#violent_love
Mariam_akter_juthi
#পর্বঃ১৯
ব্যাস জুথির এতটুকু কথাই পরিস্থিতি গরম করার জন্য যথেষ্ট ছিল। আরিশ খাবারের প্লেটটা মেঝেতে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে জুথির দিকে তেড়ে যেতে যেতে বললো,
‘বান্দির বাচ্চা, আমার কথা গায়ে লাগেনা?
আরিশ কে রাগে গজগজ করে ওর দিকে তেরে আসতে দেখে,জুথি খাবার টেবিল থেকে উঠে সানজিদা খানের পিছনে দাঁড়িয়ে ওনার বাহু চেপে ধরে ভয়াত কন্ঠে বললো,
‘বড় আম্মু তোমার ছেলেকে নিষেধ করো না? ওনাকে ভয় লাগছে তো আমার।
সানজিদা খান, একবার জুথির দিকে তাকিয়ে আরিশ কে কিছু বলবে — তার আগেই আরিশ জুথি কে সানজিদা খানের পিছন থেকে টেনে পরপর দুটো থাপ্পর লাগিয়ে বললো,
‘কোথায় যেন যাবি বলছিলি? আর কার কথা শুনবি না? এক ভাতারে হয় না? কয়জন লাগে তোর?
জুথি থাপ্পর খেয়ে, ফুপিয়ে কান্না করছে, তখন সাফওয়ান খান, মাহামুদ খান, খাবার টেবিল থেকে উঠে আরিশের কাছে এসে জুথি কে সাফওয়ান খানের পাশে দাঁড় করিয়ে মাহমুদ খান বললেন।
‘তুমি ওকে এভাবে মারতে পারো না? ও কোন অন্যায় করেনি। বাচ্চা মেয়ে ভাই বোনেরা ঘুরতে গেলে ও তাদের সাথে যাবে এটাই স্বাভাবিক।
আরিশ রাগ কন্ট্রোল করার জন্য মাথার চুল শক্ত করে মুড করে ধরে ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে পাগলের মত মাথা এদিক ওদিক করে বললো,
‘ওকে আমার কথা শুনতে হবে। আমার অবাধ্য হলে ওকে দুনিয়া ছাড়তে হবে।
আরিশ কে পাগলের মত আচরণ করতে দেখে সাফওয়ান খান বললেন,
‘তুমি দিনে দিনে বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছ আরিশ। নিজেকে কন্ট্রোল করতে শিখো।
আরিশ সাফওয়ান খানের জ্ঞান শুনে যেন রাগটাকে আর কন্ট্রোল করতে পারল না, পাশে থাকা একটা কাঁচের ফুলের টপ মেঝেতে আছাড় মেরে চেঁচিয়ে বললো,
‘আম্মু এই লোককে আমার ব্যাপারে কথা বলতে নিষেধ কর। আর নয়তো আজকে,,
আরিশের ভাঙচুর দেখে জুথি কে আরো জোরে ফুপিয়ে কাঁদতে দেখে রাদিফ উঠে জুথির পাশে গিয়ে আরিশ কে বললো,
‘জোর করে কোন কিছু পাওয়া যায় না। আর তুইও ওকে পাবি না। কারণ এখন সময় বদলাবে ও আমার হ,, — ব্যাস রাদিফ বাকি কথা আর শেষ করতে পারল না, আরিশের দাবাং মার্কা ঘুশি খেয়ে, আরিস ঘুশিটা এতটাই জোরে দিয়েছে যে রাদিফের নাক ফেটে গড়গড় করে রক্ত বের হয়ে মুহূর্তেই সেন্সলেস হয়ে গেছে ও। রাদিফকে মেঝেতে লুটিয়ে পড়তে দেখে সবাই রাদিফের কাছে এসে ব্যস্ত হয়ে যায়। লিমা খান ছেলের এমন অবস্থা দেখে দৌড়ে ছেলের কাছে এসে রাদিফের মাথাটা ওনার কোলের উপর রেখে ঢাকতে লাগলেন,
‘রাদিফ বাবা কি হলো তোর? গালে চাপড় দিতে দিতে মাহমুদ খানের উদ্দেশ্যে বললো,—‘ওগো ডক্টর কে ডাকো না। ও তো চোখ খুলছে না। নাক থেকে কিভাবে রক্ত বেরোচ্ছে তুমি তাড়াতাড়ি ডাক্তারকে ডাকো না প্লিজ।
জুথিও তখন রাদিফকে পরে যেতে দেখে দৌড়ে,রাদিফের কাছে গিয়ে গালে চাপড় দিয়ে ফোপাতে ফোপাতে বললো,
‘ক,কি হল তোমা,,র? চোখ খুলছো না কেন তুমি? কথা ব,বলো প্লিজ। বলে জুথি ফোপাতে ফোপাতে লিমা খানের হাত ধরে বললো, —‘মে,মেঝে মা ভাই চোখ খু,খুলছে না কেন?
জুথির কথায় লিমা খান ওর দিকে তাকাতে ভীষণ মায়া হল উনার। দু’গালে পাঁচ আঙ্গুলের দাগ কিভাবে চকচক করছে। উনি কিছু বলার ভাষা খুজে পাচ্ছেন না। রাদিফ কে যেমন উনি ভীষণ ভালোবাসেন, ঠিক তেমনি উনি আরিশ কেও ভালোবাসে। আরিশ ছেলেটা এমন যে, একটুতেই মাথা গরম হয়ে যায়। তারপর আর নিজেকে সামলাতে পারে না, কিন্তু যারা নিজেকে সামলাতে পারে তারা কেন পরিস্থিতি ঠান্ডা করার বদলে গরম করে? আরিশ যেহেতু বলেছে জুথি কে ঘুরতে যেতে দিবে না, তাহলে ওকে জোর করে নিয়ে অশান্তি করার কি প্রয়োজন? থাকুক না আরিশ ছেলেটা জুথিতে আ্যাডিকটড হয়ে।—উনার এসব চিন্তা ভাবনার মধ্যে আরিশ রক্ত আবা চোখ নিয়ে জুথির চুলের মুঠি পেছন থেকে শক্ত করে ধরে টেনে তুলে বললো,
‘তোর সাহস কি করে হলো? আমার সামনে পরপুরুষের জন্য উতলা হওয়ার?
আরিশ কে আবারো রেগে যেতে দেখে সাফওয়ান খান,আরিশের দিকে এগোতে নিলে আরিশ চেঁচিয়ে বললো,
‘আপনি এক’পা ও আমার কাছে আসার চেষ্টা করবেন না। বলে জুথিকে পাঁজাকোলা তুলে সিঁড়িতে উঠতে নিলে, জুথি ছোটাছুটি করে জোরে কান্না করে বললো,
‘ব, বড়ো আম্মু,আম্মু, ব,বড়ো আব্বু , তোমরা সবাই উনাকে ছাড়তে বলো না, উনি আমাকে মে,মেরে ফেলবেন প্লিজ আ,আমাকে ছাড়তে বলো। আমার ভয় লাগছে তো ওনাকে।
জুথি ওভাবে ছটফট করার ভিতরে, আরিশ ওর রুমে এনে জুথি কে বিছানার উপর ফিক্কা মেরে, রুমের দরজাটা লক করে বিছানার কাছে এসে দাঁত কিড়মিড় করে বললো,
‘পিরিয়ড চলছে বলে ফিজিক্যাল টর্চার থেকে বেঁচে গেলি, আর নয়তো,,?
এতোটুকু বলে থেমে আবার বললো,
‘তুই বলছিলি না? আমি তোকে মেরে ফেলবো? একদম ভয় পাস না, আমি তোকে জানে মারবো না, কিন্তু তোকে স্বাধীন ভাবে ছেড়েও দেব না।— বলে ওর রুমের বারান্দা থেকে মোটা মোটা দুটো দড়ি এনে জুথির দিক তাকিয়ে বাঁকা হেসে, জুথির দুই হাত খাটের দুই পাশে শক্ত করে বেঁধে দিলো।
জুথি হাত বাঁধায় ফুপিয়ে বললো,
‘আ,আমাকে বাঁধছেন কেন? আমার হা,হাত খুলে দিন।
আরিশ জুথির কথা শুনে চোখ দুটো ছোট ছোট করে শয়তানি হাসি দিয়ে বললো,
‘আজ থেকে এমন বাধা অবস্থায় এই রুমে বন্দী থাকবি। বলে জুথির দিকে তাকিয়ে বা চোখটা টিপ দিয়ে রুম থেকে বের হতে নিলে, জুথি অনুনয়ের কণ্ঠে বললো,
‘আ,আমাকে এভাবে বেঁধে রে,রেখে যাবেন না, আপনার দোহাই লা,লাগে আমাকে ছাড়ুন। আমার হাত দুটো খুলে আমাকে যেতে দিন। — কিন্তু আরিশ জুথির কোন কথা না শুনে বাহির থেকে দরজাটা পিন লক করে যেতে নিলে দেখে সানজিদা খান ওর সামনে দাঁড়িয়ে, এটা দেখে আরিশ পাশ কাটিয়ে যেতে নিলে উনি আরিশের হাতটা ধরে উনার রুমের দিকে হাঁটা দিলেন। সানজিদা খান ওনার রুমে এসে দরজাটা লক করে আরিশ কে বিছানার উপর বসিয়ে বললেন,
‘আরিশ আমি তোমার জন্মধারিনী মা। তুমি কি আমার কোন কথা শুনবে না?
‘,,,,,,,,,,,।
‘চুপ করে থাকবে না, তুমি এরকম পাগলামি করছ কেন? ওরকম একটা মেয়ের জন্য রাদিফের গায়ে হাত কেন তুল,, — আরিশের মাথা তো এমনেই গরম ছিল এখন আবার তারই প্রিয়সীকে তারই সামনে অপমান যোগ্য কথা বলায় উঠে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বললো,
‘আমার কাছে মৌ কোন ওরকম মেয়ে নয় আম্মু। ও আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে ইম্পরট্যান্ট মানুষ। আজ বলেছ নেক্সট জেন এ ধরনের কোনো কথা তোমার মুখ থেকে না শুনি।
‘আরিশ ওর জন্যই তুমি সেদিন আমাদের থেকে চলে গেয়েছিলে,৭-৭ টা বছর তুমি আমার বুকের কাছে ছিলে না। তোমার জায়গাটা ওকে দেখলে কুঁড়েকুঁড়ে ক্ষেত।
আরিশ ওর মায়ের কথা শুনে বিছানায় বসে শান্ত কন্ঠে বললো,
‘তুমি আমার মা হও, আম্মু। আমি তোমার ছেলে হয়ে আমার অনুভূতি গুলো তোমাকে বোঝাতে পারবো না। আর রইল বাকি মৌ এর কথা? তাহলে তুমি আমাকে যতটা ভালোবাসো ঠিক ততটাই ভালো তুমি মৌ কে বাসো। কিন্তু তুমি তা প্রকাশ করো না। বরঞ্চ তুমি এটা প্রমাণ করো যে তুমি মৌ কে পছন্দ করো না। কিন্তু আমি তো জানি আমার মা এতগুলো বছর সবার সামনে মৌয়ে সাথে খিটখিট করলেও, সবার আড়ালে মৌ কে আগলে রেখেছে। শুধু এটাই ভেবে যদি তার ছেলে দেশে ফিরে তাহলে একমাত্র এই মেয়ের জন্যই ফিরবে।
সানজিদা খান ছেলের কাছে সত্যি ধরা পড়ার মতো কাচুমাচু করে বললেন,
‘তো-তোমার ভুল ভুল হচ্ছে আমি ওই মেয়েকে,,
আরিশ ওর আম্মুর কথা শেষ করতে না দিয়ে বললো,
‘আম্মু মিথ্যা বলার প্রয়োজন নেই, মৌ কে তুমি আড়ালে নয় সবার সামনে আঁকড়ে রাখো। তাতে আমার মনে হবে আমার মাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মা।
সানজিদা খান বুঝতে পারে ছেলের থেকে আর লুকানো যাবে না তাই উনি ধরে রাখা চোখের পানি ফেলে বললেন,
‘তাহলে তুমি সেদিন আমাকে ছেড়ে গিয়েছিলে কেন?
মায়ের কথায় আরিশ উঠে চলে যেতে নিলে সানজিদা খান আরিশ হাত ধরে ভাঙ্গা গলায় বললেন,
‘আমি তোমার অনুভূতি শুনবো বাবা। মাকে বলো?
আরিশ দাঁড়িয়ে যায় বাধ্য সন্তানের মত মমতাময়ী মায়ের ভাঙ্গা কন্ঠ শুনে, আরিশ কে দাঁড়াতে দেখে সানজিদা খান ওর সামনে দাঁড়িয়ে বললেন,
‘মাকে বলবে না?
আরিশ নিশ্বাস ফেলে হাত দুটো মোট করে বললো,
‘আম্মু তুমি তো জানোই, আমি ছোটকাল থেকে মাথা গরম হলে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনা। আর আমি যেগুলো সহ্য করতে পারতাম না সেই জিনিসগুলোই আমার সামনে বেশি হত। তাই মাত্রাহীন রিয়াক্ট করে ফেলতাম।—এতোটুকু বলে থেমে আবার বললো,
‘আম্মু মৌকে আমি কারো সাথে সহ্য করতে পারি না। ও আমি ব্যতীত কারো সাথে হেসে কথা বলুন এটা আমি মানতে পারি না, ওর সামান্য হাসি আমার হৃদয় কুরে কুরে খায়। ওর সামান্য ব্যথা আমাদের হৃদয়কে কাঁপিয়ে দেয়, ওর চোখের পানি আমার সমস্ত সত্তা নাড়িয়ে দেয়। জানো আম্মু ওর চোখে পানি দেখলে মনে হয়,ওর চোখের পানি বের হওয়ার কারণগুলো জেনে সেই সব কষ্ট আমি নিঃশেষ করে দেই। তবুও ওর চোখের পানি বের না হোক, আর যখন ওর চোখের পানি কারনটা জানতে পারি তখন সর্বপ্রথম কারণটাই আমি হই। আর যখন এটা জানতে পারি মনে হয় পুরো পৃথিবী জ্বালিয়ে দেই কিন্তু আফসোস দুনিয়া তো আমার, কিংবা আমার বাবার নয়।
আরিশের রাগ কমতে দেখে সানজিদা খান ওনার পাশে আরিশ কে বসিয়ে বললেন,
‘আমার সোনা, তোমাকে আমি বুঝতে পারি। কিন্তু তুমি যে চলে গিয়েছিলে, এই জিনিসটা তখন মানতে পারছিলাম না। বারবার এটাই মনে হতো মৌয়ের জন্যই তুমি চলে গেছো তাই তো তুমি চলে যেতে ডিভ, — সানজিদা খানের কথা শেষ করার আগে আরিশ বললো,
‘মনে হতো না আম্মু আমি মৌয়ের জন্যই চলে গিয়েছিলাম, কারণ একটাই ছিল ওর ছোট্ট মন বারবার ভুল করত,আর তার রেশ ধরে আমার থেকে আঘাত পেতো। আম্মু আমি ওর প্রতি এতটাই আ্যাডিকটড যে ওকে দেখলেই ছুঁতে মন চাইতো।ওর সাথে সময় কাটাতে মন চাইত, কিন্তু আম্মু,আমি সেটা করতে পারতাম না। আমি যদি এখানে থাকতাম ওকে বারবার ছুঁতে মন চাইতো আর আমি সেটা করতাম, কিন্তু ও সেটা সহ্য করতে পারত না। মরে যেত আম্মু,ও মরে যেত। আর ওর কিছু হলে আমি দম আটকে মরে যেতাম। ও শুধু আমার, শুধুই আমার আম্মু।
সানজিদা খান ছেলের কথা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
‘ও তো এখনো ছোট?
ওনার কথা শুনে আরিশ ওঠে দাঁড়িয়ে বললো,
‘আমি জানি কিন্তু আমার কিছু করার নেই। রাদিফ কে রাখার আর কোন রাইট ছিল না। কারণ ওর সুইজারল্যান্ডের থাকার সময় শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাই ওকে দেশে ফিরতে হতো। আরো দেশে ফিরে আমার মৌ এর কাছে ঘেষতে চাইবে এটা আমি জানি, তাই আমিও ওর সাথেই আসি।
সানজিদা খান রাদিফের চলে আসার কথাটা সম্পূর্ণ বুঝতে না পেরে বললেন,
‘মানে?
‘মানে এটাই আম্মু রাদিফের সুইজারল্যান্ড কলারশিপ আমি করিয়েছিলাম, যাতে আমার অনুপস্থিতে ও মৌ এর কাছে যেতে না পারে।
‘এর জন্যই রাদিফ হটাৎ,,
‘হ্যাঁ, -এতটুকু বলে থেমে আবার বললো,
‘মৌ আমার, ছিল, আছে এন্ড মৃত্যুর আগ পর্যন্ত থাকবে। আর ও থাকতে বাধ্য।
আরিশ তুমি ওকে সময় দাও, ও যেন তোমাকে বোঝে কারণ জোর করে সব পাও,—আরিশ তার মায়ের কথায় গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
‘সময়? এই সাত বছর অনেক সময় ছিল। বলে আরিশ রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
Continue,,,

