#ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব__________৩৪
আয়ান ফালাক কে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আবার হাসপাতালে গেলো।
বাড়িতে পৌঁছাতেই ফালাক রুমে চলে গেলো দ্রুত। রুমের দরজা খুলতেই ফালাক দেখে পায়ের ওপর পা তুলে সাদ বসে আছে সিঙ্গেল সোফাটায়। ফালাকের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল।
সাদ সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে, এক হাত সোফার হাতলে আর অন্য হাতে একটা স্ট্রেস বল নিয়ে সজোরে চাপ দিচ্ছে। পরনের সাদা শার্টের হাতাগুলো কনুই পর্যন্ত গুটানো, আর চোখের তীক্ষ্ণ চাউনি সরাসরি ফালাকের ওপর স্থির হয়ে আছে।
সাদ কোনো কথা বলছে না, শুধু একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। এই নীরবতা ফালাকের কাছে হাজারটা চিৎকারের চেয়েও বেশি ভয়ংকর মনে হচ্ছে।
সাদ খুব শীতলল কণ্ঠে বলল-
“দরজাটা বন্ধ করো ফালাক।”
ফালাক কাঁপাকাঁপা হাতে দরজাটা লাগিয়ে দিল। সাদের গলার স্বর শুনে শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। ফালাক ধীরপায়ে সাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
সাদ হঠাৎ সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো। ফালাকের খুব কাছে এসে দাঁড়াতেই ফালাক এক পা পিছিয়ে গেল। সাদের লম্বা ছায়াটা ফালাকের ওপর আছড়ে পড়ছে। সাদ ফালাকের চিবুকটা এক আঙুলে উঁচিয়ে ধরল।
“কোথায় গিয়েছিলে? কার সাথে গিয়েছিলে? আর আমার পারমিশন ছাড়া কেন গিয়েছিলে—এসবের উত্তর আমার মুখস্ত ফালাক। আয়ানকে আমি অলরেডি ফোন করেছি। এখন ভয়ে আছে । কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো অন্যখানে।”
“হাসপাতালে উর্মিলার সাথে দেখা করার খুব শখ হয়েছে তোমার? যে সাপটাকে আমি ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করেছি, তার সাথে কথা বলার জন্য তুমি আমার অবাধ্য হলে? আমার অনাগত সন্তানদের ঝুঁকি নিয়ে তুমি একা ঐ বিষাক্ত মেয়েটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে?”
ফালাক দেখল সাদের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। ভয় না পেয়ে সাদের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল—
“আমি একা যাইনি আয়ান ভাইয়া ছিল। আর আমি কোনো ঝুঁকি নিইনি। আমি শুধু চেয়েছি ওনি আর আপনার সামনে না আসুক। আমি আপনার স্ত্রী, আপনার সন্তানের মা। ওনার কুৎসিত নজর যেন আর কোনোদিন আপনার ওপর না পড়ে, সেটাই মনে করিয়ে দিয়ে এসেছি।” আপনি যে যন্ত্রণা পেয়েছেন, উনি যেন আর আপনার সামনে না আসে, আমি চাইনা ওনাকে দেখে সেসব কালো অধ্যায় আপনার মনে পরুক।
সাদ এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। ফালাকের চোখের অদ্ভুত তেজ দেখছিল। যে মেয়েটা আগে ওর চোখের দিকে তাকাতে ভয় পেত, সে আজ ওর যন্ত্রণার জন্য বাঘিনী হয়েছে । সাদের রাগটা হঠাৎ করেই মায়ায় রূপ নিতে শুরু করল। ফালাকের দুগালে হাত রেখে কপালে নিজের কপাল ঠেকালো।
” আমি ওকে ঘৃণা করি, ওর ছায়াটাও আমি তোমার ওপর পড়তে দিতে চাই না। পরের বার যদি আমাকে না বলে বের হয়েছ, তবে তোমাকেএই রুমে তালা মেরে আটকে রাখব। মনে থাকবে?”
ফালাক মুচকি হাসল। মাথা ঝাকায়।
“হুম মনে থাকবে।
_____________
আজ মির্জা বাড়ি যেন এক টুকরো জান্নাতে পরিণত হয়েছে। বাড়ির সামনের বিশাল সাদা চাদর বিছানো হয়েছে, আর সেখানে শারি বেঁধে বসে আছে মাদ্রাসার এতিম বাচ্চাগুলো। তাদের মুখে নূরের আভা। পুরো বাড়িতে একটা স্নিগ্ধ পরিবেশ, আজ এদের জন্য ইফতারি আয়োজন করা হয়েছে।
ফালাক নিজের হাতে সবকিছু তদারকি করছে। সাদের কড়া নির্দেশ ছিল ও যেন রান্নাঘরের ধারেকাছে না যায়, কিন্তু ফালাক কি আর তা শোনে? একবার ভেতরে গিয়ে দেখছে শরবতে চিনি ঠিক হলো কি না, আরেকবার তো অন্য কিছু। সবাই বকা দিলেও ফালাক শোনে না। এখন কেবল দুমাস চলছে তেমন সমস্যা হবে না বলে ফালাক । ফালাক কোনো ভারী কাজ করছে না। ফালাকের চুপচাপ বসে থাকতে ভালো লাগে না। সব সময় কাজ করতে থাকা ফালাক এখন অলস বসতে ভালো লাগে না। আর সে তো কোনো কাজ সেভাবে করছে না। শুধু দেখছে সব ঠিক আছে কিনা। যদিও এতো মানুষ আছে করার তাও।
রিমা আর নীলা ফালাককে আগলে রাখছে।
“ভাবি, তুমি প্লিজ বসো। দেখো সব ঠিক আছে।”
ঠিক ইফতারের ১০ মিনিট আগে এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখে মির্জা বাড়ির সবাই থমকে গেল। সাদ সাদা পাঞ্জাবী, মাথায় টুপি পড়ে সোজা বাচ্চাদের মাঝে বসে পড়ে অন্য সবার মতো। চোখেমুখে এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য মিশ্রিত প্রশান্তি।
সাদের ফর্সা মুখটা আজ যেন এক অপার্থিব নূরে ঝলমল করছে। বাড়ির প্রত্যেকে অবিশ্বাসে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে। সবাই অবাক।
বারান্দার দাঁড়িয়ে থাকা ফালাকের চোখের পলক পড়ছে না। … ওর সেই জেদি, একরোখা স্বামী আজ কতটা বিনয়ী! ফালাকের চোখের কোণে নোনা জল চিকচিক করে উঠল। দেখল সাদ খুব নিচু হয়ে পাশে বসা একটা সাত-আট বছরের বাচ্চার সাথে কথা বলছে, ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
ঠিক তখনই হুজুর মোনাজাত শুরু করলেন।
হুজুরের ভরাট কণ্ঠস্বর আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তুলল। সাদ চোখ দুটো বন্ধ করে, হাত দুটো ভাঁজ করে মোনাজাতে শামিল হলো। সাদের শান্ত, গম্ভীর প্রশান্তিময় মুখচ্ছবি দেখে ফালাকের মনে হলো— এতো সুন্দর দৃশ্য।
এদিকে সাদের মা আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছলেন। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, “আমার ছেলেটা বদলে গেছে। ফালাক আমার পাথর ছেলেটাকে সত্যিই মানুষ করে তুলেছে।”
মোনাজাত শেষ হতেই চারদিকে এক অদ্ভুত শান্তি নেমে এল।
__________
দুদিন পর –
সারাদিন ভ্যাপসা গরমে ফালাকের শরীরটা একদম মেজমেজ করছিল। শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা পানির স্পর্শে ফালাকের সতেজ লাগলো । তবে মীরার চিৎকার শোনা গেলো। মীরার মামাবাড়ি থেকে অনেকগুলো নতুন ড্রেস পাঠিয়েছে, সেগুলো ভাবিকে না দেখালে ওর পেটের ভাত হজম হবে না।
“আসছি রে বাবা! একটু দাঁড়াও, আমি কি পালিয়ে যাচ্ছি?”
মীরার জেদের কাছে হার মেনে ফালাক তাড়াহুড়ো করে ভেজা শাড়িটা একপাশে রেখে,ভেজা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে পেঁচিয়ে বের হলো। মীরা তখনো বাইরে থেকে তাগাদা দিচ্ছে। ফালাক ভাবল, “ভেজা শাড়িটা পরেই ধুয়ে দেব, এখন মীরাকে শান্ত করে আসি।”
ফালাক মীরার রুমে চলে গেল। সেখানে মীরা বিছানায় স্তূপ করে রাখা জামাকাপড় নিয়ে বসে আছে।
ফালাক মীরার খুশিতে সামিল হলো। একটার পর একটা ড্রেস দেখছে আর মতামত দিচ্ছে। মীরার চঞ্চলতা দেখে ফালাকের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। প্রায় আধা ঘণ্টা ওখানেই কেটে গেল।
মীরার ঘর থেকে বের হয়ে ফালাক নিজের রুমে ঢুকল, বারান্দার স্লাইডিং ডোরটা খোলা দেখে ফালাক ধীরপায়ে সেদিকে এগিয়ে গেল।
বারান্দার গ্রিলের সাথে লাগানো স্ট্যান্ডে সাদ খুব মনোযোগ দিয়ে ফালাকের ভেজা শাড়িটা মেলে দিচ্ছে। সাদ শাড়ির ভাঁজগুলো খুব নিখুঁতভাবে টেনে দিচ্ছে যাতে কুঁচকে না থাকে। ফালাক দরজার কাছে দাঁড়িয়ে পাথরের মতো জমে গেল।
একি… আপনি আমার শাড়ি ধুয়ে দিয়েছেন কেন? এগুলো তো আমি ধুয়ে দিতাম। আপনি…!”
সাদ একবার আড়চোখে ফালাকের দিকে তাকায়। কোনো উত্তর না করে ফালাকের পাশ কাটিয়ে ভেতরে চলে এল। ফালাক কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
আসল ধাক্কাটা খেলো ফালাক একটু পর। মুখটা মুহূর্তেই রক্তিম হয়ে উঠল। লজ্জায় ফালাকের মনে হলো যেন মাটির সাথে মিশে যাবে। শাড়ির আড়ালে ওর অন্তর্বাস সাদ নিজ হাতে ধুয়ে খুব সুন্দর করে ঝুলিয়ে দিয়েছে।
“ইয়া আল্লাহ! আমি এখন মুখ দেখাবো কীভাবে? উনি… উনি ওগুলোও ধুয়ে দিয়েছেন!
ফালাক তড়িঘড়ি করে রুমে ঢুকল। সাদ টি শার্ট পড়ছে। ফালাক সামনে গিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। কান দুটো গরম হয়ে লাল হয়ে গেছে।
“আপনি… আপনি ওগুলো কেন ধুতে গেলেন?
প্রেগন্যান্সি নিয়ে ঝুকে কাপড় কাঁচা আর বালতি তোলা তোমার জন্য নিষিদ্ধ। আমি চাই না আমার অনাগত সন্তান এর আর তোমার কোনো ক্ষতি হোক। এখন কথা না বাড়িয়ে চুলগুলো শুকিয়ে নাও,।
সাদের এই সোজাসাপ্টা কথায় ফালাক কোনো যুক্তি খুঁজে পেল না। ফালাকের মনে এক অজানা অনুভূতি মিষ্টি মিষ্টি লাগছে সব কিছু।
চলবে ~~
#everyonefollowers #উপন্যাস #উপন্যাসপ্রেমী #গল্পফ্যাক্ট

