#প্রণয়ের_রূপকথা (৩৩)
ভাবনায় ডুবে গিয়ে কুহু অন্য আইসক্রিমটা গলিয়ে ফেলল। দীপ্র এসে দেখল, গলে যাওয়া আইসক্রিম নিয়ে হাবুলের মতন চেয়ে আছে কুহু। ওদিকে কুঞ্জ বসে বসে তখনো আইসক্রিম খাচ্ছে।
“আইসক্রিম গলে গেল তো।”
দীপ্রর কণ্ঠে ধ্যান ফিরে পেল ও। একটু বিব্রত হয়ে বলল,”ও, হো। সমস্যা নেই। পরে ফ্রিজ করে নেব।”
ফোঁস করে দম ফেলল দীপ্র। হাতের ব্যাগ খানা বাড়িয়ে দিতেই কুহু শুধাল,”এটা আবার কী?”
“দেখ।”
ব্যাগ খানা একটু খুলে কুহু বুঝল শাড়ি। ও চাইল দীপ্রর দিকে।
“এটা কার?”
“তোর।”
“আমার? আমি তো….
“আমি দিলাম।”
বিপরীতে কুহু কিছু বলার পূর্বেই দীপ্র আবারো বলল,”তুই আইসক্রিমের বিল দিলি না? ওটার জন্য শোধ দিলাম। আমিও ঋণ রাখতে চাই না।”
এ কথার পর কুহুর কথা আটকে গেল। ও শাড়ির ব্যাগটা রেখে বলল,”দামের দিক থেকে হিসাব করলে, আপনি আমাকে ঋণীই করে রাখলেন।”
“ঋণ যদি হয়েই থাকে, তবে তুলে রাখ। পরে শোধ সমেত নেব।”
“যদি না দিতে পারি?”
“দীপ্র দেওয়ান নিজের সব কিছু বুঝে নিতে জানে। শোধ ও আসলে। তোকে সেটা ভাবতে হবে না।”
বলে দীপ্র একটু অন্যদিকে গেল। কুঞ্জ তখন খাওয়া শেষ করেছে। কুহু শাড়ির ব্যাগ খানা পাশে রাখতে যেতেই আয়ানা আর কণাকে আসতে দেখা গেল।
“আপু এটা কী রে?”
এসেই শুধাল কণা। কুহু উত্তর দিতে চাইছে না। ও চোখের ইশারায় কণাকে থামতে বলল। কিন্তু কণা থামছে না। ও প্রশ্ন করেই যাচ্ছে।
“এটা তো শাড়ি। তোরা শাড়ি কিনলি কার জন্যে?”
“কণা, একটু থাম।”
“বল না, এটা কার।”
“আমার।”
“তোর? তুই টাকা আনলি কখন? আমাকে তো বললি না।”
“উফ কণা।”
“বাহ, মা তোকে টাকা দিয়েছে। আমাকে তো বলল পরে দেবে।”
বলে কণা কেমন মন খারাপ করতে নিচ্ছিল। ওর মন খারাপ দেখে কুহু বলল,”দীপ্র ভাই দিয়েছেন। এখন চুপ কর তুই। আর কথা বলিস না।”
আয়ানা একটু দূরে। ফোনে কথা বলছিল। ঠিক তখনই কণার মাথায় বুদ্ধিটা এল। ও দুষ্টু হাসল। গলার প্রায় সবটুকু জোর দিয়ে বলল,”শাড়িটা কি সুন্দর হয়েছে রে আপু। দীপ্র ভাই তোকে এত দারুণ উপহার দিল।”
কথাটা কানে যেতেই ঘুরে চাইল আয়ানা। কণার হাত চেপে ধরল কুহু।
“উফ, কণা। হচ্ছে টা কী? চুপ করতে বলেছি না?”
“তুই চুপ আপু।”
বলে আবারো গলার সবটুকু জোর দিয়ে কণা বলল,”দীপ্র ভাই আর কাউকে কিন্তু দেয়নি। তোকেই দিল। তাও কি সুন্দর এই শাড়িটা।”
কুহু হতাশ হয়ে চেয়ে রইল। এই মেয়েটার জন্য শান্তি নেই। একদমই নেই।
বুদ্ধি করে রাত্রি আর অরণ্যকে এক জায়গায় রেখে সবাই চলে এসেছিল। ভেবেছিল দুজন বুঝি এক সঙ্গে ফিরবে। এততে মান অভিমান কিছু নামবে। সহজ হবে সবটা। কিন্তু তেমন কিছুই হলো না। রাত্রি ফিরল একা। ওকে দেখে কুহুর মুখটা আমের ফলসিল মতন শুকিয়ে গেল। ও গেল দীপ্রর কাছে। খবর দিতে হবে। দীপ্র গোসল নিয়ে এসেছে। ফট করেই ভেতরে প্রবেশ করে ফেলেছিল কুহু। মানুষটার উন্মুক্ত বুক নজরে পড়ল। ও তড়িঘড়ি করে বলল,”পরে আসছি।”
“কুহু।”
পেছন থেকে ডেকে ওঠল দীপ্র। কুহু দাঁড়াল। তবে পেছন ফিরল না। দীপ্র টি শার্ট গায়ে জড়িয়ে নিয়ে বলল,”আয়।”
“পরে আসি। আপনি রেডি হোন।”
“হয়েছি।”
কুহু এবার পেছন ফিরে চাইল। দৃষ্টি উঠিয়ে বলল,”রাত্রিপু একাই ফিরল।”
“উফ! এবারো ও এদের মিশনটা ফেইল।”
“হুম। মনে হচ্ছে রাত্রি আপুর বিয়ে ঠিক না করলে আর কোনো লাভ হবে না।”
“সেটাই মনে হচ্ছে।”
“আচ্ছা, আমি যাই।”
“একটু দাঁড়া।”
কুহু দাঁড়াল। দীপ্র কাবাড থেকে একটা বক্স নামিয়ে আনল। কুহু প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়ে। দীপ্র বলল,”সবার জন্যই টুকটাক উপহার এনেছিলাম। সবাইকে দেয়া হলেও, তোর উপহারটা ঝামেলার কারণে দেয়া হয়নি। ভেবেছিলাম নিজে….
দীপ্র কথা শেষ করল না। কুহুর দৃষ্টি এবার নেমে এল। ওর অস্বস্তি হচ্ছে। দীপ্র কুহুর পায়ের দিকে চাইল। তারপর হেসে বলল,”থাক, ওসব কথা। এটা রাখ। তোর পা খালি। দেখে ভালো লাগে না। তাই মনে হলো দিয়েই দিই।”
বাক্স খানা হাতে নিল কুহু। ও বুঝল, এটার মধ্যে পায়েল আছে।
“এখন যা। আর আমি দেখছি রাত্রি-অরণ্যর বিষয়টা।”
“আচ্ছা।”
বলে পা বাড়াল কুহু। ঘর থেকে বের হতেই, একটা হাত ওর বাহু টেনে ধরল। ও পাশ ফিরে দেখল আয়ানা। কুহু চট করেই দীপ্রর দেওয়া বাক্স খানা লুকিয়ে ফেলল। আয়ানার চোখে আগুন। ওকে টেনে নিয়ে এল অন্য পাশটায়।
“লাগছে আয়ানাপু। হাত ছাড়ো।”
ঝটকা দিয়ে হাত ছাড়ল আয়ানা। কুহু কটমট করে চাইল।
“তোমার সমস্যা কী?”
“সমস্যা আমার? সমস্যা তো তোর। বেহায়া মেয়ে কোথাকার।”
“আয়ানাপু। মুখ খারাপ করাবে না। আমি খারাপ হলে, তুমি নিতে পারবে না।”
“তুই আর কী খারাপ হবি? তোকে বলেছি, দীপ্র দাদাভাইকে আমি পছন্দ করি। তারপর ও তুই তার পেছন পেছন ঘুরিস। বেহায়ার মতন লেগেই আছিস।”
কথা গুলো লাগল কুহুর। ও এগিয়ে এসে বলল,”দীপ্র ভাইকে তুমি পছন্দ করো। কিন্তু সে কি করে?”
“করে নাকি করে না, সেটা আমি বুঝে নিব। তুই মাঝে আসবি না।”
“শোনো আয়ানাপু। আমি মাঝে আসি নি। কিন্তু তুমি বার বার আমায় অপবাদ দাও। তবে একটা কথা, আমি যদি একবার মাঝে আসি, তোমার মতন দশ আয়ানাও আমায় সরাতে পারবে না। নিজের সীমায় থাকো। ভালো মানুষি সব সময় দেখাব না।”
তপ্ত বাক্য গুলো বলেই চলে গেল কুহু। আয়ানা হতভম্ব হয়ে রইল। ওর শরীর কাঁপছে। চোখ থেকে আসছে জল। একটা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে, বুকের ভেতর হাহাকার বয়ে চলেছে। মাথার ওপর দিয়ে, নেমে যাচ্ছে বিশাল বিশাল ঢেউ।
রাত্রি বোধহয় কেঁদেছে। ওকে দেখে তেমনই মনে হচ্ছে। দীপ্র ওর পাশে বসা। ও সরাসরি কথা বলতে এসেছে।
“আমি বুঝতে পারছি, তোমরা চাও অরণ্য আর আমার সম্পর্ক ঠিক হোক। কিন্তু এটা ঠিক হবার নয় দীপ্র ভাই।”
দীপ্র একটু সময় নেয়। তারপর বলে,”তুই কি সত্যিই চাস না?”
“না। চাই না। ওর লাইফস্টাইল আমার সাথে মিলে না। আমি ওর অন্য সব বান্ধবীদের মতন স্টাইলিশ না। আমি সাধারণ। আমার সাথে ওর যাবে না।”
“এটা ও বলেছে?”
“না।”
“তবে?”
“বুঝতে পেরেছিলাম। সেই জন্যই সরে এসেছি।”
বলে ঠোঁট কামড়ে ধরে রাত্রি। অরণ্যর সাথে সম্পর্কটা হুট করে। রাত্রি বরাবরই মিশুক। একটু চঞ্চল। সেই চঞ্চল স্বভাব থেকেই অরণ্যর সাথে কথা বলা। তারপর দুজন একটা সম্পর্কে যাওয়া। কিন্তু সম্পর্কের আগে, সম্পর্কটা যেমন ছিল। সম্পর্কের পর, সম্পর্কটা একদমই বদলে এল। অনিশ্চয়তা যোগ হলো। সেই অনিশ্চয়তা, দিনের পর দিন কথা কাটাকাটি, সব মিলিয়ে রাত্রি নিজেকে সরিয়ে নিল। তবে ক্ষীণ আশা ছিল, অরণ্য বুঝি তাকে মানাবে। কিন্তু তেমন কিছু হলো না। গো ধরে রইল ওপাশের মানুষটাও। আর তারপর, তারপর বিচ্ছেদটা সত্যিই হয়ে গেল। রাত্রি শিউরে ওঠল। নিজেকে সামলে বলল,”আমি সত্যিই এবার বিয়ে করতে চাই। বাবাকেও বলব।”
দীপ্র কি বলবে বুঝল না। রাত্রি চাইল পাশ ফিরে। আবারো বলল, “অরণ্য, আমার জীবনের কেউ না। কেউ না। ওকে আর আমি চাই না। আমি একটু ভালো থাকতে চাই। ভালো থাকতে চাই আমি।”
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমা_তুজ_নৌশি

