ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ #পর্ব________________৩২

0
29

#ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব________________৩২

গত কয়েকদিন ধরে ঘরে সূর্যের আলো ঢোকেনি। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে আছে দামী মদের কড়া গন্ধ আর সাদের যন্ত্রণাদায়ক নিঃশ্বাসের তপ্ত হাওয়ায়।
সাদ মেঝের ওপর অগোছালোভাবে পড়ে আছে। পরনের শার্টটা ছিঁড়ে গেছে, বোতামগুলো খোলা। দাড়ি গোঁফ বেড়ে মুখটা অচেনা লাগছে। এক হাতে আধভাঙা মদের বোতল, অন্য হাতে ফালাকের গোলাপি রঙের সুতি শাড়িটা। শাড়িটা নিজের মুখের ওপর চেপে ধরে আছে, যেন ওই কাপড়ের ভাঁজেই ফালাকের অস্তিত্ব লুকিয়ে আছে।
“কোথায় গেলি ফালাক?
সাদ হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, আছে এক বুক জ্বালা। মদের বোতলটা দেওয়ালে সজোরে ছুঁড়ে মারল।
‘ঝনঝন!’
কাঁচের টুকরোগুলো চুরমার হয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল।
“আমি আরহাম সাদ মির্জা! আমি যা চাই তা পাই! তবে কেন আমার ফালাককে পাচ্ছি না? কেউ ওকে খুঁজে আনছে না কেন? তোরা সবাই কি মরে গেছিস?”
ঘরের দরজাটা খুলে মীরা ট্রেতে করে খাবার নিয়ে ঢুকল। সাদের এই রূপ দেখে বুকটা কেঁপে উঠে মীরার।
“ভাইয়া… একটু খেয়ে নাও।
সাদ খাবার এর ট্রে-টা হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দিল।
“খাবার? আমি খাবার দিয়ে কী করব? ফালাক ছাড়া আমার পেটে এক ফোঁটা পানিও ঢুকবে না! তুই যা এখান থেকে! সবাই যা! কাউকে দেখতে চাই না আমি!”
মীরা ভয়ে কেঁদে ফেলল। দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সাদ এবার হামাগুড়ি দিয়ে বিছানার কাছে গেল। বালিশটা জড়িয়ে ধরে অহংকারী, রুক্ষ সাদ মির্জা আজ এক নিঃস্ব প্রেমিকের মতো কাঁদছে। বালিশে মুখ গুঁজে ফালাকের নাম ধরে ডাকতে লাগল।
“ফালাক… ফিরে আয়। আমি
সাদের এই পাগলামি, এই ভাঙচুর—সবই মির্জা বাড়ির বাতাসের সাথে মিশে এক মর্মান্তিক করুণ সুর তৈরি করছে।

সাদের দিনগুলো কাটছে এক ঘোরের মধ্যে। চট্টগ্রাম শহরের অলিগলি চষে ফেলেছে ঈশান আর আয়ান। কিন্তু ফালাকের কোনো চিহ্ন নেই। সাদ আজ অনেকদিন পর নিজের রুম থেকে বের হলো। চোখের নিচে কালি, দাড়ি গোফ বড় হয়ে গেছে। ধীরপায়ে ফালাকের ভাইয়ের বাড়ির এলাকায় গেল। আজ গন্তব্য ফালাকের ভাইয়ের বাড়ি নয়, বরং ওই পাড়ার সাধারণ মানুষজন।

সাদ পাড়ার প্রতিটি দোকানে, রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনকে ফালাকের ছবি দেখাচ্ছে।
“দেখেছেন একে? গত কয়েকদিন আগে এই রাস্তা দিয়ে যেতে দেখেছেন?”
সবাই মাথা নাড়ছে। কেউ দেখেনি। সাদ হতাশায় রাস্তার ধারের একটা ল্যাম্পপোস্টে কপাল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দীর্ঘশ্বাসগুলো আগুনের মতো উত্তপ্ত। হঠাৎ আকাশের দিকে মুখ করে চিৎকার করে উঠল—
“ফালাক!
কোথায় তুই?
একবার দেখা দে! আমি আর সহ্য করতে পারছি না!”

সাদের এই হাহাকার শুনে আশেপাশের দু-একজন থমকে দাঁড়াল। ঠিক তখনই ১৬-১৭ বছরের একটা কিশোর ছেলে সাদের সামনে এসে দাঁড়াল। ছেলেটার পরনে সাধারণ গেঞ্জি
“ভাইয়া? আপনি কি ফালাক আপুকে খুঁজছেন?”
সাদ বিদ্যুৎবেগে ছেলেটার কলার চেপে ধরল। চোখে এখন পাগলাটে আশা।

“হ্যাঁ! তুমি জানো ও কোথায়? দেখেছ ওকে?”
ছেলেটি কিছুটা ভয় পেয়ে গেল সাদের উগ্রতা দেখে। আমতা আমতা করে বলল—
“আমি… আমি সেদিন খুব ভোরে বাসস্ট্যান্ডে ফালাক আপুকে দেখেছি। সাথে তিশা আপুও ছিল।”
‘তিশা’ নামটা শুনে সাদ চিনতে পারলো না।ফালাকের ছোটবেলার বান্ধবী তিশা।

আমি ফালাক আপুর বাড়ির দুই বাড়ি পর থাকি।ছেলেটা বলল।

“আর কে ছিল? শুধু ওরা দুজন?”

“না ভাইয়া, সাথে একটা ছেলেও ছিল। ওরা একটা বাসে উঠল। ছেলে? ফালাকের সাথে অন্য কোনো ছেলে? সাদের মনে এক মুহূর্তের জন্য ঈর্ষার আগুন জ্বলে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলাল।

“কোথায় সেই তিশা? ওর বাড়ি কোথায়? বলো আমাকে!”

ছেলেটি আঙুল উঁচিয়ে একটা ছোট টিনের চালের বাড়ি দেখিয়ে বলল—
“ওই যে ওই বাড়িটা তিশা আপুদের। তবে তিশা আপু তো এখন এখানে থাকে না। মাসখানেক হলো ওনার বিয়ে হয়েছে। শুনেছি সিলেটে থাকে।”

সিলেট!

সাদ আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে সব টাকা ছেলেটার হাতে গুঁজে দিয়ে নিজের গাড়ির দিকে দৌড় দিল।আর কৃতজ্ঞতা জানালো।

____________

সেদিন ফালাক এর সারারাত চোখের জল এক মুহূর্তের জন্যও থামেনি। ভোরের আলো ফোটার আগেই ফালাক মির্জা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিল। ওর গন্তব্য ছিল শুধু একটিই—মা-বাবার কবর।
কবরের পাশে বসে ফালাক অঝোরে কেঁদেছে।

“মা, বাবা… কেন আমাকে এই দগ্ধ পৃথিবীতে একা ফেলে গেলে?

ফালাকের চোখে শুধু ভাসছে সেই বন্ধ দরজার দৃশ্য।বুক জ্বলে যাচ্ছে ফালাকের।
কবরস্থান থেকে ফেরার পথে হঠাৎ দেখা হয়ে যায় তিশার সাথে। তিশা—ফালাকের ছোট্টবেলার বান্ধবী।

“ফালাক? তুই এই ভোরে এখানে? তোর এই অবস্থা কেন রে?”

তিশার মায়াবী ডাকে ফালাকের সবটুকু বাঁধ ভেঙে গেল। তিশাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। সবটুকু হাহাকার উগরে দিল ওর কাঁধে। তিশা আর তিশার স্বামী সব শুনল। তিশার স্বামী খুব সাধারণ এক সাদামাটা মানুষ,!.
“শোন ফালাক, এভাবে পথে পথে ঘুরে বেড়ানো তোর জন্য ঠিক হবে না। আমি আমার শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছি, সিলেট। তুই আমাদের সাথে চল। কদিন ওখানে থাকলে তোর মনটা একটু শান্ত হবে। আমার শ্বশুরবাড়ির মানুষগুলো খুব ভালো, তারা তোকে কিছুই বলবে না।”
ফালাক আর দ্বিরুক্তি করেনি। শুধু মনে হচ্ছিল, এই শহর থেকে, অনেক দূরে কোথাও হারিয়ে যেতে চায়। তিশার স্বামীর সাথে ওরা নীল রঙের বাসে উঠে পড়েছিল। সেই ছেলেটি বাসস্ট্যান্ডে ফালাক আর তিশার সাথে যে ছেলেটিকে দেখেছিল, সে আসলে তিশার স্বামী।
সিলেটের ছোট গ্রাম__________

তিশাদের বাড়িটা মাটির দেয়াল আর টিনের চালের এক ছিমছাম ঘর। কিন্তু এখানে একটা অদ্ভুত শান্তি আছে। ফালাক গত কয়েকদিন ধরে এখানেই আছে। ওর সারাটা দিন কাটে প্রকৃত মাঝে। আর তিশার শাশুড়ি মা ও এসে গল্প করেন।। ফালাক প্রথম তিনদিন পাথর হয়ে ছিল। তবে দিন যায় ফালাকের কষ্ট বাড়ে মির্জা বাড়ির সবার কথা খুব মনে পড়ে।। আর সাদ…..

আর সাদ এর কথা ভাবতে ভাবতে আরও বেশি যন্ত্রনায় কাতর।।
ফালাকের অবাধ্য মনটা বারবার চট্টগ্রামে ছুটে যায়।
ফালাকের দুচোখ শ্রাবণের মেঘের মতো ভারী হয়ে থাকলেও সে নিজেকে শক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। মনে মনে ঠিক করেছে, আর কারো করুণার পাত্রী হয়ে সে থাকবে না। এখানে সে কাজ করবে। না হয় চা শ্রমিকের কাজ করবে। খুব সামান্য আয় তবে সে তা দিয়েই কোনোরকম ভাবে চালিয়ে নিবে।।

তিশার শশুরবাড়িটা পাহাড়ি ঢাল জায়গায়। গ্রামের শেষ প্রান্তে বলা চলে। খুব নিরিবিলি জায়গা।।
সামনে একটা জলাশয় আছে ওখান থেকে স্বচ্ছ পানি এনে এরা।। ফালাক জানায় আজ সে যাবে পানি আনতে, তিশা মানা করলেও ফালাক জোর করে যায়। জলাশয়টা যেন এক শান্ত দর্পণ। ফালাক মাটির কলসটা কাঁখে নিয়ে পাথুরে পথ ভেঙে নিচে নেমে এল। তিশা বারবার বারণ করেছিল, ” ফালাক, তুই এই পথে অভ্যস্ত না, পড়ে যাবি তো!” ফালাক শোনেনি। ও চায় নিজেকে কাজের মধ্যে ডুবিয়ে রাখতে, যাতে সেই অভিশপ্ত রাতের স্মৃতি ওকে আর কুঁড়ে কুঁড়ে না খায়।
স্বচ্ছ টলটলে পানি দিয়ে কলসটা ভরল ফালাক । ভিজে যাওয়া শাড়ির আঁচলটা গায়ে জড়িয়ে কলসটা মাজায় তুলল। এক মুহূর্তের জন্য জলাশয়ের পানিতে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল—চোখের নিচে গাঢ় কালি, ফ্যাকাসে মুখ ।

ফালাক যখন ঘুরে দাঁড়াল ফেরার জন্য, ঠিক তখনই ওর পৃথিবীটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। পাথুরে পথের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এক দীর্ঘদেহী পুরুষ।

‘ঝনঝন!’

ফালাকের হাত থেকে মাটির কলসটা ছিটকে পাথরের ওপর পড়ে চুরমার হয়ে গেল। কলস ভরা স্বচ্ছ পানিটুকু কলকল শব্দে মাটির বুক চিরে জলাশয়ে ফিরে যেতে লাগল। ফালাকের শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। বিশ্বাস করতে পারছে না, এই জনমানবহীন পাহাড়ি এলাকায় সাদ মির্জা কীভাবে পৌঁছে গেল!

সিলেটের এই নির্জন পাহাড়ের ঢালে, জলাশয়ের স্বচ্ছ পানির কলকল ধ্বনির মাঝে সময়টা যেন এক নিমিষেই থমকে গেল। ফালাকের দুচোখ অবিশ্বাসে স্থির হয়ে আছে সাদের ওপর।
সাদকে দেখে ফালাকের বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। মানুষটার এই কী দশা! উস্কোখুস্কো চুল, মুখভর্তি অবিন্যস্ত দাড়ি, আর চোখের নিচে গাঢ় কালচে গর্ত। ফালাক নিজের অজান্তেই এক পা এগিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু উর্মিলার বিষাক্ত স্মৃতি ওকে আবার পাথর করে দিল।
সাদ ফালাকের ঠিক এক হাত দূরত্বে এসে থামল।ফালাকের চোখের দিকে তাকিয়ে খুব ধীরে ধীরে
বলল—

“৬ দিন… ২২ ঘণ্টা… ৪৬ মিনিট…”পর……

ফালাক স্তম্ভিত হয়ে গেল। সাদ কি তবে প্রতিটা সময় গুনে রেখেছে?
সাদ এক ঝটকায় ফালাককে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিল। দুহাতে ফালাকের পিঠ আর মাথা চেপে ধরে যেন নিজের হারিয়ে যাওয়া প্রাণটা ফিরে পেল। সাদের নিঃশ্বাস ফালাকের ঘাড়ের কাছে এসে আছড়ে পড়ছে।

“কেন করলে এমন?

ফালাক এতক্ষণ পাথরের মতো শক্ত হয়ে থাকার চেষ্টা করছিল, কিন্তু সাদের এই হাহাকার মেশানো স্পর্শে সব বাঁধ ভেঙে গেল যেন । সাদের শার্টের কলারটা খামচে ধরল। দুই চোখ বেয়ে শ্রাবণের ধারার মতো জল নামতে লাগল।

সাদ ফালাকের মুখটা দুহাতে আগলে ধরল। ওর আঙুলগুলো দিয়ে ফালাকের চোখের জল মুছে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছে, কারণ জলের ধারা থামছেই না।

দুজন মানুষের একে অপরকে হারানোর ভয় আর ফিরে পাওয়ার তীব্র আকুতি। তিশা আর ওর স্বামী দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়াল। তারা বুঝতে পারল, এই প্রলয়ঙ্করী ভালোবাসার মাঝে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা কারো নেই।তিশা আর তিশার স্বামী দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে পরম শান্তিতে হাসল।
ফালাক সাদের বুকে মুখ গুঁজে কাঁদছে, আর সাদ ফালাকের কপালে মুখে বারবার পাগলের মতো চুমু খাচ্ছে। যেন নিশ্চিত হতে চায় যে ফালাক সত্যিই ওর কাছে ফিরে এসেছে। সাদের ৬ দিন ২২ ঘণ্টার বীভৎস প্রতীক্ষার অবসান ।

______________

নির্জন জলাশয়ের পাশে সিমেন্টের ভাঙা বেঞ্চটাতে সাদ শুয়ে আছে ফালাকের কোলে মাথা রেখে।ফালাকের কম্পিত হাত সাদের অবিন্যস্ত চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে, আর নোনা জল টুপটুপ করে সাদের কপালে পড়ছে।

সাদ চোখ বন্ধ করে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ৬ দিন ২২ ঘণ্টার ভয়াবহ যন্ত্রণার পর এই প্রথম নিশ্বাসটা স্বাভাবিক হচ্ছে। ফালাকের কোলের উষ্ণতায় যেন নিজের হারানো স্বর্গ খুঁজে পেয়েছে। কিছুক্ষণ পর সাদ বলতে শুরু করল—

“লন্ডন থেকে যখন ফিরলাম, বাড়ির সবাই বিয়ের জন্য পাগল করে তুলল। আমার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু উর্মিলা ছিল খালার একমাত্র আদরের মেয়ে, মা-ও খুব পছন্দ করতেন। তাই আর না করতে পারিনি। আমি সংসার করার চেষ্টা করেছিলাম ফালাক, নিজে থেকে অনেক এফোর্ট দিয়েছি। মেয়েলি আবেগ-অনুভূতি নিয়ে আমার ধারণা কম ছিল, কিন্তু ও আমার বিবাহিত স্ত্রী ছিল বলে ওকে সম্মান করার, ভালোবাসার চেষ্টা আমি করেছি।”

সাদ থামল। গলার স্বরে একরাশ তিক্ততা আর ঘৃণা ফুটে উঠল। ফালাক নিস্পলক চোখে তাকিয়ে সাদের কথাগুলো শুনছে।
কিন্তু বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারলাম আমি ভুল মানুষের পেছনে সময় নষ্ট করছি। ওর চরিত্র কতটা জঘন্য ছিল সেটা আমি আগে বুঝিনি। বিয়ের আগে থেকেই ওর অন্য পুরুষের সাথে সম্পর্ক ছিল, আর বিয়ের পরেও সেটা চালিয়ে যাচ্ছিল। আমি খালামণির সম্মানের দিকে তাকিয়ে বাড়িতে কাউকে কিছু জানাইনি, শুধু নিঃশব্দে ওকে ডিভোর্স দিয়ে জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েছি। তখন থেকেই আমার বিশ্বাস উঠে গিয়েছিল। মনে হতো সব মেয়েই বুঝিএমন, সুযোগ পেলেই আমাকে ছেড়ে অন্য কারো কাছে চলে যাবে।”
সাদ ফালাকের হাতটা টেনে নিয়ে নিজের গালের ওপর রাখল।

“তারপর যখন তুমি এলে, আমি ভেবেছিলাম তুমিও বুঝি তেমনই হবে। টাকার লোভে আমায় বিয়ে করেছো। কিন্তু আস্তে আস্তে আমি অবাক হতে থাকলাম। কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করে, কেউ আমার ব্যথায় কাঁদে, কেউ নিজ হাতে আমায় খাইয়ে দেয়—এসব আমার কাছে একদম নতুন ছিল ফালাক। মা ছাড়া কেউ কোনোদিন আমার এতোটা যত্ন নেয়নি। আমার রাগ, জেদ আর পাগলামি তুমি যেভাবে সহ্য করেছো, তাতে আমি ঠিক করেছিলাম তোমাকে আর কোনোদিন কষ্ট পেতে দেব না। তোমাকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে যাব।”
সাদ হঠাৎ উঠে বসে । ফালাকের চোখের দিকে তাকিয়ে হাত দুটো শক্ত করে ধরল।

“সেদিন যখন ওই *****(উর্মিলা) বাড়িতে এল, আমার মেজাজ এমনিতেই সপ্তমে চড়ে ছিল। কিন্তু খালামণির মাস দুয়েক আগে একটা বড় অপারেশন হয়েছে বলে আমি রাগে কোনো অঘটন ঘটাতে চাইনি। উর্মিলা আমার ঘরে ঢুকে যখন দরজা বন্ধ করল, আমি রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। যখন তোমাকে নিয়ে আজেবাজে কথা বলছিল, আমি ওকে মারতে শুরু করি।

ফালাক এতক্ষণ স্থির হয়ে সব শুনছিল। বুকের ভেতরের পাথরটা যেন মুহূর্তেই গলে জল হয়ে গেল। বুঝতে পারল, সাদের সেই রুক্ষতার আড়ালে কতটা ক্ষত আর একাকিত্ব লুকিয়ে ছিল।
ফালাক আর থাকতে পারল না। সাদের প্রশস্ত বুকে মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠল।

“আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম । আমার মনে হয়েছিল আমি আপনার জীবনে কোনো অংশই নই।”

সাদ ফালাকের চিবুক ধরে মুখটা উঁচিয়ে ধরল। “আর কোনোদিন আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাববে না। যদি যাও , তবে আমি নিজেকে শেষ করে দেব, তোমাকেও শান্তিতে থাকতে দেব না। তুমি শুধুই আমার ফালাক।”

ফালাকের হৃদপিণ্ড যেনো কেঁপে উঠে শুনে।

ফালাকের কম্পিত হাত দুটো নিজের গালের ওপর চেপে ধরল সাদ।ফালাকের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । চোখ দুটো আজ যেন স্বচ্ছ আয়না, যেখানে কোনো লুকোছাপা নেই।
“ফালাক… একটা সত্যি কথা আজ বলি। উর্মিলা আমার জীবনে প্রথম নারী ছিল ঠিকই, কিন্তু ও কোনোদিন আমার মন বা শরীর—কোনোটাকেই স্পর্শ করতে পারেনি। ওর নোংরামি জানার পর থেকে আমি ওকে ঘেন্না করতাম।”
সাদ একটু থামে । ফালাকের কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে খুব সন্তর্পণে বলল—
“আমার জীবনে তুমি প্রথম নারী না হলেও, আমার জীবনে প্রথম ‘স্পর্শ’ করা নারী কিন্তু তুমি -ই ফালাক। তোমার পবিত্র মায়া, তোমার সলজ্জ চাহনি—সবকিছু দিয়ে তুই আমাকে যেভাবে দখল করেছো , সেটা আমার জীবনে প্রথমবার। এর আগে আরহাম সাদ মির্জা কোনো নারীর কাছে এভাবে হার মানেনি।”
ফালাকের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। সাদের এই স্বীকারোক্তি মনের সবটুকু অন্ধকার দূর করে দিয়ে এক বিশাল জোৎস্না নামিয়ে আনল।

“আপনি সত্যিই বলছেন?”

সাদ ফালাকের চিবুকটা উঁচিয়ে ধরল। কি মনে হয় এই ৬ দিন ২২ ঘণ্টা আমি মরে মরে বেঁচে আছি কোনো মিথ্যে বলার জন্য?
সাদ ফালাকের মুখটা দুহাতে আলতো করে ধরল। ফালাকের চোখের পাতায় এখনো কান্নার নোনা জল লেগে আছে, কিন্তু সেই চোখে এখন আর কোনো সংশয় নেই, আছে শুধু এক সমুদ্র সমর্পণ। সাদের রক্তবর্ণ চোখ দুটো আজ তৃষ্ণার্ত। ৬ দিন ২২ ঘণ্টার দীর্ঘ বিচ্ছেদ, হাহাকার আর না পাওয়ার যন্ত্রণা ওকে পাগল করে দিয়েছে।
​সাদ ফালাকের খুব কাছে মুখ নিয়ে এল। নিশ্বাস ফালাকের ঠোঁটে এসে আছড়ে পড়ছে। ফালাক আবেশে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল। অনুভব করল সাদের ঠোঁটের স্পর্শ।
​দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যেন এক পশলা বৃষ্টির মতো।ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে যেন নিজের সবটুকু তৃষ্ণা মিটিয়ে নিতে চাইল।
​ফালাক সাদের শার্ট খামচে ধরে । মনে হলো এই মুহূর্তে পৃথিবীটা যদি থেমে যেত, তবে মন্দ হতো না। সাদের এই নিবিড় সান্নিধ্য ফালাকের শরীরের শিরায় শিরায় এক অদ্ভুত শিহরণ বইয়ে দিচ্ছে। সাদ ফালাককে আরও নিবিড়ভাবে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল, যেন এক মুহূর্তের জন্য ছাড়লে ফালাক আবার ওই কুয়াশার মাঝে মিলিয়ে যাবে।

এই নির্জন পাহাড়ি জলাশয়ের পাড়ে ফালাক আজ ওর জীবনের সবচেয়ে বড় উত্তরটা খুঁজে পেল।

চলবে ~~
( ফালাক সাদের কষ্ট ভালো লাগছে না তাই মিলিয়ে দিলাম, তাড়াতাড়ি দিয়েছি আজ।টানা আট ঘন্টা ধরে একটানা বসে ভেবে ভেবে লিখেছি কতবার যে কেটেছি আবার শুরু করেছি ঠিক নাই। যাইহোক এখন আমার পাঠক ও খুশি আমিও খুশি। হ্যাপি রিডিং 🤍)

#everyonefollowers #উপন্যাস #উপন্যাসপ্রেমী #গল্পফ্যাক্ট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here