#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:37
শেষ রাত। শহরের কোলাহল থেমে গেছে অনেক আগেই।আকাশে তখনও কিছু তারা, পূর্ব দিগন্তে একফালি ম্লান আলো জানান দিচ্ছে ভোর হয়ে আসছে। রাত তার অন্ধকার পর্দা গুটিয়ে নিচ্ছে ধীরে ধীরে।
ফাঁকা রাস্তাগুলোতে ছড়িয়ে আছে অদ্ভুত একাকিত্ব। অদূরে কুকুরের ডাক,আর গলির মোড়ে ভেসে আসা ট্যাক্সি কিংবা অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেেনের শব্দ জানান দেয় ক্লান্ত শহর ঘুমোয় নি এখনো, কেবল বিরতিতে গেছে।
নির্জন রাস্তায় গুটিকয়েক পা বাড়িয়ে কিছুদূর এগিয়ে গেলো প্রভা।মনে মনে ভয় পাচ্ছে অথচ থামাচ্ছে না পা।শীর্ণ চোখ হন্যে হয়ে খুজছে কাউকে।আরেকটু হাঁটলেই কাঙ্খিত স্থানে পৌছাতে পারবে সে।
সড়কবাতির ম্লান আলোয় আবছা ভেসে উঠেছে একটি বকুল গাছের অবয়ব,গাছটির ছায়া মাটির বুকে আঁকছে অপূর্ব নিসর্গ । সেই ছায়া তলেই বসে আছে এক ছায়ামানব,অস্পষ্ট মুখ,তবে তার চওড়া পিঠ আর পরনের সাদা পাঞ্জাবিটা দেখতে পেয়েই প্রভার চোখে জ্বলে উঠলো খুশির দীপ্তি , বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো অনাহুত আনন্দে ।দ্রুত ছুটে গিয়ে দাড়ালো সেই মানুষটার পেছনে।শান্ত আবেগি কন্ঠে বললো,
“আমি জানতাম আপনি এখানেই থাকবেন।”
প্রভার কন্ঠ পেয়ে বন্ধ চোখের ভারি পল্লব খুলে ফেললো তাকরিম।তবে পেছনে ফিরে তাকালো না।একইভাবে গাছের সাথে মাথাটা হেলান দিয়ে বসে রইলো নিঃশ্বব্দে।প্রভা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল,আস্তে করে জিজ্ঞেস করলো ,
“বাড়ি ফেরেননি কেন?”
তাকরিম উত্তর দিলো না,বরং ঠান্ডা কন্ঠে ছুড়ে দিলো প্রশ্ন,
“এসময়ে এখানে কেন এসেছিস তুই?”
প্রভা দুপা এগিয়ে গিয়ে দাড়ালো, ছোট্ট করে বললো,
“চিন্তা হচ্ছিলো।”
“আমাকে নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন নেই।”
“আমি অপ্রয়োজনীয় খাতায় পরে গেছি ভাইয়া,হয়তো এজন্যই আমার দ্বারা অপ্রয়োজনীয় কাজ গুলো হয়ে যায় না চাইতেও।”
তাকরিম কিছু বললো না।অনেক্ষন চুপ থাকার পর অস্পষ্ট উচ্চারণ করলো,
“বোস।”
প্রভা থ মেরে দাঁড়িয়ে রইলো, উসখুস করলো কিছুক্ষণ,তারপর চুপটি করে গিয়ে বসলো তাকরিমের পাশে।প্রভা পাশে বসতেই তাকরিম গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
“খাস নি কেন? আমি বলেছি আমার জন্য অপেক্ষা করে রাত পার করে দিতে?”
প্রভা অস্পষ্ট উত্তর দিলো,
“না।”
“তাহলে?”
“মাছে কাটা ছিলো বাছতে গিয়ে আপনার কথা মনে পড়ে গেলো।তাই আর খাই নি।”
“মাছ খাস নি অন্য কিছু দিয়ে খেতিস।”
“আপনার প্রিয় হাঁসের মাংস রান্না করেছিলাম নিজের হাতে,আপনি নেই তাই খেতে ইচ্ছে করলো না।”
“তাই বলে না খেয়ে থাকবি?অসুস্থ হয়ে গেলে কি করবি?”
“আপনিও তো না খেয়ে আছেন।”
তাকরিম মুখটা চুপসে ফেললো,বিরস কন্ঠে বললো,
“আমার পেট ভরা।”
“কিসে?যন্ত্রণায়? ” প্রশ্ন করে নিজেই উত্তর দিলো প্রভা।
তাকরমিন ম্লান কন্ঠে বললো,
“ব্যার্থতায়।”
তারপর অনেক্ষন কাটলো নিরবতায়, তাকরিম তার ভরাট কন্ঠের মিলন ঘটালো পুনরায়,
“আলেকজান্দ্রা আমায় ভালো কেন বাসতে পারলো না প্রভা?”
প্রভা ধীর কন্ঠে বললো,
“এই প্রশ্নের উত্তর নিয়তি যানে।”
“নিয়তি বড় নিষ্ঠুর প্রভা,নিয়তি আমার সাথে আবারও প্রতারণা করলো।”
“আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না ভাইয়া।”
তাকরিম বড় করে শ্বাস টানলো,ভরাট কন্ঠে বললো,
“প্রিন্স জোসেপ ফিরে এসেছে প্রভা।”
তাকরিমের মুখে প্রিন্স জোসেফের নাম শুনতেই চোখ মুখ বিকৃত করলো প্রভা,নিজের অজান্তেই খামচে ধরলো মাটির উপর গজিয়ে উঠা ছোট ছোট ঘাস।চাপা স্বরে বললো,
“কে সে?”
তাকরিম ভেঙে ভেঙে বললো,
“ত্রিজয়, এডভোকেট ত্রিজয় তেজই হলো ব্রিটিশ পুত্র প্রিন্স জোসেফ।”
“কীভাবে বুঝলেন?”
“ওর বুকের উপর একটা ক্ষত চিহ্ন দেখে।”
“মানে?”
“আমি যখন ফ্লোরেন্সাকে আনতে গিয়েছেলাম তখন ফ্লোরেন্সা ওই প্রিন্স কে একটা ছুড়ি দিয়ে আঘাত করেছিলো বুকের ওই খানটাতেই।এখনো সেটা চিহ্ন হয়ে রয়ে গিয়েছে।”
“যদি আপনার আন্দাজ ভুল হয়?”
“ভুল হয়নি প্রভা,আমি শিউর এই ত্রিজয়ই প্রিন্স জোসেফ। কারণ ওর বৈশিষ্ঠ্য এখনো সেম,খুব বিচক্ষণ,যে কোন কাজ শক্তি দিয়ে না করে বুদ্ধি দিয়ে করে।”
প্রভার চোখে মুখে একটা অস্পষ্ট ক্রোধ অথচ খুব সাবধানে চেপে গেলো বিষয় টা, নরমাল টোনে জিজ্ঞেস করলো ,
“আমি যে সুফি সেটা কি করে বুঝলেন?”
“তোর ব্যাবহারে আন্দাজ করে নিয়েছি।”
“যেমন?”
“যেমন, এই যে আমার জন্য না খেয়ে বসে থাকা,আমার যত্ন করা,আমার ছোট্ট কোন সমস্যায় অস্থির হয়ে যাওয়া,আর সব শেষে তোর আকুল কন্ঠে ডাকা তাকরিম ভাই ডাক,এভাবে সুফি ছাড়া আমাকে কেউ ডাকে নি, কেউ যত্ন নেয় নি।”
“এক মুখে এতগুলো গুন বললেন অথচ ভালোবাসার কথা বলতে পারলেন না।”
“ভালোবাসা স্বার্থপর প্রভা,তোর মতো স্বার্থ ত্যাগী সরল মেয়ের জন্য নয়।”
প্রভা আর কিছু বললো।তাকরিমকে প্রশ্ন করলে হাজারটা ধারালো উত্তর ছুড়ে দেয় তার দিকে,যেই উত্তরের প্রতিটি শব্দ সুচের মতো গেথে যায় তার কলিজায়।
ভোরের আলো ফুটে গিয়েছে।চারপাশের আবছা অন্ধকার কেটে গিয়ে আকাশ স্বচ্ছ হয়েছে কিছুক্ষণ হলো।তাকরিম নিরবতা ভাঙলো তখনি,
“আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দে তো।”
“কি?” অস্ফুটে বললো প্রভা।
তাকরিম কৌতুহলি কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“দু মাস আগে মাটি খোড়ার সময় একটা কঙ্কালের হাতে আলেকজান্দ্রা খচিত আংটিটা পেয়েছিলাম আমি।আর ওই আংটি টা স্পর্শ করার পরেই সবকিছু মনে পড়েছে আমার।কিন্তু তুই তো আমার আগে থেকেই আমাদের অতীত সম্পর্কে জানতি,তোর কীভাবে মনে আছে সব?”
প্রভা নিস্পৃহ হাসলো, কোমল হাতে তুলে নিলো কয়েকটা বকুল ফুল, তারপর হাতটা এগিয়ে নিয়ে রাখলো তাকরিমের চোখের সামনে,তাকরিম কপাল কুচকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকাতেই রহস্যময়ী কন্ঠে বললো,
“আমার সবকিছু মনে থাকার কারণ এই বকুল গাছ তাকরিম ভাই।”
তাকরিম ভ্রু কুচকালো, প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো প্রভার দিকে,প্রভা মুচকি হাসলো,কন্ঠ খাদে নামিয়ে বললো,
“আপনার মনে আছে তাকরিম ভাই,আপনি যেদিন ফ্লোরেন্সাকে ফিরিয়ে আনার জন্য ব্রিটিশদের মহলে গিয়েছিলেন সেদিন আমাকে একটা দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন।”
তাকরিমের মনে পড়লো না।অস্ফুটে জিজ্ঞেস করলো,
“কি দায়িত্ব?”
প্রভা মাথা তুলে উপরের দিকে তাকালো, সম্মোহনী কন্ঠে বললো,
“এই বকুল গাছের দায়িত্ব তাকরিম ভাই।”
“সেদিন আপনি যাওয়ার সময় এই বকুল গাছের চারাটা আমার হাতে দিয়ে বলেছিলেন গাছটার যত্ন করতে,ফ্লোরেন্সা এসে যেন ফুল কুড়োতে পারে,আমি সেদিন থেকে যত্ন করছি গাছটার, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমি আমার দায়িত্ব অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি,আমি আমার মৃত্যু দিয়ে এই গাছটাকে আগলে রেখেছি তাকরিম ভাই।”
“তুই বলতে চাইছিস এটা সেই গাছ? মানে পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত এটা টিকে রয়েছে?”
“হ্যাঁ,যেদিন আপনি ফ্লোরেন্সার নামে কবুল পড়েছেন সেদিন সেই দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য আমার হয় নি, আমি এই গাছের কাছে এসে আত্মহত্যা করেছিলাম।”
প্রভার কথায় তাকরিম এবার ভিষণ পর্যায়ে অবাক হলো,বিস্ময়ে ফাঁক হলো তার দুই ঠোঁট।কণ্ঠনালী হতে বেড় হলো না দ্বিতীয় কোন শব্দ।প্রভা নরম কন্ঠে বলতেই লাগলো,
“সেদিন মরে গিয়ে আমি বাঁচিয়ে নিয়েছিলাম আপনার দেওয়া বকুল গাছ,এই গাছের নিচে আত্মহত্যার কারণে এই গাছটাকে ভয় পেতো সবাই,আর তার জন্যই এতো বছরেও গাছটি কাটার সাহস করে নি কেউ।তার পঞ্চাশ বছর পর জন্ম হইলো আমার,বুঝ হইলো জ্ঞান হইলো পার হইলো দশ বছর।আমি তখন কিশোরী কন্যা,এই বকুল গাছের প্রতি আমার একটা বিশেষ আকর্ষণ টের পেয়েও অবজ্ঞা করেছিলাম আমি,কারণ আমি বুঝতাম না এই আকর্ষণের কারণ।
আমার বাবা তখন নতুন বিল্ডিং এর কাজ করার জন্য জমি কেনার তোড়জোড় করছিলো, আমি বললাম এই জায়গাটার কথা, এখানে বিল্ডিং করার কথা বলতেই বাবা ঠা মানা করে দিলেন।আমি জানতে চাইলে তিনি বললেন এই গাছটা নাকি আমার কোন ফুফিমা রোপণ করেছেন, এবং গাছটার প্রতি তার এতো বেশি ভালোবাসা ছিলো যে, গাছটার নিচেই মৃত্যুবরন করেছেন তিনি।তাই আমার বাবা এই গাছটা কাটতে পারবে না।
বাবার মুখে সেদিন এই ঘটনা শোনার পর আমি এটা নিয়েই ভাবতে শুরু করি,রাত দিন চব্বিশ ঘণ্টা আমার ভাবনা জুড়ে ছিলো এই বকুল গাছের ইতিহাস।এমনি এক রাতে গাছটার কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ি আমি,আর সেই ঘুমটাই ছিলো প্রভার শেষ ঘুম, কারণ আমি যখন জেগে উঠেছিলাম তখন সম্পূর্ণ প্রভাটাই বদলে গিয়েছিলো,প্রভার মধ্যে ঘাটি গেড়েছিলো সুফির অস্তিত্ব। ”
“তার মানে ছোট থেকেই তুই জানতি তুই শুফি,আর তখন থেকেই আমার অপেক্ষায় ছিলি?”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু তোর আত্মহত্যার সীদ্ধান্তটা বাজে ছিলো, এবার এমন কোন কাজ করতে যেন না শুনি।”
“কি করতাম বলুন ফ্লোরেন্সা আপনার নামে কবুল পড়বে সহ্য হতো না আমার।”
“বেঁচে থাকলে শুনতে হতো না,মৃত্যুর এক ভয়ংকর স্বাধ গ্রহণ করতে হতো, এক হিসেবে বেঁচে গিয়েছিস।”
“মানে?”
“মানে সেদিন আমাদের কবুল পড়া হয় নি প্রভা,নিয়তি তার আগেই সময় থামিয়ে দিয়েছিলো,বিয়ের আনন্দমুখর সময়টুকু রাঙা হয়েছিলো নীল রঙে।”
প্রভা ম্লান হাসলো এবারে,ক্ষীন কন্ঠে বললো,
“হয়তো নিয়তি মিলন চায় নি তাকরিম ভাই।”
“আমার মনে হয় নিয়তি চেয়েছিলো আর চেয়েছিলাম বলেই আরেকটি জন্ম দিয়েছে, সুযোগ দিয়েছে আরেকবার।”
“তহলে?প্রথমেই কেন জয় করতে পারলেন না ফ্লোরেন্সাকে?”
“হয়তো কেউ চায়নি,এমন কেউ,আমার আর ফ্লোরেন্সার মিলনে যার বিরাট বড় ক্ষতি হয়ে যেত।”
“এমন তো একজনই ছিলো, আর সেটা আমি।”
“উঁহু তুই ছাড়াও আরো কয়েকজন আছে।”
প্রভা অবাক হলো, বিস্মিত কন্ঠে বললো,
“আরো কয়েকজন?”
“হ্যাঁ।যে ফ্লোরেন্সাকে ভালোবাসতো অথবা যে আমাকে ভালোবাসতো।”
“আপনাকে ভালোবাসার মতো অভাগী আরো কেউ ছিলো জানতাম নাতো।”
“ছিলো আরো একজন।”
“কে সে?এবারেও কি আপনার ভালোবাসার টানে জন্মেছে সে?”
“হতে পারে।” তাকরিম আর কিছু বললো না,উঠে দাড়ালো পাঞ্জাবি ঠিক করে।
প্রভা উঠলো না, সেথায় বসে রইলো আরো কিছুক্ষণ।তাকরিম দাঁড়িয়ে থেকে তাকিয়ে রইলো পূর্ব আকাশের নরম আলোর লাল সূর্যের দিকে।তার দুহাত পেছনে আড়াআড়ি করে রাখা।প্রভা ঠায় তাকিয়ে রইলো সেই হাতের দিকে,কিছু একটা ভেবেই ঝুপ করে ছেড়ে দিলো চোখের পানি, ভেজা কন্ঠে বললো,
“আমি সৃষ্টি থেকে অভাগী তাকরিম ভাই।এই অভাগীকে দয়া করে একটু ভালোবাসুন না।”
তাকরিম শুনলো অথচ উত্তর দিলো না, না শোনার ভান করে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো শক্ত হয়ে।প্রভা চোখের জল মোছার বৃথা চেষ্টা চালালো,দীর্ঘশ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করলো,
“আমার পরিচয় জানেন আপনি?”
তাকরিম গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর দিলো,
“তুই প্রভা, আমার বাবার বন্ধুর মেয়ে।”
“আরেকটি পরিচয় আছে আমার।”
তাকরিম এবারেও গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
“তুই সুফি, আমাদের বাড়ির,,,,,,,,, ”
কথাটুকু শেষ করতে পারলো না তাকরিম তার আগেই প্রভা ধরা কন্ঠে বললো,
“আমি আশ্রিতা ছিলাম না তাকরিম ভাই।আমাকে আশ্রিতা বানানো হয়েছে।ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে আমার অধিকার।”
তাকরিম ঘাড় ঘোরালো,চোখ ছোট ছোট করে তাকালো প্রভার দিকে,কৌতুহলি কন্ঠে বললো,
“মানে?”
“মানে হুজুর আব্দুল খালেকের মেয়ে ফাতেমা খাতুনের সন্তান ছিলাম আমি।”
তাকরিম বেশ অবাক হয় না, নির্লিপ্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“কোন হুজুর?যাকে অভিশপ্ত বটগাছের নিচে ব্রিটিশরা হত্যা করেছিলো?”
“হ্যাঁ।”
“আমি যতদুর জানি ওই হুজুরের সাথে তো আমাদের বংশের রক্তের কোন সম্পর্ক ছিলো না।”
“কিন্তু আমার ছিলো। ”
“কীভাবে?”
“কারণ আমি ফ্লোরেন্সার বোন ছিলাম।ফ্লোরেন্সার বাবা লতিফ খানের দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন আমার মা ফাতেমা।”
তাকরিম বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ,কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে তাকিয়ে রইলো প্রভার দিকে।এতো বড় সত্যি টা ঠিক হজম করতে পারলো না সে,ঝাজালো কন্ঠে বললো,
“অসম্ভব, চাচা তো চাচিকে অনেক ভালোবাসতো, তাহলে দ্বিতীয় বিয়ে কেন করবে?আর কেনই বা গোপন রাখবে?”
“কন্যা সন্তানের জন্য তাকরিম ভাই।উনি আমার আম্মার সাথে প্রতারণা করেছে,উনি একটা কন্যা সন্তান লাভের জন্য আমার আম্মাকে বিয়ে করেছিলো গোপনে।কিন্তু বিয়ে করার পরই ফ্লোরেন্সা তার মায়ের গর্ভে আসে, আর সুফি আসে ফাতেমার গর্ভে। সৌভাগ্যক্রমে দুজনেই কন্যা সন্তান হয়ে জন্ম নেয়।কিন্তু ভাগ্য দুজনের একরকম ছিলো না।
ব্রিটিশদের নিপীড়ন যখন সীমা লঙ্ঘন করেছিলো তখন ফাতেমা তার দুধের শিশুকে বুকে চেপে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে একটি আর্টিকেল লেখেন।সে বুঝতে পেরেছিলো তার আর্টিকেলের জন্য তার জীবন বিপদে পড়তে চলেছে খুব তাড়াতাড়ি , তাই সে লতিফ খানের কাছে ছুটে গিয়েছিল।তার সন্তানের বাবাকে সন্তানের দায়িত্ব নিতে বলেছিল।
আর ঠিক তখনি বেড়িয়ে এসেছিলো স্বার্থপর নিষ্ঠুর পিতার আসল রুপ।তিনি সরাসরি নিজের সন্তানকে অস্বীকার করেছিলেন।ব্রিটিশ দের সাথে দ্বন্দে জড়ানোর ভয়ে ছেড়ে দিয়েছিলেন নিজের স্ত্রী সন্তানের হাত।ফাতেমা তখন দিশেহারা হয়ে পরেছিল,একদিকে ব্রিটিশ সৈন্যরা হন্যে হয়ে খুঁজছে তাকে আরেক দিকে নিজের দুধের সন্তানকে বাঁচানোর চেষ্টায় পাগল প্রায় হয়ে গিয়েছিল সে।আবেশেষে তার স্বামীর বাড়িতে কাজ করতে যাওয়া বুয়ার কাছে সফে যান নিজের সন্তানের দায়িত্ব।বড় কষ্ট পেয়ে তড়ফাতে তড়ফাতে মরেছিলেন তিনি।অভাগী করে রেখে গিয়েছিলেন তার মেয়ে সুফিকে।”
তাকরিম দাঁড়ানো থেকে বসে পরলো আবার।প্রভার কথা শুনে ভেতরটা কেঁপে উঠেছে তার,মনের মধ্যে তৈরি হয়েছে অসংখ্য প্রশ্নের জট।নিজের কৌতুহল দমিয়ে রাখতে পারলো না তাকরিম, প্রশ্ন করলো ভরাট কন্ঠে,
“তার মানে তুই প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য একের পর এক খুন করে ওই বট গাছে ঝুলিয়ে রাখতি?”
তাকরিমের কথা শুনে প্রভা ঠোঁট টিপে হেসে ফেললো এবার,মিহি কন্ঠে বললো,
“জীবনে একটা পিপড়ে না মারা মেয়েকে সোজা এতোগুলো মানুষের খুনি বানিয়ে দিলেন তাকরিম ভাই?আপনি কি বোকা?”
তাকরিম ভ্যাবাচেকা খায়, হিসেব মিলিয়ে উঠতে পারে না সে,অস্পষ্ট বলে,
“সত্যি বলছিস?”
প্রভা উঠে দাড়ালো,ছোট্ট করে বললো,
“হ্যাঁ।”
তারপর চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই পেছনে ডাকলো তাকরিম,
“শোন।”
প্রভা ঘুরে তাকালো, জিজ্ঞেস করলো,
“কিছু বলবেন?”
” আমি আলেকজান্দ্রা খচিত আংটি টা কিন্তু ফ্লোরেন্সার আঙুলে পাই নি।”
“পঞ্চাশ বছরের পুরনো কঙ্কাল দেখে কীভাবে বুঝলেন হাতটা ফ্লোরেন্সার ছিলো না?”
তাকরিম ভাবুক কন্ঠে উত্তর দিলো,
“বুঝি নি, মনে হলো কেবল।”
______________
নিশ্ছিদ্র ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। অনু ফ্রেশ হয়ে এসে দাঁড়িয়েছে বারান্দায়। সকালের নরম রোদ শরীর ছুঁয়ে আলতো করে জড়িয়ে ধরেছে তাকে।
বারান্দা থেকে সরাসরি নিচের দিকে তাকালো অনু,তাকরিমদের বাড়ির বাঁ পাশটায় ছোট্ট একটি ফুলের বাগান,মালি খুব যত্ন করে পানি দিচ্ছে সেখানটায়।তবে অনুর খেয়াল সেদিকে নেই,বিস্মিত দৃষ্টিতে সে লক্ষ করে বাগানটাতে শুধুই বকুল গাছ রয়েছে। সদ্য গজানো কচি চারাগুলো থেকে শুরু করে বড় গাছগুলোর ফাকফোকরেও অন্য কোন ফুল গাছ দেখতে পেলো না অনু।
অনুর চোখে মুখে খেলে গেলো কৌতুহল।সে দ্রুত চলে গেলো নিচের দিকে।বাগানটাকে কাছ থেকে দেখতে চায় সে।
নিচে নেমে আশেপাশে তেমন কাউকেই দেখতে পেলো না অনু।তাতে অবশ্য মাথা ঘামালো না সে, এই বাড়ির কারো প্রতি বিন্দু মাত্র ইন্টারেস্ট নেই তার।
দ্রুত হেটে বাগানটার কাছে এসে দাড়ালো অনু।দেখতে পেলো সারিবদ্ধ অসংখ্য বকুল গাছ।কিছু গাছ ছোট, কিছু গাছ বড়।আবার কিছু গাছে ধরে আছে বকুল ফুল।মাটিতেও বিছিয়ে আছে অনেক গুলো পঁচা ফুল।
ফুল গুলো মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে অনুর মায়া হলো,এগিয়ে গিয়ে ঝুকলো কিছুটা, হাত বাড়িয়ে ফুল কুড়োতে যাবে পেছনে আতংকিত কন্ঠে ডাকলো মালি,
“আরে মেডাম, কি করতাছেন কি?ফুল কুড়ানোর অনুমতি কে দিলো আপনেরে?”
অনু বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা গুটিয়ে নিলো,চোখ কুচকে তাকালো মালির দিকে, তিরিক্ষি কন্ঠে বললো,
“আপনিই এই বাগানের মালি তাইতো?বাগানে কি আপনাকে কেবল পানি দেওয়ার জন্যই রেখেছে?এই যে কয়েকদিনের বাশি ফুলগুলো মাটিতে পরে নষ্ট হচ্ছে সেটা দেখতে পান নি?কে পরিস্কার করবে এসব?”
মালি চোখ উল্টে তাকালো,তারপর হাত বাড়িয়ে দেখালো একটা গাছের সাথে ঝুলন্ত নোটিশ বোর্ড,অনুর চেয়ে দ্বিগুণ কর্কষ কন্ঠে বললো,
“এই বাড়িতে আছেন অথচ এই নিয়ম যানেন না?ওই নোটিশ পইড়া লন।হেরপর আমার লগে মেজাজ দেখাইয়েন।এই ফুল ছুইলে এমপি সাহেব আমার হাতের কব্জা কাইটা ফালাইবো,প্রতি সপ্তায় সপ্তায় এমপি সাহেব নিজের হাতে এই ফুল পরিস্কার করে,এছাড়া আর কারো অনুমতি নাই।”
কথাটা বলে দাড়ালো না মালি, হনহন করে চলে গেলো কোথাও একটা।অথচ অনু দাঁড়িয়েই রইলো, তাজ্জব হয়ে তাকিয়ে রইলো নোটিশ বোর্ডের উপর,তার মধ্যেই পেছন থেকে ভেসে এলো এক পুরুষালি কন্ঠ,সে গড়গড় করে পড়ছে নোটিশ বোর্ডের লেখাটুকু,
” আলেকজান্দ্রা ব্যাতিত এই বাগানের ফুল স্পর্শ করা সমগ্র প্রানীকূলের জন্য নিষিদ্ধ।”
লেখেটুকু পড়ার পরপরই পুরুষালি কন্ঠটা বললো,
“আহ! কি ভালোবাসা।”
অনু কপাল কুচকালো, কন্ঠটা অচেনা, এমপি মশাইয়ের নয়।তবে কে?এমপি মশাই ছাড়া বাড়ির এদিকটায় তো কেউ আসে না।অনু সেকেন্ডের গতিতে ঘুরে তাকালো,বড় বড় চোখ মেলে তাকালো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষ মানুষের দিকে।
ব্রাশ করা সিলকি চুল,তামাটে ঠোঁট জুড়ে হাঁসির তোলপাড়,কালো কুচকুচে মোটা এক জোড়া ভ্রু,ধূসর রাঙা চোখের মনি,পড়নে ব্লু কালার একটা শার্ট,আর কালো জিন্সটা কালো ত্বকের সাথে পারফেক্ট লাগছে, নির্দিধায় বলা চলে লোকটা সুপুরুষ।
অনুকে তাকিয়ে থাকতে দেখে কণ্ঠনালীর মিলন ঘটালো লোকটা,
“কি মেয়ে?এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?প্রেমে টেমে পড়ে গেলে নাকি?”
অনু থতমত খেলো, তাকালো রাগান্বিত চাহনিতে, কর্কষ কন্ঠে বললো,
“ওই কাইল্লা বেটা চেহেরা দেখেছেন আয়নায়?আপনার কি করে মনে হলো আমি আপনার প্রেমে পড়বো?”
লোকটা ঠোঁট উল্টে প্রতিত্তোর করলো দ্রুত,
“কাইল্লা বেটা?নাইস নিক নেম।এজন্যই তোমাকে আমার এতো ভালো লাগে।বাই দ্যা ওয়ে চিনেছ আমায়?”
অনু নিগূঢ় দৃষ্টি তাকালো,ভাবুক কন্ঠে বললো,
“চেনা লাগছে, কোথায় দেখেছি মনে হচ্ছে।”
লোকটা মুচকি হাসলো, হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
“ইভান।আমি ইমতিয়াজ আহমেদ ইভান,পারসোনাল সেক্রেটারি অফ এডভোকেট ত্রিজয় তেজ।”
অনু কপাল কুচকালো,চাপা উত্তেজিত কন্ঠে বললো,
“আপনি?আপনি এখানে কেন এসেছেন?বাড়িতে ঢুকলেন কীভাবে ? এমপি মশাইয়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে নিশ্চয়ই?”
“এতো প্রশ্ন করো নাতো মেয়ে,আমি দেয়াল টপকে তারপর এসেছি, এতো কষ্ট করে লাইফ রিক্স নিয়ে ওই শালা এমপির জন্য আসি নি, এসেছি অন্য কারণে।”
অনু চোখ পাকিয়ে তাকালো,সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“কি কারণে?”
ইভান ঠোঁট টিপে এক হাতে মাথা চুলকালো,দুপা এগিয়ে এসে দাঁড়ালো অনুর আরেকটু কাছে,মোহিত কন্ঠে বললো,
“কাল রাতে ঘুমোতে পারি নি।”
অনু থতমত খেলো, থমথমে কন্ঠে অস্পষ্ট শব্দ করলো,
“তো?”
ইভান হাতটা উঁচু করে ঘড়িতে সময় দেখলো,মোলায়েম কন্ঠে বললো,
“তাই ভোর পাঁচটের সময় বাড়ির পেছনে এসে দাঁড়িয়ে ছিলাম।”
অনু বিরক্ত হলো ইভানের হেয়ালিপনায়,বিরক্তি কন্ঠে বললো,
“তো আমি কি করতে পারি?আমাকে এসব বলতে আসেন নি নিশ্চয়ই?”
ইভান ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করলো, নাজুক কন্ঠে বললো,
“উঁহু মেয়ে বলতে আসি নি, দেখতে এসেছি, একটা রুদ্রাণী মুখ দেখতে এসেছি এক নজর।”
অনু ফোসফোস করে উঠলো, তিক্ত কন্ঠে বললো,
“ভাই আল্লাহর ওয়াস্তে মাপ করেন,আপনি ভুল ঠিকানায় চলে এসেছেন,এক ঝামেলায় এমনিতেই জীবন শেষ, আপনি কোত্থেকে টপকে পড়লেন।একজন তো চান্দে পাঠিয়েছে, আপনি নিশ্চয়ই সোজা জাহান্নামের রাস্তা দেখাতে এসেছেন?”
পরপরই বিরবির করে আওড়ালো,
“শালা বেডা মানুষ জীবনে যেদিন এসেছে সেদিন থেকে শনির দশা লেগেই আছে।”
ইভান চোখ বাকিয়ে তাকালো অনুর রাগান্বিত কুচকানো মুখের দিকে,মিটিমিটি হাসলো ঠোঁট চেপে,তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
“তুমি চাইলে আমি তোমাকে এখান থেকে পালাতে সাহায্য করতে পারি।”
অনু চেহারায় গম্ভীর্য টানলো,হতাশ কন্ঠে বললো,
“দু দুবার পালিয়েছি দুবারই ওই খাটাশ এমপির কাছে ধরা পড়েছি, আর পালানো ইচ্ছা আমার নেই।”
“এবার ধরা পড়বে না প্রমিজ। আমি দায়িত্ব নিচ্ছি।”
অনু চোখ উল্টে তাকালো ইভানের দিকে,সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“আপনি আমাকে হেল্প করার জন্য এসেছেন? তাও লাইফ রিক্স নিয়ে?এমপির কাছে ধরা পড়লে কি হবে জানেন?সোজা উপরে পাঠিয়ে দিবে।কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না আপনি আমাকে সাহায্য করতে এলেন কোন উদ্দেশ্যে? ”
ইভান থতমত খেলো,মুখ পিচলে ভালোবাসার কথা বলতে চেয়েও থেমে গেলো, কাচুমাচু করলো যুতসই উত্তর খোঁজার জন্য।
অথচ কোন উত্তর দেওয়ার আগেই, অনু কিছু একটা ভেবে চট করে বললো,
“নিস্পা পাঠিয়েছে আপনাকে?আমাকে এখান থেকে নিয়ে যেতে?”
ইভান হাপ ছেড়ে বাঁচলো,বিরবির করে বললো,
“কিরে মা তুই তো দেখি এক লাইন বেশি বুঝোছ,তোরে বিয়ে করলে তো জীবনের অর্ধেক সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।”
পরপরই জ্বিভ কাটলো ইভান,নিজের গালে নিজে মৃদু থাপ্পড় দিয়ে বললো,
“ছেঃ ইভান।স্যারের সাথে থাকতে থাকতে দেখি তোর মাথাটাও খারাপ হয়ে যাচ্ছে, যাকে বউ বানানোর কথা ভাবছিস তাকে মা ডাকিছিস কোন আক্কেলে?”
মনে মনে সাত কাহন ভেবে ফোস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো ইভান,তাড়াহুড়ো কন্ঠে বললো,
“ঠিক, একদম ঠিক বলেছ,নিস্পা ম্যাম পাঠিয়েছে আমাকে, চলো দ্রুত পালাতে হবে।”
কথাটা বলেই ইভান এগিয়ে দিলো নিজের হাত, অনু কিছুটা ইতস্তত করে বাড়িয়ে দিলো তার হাত। তার উষ্ণ আঙুল ছুঁয়ে গেলো ইভানের হাতের ঠান্ডা চামড়া।
ঠিক সেই মুহূর্তে কিছু একটা হলো। ছন্দপতন হলো সময়ের। চারপাশের জগতটা হঠাৎ উল্টে যেতে শুরু করল, পৃথিবী ঘুরে গেলো বিপরীত দিকে। অনুর কানে ভেসে এলো মহাকালের চাকার ঘূর্ণির গর্জন, যেন প্রতিটি শব্দ অতীতের দরজা খুলে দিচ্ছে একে একে।
স্মৃতির পাতা নিমেষেই ঝাপসা হয়ে উঠল। অনুর চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল তাকরিমের মুখ।সেই চেনা মুখ, সেই বাড়িয়ে দেওয়া হাত, আর চোখের সেই সাহসী দীপ্তি অনুকে টেনে নিয়ে গেলো অন্ধকার অতীতের গভীরে।
যেখানে তাকরিম তাকে ডাকছে আর বলছে,
“সাবধানে, সাবধানে নাবহা।আমাকে ফিরে আসতে হলো নাবহা, তোমাকে ফেলে রেখে যাওয়া হল না।”
তারপর শোনা গেলো আবার,
“মুক্ত হবে,তুমিও মুক্ত হবে নাবহা,তোমাকে সাথে নিয়েই ফিরবো আমি।”
অনুর চোখ থেকে গড়িয়ে পড়লো জল,ভেজা কন্ঠে বিরবির করলো,
“আমি ফিরবো ভিনদেশী পুরুষ ,মুক্ত হবো আপনার সাথে।আমি মুক্ত হবো,মুক্ত হবো।”
ইভান তাড়া দেখিয়ে, ভরসা দিয়ে বললো,
“অবশ্যই তুমি মুক্ত হবো,তোমাকে মুক্ত করার দায়িত্ব আমার।তুমি কেবল আমার সাথে চল।”
ইভান টান বসালো অনুর হাতে,যেতে চাইলো দ্রুত,অথচ অনু পিলারের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো, নড়লো না এক ইঞ্চি।
ইভান কপাল কুচকালো,ভরাট কন্ঠে বললো,
“কি হলো চলো।”
অনু এবারেও নড়লো না, নিস্প্রভ কন্ঠে বললো,
“হাত ছেড়ে দিন আমার।”
ইভান থমকে দাড়ালো।হতহ্বিবল হয়ে তাকালো অনুর দিকে, অস্ফুটে বললো,
“মানে?”
“মানে আমি যাবো না,উনাকে ছেড়ে আমি যাবো না।কোত্থাও যাবো না, কোত্থাও না।”
ইভান কিছু বুঝে উঠার আগেই অনু ঝাড়া মেরে ছাড়িয়ে নিলো নিজের হাত,ইভানকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দৌড়াতে শুরু করলো বাড়ির সামনের দিকে, দৌড়াতে দৌড়াতে বিরবির করে বললো,
” আপনাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাবো না,মৃত্যুর পর মৃত্যু নিশ্চুপে সঙ্গি হবো আপনার।”
___________
আজ তিন দিন হলো হাসপাতালের গন্ডিতে চরকির মতো ঘুরছে ত্রিজয়।জান্নাতকে আজ আইসিউ থেকে বেড় করার কথা ছিলো কিন্তু ডক্টর জানিয়েছে জান্নাতের শরীরের কন্ডিশন এখনো নিয়ন্ত্রণে আসে নি, তাই আরো একদিন আইসিউতে রাখতে হবে।
তবে সম্পূর্ণ ভাবে আশা দিয়েছেন কালকের মধ্যেই বেডে শিফট করা হবে তাকে।
এদিকে ডক্টরের সাথে ডিসকাস করেছে ত্রিজয়।নিস্পার চোখের অপারেশনের ব্যাপারে সমস্ত ফর্মালিটি পূরন করে ফেলেছে রাতের মধ্যেই।
ত্রিজয়ের হাতে নাস্তার প্যাকেট। চোখে মুখে ঘুমের ঘোর, অথচ পায়ের গতিতে ব্যাস্ততা।কালো রঙের শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, কপালে জমাট বাধা ঘাম চুইয়ে পড়ছে দু দিক থেকে।
রাতে পরনের টাউজার টাও পাল্টায় নি,চুল গুলো উস্কখুস্ক এলোমেলো,হাত ঘড়িটাও লাগিয়েছে উল্টো, সময় দেখতে নিয়েই বিরক্তিতে কুচকে আসছে কপাল।
সকাল নয়টা বেজে গিয়েছে, নিস্পা এখনো কিছু খায় নি, এই ভাবনায় তার প্রাত্যহিক রুটিনে হয়েছে ছন্দপতন, আজ প্রথমবার অনিয়ম হলো,ঘুম থেকে উঠে কফি খাওয়া তো দূর,খবরের কাগজটা কোথায় রেখেছে সেটাই ভুলে গিয়েছে ত্রিজয়,কোন রকম ফ্রেশ হয়ে দৌড়ে বেরিয়েছে বাড়ি থেকে, এমন এলোমেলো তো আগে কখনো ছিলো না সে,প্রাত্যহিক রুটিনে এমন গোলমাল তো কখনো লাগে নি তার,তবে আজ কি হলো? কথা গুলো ভাবতে ভাবতেই আনমনে স্মিথ হাসলো ত্রিজয়,মাথা চুলকে বিরবির করলো,
“কানার বাচ্চা তোর জন্য সব গোলমেলে হয়ে গেলো।”
ত্রিজয় লিফটে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো, বুকের উপর দু হাত রেখে চোখ বন্ধ করলো ওমনি,নিস্পার শুভ্র নির্মল মুখটা চোখের পাতায় ভেসে উঠতেই হৃদয়ের গভীরে কেউ সুর ধরলো, বাধলো প্রেমের গান,
“কি যাদু করেছ বলনা,,,,,,
ঘরে আর থাকা যে হলো না,,,,,,”
__________
নিস্পার কেবিনে আজ আবারও এসেছে সত্যবীনা পাখি,নিস্পা স্পষ্ট শুনেছে পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ।শব্দ শুনেই ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো নিস্পা,তার মাঝেই কানে ভেসে এলো সত্যবীনা পাখির কন্ঠ,
“কিলো কন্যা?এতো জ্বালাও কেন মোরে?”
নিস্পার চোখ চিকচিক করে উঠলো, সত্যবীনা পাখির উপস্থিতি বুঝতে পেরে উত্তেজিত কন্ঠে বললো,
“তুমি এসেছ সত্যবীনা পাখি?”
“আইছি লো কন্যা আইছি।তুমি এতোবার স্মরণ করছো না আইয়া উপায় আছে কও?কি জন্য ডাকছো তাড়াতাড়ি কও কন্যা।আমার মেলা তাড়া আছে।”
নিস্পা শুখনো ঢোক গিললো,অস্ফুটে বললো,
“আমার ভয় হচ্ছে পাখি,তুমি তো সব জানো, তাহলে নিশ্চয়ই জানো কবে আমার সময় ভ্রমণ হবে?দয়া করে বলো না সত্যবীনা পাখি,কবে আমার সময় ভ্রমণ হতে চলেছে?”
“তোমার সময় ভ্রমণ হওয়ার সময় আসন্ন কন্যা,নিজেকে প্রস্তুত কর,আগামী কালই তোমার সময় ভ্রমণ হবে।”
নিস্পা আঁতকে উঠল, আতংকে শুখিয়ে এলো গলবিল,ভয়াতুর কন্ঠে আওড়ালো,
“কালকেই?”
“হ লো কন্যা,তোমার সময় ভ্রমণ কালই হইবো,মহাকালের চাকা ঘুড়বো ঘূর্ণির মতো,তোমারে টাইনা নিয়ে যাইবো পঞ্চাশ বছর পেছনে।”
“কিন্তু কেন?মহাবিশ্বে এতো এতো মানুষ থাকতে আমিই কেন?আমাকেই কেন যেতে হবে মহাকালের গহ্বরে? ”
“কারণ তোমার জন্মদাগ লো কন্যা।।তোমার প্রথম দূর্ভাগ্য তুমি ফ্লোরেন্সার বংশে জন্মাইছো।আর দ্বিতীয় দূর্ভাগ্য তোমার পেটের জন্মদাগ এই চিহ্ন তোমার অস্তিত্ব বিলিন করছে কন্যা,তোমার ভাগ্য জুড়ে দিছে ফ্লোরেন্সার ভাগ্যের সাথে।”
নিস্পা অবাক হয়, বিস্ময়ে ঝুলে চোয়াল,বাকরুদ্ধকর কন্ঠে বলে,
“ফ্লোরেন্সা? কোন ফ্লোরেন্সা?আমার দাদি যেই ফ্লোরেন্সার গল্প শুনিয়েছিলো সেই ফ্লোরেন্সা?”
“হ লো কন্যা,সব জানতে পারবা আস্তে আস্তে।”
“তার মানে আমি যে প্রতিদিন দুঃস্বপ্ন দেখতাম?সেই অন্ধকারে বসে থাকা মেয়েটা? জ্বলন্ত সিগারেটের ছ্যাঁকার জ্বালায় চিৎকার করা মেয়েটা আমি না?ফ্লোরেন্সা?”
” তুমই ঠিক ধরছো কন্যা।তোমার স্বপ্নে আসা সেই মাইয়াই হইলো ফ্লোরেন্সা।”
“কিন্তু আমি কেন উনাকে স্বপ্ন দেখি?কেন উনার যন্ত্রণা উপলব্ধি করে আঁতকে উঠি রাতের পর রাত।”
“কারণ এই জন্মদাগ লো কন্যা ।নিয়তি এক অস্তিত্বের দুজন পৃথক মানুষ তৈরি করেছে।যাদের সময় ভিন্ন অথচ চাওয়া পাওয়া থাকবে এক।”
নিস্পা আবারও গোলকধাদায় পড়ে গেলো, পাগলের মতো খামচে ধরলো নিজের চুল,উন্মাদের মতো বললো,
“এক অস্তিত্বের পৃথক মানুষ? সেটা আবার কি?বুঝতে পারছি না কিচ্ছু বুঝতে পারছি না আমি, পাগল হয়ে যাচ্ছি আমি।”
“নিজেকে সামলাও কন্যা।আমার সময় শেষ, আমার যাইতে হইবো,তয় হুইনা রাহো, আর ডাইক্কো না মোরে,এইডাই আমাগো শেষ কথা।বিদায় কন্যা, বিদায়।”
নিস্পা ধড়ফড়িয়ে উঠলো,শেষ বারের মতো বললো,
“দাড়াও,দাড়াও সত্যবীনা পাখি,শুধু এই টুকু বলে যাও, সময় ভ্রমণ করার পর তুমি কি আসবে?আমার পথ পদর্শক হবে?বলে যাও, ও সত্যবীনা পাখি বলে যাও একটিবার।”
সত্যবীনা পাখি এবারেও খোলসা করলো না,নিস্পার প্রশ্নের এক জটিল উত্তর বললো,
“সত্য পাইবা, বীনা পাইবা।কিন্তু সত্যবীনার জবান পাইবা না কন্যা।”
**
সত্যবীনা পাখি উড়ে যাওয়া মাত্রই দরজা খুলে রুমে প্রবেশ করলো ত্রিজয়,নিস্পা তখনও বিরবির করছে,
“সত্য পাবো, বীনা পাবো,কিন্তু সত্যবীনার জবান পাবো না।”
ত্রিজয় দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকালো আশেপাশে, নাহ!কাউকেই তো দেখতে পেলো না,তাহলে এ কথা বলছে কার সাথে?
ত্রিজয় কৌতুহল দমিয়ে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করেই বসলো,
“পাগলের মতো একা একা কথা বলছিস কার সাথে?”
ত্রিজয়ের কন্ঠ শুনে ধ্যান ছুটলো নিস্পার,নড়েচড়ে বসলো নিজেকে সামলিয়ে।ত্রিজয় খাবারের প্যাকেট থেকে খাবার বের করতে করতে আবার বললো,
“কি হলো? বললি না কার সাথে কথা বলছিলি?”
নিস্পা এমনিতেই টেনশনে ফেটে যাচ্ছে, তার উপর ত্রিজয়ের করা প্রশ্নে না চাইতেও মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে তার,সে বিরক্ত কন্ঠে উত্তর দিলো,
“জ্বিনের সাথে।”
ত্রিজয় চোখ উল্টে তাকালো নিস্পার দিকে, তারপর বললো,
“বাহ!তোর নাগর দেখি এক একজন একেক রকমের ক্ষমতার অধিকারী।একজন এমপি, একজন ডাক্তার আর এখন দেখি জ্বিনও আছে।”
নিস্পার মেজাজ আরেকটু খারাপ হলো এবার, তিক্ত কন্ঠে বললো,
“ফালতু কথা বলবেন না তো।বিরক্ত লাগছে।”
“যেভাবে বলছিস যেনো আমি তোকে বিরক্ত করার জন্য বসে আছি। ”
“আপনি এই একটা জিনিসই ভালো পারেন,আমাকে বিরক্ত করা ছাড়া আর কিছু পারেন বলে তো মনে হয় না।”
“বউকে বিরক্তও করতে পারি আবার আদরও করতে পারি,বিরক্ত করার জন্য যদি বিরক্ত হয়ে যাস তবে বল আদর কিরে ফুসিয়ে দিবো।”
“ছিঃ,আপনার মতো লোকের আদর খাওয়ার থেকে মশার কামড় খাওয়া ভালো। ”
“মশা আর হাসবেন্ড একই প্রানী,দুটোই রাতের বেলা কামড়ায়।তার চেয়ে বরং আমাকে সুযোগ দিস,রক্ত টুকু বেঁচে যাবে।”
“মশা কামড়াতে আসলে যে থাপ্পড় খেয়ে চ্যাপ্টা হয়ে যায় সেটা নিশ্চয়ই জানেন?”
“বিড়ালের মতো খামচা খামচি করেই কুল পাবি না, থাপ্পড় তো দূর কি বাত।”
ত্রিজয়ের ঠোঁট কাটা কথায় জ্বলে উঠলো নিস্পার কান,রাগান্বিত কন্ঠে বললো,
“আপনি এতো নির্লজ্জ কেন?খোদা কি আপনাকে লজ্জা শরমের ছিটেফোঁটাও দেয় নি?”
“নির্লজ্জ? কোথায় নির্লজ্জ হলাম আমি?জাস্ট বোন করে শালীনতা বজায় রেখে একটা এডভাইস দিলাম আর ওমনি নির্লজ্জ বানিয়ে দিলি?”
“ছিঃ,এটা আপনার শালীনতা? আপনার শালীন কথা শুনলে তো লজ্জা লেজ গুটিয়ে পালাবে।”
“তাহলে তো বুঝতেই পেরেছিস আমার কথার কত পাওয়ার।সামান্য শালীন কথা শুনেই লজ্জা লেজ গুটিয়ে পালাবে, আর যদি অশালীন কথা শুনে তাহলে তো মনে হচ্ছে কাঁথা কম্বল নিয়ে পালাবে।”
“আপনার নিশ্চয়ই খেয়ে দেয়ে কাজ নেই তাইনা?তাই আমার পেছনে লাগার জন্য সাজ সকালে হাসপাতালে চলে এসেছেন।”
“ঠিক ধরেছিস, সাজ সকালে তোকে ব্যায়াম করানোর জন্য ছুটে এসেছি।সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে এক ঘন্টা ঝগড়া করাও একধরনের এক্সারসাইজ।যতই হোক আমার ওয়াইফ বলে কথা।”
“কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে আপনি আমাকে ওয়াইফ না ভেবে ওয়াইফাই ভাবছেন।দেখুন, আপনার সাথে সারাক্ষণ ঝগড়া এক্টিভ রাখার বিন্দু মাত্র ইচ্ছে আমার নেই।
” ওয়াইফ আর ওয়াইফাই সে দুটোও এক জিনিস , রাউটারের সিগন্যাল পেলে যখন ইচ্ছে তখনই কানেক্ট করা যায়।নো প্রবলেম।”
নিস্পা রাগে গজগজ করে উঠলো তিরিক্ষি কন্ঠে বললো,
“আল্লাহর দোহাই লাগে আমাকে একটু একা থাকতে দিন,আর একটা কথা বলে আমার মাথাটা খারাপ করবেন না।”
ত্রিজয় খাবারের প্লেট টা নিস্পার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,
“খেয়ে নে, একটা কথা বলেই চলে যাব।”
“যা বলার এখনি বলুন।আপনি গেলে তবেই আমি খাবো।”
ত্রিজয় ফোস করে নিঃশ্বাস ফেললো,চাপা বিরক্তি মিশ্রিত কন্ঠে বললো,
“নিজেকে প্রস্তুত কর,কাল তোর চোখের অপারেশন হবে।”
নিস্পা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“টাকা দিবে কার বাপে?”
নিস্পার প্রশ্নের ধরনে আরেকটু বিরক্ত হলো ত্রিজয়,দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
“তোর ভবিষ্যৎ চার বাচ্চার একমাত্র বাপে।”
নিস্পা ভ্রু উচালো,কর্কষ কন্ঠে বললো,
“হাই লেভের কঞ্জুস একটা, চোখের অপারেশনের নাম করে আমার কিডনি চালান করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছেন না তো?”
ত্রিজয় কটমট করে তাকালো, জবাবে বললো,
“আমাকে তো পাগলা কুত্তায় কামড়ায় নাই,তোর কিডনিতে হাত দেই আর তুই ওই ডাক্তার কিয়াইন্নারে দিয়ে আমার কলিজা ফুসফুস চালান করে দে।এমনিতেই তোর প্রেমিকের অভাব নাই, শালা সবকয়টাই আধ পাগল।”
চলবে,,,,,,,,,,,
পরবর্তী পার্টে নিস্পা কিন্তু চোখে দেখতে পাবে🫰
⭕গল্পটা সম্পূর্ণ কাল্পনিক বা রুপকথা । বাস্তবতার সাথে বিন্দুমাত্র মিল নেই।অযথা লজিক দেখিয়ে বিভ্রান্ত করবেন না আশা করি।⭕

