প্রণয়ের_রূপকথা (৬২)

0
42

#প্রণয়ের_রূপকথা (৬২)

ঝনঝন শব্দে গ্লাসটা ভেঙে গেল। মাত্রই মেয়ের ঘরে এসেছিলেন আবিদা। তিনি আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে বললেন,”এটা কী করলে তুমি?”

“কী করলাম?”

“এভাবে গ্লাস ভাঙলে কেন?”

আয়ানা পেছন ফিরে চাইল। চোখ দুটো অসম্ভব লাল। আবিদা ভরকালেন।

“আয়ানা, কী হয়েছে?”

“কী হয়নি মা? আমার সবটা শেষ হয়ে গেছে। আমার চোখের সামনে কুহু প্রেম করছে। আমার চোখের সামনে।”

আবিদা বুঝলেন না মেয়ের কথা। আয়ানার গা কাঁপছে। চোখ দুটো রক্তিম।
“কুহু, দীপ্র দাদাভাইয়ের ঘর থেকে ভিজে অবস্থায় বের হয়েছে।”

“দীপ্র বাড়ি এসেছে?”

“এসেছে।”

আবিদা কী বলবেন বুঝলেন না। আয়ানা এবার চ্যাঁচিয়ে ওঠল।

“তোমরা আমাকে ধৈর্য ধরতে বলেছিলে। সেই ধৈর্যে আমার সবটা শেষ হলো। আমাকে না আগাতে দিচ্ছিলে। আর না কিছু করতে দিচ্ছিলে। আসল দোষী তো তোমরা মা।”

“আয়ানা! এটা কী বলল‍ে তুমি। আমরা দোষী?”

“হ্যাঁ, তোমরা দোষী। তোমাদের জন্যই আমার সবটা শেষ। সবটা শেষ। চোখের সামনে থেকে চলে যাও। চলে যাও বলছি।”

বলে হুংকার তুলল আয়ানা। আবিদা না গিয়ে মেয়ের কাছে আসতে চাইলেন। আয়ানা তৎক্ষণাৎ হাতে থাকা ফোনটা ছুড়ে ফেলল আয়নাতে। বড়ো আয়ানাটা ভেঙে গেল। আবিদা চমকে পিছু হটলেন।

“আমার চোখের সামনে থেকে দূর হও।”

আবিদাকে বের হতে হলো। তার দু চোখে জল। তিনি বের হতেই দেখতে পেলেন ববিতা দাঁড়িয়ে। ভাঙার শব্দ তার কানে এসেছে।

“আপা, কী ভাঙল?”

আবিদা চোখ মুছলেন। বললেন,”আমার মেয়ের মন। যা ভেঙেছে তোমার মেয়ে।”

ববিতা কথা খুঁজে পেলেন না। আবিদা যেতে যেতে বললেন,”তামাশা দেখতে এসেছে এখন। অথচ এই তামাশা তার মেয়েই তৈরি করেছে। দিনের বেলাতেই কী না কী করে বেড়াচ্ছে। ভিজে অবস্থায় বের হচ্ছে দীপ্রর ঘর থেকে।”

কথা গুলো শুনে ববিতা মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলেন। দীপ্র-কুহুর বিয়েটা এখনো ততটা স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি। দুজনে আলাদা থাকছে, এ ব্যাপারটি সবারই জানা। ববিতা নিজেও চাচ্ছিলেন, ঝামেলাটা আরেকটু দমলে তবেই এক সাথে থাকুক ওরা। কিন্তু এখন তো সব এলোমেলো লাগছে। বেশ চিন্তায় পড়লেন তিনি। মেয়ের কক্ষে এলেন। কুহু তখন চুল শুকাচ্ছে। মাকে দেখেই বলল,”এসে পড়েছ?”

“হ্যাঁ, এলাম। তুই এই অসময়ে গোসল করেছিস?”

“ফিরতে লেট হয়েছে। তাই গোসলেও দেরি হলো। তুমি তো জানো আমি গোসল ছাড়া থাকতে পারি না।”

জানালা দিয়ে শীতের হাওয়া আসছে। খোলা দেখে ববিতা জানালাটা বন্ধ করে দিলেন। প্রশ্ন করতে দ্বিধা লাগছে। তবু তিনি বললেন,”দীপ্রর ঘরে গিয়েছিলি?”

এ কথায় কুহু থমকাল। জবাব দিল না। ববিতা এগিয়ে এসে মেয়ের বাহু টেনে ধরলেন,”তুই নিজ থেকেই তো আলাদা থাকলি। তবে এই দিনের বেলাতেই…

ববিতার কথা আটকাল। কুহুর নজরও নেমে গেছে। ও কথার মানে বুঝতে পারছিল। ও বলল,”তুমি যা ভাবছো তা না মা।”

“তবে ও ঘর থেকে ভিজে অবস্থায় বের হলি কেন?”

কুহু কীভাবে বলবে জানে না। ও থেমে রইল। মেয়ের বাহু টেনে ধরলেন ববিতা।

“থাকতে হলে, সবসময়ে জন্যই থাকো। এমন কিছু কোরো না যাতে আমায় কথা শুনতে হয়।”

কুহু কিছুই বলতে পারল না। ববিতা ফোঁস করে দম ফেললেন। বললেন,”যদি, প্রয়োজন হয় তবে ট্যাবলেট খেয়ে নিও। সময়ের আগে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে নিও না।”

মায়ের যাওয়ার পানে কুহু তাকিয়ে রইল। খুব হতাশ লাগছে এখন। মায়ের মনের অবস্থা ও ধরতে পারে। তিনি চিন্তিত। চিন্তিত কুহুর ভবিষ্যৎ নিয়ে। চারপাশের এহেন অবস্থায়, কাউকেই আর ভরসা করতে পারেন না তিনি।

এখন আর রাতের খাবারটা একসাথে খাওয়া হয় না। যে যার মতন খেয়ে নেয়। বাড়িটা কেমন হয়ে আছে। কুহু খাবার বেড়ে দিচ্ছিল কুঞ্জকে। বাচ্চাটা আজ প্রায় না খাওয়া। আবিদাও খেয়াল করেননি। কুঞ্জও সাহস করে চায়নি। কুহু ওকে রান্না ঘরের পাশে ঘুরঘুর করতে দেখে নিজ থেকেই বলল। কুঞ্জ মাথা নাড়াল। তাই ও খাবার দিচ্ছিল। ঠিক তখনই আবিদা এসে বললেন,”এত দরদ দেখাতে হবে না।”

তিনি হাত থেকে বাটিটা নিয়ে গেলেন। কুহু ভাষাহীন ভাবে চেয়ে রইল। দীপ্র নেমে আসছে। নজরে এসেছে বিষয়টা। ও এগিয়ে এল।

“কুঞ্জকে নিয়েও এখন ঝামেলা করবে চাচি?”

“করলে করব। সেসব নিয়ে এত মাথা ব্যথা না দেখালেই ভালো। ও আমার ছেলে। আমি যা বলব তাই হবে।”

“তাই বলে কি র ক্তে র থেকে আলাদা করবে?”

“করার হলে করব। র ক্তে র দাম থাকলে আমার ঘর এলোমেলো হোতো না।”

কুঞ্জর মুখটা একদম শুকিয়ে গিয়েছে। দীপ্র কঠোর ভাবে বলল,”অশান্তি কিন্তু ভালো লাগছে না চাচি। কুঞ্জকে এসবে না জড়ালেও হয়।”

“অশান্তির কথা বলসিস? সেটা কারই ভালো লাগে দীপ্র? অথচ এই অশান্তি তো তোরাই সৃষ্টি করেছিস। কুঞ্জ, তুমি ঘরে গিয়ে খাবে।”

কুঞ্জর হাতটা ধরতেই ও একটু থেমে রইল। আবিদা চোখ পাকালেন। কটমট করে বললেন,”এসো সাথে।”

চোখের সামনে দিয়ে বাচ্চাটিকে নিয়ে গেল। দীপ্রর মেজাজ খারাপের থেকেও খারাপ হচ্ছে। কিন্তু গুরুজনের সাথে, কতটাই বা কঠোর হওয়া যায়।

“কুহু।”

থমকে দাঁড়িয়ে ছিল ও। চাইল ডাকে। দীপ্র পুনরায় বলল,”খেয়েছিস?”

ও মাথা দোলাল। অথার্ৎ খায়নি। দীপ্র বল‍ল,”খাবার বাড়। একসাথে খাব।”

কথা মতন কুহু খাবার নিয়ে আসে। দীপ্রর প্লেটে তুলে দিতেই দীপ্র বলে,”বোস।”

“আমার ক্ষিধে নেই।”

“আমার আছে। আর তুই না খেলে, আমার ক্ষিধেও মিটবে না। চুপচাপ বোস।”

এ কথায় কুহু মাথা নত করে বসল। প্লেটে ভাত নিয়ে নাড়াচাড়া করতেই দীপ্র বলল,”খাইয়ে দিতে হবে নাকি?”

না বুঝে ও তাকিয়ে রইল। একদম সরল দৃষ্টি। দীপ্র বলল,”কুহু, শুধু শুধু তুই মন খারাপ করছিস।”

“কুঞ্জ খেতে পারল না।”

“ও ঘরে গিয়ে খাচ্ছে।”

“কিন্তু, আমি দেখতে পারছি না।”

বলেই ওর চোখ দুটো টলমল করে ওঠল। দীপ্র ফোঁস করে দম ফেলল। এই মেয়েটা ভীষণ আবেগী। আর আবেগের বসেই নানান সময় ভুল করে বসে। দীপ্রর ভয়টা তো এখানেই।

সময়ের স্রোতে সম্পর্ক গুলো যেন কেমন হয়ে যায়। রাত্রি, আর আবির, দুই ভাই বোনের বিয়ের আয়োজন চলছে দারুণ গতিতে। সবাই খুব ব্যস্ততার সাথে নতুন করে সাজাচ্ছে। তবে আজকাল কণার সাথে আগের মতন কথা হয় না কুহুর। বিষয়টি মাত্রই বুঝতে পারল ও। কণা রোদ পোহাচ্ছিল। কুহু এসেছিল কাপড় শোকাতে। শ্যাওলা পড়া ছাদে আঁচারের বয়াম গুলোও রয়েছে। কুহু বয়াম খুলে এক টুকরো আঁচার মুখে তুলে বলল,”দাদিজান রোদে দিয়েছেন এগুলা?”

কণার থেকে উত্তর আসে না। ও চুপ করেই থাকে। কুহু শরীর ছুঁতেই ভরকে যায়। ও ভ্রু কুঞ্চিত করে শুধায়,”কী হয়েছে তোর?”

আমতা আমতা সুরে কণা বলে,”কিছু তো হয়নি।”

“মনমড়া দেখাচ্ছে।”

“কি জানি। মাঝে শরীর খারাপ ছিল। তাই হয়তো।”

“সেটা তো সেরেছে বেশ অনেকদিন হলো।”

“তাহলে হয়তো এমনি।”

কুহু ওর গাল, গলা কপাল ছুঁয়ে দেয়। কণা চেয়ে থাকে এক দৃষ্টিতে। কুহু বলে,”শরীরের তাপমাত্রা ঠিক আছে। কোনো সমস্যা মনে হলে জানাবি আমাকে।”

“হুম।”

বলে আবারো মৌন হয় কণা। কুহু ওর পাশে বসে। আঁচারের বয়াম খুলে বলে,”নে।”

“না। ইচ্ছে করছে না।”

“তুই তো আঁচার খেতি খুব।”

“হুম। এখন ভালো লাগছে না।”

“আচ্ছা। না ইচ্ছে করলে জোর করব না।”

বলে বয়াম লাগায় কুহু। কণা বলে,”জয়েনিংয়ের ডেট তো পেরিয়ে গেল। জয়েন কেন করলি না?”

স্কুলের জয়েনিংটা যেন কুহুর হয়েও হচ্ছে না। ও দম ফেলে। বলে,”চাপ লাগছে। আবারো সময় নিয়েছি। পড়াশোনা, জীবন সব তো ফ্লো হারিয়েছে।”

“হুম।”

বলে আবারো থেমে যায় কণা। কুহু বোনের গা ঘেঁষে বসে। বলে,”মায়ের ব্যবসাটা ভালো চলছে। আমার খুব ভালো লাগছে। আইডিয়া কিন্তু তোর ছিল।”

“হুম।”

শুধু হুম, আর কি কিছু বলার নেই কণার? কুহু কেমন চুপসে যায়। কণা হাঁটুতে মুখ গুজে দেয়।

“তুই কি কিছু নিয়ে ভাবছিস?”

“না।”

“কিছু নিয়েই না?”

“উহু।”

“রাত্রিপুর বিয়ে নিয়ে তোর কিন্তু খুব আগ্রহ ছিল কণা।”

“সেটা তো তোর বিয়ে নিয়েও ছিল আপু।”

কুহু কথা হারায়। কণা মাথা তুলে তাকায়। বলে,”তুই যদি দীপ্র ভাইকেই বিয়ে করবি, তবে সবসময় না কেন করতি? সবকিছুই কি অভিনয় ছিল?”

“কণা! হুট করে এসব কথা কেন?”

ভারী অবাক হয়ে বলে কুহু। কণা হেসে বলে,”জিজ্ঞেস করতে পারি না? উত্তর না দিতে চাইলে দিতে হবে না।”

কুহু থেমে থাকে। ওর ভেতরটা কেমন কাঁপছে। ওর জীবনে, চোখের সামনে, এত সব ঘটেছে যে, ও আজকাল এইটুকুতেই নুয়ে পড়ে। ঠিক ভুল পার্থক্য করতে ভারী কষ্ট হয়। যেমন একটা সময় মনে হয়, দীপ্র ভাইয়ের প্রতি ওর আকাশ সমান আগ্রহ। আবার একটা সময় মনে হয়, যদি এতই আগ্রহ, তবে কেন বিয়ের বিষয়টা এখনো সহজ হচ্ছে না ওর নিকট? কেন এত দূরত্ব। এটা কি আদৌ ভালোবাসাতে পরিণত হবে, নাকি নিছকই ভ্রম হয়ে যাবে?

চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমা_তুজ_নৌশি

লম্বা সময় অপেক্ষা করিয়েছি। মাফ চাই প্রিয়রা। এটা দেখে আসিয়েন তো। 👇
https://www.facebook.com/100076527090739/posts/902549748972587/?app=fbl

(৬৩)
https://www.facebook.com/100076527090739/posts/905788208648741/?app=fbl

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here