শূন্য_অর্থ_পূর্নতা(২)

0
32

#শূন্য_অর্থ_পূর্নতা(২)
….
অন্ধকার রাত , হুর এককোনে সেই বোরকা গায়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে ।ভয়ে শরীর টা থরথর করে কাপছে । ঘড়ির টিকটিক আওয়াজ জানান দিচ্ছে রাত সাড়ে আটটা। কিন্তু এতো রাত মনে হচ্ছে কেন,? তার জীবনের বাতি নিভে গিয়েছে বলে কি এই ভাবনা!
হাঁটু অবধি কালো সাদা স্টাফ গাউন পড়া মেয়েটা এগিয়ে আসলো ওর দিকে ।হুর আরোও জড়োসড়ো হয়ে গেলো। মেয়েটার দিকে ভীতু দৃষ্টিতে তাকিয়ে মনে করার চেষ্টা করলো মেয়েটার নাম কি।
ব্রেনে চাপ প্রয়োগ করতেই মনে পড়লো মেয়েটার নাম রুমি । একজন লেডি স্টাফ।
হুরের মনে পড়লো নওশাদ এর বলা কথাটা -“তুই কাজের লোকের মতো থাকবি , আমার মেয়ের দেখাশোনা করবি”
হুর নিজের কান চেপে ধরলো , নাহ সে এসব কাপড় জীবনেও পড়বে না , মরে গেলেও না ।কাজের লোক হলে তো ওকে এই ছোটো জামা পড়তে হবে !
এটা হুর জীবনেও করবে না ।

রুমি একটা প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে বললো – এই ড্রেস পরে নাও । স্যার দিয়েছেন ।
হুর সেটা নিয়ে দেখলো ও একই জামা ।পাশে রেখে দিল এরপর উঠে দাঁড়িয়ে রুমির উদ্দেশ্যে বললো- আমি এসব জামাকাপড় পড়তে পারবো না আপু , আমার পর্দা খেলাপ হবে , আপনি আমাকে বোরকা এনে দিন নাহলে আমি এই পোশাকেই ঠিক আছি ।

রুমি সরু চোখে মেয়েটিকে দেখলো – বয়স আন্দাজ করতে পারলো না নীল বোরকা , কালো হিজাব এ আবৃত মেয়েটার । কিন্তু গলার স্বর শুনে বুঝতে পারলো হয়তো খুব কমই হবে বয়স ।অবাক হলো রুমি ।
সাথে মুখে ভয়ের ছাপ দেখা গেলো , মেয়েটার উপর মায়া হচ্ছে।

রুমি- দেখো স্যারের কথার বাইরে আমরা যেতে পারবো না ।ক্ষমা করো আমায় , এটা পড়তে হবে তোমার।ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নাও ।

হুর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো, আচমকা রুমির পায়ের কাছে বসে পড়লো- আপু আমাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করুন দয়া করে , আল্লাহ আপনার ভালো করবেন।আমার এতো বছরের পর্দা ইমান সব শেষ হয়ে যাবে ।আমি আল্লাহর কাছে কি জবাব দেব ? পাপী আমি , এতো বড়ো পাপ করলে আমার জাহান্নামেও জায়গা হবে না ।

রুমি অবাক হয়ে কথা গুলো শুনলো । মেয়েটার কথাগুলো তার কাছে অদ্ভুত লাগলো । কিন্তু কিছু বললো না ।তার মাথায় কিছু আসছে না ।

হুরের কান্না দেখে পায়ের কাছ থেকে তুললো হুরকে , এরপর জামাটা রেখে দিয়ে বললো- ঠিক আছে পড়ার দরকার নেই তুমি তোমার পোশাক এই থাকো । ফ্রেশ হয়ে এসো নূর এর সাথে দেখা করতে যেতে হবে ।

হুর বুঝলো তার এখানে থেকে বের হওয়া কঠিন হবে , সে আসেপাশে অনেক রক্ষীদের দেখেছে ।তাই কান্না থামিয়ে জিজ্ঞেস করলো – নূর কে?

রুমি যেতে যেতে বললো- স্যারের মেয়ে ।

রুমি চলে যেতেই হুর পাশের ওয়াসরুমে চলে গেলো , ফ্রেশ হয়ে ওজু করে আসলো , আজান দিয়েছে একটু আগে ।
এখানে কোনো জায়নামাজ খুঁজেও পেলো না, বুঝতে পারলো হয়তো কেউ পড়ে না নামাজ। কিন্তু এক কোনে ভাঁজ করা একটা জায়নামাজ পেলো ।সেটা নিয়ে নামাজ পড়ে নিল।
নামাজ পড়ে মোনাজাত এ কান্নায় ভেঙে পড়লো হুর ।

– আল্লাহ আমি তো কোনো পুরুষের সংস্পর্শে কখনো আসি নি । আমি যদি বোনের কথায় না ভুলে পার্টিতে না যেতাম তাহলে এসব কিছুই হতো না ।আমাকে মাফ করো আল্লাহ। একজন বিবাহিত পুরুষ আমার স্বামী কিকরে হতে পারে আল্লাহ।

– ইয়া আল্লাহ আমি আমার স্বামীর ভাগ কীভাবে অন্য নারীকে দেব আল্লাহ। আমার স্বামীর প্রথম সন্তান এর মা তো আমার হওয়ার কথা ছিল তাহলে এতোবড় শাস্তি কেন দিলে আল্লাহ।আমি আম্মু আব্বুর কাছে যেতে চাই। সাহায্য করো আল্লাহ।

রুমি হুর কে নিয়ে এসে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।হুর জায়নামাজ ভাঁজ করে ডানে তাকাতেই রুমির বিষ্ময় ভরা মুখটা দেখতে পেলো ।

রুমি- মাশাআল্লাহ।তুমি কি কোনো পরী ?

কান্না করার ফলে চোখদুটো টকটকে লাল হয়ে চোখ ফুলে গিয়েছে । গোলগাল ধবধবে ফর্সা মুখটা লাল হয়ে আছে , এতে সৌন্দর্যের কোনো ভাটা পড়েনি ।
হুর লজ্জা পেলো রুমির কথায় – না আপু কি বলছেন এসব , আমি হুর ।

রুমি অবাক হয়ে বললো- তুমি আসলেই একটা হুর ।

কথাটা বলে নিজের ঘোর থেকে বেরিয়ে এলো রুমি , কিসব বলছিস ভেবে লজ্জা পেলো – দুঃখিত কিছু মনে করো না ।চলো আমার সাথে ।

হুর হাত মোজা আর মাস্ক টা পড়ে নিল । এবাড়িতে অনেক পুরুষ কর্মী আছে , হুর এভাবে কখনোই যাবে নাই বাহিরে ।


দড়জা খুলে একটা ছোটেখাটো রুমের ভেতর প্রবেশ করলো হুর , জায়গাটা খুব শান্ত নিরিবিলি। গোলাপী রঙে রুমটা ডিজাইন করা হয়েছে । রুমের মাঝে গোল বড়ো বিছানায় যেন একটা ছোট্ট পরী শুয়ে আছে ।হুরের দৃষ্টি থেমে গেলো ।এতো সুন্দর বাবু!
হুর এগিয়ে গেলো নূর নামের আটমাস এর বাবুটার দিকে ।মুখটা কি অসম্ভব মায়াবী!
নূর আড়মোড়া দিয়ে বিছানায় গড়াগড়ি করছে । সেখানে একজন স্টাফ বসে আছে ।ইনি সবসময় বসে থাকে নূরের পাশে ।
হুর মেয়েটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো – ওর মা কোথায়?
রুমি একটু চমকে উঠলো , এরপর নিজেকে সামলে উত্তর দিল – আছে ।

হুর ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো – কোথায়? নিজের মেয়েকে কাজের লোকদের কাছে মানুষ করতে দেয় কোন মা?

রুমি – এতো প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমাদের কাজ না , তুমি নিজের কাজ করো ।
দুজন স্টাফ ই বেরিয়ে গেলো ।

হুর নূরের পাশে গিয়ে বসলো , নূর চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো এই নতুন মানুষ টা কে ।হুর কে চিনতে না পেরে ফ্যাচফ্যাচ করে কাদতে লাগলো ।হুর মনে করলো হয়তো ওকে মাস্ক পড়া দেখে ভয় পেয়েছে । মাস্ক খুলে নূর কে কোলে নিলো হুর ।হাত পা অসম্ভব রকমের কাপছে। জীবনেও কোনো বাচ্চা কোলে নেয়নি ।
সবসময় বাবা মা ভাই ছায়ার মতো আগলে রেখেলে , এখন সেই হুর ছোটো একটা বাচ্চা কে কীভাবে রাখবে?
বাচ্চা টা অদ্ভুত ভাবে হুরের মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে গেলো । দুহাতে হুরের গাল ধরার চেষ্টা করলো ।ধরতে সফল ও হলো ।

হুর ভয় পাচ্ছে খুব, কোল থেকে বিছানায় রেখে উঠে দাঁড়ালো।এই বাচ্চা পালা ওর কাজ না ।কি নরম শরীর মনে হচ্ছে ধরলেই ব্যাথা পাবে ।

কিছুক্ষন পর রুমি বাচ্চার খাবার নিয়ে আসলো , বাচ্চা যেটা খায় ।হুর দূরে সরে বসলো , ভেবেছে রুমি হয়তো নূর কে খাওয়াবে ।
তাই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো – ও কি মায়ের বুকের দুধ খায় না ।

রুমি ছোট্ট করে উত্তর দিলো – না ।

এরপর হুরের দিকে তাকিয়ে বললো- তুমি দূরে দাঁড়িয়ে আছো কেন? ওকে খাওয়াও ।
হুর থতমত খেয়ে গেলো , হুর খাওয়াবে! তাও এই বাচ্চাটাকে ? হুরকেই তো ওর মা খাইয়ে দেয় ।জীবনেও নিজ হাতে ভাতটা পর্যন্ত খায়নি ও ।

রুমি চলে যেতেই, হুরের চোখে পানি চলে আসলো , এতো ধৈর্য ধরে একটা বাচ্চা খাওয়ানো বড়ো কষ্টের কাজ ।
হুর – আমি জীবনেও নিজ হাতে খাইনি নূর , পাপা নাহলে মাম্মা খাইয়ে দিতো আমি তোমাকে কিকরে খাওয়াবো ?
নূর দাঁত ছাড়া মাড়ি বের করে হাসছে ।
নূর খুব কষ্টে একচামচ খাবার তুললো । কিন্তু তুলতে গিয়ে মনে হলো চামচ ধরতে কি ভুলে গেলো না কি?

নূর এর পুরো শরীর মাখিয়ে ফেললো হুর । এরপর নূরের অবস্থা দেখে হুর দুহাতে নিজের মুখ চেপে ধরে কেঁদে উঠল।
এদিকে নূর মজা পাচ্ছে, হাতে লেগে থাকা খাবার দুহাতে কচলিয়ে যাচ্ছে আর হাসছে ।
কিছুক্ষন পর রুমি এসে এই অবস্থা দেখে কপাল চাপড়ালো।হুর কে যেতে বলে নূর কে পরিস্কার করিয়ে , খাবার খাইয়ে দিলো ।
এরপর হুরকে নূর এর সাথে থাকতে বলে নিজের কাজে চলে গেলো ।

নূর খুব শান্ত মেয়ে জ্বালায় না একদম সারাক্ষণ শুধু হাসে ।হুর নূরের দিকে তাকিয়ে ভাবলো , সেও তো এমন শান্ত একটা মেয়ে সবসময় হাসতো ।এখন সারাদিন কান্না করা লাগছে ।
নূরকে জাপটে ধরে ঘুম পাড়ালো। এরপর নিজে মাস্ক পরে হাতমোজা পড়ে নিল ।জুতা খোঁজার সময় নেয় , রাত দশটার কাছাকাছি।পালাতে হবে দ্রুত।


হুর ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো রুম থেকে , আসেপাশে সবাই যেন তীক্ষ্ণ চোখে তাকেই দেখছে , পাহাড়া দিচ্ছে । অদূরে মেহেরিন মির্জা কে বসে থাকতে দেখলো ।কারোর সাথে কথা বলছে ।
হুর হতাশ হয়ে স্টাফ রুমে গেলো । আপাতত সেখানে কেউই নেই সকলে খাবার খাওয়ার স্থানে আছে ।
হুর হতাশ হতেই চোখ পড়লো বারান্দায়।গ্ৰীল দেওয়া বারান্দায় একটা গ্ৰীলের দড়জা ।সেটা তালা দেওয়া ।তবে সেটা খুলতে পারলে লাফ দিয়ে নিচে যাওয়া যাবে ।
এই দোতালা থেকে কীভাবে লাফ দিবে সেটা ভাবলো না ।ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে চাবি খুঁজলো পুরো রুম তন্ন তন্ন করে ।একটা চাবির ঝাঁক পেলো যেন টেবিলের ড্রয়ার এ । পঁচিশ খানেক চাবি হবে নিম্নে ।

প্রত্যেকটা দিয়ে খোলার চেষ্টা করলো । হঠাৎ কারোর পায়ের শব্দ পেলো হুর । দ্রুত বারান্দায় কাপড়ের পেছনে লুকিয়ে গেলো ।ওকে এখানে দেখলে ঝামেলা কারন ওকে তো নূরের রুমে থাকতে বলা হয়েছিল।

হুর তাকিয়ে দেখলো একজন স্টাফ এসেছে , এসে হুরের সামনে থেকে একটা কাপড় উঠিয়ে নিয়ে চলে গেলো । হুরের সামনে আরেকটা কাপড় থাকায় ওকে দেখতে পেল না ।
হুর যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো ।কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে ।বুকটা অসম্ভব রকমের কাপছে।চোখে যেন সব ঝাপসা দেখছে ।
দেওয়াল ধরে নিজেকে সামলে নিলো ।শেষ বারের মতো চাবি দিয়ে ট্রাই করতেই খুলে গেলো ।

….
হাতে পায়ে অসম্ভব ব্যাথা নিয়ে রাস্তা দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে হুর ।এটা কোন জায়গা চিনতে পারছে না।চোখে সব ঝাপসা দেখছে । দোতালা দিয়ে নামতে গিয়ে ভালোই ব্যাথা পেয়েছে ।
বাড়ি থেকে বেশি দূরে আসতে পারে নি এটা নিশ্চিত।
কিন্তু হঠাৎ শোরগোল এর আওয়াজ পেলো পেছনে তাকিয়ে দেখলো নওশাদ এর বাড়ির ই কয়েকটা গার্ড।
গার্ড রা পেছনের গেট দিয়ে কাউকে পালাতে দেখেছিল, ওরা ভেবেছে হয়তো নওশাদ এর কোনো শত্রু গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট চুরি করে পালিয়েছে ।
তাই ওরা সেদিকেই হুরকে তাড়া করলো ।

সাথে তিনটা ভয়ঙ্কর কুকুর যা দেখে হুরের গলা শুকিয়ে এলো ।
দৌড়াতে শুরু করলো কোনো দিকে না তাকিয়ে। হঠাৎ সামনে একটা পোড়াবাড়ির মতো জায়গা দেখতেই সেখানে গিয়ে লুকালো ঝোপঝাড় এর মধ্যে। লোকগুলো সেখানেও আসলো হুর ঘাপটি মেরে সেখানে বসে রইল শরীর শক্ত হয়ে আসছে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বসে রইল।
শরীর এর অবস্থা বেগতিক দেখে হুর বুঝলো ওর প্রেশার বেড়েছে নাহলে কমেছে ।
লোকগুলো খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে চলে গেলো ।

ওরা সেখানে থেকে চলে যেতেই হুর উঠে দাঁড়ালো পা বাড়াতেই মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গেলো ।
মাথা ধরে কিছুক্ষন বসে থাকলো হুর । হঠাৎ দুটো গাড়ির শব্দ পাওয়া গেলো।
হুর ওভাবেই পড়ে পড়ে ভাবলো কে আসবে এতো রাতে এই পোড়াবাড়ি তে?

চলবে,,,,,
রেসপন্স করবেন সবাই । কমেন্ট রিয়েক্ট করে উৎসাহিত করবেন ধন্যবাদ ❣️

মিহিকা রোজা- Black Rose (লেখিকা)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here