#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:50
(⭕81+ এলার্ট)
নিস্পাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছে ত্রিজয়।রাত তখন দুটো বেজে এসেছে। গভীর অন্ধকারে নিঃশ্বাস চেপে বসে আছে পৃথিবী।যদিও অন্ধকারে ভয় নেই নিস্পার,সারাটা জীবন যার অন্ধকারে কেঁটেছে তার আবার কিসের ভয়?তবে ত্রিজয় যেভাবে তার হাতটা মুঠোয় চেপে ধরে আছে মনে হচ্ছে এই অন্ধকারে মেয়েটাকে হারানোর ভয় মনে ফুসছে সে।
নিস্পা ততটা গ্রাহ্য করলো না,ত্রিজয়ের হাত ধরেই এগোলো সামনের দিকে।তাকরিমের গাড়ি করে মেইন রোড পর্যন্ত আসতে পাঁচ মিনিটের মতো সময় লেগেছে,বাড়িতে যেতে দু মিনিটের একটা সরু পথ হাটতে হবে।তবে সেই রাস্তায় পা বাড়ানোর আগে ত্রিজয় তার গ্যারেজের দিকে এগোলো।গাড়িতে একটা জরুরি ডকুমেন্টস রেখে এসেছিলো তখন, সেটা নেওয়ার জন্যই তারাহুরো করে সেদিকে পা বাড়িয়েছে।
নিস্পা তেমন প্রতিক্রিয়া দেখালো না,একটু আগের ঘটনায় বড্ড ক্লান্ত লাগছে এখন।একটা টু শব্দও করতে ইচ্ছে করছে না।গ্যারেজের হলদে বাল্বের আলোটা ঠিক চোখে এসে লাগছে,শুরু হয়েছে মাথাব্যথা। তবুও চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছে ত্রিজয়ের কির্তিকলাপ।
সেই তখন থেকে পাগলের মতো কিছু একটা খুজছে।পুরো গাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও জিনিসটা কিছুতেই পেলো না সে,চিন্তা আর নিজের প্রতি রাগে কপালের শিরা গুলো দপদপ করে উঠেছে তার।
নিস্পা প্রায় বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর বিরক্তি প্রকাশ করলো,একটু তেঁতে উঠা কন্ঠে বলে উঠলো,
“কি সমস্যা কি আপনার?কি খুজছেন তখন থেকে?জিনিসটা কি পরে খোঁজা যাবে না?”
অন্য সময়ের মতো ত্রিজয় এবার আর ঠান্ডা বিহেভিয়ার দেখালো না,নিস্পার সামান্য কথাতেই প্রচন্ডরকম রেগে উঠলো সে,নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে জোরে একটা লাথি বসালো গাড়িটার উপর, রাগান্বিত কন্ঠে ধমকে বললো,
“না যাবে না।শুনেছ?পরে খোঁজা যাবে না।ওটা আমার এক্ষুনি চাই।তুমি যানো ওটা আমার জন্য কতটা মূল্যবান ছিলো?”
ত্রিজয়ের ধমকে কেঁপে উঠলো নিস্পা,তব্দা খেয়ে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরলো, ভয়ে আর আশঙ্কায় শুখনো ঢোক গিললো।
অথচ মেয়েটার এমন নাজেহাল অবস্থাতেও ফিরে চাইলো না ত্রিজয়,আরো দ্বিগুণ ক্ষেপে উঠে জোরে ঘুষি বসালো গাড়ির গ্লাস ফ্লোটিং এর উপর, মূহুর্তের মধ্যেই ঝনঝন শব্দ করে ভেঙে গুড়িয়ে গেলো গাড়ির সামনের অংশের গ্লাস। নিস্পা আতংকে চোখ বড় বড় করে তাকালো,ত্রিজয়ের এমন রুদ্রমূর্তির সাক্ষী হয়ে কেঁপে উঠলো শরীর,অথচ ত্রিজয় এবারেও খেয়াল করলো না নিস্পাকে,বরং মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ হরিয়ে রক্তাভ কন্ঠে রাগ ঝাড়লো নিজের,
“সব দোষ তোমার।তোমার জন্য সবটা শেষ হয়ে গেলো, আমি জিনিসটা পেয়েও হারিয়ে ফেললাম।জীবনে এসেছ পর্যন্ত জীবনটা হেল হয়ে গিয়েছে আমার।গেট আউট, জাস্ট গেট আউট নাউ।”
ভয়ে থতমত খেয়ে এবার কেঁদেই ফেললো নিস্পা,চাপা কান্নার তোপে তিরতির করে কাঁপলো তার গোলাপি রঙের ঠোঁট। ঝুলে থাকা ওড়না টা হাত দিয়ে খামচে ধরে শক্ত হয়ে দাড়ালো মেয়েটা।
এতোক্ষণে টনক নড়লো ত্রিজয়ের,নিস্পার অশ্রুসিক্ত লোচনের দিকে তাকাতেই উবে গেলো সমস্ত রাগ।মনটা কেন যানি ভার হয়ে এলো তার,নিজের সমস্ত চিন্তা ভুলে ছুটে এসে দু’হাতে গাল চেপে ধরলো নিস্পার,নরম গলায় বলল,
“এ্যই এ্যই কাঁদছিস কেন?কান্নার মতো কি বললাম?”
নিস্পা ঠোঁট কামড়ে ডুকরে উঠলো,অভিমানে অভিযোগে দু হাতে ধাক্কা দিয়ে সরাতে চাইলো ত্রিজয়ের হাত,ভেঙে ভেঙে বললো,
“ছাড়ুন,যা ইচ্ছে খুজুন আপনি। আমি চলে যাচ্ছি।”
ত্রিজয় ছাড়লো না,বরং আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরে নিরেট কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“রাগ করেছ?”
দৃঢ় আত্মসংযমে আবদ্ধ মস্তিষ্ক টা তীব্র আক্রোশে রুখে দিলো নিস্পার সমস্ত অনুরাগ,তপ্ত ক্রোধ নিয়ে ফের বললো,
“ছাড়ুন।”
ত্রিজয় দু হাতে নিস্পার গাল চেপে ধরে কপালের সাথে কপাল মিলিয়ে গভির স্বরে বিড়বিড়লো,
“রাগলে তোমাকে ভিষণ সুন্দর লাগে,তারচেয়ে বেশি সুন্দর লাগে যখন অভিমান করো।”
ভেতরটা উথাল-পাথাল করে উঠলো নিস্পার, চোখ ছাপিয়ে জল আসলো ফের,প্রতিরোধী কন্ঠে বললো,
“ছাড়ুন।লাগছে আমার।”
ত্রিজয় নিজের নীলাক্ষি নয়ন জোড়া তাক করলো নিস্পার পানে,দু চখের মিলনে উদ্বোলিত হয় কয়েক জন্মের না পাওয়ার ব্যাথা,হৃদয়ে তোলপাড় শুরু হয় ত্রিজয়ের,কন্ঠ ফুরে নিঃসৃত হয় দগদগে ক্ষতের ঝাঁঝ,
“লাগুক।”
ত্রিজয় আরেকটু ঘনিষ্ঠ হলো,নিজের নাকের সাথে ঠেকালো নিস্পার নাক,আহত স্বরে হিসহিসালো,
“সরি কলিজা।ওটা ভিষণ দামি জিনিস ছিলো,এজন্য রাগ উঠে গিয়েছিলো।”
নিজের বুকের ভেতর ভাঙন টের পেলো নিস্পা,কুলহারা নদীর মতো সব ভেঙে তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে ভেতর ভেতর,দমবন্ধকর অনুভুতি খুব সাবধানে গিলে নিয়ে দূরত্ব বাড়ালো নিস্পা,তপ্ত কন্ঠে ফের বললো,
“তো আমি কি করবো?আপনি ছাড়ুন আমাকে।”
অথচ এক ইঞ্চিও দূরত্ব বাড়তে দিলো না ত্রিজয়,আচানক নিস্পাকে বুকের সাথে জাপ্টে ধরে পাগলের মতো আচরণ করলো,বড় বড় শ্বাস ফেলে বললো,
“কাঁদিস না, প্লিজ কাঁদিস না কলিজা।”
নিষ্পাপ নাক টানলো,ফ্যাশফ্যাশে শব্দ করে বলল,
“হু, কাঁদছি না ছাড়ুন।”
হৃদয় নিষ্পাপকে ছেড়ে দূরত্ব নিয়ে দাঁড়ালো এবার,দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা চালিয়ে বলল,
“কি খুজছিলাম জিজ্ঞেস করবে না?”
নিস্পা চোখের পানি মুছলো হাতের পিঠ দিয়ে,কন্ঠতালুতে বাধিয়ে বাধিয়ে উচ্চারণ করলো,
“পড়ে শুনবো।বাসায় চলুন।আপনি না বললেন দাদি অপেক্ষা করছে।”
ত্রিজয় প্যান্টের পকেটে হাত রেখে সটান হয়ে দাঁড়ায়,ঠিক আগের মতোই শক্ত করে আগলে ধরে নিষ্পার হাত,অস্ফুটে আওড়ায়,
“হ্যাঁ, চলো।”
_____________
গ্যারেজ থেকে সোজা হেটে এসে বাড়ির মেইন ডোরের সামনে এসে হোচট খেলো নিস্পা।কিছু একটা ভারি বস্তুর সাথে পা বিধে পড়ে যাওয়ার সাথে সাথেই ফস্কে গেলো ত্রিজয়ের হাতের মুঠোয় চেপে রাখা হাতটাও।
ঘটনাটা স্বাভাবিক হলেও এক অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটলো তখন, যখন নিস্পার হাতটা সোজা গিয়ে স্পর্শ করলো এক ঠান্ডা তরল পদার্থ।কেন যানিনা শিউরে উঠলো নিস্পা,শিরদাঁড়া বেয়ে কাঁটার মতো শিহরণ ছড়িয়ে গেলো সারা শরীরে,পুরো হাতের তালুতে জমাট বাধা কাঁদার মতো কিছু একটা লেপ্টে গিয়েছে।
ত্রিজয় ঝুকে এসে দু হাতে আগলে ধরলো নিস্পাকে,গভীর শীতল কন্ঠে আওড়াল,
“আর ইউ ওকে?”
বিভ্রমে ডুবে থাকা মস্তিষ্ক সজাগ হলো নিস্পার, ভেতরের কৌতূহল আর আতঙ্ক মিলেমিশে এক অদ্ভুত ঘূর্ণি তৈরি করেছে তার মস্তিষ্কে। প্রতিটি স্নায়ু কেবল এই তরলের রহস্য উন্মোচন করার জন্য মড়িয়া হয়ে উঠেছে। সে ধীরে ধীরে হাতটা নাকের কাছে এনে রাখলো, বস্তুটার ঘ্রাণ নেওয়ার চেষ্টা চালাতেই বিৎঘুটে পচা রক্তের গন্ধটা ধেয়ে গিয়ে হামলা করলো পেটের ভেতর,এক নিমিষে শরীর শিউরে উঠলো ভয়ে ও বিতৃষ্ণায়,অতর্কিতে পেটের ভেতর নাড়িভুড়ি উগড়ে আসা বোমিতে ভাসিয়ে দিলো ত্রিজয়ের ব্লু রঙা মসৃন শার্ট। মৃদু আতংকিত কন্ঠে বিরবিরালো,
“রক্ত! রক্ত!”
এতোকিছুর পড়েও নির্বিকার ত্রিজয়।প্রতিক্রিয়া বিহীন কেবল আগলে নিলো নিস্পার ঢলে পড়া রুগ্ন শরীর, নিস্পার বলা অপ্রত্যাশিত শব্দ,বা নিস্পার বোমি করার মতো বিদঘুটে পরিস্থিতি একটুও বিব্রত করলো না তাকে,বরং তার চোখে মুখে ফুটে উঠলো চাপা ক্রোধ,কিন্তু বুঝতে দিলো না নিস্পাকে, নরম স্বরে আওড়াল,
“ইউ ফিল সিক, কলিজা।”
নিস্পা আধো আধো তাকাতে চাইলো,কিন্তু সম্ভব হলো না,অকেজ মস্তিষ্ক সে শক্তি দিলো না তাকে,ধিরে ধিরে নিস্ক্রিয় হয়ে এলো পুরো শরীর,অবচেতন হওয়ার আগ পর্যন্ত সে বলার চেষ্টা করলো,
“রক্ত!আমার হাতে রক্ত উকিল সাহেব!”
ত্রিজয়ের পুরো অভিব্যক্তি ভিন্ন।অদ্ভুত ভাবেই লক্ষ করা গেলো তার মুখের হিংস্রতা,যেন মনে হলো এতোগুলো দিন পর মুখোশের আড়াল থেকে তার আসল চেহারা বেড়িয়ে এসেছে,কি বিভৎস ভয়ংকর রকমের চেহারার অভিব্যক্তি তার, হিংস্র নেকড়ের মতোই ক্রোধের তাড়নায় জ্বলজ্বল করছে তার নীলাদ্রি চোখ,সে অদ্ভুত ভাবে ঘাড় কাত করলো দুদিকে, তারপর চুপটি করে একটা চুমু খেলো নিস্পার ফ্যাকাশে ঠোঁটের উপর,হিমশীতল কন্ঠে আওড়াল,
“সব ব্যাপারে এতো আগে বুঝে যাওয়াটা আমার মোটেও পছন্দ নয় কলিজা।”
________
নিস্পাকে পাজাকোলে তুলে নিয়ে সোজা নিজের বেডরুমে এনে শুইয়ে দিলো ত্রিজয়।তারপর নিজের শার্ট টা খুলে অদ্ভুত ভাবে ঘ্রাণ নিলো,নিস্পার করা বোমি গুলো তখনও শার্টে লেগে আছে বিশ্রী ভাবে,অথচ ত্রিজয়ের চোখ মুখের ধরন দেখে মনে হচ্ছে সে স্বাভাবিক অবস্থায় নেই, পুরো একটা সাইকো।তার বিকৃত হাসিরর মাঝে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে শার্টের ভেতরে সে খুঁজে পাচ্ছে এক অনির্বচনীয় সুখানুভূতি।তার পুরো আচরণ পালটে গিয়েছে,মানসিক রোগীর মতো সে কেমন তৃপ্তি নিয়ে ঘ্রাণ নিচ্ছে শার্ট টার।কোন সাধারণ স্বাভাবিক মানুষ এই দৃশ্য দেখলে হয়তো মূহুর্তেই আরেক দফা বোমি করতো।
নিস্পা পুরো পুরি অজ্ঞান।সারাদিন না খেয়ে থাকার পর তখনকার ওই ঝোট ঝামেলা সয়ে এমন একটা আতংকের মুখোমুখি হয়ে নিজের শরীরের শক্তি আর ধরে রাখতে পারে নি মেয়েটা।
শার্ট টা ডেস্কের উপর রেখে ত্রিজয় একপল চাইলো নিস্পার দিকে।তারপর ধিরে ধিরে এগিয়ে এসে বসলো নিস্পার মাথার কাছে,নিস্পার পুরো শরীর জুড়ে তাকালো লালোশার নজরে, যেন বহু বছরের প্রতিক্ষার স্বাদ লুফে নিচ্ছে সে।নিস্পার প্রতিটি শ্বাসহীন নীরবতাকে ত্রিজয়ের কাছে মনে হচ্ছে এক বিকৃত তৃপ্তির উপকরণ।কক্ষের নীরবতায় নিস্পার নিস্তব্ধতা আর ত্রিজয়ের উন্মাদ দৃষ্টি সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে গভীর থেকে গভীরতম হয়ে উঠলো।
ত্রিজয়ের আঙুলগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল নিস্পার পোশাকের দিকে। অস্বাভাবিক সতর্কতায় সে একে একে উন্মোচিত করলো নিস্পার নিথর দেহ। নিস্পার চোখ দুটি তখনও শক্ত করে বন্ধ, যদি এই অপ্রতীকর পরিস্থিতির সামান্যতম আভাসও সে পেতো তবে ভয়ে হয়তো প্রাণটাই হারিয়ে ফেলতো মেয়েটা।
অথচ ত্রিজয় অন্য জগতে মগ্ন। তার নীলাভ নয়নদ্বয় নিস্পার উন্মোচিত দেহে একটুও থামলো না।কোনো আকর্ষণ বা দৃষ্টির লালসা সেখানে বর্তালো না বরং তার দৃষ্টি স্থির হয়ে থমকালো একেবারে নাভিপদ্মের কাছে জ্বলজ্বল করা সেই পোড়া দাগগুলোর ওপর।
সাদা, ফর্সা ত্বকের উপর দগদগে লাল চিহ্নগুলোকে সে এক অদ্ভুত তৃপ্তির সঙ্গে দেখছিল। তার কাছে সেগুলো নিছক ক্ষত নয় বরং মনে হচ্ছিলো কোনো শিল্পীর তুলির আঁচড়, মরণঘাতী অথচ ভয়ংকর সুন্দর এক শিল্পকর্ম।যা তাকে টেনে নিচ্ছিল এক বিকৃত মুগ্ধতার গভীরে।ত্রিজয় নিজের হাত ছোয়ালো সেখানটায়,গম্ভীর কন্ঠে বিড়বড়ালো,
“আমি ঠিক ধরেছিলাম। তুমিই সেই অভিশপ্ত সুন্দরী,যাকে আমি দুটো বছর পাগলের মতো খুজছি।”
একটু থেমে আবার বললো,
“এ পর্যন্ত মোট চারটে খুন করার দ্বায় কার বলতো মেয়ে?আমার নাকি তোমার?”
নিস্পাকে প্রশ্ন করে, আবার নিজেই উত্তর দিয়ে বললো,
“অবশ্যই তোমার।কেন আগে দেখা দিলে না বলো?”
তারপর লাগামহারা হয়ে মাথা নোয়ালো,বেখেয়ালি,বেহুশি ঠোঁট দুটো এগিয়ে নিয়ে গেলো যায়গাটা ছুয়ে দেওয়ার জন্য, ঠিক তক্ষুনি,ঠিক তক্ষুনি নজরে এলো একটা তিল।লাল রঙের তিল।ত্রিজয় মোহিত দৃষ্টিতে তাকালো সেদিকে, নিলাভ নয়ন স্থির হয়ে গেলো সেখানে। নিস্পার শরীরের পোড়া চিহ্ন ভুলে তার সমস্ত মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হলো ওই তিলের দিকে। দৃষ্টিতে ঝরে পড়লো উন্মাদ মুগ্ধতা। যেন পৃথিবীর সব সৌন্দর্য একটি বিন্দু হয়ে এসে জড়ো হয়েছে সেই তিলে।
দিকভ্রষ্ট হয়ে ঠোঁট দুখানা ঘুরিয়ে নিলো সেই তিলের দিকে,তারপর কাঁপা শ্বাসে আলতো একটা চুমু খেয়ে বিরবিরালো,
“আজ থেকে এটাই আমার একমাত্র উইকনেস।প্রতিদিন একটা চুমু খেতে না পাড়লে কলিজাটা ছটফটিয়ে মরবে অভিসপ্ত সুন্দরী।”
______________
উন্মুক্ত শরীরে ইজি চেয়ারে বসে আছে ত্রিজয়,পড়নের টাউজার টা নাভির নিচের দিকে নামানো,আঙুলের ভাজে চেপে ধরা সিগারেটের পোড়া অংশ ছাই হয়ে লুটিয়ে পড়ছে মেঝেতে,সকালের ফুরফুরে বাতাস জানালা দিয়ে আছড়ে এসে পড়ছে তার মুখে,বাতাসের সাথে উর্মিমালার মতো ঢেউ খাচ্ছে তার সিলকি চুল।
খুব সুন্দর মনরোম পরিবেশটা যতটা মনরোম মনে হচ্ছিলো ঠিক ততটাই বিভৎস ভয়ংকর রকমের গুমোট ছিলো।একটা কালো কুচকুচে সাপ,কলমি লতার মতো আষ্টেপৃষ্টে পেচিয়ে আছে ত্রিজয়ের গলায়,সাপটা ফনা তুলে বষিভূতের ন্যায় তাকিয়ে আছে ত্রিজয়ের নীল রঙা চোখের দিকে।অবিশ্বাস্যকর ব্যাপার হলো সাপটা ত্রিজয়কে কামড়ানোর চেষ্টা অব্দি করছে না।ত্রিজয়ের অন্ধকার ক্ষমতার কাছে বশ্যতা স্বীকার করে স্থির হয়ে আছে সে,দেখে মনে হচ্ছে ত্রিজয়ের পোষা প্রাণী, কিন্তু সাপ কে কি করে পোষ মানানো যায়?
ত্রিজয় বাস্পিভূত ধোঁয়া উড়িয়ে দিয়ে দু ঠোঁট গোল করে এক অদ্ভুত সম্মোহনী সুর তৈরি করলো,ঠান্ডা কন্ঠে আওড়াল,
“আমার চোখের বিষের কাছে তোমার বিষ নিতান্তই তুচ্ছ ন্যাক্সোরা ডার্লিং।”
সাপটা তার কলকলে জ্বিভ বের করলো, অথচ কামড় দেওয়ার সাহস দেখালো না,সেই একই নির্বিকার ভাবে তাকিয়েই রইলো ত্রিজয়ের চোখের দিকে।
ঠিক তক্ষুনি বাইরে থেকে শোনা গেলো কারো পদধ্বনি, নিশ্চয়ই নিস্পা আসছে।ত্রিজয় জানালার গ্রিল চেপে ধরলো শক্ত হাতে,তারপর হিসহিসানো কন্ঠে আওড়াল,
“গো ন্যাক্সোরা ডার্লিং।গো নাউ।”
সাপটা বষিভূতের ন্যায় শুনলো ত্রিজয়ের কথা,সে ধিরে ধিরে ত্রিজয়ের হাত বেয়ে বেড়িয়ে গেলো জানালার বাইরে।
ততক্ষণে নিস্পা পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে তার,ঘরে ঢোকার সময় মনে হচ্ছিলো কারো সাথে কথা বলছে ত্রিজয়,অথচ ঘরে ত্রিজয় ব্যাতিত আর কাউকে দেখতে না পাওয়ায় বেশ বিভ্রান্ত হলো নিস্পা,দ্বিধান্বীত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“আপনি কি কারো সাথে কথা বলছিলেন?”
ত্রিজয় কান থেকে এয়ারপ্যাড খুলে ঘুরে তাকালো নিস্পার দিকে,নরমাল টোনে বললো,
“হ্যাঁ। ওই ক্লাইন্ড ছিলো। তুমি উঠে এলে কেন?”
নিস্পা আমতাআমতা করে শুখনো কন্ঠে বললো,
“আসলে,ওই রক্ত! ওই রক্ত গুলো দেখতে গিয়েছিলাম।”
ত্রিজয় কপাল কুচকে তাকায়,না বোঝার ভঙিমায় পাল্টা প্রশ্ন করে বলে,
“কীসের রক্ত?কোথায়?কি আজেবাজে কথা বলছো তুমি?যাও গিয়ে ঘুমিয়ে পর।”
ত্রিজয়ের কথা মানতে নারাজ নিস্পা,সে তখন স্পষ্ট বুঝেছিলো সেগুলো রক্ত,সে এতোকাল অন্ধ ছিলো, তাই সে চোখে দেখতে না পেলেও বুঝতে পারে কোনটা কি, আর তখন যে সেগুলো রক্ত ছিলো সে সম্পর্কে একটুও সন্দেহ নেই নিস্পার,তাই জোর গলায় বলল,
“ওগুলো সত্যি রক্ত ছিলো, আমি স্পষ্ট বুঝেছিলাম ওগুলো রক্ত।কিন্তু! কিন্তু এখন নেই কেন?”
ত্রিজয় জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে এগিয়ে এলো নিস্পার কাছে,নিস্পার গালে হাত রেখে বললো,
“কুল কলিজা,কুল।কোথায়? কোথাও কোন রক্ত নেই সব তোমরা হ্যালুশিনেশন।”
নিস্পা আবার বললো,
“উহু,আপনি মিথ্যা বলছেন, ওগুলো রক্তই ছিলো।”
ত্রিজয় আরেক হাত তুলে রাখলো নিস্পা গালে,দূরত্ব ঘুছিয়ে নিয়ে আদুরে কন্ঠে বললো,
“আমি কেন মিথ্যা বলতে যাবো বলো?তুমি রক্ত দেখেছ,কই আমি তো দেখিনি।তখন মোবাইলের ফ্লাশ অন করে সবকিছু খুটিয়ে দেখছি আমি।ওখানে রক্তের চিহ্ন অব্দি ছিলো না।তুমি অযথাই ভয় পেয়েছ,আমার মনে হচ্ছে তুমি ওসব হ্যালুসিনেশন করেছ।”
নিস্পা বড় করে শ্বাস টানলো,পূর্ণ দৃষ্টিতে ত্রিজয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,
“আপনি ঠিক বলছেন?”
ত্রিজয় মুচকি হাসলো,মোলায়েম কন্ঠে বললো,
“হ্যাঁ একদম ঠিক বলছি।মাঝে মধ্যে আমারও এরকম হ্যালুসিন্যাশন হয়।”
“তখন কি আপনিও এমন রক্ত দেখতে পান?”
ত্রিজয় পিচলে হেসে ফেললো, ভ্রুকুটি তুলে ভাবুক কন্ঠে উত্তর দিলো,
“না। ঠিক রক্ত দেখতে পাই না,তবে অন্য কিছু দেখি।”
নিস্পা নাজুক কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“কি দেখেন?”
ত্রিজয় ঠোঁট টিপে রস্য কন্ঠে বললো,
“দেখি রিকশা চালাচ্ছি আমি।”
নিস্পা ঠোঁট উল্টে তাজ্জব কন্ঠে বললো,
“বি এম ডাব্লিউ কার রেখে সোজা রিকশা চালাতে চাওয়ার কারণ ?”
“সে যে কারণই হোক না কেন,চালাতে চাইলেই কি আর চালানো যায়?”
কন্ঠ কিঞ্চিৎ নরম করে আনলো ত্রিজয়,অন্য সুর তুলে বললো,
“লাইসেন্স আছে,ড্রাইভিং স্কিল জানা আছে অথচ রিকশা চালানোর অনুমতি নেই।
” কেন?রিকশা চালাবেন নাকি এখন থেকে?”
“হাত পা প্যাডেল সবই তো অক্ষত আছে,তুই অনুমতি দিলে ড্রাইভিং অবশ্যই করবো।”
নিস্পা বুঝতে না পেরে অস্পষ্ট আওড়াল,
“মানে?”
ত্রিজয় নিস্পার গাল ছেড়ে দিয়ে দু হাতে পেচিয়ে ধরলো নিস্পার কোমর,তারপর মোহিত কন্ঠে বললো,
“মানে,রিকশা চালালে শরীরের ব্যায়াম হয়।প্রত্যেক বিবাহিত দম্পতির উচিত প্রতিদিন দু’বার করে রিকশা চালানো।”
ঠোঁট কামড়ে হতাশার শ্বাস ফেলে আবার বললো,
“তুই তো একবারই দেস না,দুইবার তো বিলাসিতা।”
নিস্পার মেজাজ তুঙ্গে,দু হাতে ত্রিজয়ের বুকে ধাক্কা দিয়ে ছাড়িয়ে নিলো নিজেকে,তিরিক্ষি কন্ঠে বললো,
“ছিঃ। আপনি এতো লুইচ্চা কেন?”
ত্রিজয় বৃদ্ধাঙুল দিয়ে ঠোঁটের নিচে স্লাইড করে বললো,
“আমি কি সেটা বলার আগে নিজের দিকে তাকাও মিসেস চাটনি।”
নিস্পা কড়া মেজাজি কন্ঠে ফুসে উঠলো,
“চাটনি মানে?কি বলতে চাইছেন আপনি?”
ত্রিজয় ঠোঁট কামড়ে নিরেট কন্ঠে বললো,
“চাটনি মানে চেটে খাওয়ার জিনিস।”
“দেখুন আপনি কিন্তু বেশি করছেন।”
“আমার টিশার্ট যেহেতু তোমার গায়ে সেহেতু অনেক কিছুই দেখা হয়েছে।তুমি চাইলে আরেকটু দেখার সুযোগ পাবো মিসেস চাটনি।
টনক নড়লো নিস্পার,নিজের শরীরের দিকে তাকাতেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো,উষ্মা কন্ঠে বললো,
“আমার ড্রেস কেন চেঞ্জ করেছেন আপনি?”
ত্রিজয় অভিব্যাক্তি নরমাল রেখে বললো,
“ডোন্ট ওয়ারি। কিচ্ছু দেখি নি আমি।বোন মনে করেই চেঞ্জ করেছি।”
নিস্পা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে,কটমট করে তাকিয়ে বললো,
“সত্যি বলছেন?”
ত্রিজয় তার হাতটা নিস্পার মাথায় রেখে বললো,
“তোমার কসম।নাভি থেকে তিন ইঞ্চি নিচে একটা লাল তিল ছাড়া আর কিচ্ছু দেখি নি।”
চলবে,,,,,,,,

