#প্রণয়ের_রূপকথা (৩৯)
কুহুর পায়ের ব্যথা নামল তিনদিন পর। এই তিনদিন ঘরের ভেতর শুয়ে বসে কাটিয়েছে ও। খাবার দাবার ও এখানেই দেয়া হয়েছে। এই তিন দিনে বাড়িতে উল্লেখযোগ্য তেমন কিছুই ঘটে নি। সবটা চলেছে স্বাভাবিক নিয়মেই। দীপ্র ভাই নিজেও খুব ব্যস্ত। বাসায় তার পা পড়ছে খুব কম। তাই দেখা হয় না। তবে কথা হয়। কথা হয় ম্যাসেঞ্জারে। এই যে সেদিন, খুব সকাল বেলা দীপ্র ভাইয়ের ম্যাসেজ এল। ম্যাসেজটি কুহু দেখল দুপুরের দিকে। দীপ্র ভাই লিখেছেন,”কুহু, তোর পায়ের ব্যথা কমেছে? ঔষধ খাস ঠিক মতন। আমি একটু এলাকার বাহিরে যাব। আজ না ও ফিরতে পারি।”
এই ম্যাসেজটা দেরি করে দেখায়, কুহুর খুব মন খারাপ হলো। আজকাল দীপ্র ভাইয়ের সঙ্গ তাকে আনন্দ দিচ্ছে। ভালো লাগা দিচ্ছে। কুহু এ বিষয়টি ঠিকই উপলব্ধি করে। কিছুটা প্রশ্রয় ও দেয়। ও ম্যাসেজটির জবাব দিল,”এলাকার বাহিরে কেন আপনি?”
তবে তাৎক্ষণিক উত্তর এল না। আসবে কেমন করে? মানুষটা যে অফলাইনে। কুহু অনেকটা সময় ফোন নিয়ে বসে রইল। অপেক্ষা করতে করতে গোসলের সময় হলো। খাওয়া দাওয়াও করতে হলো। সব মিলিয়ে সেদিনটা ওর অপেক্ষায় অপেক্ষায় পার হলো। কুহু এই অপেক্ষার মাঝেও অপেক্ষায় ছিল। যদি দীপ্র ভাই বাড়ি ফিরেন। কিন্তু সেদিন আর ফিরলেন না তিনি। তবে ম্যাসেজটি এল গভীর রাতে। দীপ্র ভাই ভয়েস পাঠিয়েছেন।
“সরি রে। খুব ক্লান্ত লাগছে। এত ব্যস্ততা গেল সারাদিন। ফোনটা খুলে দেখার সুযোগটুকু হয়নি। তুই বললি না তো, ব্যথা কমেছে কি না।”
এই ভয়েস খানা কুহু পর পর সাতবার শুনল। শুনতে শুনতে কথা গুলো ওর নিজের কানেই বাজতে লাগল। তারপর ও লিখল,”ব্যথা কমেছে।”
“রাগ করেছিস?”
“রাগ কেন করব?”
“এই যে ম্যাসেজ দেখলাম লেট করে।”
“ওটা হতেই পারে।”
“তুই বড়ো হয়ে গিয়েছিস কুহু।”
এ কথার বিপরীতে কুহু কথা পেল না। অনেক সময় নিয়ে কিছু একটা লিখতে গিয়েও আর লেখা হলো না। দীপ্রই লিখল,”কী করছিস?”
“বসে আছি।”
“ওহ।”
“আপনি?”
“আমি শুয়ে। খুব ক্লান্ত।”
“রেস্ট নিন তাহলে।”
“কল দেই?”
কুহু কথা হারাল। ওর বুকটা কেমন ধীম ধীম করছে। ও লিখল,”আচ্ছা।”
কলটি এল। দীপ্র অপেক্ষায়। তবে কুহু রিসিভ করল না। ওর কেমন একটা ভয় ভয় হচ্ছে। মানুষ লুকিয়ে প্রেম করলে যেমন হয় ঠিক তেমনই লাগছে। ও দ্বিতীয় বারে কলটি রিসিভ করল। ওপাশের ব্যক্তিটি কেমন করে বুঝে ফেলল ওর অনুভূতি। সরাসরি বলল,”কথা বলতে ভয় হচ্ছে?”
কুহু ঢোক গিলল। সে ভীষণ অবাক। আজকের আবহাওয়া শীতল। ফ্যানের প্রয়োজন নেই। ও তবু ওঠে গিয়ে ফ্যানটা চালাল। ফ্যানের কু কু শব্দে ও একটু দম পেল যেন। দীপ্র শব্দহীন হাসল।
“ভয় পাব কেন?”
“ভয় পাস না?”
“না। ভয় পাওয়ার কী আছে?”
“কিছু নেই?”
“কী থাকবে?”
“এই যে, এত রাত।”
“তাতে কী হয়েছে?”
“আমার সাথে কথা বলছিস।”
কুহু কথা পায় না। দীপ্র ভাই ওকে আটকে দেয়। ওপাশ থেকে একটু করে হাসে দীপ্র।
“ঘুমাস নি এত রাতেও!”
“ঘুম আসছিল না।”
“আজকাল তোর ঘুম আসছে না দেখি। সমস্যা কী?”
“সমস্যা নেই। আপনিও তো ঘুমান না।”
“হুম।”
“আপনার কী সমস্যা?”
“আমার সমস্যা তো গভীর কুহু।”
গভীর সমস্যা! কুহু মৌন হয়ে রইল। ওপাশ থেকে ক্লান্ত দীপ্র পুনরায় বলল,”গভীর সমস্যার কথা শুনতে চাস তুই?”
কুহু চায়। শুনতে চায়। তবে বলতে পারে না। ও পথ পাল্টে বলে,”থাক, দরকার নেই।”
“আচ্ছা।”
এইটুকুই? আর কিছু বলবে না দীপ্র ভাই? তবে কি মান হলো তার? কুহু আবারো দোটানায় ডুবল। ওপাশ থেকে দীপ্র বলল,”রাত অনেক। ঘুম দে। সত্যি সত্যি ঘুম।”
“ঘুম আবার মিথ্যে মিথ্যে হয় নাকি?”
“হয় তো।”
“কীভাবে?”
“ধর আমাকে বললি ঘুমাব। কিন্তু ঘুমালি না। ফাঁকি দিলি। যেটা সব সময় করিস।”
“আমি আবার কখন ফাঁকি দিলাম?”
“দিয়েছিস।”
“কবে দিয়েছি?”
“সেটা না জানলেও চলবে। এখন সত্যি সত্যি ঘুম দে।”
কুহু ফোঁস করে দম ফেলে। দীপ্র আবারো বলে,”কুহু।”
একটা কথা কুহু কখনো অস্বীকার করতে পারবে না। দীপ্র ভাই যখন তার নাম ধরে ডাকে, তখন সব কিছু কেমন এলোমেলো লাগে। কুহু শুকনো ঢোক গিলে।
“বলেন।”
“ঘুম আসছে না।”
“কলে থাকব?”
একদম ফট করেই বলে ফেলল কুহু। যেন কলে থাকলে দীপ্র ভাইয়ের ঘুম এসে যাবে। কথাটা বলে ফেলে এখন নিজেই একটুখানি অস্বস্তিতে পড়ল। ওপাশ থেকে দীপ্র হাসল। কুহু মিনমিন করে বলল,”না মানে….”
“মানে আর বোঝাতে হবে না। আমি ঘুমিয়ে নেব। তোর শরীর খারাপ। রেস্ট দরকার।”
“আচ্ছা।”
“রাখছি তাহলে। সুন্দর বাচ্চাদের মতন ঘুমিয়ে পড়বি।”
শেষ কথায় কুহুর চোখে মুখে এক রকম হাসি তৈরি হলো। ও বলল,”আপনিও।”
কলটি রেখে কুহু বিছানায় গা ছেড়ে দিল। কি একটা অনুভূতি হচ্ছে। এই অনুভূতি কুহুকে অনেক দিন ধরেই পোড়াচ্ছে। কে জানে ভবিষ্যতে কি লেখা আছে।
দীপ্র ভাইকে আজ দুপুরের খাবারে পাওয়া গেল। কুহুও আজ সুস্থ। পায়ে হেঁটেই এসেছে। বড়ো চাচা দবীর বললেন,”রি চেকাপ করিয়ে নিলে ভালো হবে না? পেরেক কিন্তু মারাত্মক হয়।”
“দেখি ভাইজান। আমার তো সময় হয় না। এত কাজ।”
বললেন ববিতা। দীপ্র খাবার খাচ্ছিল। ও বলল,”আমি ফ্রী আছি। বিকেলে দেখিয়ে আনব।”
“তুমি না বললে বিকেলে তোমার কাজ আছে?”
দীপ্র না তাকিয়েই বলল,”ক্যানসেল হয়ে গেছে বাবা।”
মোটামুটি ডাইনিংয়ে বসা সবার মাঝেই এক রকম অনুভূতি খেলে গেল। ভালো,মন্দ মিশ্রিত এক অনুভূতি। তবে আয়ানার মাঝে পুরোটাই মন্দ রইল। ওর চোখ দুটো টলমল করতে লাগল। খাবার গুলো মনে হতে লাগল বি ষ।
দবীর আর আনোয়ার এক সাথে ব্যবসা আগাচ্ছেন। সেসব নিয়েই কথা বার্তা চলছিল। একটা সময় পর আনোয়ার বললেন,”ভাইজান, একটা কথা ভাবছিলাম।”
“কী কথা আনোয়ার?”
“আয়ানার তো বিয়ের বয়স হয়েছে।”
“হ্যাঁ, তা তো হয়েছেই। রাত্রির জন্য ও ছেলে দেখা হচ্ছে। আয়ানার জন্যও দেখা হোক?”
“সে হতেই পারে। তবে জানেন তো মেয়েটা আমার সহজ সরল। মাঝে মাঝে রাগ করে। তবে একদম সহজ সরল। পানির মতন পরিষ্কার ওর মন। ওরে দূরে দিয়ে শান্তি পাব না।”
দবীরের মাথায় তখন অন্যসব চিন্তা। তিনি এখনো বিষয়টি আঁচ করতে পারেননি। তাই বললেন,”আশেপাশের কাউকে ভেবেছ নাকি? কথা বার্তা বলব?”
“আশেপাশে বলতে…
আনোয়ার একটু থামলেন। ভাইয়ের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বললেন,”দূরে দেওয়ার আর কি দরকার ভাইজান? ঘরের ছেলে থাকতে।”
এ কথায় দবীর ছোট ভাইয়ের দিকে তাকালেন। তিনি তখনো ছেলের কথা ভাবতে পারেন নি। তিনি ভ্রু বাঁকিয়ে বললেন,”আবিরের জন্য ভাবলে নাকি? এটা তো….”
“কি যে বলেন ভাইজান! ওর তো বিয়ে ঠিক। ওর কথা ভাবব কেন?”
“তবে?”
“দীপ্রর কথা বলছিলাম।”
আনোয়ারের কথায় দবীর নড়েচড়ে বসলেন। তার মুখটা কেমন হয়ে গেল। আনোয়ার পুনরায় বললেন,”ভাইজান, আমি দীপ্রকে তো চিনি। ওর সময় কেটেছে বাহিরের দেশে। ওর পছন্দ একটু উচ্চ। আমি কুহুকে অপমান করছি না। আমার ই ভাতিজি। তবু বলতে গেলে কুহুর থেকে আয়ানা সব দিকে উচ্চ। আর দীপ্রর প্রতি ওর সফট কর্ণার ও আছে। দীপ্র ও ওকে আদর করে। আমার মনে হয়, এটা ভালো হবে।”
বলে থামলেন তিনি। দবীর ফোঁস করে দম ফেললেন। বললেন,”আমি তোমার কথা বুঝতে পেরেছি। তবে, ভাই পুরোটাই দীপ্র আর আয়ানার বিষয়। এবার আর আমি ভুল করব না। কুহুর প্রতি যে অন্যায় হয়েছে তা আয়ানার প্রতি হতে দেব না। দীপ্র চাইলে তবেই হবে।”
আনোয়ার খুব একটা খুশি হতে পারলেন না। তিনি ভাইয়ের থেকে আরেকটু জোর আশা করেছিলেন। তবে তেমনটা হলো না। তিনা হতাশই হলেন। বললেন,”আমি দীপ্রর সাথে কথা বলি? ভাইজান, ওর যা যা প্রয়োজন সব দেব আমি। ও তো আমারই ছেলে। তাই না?”
দবীর আসলেই কথা পেলেন না। তিনি চিন্তিত। ছেলেটা কি করতে চলেছে এই বিষয়টি একদমই পরিষ্কার নয়। এদিকে আনোয়ারের দেওয়া প্রস্তাব। সরাসরি কোনো কথাও বলতে পারছেন না তিনি।
“মানাতে পারলে আমার তো সমস্যা নেই আনোয়ার। তবে, এমন কিছু যেন না হয় যাতে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়ে যায়। দীপ্র আমার ছেলে। তবে ওকে আমিও বুঝতে পারছি না।”
“সেটা ভাববেন না। আমি সব বুঝে নেব। কাল রাত্রিকে দেখে যাক, তারপর কথা বলব দীপ্রর সাথে।”
গ্রামে ছিলাম। এক মিনিটের অবসর ছিল না। লেট হওয়ার জন্য দুঃখিত। গতাকাল রাতে ফিরেছি। অর্ধেক রাতে লিখলাম। আর বাকিটুকু এখন। এখন আবার ভার্সিটি যাব। তবু পোস্ট করে গেলাম। সবাই এটা দেখে আসুন।👇
https://www.facebook.com/100066517613170/posts/1143809691179607/?app=fbl
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমা_তুজ_নৌশি
(৪০)
https://www.facebook.com/100076527090739/posts/829381746289388/?app=fbl

