#প্রণয়ের_রূপকথা (৪৮)
কাজ করতে করতে ভীষণ মাথা ব্যথা ধরে গেছে দীপ্রর। মনে হলো এক কাপ চা দরকার। তবে অলস লাগছে। কিয়ৎকাল সময় নিয়ে অলসতা ভাঙল ও। এল কিচেনে। চায়ের পানি বসাতেই কোথা হতে ছুটে এল আয়ানা। এক গাল হেসে বলল,”আমি বানিয়ে দিই।”
দীপ্র মানা করতে গিয়েও করল না। দাঁড়িয়ে রইল। সেই সময়েই কুহু আর রাত্রিকে আসতে দেখা গেল। ওরা গিয়েছিল রাগীবের সাথে দেখা করতে। কুহুর ভীষণ অস্বস্তি লাগছিল। অথচ রাত্রিপু তাকে কাবাবের হাড্ডি করে সাথে নিয়েছিল। ক্লান্ত কুহু একবার চাইল রান্না ঘরে। আয়ানার মুখটা হাসি, হাসি। দীপ্র এদিকেই চেয়েছিল। আয়ানা শুধাল,”চিনি কতটুকু দিব?”
দীপ্রর ধ্যান কাটল ওর কথায়। চিনির পরিমাণ বলে দিয়ে দীপ্র পুনরায় তাকাল কুহুদের দিকে। তবে কুহু নজর ফিরিয়ে নিল। রাত্রি বসল সোফায়।
“বোস রে কুহু।”
“বসব না রাত্রিপু। ঘরে যাই আমি।”
“একটু বসে যা।”
“ফ্রেশ হতে হবে।”
কুহু কি পালাতে চাইল? জানে না রাত্রি। খুব একটা জানতেও ইচ্ছে করছে না। ভালো লাগছে না কিছু। রাগীব লোকটা আসলেই ভালো। তবে, তবে রাত্রির ভেতরে যে অনুভূতি আসে না। ওর খুব কান্না পায়। মাথাটাও কেমন যন্ত্রণা করে। আয়ানার চা বানানো প্রায় শেষ। ও গলা ছাড়িয়ে বলে,”রাত্রিপু চা খাবে?”
রাত্রি খেয়াল করেনি। এখন তাকায় রান্না ঘরে। আয়ানা আর দীপ্র দাঁড়িয়ে।
“চা বেশি আছে?”
“আছে। শেয়ার করে নিচ্ছি।”
“আচ্ছা দে।”
দীপ্রকে পুরো কাপ চা দিয়ে নিজের ভাগের চা টুকু রাত্রির সাথে ভাগ করে নেয় আয়ানা। তারপর দীপ্রর দিকে চেয়ে বলে,”চা ভালো হয়েছে?”
এখনো অন্য মনস্ক ছিল দীপ্র। ওর কথায় ফিরে চায়। চা কাপে চুমুক না দিয়েই বলে,”হুম, ভালো।”
রাত্রি, দীপ্র, আয়ানা। তিন জন এক সাথে বসেছে। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে রাত্রির মাথায় আসে, আয়ানা নিজের ভাগ থেকে চা দিল। এটা অনেকটাই অসম্ভব বিষয়। ও চাইল আয়ানার দিকে। অন্যদিন মেয়েটাকে যতটা অহংকারী, শ য় তা ন লাগে, আজ তো তেমন লাগছে না। এসব কি লোক দেখানো? নাকি সত্যি,সত্যি?
“তোমাদের ডেট কেমন হলো?”
রাত্রির চোখ পড়ল দীপ্রর দিকে। জবাব দিতে কেমন যেন লাগছে। তবু মিনমিন সুরে বলল,”ভালো।”
চা শেষ করে দীপ্র ওঠে গেল। বসে রইল আয়ানা আর রাত্রি। টুকটাক কথা হলো তাদের। দীপ্র করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় কুহুর ঘরের দরজার কাছে এল। ঠকঠক করতেই ভেতর থেকে কুহু বলল,”কে? রাত্রিপু? এসো ভেতরে।”
জবাব না দিয়েই ভেতরে এল দীপ্র। কিছু সময় ওভাবেই গেল। কুহু এবার পেছন ফিরে চাইল। ও উল্টো হয়ে জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখছিল। এখন সন্ধ্যার পরিবেশ।
“দীপ্র ভাই।”
বলেই ঠিকঠাক হয়ে বসল কুহু। দীপ্র চেয়ে রইল। কিছুই বলল না। কুহুই শুধাল,”কিছু বলবেন?”
“হুম।”
“বলুন।”
“চা বানিয়ে দিতে পারবি?”
এ কথায় কুহুর মুখটা সামান্য হা হলো। শুধাল,”মাত্রই না চা খেলেন?”
“হুম।”
“তবে?”
“তোকে যেটা বলেছি তার উত্তর দে কুহু। পারবি?”
কুহু একবার ভাবছিল বলবে পারব না। আবার কি মনে করে বলল,”পারব।”
“এখানেই বসছি। তুই চা নিয়ে আয়।”
হাজারটা দোমনা নিয়ে কুহু গেল চা বানাতে। নিচে তখনো রাত্রি আর আয়ানা বসে আছে। কুহু চায়ের পানি বসাতেই রাত্রি বলল,”চা বানাচ্ছিস?”
“হুম। তুমি খাবে?”
“না। আয়ানার থেকে শেয়ার করে খেয়েছি।”
কুহু ভালো মন্দ কিছু বলল না। ও চা বানাতে বানাতে দীপ্রর কথা ভাবল। দীপ্র ভাইয়ের চোখের চাহনি, অল্প স্বল্প প্রকাশ, সব কিছুই কুহুর চোখে ধরা দেয়। ও বুঝতে পারে। পারে অনুভব করতে। তবে নিজের ভেতর থেকে বিস্তর এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়া কিছুই মেলে না। ওর নিজের ওপর রাগ হয়। আজকের এই হাল তো ওর নিজের জন্যই হয়েছে। শুধু নিজের জন্য।
দু কাপ দেখে রাত্রি বলল,”দু কাপ কেন?”
কুহু বলতে গিয়েও দ্বিধায় পড়ে। মিনমিন করতে থাকে। রাত্রি আবারো বলে,”কী রে, আরেক কাপ কার জন্য?”
না পেরে কুহু বলে,”দীপ্র ভাইয়ের জন্য।”
এ কথায় বসা থেকে দাঁড়িয়ে যায় আয়ানা। ফোঁস ফোঁস করে বলে,”এত পাকামো কে করতে বলেছে? দীপ্র দাদাভাই মাত্রই তো চা খেয়েছে। তুই আবার….
আয়ানা যদি না তার সাথে এভাবে কথা বলত, তবে কুহু বিষয়টা মাটির সাথে মিশিয়েই রাখত। তবে ওর এহেন আচরণে রাগ বাড়ল কুহুর ও। ও মুখের ওপর বলল,”দীপ্র ভাইই চেয়েছেন আয়ানাপু। আগ বাড়িয়ে কোনো কিছু করা আমার স্বভাবে নেই।”
এ কথায় আয়ানা একদম নিস্তেজ হয়ে গেল। ওর দুটো চোখে রাগ, ক্ষোভ, যন্ত্রণা এসে ধরা দিল। কুহু আর দাঁড়াল না। চলে গেল। এদিকে রাত্রি, বসে বসে পুরো ঘটনা দেখতে লাগল। ওর নিজের জীবনেরই ঠিক নেই। এদিকে আয়ানা আর কুহু প্রতিপক্ষ হতে চলেছে!
দীপ্রর ফোন সুইচ অফ। রাত বারোটার ও বেশি। সবাই নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে আছে। আর কারো নাম্বার ও নেই। অরণ্য পড়ল বিপাকে। একবার ভাবল বাইরে ঘুরে ঘুরেই কাটিয়ে দেবে। কিন্তু সমস্যা হলো প্রচুর মশা। সব মিলিয়ে অসহ্য হয়ে ও ফোন করল রাত্রির নাম্বারে। রিসিভ হলো কয়েকবার রিংয়ের পর। রাত্রি ঘুম ঘুম ভাবে বলল,”হ্যালো।”
অরণ্য বোধহয় চমকাল। খানিকটা থমকালোও। রাত্রির এই ঘুমন্ত কণ্ঠ কতকাল পর শুনল ও। ও শুকনো ঢোক গিলল।
“হ্যালো, কে?”
ঘুমের চোখে ফোনের স্ক্রিন দেখতেও ইচ্ছে করে না। রাত্রি ওভাবেই বলতে লাগল। অরণ্য নিজেকে ধাতস্থ করে বলল,”আমি, অরণ্য।”
নামটি শুনেই রাত্রির ঘুম পালাল। ও ওঠল হুড়মুড় করে। বিঘ্ন হয়ে শুধাল,”অরণ্য?”
“হ্যাঁ, সরি বিরক্ত করার জন্য।”
অরণ্য তাকে সরি বলল! রাত্রি কি বলবে বুঝল না। এই একটা সরি বলা নিয়েই তো পুরো সম্পর্কটা ভেঙে গেল। অথচ অরণ্য আজ এত সহজে, অকপটে সরি বলে দিচ্ছে। শুধুমাত্র বেশি রাতে কল করার জন্য? জীবন এমন কেন হয়? রাত্রি ভাবনায় ডুবে। অরণ্য মিনমিন করে বলল,”রাত্রি, আমি বাইরে দাঁড়িয়ে। দীপ্রর ফোন সুইচঅফ। বাইরে খুব মশা।”
অরণ্যর আজ ফেরার কথা ছিল না। ও ছিল কাজে। কাজ শেষ করে কী মনে করে যেন ফিরল। মাঝে মাঝে কিছু জিনিস মন, মস্তিষ্কের অজান্তেই হয়। আজকের ঘটনা বোধহয় তেমনই। ও ফোঁস করে দম ফেলল। রাত্রি ভালো মন্দ কিছুই বলেনি।
“আচ্ছা রাখি। তুমি ঘুমাও।”
“আমি দরজা খুলছি। অপেক্ষা করো।”
“আচ্ছা।”
রাত্রি দ্রুত গিয়ে দরজা খুলল। মশার কামড় খেয়ে অরণ্যর যা তা অবস্থা। দীর্ঘদিন বাহিরের দেশে কাটিয়ে শরীরটা কেমন বিদেশি বিদেশি হয়ে গেছে। রাত্রির মাত্র ঘুম থেকে ওঠা চেহারা। খুবই সাধারণ গোছের মেয়ে ও। নাকের কাছে আবার তেল জমে আছে। তেলতেলে চেহারাটা তবু মায়াবী লাগছে। নাকি অরণ্যই বেশি বেশি ভাবছে। ও নজর ফেরাল। ঘরে প্রবেশ করতেই টের পেল পেটে ক্ষুধা। সেই কখন খেয়েছে। আজ যেন তার কি হয়েছে। কিছুরই ঠিক নেই।
রাত্রি চলে যাচ্ছিল। অরণ্য বলল,”একবার জিজ্ঞেস ও করলে না।”
পেছন ফিরল রাত্রি। বলল,”কী?”
“ক্ষিধে পেয়েছে কি না।”
অরণ্যকে অনেকদিন পর ইনোসেন্ট লাগল। রাত্রির মনে আছে। মনে আছে সেই দিন গুলোর কথা। অরণ্য বিদেশে থাকলেও, ওর মধ্যে একা ইনোসেন্ট আচরণ ছিল। যা তাকে আকৃষ্ট করেছিল। সেটা হারিয়ে যেতেই সম্পর্কে টানাপোড়েন এসেছিল। আজ আবারো অরণ্যর সেই ইনোসেন্ট আচরণ। রাত্রি একটা ধ্যানে ডুবে গেল। অরণ্য পেটে হাত দিয়ে বলল,”খাবার হবে? আজ সব উল্টা পাল্টা হয়ে গেছে। কিছুরই ঠিক নেই।”
ধ্যান ভেঙে ফিরল রাত্রি। নরম সুরে বলল,”বোসো, আমি খাবার গরম করছি।”
অনেকটা খাবার খেল অরণ্য। কে জানে, আজ খাবার এত বেশি মজা লাগছে কেন। ও খেতে খেতে বলল,”আমাকে রাক্ষস ভেবো না। আজ কেন যেন খাবার মজা লাগছে। তাই এভাবে খাচ্ছি।”
“আমি কিছুই ভাবি নি।”
খেতে খেতেই অরণ্য বলল,”কিছুই না?”
“না।”
“অহ।”
বলে মৌন হয়ে গেল অরণ্য। এরপরের সময়টুকু দুজনের কেউ আর একটা কথাও বলল না। মৌন হয়েই যে যার পথে পা বাড়াল। তবে পথ আলাদা হলেও, দুজনই কোথাও না কোথাও একই পথেই রয়ে গেল। আচ্ছা, এই রয়ে যাওয়াই কি দুজনকে নতুন করে একই পথের সঙ্গী করবে?
প্রিয় পাঠক, আমার সকল ই-বই তে ৫০% ছাড় চলছে। অফারটি শেষ হওয়ার আগে দেখে নিন বিস্তারিত। 👇
https://www.facebook.com/100076527090739/posts/854097380484491/?app=fbl
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমা_তুজ_নৌশি
(৪৯)
https://www.facebook.com/100076527090739/posts/855841496976746/?app=fbl
