহু, বসে যা।”
আয়ানা নিজের হাতের মুঠো শক্ত করল। দীপ্র ভাই এখনো এই মেয়েটিকে নিয়ে পড়ে আছে। অথচ কুহু তাকে কত রকম ভাবে অপমান করে। তবু দরদ দেখায় দীপ্র ভাই। এসব আসলেই কৌশল। কুহু কৌশলে দীপ্রর মন জয়ের চেষ্টা করছে। এসব ভেবেই আয়ানার ইচ্ছে হচ্ছে কুহুর গালে কটা চড় বসাতে। কিন্তু সেটি করতে পারছে না। ও দাঁত কিড়মিড় করতে থাকে। কুহুর বসার ইচ্ছে নেই একদমই। ও ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। আয়ানা এবার হেসে বলল,”হ্যাঁ, কুহু। বোস না তুই।”
কণাও বলল,”বসে পড় আপু।”
সবাই বলাতে কুহু বসল। খাবার নিয়ে নাড়াচাড়া করল। ওর খুব একটা ক্ষিধে নেই। আজকাল খাওয়া দাওয়ার প্রতি একদমই মন নেই। মনে হয় না খেয়েই বেঁচে থাকা যাবে।
হাত পরিষ্কার করতে এসে কুহু আর দীপ্রর দেখা হলো। হলো চোখাচোখি। একেবারে নীরব থাকা যায় না এমন একটা পরিস্থিতি। কুহু ছোট করে বলল,”গাছের জন্য কৃতজ্ঞতা।”
দীপ্র এই প্রসঙ্গে কিছু বলল না। ও বলল,”চাচি ফিরবে কবে?”
“দু চারদিন সময় লাগতে পারে। মামারা সবাই বাড়ি নেই।”
ববিতা গিয়েছেন বাবার বাড়ি। ভাইদের সাথে আলোচনা করতে। অতীতে বাবার বাড়ির সম্পত্তি নিয়ে না ভাবলেও আজকাল ভাবতে হচ্ছে। সেসব নিয়েই ভাইদের সাথে কথা বলবেন তিনি। দীপ্র ছোট করে নিশ্বাস ফেলে বলল,”ব্যাপারটা কেমন হলো কুহু। চাচি শেষমেশ বাবার বাড়ির সম্পত্তি নিতে গেল।”
কুহু বুক ভরে দম নিল। বলল,”ওটা মায়ের অধিকার। সে তো বাড়তি কিছু নিতে যাচ্ছে না।”
“তবু, আমাদের বাড়ির বউরা সাধারণত নিজ থেকে সম্পত্তি আনেন না।”
“প্রয়োজন পড়েনি দেখেই কেউ আনেননি। কিন্তু আমাদের প্রয়োজন পড়েছে দীপ্র ভাই। তাই আনতে হচ্ছে। এখানে তো দোষের কিছু নেই।”
দীপ্র কি বলবে বুঝল না। কুহু হাতটা সাবান দিয়ে পরিষ্কার করে নিল। দীপ্র গেল না,দাঁড়িয়েই রইল।
“ভার্সিটি যাবি কবে থেকে?”
কুহুর গলাটা একটু শুকিয়ে এল। ও ভার্সিটি যাচ্ছে না দুটো কারণে। প্রথমত মানসিক অবস্থা ও দ্বিতীয়ত বেতন আটকে আছে।
“যাব, দ্রুতই।”
“টিউশন ফি আমি দিয়ে দিলে সমস্যা হবে?”
কুহু বুঝল বিষয়টা দীপ্র ভাই জেনেছেন। ও শুকনো ঢোক গিলে বলল,”প্রয়োজন পড়বে না। মা ফিরলেই বকেয়া শোধ করে দেব। এতটা ভাবার জন্য কৃতজ্ঞতা।”
কুহু চলে গেল। দীপ্র রইল দাঁড়িয়ে। ওর হতাশ লাগে। লাগে সব জটিল। জীবনে কখনো সখনো এমন পরিস্থিতি এসে দাঁড়ায়, যা ঠিক ভুল হিসাব করতে দেয় না। তখন রাগ ক্ষোভই বেশি গুরুত্ব পায়। আর তারপর যে সিদ্ধান্ত আসে, সেই সিদ্ধান্ত প্রতি মুহূর্তই ভোগাতে থাকে। দীপ্রর অবস্থা এখন ঠিক সেই পর্যায়ে। ওর ভোগান্তি চলছে। এর শেষ কোথায় ও সত্যিই জানে না।
একটা সারপ্রাইজ…👇
https://www.facebook.com/100076527090739/posts/765562036004693/?app=fbl
চলবে…
কলমে ~ #ফাতেমা_তুজ_নৌশি
(১৭)
https://www.facebook.com/100076527090739/posts/770858725475024/?app=fbl

