#প্রণয়ের_রূপকথা (২৩)
রাত বিরেতে দীপ্রর ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে কুহু। ওর দুটো চোখে জল থৈ থৈ করছে। দীপ্র কি বলবে বুঝতে পারছে না। পরিস্থিতি এতদিন এক রকম ছিল। আজ আরেক রকম। ও অনেকটা দ্বিধা নিয়ে বলল,”সকালে কথা হবে কুহু। এখন ঘুমাতে যা।”
কুহু নড়ল না। দীপ্র চেয়ে রইল। মেয়েটিকে কেমন যেন দেখাচ্ছে।
“কী বললাম, শুনিস নি?”
“আপনি আবারো দয়া দেখালেন আমায়?”
দীপ্রর যে কি পরিমাণে রাগ হলো। ও নিজেকে ধরে রাখতে ব্যর্থ হলো। মেয়েটি সব সময় তাকে আ ঘা ত করে।
“ঘরে যেতে বলেছি কুহু।”
“আপনি আমাকে দয়া দেখিয়েছেন। তাই না?”
এই পর্যায়ে দীপ্র নিজের রাগ ধরে রাখতে পারল না। ও হিস হিস করে এগিয়ে গেল। কুহু কিন্তু ভয় পেল না।
“আর একবার দয়ার কথা বললে ঠাস করে চড় বসাব।”
“সেটিই পারবেন। কারণ আপনি ছেলে। আমি মেয়ে। আমার ওপর জোর খাটানো যায়।”
“কী জোর খাটিয়েছি আমি?”
“আপনি কেন বিষয়টি সামনে আনতে দিচ্ছেন না? আপনি জানতেন আমি পালাব। তাই বিয়েটা ভেঙেছেন? বলেন এটা সত্যি কী না।”
দীপ্র মৌন রইল। কুহুর শব্দ করে কেঁদে ফেলল।
“আমাকে আদৌ আপনি বাঁচালেন নাকি মে রে ফেললেন। আমি নিজেও বুঝতে পারছি না দীপ্র ভাই। আমি দয়া নিয়ে বাঁচতে চাই না। চাই না দয়া নিয়ে বাঁচতে।”
এইবার দীপ্র শান্ত হলো। ও দম ফেলে বলল,”সেটির জন্য আমার সাথে কথা বলা উচিত ছিল না কুহু? বিয়েতে তোর পুরো মত ছিল না। তোর মতের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়েটা এমনিতেও হতো না। কিন্তু তুই একটা বার আমাকে বলেছিস? বলিসনি তো। উল্টো আমাকে ছোট করতে চেয়েছিল। বিয়ে ভেঙে পালাতে চেয়েছিল। অপমান করতে চেয়েছিল। তাই না?”
ঠিক তাই। কুহু তাই চেয়েছিল। চেয়েছিল বিয়েটা ভাঙতে। এই স্বার্থপর মানুষ গুলোকে অপমান করতে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা সফল হওয়ার পূর্বেই বিষয়টা ঘুরে যায়। দীপ্র নিজ থেকেই বিয়েটা ভেঙে দেয়। ফলে উল্টো ভাবে কুহুরই অপমান হয়ে যায়। কুহু ঠোঁট কামড়ে বলে,”আপনি ও তো জানতে চাননি আমার কাছে। আমার মতামত আছে কি নেই।”
“জানার সুযোগ ছিল আমার কাছে? আমি আসার পূর্বেই সব ঠিকঠাক হয়। আমি এসে কথা বলার আগেই তুই ডিসিশন নিয়ে রেখেছিলি।”
“আর আপনি সেটা জেনে, সুযোগটা কাজে লাগালেন। আমাকে অপমান করলেন। তাই না?”
ফোঁস করে দম ফেলল দীপ্র। ছোট করে বলল,”মানছি আমিও পুরো ঠিক ছিলাম না। রাগ হয়েছিল। তাই ওভাবে কাজ করেছি। তবে আমি বিয়ে না ভাঙলে, তুই যেই কাজটা করতে যাচ্ছিলি, সেটা কতটা প্রভাব রাখত বুঝতে পারছিস কুহু? বাড়ির সম্মান থাকত? বলত না সবাই হেড স্যারের মেয়ে পালিয়েছে? চাচার নাম খারাপ হতো না? চাচির বদনাম হতো না? শুধু আমাকে অপমান করার জন্য তুই নিজে যে বাকি সবাইকে অপমান করতে চলেছিলি এটা কখনো মাথায় এসেছে তোর?”
কুহু ঠোঁট কামড়ে নিজের কান্না আটকাল। সেই মুহূর্তে এই বিষয় গুলো সত্যিই মাথায় আসেনি। তবে পরে বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু ততক্ষণে কিছু করার ছিল না। বিষয়টাই ঘুরে গিয়েছিল। দীপ্র তাকে অপমান করেছিল। বিয়ের সাজ নিয়ে কুহুকে শুনতে হয়েছিল বিয়েটা হচ্ছে না কুহু। অথচ ঘটনা উল্টো হওয়ার কথা ছিল। সবটা স্মরণ করে কুহু আসলেই দুঃখে নুয়ে পড়ল। দীপ্র শীতল কণ্ঠে বলল,”যা হবার হয়েছে। আমি আমার কাজের জন্য সরি। ইনফ্যাক্ট সব দোষ তো আমিই নিয়েছি তাই না? তবু এত রাগ কেন তোর?”
“কারণ, কারণ আপনারা স্বার্থপর। সবাই স্বার্থপর।”
বলে কুহু উল্টো পথে হাঁটতে লাগল। দীপ্র ভাষা হারিয়ে ফেলল। সে স্বার্থপর। আসলেই সে স্বার্থপর?
রাত্রি এখনো কুহুর ঘরেই আছে। ওর চিন্তা হচ্ছিল। মেয়েটা আসতেই ও শুধাল,”সব ঠিক আছে কুহু?”
“হুম।”
বলে মুখ ঘুরিয়ে নিল কুহু। রাত্রি বুঝল মেয়েটির একটু একা থাকা দরকার। ও আদরের হাত খানা গালে স্পর্শ করিয়ে বলল,”একটু ঘুম দে। ভালো লাগবে।”
“আচ্ছা।”
রাত্রি চলে যেতেই দরজাটা আটকে দিল কুহু। তারপর লাবিবার নাম্বারে কল করল। মেয়েটি ঘুমায়নি। জেগেই আছে। অনেকবার কল দিয়েছে।
“কুহু,কুহু। দোস্ত আমাকে মাফ কর। মাফ কর আমায়। আমি যদি জানতাম ঐ হারামিতে ওমন করবে তাহলে জীবনেও ওকে সাথে নিতাম না। সরি দোস্ত। মাফ কর আমায়। আমি সরি রে।”
এত গুলো কথা বলে থামল লাবিবা। কুহু ছোট করে বলল,”যা হবার হয়েছে লাবিবা। এখন আর ঠিক করার মতন কিছু নেই।”
“আমি সরি দোস্ত।”
“সরি বলতে হবে না। আমার ভাগ্যটাই খারাপ। একজন খারাপ ভাগ্যের মানুষের সাথে তোর উচিত বন্ধুত্ব না রাখা।”
“কুহু!”
“হুম। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি। আমার কাউকে লাগবে না আর।”
“এভাবে বলিস না দোস্ত। আমার কথাটা শোন। শোন দোস্ত।”
কুহু শুনল না। কলটি কেটে দিল। লাবিবার ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে কেঁদে ফেলল। ওর ভুল হয়েছে। ও ভুল করেছে। যদি সেদিন সায়েরকে না জানাত। সায়ের যদি ওর সাথে না আসত। তবে এত কিছু হতো না। লাবিবার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। কল করে চলেছে সায়ের। লাবিবা তীব্র রাগ নিয়ে কলটা রিসিভ করল। সায়েরকে কিছু বলতে না দিয়ে বলল,”কুহু আমার সাথে ফ্রেন্ডশিপ ভেঙে দিয়েছে। খুশি হয়েছিস না? হবারই কথা। তোর আর আমার মধ্যেও আর কোনো বন্ধুত্ব নেই। সবটা শেষ সায়ের। সবটা শেষ। তুই তোর পথে। আর আমি আমার পথে।”
একটা শব্দও বলতে দিল না লাবিবা। কলটি কেটে দিল। সায়ের হতভম্ব হয়ে গেল। রাগের মাথায় সে বলেছিল ঘটনা কুহুর বাসায় জানিয়ে দেবে। পরে নিজের ভুলটি বুঝেও ছিল। কিন্তু এতে লাভ হলো কী? কোনো লাভই হলো না। একটা রাগ থেকে বলা কথায়, এভাবে বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে গেল। সায়েরের খুব খারাপ লাগল। নিজের ওপর রাগ হলো। কেন ওমন কথা বলেছিল সে? ওর জন্য সবটা আজ শেষ হয়ে গেল। একদম শেষ হয়ে গেল।
সমস্ত রাত ঘুম নেই কুহুর। মেঝেতে বসে কাটাল। এখন ভোর হয়ে গিয়েছে। গত রাতে জানালা লাগানো হয়নি। আলো এসে ঘরে পৌঁছাল। সেই সাথে মোরগের ডাক ও সদর দরজার বেল বেজে ওঠল। একটু বাদেই শুরু হলো খটখট আওয়াজ। বাড়ি মেরামতের কাজ করছে মজুর’রা। শব্দটা এত বাজে লাগে কুহুর। ওর ইচ্ছে করল ছুটে গিয়ে বলতে আজ কোনো কাজ হবে না। কিন্তু সে উপায় যে নেই। ও ফোঁস করে দম ফেলল। এ ঘরে থাকা যাবে না। কুহু ওঠে পড়ল। শরীর নড়তে চাচ্ছে না। শক্তি পাচ্ছে না। করিডোর পেরিয়ে নিচে আসতেই আয়ানার সাথে চোখাচোখি হলো। আয়ানা খুব ভোর বেলায় ওঠেছে। ইদানীং সে শরীরচর্চায় মনোযোগ দিয়েছে। কুহুকে দেখেই বাঁকা হাসল। তিরস্কার পেয়ে কুহুর মনটা বিষাদে ভরে ওঠল। ও ঝামেলা না করে এক কাপ চা বানাতে রান্না ঘরের দিকে এগোচ্ছিল। ওমন সময় আয়ানা বলল,”শেয়ানা আছিস ভালোই।”
কুহু ঢোক গিলল। ঠোঁট কামড়ে নিজেকে শান্ত করল। সামনে আগাতে যেতেই আয়ানা বলে ওঠল,”বেশি বাড়াবাড়ি করলে সব কথা সবার কানে চালান করে দেব।”
অন্যান্য দিনের থেকে আয়ানার কণ্ঠে আজ ঘৃণা বেশি। আছে গৌরব ও। কুহু এবার পেছন ফিরল। ওর চুল গুলো এখনো অনেকটাই এলোমেলো।
“ভয় দেখাচ্ছ আয়ানাপু?”
“না। ভয় দেখাচ্ছি না। তবে সর্তক করলাম। শোন কুহু।”
একটু থামল আয়ানা। চারপাশে চোখ বুলিয়ে এক পা এগোল। চিবিয়ে চিবিয়ে নিচু সুরে বলল,”দীপ্র দাদাভাইয়ের থেকে দূরে থাকবি। না হলে আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না।”
“তার প্রতি আমার কোনো আগ্রহ নেই আয়ানাপু। এটা জেনে বুঝেও এ কথার মানে দেখি না।”
“তোকে ভরসা করি না।”
কুহুর বড়ো হাসি পেল। ও একটু তিরস্কারের সুরে বলল,”আজ যদি আমি চাইতাম, তাহলে তুমি যে বিষয় নিয়ে ভয় দেখাচ্ছ, তার ধারে কাছেও আসতে পারতে না। দীপ্র ভাইকে আজ যেভাবে চাচ্ছ, তার নাম নিতেও তখন দুবার ভাবতে হতো। না হলে জ্বিভ…..
বিস্ফোরণ নিয়ে তাকাল আয়ানা। কুহু শুকনো একটা ঢোক গিলল। শরীরটা বড়ো ক্লান্ত লাগছে। চা দরকার। এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা।
দেখে আসুন 👇
https://www.facebook.com/100066517613170/posts/1101695705391006/?app=fbl
চলবে…
কলমে ~ #ফাতেমা_তুজ_নৌশি
(২৪)
https://www.facebook.com/100076527090739/posts/786784053882491/?app=fbl

