হিপনোটাইজ #তাজনিন_তায়্যিবা পর্বঃ57

0
37

#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্বঃ57

অটোমেটিক স্লাইড করা মাত্রই খুলে খাঁন বাড়ির ফ্রন্ট গেটটা।গেটের দু’পাশে স্মার্ট লাইট সেন্সর লাগানো,ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়লো প্রশস্ত ড্রাইভওয়ে, দু’পাশে মিনিমালিস্টিক ল্যান্ডস্কেপিং,যেখানে সাজানো রয়েছে গাছপালা, আর গ্লাস ফাইবার ল্যাম্প।ব্যাকইয়ার্ডে ইনফিনিটি সুইমিংপুল আর আউটসাইডে রয়েছে গার্ডেন লাউঞ্জ।যার বা পাশেই রয়েছে সারি সারি বকুল গাছের সমারোহ। যেখানটায় বসে প্রতিদিন ভোরে এক কাপ কফি খেতে খেতে নিজের আলেকজান্দ্রাকে কল্পনা করে এমপি তাওসিফ তাকরিম।

নিস্পা চারদিকটা নজর বুলালো একবার।বাড়ির গেটে দাঁড়িয়েই আউট সাইডের বকুল গাছের বাগান টা দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। সে যতটা সময় নিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো ততটা সময় কেবল তাকিয়ে দেখছিলো বকুল গাছের বাগান টাকে।

যদিও রাতের বেলা।কম হলেও রাত এগারোটা তো বাজেই।অথচ পুরো বাড়ি আলোতে ঝলমল করছে।লাইটিং এর কারণে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বাড়ির প্রতিটি কোনা।ওইযে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে গাছের ঢালে দুলতে থাকা নক্ষত্রের মতো ছোট ছোট বকুল ফুল গুলোকেও।নিস্পা প্রতিটি কদমে বিমোহিত নয়নে শুধু সেই ফুল গুলোই তাকিয়ে দেখলো,মনে মনে প্রশ্নও করলো নিজেকে,”আচ্ছা ওর কি আর এই ফুলের নেশা আছে?এই ফুলটা কি এখনো ওর প্রিয়র তালিকায় আছে?এই ফুলের জন্য কান্নাকাটি করে পুরে বাড়ি মাথায় তোলা মেয়েটা কি এখনো ভালোবাসে এই ফুল?”
উত্তরে কোন শব্দ তৈরি হলো না মনের ভেতর,শূন্যতায় খা খা করা হৃদয়টা উত্তর দিতে ব্যার্থ। তবে তার দুটো চোখ নৈঃশব্দ্যে বলে গেলো একটাই কথা ‘ এই ফুল দেখতে পেলেও শান্তি,চোখের শান্তি।’

তাকরিমের পেছন পেছন বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো নিস্পা।প্রভা ড্রয়িং রুমেই বসা।কোলের উপর একটা বাটিতে চিপস রেখে খাচ্ছিলো সে।হটাৎ করেই তাকরিমের আগমনে বাটিটা রেখে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো সে।টানা একরাত একদিন পর তাকরিমের চেহারাটা দেখতে পেয়েই জুড়িয়ে এলো অন্তর।ঠোঁটে হাসি ধরে রাখে প্রফুল্ল চিত্তে এগিয়ে গেলো তাকরিমের দিকে।অথচ দু কদম এগোতেই তার পা জমে গেলো শক্ত পাথরের ন্যায়,ঠোঁটের হাসি ম্লান হলো দমকা হাওয়ার ধাক্কায়,তাকরিমের পেছন থেকে বেড়িয়ে এলো নিস্পাপ।যাকে দেখতে পেয়েই থমকে গেলো প্রভার হৃদপিন্ড।ছলকে উঠলো এক জোড়া চোখ,কোত্থেকে যেন এক দলা যন্ত্রণা খাবলে ধরলো তার কলিজা।

তাকরিম নিস্পাকে নিয়ে এগিয়ে এসে দাড়ালো প্রভার মুখোমুখি।নিস্পা চিনতে পেরেছে প্রভাকে,তবে আগ বাড়িয়ে তেমন কিছু বললো না।চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো প্রভার দিকে তাকিয়ে।তাকরিম নিজে থেকেই পরিচয় করিয়ে দিলো প্রভাকে,প্রভার দিকে ইশারা করে কন্ঠ লঘু করে বললো,

“সুফি।বর্তমান পরিচয় প্রভা।বাড়িতে আপাতত ওই আছে।আম্মা অসুস্থ,চিকিৎসার জন্য দেশেই রাখা হয়েছিলো কিন্তু রিস্ক নিতে চাই নি আমি।তাই বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছি।”

নিস্পা আরও একবার দেখলো পুরো ঘরটা,লিভিং রুম থেকে শুরু করে ডাইনিং স্পেসে নজর বুলিয়ে শুখনো ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করলো,

“আপনার বোন?”

তাকরিম ঠোঁট টিপে চতুর কন্ঠে বললো,

“ও তো ত্রিজয়ের নতুন ফ্ল্যাটে আছে।হসপিটাল থেকে রিলিজ করার পর ওখানেই রয়েছে।তবে কাল ফোন করে বললো একা থাকলে নাকি ভয়ে প্যানিক আ্যটাক হয় তার।তাই কালকে বাড়িতে চলে আসবে।”

ত্রিজয়ের ফ্ল্যাটে জান্নাত।এই কথাটা শুনেই কেমন ভেতরটায় জ্বালাপোড়া অনুভুত হলো নিস্পার,বিরস কন্ঠে আওড়াল,
“ওহ।”

নিস্পা ধিরে ধিরে এগিয়ে এসে দাড়ালো পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা নির্বিকার প্রভার সামনে।ঘটনার আকস্মিকতায় মেয়েটা যেন সত্যিই পাথর হয়ে গিয়েছে,হয়তো ভাবতেই পারে নি নিস্পা এতো তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে পারে।নিস্পা তার কোমল হাতটা ছোয়ালো প্রভার গালে,তারপর মোলায়েম কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

“কেমন আছিস?”

উষ্ণতায় বরফ গলে যাওয়ার মতোই নিস্পার উষ্ণ স্পর্শে গলে গেলো প্রভা,ভাটা নামলো তার দুঃখের জোয়ারে,নিস্পাকে অবাক করে দিয়ে প্রভা ডুকরে কেঁদে উঠলো হটাৎ,দু হাতে জড়িয়ে ধরলো নিস্পার পাতলা শরীর টা।কান্না ভেজা কন্ঠে বললো,

“যেমন দেখে গিয়েছিলি তেমনই আছি।”

নিস্পাও দু’হাতে জড়িয়ে ধরলো প্রভাকে,রিনরিনিয়ে বললো,

“যুগ কাঁটলো,বছর কাঁটলো অথচ তোর বিরহ কমলো না।”

প্রভা নাক টেনে প্রত্যুত্তরে বললো,

“যুগ বা সময় সবটাই যে তোর ফ্লোরা,আমি তো কেবল দাস।সেজন্মেও আশ্রিতা ছিলাম এজন্মেও তাই আছি।”

নিস্পা দু’হাতে প্রভার চোখের পানি মুছিয়ে দিতে দিতে নিজেও চোখের পানি ছেড়ে দিলো,কান্না বিজরিত গলায় বললো,

“এমন করে বলতে নেই সুফি।কতবার বারন করেছি এভাবে নিজেকে ছোট করবি না।”

নিস্পার চোখে পানি দেখেই চোয়াল শক্ত করলো তাকরিম,মেয়েটার চোখের পানি কেন যানি সহ্যই হয় না তার,সুখে হোক বা দুঃখে এই মেয়েটার কেবল হাসা উচিত,কারণ ওকে হাসলেই অপুর্ব লাগে।

তাকরিম এগিয়ে এসে নিজের হাতে মুছিয়ে দিলো নিস্পার চোখের পানি,নিস্পার কোটর থেকে বিষাধের অশ্রু গড়িয়ে পড়ার সুযোগ না দিয়েই বললো,

“কান্নাকাটি থামাও আলেকজান্দ্রা,তোমার চোখের জল আমার অপছন্দ।যন্ত্রণা হোক বা আনন্দ চোখে পানি আসা যাবে না কেমন?”

নিস্পার প্রতি এমন যত্ন দেখে ধরমার করে ভেঙে যেতে শুরু করলো প্রভার বুক পাজর,ভেজা চোখে ফ্যালফ্যাল করে তাকালো তাকরিমের দিকে,তাকরিম তার দিকে ফিরতেই চোখাচোখি হলো দুজনের,প্রভা চিবুক নামিয়ে নিলেও তাকরিম ফিরলো না,তার দিকে তাকিয়ে থেকেই ভরাট কন্ঠে বললো,

“প্রভা যা ওকে নিয়ে ঘরে যা।আমি একটু আসছি।”

কথাটা বলেই নিস্পার দিকে তাকালো তাকরিম,নিস্পার গালে নিজের ঠান্ডা শীতল হাতটা ছুইয়ে দিয়ে বললো,

“যাও ফ্রেস হয়ে নেও।আমি যাবো আর আসবো।”

তাকরিম চলে যেতে নিলেই বাধা দিলো নিস্পা,দ্রুত প্রশ্ন করে বললো,
“আপনি কোথায় যাচ্ছেন?”

তাকরিম হাত ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে বললো,

“এমনি।ছোট্ট একটা কাজ আছে।”

আর বেশিক্ষণ দাড়ালো না তাকরিম।নিস্পাকে ঘরে গিয়ে ফ্রেস হতে বলেই দ্রুত বেড়িয়ে গেলো বাড়ি থেকে।নিস্পা আর প্রভা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো সেদিকে।তাকরিম পুরোপুরি বেড়িয়ে যাওয়া মাত্রই দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল প্রভা,ততক্ষণে তার চোখের নিচের জল শুকিয়ে গিয়েছে,সে নিস্পার দিকে তাকিয়ে বললো,

“চল তোর ঘরে নিয়ে যাই।”

নিস্পা কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত নয়নে তাকালো,বিহ্বলিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“আমার ঘর?আমি তো মাত্রই এলাম এবাড়িতে।”

প্রভা মুচকি হেসে বললো,

“তাতে কি?এই বাড়ির মালিকের হৃদয়ে তো আরও একজন্ম আগেই বাসা বেধে রেখেছিস।”

কথাটা বলতে গিয়ে যে কণ্ঠনালী চেপে এলো প্রভার সে বিষয় টা স্পষ্ট টের পেলো নিস্পা,শুস্ক কন্ঠে বললো,

“তোর খুব কষ্ট হচ্ছে সুফি?”

সুফি নিজের যন্ত্রণাকে বরাবরের মতো অস্বীকার করে বললো,

“উঁহু।তোর আর আইরিশ ভাইয়ের সুখ দেখলে এই কষ্ট আর কষ্ট মনে হবে না।”

“কেন?”

“কারণ তোরা দুজনেই আমার ভালোবাসার মানুষ।”

নিস্পা ম্লান কন্ঠে অস্ফুটে জিজ্ঞেস করলো,

“আমিও?”

প্রভা কপাল কুচকে সন্দিহান কন্ঠে বললো,

“এভাবে জিজ্ঞেস করছিস যে?”

নিস্পা বক্র হেসে লঘু কন্ঠে বললো,

“না আসলে এমনি।আচ্ছা মানুষ ভালোবাসলে কি কাউকে খুন করে দিতে পারে?

সিড়ির মাঝামাঝি ধাপে উঠে গিয়েছে দুজন।নিস্পা কথা বলতে বলতে পরবর্তী ধাপে এগোলেও প্রভার পা জমে গেলো নিস্পার ছোট্ট প্রশ্ন টা শুনেই।
প্রভার পায়ের শব্দ না পেয়ে থেমে গেলো নিস্পা, ঘার ফিরিয়ে দেখলো প্রভা এখনো সেভাবেই দাঁড়িয়ে আছে।অথচ তেমন একটা অস্বাভাবিক ভাবে নিলো নিস্পা,ধিরে সুস্থে খুব স্বাভাবিক ভঙিতে বললো,

“কি হলো থেমে গেলি যে?প্রশ্নটা কি বেশি কঠিন করে ফেললাম?”

এদিকে প্রভার চোখে মুখে ভয় স্পষ্ট হয়ে উঠলো,হটাৎ করেই অস্বাভাবিক ভাবে ঘেমে উঠলো তার মুখমন্ডল, সে খুব সাবধানে ভেতরে উথলে উঠা ঝড়টাকে মাটিচাপা দিয়ে পাল্টা জিজ্ঞেস করলো,

“না মানে।হটাৎ এই প্রশ্ন কেন?”

নিস্পা উপরে না উঠে নিচের দুটো সিড়ি নেমে এসে দাড়ালো প্রভার সামনে,ধিম গলায় বলল,

“আচ্ছা তোকে একটা কথা বলি শোন।”

“কি?”

“1947 সালে যে একজন বহুরূপী সময় ভ্রমণে গিয়েছিলো সেটা তো অজানা নয় তাইনা?”

“অজানা থাকার কথা নয়।”

“সেটা আমিই ছিলাম।ভবিষ্যতে পূনর্জন্ম নেওয়া ফ্লোরেন্সা আমিই বহুরুপী হয়ে অতীতে গিয়েছিলাম।”

নিস্পার কথায় বিস্ফোরিত হলো প্রভার দুই চোখ ,ঘনঘন ঢোক গিলে হাতের তালু দিয়ে ঘাম মুছলো ঘাড় মুখ কপালের।নিস্পা সেদিকে তাকিয়ে ভ্রুকুটি তুললো,রহস্যময় কন্ঠে শুধালো,

“কি হলো এমন নারভাস হয়ে গেলি যে?ভয় পেলি নাকি?”

প্রভা অপ্রস্তুত হয়ে তোতলালো,
“ভ,,,ভয়? আমি কেন ভয় পেতে যাবো।”

নিস্পা মুচকি হেসে চুমু খেলো প্রভার কপালে,দু’হাতে প্রভার মুখটা আগলে নিয়ে অপারগ দৃষ্টিতে তাকালো প্রভার ফ্যাকাসে মুখের দিকে।তাকালো তো তাকালো,প্রায় বেশ অনেক্ষন ধরে তাকিয়েই রইলো একভাবে।অতঃপর গমগমে কন্ঠে বললো,

“হু সেটাই তো।তুই তো কিছু করিস নি তাহলে তুই কেন ভয় পাবি।শত হোক আমার বোন তুই।”

বিস্ময়ে চোখ বড়বড় হয়ে গেলো প্রভার,নিঃশ্বাস আটকে গেলো বুকের ভেতর,রুদ্ধশ্বাসে আওড়াল,

“ফ্লোরা,,,তুই?”

নিস্পা আনমনে স্পষ্ট জবাব দিলো,

“সব জানি।”

__________________

চৌধুরী বাড়ির চারপাশে নিস্তব্ধতা।ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত।অনুর চোখে ঘুম নেই,অনিশ্চিত জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে তার মনে।তাকরিমের করা এমন ভয়ংকর প্রতারণা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে অনুর।ভেতরটা জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে।কাকে ভালোবাসলো সে?কাকে ভালোবেসে আরেকটা জন্মের জন্য তড়পেছিলো মৃত্যুর আগ পর্যন্ত?যে বরাবরই স্বার্থপর তার জন্য? যে কখনো তার প্রেম ছাড়া অন্যকাউকে প্রাধান্য দেয় নি তার জন্য?যে মানুষকে মানুষ বলে গন্যই করে না তার জন্য?নিজের প্রতি নিজেরই ঘৃনা হচ্ছে অনুর,অথচ সেই ঘৃনার এক বিন্দুও তাকরিমকে করতে পারছে না অনু।কেন করতে পারছে না?এখনও কি ওই লোকটাকে ভালোবাসে সে?ওই স্বার্থপর লোকটা কি আদৌও ভালোবাসার যোগ্য?

কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই বেলকনির চেয়ারে মাথা এলিয়ে দিলো অনু।কিয়ানের ঘরে থাকছে না সে,কিয়ানের ঘর থেকে প্রায় তিনটা রুম ডিস্টেন্সে তার ঘর,যতদিন পর্যন্ত এই বাড়ি থেকে বেড়োতে না পারবে ততদিন এই ঘরটাতেই থাকতে হবে তার।

রাত তখন প্রায় বারোটা।শহরের রাস্তা তখনও জমজমাট।ইভানের বাইকটা হনহনিয়ে ছুটে এসে দাড়ালো ডক্টর কিয়ান চৌধুরীর বাড়ির সামনে।ইভানের দৃষ্টি অস্থির।অনেক বড় বাড়ি,কোথায় খুজবে অনুকে?কোন ঘরে আছে অনু সেটাই তো জানে না।

ইভানের বুকটা ধড়ফড় করছে,বিরহ যন্ত্রণায় ব্যাকুল হৃদয়টা ছটপট করছে অনুর দেখা পাওয়ার জন্য।ভয়ংকর এক অনুভূতির জাতাকলে পৃষ্ঠ হচ্ছে হৃদয়।পুরুষ মানুষ খুব সহজে কাঁদে না,তারা কাঁদতে জানে না,অথচ এই লোকটার চোখ ভেজা,শার্টের হাতা দিয়ে কিছুক্ষণ পরপর চোখ মুছচে আর পুরো বাড়িটার দিকে নজর বুলাচ্ছে।প্রায় অনেক্ষন ধরে উন্মাদের মতো বাড়ির চারদিকে খোজাখুজির পর,দেখা মিললো,অন্ধকার হাতরে এক ছটাক আলোর মতোই দেখা মিললো অনুর।একটা বেলকনিতে মাথাটা দেখা যাচ্ছে তার,পাশেই বেগুনি রঙের ওড়না উড়ছে অবহেলায়।ইভান চোখ বন্ধ করেই বুঝে নিলো সেটা অনু,অনুকে সে কয়েক মাইল দূর থেকে উপলব্ধি করতে পারে,গভীর ভাবে উপলব্ধি করতে পারে।

ইভান আর দেরী করলো না,দেয়ালে লাগোয়া একটা পাইপ বেয়ে খুব কষ্ট করে উঠতে শুরু করলো উপরের দিকে।প্রায় বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর অবশেষে নাগাল পেলো অনুর বেলকনি,সে একহাতে পাইপ ধরে রেখে আরেক হাত বাড়িয়ে দিয়ে আঁকড়ে ধরলো বেলকনির লোহার গ্রিল,সাথে তার হাতের মুঠোয় আটকা পড়লো অনুর উড়তে থাকা ওড়নাটা।গলায় টেন পেতেই ধড়ফড়িয়ে বসা থেকে উঠে দাড়ালো অনু,ওড়নাটা সামলে নেওয়ার জন্য টান দিতেই দেখতে পেলো পুরুষালি হাত।অনু বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো,এতো রাতে দেয়ালের পাইপ বেয়ে বেলকনি পর্যন্ত কে আসতে পারে ভেবেই পেলো না সে। তবে প্রতিবারের মতো কেন যানি ভয় পেলো না একটুও,বরং অদম্য কৌতুহল নিয়ে উঁকি দিলো বেলকনির বাইরে।ঠিক তক্ষুনি ইভানকে ঝুলে থাকতে দেখে চক্ষু কড়াগাছে উঠলো তার।বিস্ময়ের তোপে মুখে হাত চেপে ধরে স্তম্ভিত কন্ঠে আওড়াল,

“আপনি?”

অনুর দিকে তাকিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেললো ইভান,বুকের উপর পাথর নামার মতো করেই প্রশান্তি ঝিলমিল করে উঠলো তার চোখে,আবিষ্ট কন্ঠে বললো,

“তুমি যেখানে আমিও সেখানে।”

অনু হতবাক হয়ে তাকালো, আশ্চর্যবিভূত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

“এই বাড়ির ঠিকানা কোথায় পেলেন আপনি? ”

ইভান শক্ত করে রেলিং টা চেপে ধরে ঝুলন্ত অবস্থা বললো,

“এটা ডক্টর কিয়ানের বাড়ি,যে কেউ দু মিনিটে ঠিকানা বলে দিতে পারবে।”

“কিন্তু আমি এখানে আপনি জানলেন কীভাবে?”

“সেসব কথা পড়ে আগে টেনে তোল আমাকে।”

অনু ঠোঁট কামড়ে ধরে তাড়াতাড়ি হাত বাড়ালো,ইভানের হাতটা শক্ত করে ধরতেই ধড়ফড়িয়ে উঠলো ইভান,কলিজাটা ঠান্ডা হয়ে এলো অদ্ভুত শিহরনে,সে শুখনো ঢোক গিলে নিজেও শক্ত করে চেপে ধরলো অনুর হাত,অনেক কষ্টের পর অবশেষে ইভানকে টেনে তুলতে সক্ষম হলো অনু,বুকে হাত রেখে হাপানি রোগীর মতো হাপাতে হাপাতে জিজ্ঞেস করলো ,

“দেয়াল টপকানো ছাড়া আর কোন কিছুই শেখেন নি জীবনে?”

“জীবন বারবার দেয়াল টপকাতে বাধ্য করলে আমার কি দোষ?”

ইভানের সোজাসাপটা উত্তরে ক্ষানিক ভড়কালো অনু,কথাটা গুরুত্ব না দিয়ে বললো,

“হয়েছে দোষ গুন পরে বলা যাবে, আপনি এটা বলুন কেন এসেছেন এখানে?”

অনুর প্রশ্নের উত্তরে যুতসই জবাব খুঁজে পেলো না ইভান,ভগ্ন হৃদয়ের ভারে নুয়ে এলো তার কণ্ঠনালী, সে ধরা গলায় প্রশ্ন করে বললো,

“তুমি বিয়ে করেছ?ওই ডক্টর কে?”

অনু চমকে উঠা বিস্ময় ভরা চোখে তাকালো ইভানের অগোছালো এলোমেলো দৃষ্টির পানে,অবাক হয়ে বললো,

“আপনি কীভাবে জানলেন?”

ইভান এবারেও উত্তর দিলো না, অবিন্যস্ত কন্ঠে বললো,

“যেটা জিজ্ঞেস করছি উত্তর দেও।”

“হ্যাঁ, কিন্তু ওটা একটা এক্সিডেন্ট ছিলো।”

“তুমি কি এই বিয়েতে রাজি?এই সম্পর্কটা টেনে নিতে রাজি?”

“আপনি এসব জিজ্ঞেস করতে এখানে,,,,,

ইভান অধৈর্য, অনুর মুখ থেকে না শব্দটা শোনার জন্য কলিজাটা ছটপট করছে তার।অনুকে কোন প্রশ্ন করতে না দিয়ে সে গম্ভীর ভরাট কন্ঠে বললো,

” উফফস! এতো বেশি কৌতুহল দেখাচ্ছো কেন?যেটা জিজ্ঞেস করছি সেটা বল।”

ইভানের এমন ব্যাবহারে অনু বেশ আশ্চর্য হয়,তবে তেমন একটা প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে ইভানের প্রশ্নের উত্তরে বলে,

“না।আমি কখনো এই সাইকো লোকটার সাথে থাকতে পারবো না।মরে গেলেও না।”

মুহূর্তেই ইভানের চোখেমুখে আনন্দের ঝলক বয়ে গেলো, যেন বসন্তের হাওয়ায় দুলে উঠলো তার সমগ্র সত্তা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষে হঠাৎ পাওয়া সুখের মতোই আচমকা শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো অনুকে।অনুর নাজুক শরীর খান পৃষ্ঠ করলো শুন্য বক্ষের মধ্যখানে।
পুলকিত কন্ঠে বিরবির করে বললো,

“থ্যাংক ইউ অনু,থ্যাংক ইউ সো মাচ।বাঁচালে আমায়,আর একটু হলে নির্ঘাত মরে যেতাম।”

অনু স্তম্ভিত। নিঃশব্দে আছড়ে পড়া সাগরের তরঙ্গের মতোই তার মস্তিষ্কে আছড়ে পরলো হাজারটা প্রশ্নের সমারোহ, আচমকা ধকল খাওয়ার মতো অবিশ্বাস্য কন্ঠে আওড়াল,

“আপনি,,,,, ”

ইভান আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো অনুকে,অনুর মাথাটা নিরেট বক্ষে চেপে ধরে ব্যাকুল কন্ঠে দিলো হৃদয়ের স্বীকারোক্তি,

“আই লাভ ইউ অনু।আই লাভ ইউ।আমি দ্রুত ডিভোর্সের ব্যাবস্থা করে তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যাবো।প্রমিজ।”

_____________________

মাত্রই নিস্পাকে ঘরে পৌছে দিয়ে গেছে প্রভা।সেই থেকেই নিস্পা খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে ঘরের প্রতিটি কোনা থেকে শুরু করে আসবাব পত্র।সবকিছু নিস্পার পছন্দ মতোই সাজানো, যেমনটা নিস্পা চেয়েছিল ঠিক তেমন করেই যত্ন করে নিস্পার জন্য ঘরটা সাজিয়ে রেখেছে তাকরিম।মানুষ টা কি অদ্ভুত। যুগ গেলো, জন্মের পর জন্মান্তর হলো অথচ মানুষ টা তার ভালো লাগা, খারাপ লাগা, পছন্দ অপছন্দ সবটা মনে রাখলো কি নিখুঁত ভাবে।এই মানুষটাকে কি ভালো নাবেসে থাকা সম্ভব? হয়তো সম্ভব। এজন্যই হয়ত নিস্পা ভালোবাসতে পারলো না,চোখের সামনে ভালোবাসার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ দেখেও ভালোবাসতে পারলো না নিস্পা,হয়তো কখনো ভালোবাসতেও পারবে না।এটাই হয়তো নিস্পার সবচেয়ে বড় না পাওয়া অধ্যায়।যেই অধ্যায় কখনো পড়তেই চায় নি নিস্পা,যেই অধ্যায় পড়ার প্রতি বড্ড অনিহা তার,অথচ সে অধ্যায়টাই তার জীবনের সবচেয়ে সহজ অধ্যায়।

ভাবনার ভারে নিস্পার বুক থেকে ছিটকে বেড়িয়ে এলো এক চাপা দীর্ঘশ্বাস।ঠিক তখনই কানে ভেসে এলো তাকরিমের ডাকার শব্দ।দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা।নিস্পা দ্রুত উঠে দাড়ালো,তাড়াহুড়ো করে খুললো দরজার লক।যা ভাবছিলো তাই,দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তাকরিম।কিন্তু লোকটা একা নেই সাথে আরও দুজন গার্ড আছে,দুজনের হাতেই বেশ অনেকগুলো ব্যাগ।এতোগুলো ব্যাগ দেখে স্বাভাবিক ভাবেই কপাল কুচকে এলো নিস্পার,তবে তেমন একটা রিয়েক্ট না করে তাকরিমকে জিজ্ঞেস করলো,

“ডাকছিলেন?”

তাকরিম নিস্পাকে সাথে নিয়ে ঘরে ঢুকলো, তারপর বললো,

“হ্যাঁ। বোস এখানে।”

“কেন?”

“বোস।বলছি।”

নিস্পা বসলো, ভাবুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তাকরিমের দিকে।তাকরিম বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে গার্ড দুজনকে উদ্দেশ্য করে বললো,

” কাম হেয়ার।”

সাথে সাথেই দুজন গার্ড এসে ঢুকলো ঘরের ভেতর,নিস্পার সামনে খুব সাবধানে নামিয়ে রাখলো হাতের ব্যাগগুলো, তারপর যেভাবে এসেছে সেভাবেই বেড়িয়ে গেলো হনহনিয়ে।

নিস্পার চোখেমুখে উপচে পড়া কৌতুহল,সে ব্যাগগুলোর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“এসব?”

“এখানে পঞ্চাশ টা নীল রঙের শাড়ি আর তোর পড়ার জন্য থ্রিপিস আছে পঞ্চাশ টা।”

শাড়ি আর থ্রি পিসের ব্যাগ গুলো দেখিয়ে তাকরিম নিজের হাতের ব্যাগ গুলোও বাড়িয়ে দিলো নিস্পার দিকে,বললো,

“আর এগুলো হলো তোর প্রয়োজনীয় জিনিস যা যা তোর প্রয়োজন সব।”

“কিন্তু এসবের কি প্রয়োজন?আমার এতো কিছুর প্রয়োজন নেই।”

“তোর প্রয়োজন নেই তো কি হয়েছে,আমার আলেকজান্দ্রার প্রয়োজন আছে।”

নিস্পা থম মেরে চুপ করে গেলো।ভেতর ভেতর নিজেকে প্রস্তুত করে বললো,

“আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে এমপি মশাই।”

তাকরিম তেমন একটা গুরুত্ব না দিয়ে বললো,

“খেয়েছিস তুই?তোর পছন্দের সব খাবার নিয়ে এসেছি আমি।আগে খাবি তারপর কথা।”

“কিন্তু কথাগুলো আমার এক্ষুনি বলতে হবে।”

“শুনবো তো,কিন্তু আগে চল খেয়ে নিবি।”

নিস্পা নিজের সিদ্ধান্তে অটল।কথাগুলো না বলে এখান থেকে উঠবে না সে,তাই তাকরিমের কথায় অসম্মতি জানিয়ে কিঞ্চিৎ কড়া কন্ঠেই বললো,

“আমার কথাগুলো আপনার এক্ষুনি শুনতে হবে এমপি মশাই।”

তাকরিম বড় করে শ্বাস টানলো, তাকালো নিস্পার দ্বিদাগ্রস্ত চোখের দিকে,ঠান্ডা কন্ঠে বললো,

“আচ্ছা বল।কি বলবে।”

নিস্পা ঠোঁট টিপে উসখুস করল,আরও কিছুক্ষণ সময় নিয়ে রয়েসয়ে বললো,

“আমি আপনার আলেকজান্দ্রা নই এমপি মশাই।”

তাকরিমের চোয়ালে চাপ ধরলো,কন্ঠ তেঁতে উঠলো না চাইতেও,বললো,

“মজা নিচ্ছো?কাল রাতেও তো আমাকে আইরিশ ভাই বলে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলে।ফ্লোরেন্সা না হলে কি এমনটা করতে?”

“আমি ফ্লোরেন্সা কিন্তু আপনার আলেকজান্দ্রা নই।”

তাকরিম নিস্পার কথার আগামাথা কিচ্ছু বুঝলো না,সে ভ্রুকুটি তুলে বললো,

“আচ্ছা,কি বলতে চাইছো একটু ক্লিয়ার করে বলতো।”

“আমি ফ্লোরেন্সা ঠিকই কিন্তু আমার মধ্যে আপনার আলেকজান্দ্রা আর বেঁচে নেই এমপি মশাই।আপনার আলেকজান্দ্রার মতো আমি আর ভীতু নেই এখন,আমি এখন আর কথায় কথায় ললজ্জাবতীর ন্যায় নুইয়ে পড়ি না,আমি এখন আর কথার আগে কেঁদে ফেলি না,আমার পছন্দের তালিকায় এখন আর বকুল ফুল নেই,আমি এখন আর আপনার চোখের দিকে তাকিয়ে সেই আগের মতো ভয় পাই না।আমি ফ্লোরেন্সা হয়ে জন্মেছি ঠিকই কিন্তু আমি আপনার আলেকজান্দ্রাকে আমার ভেতরে বাঁচিয়ে রাখতে পারি নি।”

“বাজে বকছিস কেন?”

“বাজে বকছি না এমপি মশাই।আপনি দয়া করে আমাকে আর আলেকজান্দ্রা ডাকবেন না।ভিষণ কষ্ট হয় আমার।”

“কি চাইছিস তুই?আমাকে খুন করার পায়তারা করতে?”

“আমি চাই আইরিশ ভাই একমাত্র তার আলেকজান্দ্রাকে ভালোবাসুক।দ্বিতীয় কোন অস্তিত্ব তার হৃদয়ে ঘাটি না গাড়ুক।”

“তুই তো মৃত্যুর আগ অব্দি আমার হতে চেয়েছিলি,সেটাকে কি বলবি?”

“ছেলেমানুষী এমপি মশাই।আপনার আলেকজান্দ্রা তো বড্ড ছেলেমানুষী ছিলো।শত হোক সে কিন্তু ব্রিটিশ প্রিন্সকে ভালোবেসে তার হাত ধরে ব্রিটিশ মহলে গিয়েছিলো।যখন ব্রিটিশ প্রিন্স তার মনটা ভয়ংকর আঘাতে খণ্ডবিখণ্ড করে দিলো তখন তার মনে হলো সে তার আইরিশ ভাইয়ের ভালোবাসা প্রত্যাখ্যান করেছে বলেই হয়তো অভিশপ্ত হয়েছে।তার অবুঝ মন তখন আইরিশ ভাইকে চাইতে শুরু করলো, পাপের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে আইরিশ ভাইয়ের ভালোবাসা গ্রহণ করার পণ করলো। অথচ দেখুন যখনি প্রিন্স জোসেফের বিয়ের খবরটা তার কানে এসে পৌছালো সে নিজেকে বোঝাতে পারলো না,মনটা হু হু করে কেঁদে উঠলো বিরহে।তার মন তখন বললো তার প্রিন্স জোসেফ কে চাই।আবার?আবার যখন প্রিন্স জোসেফ তাকে অত্যাচার করা শুরু করলো সে তখন চাইলো তাকে নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবাসা আইরিশ ভাইকে।সে পরিস্থিতির দাস ছিলো।পরিস্থিতিটা এমন ছিলো যে কোমল হৃদয় ভেঙে গুড়িয়ে যাওয়ার পর সে ঠিক কি চাইবে?বা তার কি করা উচিত ছিলো সেই অনুশোচনায় ভুগেই সে নির্মম ভাবে শেষ হয়ে যাচ্ছিলো।সে নিষ্ঠুর ভাবে দলিতমথিত হচ্ছিলো হৃদয়ের টানাপোড়নে,নির্মম এক নিয়তির জাতাকলে।”

তাকরিম নির্বাক।মাথা নুইয়ে চুপচাপ শুনল কেবল নিস্পার অভিযোগ।অতঃপর বৈরাগী কন্ঠে বললো,

“তুই আমাকে কখনো হৃদয় থেকে চাস নি তাইতো?”

নিস্পা শক্ত কন্ঠে প্রত্যুত্তর করলো তড়িৎ,

“আপনাকে না চাইতে পারা টা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আফসোস হয়ে থাকবে।”

“এই জন্মেও ওই ত্রিজয়কে জিতিয়ে দিলি।”

“আমি উনার সাথেও থাকবো না এমপি মশাই।যে আমাকে নরক চিনিয়েছে তার সাথে কি করে থাকি বলুন?উনার সাথে সংসার করা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না।”

“তাহলে কি চাইছিস তুই?”

“প্রতিশোধ। প্রতিশোধ নিতে চাইছি এমপি মশাই। আর আপনার কাছ থেকে ক্ষমা চাইছি।”

“মাথা খারাপ তোর?”

“আমাদের প্রত্যেকের জন্মের পেছনে একটা কারণ রয়েছে এমপি মশাই। আমি বোধহয় আমার জন্ম নেওয়ার কারণ টা পেয়ে গিয়েছি।নিয়তি আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে সেই কারণ গুলো।”

“যেমন?”

“আমার জন্মের প্রধান কারণ হলো প্রতিশোধ।যে বা যারা আমাকে বাঁচতে দিলো না একটা উৎসব মূখর বাড়ি মৃত্যু পুরিতে পরিনত করলো তাকে খুঁজে বের করে নিষ্ঠুর প্রতিশোধ নেওয়া।
দ্বিতীয় ওই ব্রিটিশ প্রিন্সকে ভালোবাসার বিরহ কেমন সেটা উপলব্ধি করানো।উনি আমাকে যতটা না ভালোবাসে তার চেয়ে বেশি আমাকে আঘাত করেছে।ভালোবাসা দিয়ে যন্ত্রণার ক্ষত ঢাকা যায় না, আবার যন্ত্রণার ক্ষত দিয়ে ভালোবাসা মোছা যায় না।একটা আরেকটার কম নয়।তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি উনার থেকে দূরে সরে যাবো আমি।
তৃতীয় আপনার কাছ থেকে ক্ষমা চাওয়ার জন্যই হয়তো আমার জন্ম হয়েছে।আপনাকে ভালোবাসতে না পারার জন্য আমি অনুতপ্ত।”

“অথচ আমি তোকে সারাজীবন ভালোবেসে যাবো।”

“আর আমি আপনাকে ভালোবাসতে না পারার গ্লানি সারাজীবন বয়ে বেড়াবো।”

নিস্পার মুখে এমন কঠিন কথাগুলো নিতে পারলো না তাকরিম,আলগোছে নিস্পার দুটো হাত ধরে বেদনাচ্ছন্ন কন্ঠে বললো,

“আমি তোকে ভালোবেসে নিঃশ্ব আলেকজান্দ্রা।”

নিস্পা চুপটি করে গুটিয়ে নিলো নিজের হাত,দৃঢ় কন্ঠে বললো,

“আমি আপনার কোমল বতি আলেকজান্দ্রা নই এমপি মশাই।ভালোবাসা অপাত্রে দান করে আলেকজান্দ্রকে অসম্মান না করার অনুরোধ জানাই।”

“কোমলতার প্রয়োজন নেই আমি তোর রুক্ষতাকেই গ্রহণ করে নেবো।”

নিস্পা নিজের হাতটা নিয়ে রাখলো তাকরিমের চোখের উপর,রিনরিনিয়ে বললো,

“চোখ বন্ধ করুন এমপি মশাই।চোখ বন্ধ করে বলুনতো কে আপনার চোখের সামনে ভাসছে?কে আপনার সামনে ভীতু নয়নে তাকাচ্ছে?কার খিলখিল হাসির শব্দ আপনার হৃদয়ে দামাদোল বাজাচ্ছে?”

তাকরিম চোখ বন্ধ করলো। চোখের সামনে ভেসে উঠলো সেই পুরোনো ফ্লোরেন্সার মুখটা।সেই ভীতু নয়ন,কাজলে রাঙা চোখ।আর ভয়ের জৌলুশে কেপে উঠা কন্ঠ,’আমার ভুল হয়ে গেছে আইরিশ ভাই,এবারের মতো ক্ষমা করে দিন।’
পরপরই ভেসে উঠলো সেই অশ্রু ভেজা দুটো চোখ,কান্না জড়ানো অভিমানী কন্ঠ,
“আপনি খুব খারাপ আইরিশ ভাই,আমার বকুল গাছের সাথে কি শত্রুতা আপনার?আমার বকুল ফুল লাগবে,আমার ফুল এনে দিন।”

আইরিশের বক্ষস্থল কেঁপে উঠলো,অস্পষ্ট স্বরে আওড়াল,

“আলেকজান্দ্রা,,,,,!”

নিস্পা প্রসন্ন হেসে ফেললো,অবিচল কন্ঠে বললো,

“আলেকজান্দ্রা। হ্যাঁ আলেকজান্দ্রা, যার হাসিতে কলিজা জুড়িয়ে যেতে বাধ্য,যে কারন ছাড়াই অভিমান করে,কারন ছাড়াই ভয় পায়, আবার কারণ ছাড়াই হাসে।যার পছন্দের তালিকার সবটা জুড়ে রয়েছে বকুল ফুল,তিন বেলা ভাতের বদলে যার বকুল ফুল হলেই চলে, যে বকুল ফুল হারিয়ে বাড়ি মাথায় তুলে ভ্যাভ্যা করে কেঁদেছে দিন রাত ।সেই বোকাসোকা ভোলা ভালা কোমলতায় মোড়ানো মেয়েটাকেই দেখছেন তাইতো?”

তাকরিম চোখ খুলে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো নিস্পার দিকে,গম্ভীর ভরাট কন্ঠে বললো,

“যদি বলি নারী মানেই কোমলতা। তোর মধ্যকার কোমলতা তুই আড়াল করে রাখছিস ইচ্ছে করে।আমাকে এড়িয়ে যেতে চাইছিস তাই না?কিন্তু এই এড়িয়ে যাওয়ার পেছনে এক্সেট কারনটা কি?”

“বাদ দিন না,কোন কারণ নেই।আর থাকলেও বলতে বাধ্য নই আমি।আমার শেষ কথা আপনার ভালোবাসা গ্রহণ করতে পারবো না আমি।আমার পক্ষে অসম্ভব।”

রাগে ফোসফোস করে উঠলো তাকরিম।ক্ষুব্ধ হয়ে জোড়ালো ভাবে চেপে ধরলো নিস্পার হাতের কব্জা,ক্রোধিত কন্ঠে বললো,

“আমি ভাষণ শুনতে চাইছি না।আমি শুনতে চাইছি লিগ্যাল কারণ টা কি?কেন আমাকে ভালোবাসতে এতো সমস্যা তোর।”

“ছাড়ুন এমপি মশাই।আমি,,,,,

” তুই বলবি, আর এক্ষুনি বলবি।আমাকে কেন ভালোবাসতে পারবি না বল আলো।”

নিস্পা আর চেপে রাখতে পারলো না নিজেকে,তাকরিমের প্রশ্নের বিপরীতে উষ্মা গলায় চেচিয়ে বললো,

“কারণ আমি কামিনী শিকদার আর রহমান শিকদারের মেয়ে।যাদেরকে আপনি হত্যা করেছেন।”

সঙ্গে সঙ্গে হাতটা আলগা হয়ে গেলো তাকরিমের,জড়বস্তুর মতো পাথরে পরিনত হলো যেন পুরো শরীর।নিস্পা এক ঝটকায় সরিয়ে নিলো নিজের হাত,চোখের পানি ফেলতে ফেলতে পুনরায় চেচিয়ে বললো,

“শুনেছেন আপনি? শুনেছন তো?অনুতাপ হচ্ছে? নিশ্চয়ই হচ্ছে। আমি এতোক্ষণ এই অনুতাপটাই ছুতে দিতে চাই নি আমার আইরিশ ভাইকে।

চলবে,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

⭕প্রায় অনেকটা লেখা ডিলিট হয়ে গিয়েছে,পুনরায় লিখতে বেশ কষ্ট হয়েছে, গুছিয়েও উঠতে পারি নি।ভুল ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।আর সবাই 1k রিয়েক্ট পূরন করে দিবেন প্লিজ।⭕

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here