উৎসর্গ #পর্ব:২৫ #তানজিনা

0
23

#উৎসর্গ
#পর্ব:২৫
#তানজিনা ইসলাম

আজকের পুরো দিনটা ভালোই কেটেছে মায়ার।সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মুখগুলোর দেখা পেয়েছে ও। রাহুল,রুহানি,আরিয়ান,সাহিল, রিয়ানা মিলে ঘুম থেকে টেনে তুলেছে ওকে।ঘুমের রেশ কাটতে না কাটতেই রুহানির হাতের উদুম কিল খেয়েছে মায়া।
সকালের নাস্তার আগে রুহানির মার খেয়ে দিন শুরু হয়েছে ওর। সবার অনেক বকাও খেয়েছে। সবার একটাই অভিযোগ, সমস্যা নাহয় রুদ্রর সাথে হয়েছে।কিন্তু ওদের সাথে কথা বলা বন্ধ করলো কেন?রুহানি আর রিয়ানাতো পুরোটা সময় এক প্রকার জড়িয়ে ধরেই বসে ছিলো।মায়া শুধু মুচকি হেসেছে। এত ভালোবাসা কই রাখবে ও?
এত এত ভালোবাসার মানুষ ওর।যারা নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবাসে ওকে।যারা কোনো ফায়দা ছাড়াই ওর কথা এতটা ভাবে।এই অসম্ভব ভালোবাসাগুলো রাখার জায়গা তো নাই ওর কাছে।

বিভিন্ন কথা -অকথার মাঝে মায়া জানতে পেরেছে রিয়ানা আর সাহিলের ঝগড়ার কারণ।সাহিল সবার অগোচরে রিয়ানাকে নিজের ভালোবাসার কথা জানিয়েছে।কিন্তু রিয়ানা সাফ সাফ রিজেক্ট করেছে ওকে।সাহিল মানানোর চেষ্টা করলে রিয়ানা অনেক কথা শুনিয়েছে ওকে,খোঁটা দিয়েছে।বন্ধু হয়ে বন্ধুকে অন্য নজরে দেখে কী করে?সাহিল যাতে নিজের নজর ঠিক করে।
সাহিল তারপরও রিয়ানাকে শান্তভাবে বুঝিয়েছে,’রুদ্র আর মায়াও বেস্টফ্রেন্ড ছিলো।তবুও ওদের দুজনের বিয়ে হয়েছে।মায়া ভালোবাসে রুদ্রকে।নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসে।রুদ্র ভালো না বাসুক তারপরও মায়ার ভালোবাসার কোনো পরিবর্তন হয়নি।মায়া যেভাবে একতরফা ভালোবাসেছে , সেভাবে নাহয় সাহিলও ভালোবাসবে রিয়ানাকে।ভালোবাসতে না পারুক অন্তত রিয়ানা বিয়েতে যেন সম্মতি দেয়।
কিন্তু রিয়ানা কাঠ কাঠ উত্তর দিয়েছে ‘মায়া যেসব কষ্ট সয়েছে তা রিয়ানা সইতে পারবে না। ছেলেদের চেনা হয়ে গেছে ওর।রুদ্রও মায়ার বেস্টফ্রেন্ড ছিলো, কিন্তু তারপরও মায়ার সাথে কতটা খারাপ বিহেভ করেছে।এমনকি দুজনের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরও মায়ার সামনেই আরশির সাথে ঢলাঢলি করেছে।মায়াকে কষ্ট দিয়েছে, ওদের সামনে অপমান করেছে।এসব ওর নিজের চোখে দেখা।
নিজের চোখের সামনেই তো ঘটেছে সব।নিজের প্রিয় বান্ধবীর কষ্টে নিজেও কষ্ট পেয়েছে তারপরও কোনো সাহায্য করতে পারেনি তাঁকে। যেখানে রুদ্রকে চোখের সামনে বদলে যেতে দেখেছে, সেখানে সাহিল যে বদলাবে না তার কী গ্যারেন্টি?এমন কোনো গ্যারান্টি কী সাহিল দিতে পারবে?’
রিয়ানা প্রশ্ন করেছে ঠিকই কিন্তু সাহিলের উত্তর শোনার প্রয়োজনবোধ করেনি।রুদ্র এমন করেছে এর মানে এই না যে সাহিলও এমন করবে।তারপরও রিয়ানা ওকে অপমান করেছে,সাহিল কষ্ট পেয়েছে অনেক। ও রিয়ানাকে অন্য নজরে দেখে না। কিন্তু রিয়ানার সামনে ওর কেমন যেন লাগে! অন্যরকম অনুভত হয় বুকের মধ্যে। অনেকগুলো দিন একসাথে কাটানোর পর অবশেষে সাহিল রিয়ালাইজ করেছে যে অনুভূতি ওর রিয়ানার জন্য আসে, সেটা রুহানি বা মায়াকে দেখে আসে না। তাহলে এটা নিশ্চয়ই শুদূ বন্ধুত্বের অনুভুতি হবে।কিন্তু রিয়ানা তো শুনলো না, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে এড়িয়ে গেলো ওঁকে।
সেই থেকে সাহিল আর রিয়ানার মধ্যে ঠান্ডা যুদ্ধ চলছে।রিয়ানা সাহিলের প্রপোজ মানতে পারেনি আর সাহিল রিয়ানার রিজেক্ট।
এ কথা রাহুল তার সিক্রেট এজেন্টের মাধ্যমে জানতে পেরেছে তাও ঘটনা ঘটার পনেরো দিন পর।যেহেতু সব বন্ধুদের মাঝে এক্সামের জন্য সাময়িক দুরত্ব তৈরী হয়েছিলো তাই রাহুল এই কথা কাউকে জানাতেও পারেনি।

এসব কথা শুনেই মায়া রিয়ানাকে বুঝিয়ে বলেছিলো, ‘রুদ্র আর সাহিলের সিচুয়েশন আলাদা।রুদ্র ভালোবাসতো আরশিকে।তাই মায়াকে হাজার চেষ্টা করেও মানতে পারেনি।আর ফলস্বরূপ খারাপ ব্যবহার করে ফেলেছে ওর সাথে।কিন্তু সাহিলতো কাউকে ভালোবাসে না আর না রিয়ানা ভালোবাসে কাউকে।তাহলে সাহিলকে বিয়ে করতে সমস্যা কী?রিয়ানার ডেসটিনেশন কেন মায়ার মতো হতে যাবে?রিয়ানাতো আর মায়ার মতো খারাপ না।না,রিয়ানা কারো ভালোবাসা কেড়ে নিয়েছে মায়ার মতো।’
উত্তরে রিয়ানা বলেছে, ‘দেখ মায়া নিজেকে খারাপ বললেই কেও খারাপ হয়ে যায় না।তুই ভুল করেছিস মানছি,কিন্তু তার মাশুল এভাবে দিতে হবে কেন তোকে?একটু ভালো থাকার অধিকার তো তোরও ছিলো।কিন্তু পারছিস কী ভালো থাকতে?যে কাটায় তোর পা কেটে রক্তক্ষরণ হচ্ছে সে কাটায় জেনে বুঝে আমি আবার পা দিতে যাবো কেন?আমি দরকার হলে একটা গাঞ্জাখোরকে বিয়ে করবো তারপরও নিজের কোনো বন্ধুকে না।’

মায়া অনেকবার বুঝিয়েছে রিয়ানাকে।এমনকি ওর সব বন্ধুরাও অনেক অনুরোধ করেছে,রিয়ানা যাতে সাহিলকে বিয়ে করতে রাজি হয়। কিন্তু রিয়ানা কিছু বলেনি। মায়া রিয়ানাকে বলেছে এটা তার প্রথম এবং শেষ আবদার রিয়ানার কাছে।রিয়ানা যাতে একটু ভেবে দেখে।আর কোনোদিন রিয়ানার কাছে কিচ্ছু চাইবে না মায়া। ভালোবাসা না পাওয়ার যে যন্ত্রণা ও ভোগ করছে সে যন্ত্রণা যাতে ওর কোনো বন্ধুকে সহ্য করতে না হয়।রিয়ানা জানিয়েছে ও ভাববে।কিন্তু এইবার রিয়ানা যেটা বলবে সেটাই ওর শেষ কথা হবে।
অবশেষে সকলেই বিকালের দিকে বাড়ির পথে রওনা দিয়েছে। মায়া রুহানি আর রিয়ানা কে থাকতে বলেছিলো। কিন্তু পরেরদিন এক্সাম হওয়ায় ওরা চেয়েও থাকতে পারেনি।
,

ঝড়ো বাতাস শুরু হতেই মায়া দৌড়ে ছাঁদে উঠে গেলো।ছাঁদের রেলিঙের কাছে দাঁড়িয়ে দুহাত মেলে স্নিগ্ধ বাতাস অনুভব করলো।এখন বিকালের শেষ সময় হলেও আকাশ দেখে মনে হচ্ছে সন্ধ্যা পার হয়ে রাত নামার দেরি। আজ খুব বেশিই বৃষ্টিতে ভিজতে মন চাইছে মায়ার।বৃষ্টির পানির সাথে নিজের মনের দুঃখ-কষ্ট গুলো ঝড়িয়ে দিতে মন চাচ্ছে। আজ এই বৃষ্টিময় দিনে দাঁড়িয়ে ,মায়ার আরেকটি অনুরূপ দিনের কথা মনে পরছে। আজ থেকে হয়তো দুমাস আগে।এরকম একটি মেঘলা দিনে ভার্সিটি ছুটির পর আরশি আর ও মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিলো।পাশে একটু দুরে দাঁড়িয়ে ছিলো ওর বন্ধুরা।
মায়া নিস্পৃহ কন্ঠে জিজ্ঞেস করেছিলো আরশিকে, ‘কেন ও রুদ্রর পিছে পরে আছে?’ আরশি উদাস কন্ঠে উত্তর দিয়েছিলো, ‘রুদ্রকে ভালোবাসে তাই।’মায়া ফের প্রশ্ন করেছিলো,’ ও কী জানে না রুদ্রর সাথে ওর বিয়ে হয়ে গেছে?একজন বিবাহিত পুরুষকে ভালোবাসলেও, পিছনে পরে থেকে লাভ কী?ওর তো আর বিয়ে করার সুযোগ নেই।’

বিনিময়ে আরশি হেঁসেছিলো।হেঁসে বলেছিলো ‘মায়া ছলনা করেছে,কিন্তু আরশি ছলনা না করেই এমন অবস্থা করবে যে রুদ্র মায়াকে সহ্যই করতে পারবে না।খুব তাড়াতাড়িই মায়া নামক কাঁটাকে উপড়ে ফেলবে ও রুদ্রর জীবন থেকে। আর তারপর অবশ্যই রুদ্রকে বিয়ে করবে।দুনিয়ার সবকিছু সেক্রিফাইজ করা গেলেও, নিজের ভালোবাসার মানুষের জন্য নো কম্প্রোমাইজ। আর কম্প্রোমাইজ করা যেতো, যদি বিপরীত পাশে ওর অপ্রিয় শত্রু না থাকতো! মায়ার সাথে ওর শত্রুতাটা কেমন যেন শুরু থেকেই।সবসময় চোখে চোখে, আড়ালে-আবডালে যুদ্ধ চলে ওদের। তাইতো বেছে বেছে ওর বেস্টফ্রেন্ডের সাথেই রিলেশনে গেছে। আরশি সবসময় হেরে গেছে মায়ার কাছে। কিন্তু এবার ও জিতবে। এবারের বেইটে ওঁকে জিততেই হবে।হেরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অন্তত মায়াকে কাদানোর জন্য হলেও ওর যেতে চায়।

মায়া নিজেও হেঁসেছিলো ওর সাথে।তাচ্ছিল্য করে বলেছিলো, ‘কোনোদিন তা সম্ভব হবে না। আরশি শুধু শুধুই মিথ্যে স্বপ্ন দেখছে।’ আরশি চ্যালেন্জ নিয়ে বলেছিলো এই চ্যালেন্জে ওই জিতবে।মায়া যাতে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষকে হারানোর জন্য।’ মায়া চলে যেতে যেতে বলেছিলো ‘যা এক্সেপ্ট করলাম তোর চ্যালেন্জ।যদি পারিস রুদ্রকে নিজের পক্ষে কর। আমার প্রতি তোর সবচেয়ে বড় প্রতিশোধ হবে ওকে আমার বিরুদ্ধে দাঁড় করানো। কিন্তু আমার কথা শুনে রাখ তুই এমনটা কোনোদিন হবে না।রুদ্রকে যখন আমি একবার নিজের করে পেয়েছি,তখন আল্লাহ ছাড়া এই দুনিয়ার কেও আর কোনোদিন আমার থেকে কেড়ে নিতে পারবে না।কিন্তু তুই হারার জন্য প্রস্তুত থাক।এই জনমে আমার থেকে তাকে কেড়ে নেওয়া তোর পক্ষে সম্ভব নয়। ‘
মায়া এসব বড় বড় কথা বলে এসেছিলো আরশিকে সেদিন। কিন্তু তার ঠিক পরেরদিনই আরশি সুইসাইড করলো। আরশির ঐ একটা পদক্ষেপ রুদ্রকে মায়ার কাছ থেকে সত্যিই দুরে সরিয়ে দিলো।রুদ্র বদলে গেলো।মায়ার নিজের প্রিয়জনের চেনা মুখ অচেনা হয়ে গেল।মায়ার কথার আস্থান ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো।

আকাশ থেকে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পরছে। টুপটুপ করে বৃষ্টি মায়ার চুল বেয়ে মুখোমন্ডল ছুয়ে দিচ্ছে।মায়া দু’হাত মেলে আকাশের দিকে মুখ করে চোখ বন্ধ করে ভিজছে।বৃষ্টির প্রতিটা ফোটা ভিজিয়ে দিচ্ছে ওকে।
বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আরশিকে মনে করে ,তাকে উদ্দেশ্য করে বললো
-“তুই জিতে গেছিস আরশি। জিতে গেছিস তুই।তুই তোর কথার মান রাখতে পেরেছিস।আজ তুই এখানে নেই,কিন্তু তবুও আমি তোর জেতার কথা জানিয়ে দিলাম তোকে।জীবনে এই প্রথমবার তোর কাছে হেরে গেলাম আমি।তোর দুই বছরের ভালোবাসা আমার আঠারো বছরের বন্ধুত্বের কাছে জিতে গেছে।আমার বন্ধুত্ব হেরে গেলো আরশি।আমি হেরে গেলাম।আমি আমার হার মাথা পেতে নিলাম।”

ঝুম বৃষ্টিতে মায়া ভিজে একাকার।পরণের কাপড়টা গায়ের সাথে লেপ্টে গেছে।তীব্র বাতাসে গাছপালা নড়ছে। বাতাসের তোপে দাঁড়িয়ে থাকা দায় হয়ে পরেছে।বিজলি চমকাচ্ছে আকাশে।মেঘ গর্জন করছে।কিন্তু মায়ার ভয় লাগছে না।একটুও ভয় লাগছে না।যেখানে অনুভূতিই মরে গেছে সেখানে কোনোকিছু অনুভব হবে না এটাই স্বাভাবিক। রুদ্র ওর মনটা কিভাবে বিষিয়ে দিয়েছে! এতোটাই ঘৃণা করেছে যে মায়া এখন নিজেকেই ভালোবাসতে পারে না। ওর লজ্জা লাগে, অনুশোচনা হয়। বন্ধুত্ব টাও কেন এভাবে নড়বড়ে হয়ে গেলো! ভালো নাহয় বাসলো না, অন্তত বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে এই পঁচিশ দিনে একবার ওঁকে দেখতে আসা যেতো না!

মায়া বসে পরলো ছাদের মেঝেতে।দুহাতে ভর দিয়ে সামলালো নিজেকে। ও যে শুধু আরশির সাথে চ্যালেঞ্জে হারেনি।হেরে গেছে নিজের জীবনের কাছে।হেরে গেছে ওর ভালোবাসা।
মায়া হাত দিয়ে ঠেকিয়ে ছাদের মেঝেতে বসে আছে।বৃষ্টির পানি নাক বেয়ে মেঝেতে পরছে।সেই সাথে ওর চোখের পানিও মিশে যাচ্ছে।
মায়া জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে চিৎকার করে বললো
-“ও আল্লাহ,আমি আর সইতে পারছি না।আমাকে নিয়ে যাও তোমার কাছে। আর বেহায়া বানাইও না আমাকে।নিজের দিকে তাকালে এখন নিজেরই লজ্জা লাগে।নিজেকে ঠিক কতটা নিচে নামিয়েছি আমি। আত্মসম্মান কতবার নিজের হাতে বলি দিয়েছি।ও আল্লাহ,আমার রুদ্র,আমার রুদ্র।ওকে তুমি ভালো রেখো।সে যাতে কোনোদিন কষ্ট না পায়।আমি আমার দুঃখ সয়ে নিয়েছি আল্লাহ। ওকে ওর ভালোবাসার মানুষের সাথে ভালো রেখো।আমার কথা যাতে ওর একফোটাও মনে না পরে।ওকে ভোলা আমার পক্ষে সম্ভব না,কিন্তু ও যাতে আমাকে ভুলে যায়।কোনোদিন ওর দুঃস্বপ্নেও যাতে আমি না আসি। ভালো রেখো ওকে।”
,

বৃষ্টিতে ভেজার দরুন রাতে মায়ার গা কাঁপিয়ে জ্বর এলো। মাহেরা খান চিন্তিত মুখে চেয়ে আছে মায়ার ঘুমন্ত চেহারার দিকে।ঘুমের ঔষধ দেয়া হয়েছে ওকে।একটু আগেই ডাক্তার এসে দেখে গেছে।
মায়া ছাদ থেকে আসার পর মাহেরা খান তার পিছু পিছু এসেছিলেন।মায়ার তখন কাশতে কাশতে অবস্থা কাহিল।শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে,দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম।তখনই মু্স্তাফিজ খানকে আর্তনাদ করে ডাকেন তিনি।
মাহেরা খান কপালে হাত ঠেকিয়ে দেখেন আগুন ন্যায় জ্বর। থার্মোমিটারে জ্বরের পরিমাণ ১০৪ ডিগ্রি।
মাহেরা খান চিন্তায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। এক্ষুনি যদি মায়া জেগে থাকতো তাহলে রান্নাঘর থেকে গোটা এক খুন্তি এনে ওর পিঠে ভাঙতেন তিনি।পই পই করে মায়াকে মানা করেছিলের তিনি যাতে বৃষ্টিতে না ভিজে।বৃষ্টির পানি ওর সহ্য হয় না। শ্বাস কষ্ট উঠে যায়। প্যানিক অ্যাটাক করে। কিন্তু মায়া যদি তার একটা কথা শোনে।আরও অসময়ের বৃষ্টি।এখন অসুস্থ হয়ে আবার হসপিটালে না ভর্তি হতে হয়।কত করে সাবধানে থাকতে বলেছিলেন তিনি মেয়েকে।কিন্তু নিজের একটু যদি যত্ন নিতো অবাধ্য মেয়েটা।

মাহেরা খান মায়ার মাথার কাছে বসে জল পট্টি দিচ্ছেন।আর বারবার আঁচল দিয়ে চোখ মুছছেন। কেন তার মেয়েটাকেই সবসময় শারীরিক, মানষিক ভাবে এতো কষ্ট পেতে হয় ভেবে পানা না তিনি।
আজ পুরো রাতটায় মেয়ের কক্ষে থাকবেন তিনি।মুস্তাফিজ খানকে এক প্রকার জোর করে নিজেদের কক্ষে পাঠিয়েছেন তিনি।নিজের আদরের মেয়েকে ছেড়ে যেতে মন চাচ্ছিল না তারও। কিন্তু এতো রাতে তিনি থেকেও কী করতেন!তাই মাহেরা খান পাঠিয়ে দিয়েছেন তাকে।জলপট্টি দিতে দিতে একসময় মায়ার পাশেই ঘুমিয়ে পরেন তিনি।

মাঝরাতে মায়ার ঘুম ভেঙে যায়। ঘুমের মেডিসিনের কারণে ঘুম ভাঙার কথা না। তবুও ঘুম ভেঙে গেছে মায়ার।মায়া অনেক চেষ্টার পর বিছানায় হাত ঠেকিয়ে উঠে বসে।মাথা ভারি হয়ে আছে সাথে পুরো শরীর নাড়াতে কষ্ট হচ্ছে ।চোখেও ঝাপসা দেখছে।চোখ কচলে কোনোমতে বোঝার চেষ্টা করে এখন ঠিক কোন অবস্থানে আছে।পাশেই তার মা ঘুমোচ্ছে।
মায়া বালিশের পাশ হাতড়ে নিজের মোবাইল হাতে নিলো। মোবাইলে মুহুর্তের সময়টুকু দেখে নিয়ে,আবার ধপ করে শুয়ে পরলো।পুরো শরীরে ব্যাথা,অবস হয়ে আছে যেন স্নায়ুর সকল কার্যক্রম।মায়ার খারাপ লাগছে কেনো যে ঘুমটা ভেঙে গেলো। এত আরামকরে ঘুমোচ্ছিলো,এখন হাজার চেষ্টা করেও আর ঘুম নামবে না চোখে।
মায়া মোবাইল হাতে নিলো একটু সময় কাটানোর জন্য। কিন্তু ফোনের স্ক্রিন পাওয়ারে চোখ খুলে তাকাতে পারছে না ও।মায়া কষ্ট করে দেখার চেষ্টা করলো,কিন্তু চোখ জ্বালার কারণে দেখতে পারলো না।
বিরক্ত হয়ে মোবাইল রেখে দিতে যাবে তার আগে আজকের তারিখে চোখ পরলো।
ওয়েট,আজকে তো ওদের বিয়ের একবছর পূর্ণ হয়েছে।এই দিনেইতো রুদ্রর সাথে ধরে বেধে বিয়ের পিড়িতে বসেছিলো ও।যাকে বলে ফোর্স ম্যারেজ! মায়ার মনে পরলো সেদিনের ঘটনাগুলো।অতিতের স্মৃতি মাথায় আসতেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটলো মায়ার।
মায়া আবার উঠে বসলো।কাঁপা কাঁপা হাতে চুলগুলো খোপা করে নিলো।বিছানা থেকে নেমে কোনোমতে নিজের পা দুটো টেনে নিয়ে গেলো পড়ার টেবিলের কাছে।
নাক দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। টিস্যুবক্স থেকে টিস্যু নিয়ে নাকের রক্ত মুছলো। তারপর রক্তমাখা টিস্যু ফেলে দিলো ডাস্টবিনে।

বইয়ের ভাঁজ থেকে নিজের স্কেচবুক বের করলো।মাথা ঘুরছে তাই নিজের ব্যালেন্স রাখার জন্য টেবিলের পাশ ঘেঁষে বসলো।স্কেচবুকের পাতা উল্টে কাঙ্ক্ষিত ছবিটি আসতেই মায়া যত্নে ছুয়ে দিলো। চোখে একরাশ মুগ্ধতা ঠিকরে পরলো ওর। ওর জীবনের সবচেয়ে দামী, গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ ‘রুদ্র’।

যেদিন টিচারের বিরক্তিকর লেকচারে মায়া মন বসাতে পারছিলো না,সেদিন ক্লাসের ফাঁকে লুকিয়ে- চুরিয়ে রুদ্রর ছবি এঁকেছিলো।মজার ব্যাপার হচ্ছে পুরো ছবিটা আঁকতে রুদ্রর দিকে একবারো তাকাতে হয়নি ওর।যেখানে পুরো রুদ্রর ছবিই ও মনের মধ্যে এঁকে ফেলেছে সেখানে শুধুমাত্র খাতার পাতায় আকার জন্য ওর দিকে আবার তাকাতে হবে কেন?
কিন্তু স্কেচের কিছু কাজ এখনো থেকে গেছে। করবে করবে করে আর করা হয়ে উঠেনি।মায়া টেবিল ধরে দাঁড়িয়ে ড্রয়ার থেকে রাবার আর পেন্সিল বের করলো।টেবিলের পাশে বসে স্কেচের এক -চতুর্থাংশ আকতে শুরু করলো।ওর হাত কাপছে। জ্বর উঠলেই ওর প্যানিক অ্যাটেক আসে। নিজেকে ঠিক রাখতে পারে না। নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বেরোয়। হাত কাপে, চোখে ঝাপসা দেখে, মাথা ঘোরায়। বুক ধরফর করে।
এসব কষ্ট আজ আর মায়ার উপর প্রভাব ফেলতে পারলো না।মনোযোগ দিয়ে ছবি আঁকতে থাকলো ও।
আকা শেষ করে উঠে দাড়ালো মায়া। স্কেচটা এক হাতে নিয়ে অপর হাতে মোমবাতি আর লাইটার খুঁজে বের করলো।তারপর গুটিগুটি পায়ে বেলকনিতে গিয়ে চেয়ারের উপর বসলো। স্কেচবুকটা নিজের কোলের উপর রেখে লাইটার দিয়ে মোমবাতি ধরালাে।তারপর স্কেচবুকটা সন্তর্পণে একহাতে নিয়ে অপরহাতে মোমবাতি ধরলো।মোমবাতি গলে হাতের উপর পরছে।কিন্তু মায়ার তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।ও মিষ্টি হেঁসে দেখলো রুদ্রর ছবি।ফিসফিসিয়ে বললো
-“হ্যাপি এনিভার্স্যারি রুদ্র।”

তারপর আলতো চুমু খেলো খাতার পাতায়।ছবিটায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কন্ঠে অভিযোগ এনে বললো
-“কীরে, এভাবে ভুলে গেলি আমাদের বিয়ের দিন? অবশ্য ভুলবি নাই বা কেন?এই বিয়েতো কোনো মাইনেই রাখে না তোর কাছে।কোনো মূল্যই নেই তোর কাছে এই বিয়ের। কিন্তু আমার কাছেতো আছে।আফসোস একটাই, এই দিনে তুই আমার কাছে নেই।তোর সাথে দিনটা উদযাপন করতে পারলাম না।আমার অপেক্ষা গুলো শেষ হয়না রে দোস্ত। আমি তোর অপেক্ষা করি। মনে করি তুই ফিরে আসবি। অথচ তুই আসিস না।এভাবে আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে কেনো চলে গেছিস তুই?”

এমন আরো অনেক অভিযোগের বুলি আওড়ে, ছবিটি শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলো মায়া। বুকের মধ্যে স্কেচবুকটা জড়িয়ে রেখেই,চেয়ারে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে গেলো।
,

সকালের নাস্তা না করেই এক্সাম দিতে এসেছে মায়া।ঘুম ভাঙতে দেরি হয়ে গিয়েছিলো ওর, তাই নাস্তা না করেই ছুট লাগিয়েছে।মাহেরা খান অনেক বলে কয়েও খাওয়াতে পারেনি ওকে।
লিখতে লিখতে মায়া বেঞ্চের উপর মাথা রাখলো।মাথা ঘুরছে। খারাপ লাগছে অসম্ভব। হাতের আঙ্গুলে একটা লেখাও আসছে না।ইনভিজিলেটর মায়ার কাছে এগিয়ে এলেন।জিজ্ঞেস করলেন বেশি খারাপ লাগছে কিনা?মায়া উত্তর দিচ্ছে না।কোনোমতে চোখ বন্ধ করে শ্বাস ফেলছে।
ওর আবার জ্বর উঠেছে। ক্ষণে ক্ষণে জ্বরটা এমন মাথাচাড়া দিয়ে উঠে।অস্হির করে ফেলে ওঁকে।
ইনভিজিলেটর স্যার গিয়ে পাশের রুম থেকে একজন ম্যাম কে ডেকে নিয়ে এলেন।ম্যাম এসে মায়াকে ধরলো। পানি নিয়ে চোখেমুখে পানি দিলো।ক্লাসের বিশৃঙ্খল অবস্থা শুরু হলে ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিলো সবাইকে। মায়া কোনোমতে নিজের মাথা তুললো।ম্যামের হাত থেকে পানি নিয়ে পানি খেলো।ম্যাম এসে পিঠে হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলো কমনরুম পর্যন্ত যেতে পারবে কিনা?মায়া মাথা নাড়লো।আস্তে করে বললো যাওয়ার দরকার নেই।একটু বসলেই ঠিক হয়ে যাবে।
একটু পর মায়া স্বাভাবিক হলো।টেবিলে মাথা রেখেই যতটুকু পারলো লিখলো।

এক্সাম হল থেকে বেরিয়ে, মায়া মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে হাটছে।গেইটের বাইরে গাড়ি পার্ক করে রাখা।হল থেকে এইটুকু পথও মায়ার অঢেল পথ বলে মনে হচ্ছে।পা দু’টো চলছে না। বহু কষ্টে গিয়ে গাড়ির সামনে দাঁড়ালো ও।
গাড়ির কাছে গিয়ে গাড়ির দরজা খুলতে যাবে তখনই কেও একজন পিছন থেকে হাত ধরে টান দিলো।মায়া আগন্তুকের বুকের উপর হুমড়ি খেয়ে পরলো।বুক থেকে মাথা তুলে চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে দেখলো রুদ্র উৎকন্ঠা নিয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।মায়া কিঞ্চিৎ দুরে সরে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
রুদ্র দ্রুতবেগে আওড়ালো
-“কতক্ষণ ধরে ডাকছি তোকে।দাঁড়ালিনা কেন? ”

মায়া অবাক হলো।রুদ্র ডাকলো?কিন্তু কখন?ও তো কিছুই শুনতে পায়নি। খুব আস্তে করে বললো
-“শুনতে পেলেই না দাঁড়াতাম,আমি তো শুনতেই পাইনি।তুই ডাকছিলি কেন?কিছু বলবি?”

রুদ্র উত্তর না দিয়ে কিছুক্ষণ অস্হির দৃষ্টিতে দেখলো ওকে।তারপর কিছু না বলে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ওঁকে।মায়া আরেক দফা অবাক হলো।অবাকের চোটে মুখ দিয়ে কথা বেরোলো না ওর।হয়েছেটা কী ছেলেটার?এমন করছে কেন? হুশ আসতেই নিজেকে ছাড়াতে চায়লো রুদ্র থেকে।
রুদ্র ছাড়লো না,অনেকটা নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে রাখলো মায়াকে।মায়া গুটিসুটি মেরে রুদ্রর বুকের সাথে লেপ্টে থাকলো। দুর্বল হাতে আলতা ধাক্কা দিয়ে সরাতে চায়লো রুদ্রকে। রুদ্র নিজের থেকে ছাড়িয়ে মায়াকে আতঙ্কিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো
-“তুই নাকি আজকে এক্সামের হলে অসুস্থ হয়ে পরেছিলি?”
-“হ্যাঁ।তুই কোত্থেকে জানলি?”
-“সবাই জেনে গেছে।এক্সামের মাঝামাঝি টাইমেই জানতে পেরেছি ১০৩ নাম্বার কক্ষের একজন স্টুডেন্ট নাকি অনেক বেশি অসুস্থ হয়ে পরেছিলো। পরে জানতে পেরেছি সেটা তুই।কী হয়েছে তোর?”
-“জ্বর উঠেছে।”
রুদ্র মায়ার কপালে হাত দিলো।এখনো জ্বরের পরিমাণ অনেক বেশি।রুদ্র মায়ার গালে হাত দিয়ে আতঙ্কিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো
-“এতো জ্বর উঠলো কী করে?গা পুড়ে যাচ্ছে। নিশ্চয়ই বৃষ্টিতে ভিজেছিস।”

মায়া ওর থেকে দূরে সরে কাচুমাচু মুখ করে দাঁড়ালো।উত্তর দিলো না কোনো।
রুদ্র যা বোঝার বুঝে গেলো।মায়ার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুচকে বললো
-“যখন জানিসই বৃষ্টিতে ভেজা মাত্র অসুস্থ হয়ে পরবি তখন ভিজতে গেলি কেন?মানে নিজের ভালোটুকু নিজেই বুঝিস না।”
মায়া কথা কাটাতে মাথা নিচু করে বললো
-“আচ্ছা আমি যাই কেমন।সকালে কিছু খাইনি।খিদা লেগেছে অনেক।”
-“মানে না খেয়ে এক্সাম দিতে এসেছিস।মামনি তোকে না খাইয়ে কী করে ছাড়লো সেটাই ভাবছি।”
রুদ্র আফসোসের সুরে বললো।
মায়া কিছু বললো না।রুদ্র নিজেই আবার বললো
-“অনেক শুকায় গেছিস! খাস না? চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল পরে গেছে পুরাই। কী হয়েছে রে?”
-“কী হবে? বেশি খাচ্ছি তো এজন্যই শুকিয়ে যাচ্ছি।”

উদাস কন্ঠে বললো মায়া। রুদ্র অনুনয় করে বললো
-“প্লিজ এমন করিস না।তোকে দেখে একটুও ঠিক লাগছে না আমার। অসুস্থ অসুস্থ লাগছে!”
-“আমি ঠিক আছি। চিন্তা করতে হবে না তোকে। আচ্ছা আমি যাই। খিদের চোটে দাঁড়াতে পারছি না।”
-” আচ্ছা যা তাহলে।যাওয়া মাত্র খেয়ে নিবি।প্লিজ খাওয়াদাওয়া ঠিকঠাক মতো কর। যেভাবে আজকে অসুস্থ হয়ে পরেছিলি, আমার অনেক ভয় লেগেছে। অনেক খুঁজতে খুঁজতে পেয়েছি তোকে। নিজের ক্ষতি করিস না প্লিজ,
তুইতো আবার কোনোকিছু ঠিকঠাক করতে পারিস না।”

মায়া কিছু না বলে চুপচাপ গাড়িতে উঠলো।রুদ্রকে বিদায় পর্যন্ত জানালো না।কিন্তু রুদ্র এগিয়ে এসে গাড়ির দরজা বন্ধ করে দিলো।জানালা দিয়ে তাকিয়ে মায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো।নরম কন্ঠে বললো “সাবধানে থাকিস।”
গাড়ি ছেড়ে দিলো।মায়া অক্লিষ্টে ঢোক গিললো।যতবারই নিজেকে সামলাতে যায় সে, ততবারই ছেলেটা এসে সবকিছু বিগড়ে দেয়।মায়া বদ্ধ কাচের জানালা দিয়ে পিছনে ফিরে রুদ্রকে দেখলো।ছেলেটা এখনো দাড়িয়ে আছে সেই জায়গায়।নিষ্পলক তাকিয়ে আছে মায়ার গাড়ির দিকে।মায়া তাকিয়ে থাকলো।যতক্ষণ না রুদ্রের অবয়ব অদৃশ্য হয় ততক্ষণ তাকিয়ে থাকলো।

#চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here