#ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব__________৩০
তারাবির নামাজ শেষ হয়ে গেছে।
মির্জা বাড়ির সবাই ধীরে ধীরে নিজেদের রুমে চলে গেছে। পুরো বাড়িটা এখন শান্ত।
ফালাক ধীর পায়ে ছাদে এসে দাঁড়াল।
রমজানের রাতের বাতাসে একটা আলাদা শান্তি আছে।ফালাক আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। অর্ধেক চাঁদটা মেঘের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে।
হঠাৎ পেছন থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল—
“একা একা এখানে কি করছিস?”
ফালাক চমকে ঘুরে তাকাল।
সাদ দাঁড়িয়ে আছে।
কালো টি-শার্ট, এলোমেলো চুল, চোখে চিরচেনা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
ফালাক একটু ইতস্তত করে বলল—
“এমনি… একটু হাওয়া খেতে এসেছিলাম।”
সাদ ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এল।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।
তারপর সাদ হঠাৎ বলল—
“আজ বরফিটা খারাপ হয়নি।”
“আপনি… খেয়েছেন?”
সাদ ভ্রু তুলল।
“তোকে কে বলেছে আমি খাইনি?”
ফালাক লজ্জা পেয়ে নিচের দিকে তাকাল।
“আমি… দেখেছি।”
সাদ থেমে গেল।
“কোথা থেকে?”
ফালাক একটু মুচকি হাসল।
“পর্দার আড়াল থেকে।”
এক মুহূর্তের জন্য সাদের চোখে অদ্ভুত একটা ঝিলিক দেখা গেল।
“মানে তুই লুকিয়ে লুকিয়ে আমাকে দেখছিলি?”
ফালাক তাড়াতাড়ি বলল—
“না না! আমি তো শুধু—”
কথা শেষ করার আগেই সাদ এক ধাপ সামনে এগিয়ে এল।
ফালাক স্বভাবতই একটু পিছিয়ে গেল।
সাদ রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়ায় কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল—
“লন্ডনে যেতে ভয় লাগছে?”
ফালাক একটু থামল।
“ভয় না… …”
“ কি?”
ফালাক নিচের দিকে তাকাল।
“এই বাড়িটার জন্য মায়া লাগবে।”
ওহ!
বাতাসে ফালাকের আঁচল উড়ে এসে সাদের হাতে ছুঁয়ে গেল।
তারপর আবারও দুজনে নিশ্চুপ হয়ে গেলো।
কিছুক্ষন পর ফালাক নীরবতা ভেঙে বলল –
“আপনি কি কফি খাবেন?”
সাদ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল—
“এখন?”
“হ্যাঁ, দাঁড়ান, আমি নিয়ে আসছি।”
ফালাক সিঁড়ি বেয়ে নেমে রান্নাঘরে চলে গেল। কিছুক্ষণে হাতে কফি তৈরি করে ধীরে ধীরে সাদকে দিতে নিয়ে এল।
সাদ দোলানায় বসে আছে। সিগারেট খাচ্ছে। ফালাক কফির কাঁপটা এনে দিলো। সাদের এক হাতে সিগারেট, আর এক হাতে কফির কাপ ধরে বসল। ফালাক গিয়ে সামনে রেলিং ধরে দাঁড়ালো । মিষ্টি মিষ্টি বাতাসে বেশ ভালো লাগছে।
হালকা বাতাসের ঝাপটায় ফালাকের অবাধ্য চুলগুলো বারবার চোখে-মুখে এসে আছড়ে পড়ছে। ফালাক এক হাত দিয়ে চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু পরক্ষণেই এক ঝলক হাওয়া এসে আবার সব এলোমেলো করে দিচ্ছে।
সাদ দোলনায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে। এক হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ, অন্য হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। সিগারেটের লালচে আভাটা অন্ধকারের মাঝে সাদের তীক্ষ্ণ চোয়াল আর গম্ভীর মুখটাকে আরও রহস্যময় করে তুলছে। কফিতে চুমুক দিচ্ছে না, বরং স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে।
এই সাধারণ দৃশ্য সাদের কাছে যেন অসাধারণ লাগছে।
ফালাকের এই সাদা শাড়ির আঁচল , বাতাসের তোড়ে উড়ছে,বারবার চুল ঠিক করছে —সবকিছুই সাদের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত তোলপাড় সৃষ্টি করছে। ।
সাদ ধীরপায়ে উঠে দাঁড়াল। সিগারেটের শেষ অংশটা পায়ের নিচে পিষে দিয়ে ও ফালাকের একদম পেছনে এসে থামল। ফালাক তখনো চুল সামলাতে ব্যস্ত। হঠাৎ অনুভব করল দুটো শক্ত হাত ওর কাঁধের ওপর দিয়ে এসে অবাধ্য চুলগুলোকে মুঠো করে ধরল।
ফালাক চমকে উঠে । সাদের গায়ের পুরুষালী ঘ্রাণ এক মাদকতা তৈরি করেছে ফালাকের কাছে । সাদ খুব সাবধানে ফালাকের সব কটা চুল এক হাতে গুছিয়ে নিয়ে ঘাড়ের একপাশে সরিয়ে দিল।
“চুলগুলো খুব বিরক্ত করছে!
ফালাকের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। সাদের আঙুলের অগ্রভাগ ফালাকের ঘাড়ের ত্বক ছুঁয়ে যাচ্ছে। ওশুধু অস্ফুট স্বরে বলল—
“বাতাসটা খুব বেশি আজ…”
সাদ ফালাককে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। চাঁদের আবছা আলোয় ফালাকের মুখটা এখন একদম পরিষ্কার। সাদের চোখদুটো আজ বড্ড বেশি কথা বলছে। ফালাকের গালের ওপর হাত রেখে বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে নিচের ঠোঁটটা আলতো করে স্পর্শ করল।
ফালাক মন্ত্রমুগ্ধের মতো সাদের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
এই শান্ত রাত, দূর থেকে আসা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক সাদের নিবিড় সান্নিধ্য—ফালাকের মনে হলো সময়টা যদি এখানেই থমকে যেত!
রমজানের দিনগুলো মির্জা বাড়িতে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে এসেছে। গত কয়েকটা দিনে সাদ আর ফালাকের সম্পর্কের কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এক ধরণের অঘোষিত নির্ভরতা তৈরি হয়েছে।
বিকেল বেলা ইফতারের আগে সাদ মাঝেমধ্যে রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায়। ফালাক যখন ব্যস্ত হয়ে কাজ করে, সাদ তখন দূর থেকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। ফালাক মাঝেমধ্যে চোখাচোখি হলে লজ্জা পায়, বাড়ির ছোটরা——সবই লক্ষ্য করে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করে।।
___________
দুপুরে বাড়ির সদর দরজায় একটা গাড়ির হর্ন শোনা গেল। সাদের ছোট খালা ভেতরে ঢুকলেন, কিন্তু একা নন। তাঁর সাথে এক আধুনিকা নারী। পরনে গাঢ় রঙের শিফন শাড়ি, চোখে রোদচশমা আর ঠোঁটে এক উদ্ধত হাসির রেখা।
সাদের খালা আসাতে বাড়ির বড়রা সবাই ড্রয়িংরুমে এসে জড়ো হলেন। ফালাক ট্রেতে করে শরবত নিয়ে আসতেই ড্রয়িংরুমের আবহাওয়াটা কেমন যেন থমথমে হয়ে গেল। সাদের মা মুখটা নিচু করে আছেন, আর সাদের ছোট চাচির চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তি।
পাশ থেকে রিমা ফালাকের বলে উঠল—
“সর্বনাশ! উর্মিলা ভাবি এখানে কেন?
‘উর্মিলা’ নামটা কানে যেতেই ফালাকের হাতের ট্রে-টা কেঁপে উঠল। নামটা ওর খুব চেনা। সাদের জীবনের সেই অতীত, সাদের প্রথম স্ত্রী—উর্মিলা!
উর্মিলা সোফায় আয়েশ করে বসে চোখ দুটো ফালাকের ওপর দিয়ে একবার বুলিয়ে নিল, যেন কোনো তুচ্ছ আসবাবপত্র দেখছে।
“খালামণি, এই কি তবে সাদের নতুন বউ।সাদের চয়েস তো দেখছি বেশ বদলে গেছে। একদম সাধারণ গেয়ো !”
সাদের মা শক্ত গলায় বললেন—
“উর্মিলা, তুই এ বাড়িতে কেন । আমার ছোট বোন, তোর মা সাথে নিয়ে এসেছে বলে কিছু বলছি না। তবে ফালাকের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করার অধিকার তোর নেই।”
উর্মিলা এক বাঁকা হাসি দিয়ে ফালাকের দিকে এগিয়ে এল। ফালাক তখনো পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে। সাদের প্রথম স্ত্রীর রূপ আর ব্যক্তিত্বের মাঝে এক ধরণের বিষাক্ত আভিজাত্য আছে, যা ফালাককে ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে দিচ্ছে।
“আরে খেলামনি এতো রাগ করছো কেন?
ফালাকের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সাদের পাশে এই উর্মিলাকেই বোধহয় বেশি মানাত। ফালাক নিজেকে খুব ছোট আর অসহায় মনে করতে লাগল।
উর্মিলার উপস্থিতিতে ড্রয়িংরুমের বাতাস যেন বিষিয়ে উঠেছে। ঠোঁটে লেগে থাকা তাচ্ছিল্যের হাসি ফালাকের কলিজায় তীরের মতো বিঁধছে।
উর্মিলা ধীরপায়ে ফালাকের চারপাশে একবার ঘুরে এল। । ফালাকের থুতনিটা আঙুল দিয়ে উঁচিয়ে ধরল।
“কী রে মেয়ে, কথা বলছো না কেন? তা
সাদের মা চিৎকার করে উঠলেন—
“উর্মিলা! মুখ সামলে কথা বল। তুই এই বাড়ির কেউ নোস। ফালাক আমার বাড়ির সম্মান, আমার সাদের স্ত্রী।”
উর্মিলা এবার হো হো করে হেসে উঠল।
“সাদকে তো আমি চিনি। ও কোনোদিন একে ভালোবাসতে পারে না। আর ও শুধু আমাকে ভালোবেসেছিলো। ও এখনো আমাকে ভালোবাসে। প্রথম ভালোবাসা ভোলা যায় না। ”
“খালামনি আমি সাদের কাছে ফিরতে চাই। আমি জানি সাদ আমায় ফেরাবে না।”
উর্মিলার প্রতিটি কথা ফালাকের কানে বিষের মতো ঢুকছে। মনে মনে ভাবলো ফালাক এ জীবনে কি সে সুখ পাবে না!
চলবে ~~
( উর্মিলাকে দেখে সাদ এর কি রিয়েকশোন হতে পারে?? আর রোজার দিনে প্রতিদিন লেখা কষ্ট হয়ে যায় ছোট ছোট হচ্ছে পর্ব যদি একদিন দুইদিন পরপর দেই তাহলে বড় পর্ব হবে )

