#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:29
⭕পূনর্জন্ম বা টাইম ট্রাবল কোন ধর্মে গ্রহনযোগ্য
___________________________________________ নয়,এটি কেবল রুপকথার উপমা।
_______________________________⭕
ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘর।আলো আধারি খেলায় মেতেছে একটি বাচ্চা ছেলে।সে হাসছে, খিলখিল করে হাসছে,ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে এগিয়ে আসছে ত্রিজয়ের কাছে,হলুদ আলোর জ্যতিতে তার চুল আর চোখের পাপড়ি গুলো চিকচিক করছে।কমলালেবুর মতো ঠোঁট গুলো নাড়াচ্ছে আর ডাকছে,
“পচা লোক, কোথায় তুমি?ও পচা লোক।”
ত্রিজয় চট করেই চোখ খুলে ফেললো, দেখতে পেলো বাচ্চা ছেলেটা তার কাছে, তার আঙুল ধরে ঝাকাচ্ছে আর ডাকছে,
“আর কত ঘুমাবে প্রিন্স ?উঠো,প্রতিশোধ নিবে না? আমার হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার সময় যে ফুরিয়ে যাচ্ছে।”
ত্রিজয় অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছে বাচ্চাটির দিকে,তার চোখ মুখের ভাষা অসংশোধিত।অতল অন্ধকারে ডুবে থাকা শূন্য দুটো চোখ কোন রোবট বা মৃত প্রানীর ন্যায় নিস্প্রান নিরাবেগ।নয়তো কোনো মৃত যন্ত্রমানব কিংবা প্রাচীন অভিশপ্ত আত্মার ছায়া। শিশুটির দিকে তাকিয়ে সে হারিয়ে গেছে শত মাইল দূরের কোনো অচেনা সময় আর অজানা স্মৃতির অন্তরালে।
বাচ্চাটা আবার ডাকলো,
“দাসী আলেয়ার সন্ধান পেয়েছি আমি।চলো আমার সাথে, আমার আত্মাকে মুক্তি দেও পচা লোক, দাসী আলেয়ার রক্তে আমার আত্মা পবিত্র করো।”
বাচ্চাটির বলার সাথে সাথেই যন্ত্রমানবের মতো উঠে দাড়ালো ত্রিজয়,অদ্ভুত রোবটিক কন্ঠে বললো,
“চলো।”
বাচ্চা ছেলেটা খুশি হলো,হেসে উঠলো খিলখিল করে, পরপরই রুপান্তর হলো একটা পাখির রুপে।উড়ে এসে বসলো ত্রিজয়ের কাঁধের উপর,চিকন সুরে বললো,
“চলো, চলো,সময় ফুরায়,সময় ফুরায়।”
____________
ত্রিজয় নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো নিজের ঘর থেকে। রাত তখন চূড়ান্ত অন্ধকারের দখলে। আকাশে কোনো চাঁদ নেই, ল্যাম্পপোস্টের বাতিগুলোও ঝাপসা।অথচ যান্ত্রিক শহরে থেমে নেই মানুষের ছায়াময় পদচারণা। রাতের আঁধারকে উপেক্ষা করে, লোকজন এখনো নিজেদের কাজে মগ্ন।কেউ হাসছে, কেউ কথা বলছে,কেউবা এগিয়ে যাচ্ছে ব্যাস্ততম কদম ফেলে। আবার কেউ কেউ আড্ডা জমিয়েছে টং দোকানের বেঞ্চিতে বসে।
ত্রিজয়ের মুখে এক অচেনা শীতলতা, চোখে অনির্বচনীয় শূন্যতা। তার প্রতিটি পদক্ষেপে মাটির নিচ থেকে উঠে আসছে চাপা দীর্ঘশ্বাস। বাতাস ভারী, নিশুতি রাত অপেক্ষা করছে কোনো অজানা ঘটনার সাক্ষী হওয়ার উদ্দেশ্যে।
আঁধারকে কেউ ভয় পায় না। কেউ শোনে না রাতের বুক চিরে ভেসে আসা আঁধারের চাপা চিৎকার। সে তো চায় বলি, তাজা রক্তের বলি। এই শহরের অন্ধকার গলিতে ঘুরে বেড়ায় তার ক্ষুধার্ত ছায়া।
যদি কেউ সেই চিৎকার শুনতে পেতো, তবে পথঘাটের নিস্তব্ধতা বেড়ে যেতো কয়েকগুণ। মানুষ ভয়ে সন্ধ্যা নামতেই দরজায় খিল আঁটতো, জানালায় পর্দা টেনে দিতো। কুকুরের ডাকে শিউরে উঠতো গা।
**
ত্রিজয় হাঁটছে নিস্তব্ধ শুনশান গলি ধরে।তার মাথার উপর দিয়ে উড়ছে সেই পাখি,নির্মল ভারি বাতাসের সাথে শোনা যাচ্ছে পাখিটির ডানা ঝাপটানোর শব্দ।
পাখিটির দিক নির্দেশনা অনুযায়ী ত্রিজয় এগিয়ে যাচ্ছে, পেছনে ফেলে আসছে কয়েক মাইল পথ।
কাঁধে একটা ভ্যানিটি ব্যাগ।কালো রঙের শাড়ি পরিহিত একটি মেয়ে এগিয়ে আসছে সেই গলি ধরে ।কপাল ভিজে আছে ঘামে,কিছু কেশ গুচ্ছ লেপ্টে আছে তৈলাক্ত ঘামের উপর।মেয়েটির প্রতি কদমে ব্যাস্ততা।রাতের অন্ধকারে ভয়ডর নেই তার, অথচ আজ গলির বাতাস ভারি,অজানা কিছু নিঃশ্বাস ফেলছে তার কানের কাছে, পুরনো কোন শাবদেহের মতো গুমোট ভয় তাকে জাপ্টে ধরেছে পা থেকে মাথা অব্দি।
মেয়েটির ভয়কে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়ে ভেসে এলো এক মনভুলানো সুর।মেয়েটির গন্তব্য সেখানেই থেমে গেলো, ভাবনার সময় পেলো দু সেকেন্ড বা তারও কম সময়, তার মাঝেই অন্ধকারের আঁচল চিরে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো এক জোড়া নীল নেত্রমনি,পরপরই শানিত অস্ত্রের ন্যায় ঠিকরে পড়ল মেয়েটির চোখের গভীরে।
এক মুহূর্তেই ত্রিজয়ের সেই অপার্থিব দৃষ্টি ঘিরে ধরল মেয়েটির সমস্ত সত্ত্বা, সম্মোহিত, স্থবির। মেয়েটির চেতনা আর নিজের আয়ত্তে নেই। মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষে ঢুকে পড়েছে এক শীতল মায়াবী শিকল।
ত্রিজয় তার চোখের দৃষ্টি দ্বারা এক অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে ফেলেছে মেয়েটিকে। তার দু ঠোঁটের ফাঁক গলে বেড়িয়ে আসা মনভুলানো সুর ধীরে ধীরে রক্তজমাট স্রোতের মতো ঘিরে ধরছে মেয়েটির মস্তিষ্ক।
___________
নিজের ল্যাপটপ নিয়ে কিছু একটা ঘাটাঘাটি করছে তাকরিম,কপালের ভাজ আর বৃদ্ধাঙুলের অনবরত নাড়ানাড়িতে বোঝা যাচ্ছে কারো সাথে টেক্সট করছে সে।
মুখের অভিব্যক্তি বোঝা দায়,তবে কিছু একটা নিয়ে চিন্তিত হয়তো।
কিছুক্ষণ একইভাবে টেক্সট করার পর ল্যাপটপ বন্ধ করে ইজি চেয়ারে মাথা এলিয়ে দিলো তাকরিম।পরপরই পাঞ্জাবির পকেট থেকে বের করলো মোবাইল ফোন,ফোনের স্ক্রিনে দ্রুত চালালো হাত,একটা নাম্বার ডায়াল করলো দুবার, তৃতীয়বার ডায়াল করার আগেই কলব্যাক এলো,তাকরিম মোবাইল ঠেকালো কানে,অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে এলো চিত্রার কন্ঠ,
“হ্যাঁ, হ্যালো স্যার,বলুন।”
তাকরিম চোয়াল শক্ত করে চুপ করে রইলো,তাকরিমের উত্তর না পেয়ে চিত্রা আবার বললো,
“হ্যালো, হ্যালো স্যার।আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন?”
তাকরিম দাঁতে দাঁত পিষে, চাপা কন্ঠে বললো,
“তোমার পরিচয় কি চিত্রা?”
চিত্রা ভ্যাবাচেকা খেলো,অপ্রস্তুত ভঙিতে বললো,
“আম,,আমি চিত্রা, মানে আমি,,,”
“নাম ছাড়া তোমার আরও একটা পরিচয় থাকার কথা।”চিত্রাকে থামিয়ে দিয়ে বললো তাকরিম।
চিত্রা থতমত খেয়ে বললো,
” আপনার পিএ স্যার।”
তাকরিম এবার আর রয়েসয়ে বললো না,ধমকে উঠলো চওড়া কন্ঠে,
“এক্সাক্টলি চিত্রা,আমার মনে হচ্ছে তুমি তোমার এই পরিচয়টা ভুলে গিয়েছো।”
চিত্রা চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো,ভয়ে কান থেকে দূরে সরালো মোবাইল ফোন, বুকে থু থু ছিটিয়ে কম্পিত কন্ঠে বললো,
“কে,,কেন স্যার?আমি কি করেছি?”
“ওহ তার মানে তুমি জানোই না কি হচ্ছে?বাহ!এমপি তাওসিফ তাকরিমের পিএ দেখছি একটা অকর্মা।”
“স্যার,,”
“চুপ, একটা কথা বলবে না,তোমার জন্য আমার কেরিয়ারে রেড ফ্লাগ উড়তে যাচ্ছিলো একটুর জন্য।”
“স্যার বিশ্বাস করুন, আমি এমন কোন অন্যায় করি নি, আপনি কীসের কথা বলছেন আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না।”
“বুঝে কি করবে এখন?ওই ত্রিজয় যা করার তো করেই ফেলেছে, পনেরো বছরকার আগের একটা কেস রিওপেন করে আমার পেছনে লেগেছে, আর তুমি নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছো?”
চিত্রাকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে তাকরিম আবার বললো,
“শুনো তোমাকে একটা সুযোগ দিচ্ছি,কাল ওই উকিলের পিএ র সাথে দেখা করবে,যত টাকা প্রয়োজন অফার করবে ওকে,যেকোনো মূল্যে ছেলেটাকে কিনে নিবে,কেসটার সমস্ত ডিটেইলস একসপ্তাহের মধ্যে আমার চাই।কাজটা করতে পারলে ভালো, নয়তো তোমার চাকরি থাকবে কিনা গ্যারান্টি দিতে পারছি না।”
“কিন্তু স্যা,,,,টুটু করে কল কেটে যাওয়ার শব্দ পেয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল চিত্রা।তাকালো বিছানায় শুয়ে থাকা প্যারালাইজড মায়ের দিকে,কাজটা যে করেই হোক করতে হবে তার,চাকরিটা কোনভাবেই হারাতে পারবে না সে।
__________
চিত্রার সাথে ফোনে কথা বলা শেষ করেই ঘরের বাইরে বেড়িয়ে গেলো তাকরিম।পাঞ্জাবি চেঞ্জ করে একটা টি শার্ট আর টাউজার পড়ে নিয়েছে,বেড়োনোর সময় একটা মাক্স আর কালো কেপ নিয়ে নিয়েছে হাতে।
কোথাও একটা যাওয়ার তোড়জোড় তার।সিড়ি ধরে নিচে নেমেছে খুব দ্রুত,তবে দরজা অব্দি যাওয়া হয়নি,সিড়ি থেকে নেমে কয়েক পা এগোনো মাত্রই কিছু একটার সাথে হোচট খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে বাঁচলো,লম্বা হাত বাড়িয়ে ব্যালেন্স রাখলো চেয়ারের উপর।পরপরই ভেসে এলো মেয়েলি কন্ঠ,
” ওহ আল্লাহ গো,এই রাতের বেলা কোন দামড়া এসে পড়লো আমার উপর।”
মেয়েলি কন্ঠস্বর পেতেই কপাল কুচকালো তাকরিম,পুরো ড্রয়িং রুম আবছা অন্ধকারে মোড়ানো।তাকরিম মোবাইলের ফ্লাশ জ্বালিয়ে সামনে ধরতেই চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো অনু,তাকরিম হতহ্বিবল,বিস্মিত কন্ঠে বললো,
“তুমি এখানে?এই অন্ধকারে ফ্লোরে কি করছো?”
তাকরিমের কন্ঠ পেতেই থতমত খেলো অনু,আতংকে চোখ বড় বড় করে ফেললো,তাকালো তাকরিমের দিকে, চোখে মুখে চোরা চোরা ভাব,ধরা পড়ার ভয় ছড়িয়ে গিয়েছে সর্বমুখে।
তাকরিম সটান হয়ে দাড়ালো,সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“বাই এনি চান্স পালানোর চেষ্টা করছিলে নাতো?”
অনু মুখটা আরেকটু চুপসে ফেললো,চিবুক ঠেকালো অগ্রভাগে,ভেঙে ভেঙে বললো,
“না মানে, মানে।”
তাকরিম ঝুকে এলো একটু, বললো,
“মানে?”
অনু তাড়াহুড়ো করে বললো,
“কানের দুল,আমার কানের দুল পড়ে গিয়েছিলো, সেটাই খুজছিলাম।”
“কিন্তু তোমার কানের দুল তো কানেই আছে।”
অনু ফোস করে নিঃশ্বাস ফেললো,হাত রাখলো কানের উপর,মিনমিনে কন্ঠে বললো,
“ওহ কানের দুল আছে? না মানে আমি বলতে চাইছিলাম আমার একটা রিং, একটা রিং পড়ে গিয়েছে,কোথায় যে পড়লো।”
তাকরিম দাঁতে দাঁত চেপে কটমট করে তাকালো,তারপর প্রচন্ড আক্রোশে চেপে ধরলো অনুর গাল,ক্রোধিত কন্ঠে বললো,
“এর পরের বার পালানোর চেষ্টা করলে সোজা দুটো পা কেটে ফেলে দেবো।”
অনু ঠোঁট ফোলালো,তিরিক্ষি কন্ঠে বললো,
“এমপি বলে যা ইচ্ছে তাই করবেন নাকি?আমাকে আটকে রেখেছেন কোন দুঃখে? আমার সাথে কীসের শত্রুতা আপনার?”
“কৈফিয়ত চাইছো?”
“যদি বলি তাই।”
“আমি কাউকে কৈফিয়ত দেই না।”
“এমপি বলে?”
“বড্ড বেশি প্রশ্ন করো তুমি।ইচ্ছে করছে জ্বিভ কেটে দেই।”
“জ্বিভে হাত দেওয়ার আগে আমার দন্তপাটির সাথে দ্বন্দে জড়াতে হবে।”
“যদি বলি দাঁত ভেঙে দিবো?”
“এইটুকুই তো পারেন, কখনো কেঁটে ফেলেন তো কখনো ভেঙে ফেলেন।আর কি পারেন বলুনতো?”
“ভালোবাসতে।”
“অথচ আপনি ভালোবাসা কি সেটাই যানেন না।”
“কি বলতে চাইছো তুমি?”
“ভালোবাসলে কৈফিয়ত দেওয়া শিখতে হয়।”
“সেটা না হয় আমি বুঝে নেবো।”
“এজন্যই আপনার ভালোবাসা আপনার ধরাছোঁয়ার বাইরে।”
“মানে?”
“মানে আপনি কেবল ভালোবাসতেই যানেন,কখনো বুঝতে শেখেননি, কখনো ধরে রাখতে শেখেন নি।আপনি কেবল পারেন ভালোবাসতে।”
“যদি বলি আমি আরো একটা জিনিসও ভালো পারি।”
অনু কপাল কুচকে তাকালো তাকরিমের দিকে, তাকরিম কিঞ্চিৎ ঝুঁকে এলো, ফিসফিস করে বললো,
“খুন করতে পারি আমি।ঠান্ডা মাথায় রক্তের বন্যা বইয়ে দেওয়া আমার শখ, আমাকে সহজভাবে নিও না মেয়ে, তাকরিম উদ্দেশ্য ছাড়া কিছু করে না, নিশ্চয়ই তোমাকে আটকে রাখার পেছনে যথেষ্ট কারণ আছে আমার কাছে।”
অনু এবারে ভড়কালো কিঞ্চিৎ,তোতলানো ভঙিতে বললো,
“মা,ম,মানে?”
তাকরিম বাঁকা হাসলো, ঘাড় কাত করলো অদ্ভুত ভাবে,হাত দিয়ে আলতো থাপ্পড় দিলো অনুর গালে, রহস্যময় কন্ঠে বললো,
“ডোন্ট ওয়ারি,খুব শীঘ্রই মুক্তি পাবে তুমি।চিরদিনের মতো মুক্তি দেবো তোমায়।তোমার রক্তের গন্ধে আমার শান্তির খোরাক ফুরিয়ে আসছে।”
_______________
রক্তের সোঁদা গন্ধে ভরে আছে ঘর। বাতাস ভারী, দমবন্ধ করা শীতলতা কাবু করেছে বাতাসকে। দেয়ালের গায়ে লাল রক্তের ছোপ, মেঝেতে জমাট রক্ত, মাঝখানে পড়ে আছে অর্ধনগ্ন নারীর নিথর দেহ। তার শরীরজুড়ে ক্ষত,হাতে ধরে রাখা চাপাতি টা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে মেয়েটি নিজেকেই নিজে জখম করেছে।
ত্রিজয়ের অপার্থিব দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে মেয়েটির নগ্ন পেটের উপর।কিছু একটা খুঁজছে সে।
কিন্তু নেই। একটা চিহ্ন থাকার কথা। কারো না কারো উদরে থাকার কথা সেই চিহ্ন। এক নিষিদ্ধ জন্মছাপ বা ভয়ংকর ইতিহাসের চিহ্ন থাকার কথা।
সবচেয়ে ভয়ংকর যেই ব্যাপারটা সেটা হলো পাখি, সাদা ময়ুর পেখমে আবৃত সেই পাখি, যার রঙ এখন আর সাদা নেই।মেয়েটির রক্তে ভিজে টকটকে লাল হয়েছে তার পালক। রক্ত মাখা পেখম গুলো ধীরে ধীরে খুলে মেলে ধরছে সে পাখি।ডাকছে অদ্ভুত শব্দ করে,হয়তো খুশির নয়তো বিজয়োল্লাসের।
পরপরই ডানা মেলে উড়ে গেলো পাখিটি,ঘরের দেয়াল কেঁপে উঠল হালকা। বাতাস ভারী হয়ে উঠলো, জানালার বাইরে দূরের গাছে একা একা দুলে উঠল শুকনো শাখা।ভেসে এলো সে পাখির চিকন কন্ঠ,
“সে চিহ্ন তুমি পেলেপুষে বড় করছো অথচ তা তোমার নাগালের বাইরে।নিয়তি তোমার চোখে মায়াজাল বুনেছে ইচ্ছে করে।”
______________
কালো কেপ, সাথে কালো সানগ্লাস আর মুখে মাস্ক লাগিয়ে পুরো মুখ আবৃত করে নিয়েছে তাকরিম, বাড়ি থেকে বেড়োনোর বেশ তাড়াহুড়ো দেখালো সে।পার্কিং লড থেকে বাইক টা বের করে স্টার্ট দিবে ঠিক সেই মূহুর্তে পেছন থেকে ডেকে বসলো প্রভা,
“ভাইয়া।”
বাইক স্টার্ট দিতে গিয়েও থামলো তাকরিম,হাতের মুঠোয় চাবিটা চেপে ধরে তাকালো পেছনের দিকে।কপাল কুচকে জিজ্ঞেস করলো,
“তুই?”
প্রভা ঠোঁট টিপে চিবুক নামালো, বললো,
“বাইরে যাচ্ছেন?”
“কি মনে হচ্ছে? “গম্ভীর কন্ঠে পাল্টা প্রশ্ন করলো তাকরিম।
প্রভা আইঢাই করে বললো,
” না মানে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পড়ছে, বাইকে যাবেন?”
“সমস্যা হবে না।”
তাকরিম ফের বাইক স্টার্ট দেওয়ার জন্য উদ্যত হলো,প্রভা তাড়াহুড়ায় ডাকলো আবার।
তাকরিম চোয়াল শক্ত করলো,রাগ চেপে তাকালো আবার,শক্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“আবার কি হয়েছে?”
প্রভা তার হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
“রেইন কোট টা নিয়ে যান না প্লিজ।বৃষ্টির ফোটা মাথায় পড়লে জ্বর এসে যায় আপনার।”
তাকরিমের দৃষ্টির ভাষা পাল্টালো, তাকালো প্রভার হাতে ধরে রাখা রেইন কোটের দিকে,শান্ত কন্ঠে বললো,
“এসবের দরকার নেই,জ্বর হলে তেমন কিছু আসবে যাবে না।”
“কিন্তু জ্বর আসলে আপনার মাথা ব্যাথা শুরু হয়, আপনার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পরে, সেবারের কথা মনে নেই আপনার?”
তাকরিম স্মিথ হেসে ফেললো,প্রভার হাত থেকে রেইন কোট টা নিতে নিতে বললো,
“তুই মনে রেখেছিস তাই মনে রাখার প্রয়োজন পরে নি।”
“আজ মনে রেখেছি কিন্তু সবসময় তো মনে রাখতে নাও পারি, সারাজীবন এই ছোট খাটো বিষয় গুলো মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য আমি থাকবো না নিশ্চয়ই।”
তাকরিম রেইন কোট গায়ে জড়ালো, জিফার টা টেনে উপরে তুলতে তুলতে বললো,
“আই নো আমি চাই বা না চাই তুই সারাজীবন থেকে যাবি, এই ছোট খাটো বিষয় গুলো তুই ছাড়া কেউ ভালো বুঝবে না।”
“হেয়ালি করছেন?”
“তোকে বোঝার চেষ্টা করছি।”
“বুঝে কি লাভ?আপনার অবুঝ মন অন্যকারো দ্বারে কড়া নাড়ে প্রতিদিন।”
“মনের দিকে তাকাস না, তাকে আমি ফানুশের মতো উড়িয়ে দিয়েছি, তার গন্তব্যে সে উড়ছে অভিরাম, আমার আলেকজান্দ্রা ছাড়া সে আর কারো সম্মুখে থমকাবে না।”
____________
হুশ ফিরেছে ত্রিজয়ের।সজ্ঞানে আসা মাত্রই চতুর্থ বারের মতো চমকালো ছেলেটা।দ্রুত ফোন করলো ইভানকে।প্রায় বিশ মিনিটের মধ্যে এসে হাজির হলো ইভান।রক্তাক্ত ঘরের ভেতর পা রাখতেই শিরদাঁড়া শক্ত হয়ে এলো তার।দুই ঠোঁট হা করে তাকালো কাউচের উপর বসে থাকা ত্রিজয়ের দিকে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর,ইভানের চোখের দিকে দৃষ্টিপাত করলো ত্রিজয়,ভ্রু বাঁকিয়ে চাপা রাগান্বিত কন্ঠে বললো,
“উজবুকের মতো তাকিয়ে কেনো আছো?”
ইভান থতমত খেলো, হাত দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বললো,
“স্যার এই খুনটাও কি অজান্তেই করেছেন?”
“তোমার কি মনে হয়?”
ইভান ভোতা মুখে তাকালো, মনে মনে আওড়ালো,
“সালা তোর কি আমাকে বলদ মনে হয়?নিজের পায়ে হেটে, নিজের বাড়িতে এনে চার চারটে খুন করার পর বলছিস ঘুমের ঘোরে করেছিস?”
ইভানের কাছ থেকে উত্তর না পেয়ে মেজাজ দেখালো ত্রিজয়,
“হা করে তাকিয়ে না থেকে লাশটার ব্যাবস্থা কর কুইক।”
ইভান নড়েচড়ে উঠলো, বললো,
“স্যার আমাকে একটা কথা বলুন তো,এই পর্যন্ত যে চারটে মেয়েকে খুন করেছেন,তার মধ্যে একজনকেও কি চেনেন আপনি? ”
“বাপের জন্মেও দেখি নি।”
ত্রিজয়ের উত্তর শুনে আবারো ভড়কালো ইভান,বললো,
“না চিনেই খুন গুলো কীভাবে করলেন?কোথায় খুঁজে পেলেন মেয়েগুলোকে?”
“তুমি কি আমাকে আসামী মনে করেছো ইভান?উকিলের মতো কীসের এতো জিজ্ঞাসাবাদ করছো?”
“সরি স্যার আসলে,,,, ”
“আসল নকল পরে ভাবো, আগে বলো লাশটাকে কি করবে?”
“কি করবো আর? আগের গুলো যা করেছি এটাকেও তাই করবো।”
ইভানের উত্তরে নিশ্চিন্ত হলো ত্রিজয়,পকেট থেকে লাইটার বের করে সিগারেট ধরালো, কয়েকটা একশো টাকার নোট ইভানের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,
“এটা তোমার বখশিশ।কাজটা শেষ করে বাড়িতে চলে যেও। আমি আসছি।”
টাকাগুলো হাতে নিয়ে গুনলো ইভান,দাঁতে দাঁত চেপে ডাকলো ত্রিজয়কে,
“স্যার।”
ত্রিজয় পেছনে ঘুরে দাড়ালো, তাকালো জিজ্ঞাসা বোধক দৃষ্টিতে, ইভান দ্রুত কন্ঠে বললো,
“স্যার এখানে তো আট টা একশো টাকার নোট।”
“তো?” ভ্রু নাচালো ত্রিজয়।”
ইভান আমতা আমতা করে বললো,
“এক হাজার টাকা পুরো দিলে কি ক্ষতি হতো স্যার?”
“আজকে সারাদিন আমার গাড়ি নিয়ে ঘুরেছো,পেট্রোল কি তোমার বাপের টাকায় কিনেছি?পেট্রোলের টাকা কেটে রেখেছি।”
ইভান ঠোঁট ফোলালো,দাঁতে দাঁত চেপে বিরবির করলো ,
“শালা কিপটের বাচ্চা, অভিশাপ দিলাম তোর টাকা ইঁদুরে কাটবে।”
তারপর বিরক্তিকর কন্ঠে অস্ফুটে শব্দ করলো,
“ধ্যাৎ।”
_________________
নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে তাকরিম বাইক চালাচ্ছে। চারপাশে ঝিরঝির বৃষ্টি, তার পরনে কালো রেইন কোট। বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ছে রেইন কোটের গা বেয়ে। কিছুক্ষণ পরপর রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোয় আলোকিত হচ্ছে তার ভেজা শরীর।
ভালো করে তাকালে বোঝা যায়, রেইন কোটের ভাঁজ বেয়ে গড়িয়ে পড়া তরল কোন বৃষ্টির পানি নয়,বরং টকটকে লাল রক্ত।যার প্রতিটি ফোঁটা মাটিতে পড়েই ভেসে যাচ্ছে । শহরের স্নিগ্ধ বৃষ্টির রাতের পিচঢালা রাস্তায় চাপা পরে যাচ্ছে রক্তাক্ত রহস্য।
হটাৎ করেই নিস্তব্ধতার বুক চিরে ভেসে এলো কারো আত্মচিৎকার,
“আয়ায়ায়ায়ায়ায়ায়ায়ায়া”
ঘটনার আকস্মিকতায় বাইকের ব্রেক চাপলো তাকরিম,বেলেন্স হারিয়ে উল্টে পাল্টে গিয়ে পড়লো পাকা রাস্তার উপর , ছোটখাটো এক্সিডেন্টে তেমন কোনো ক্ষতি না হলেও হাত পা ছিলে গিয়েছে,কপালের একটা অংশ কেটে গিয়েছে হালকা।
সেদিকে অতো মনযোগ দেওয়ার সময় পেলো না তাকরিম,ল্যাম্পপোস্টের আলোর গতি ধরে তাকালো সামনের দিকে,রাস্তার মধ্যে গুটিশুটি মেরে বসে থাকা এক বুড়িকে দেখেই কপালে ভাজ পড়লো তার।দ্রুত ছুটে গেল বুড়ির কাছে।মূলত এই বুড়িকে বাঁচানোর জন্যই বাইকের ব্রেক চেপেছে তাকরিম,জানে বাঁচাতে পারলেও বেশ আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে বুড়ি,কুচকানো চামড়া থেকে রক্ত বেড় হচ্ছে খুব।তাকরিমের মায়া হলো,জড়তা সংকোচ দূরে হাটিয়ে কোলে তুলে নিলো বৃদ্ধাকে,কৌতুহলি কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“কে আপনি?এই বৃদ্ধা বয়সে ঝড় বৃষ্টির রাতে বাইরে কেনো বেড়িয়েছেন?”
বৃদ্ধা যন্ত্রণায় কুকিয়ে উঠলো,আহত কন্ঠে বললো,
“ফ্লোরেন্সা, ফ্লোরেন্সা আমি।”
________
কেটে গেছে গোটা একদিন
সকাল সকাল ব্রেকফাস্ট শেষ করে নিজের ঘরে চলে গিয়েছে ত্রিজয়।
ত্রিজয় চলে যাওয়ার পরপরই পা গুনে গুনে ডাইনিং টেবিলে এসে বসেছে নিস্পা।
প্রতিদিন একই নিয়মে খাবার খায় নিস্পা,ত্রিজয় খাওয়া শেষ করে,নিস্পার খাবার টেবিলে রেখে যায় চুপচাপ, তারপর নিস্পা এসে খাবার খেয়ে নিজের ঘরে চলে যায় নিঃশব্দে।খাবারের বিষয় নিয়ে অতো বেশি মাথা ঘামায় না নিস্পা।মনে করে হয়তো ত্রিজয় বাইরে থেকে খাবার কিনে নিয়ে আসে প্রতিদিন।
কিন্তু আজ নাস্তায় ভিন্নতা অনুভব করলো নিস্পা।প্লেট থেকে খাবার তুলে মুখে তুলতেই কুচকে এলো কপাল,পেট মুচড়ে বোমি আসতে নিলেই হাতরে একটি গ্লাস তুলে নিলো দ্রুত।পানি ভেবে গ্লাস মুখে দিতেই ওয়াক ওয়াক শুরু করলো নিস্পা।
নিস্পার বোমির শব্দ পেয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে এলো ত্রিজয়,মুখে হাত চেপে ধরে ওয়াক ওয়াক করেই যাচ্ছে নিস্পা, তবে খালি পেট হওয়াতে বোমি হচ্ছে না একটুও।
নিস্পার এমন অবস্থা দেখে ভড়কালো ত্রিজয়,সন্দিহান কন্ঠে বললো,
“এই তুই বোমি করছিস কেনো?”
পরপরই একটু উত্তেজিত কন্ঠে বললো,
” জাস্ট বোন মনে করে দুটো চুমু খেলাম,আর বাবা হয়ে গেলাম?অসম্ভব! এই বাচ্চা আমার না।”
নিস্পা রাগে ক্ষোভে গজগজ করে উঠলো, দাঁতে দাঁত চেপে তিরিক্ষি কন্ঠে বললো,
“অসভ্য লোক, করলার জুস খাওয়ালেই বাচ্চার বাপ হওয়া যায় না।”
চলবে,,,,,,

