হিপনোটাইজ #তাজনিন_তায়্যিবা পার্ট:24

0
31

#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পার্ট:24

নিয়তির নিয়ম অটল, অপ্রতিরোধ্য। সময় বহমান, বয়ে চলে তার নির্ধারিত পথে। প্রাণের আবির্ভাব হয়, অস্তিত্বের প্রদীপ জ্বলে আবার নিভেও যায়। অথচ নিয়তি তার নিজস্ব ছন্দে চলতেই থাকে, শতাব্দী পেরিয়ে সহস্রাব্দীর দোরগোড়ায় গিয়েও অটুট থাকে তার বিধান। পরিবর্তনের অনিবার্য স্রোতে সবকিছুর রূপ বদলায়, কিন্তু নিয়তির নিয়ম চিরকালই অমোঘ থেকে যায়।

নিয়তির শিকল ভেঙে কেউ কোনোদিন মুক্তি পায়নি, না তো কোনো প্রজন্মের সে শক্তি হবে । এ এক শাশ্বত সত্য, যা জন্ম থেকে জন্মান্তর পর্যন্ত নির্ধারিত। নিস্পা, ত্রিজয় আর তাকরিমের জীবনও ভাগ্যের চক্রে আবর্তিত, নিয়তির ঘূর্ণিতে ঘূর্ণায়মান। চাইলেও তারা এ বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না, কারণ নিয়তি যা রচনা করে, তার বাইরে যাওয়ার সাধ্য কারো নেই।

ঠিক তেমনি কামিনী শিকদারের পরিচয় পেয়ে বড়সড় একটা ব্লাস্ট হলো ড্রইং রুমে। পাঁচ দশ মিনিটের মতো ত্রিজয়ের মাথা হ্যাং হয়ে গিয়েছে প্রায়।ইভান তো পুরো পুরি ভ্যাবাচেকা।তারা ভাবতেই পারে নি ভাগ্য তাদেরকে এতো বড় একটা ধাক্কা দিবে।মানে যেই তাকরিমের পেছনে বাশ দেওয়ার জন্য এই মেয়েটাকে বিয়ে করলো, সেই মেয়েটার মায়ের খুনিই ওই তাকরিম।

চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ত্রিজয় উত্তেজিত হয়ে ঘনঘন নিঃশ্বাস নিতে শুরু করলো ।ইভান তড়িঘড়ি করে ত্রিজয়ের উদ্দেশ্যে বললো,

“কি হয়েছে স্যার?শরীর খারাপ লাগছে?”

ত্রিজয় শুখনো ঢোক গিলে বললো,

“এ কাকে বিয়ে করলাম রে বাপ,ঝামেলার গোডাউন।”

“এজন্যই তো বলেছিলাম স্যার,একটু যাচাই বাচাই করে বিয়ে করুন।শুনলেন না তো আমার কথা।”

ত্রিজয় চোখ ঘুড়িয়ে তাকালো নির্বিকার ভঙিতে দাঁড়িয়ে থাকা নিস্পার দিকে, দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

“দেখ দেখ চেহারাটা কেমন নিস্পাপ করে রেখেছে, যেনো ভাজা মাছটাও উল্টে খেতে যানে না।কে বলবে এই মেয়ে ঝামেলার বস্তা কাঁধে নিয়ে ঘুড়ছে?”

ত্রিজয়ের রাগান্বিত চেহারা দেখতে না পেলেও,তার ক্রোধিত কন্ঠ ঠিকই শুনতে পেয়েছে নিস্পা,নিজের সম্মন্ধে এমন মন্তব্য শুনে সহ্য হলো না কিছুতেই,চেহারায় প্রতিক্রিয়া না ফুটিয়েই নরম কন্ঠে বললো,

“দেখুন, আপনি আমার সম্পর্কে এ ধরনের মন্তব্য করতে পারেন না।”

ত্রিজয়ের মেজাজ আরেকটু বিগড়ে গেলো এবার, বললো,

“এই তোর সম্পর্কে কী কথা বলবো এখন তোর কাছে শিখবো নাকি আমি?আমার এতোটাও অকাল আসে নি এখনো।”

নিস্পা এবারেও ঠান্ডা কন্ঠে উত্তর দিলো,

“কিন্তু আপনার কথা শুনে তো মনে হচ্ছে আমাকে বিয়ে করার সাথে সাথেই আপনার অকাল চলে এসেছে।”

ত্রিজয় ক্রোধে তেড়ে এলো নিস্পার কাছে, তারপর প্রচন্ড আক্রোশে এক হাতে চেপে ধরলো নিস্পার গাল,ক্রোধিত কন্ঠে বললো,

“এই নিজেকে কি মনে করিস তুই?নিজেকে অনেক বড় কিছু ভাবা শুরু করেছিস দেখছি।”

নিস্পা সমস্ত শক্তি দিয়ে দুই হাতে টেনে সরালো ত্রিজয়ের হাত,হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,

“আমি নিজেকে বেশি কিছু ভাবছি না, উল্টো আপনিই আমাকে নিয়ে ভয়ে আছেন দেখছি।”

ত্রিজয় ঠোঁট বাকালো, ব্যাঙ্গার্থক কন্ঠে বললো,

“তুই আমার পশ্চাদ্দেশের পাদের মতো,যাকে টুস করে উড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখি আমি।ভয় পাওয়ার প্রশ্নই আসে না।”

ত্রিজয়ের কথায় নাক কুচকালো নিস্পাপ,তিরিক্ষি কন্ঠে বললো,

“ছিঃ, আপনি মানুষটার মতো আপনার কথাবার্তাও নোংরা।”

ত্রিজয় গা ছাড়া ভাব নিয়ে বললো,

“নোংরামির কি করলাম তোর সাথে?তিন দিন হলো বিয়ে করেছি তিন আঙুল দিয়েও ছুয়ে দেখি নি,নোংরা নয়, বল পৃথিবীর একমাত্র শুদ্ধ পুরুষ আমি।”

নিস্পা বিরক্তিতে কপাল কুচকালো, কর্কষ কন্ঠে বললো,

“বিয়ে কোনটাকে বলছেন আপনি? ইসলামে জোর করে বিয়ে করা নাজায়েজ।”

ত্রিজয় গা ছাড়া ভাব নিয়ে বললো,

“তোর এসব লেইম যুক্তি ধুয়ে কি পানি খাবো আমি?আমার দরকার লিগেল স্ট্যাটমেন্ট।রেজিস্ট্রি কাগজে বড় বড় করে লেখা আছে তুই আমার এক টাকার বউ।”

“তো সেই কাগজ ধুয়েই পানি খাচ্ছেন না কেনো?অন্তত মাথায় যদি ঘিলু আসে।”

ত্রিজয় প্রচন্ড ক্ষোভে তাকালো ইভানের দিকে, কর্কষ কন্ঠে বললো,

“শুনলে ইভান?শুনলে তুমি?এই মেয়ের স্পর্ধা দিন দিন বেড়েই চলেছে।”

ইভান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,

“শুনছি স্যার,আপনারা কন্টিনিউ করুন,আর কিছুক্ষণের মধ্যে আমি বয়রা হয়ে যাবো বলে।”

“মশকরা করছো তুমি আমার সাথে?মশকরা?যাও তোমার এক মাসের সেলারি কাটা।”

ইভানের মুখটা চুপসে গেলো,তাড়াহুড়ো করে বললো,

“আরে স্যার আমি মশকরা কোথায় করলাম,আপনি আমার সাথে এতো বড় অন্যায় করতে পারেন না।”

“তবে কত বড় অন্যায় করার কথা বলছো?এর মতো একটাকে ধরে এনে বিয়ে করিয়ে দেই, তখন বুঝবে কেমন লাগে।ওই যে এমপির একটা পিএ আছে না?ওটাকেই তুলে আনি?”

ইভান ভড়কালো,উত্তেজিত কন্ঠে বললো,

“আল্লাহর দোহাই লাগে স্যার,আপনি সারাদিন আমাকে লুঙ্গি পড়ে থাকতে বলেন কিন্তু ওই মেয়ের কথা আমার সাথে বলবেন না।”

ত্রিজয় ভ্যাবাচেকা খেলো, বললো,

“কীসের সাথে কীসের তুলনা করলে তুমি?ওই মেয়ের সাথে লুঙ্গির কি সম্পর্ক?”

“আছে স্যার আছে, অনেক গভীর সম্পর্ক আছে, এখন এসব বাদ দিন না, আমার কাছে একটা জবরদস্ত আইডিয়া আছে সেটা শুনুন।”

ত্রিজয় কপাল কুচকে তাকালো, কৌতুহলি কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো ,

“কি আইডিয়া?”

ইভান তাকালো নিস্পাপের দিকে, নড়েচড়ে গিয়ে দাড়ালো কেবিনেটের পাশে, গলা পরিস্কার করে বললো,

“স্যার একটু সাইডে আসুন না।”

ত্রিজয় চোখ ছোট ছোট করে মেজাজ দেখিয়ে বললো,

“আর ইউ ক্রেজি ইভান?তোমার সাথে আমাকে চিপায় যেতে বলছো?”

ইভান এবারেও ভ্যাবাচেকা খেলো, দুই গালে মৃদু থাপ্পড় দিয়ে বললো,

“আস্তাগফিরুল্লাহ আস্তাগফিরুল্লাহ, আমি সেরকম কিছু বলতে চাই নি, না মানে ম্যাম শুনবে তো তাই আর কি,,, ”

ত্রিজয় তাকালো নিস্পাপের দিকে,তারপর রাগান্বিত কন্ঠে বললো,

“তুমি আমাকে এই কানার ভয়ে চিপায় যেতে বলছো?তুমি আমাকে কি মনে করো ইভান?”

ইভান ভেতরে ভেতরে রাগে ফেটে গেলো, দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

“ওরে ঘাড় তেরার বাচ্চা, এতো বেশি কেনো বুঝিস?ইচ্ছে করছে ঘাড়টা মটকে দেই।”

“কিছু বললে নাকি?”

ইভান নড়েচড়ে দাঁড়িয়ে বললো,

“না না, কি বলবো?না মানে বলতে চাইছি প্রাইভেসির তো একটা ব্যাপার আছে।”

ত্রিজয় কপট মেজাজ দেখিয়ে বললো,

“আমার বাড়িতে আমার প্রাইভেসি মেন্টেইন করতে হবে কেনো?এই কানার জন্য?অসম্ভব। ”

তারপর এগিয়ে গিয়ে দাড়ালো নিস্পাপের সামনে,কর্কষ কন্ঠে বললো,

“এখনো কেনো দাঁড়িয়ে আছিস?এক্ষুনি এখান থেকে যা।”

নিস্পা বিরক্তি মিশ্রিত কন্ঠে বললো,

“যাচ্ছি, আপনাদের আজাইরা কথা শোনার জন্য দাঁড়িয়ে নেই আমি।”

নিস্পা আর এক মূহুর্ত দাঁড়ালো না, দুই হাত সামনের দিকে মেলে হাতরে হাতরে এগোতে শুরু করলো,নিজের ঘরে যাওয়ার জন্য চব্বিশ পা হাঁটতে হবে তার,গুনে গুনে মাত্র চার পা এগোতেই ত্রিজয় আরেকটু চটে গেলো,

“দেখেছো ইভান?হাঁটার ধরন দেখেছো তুমি?যেনো পিঁপড়ে হাঁটছে, আরে এ তো ড্রইং রুম থেকে বেড়োতে বেড়োতেই রাত কভার করে ফেলবে।”

ইভান একটু নরম স্বরে বললো,

“কি করার আছে স্যার?ম্যামের দিকটাও তো বুঝতে হবে,চোখে দেখতে না পেলে কি করে দ্রুত হাঁটবে বলুন।”

ত্রিজয় রাগে ক্ষোভে সোফায় লাথি বসালো, অস্ফুটে শব্দ করলো,
“ধ্যাৎ।”

তারপর তেড়ে গেলো নিস্পার কাছে, কথা নেই বার্তা নেই চট করেই কোলে তুলে নিলো নিস্পার চিকনা পাতলা শরীর টা।ত্রিজয়ের এমন কাজে হকচকালো নিস্পা, আচমকা ব্যালেন্স রাখতে না পেরে, না চাইতেও দু হাতে আঁকড়ে ধরলো ত্রিজয়ের গলা,দ্বিধান্বিত কন্ঠে বললো,

“কি,,কি করছেন আপনি? কোলে তুললেন কেনো? ছাড়ুন আমাকে।”

ত্রিজয় ধমকে উঠলো, বললো,

“চুপপ,,একদম অন্য কিছু ভাববি না, তোর প্রতি চুল পরিমাণ ফিলিংস নেই আমার,স্রেফ বোন মনে করে কোলে নিলাম।”

ত্রিজয়ের কথা শুনে চোখ গোল গোল করে তাকালো ইভান,ত্রিজয়ের কথার বিপরীতে ঠিক কি প্রতিক্রিয়া দেখাবে ভেবে পেলো না,বিরবির করে আওড়ালো,

“তুই সিঙ্গেল ছিলি আধ পাগল ছিলি,বিয়ে করে পাপ করেছিস বাপ,পুরো পাগল হয়ে গিয়েছিস।”

এদিকে রাগে নিস্পার নাকের ডগা লাল হয়ে গিয়েছে,তার উপর ত্রিজয়ের কথা শুনে জ্বলে উঠলো কানের লতি,তিরিক্ষি কন্ঠে বললো,

“আমি আপনার বোন হতে যাবো কোন দুঃখে? আল্লাহ আমাকে বেহুশ করে নি।”

ত্রিজয় নিস্পাকে কোলে নিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে বললো,

“আল্লাহ আমাকে বেহুশ করেছে, তাইতো তোকে বিয়ে করেছি।”

“আমি যেচে এসে বলি নি আমাকে বিয়ে করতে।”

“আমিও যেচে গিয়ে আনিনি তোকে।”

“কীভাবে সুন্দর করে মিথ্যা কথা বলতে হয় সেটা আপনার কাছেই শেখা উচিত,আপনি আনেননি তো আমি উড়ে উড়ে এসে আপনার মাথার উপর পড়েছি।”

“রাইট, একদম ঠিক বলেছিস,শনির দশা হয়ে উড়ে উড়েই এসে পড়েছিস আমার মাথায়।”

“আমি উড়ে উড়ে আসলাম আর আপনি টুপ করে বিয়ে করে নিলেন, বাহ!”

ত্রিজয় এবার আর উত্তর দিলো না, চুপ করে রইলো কিছুক্ষন, তারপর বললো,

“আমার দাদা একটা কথা বলতো,অন্যের জন্য গর্ত খুরলে নাকি, সেই গর্তে নিজেকেই পড়তে হয়।”

নিস্পা অস্ফুটে জিজ্ঞেস করলো,

“মানে? ”

“মানে ওই এমপি কে গর্তে ফেলার জন্য আমি তোকে বিয়ে করলাম,আর এখন মনে হচ্ছে তুই ওই এমপির কাছে থাকলে এমপি এমনিতেই গর্তে পড়ে যেতো,আমিই সেধে নিজের গর্ত নিজে খুড়লাম।কি কপাল আমার।”

“বাংলায় একটা প্রবাদ আছে যানেন?”

“কী?”

“অতি চালাকের গলায় দড়ি।”

“তুই বুঝাতে চাইছিস তুই আমার গলার দড়ি?”কথাটা বলেই ব্যাঙ্গ হাসলো ত্রিজয়।

নিস্পা নিঃশ্বব্দে ঠোঁট এলিয়ে দিয়ে বলল,

” আমি কোথায় বললাম, আপনিই তো ভেবে নিলেন।”

ত্রিজয় ঠান্ডা কন্ঠে বললো,

“আমি তোকে গোনায় ধরি না।”

“অতিরিক্ত অহংকার ভালো না।”

“আমার অহংকার চূর্ণ করার মতো এখনো কেউ পয়দা হয় নি।”

“কে বলতে পারে তার জন্মও হয়েছে, আর সে আপনার খুব নিকটে আছে।”

“আমার অহংকারের আগুনে ঝলসে মরবে সে, নিকটে আসার প্রশ্নই আসে না।”

“অহংকারীকে আল্লাহ ঘৃনা করেন, আপনি তো তার চেয়ে জঘন্য।জাহান্নাম থেকে রেহাই কি করে পাবেন আপনি?”

ত্রিজয় স্মিথ হাসলো,শান্ত সাবলীল কন্ঠে বললো,

“ওসবে ভয় নেই আমার, যদি কখনো পরিস্থিতি পাল্টে যায়, আমার সব পাপ তোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিবো।”

“কেনো?”

“কারণ স্বামী স্ত্রী একে অপরের পরিপূরক, যা দেখছি আমার চেয়ে তোর পাপ কম আছে, তাই আমার পাপ তোর উপর চাপিয়ে দিয়ে তোর পাপের ঘড়া পূর্ণ করে দিবো।”

______________

নিজের ঘরের ইজি চেয়ারে মাথা এলিয়ে বসে আছে তাকরিম।চোখ দুটো ক্লান্তির ভারে বন্ধ তার। টেবিলের ওপর রাখা ওয়াইনের গ্লাসটায় লাল তরল নিস্তব্ধ, অথচ এক অদ্ভুত গাঢ়তা ছড়িয়ে আছে চারপাশে। আঙুলের ভাঁজে ধরা সিগারেটের পোড়া অংশ ধিকিধিকি করে জ্বলছে, একদম তার ভেতরের দগদগে ক্ষতের মতো।ঘরের ভেতর ছড়িয়ে থাকা ওয়াইনের গন্ধ, সিগারেটের ধোঁয়া, আর যন্ত্রণার মিশ্রনে গাঢ় বিষাদ জমাট বেঁধেছে নিস্তব্ধ ঘরের চার দেয়ালে।

হুট করেই নিস্তব্ধতা ভেঙে দরজায় হালকা শব্দ হলো, তাকরিম শুনলো, কিন্তু কোনো প্রতিউত্তর করলো না।

দরজার বাইরে প্রভা দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ, একটু অস্থির ভঙিতে গভীর নিঃশ্বাস নিল, তারপর আবার নক করলো, মৃদু সুর তুলে ডাকলো,

“ভাইয়া আসবো?”

তাকরিম বিরক্তিতে কপাল কুচকে চোখ খুলে নিলো, দরজার দিকে তাকিয়ে বললো,

“কেনো?”

“আম্মা পাঠিয়েছে।”

মায়ের কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল তাকরিম,গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“আয়।”

প্রভা খুশি হলো, দ্রুত পায়ে ঢুকলো ঘড়ের ভেতর।

প্রভার দিকে মনযোগ দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলো না তাকরিম, পোড়া সিগারেটের শেষ অংশটা অ্যাশট্রেতে চেপে নিভিয়ে দিয়ে, নতুন একটা সিগারেট বের করলো। ঠোঁটের কোণে সেটে নিয়ে লাইটারটা ক্লিক করতেই ছোট্ট আগুনের শিখা জ্বলে উঠলো,অত:পর ধোঁয়ার কুণ্ডলী ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো ঘরের নিস্তব্ধ বাতাসে।

প্রভা চুপচাপ তাকিয়ে রইলো তাকরিমের বিষাদে মোড়ানো ফ্যাকাসে চেহারার দিকে। স্থির দৃষ্টিতে পরোখ করলো, চোখের নিচে গভীর যন্ত্রণার ছাপ,ভাষাহীন চাহনি, বিবর্ণ ঠোঁট,ফর্সা কপালের কুচকানো ভাজ।

তাকরিম চুপচাপ শেষ করলো এই সিগারেটটিও,নতুন উদ্যমে আরেকটি সিগারেট ধরানোর জন্য লাইটার টা ক্লিক করতে নিলেই, প্রভা চিকন কন্ঠে বলে উঠলো,

“আবারও?”

তাকরিম হাত স্থির করে দৃষ্টি ঘুড়িয়ে একবার তাকালো প্রভার দিকে,তারপর আবারো মনযোগ দিয়ে ধরালো সিগারেট,লাইটারটা টেবিলের উপর ছুড়ে রেখে বললো,

“আম্মা কেনো পাঠিয়েছে?”

প্রভা নিঃশ্বাস নিয়ে বললো,

“আপনার নাকি মাথা ব্যাথা?”

“তো?”

“আম্মা বললো আপনার মাথাটা টিপে দিতে।”

“প্রয়োজন নেই।তুই এখন যেতে পারিস।”

তাকরিমের উত্তরে বুকটা মুচড়ে এলো প্রভার।যেতে মন চাইলো না একটুও,বরং তাকরিমকে আরো কিছুটা সময় দেখার জন্য অবাধ্য হতে মন চাইলো খুব।

এই বিষণ্ণ, ক্লান্ত মানুষটার চোখের গভীরে হারিয়ে যেতে মন চাইলো।খুঁজে পেতে চাইলো সুপ্ত অনুভূতির চিহ্ন, পেতে চাইলো তাকরিমের শূন্য দৃষ্টিতে একটুখানি উষ্ণতা,এতো কিছু পাওয়ার লোভে তার পা নড়লো না, ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো সেখানেই।

প্রভাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কণ্ঠনালীর মিলন ঘটালো তাকরিম,গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

“কি দেখছিস?”

“সিগারেটের ধোঁয়া।” অস্ফুটে বললো প্রভা।

“দেখে কি লাভ?”

“আপনি খেয়ে কি লাভ পাচ্ছেন?”

তাকরিম হতাশার নিঃশ্বাস ছাড়লো,তারপর বললো,

“এই সিগারেটে ছয় থেকে বারো মিলিগ্রাম নিকোটিন আছে, অথচ আমার কোন লাভেই আসছে না,কেনো বলতো?”

“কেনো?”

“কারণ আমার ভেতরটা এই সামান্য নিকোটিনের থেকেও বিষাক্ত।”

“এতো যন্ত্রণা?আপনি তো শেষ হয়ে যাবেন।”

“আমি নিঃশেষ হয়ে গিয়েছি প্রভা।”

“কি এমন হারিয়েছেন শুনি?”

“আমার মহামূল্যবান আলেকজান্দ্রা।”

তাকরিমের ভরাট কন্ঠ থেকে ধেঁয়ে আসা শেষ শব্দটুকু প্রভার ভেতরটা নাড়িয়ে দিলো, শিউরে তুললো তার অস্তিত্ব, ধক করে কম্পন তুললো হৃৎপিন্ড।ঘন ঘন নিঃশ্বাস ছেড়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,

“আলেকজান্দ্রা!কে সে ভাগ্যবতী?”

“আছে একজন।”ছোট্ট জবাব দিলো তাকরিম।

প্রভা গুনগুনিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

” একজন?আর কেউ নেই?আর কাউকে মনে পড়ে না আপনার?”

“সে ছাড়া আমার স্মৃতিতে সব শুন্য।”

পরক্ষণেই কপাল কুচকালো তাকরিম, প্রভার দিকে তাকিয়ে বললো,

“কেনো বলতো?আর কাকে মনে থাকার কথা আমার?”

প্রভা শুখনো ঢোক গিললো,ইনিয়েবিনিয়ে বললো,

“এই ধরুন এমন কেউ, যে আপনাকে ভালোবাসে, খুব বেশি, এতো বেশি যে সে মৃত্যুকে কবুল করেছে সজ্ঞানে, স্বইচ্ছায়।”

তাকরিম নিশ্চুপ ভঙিতে বসে রইলো,আনমনেই একবার তাকালো বেলকনির দিকে,অন্ধকার খোলা আকাশে কিছু একটা খুজলো বোধহয়,তবে না পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস ছিটকে বেড়িয়ে এলো নাসিকাগ্রন্থ থেকে।খুস্ক ঠোঁট কামড়ে চোখ বন্ধ করলো, স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠলো একটা চঞ্চল চড়ুই পাখির মতো মুখ,অস্ফুটে বললো,

“সুফি।”

তাকরিমের অস্পষ্ট শব্দ টুকু বুঝতে ভুল হলো না প্রভার, ঠোঁটের কোনে ফুটে উঠলো দুর্বোধ্য হাসি।তাকরিম দেখার আগেই সেই হাসি আড়াল করে ফেললো দ্রুত,বিরবির করে বললো,

“আপনাকে যে ভালোবেসে পূনর্জন্মে তড়পায়, তাকে ভুলে অন্য কারো প্রেমে তড়পাচ্ছেন আপনি, এবারেও কি তবে শেষ পরিনতি মৃত্যু হবে?”

তাকরিম সিগারেটের ধোঁয়া উড়াতে উড়াতে বললো,

“হু,কিছু বললি আমায়?”

“না, না। কি বলবো,আমি আসছি তাহলে।”

প্রভা আর দাড়ালো না, ঠোঁটের হাসির সাথে,চোখের জল টুকুও আড়াল করে ছুটে বেড়িয়ে গেলো ঘর থেকে।

___________________

ড্রয়িং রুমে আবারো আলোচনায় বসেছে ত্রিজয় আর ইভান,ইভান সুন্দর করে উপস্থাপন করছে তার পরিকল্পনা,

“স্যার অনেক পুরনো কেস,স্ট্রং এভিডেন্স থাকলেই ওই এমপি মশাইয়ের বিরুদ্ধে জোড়ালো স্টেপ নেওয়া যাবে,কারণ দেশের আইন প্রশাসন কিন্তু তার ইশারাতেই চলে।”

ত্রিজয় তোয়াক্কা করলো না, উল্টো দাম্ভিক কন্ঠে বললো,

“তাতে কি?তুমিও বোধহয় ভুলে যাচ্ছ, শুধু দেশের আইন প্রশাসন নয়, আমি চাইলে আমার চোখের ইশারায় পুরো দেশ কন্ট্রোল করতে পারি।”

“তাতে তো আর প্রতিশোধ নিয়ে মজা পাবেন না, কলিজাও ঠান্ডা হবে না।”

“তাহলে কি করতে বলছো তুমি?”

“আমি বলতে চাইছি আপনি নিস্পা ম্যামকে দিয়ে কেসটা রি ওপেন করান,যত যাই হোক আজকে সকালের ঘটনায় যা বুঝেছি ওই এমপি কিন্তু নিস্পা ম্যাম কে অসম্ভব বেশি ভালোবাসে, আর সে যদি শুনে তার বিরুদ্ধেই তার ভালোবাসার মানুষ কেস করেছে বিষয় টা কেমন মজার হবে ভাবতে পারছেন?”

ত্রিজয় ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ ভাবলো, তার চোখে মুখে খেলে গেলো খুশির ঝলক,ঠোঁটের কোনে ফুটে উঠলো বাঁকা হাসি,ডেবিল কন্ঠে বললো,

“ওই কানাকে রাজ সাক্ষী রাখলে কেমন হয়?এমপি তাওসিফ তাকরিমের বিরুদ্ধে রাজ সাক্ষী হবে তার জান পাখি মিসেস ত্রিজয়।”

কথাটা বলতে বলতে সোফায় গা এলিয়ে দিলো ত্রিজয়,দুই হাত দুদিকে মেলে দিয়ে তাকালো মাথার উপর ঝুলন্ত ঝড়বাতি টার দিকে,শান্ত কন্ঠে বললো,

“এমপি মশাইয়ের পরিনতির কথা ভাবলেই কলিজাটা ঠান্ডা হয়ে আসছে ইভান।আহ! কি যে শান্তি।”

“কিন্তু একটা সমস্যা আছে স্যার।”

ইভানের কথা শুনে চট করেই মাথা তুলে তাকালো ত্রিজয়, বললো,

“কি সমস্যা?”

ইভান আইঢাই করে বললো,

“সমস্যা মানে, যদি নিস্পা ম্যাম রাজি না হয়,আপনারা তো একত্র হলেই ঝগড়া করেন।”

“তাতে কি? ওই কানা রাজি হবে না, ওর বাপ রাজি হবে।”

“স্যার, ওনার বাবা তো উপরে,,,, ”

“তো?এতো বেশি কথা বলো কেনো তুমি?আমি যখন বলেছি ওই কানা আমার রাজসাক্ষী হবে, তবে তাই হবে।”

“কি করে রাজি করাবেন?আমি যতদূর চিনেছি নিস্পা ম্যামও আপনার মতোই ঘাড় তেরা।”

“তুমি কি ইন্ডিরেক্টলি আমাকে ঘাড় তেরা বললে?”

“অসম্ভব ব্যাপার স্যার,আমার ঘাড়ে কটা মাথা আছে যে আপনাকে ঘাড় তেরা বলবো?”

“তাও তো ঠিক,আমাকে নিয়ে কিছু বললে, ঘাড়ে যেটা আছে সেটাও থাকবে না।মনে থাকবে?”

“জ্বি স্যার মনে থাকবে, আমি এখন আসি।”

“কোথায় যাবে তুমি?”

ইভান তাকালো হাত ঘড়ির দিকে, সময় দেখে নিয়ে বললো,

“কোথায় আবার বাড়িতে যাবো,রাত দুটো বেজে গিয়েছে।”

“কোথাও যেতে হবে না, ভোর হতে আর চার ঘন্টা আছে, এখানেই বসে থাকো।”

ইভান চমকে তাকালো,উত্তেজিত কন্ঠে বললো,

“বসে থাকবো মানে?আমাকে কি আপনার রোবট মনে হয় স্যার।”

“গাধা কোথাকার, তোমাকে আমি বসে থাকতে বলেছি বলে কি বসেই থাকতে হবে? আমি যাওয়ার পর তুমি বসে থাকবে নাকি শুয়ে থাকবে সেটা তোমার ব্যাপার।শুধু কান টা খোলা রেখো, সকালে বউয়ের সাথে ঝগড়া হলে তোমাকে হেলমেট হিসেবে ইউস করবো।”

ইভান দাঁতে দাঁত পিষলো, চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,

“সমস্যা নেই স্যার, আপনি চাইলে আমাকে আন্ডারওয়্যার হিসেবেও ইউস করতে পারেন, একমাত্র ওইটাই বাকি আছে।”

__________________

রাত দুটো বেজে চল্লিশ। চারপাশ নিস্তব্ধ, ঘরের ভেতর সিগারেটের ধোঁয়া ভাসছে ধীর লয়ে। টেবিলের কোণে উপুড় হয়ে পড়ে আছে ওয়াইনের বোতলটা , গ্লাসের তলানিতে জমাট বেঁধেছে লালচে তরল, সিগারেটের শেষাংশটা ধীরে ধীরে ছাই হয়ে ঝরে পড়ছে অ্যাশট্রেতে,

তাকরিম এখন পুরোপুরি ড্রাংক। শরীরটা এলিয়ে পড়েছে , মাথাটা হেলে গিয়েছে একদিকে । চোখের পাতা ভারী হয়ে এসেছে, অথচ ঘুম নেই। নেশার দোলাচলে ধোঁয়াটে লাগছে পৃথিবীটা, ঘোলাটে হয়ে এসেছে সামনের সব টুকু।টালমাটাল পায়ে ভর করে উঠে দাড়ালো সে,হাঁটতে শুরু করলো এলোমেলো ভাবে,গন্তব্যহীন এগিয়ে গিয়ে থামলো একটা ঘরের সামনে।হালকা ধাক্কা দিতেই খুলে গেলো সে ঘরের দরজা, আওয়াজ পেয়ে ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠলো অনুরিকা, আতংকিত কন্ঠে বললো,

“কে? কে এসেছে আমার ঘরে?”

চলবে,,,,,,,

⛔রোজার মাস, খুব ব্যস্ত থাকতে হয় বইনারা।খুব কাজ, ঈদ সামনে টুকটাক সেলাইয়ের কাজ করি, তাই অনেক কাজ জমা হয়েছে,তারউপর সংসার, নিজের একার হলে সমস্যা ছিলো না। কিন্তু শশুর শাশুড়ী যেহেতু আছে তাই, সময় মতো শেষ করতে হয়ে, তারউপর আছে বাচ্চা।তাও শেষ নেই, নামাজ কোরান পড়াও আছে।রান্না বান্না তো প্রাত্যহিক ঝঞ্ঝাট।আরো আছে দুটো টিউশন পড়াই, দুইটাই বাচ্চা।নিজেরটা সহ আরো দুইটা বাচ্চা সামলাতে হয়।

বুঝতেই পেরেছেন আমি কীভাবে সব সামলে গল্প লিখি,যখন গল্প দিয়ে কারো অনুভুতি জানতে পারি না তখন কেমন লাগে?তোমাদের দুটো লাইন কমেন্ট করতে সমস্যা আর আমি এতো কিছু সামলে 2 হাজার শব্দ লিখি।আশা করি সবাই আমার দিকটা বুঝবেন🥹

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here