#উৎসর্গ
#পর্ব:২৯
#তানজিনা ইসলাম
অতিবৃষ্টি হওয়ার দরুন পাহাড়ে ধ্বস নেমেছে।মধ্যরাতে বৃষ্টি মাথায় বাড়ি ফিরেছে দুজনে।রাফানা চৌধুরী দুজনের জন্য অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছেন।
রুদ্রর কাছে ডুপ্লিকেট চাবি থাকায় দুজনের বাড়িতে ঢুকতে সমস্যা হয়নি।দুজনে ভেজা গায়ে কক্ষে ঢুকলো। রুদ্র মায়াকে বিছানায় বসিয়ে টাওয়েল বের করে মায়ার মাথা মুছে দিলো।তাগাদা দিয়ে বললো
-“তাড়াতাড়ি ড্রেস বদলে নে।নয়তো এই ভেজা কাপড়ে আবার জ্বর উঠবে।”
মায়া ঠান্ডার দরুন মৃদু কাপছে। রুদ্র ওয়ারড্রব থেকে টিশার্ট আর প্লাজো বের করে মায়ার হাতে দিলো।মায়া কচ্ছপের গতিতে ওয়াশরুমে ঢুকলো।
রুদ্র নিজেও পাশের কক্ষে গিয়ে গোসল সেরে নিলো। নিজের পরণের ভেজা শার্ট বদলে একটা ছাই রঙা, টিশার্ট আর প্যান্ট পরলো।কক্ষে এসে হাতে তোয়ালে নিয়ে নিজের মাথা মুছে নিলো। ভেজা তোয়ালে রাখলো সোফার উপর। দ্রুত পায়ে নিচে গিয়ে খাবার নিয়ে এলো।কিন্তু কক্ষে এসে দেখলো মায়া এখনো ওয়াশরুম থেকে বের হয়নি। রুদ্র ওয়াশরুমের দরজায় বার কয়েক বারি দিয়ে মায়াকে বের হতে বললো।
রুদ্র কক্ষের মধ্যে পায়চারি করছে। আর কিছুক্ষণ পর পর মায়াকে বের হতে বলছে।
মায়া দরজা খুলে বের হলো।রুদ্র গিয়ে দাড়ালো ওর সামনে। ছোট ছোট চোখ করে বললো
-“ওয়াশরুমে বসে গু* খাচ্ছিলি?বের হতে এতোক্ষণ লাগে?”
মায়া ঠোঁট উল্টে তাকালো।পরনের টিশার্ট ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। রুদ্র মায়ার হাত ধরে বিছানায় বসিয়ে দিলো।বিছানার সাথে বালিশ দিয়ে পিঠ ঠেকিয়ে বসালো।ব্ল্যাঙ্কেট নিয়ে কোমর পর্যন্ত টেনে দিলো।তারপর এসি অন করে দিলো। মায়ার কাঁধ সমান চুলগুলো থেকে টপটপ পানি পরছে।যা তার পরণের টিশার্ট সহ বিছানা আর ব্ল্যাঙ্কেটও ভিজিয়ে দিচ্ছে।সোফা থেকে তোয়ালে নিয়ে রুদ্র মায়ার সামনে গিয়ে বসলো।যত্ন করে মায়ার চুলে তোয়ালে পেচিয়ে দিলো।
মায়া হাঁচি দিচ্ছে কিছুক্ষণ পরপর হাঁচি দিচ্ছে।মৃদু ঠান্ডা লাগায় মায়া ব্ল্যাঙ্কেট টা ভালোভাবে জড়িয়ে নিলো। রুদ্র খাবারের প্লেট নিয়ে মায়ার সামনে বসলো।লোকমা ধরে খাইয়ে দিলো মায়াকে।
রুদ্র উঠে যাওয়ার আগে মায়া কোমল গলায় বললো
-“তুই খাবি না?”
-“হুম।খাবো। ”
-“খেয়ে নে।”
-“তুই একটু বোস। আমি খেয়ে আসছি।”
মায়া আপনমনে বসে থাকলো।কিঞ্চিৎ ঠান্ডা লাগছে। মনে হয় জ্বর আসছে আবার।মায়ার থেকে থেকে কাশি হচ্ছে।ঘুম আসছে,কিন্তু রুদ্র না আসা পর্যন্ত ঘুমাতে মন চাচ্ছে না।মায়া জোর করে নিজের ঘুম কে আটকে রাখলো।
রুদ্র দ্রুত পায়ে কক্ষে ঢুকলো।মায়া অবাক হয়ে বললো
-“কীরে এতো তাড়াতাড়ি চলে এলি যে?দশ মিনিটও তো হয়নি মনে হয়।খাসনি?”
-“হুম। খেয়েছি।”
রুদ্র মায়ার কপালে হাত দিয়ে দেখলো গায়ের তাপমাত্রা হালকা বেড়েছে। এই জ্বর রাত পোহালে আরো ভালোভাবে উঠবে।রুদ্র ফার্স্ট এইড বক্স থেকে জ্বরের মেডিসিন নিয়ে মায়ার সামনে ধরলো।মায়া মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ব্ল্যঙ্কেটের নিচে মুখ লুকালো।মিনমিন করে বললো
-“খাবো না আমি।মেডিসিন খেতে ভালো লাগে না আমার।”
রুদ্র চোখমুখ কুচকে বললো
-“জ্বর উঠলে ছোটবেলার মতো এখনো তালবাহানা করবি মেডিসিন নিয়ে।খেয়ে নে জান।নয়তো আরো বেশি খারাপ লাগবে।”
-“উহু খাবো না।”মায়া মাথা নেড়ে বললো।
-“নাটক পেয়েছিস!ঐ বাড়িতে থাকতে যখন প্রতিরাতে ঘুমের ঔষধ নিতি তখন তো সমস্যা হতো না তোর।”
মায়া মুখে হাত চেপে হাসলো।নরম কন্ঠে বললো
-“তখন তো আর তুই ছিলি না।এখন তুই আমার কাছে আছিস।তুই থাকলেই সুস্থ হয়ে যাবো আমি।”
রুদ্র হতভম্ব হয়ে তাকালো মায়ার দিকে।তারপর শক্ত হাতে মায়ার হাতে ধরা ব্ল্যাঙ্কেটের মাথা ছিনিয়ে নিলো।মায়া ঠোঁট উল্টে তাকালো রুদ্রর দিকে। রুদ্র মেডিসিন মায়ার মুখের সামনে নিয়ে পানি ধরলো।দৃঢ় কন্ঠে বললো
-“যদি না খাস।তাহলে চলে যাবো আমি।”
রুদ্র মায়ার মুখে মেডিসিন পুরলো।নিজ হাতে পানি টুকুও খাইয়ে দিলো।বালিশ ঠিক করে দিয়ে মায়াকে উদ্দেশ্য করে বললো
-“ঘুমা এবার।”
রুদ্র মায়ার পাশে আধশোয়া হয়ে বসলো।মায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো সন্তর্পণে।
ক্ষণকাল পর মায়ার গায়ের তাপমাত্রা অত্যাধিক বেড়ে গেল। শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ঠান্ডায় বেশ কাপছে ও।শরীরের অত্যাধিক তাপমাত্রা আর গায়ের কাপুনিতে রুদ্রর ঘুম ছুটে গেলো।একটু আগে চোখ লেগে এসেছিলো। ঘুম ভেঙ্গে দেখলো মায়া গুটিশুটি মেরে তার বুকে শুয়ে আছে।রুদ্র কপাল কুঁচকে মায়ার কপালে হাত দিলো।কপালের উষ্ণতা অনুভব করে রুদ্রর মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো।এতটাই ভিজেছিলো তখন যে মেডিসিন পর্যন্ত কাজে দিলো না।রুদ্রর ইচ্ছে করলো আগে ঘুম থেকে তুলে ঠাস ঠাস দুইটা দিয়ে নিতে।’বেয়াদব একটা!ওর সাথে বৃষ্টিতে ভিজতে মন চাচ্ছিল।মায়াকে ও সাইকো বলেছিলো একবার! এটা নিয়ে পরবর্তী তে ওর খুব খারাপ লেগেছিলো। কিন্তু ও মনে হয় ভুল কিছু বলেনি। যে মেয়ে নিজের রুহকে এতো বাজেভাবে কষ্ট দিতে, নিজের ভালো থাকার একটু কদর করে না সে সাইকো-ই।সাইকোলজি তো এটাই বলে।
বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, রুদ্রর এখন মনে চাচ্ছে এই ঝুম বৃষ্টিতে মায়াকে এই অবস্থায় ছাদে রেখে আসতে।তারপর ভিজুক।মন-প্রাণ এক করে ভিজুক। রুদ্র বিরবির করে বকতে বকতে বিছানা ছেড়ে নামতে যাবে তার আগেই মায়া মুষ্টিবদ্ধ করে রুদ্রর শার্টের কোণা ধরলো।ভাঙ্গা গলায় আস্তে করে বললো
-“যাস না।যাস না রুদ্র আমাকে ফেলে।”
রুদ্র মায়ার কাছে এসে আলতো হাতে নিজের শার্ট ছাড়ালো।রাগ বর্জন করে নম্র কন্ঠে বলল
-“জলপট্টি দিতে হবে তোকে।আমি জলপট্টি নিয়েই চলে আসবো।”
মায়া রুদ্রর প্রস্তাব নাকোচ করে দিয়ে মাথা নেড়ে বললো
-“আমার কিচ্ছু লাগবে না।ঠিক আছি আমি। কোথাও যাবি না তুই।”
রুদ্র মায়াকে বোঝানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু মায়া বারবার রুদ্রর শার্ট আষ্টে-পৃিষ্টে ধরছে।রুদ্র আর না পেরে জোরে ধমক দিলো।রুদ্রর ধমক খেয়ে মায়া ছেড়ে দিলো ওকে।রুদ্র উঠে গিয়ে লাইট জ্বালিয়ে দিলো। এসি অফ করে ফ্যান ছেড়ে দিলো।বাটিতে করে পানি নিয়ে এলো।মায়ার কাছে গিয়ে তার মাথা নিজের কোলের উপর রাখলো।তারপর জলপট্টি দিতে শুরু করলো।মায়া জ্বরের ঘোরে চোখ পর্যন্ত টেনে খুলতে পারছে না।বেশকিছুক্ষন জলপট্টি দেওয়া শেষে তাপমাত্রা একটু কমতেই রুদ্র মায়ার পাশে এসে বসলো। নিজের পরণের টিশার্ট খুলে ফেললো। এমনিতেই মায়ার গায়ের অতিরিক্ত তাপমাত্রা তারউপর টিশার্ট পরলে আরো বেশি গরম লাগবে।রুদ্র খালি গায়ে মায়াকে নিজের কাছে টেনে নিলো। নিজের বুকের উপর যত্ন করে রাখলো মায়াকে।
মায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে রুদ্র।মায়া রুদ্রর বুকে নাক ঘষছে।রুদ্র চোখ মুখ কুচকে বললো
-“ফালতুমি বন্ধ কর।”
মায়া মাথা তুলে তাকালো রুদ্রর দিকে।চোখমুখ লাল হয়ে আছে ওর।রুদ্র স্নেহভরা দৃষ্টিতে তাকালো ওর দিকে। মায়ার গালে হাত দিয়ে বললো
-“ঘুমা।”
মায়া নিম্নস্বরে বললো
-“ঘুম আসে না তো।”
-“শুয়ে থাক তাহলে।”
মায়া বাচ্চাদের মতো করে শুলো রুদ্রর বুকের উপর।রুদ্রর বুকে আঁকিবুঁকি করতে করতে বললো
-“রুদ্র।”
-“হুম।”
-“তুই কী আমাকে এখনো ভালোবাসতে পারিসনি?”
-“হঠাৎ?কী বলছিস এসব?”
-“বল না।কতদিন আমরা একসাথে আছি, এখনও কী তুই আমাকে ভালোবাসতে পারিসনি?”
-“হঠাৎ এসব প্রশ্ন মাথায় আসলো কেন তোর?”
-“এমনিই।জানতে মন চাইছে খুব।”
-“ভালোবাসা বিবৃত করার জিনিস না মায়ু।এটা একটা অনুভূতি। মুখে মুখে বললেই ভালোবাসা হয় না।”
-“তারপরও আমি জানতে চাই।”
-“আমি নিজেও জানি না নিজের ফিলিংস।”
-“কেন জানিস না?”
-“তুই ঘুমাতো।কথা বলিস না।ঘুমানোর চেষ্টা কর।”
-“উহু।তুই না বলা পর্যন্ত ঘুমাবো না।তুই আমাকে একবার বলে দে যে তুই আমাকে ভালোবাসিস।”
-“এটা কী বলতেই হবে?”
-“হুম।যদি নিজের ফিলিংস বুঝতেও না পারিস, তাহলে মিথ্যা হলেও বলে দে।শুধু একবার তোর মুখে আমাকে ভালোবাসার কথা শুনতে চাই।”
-“প্লিজ মায়ু।জোর করিস না।”
-“তুই আমার এইটুকু কথা রাখতে পারবি না?বলছি তো,মিথ্যা হলেও বল যে ভালোবাসিস।”
-“মিথ্যা বললেতো তোকে ঠকানো হবে।”
-“ঠকানো হবে না।আমি বলছি তো তোকে। শুধু ভালোবাসি বল।”
-“মাঝরাতে এসব কী শুরু করলি?”
মায়া অধৈর্য হয়ে বললো
-“তাহলে তুই বলবি না?”
-“এভাবে আচমকা কী করে বলবো?একটু বোঝার চেষ্টা কর।”
মায়া আচমকা উঠে বসলো।রুদ্রর কাঁধ ধরে ঝাকিয়ে বললো
-“বল ভালোবাসিস।শুধু একবার বল।”
রুদ্র নিশ্চুপ হয়ে অসহায় চোখে তাকালো মায়ার দিকে।মায়া জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পরলো।রুদ্র উঠে বসে মায়াকে কিছু বলতে যাবে তার আগেই মায়া বললো
-“ঘুমিয়ে পর রুদ্র।শুধু শুধু তোর ঘুমটা নষ্ট করে দিলাম আমি।”
রুদ্র ঢোক গিললো।মায়াকে বুঝিয়ে বলতে চায়লো।কিন্তু মুখ দিয়ে একটা শব্দও বার করতে পারলো না।
রুদ্র পিছন থেকে মায়াকে জড়িয়ে শুয়ে পরলো। মায়া চুপ করে থাকলো, কিছু বললো না।
দুচোখের কার্ণিশ বেয়ে পানি পরছে মায়ার।মায়া মুখে হাত দিয়ে নিজের কান্নার শব্দ আটকালো।পরপর হাতের উল্টো পিঠে মুছে নিলো নিজের চোখের পানি।কিন্তু চোখের পানি মুছতে না মুছতেই আবার চোখ ভিজে যাচ্ছে।কাঁদতে কাঁদতে বালিশের একপাশ ভিজিয়ে ফেললো মায়া।ছোটবেলা থেকে যা কাঁদেনি তা এই কয়েকদিনে কাঁদতে হচ্ছে। মায়ার নিজেকে ছিঁচকাদুনে মনে হচ্ছে। কিন্তু ও কী করবে?রুদ্রর এসব ব্যবহারে যে অসম্ভব কান্না পায় ওর।কী এমন ক্ষতি হতো রুদ্রর,ওকে ভালোবাসি বললে?এতোদিন একসাথে থেকেও নাহয় ভালোবাসা জন্মায় নি।তাই বলে মিথ্যা ভালোবাসি বলতেও সমস্যা ওর?বেস একবার রুদ্রর মুখে ভালোবাসার কথাই তো শুনতে চেয়েছে। রুদ্র সেটাও বলতে পারলো না।মায়া পিছনে ফিরে একবার রুদ্রর মুখটা দেখে নিলো।রুদ্র ঘুমাচ্ছে। মায়া রুদ্রর দিকে ফিরে ওর মুখে হাত রাখলো।একতো জ্বর তারউপর আবার কেঁদেছে।ওর চোখের পাতা ব্যাথা করছে।মায়া আর জেগে থাকতে পারলো না,রুদ্র কে দেখতে দেখতেই ঘুমিয়ে পরলো।
,
পরেরদিনও মায়ার একটুও জ্বর কমলো না।রুদ্র ডক্টর ডেকে আনলো বাড়িতে। ডক্টর চেকআপ করে প্রয়োজনীয় মেডিসিন দিয়ে গেলো মায়াকে।রুদ্র অফিসে যায় নি।মায়ার এই অবস্থায় ওকে ছেড়ে কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না।তাই সকালে উঠেই অশোক কে কল করে বলে দিয়েছে যাতে অফিসের দিকটা ও সামলে নেয়।আর মায়া সারাদিন জপ করেছে যাতে রুদ্র ভালোবাসি কথাটা একবার বলে।
রাতেরবেলা রুদ্র আধশোয়া হয়ে বসে, লেপটপে কিছু একটা কাজ করছে।মায়া তার পাশে শুয়ে মোবাইল টিপছে। কিয়ৎকাল পর মায়া নিজের মোবাইএ রেখে রুদ্রর কাছে এসে ওর হাঁটু জড়িয়ে ধরলো।রুদ্র মুচকি হাসলো মায়ার কান্ড দেখে।মেয়েটা কখনো স্বাভাবিক ভাবে জড়িয়ে ধরতে পারে না ওঁকে! হয়, ওর হাঁটু জড়িয়ে ধরবে নয়তো শার্ট নয়তো পা ধরে ঝুলে থাকবে।
মায়া রুদ্রর হাঁটুতে মাথা রেখেই বললো
-“কাজ কখন শেষ হবে?”
-“এইতো শেষ হয়ে গেছে।”বলেই পাশের সাইড টেবিলে লেপটপ রেখে মায়াকে নিজের কাছে নিয়ে আসলো।মায়া আহ্লাদী হয়ে রুদ্রর গলা জড়িয়ে ধরলো।অতিরিক্ত কাশির ফলে মায়ার গলা বসে গেছে। মায়া রুদ্র কে ভাঙা গলায় বললো
-“তুই আজকেও আমাকে ভালোবাসি বললি না।”
-“আবার শুরু হইলো তোর এই প্যানপ্যানানি। আজ পুরো দিনে এই কথাটা কতবার বলেছিস হিসাব আছে?”
-“তুই বলে দিলেই তো ঝামেলা চুকে যায়।”
-“পারব না বলতে।”
-“তোর মুখে ভালোবাসি কথাটা না শুনে যদি আমি মরে যাই,তাহলে আমি মরেও শান্তি পাবো না। বিশ্বাস কর।”
রুদ্র ধমক দিলো মায়াকে।মায়া কাচুমাচু হয়ে বসলো।রুদ্র রাগী কন্ঠে বললো
-“কতবার বলেছি এসব কথা বলবি না।সবসময় এসব কথা বলা কী জরুরি?”
-“আচ্ছা সরি সরি।আর বলবো না।আগে তুই শান্ত হ।”মায়া রুদ্রকে শান্ত করার চেষ্টা করে বললো।
-“প্লিজ মায়ু।একটু বোঝার চেষ্টা কর।ভালোবাসার কথা এভাবে বলা যায় না।মুখে মুখে ভালোবাসি বলে লাভ কী?মনের অপ্রকাশিত অনুভূতিটাই তো আসল।”
মায়া বাচ্চাদের মতো করে তাকিয়ে আছে রুদ্রর দিকে। রুদ্র হাত দিয়ে টেনে নিলো মায়াকে নিজের কাছে।বুকের উপর রেখে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো।নরম স্বরে বললো
-“সরি এভাবে বকা দেওয়ার জন্য। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন এমন জেদ ধরিস!”
-“আমি জেদ ধরি?”
-“হুম।ধরিসই তো।কালকের একটা কথায় এখনো গো ধরে বসে আছিস।বলতে হবে মানে বলতেই হবে।এই কথাটা বাদ দিয়ে অন্য কিছু বলা যায় না?”
-“কী বলতাম?”রুদ্রর বুকে মুখ গুঁজে মায়া প্রশ্ন করলো।
-“তোর যা ইচ্ছে বল।দেখি তোর একটা ইচ্ছার কথা বলতো।”
মায়া মাথা তুলে কিছু ভাবার ভান ধরলো।তারপর রুদ্রর দিকে তাকিয়ে খুশি হয়ে বললো
-“জানিস আমার না বিয়ের পর থেকেই একটা ইচ্ছা হয়েছে।”
-“তাই নাকি।দেখি বলতো কী ইচ্ছে।আমিও একটু শুনি।”রুদ্র মৃদু হেসে বললো।
মায়া আরেকটু কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো রুদ্রকে।গমগমে স্বরে বললো
-“আমার না অনেকগুলা বেবি হবে।”
-“কী?”বলেই রুদ্র অট্ট হাসলো।মায়া চোখ ছোট ছোট করে তাকালো।রুদ্রর বুকের উপর ঘুষি মেরে বললো
-“তুই নিজেই তো আমাকে ইচ্ছের কথা বলতে বললি।এখন আবার হাসছিস।”রুদ্র অনেক কষ্টে নিজের হাসি থামালো।মুখে হাত চেপে মিটিমিটি হেসে মায়ার দিকে তাকালো।মায়া বিরক্তিকর চোখে তাকিয়ে আছে রুদ্রর দিকে।
রুদ্র মায়াকে আবার টেনে নিলো নিজের কাছে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ওকে।মায়া গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাকলো রুদ্রর বুকে।
-“অনেকগুলা বেবি?”রুদ্র হেসে জিজ্ঞেস করলো।”
-“পঁচাচ্ছিস?”
-“না।আচ্ছা স্পেসিফিকলি বলতো কয়টা?”
-“জানি না।”
-“বল না।”
-“কমপক্ষে একটা ফুটবল টিম তো বানাতেই হবে।”
রুদ্র লাজুক হাসলো।মায়ার চুল টেনে দিতে দিতে ডাকলো তাকে।মায়া প্রতিত্তোরে কিছু বললো না।ঘুমিয়ে পরেছে মেয়েটা।অসুস্থ শরীরে নিজের ঘুমের সাথে যুদ্ধ করে টিকতে পারলো না।নয়তো এতো তাড়াতাড়ি ঘুমানোর মানুষ মায়া না।
খুব বাজে একটা স্বপ্নে মাঝরাতে রুদ্রর ঘুম ভাঙলো।রুদ্র হন্তদন্ত হয়ে উঠে বসলো।পাশ ফিরে ঘুমন্ত মায়াকে দেখে জোরে জোরে শ্বাস ফেললো। তারপর শক্ত করে মায়াকে জড়িয়ে ধরে মায়ার গালের সাথে গাল ঠেকালো।মায়া কপাল কুঁচকালো।পরক্ষণে আবার ঘুমিয়ে পরলো।রুদ্রর বুকের মধ্যে ধুপধুপ আওয়াজ হচ্ছে। বুকের মধ্যে নিজের প্রিয় কিছু হারিয়ে ফেলার তীব্র ভয়।পুরো রাত রুদ্র টেনশনে দুচোখের পাতা এক করতে পারলো না।
,
সকালে মায়া মন খারাপ করে বসে আছে সোফায়। রুদ্র ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।এই সকালে মেয়েটার মন খারাপের কারণ খুঁজে পাচ্ছে না রুদ্র।রুদ্র নিজের কৌতূহল রাখতে না পেরে বললো
-“কীরে?কী হয়েছে তোর?এভাবে মন খারাপ করে বসে আছিস কেন?”
-“এমনিই।”
রুদ্র উঠে এসে মায়ার পাশে বসলো।কাঁধে হাত রেখে জড়িয়ে ধরে মায়াকে বললো
-“এমনি কারো মন খারাপ থাকে?কী হয়েছে বলতো।”
-“বললেই কী মন ভালো হয়ে যাবে?”
-“চেষ্টা করবো ভালো করার।”
মায়া রুদ্রর দিকে তাকালো।কাঁধে হাত রাখা রুদ্রর হাত ধরে বললো
-“আম্মুর কথা খুব মনে পরছে।”
-“ফোন কর।কথা বলে দেখ মামনির সাথে।দেখবি ভালো লাগছে। ”
-“শুধু কথা বললে হবে না।সামনাসামনি দেখতে হবে।তাহলেই ভালো লাগবে। বাড়িতে দিয়ে আসতে পারবি?”
রুদ্র আচমকা উঠে দাড়ালো।মায়ার সামনে দাঁড়িয়ে রুক্ষস্বরে বললো
-“মগের মুল্লুক পেয়েছিস? বাড়ি থেকে ঘুরে এসেছিস কদিন হলো?আবার যেতে চাচ্ছিস?”
মায়া মাথা নিচু করে ফেললো।মাথা নিচু করেই বললো
-“আম্মুর কথা খুব মনে পরছে আমার।একবার দেখতে মন চাইছে খুব করে।শুধু একদিন থাকবো।প্লিজ দিয়ে আয়।”
রুদ্র রুক্ষতা বর্জন করে স্বাভাবিক স্বরে বললো
-“দেখ শ্বশুরবাড়ি থেকে এভাবে ঘন ঘন বাপের বাড়ি যাওয়া যায় না।তোর শ্বশুর-শাশুড়ী তোকে কিছু না বললেও তোর হাসবেন্ড এসব মেনে নিবে না।”
মায়া মুখ কালো করে বললো
-“এভাবে বলছিস কেনো?বলছিতো শুধু একদিন থাকবো।”
রুদ্র মাথা নাড়িয়ে বললো
-“না মানে না।
মায়া বলতে গিয়ে থেমে গেলো। কিছু একটা ভেবে বাঁকা হাসলো।রুদ্র মায়ার হাসি দেখে চিন্তায় পরে গেলো।ও এভাবে হাসলেই রুদ্রর ভয় লাগে! কারণ এ হাসির পরই মায়া কুটনামি শুরু করে। মেয়েটা আবার কী শয়তানি আঁটছে মনে মনে কে জানে?মায়া হাসিমুখেই বললো
-“ঠিক আছে, যাবো না।তার আগে তোকে আমার একটা শর্ত মানতে হবে।”
-“কী শর্ত? রুদ্র ভ্রু কুচকে বললো।
-“বাড়ি যাবো না আমি।তার আগে তুই বলবি যে তুই আমাকে ভালোবাসিস।”
রুদ্র রাগী দৃষ্টিতে তাকালো মায়ার দিকে। পারলে চোখ দিয়েই ঝলসে দিতো ওকে।রুদ্র মুখের অবস্থা দেখে মায়া হাসলো।রুদ্রর দিকে তাকিয়ে বললো
-“বল।কোনটা করবি।দেখ,যেকোনো একটা তো তোকে করতেই হবে।হয় ভালোবাসি বল,নয়তো বাড়ি দিয়ে আয়।”
রুদ্র চিন্তায় পরে গেলো।কী করবে?মায়া একেবারে যাতাকলে ফেলেছে ওকে।মায়ার সামনে ভালোবাসি কথাটা তো মুখ দিয়ে জীবনেও বের হবে না। এতো এতো মেয়েকে ভালোবাসার কথা বলেছে ও।কিন্তু মায়াকে ভালোবাসি বলতে কীসের এতো জড়তা কাজ করে কে জানে?রুদ্র একবার ভাবলো মায়াকে বলবে কথাটা।কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলো ‘যাক না মেয়েটা নিজের মায়ের কাছে। নিশ্চয়ই অনেক মনে পরছে মা’কে।নয়তো এভাবে মন খারাপ করে বসে থাকবে কেন?ও তো নিজের মা’কে দেখা ছাড়া একদিনও থাকতে পারে না।সেখানে তো মায়া কতদিন তার মা’কে না দেখে থাকে। থাক,কালকে গিয়ে নাহয় নিয়ে আসবে।’
রুদ্র মায়ার দিকে তাকালো।মায়া উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।রুদ্র বললো
-“ঠিক আছে।দিয়ে আসবো তোকে।কিন্তু আমিতো থাকতে পারবো না।কালকে অফিসে যায়নি।আজকে তো যেতেই হবে।”
মায়া উৎফুল্ল হয়ে বললো
-“তোকে যেতে বলছি নাকি আমি।তোর যাওয়ার দরকার নেই।শয়তান, নিজের বৌকে ভালোবাসার কথাটুকু বলতে পারিস না।থেকে কী করবি?থাকার দরকার সেই তোর।”
-“মানে এটাতেও পিন্চ মারতে হবে তোকে।”
-“পিন্চ না মেরে সালাম করবো তোকে?গালি যে দিচ্ছি না এর জন্য শুকরিয়া জানা।”
বলেই মায়া উঠে দাড়ালো।ওয়ারড্রব থেকে কাপড় নিয়ে ব্যাগ গোছাতে শুরু করলো।রুদ্র কপাল কুঁচকে তাকালো ওর দিকে।বললো
-“ক’দিনের জন্য যাচ্ছিস তুই?ব্যাগ গোছানোর দরকার কী?কালকেই না চলে আসবি বললি?”
-“হুম। চলে আসবো তো।”
-“তাহলে এসব কী করছিস?পুরো আলমারির জামাকাপড়ই তো বের করে ফেলছিস মনে হয়!তুই কী আমাকে মিথ্যা বলে বেশিদিন থাকার প্ল্যান করছিস?”
-“আরে না।মিথ্যা বলবো কেন।কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস নিতে হবে।চলে আসবো কালকে।”
মায়া মাথা আঁচড়ে নিলো।কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বললো
-“আমি রেডি।”
রুদ্র হাতে ঘড়ি পরলো।হাতে রাখা টাই নিয়ে মায়ার কাছে এগিয়ে গেলো। টাই মায়ার হাতে দিয়ে বললো
-“পরিয়ে দে।”
মায়া যত্ন করে টাই পরিয়ে দিলো। কপালের উপর আসা এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করে দিলো।তারপর রুদ্রর নাক টেনে দিয়ে বললো
-“সুন্দর লাগছে।”
রুদ্র মৃদু হাসলো।মায়া আবার বললো
-“অফিসের মেয়ে স্টাফগুলো থেকে দুরে থাকবি।তাও ভার্সিটি তে আমার সিসি ক্যামেরা গুলা তোর সাথে লেগে থাকতো।অফিসে কী করস তা তো জানতেই পারি না।নিজ উদ্যোগে দুরে থাকবি।ঠিক আছে?”
রুদ্র বাধ্যের মতো মাথা নাড়লো।
-“আমি নিচে যাচ্ছি। মামনিকে বুঝিয়ে বলতে হবে।তুই রেডি হয়ে আয়।”
বলতে বলতেই মায়া নিচে চলে গেলো।রুদ্র একপলক তাকিয়ে অফিসের ফাইল গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পরলো।
#চলবে

